📄 আসক্তির চিকিৎসা
বান্দার প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অপার অনুগ্রহ হল, তিনি তার বান্দাদের অনর্থক ছেড়ে দেননি এবং অনর্থক সৃষ্টি করেননি। বরং তিনি তাদের জন্য তাদের জীবনে যত ব্যাধি, সংক্রামক ও বক্রতা আছে তার চিকিৎসার জন্য মজবুত দ্বীন নাযিল করেছেন। জীবনের সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাধি হল, নিষিদ্ধ কামনা-বাসনা, কুআসক্তি বা নিষিদ্ধ চাহিদা। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ মারাত্মক ব্যাধির জন্য একাধিক চিকিৎসা নির্ধারণ করেছেন; যার দ্বারা খারাপ বাসনা ও কুআসক্তির উত্তেজনা স্তিমিত হয় এবং তার দৌরাত্ম্য দূর হয়। নিম্নে এগুলোর সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হল।
এক. বিবাহ
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ، مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ البَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجُ؛ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلبَصَرِ، وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ.
"হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যাদের ক্ষমতা আছে তারা যেন বিবাহ করে। কারণ, তোমাদের চোখের জন্য অধিক হেফাজতকারী এবং তোমাদের লজ্জাস্থানের সংরক্ষক"। ৪৯
উল্লিখিত হাদিসে الباءة শব্দের অর্থ স্ত্রী মিলনে সক্ষম ও বিবাহের খরচ। যখন কোন ব্যক্তি বিবাহের ক্ষমতা রাখে এবং তার নফস বিবাহের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে তাকে অবশ্যই বিবাহ করতে হবে।
বিবাহ হল হালাল উপায়ে মানুষ তার মানবিক ও জৈবিক চাহিদা মেটানোর একটি পথ; যা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষের জন্য বৈধ বিধান হিসেবে চালু করেছেন। বিবাহ হল নবি ও রাসুলগণের সুন্নাত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যারা তাদের নিজেদের উপর বিবাহকে হারাম করেছিল তাদের বিষয়ে বলেন-
لَكِنِّي أُصَلِّي وَأَنَامُ وَأَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي.
"কিন্তু আমি সালাত আদায় করি, ঘুমাই, রোজা রাখি, ইফতার করি এবং নারিদের বিবাহ করি। সুতরাং এ গুলো সবই হল আমার আদর্শ। আর যে ব্যক্তি আমার আদর্শ থেকে দূরে সরে সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়"। ৪৮
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
النِّكَاحُ مِنْ سُنَّتِي، فَمَنْ لَمْ يَعْمَلْ بِسُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي، وَتَزَوَّجُوا فَإِنِّي مُكَاثِرُ بِكُمُ الأُمَمَ، وَمَنْ كَانَ ذَا طَوْلٍ فَلْيَنْكِحُ، وَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَعَلَيْهِ بِالصِّيَامِ ۚ فَإِنَّ الصَّوْمَ لَهُ وِجَاءُ.
"বিবাহ আমার সুন্নাত। যে আমার সুন্নাত অনুযায়ী আমল করে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। তোমরা বিবাহ কর, কারণ আমি আমার উম্মতের আধিক্য নিয়ে আল্লাহর দরবারে গর্ব করব। যার সামর্থ আছে সে অবশ্যই বিবাহ করবে আর যার সামর্থ নাই তার উপর কর্তব্য হল রোজা রাখা। কারণ, রোজা তার জন্য প্রতিষেধক"।৪৯
বিবাহের মাধ্যমে মানুষের দ্বীন ও ঈমানের সংরক্ষণ হয়। আর যিনা ব্যভিচার দ্বারা মানুষ যে নুরের দ্বারা আলোকিত, তা ছিনিয়ে নেয়া হয়।
টিকাঃ
৪৯ সহিহ মুসলিম: ১৪০০।
৪৮ সহিহ মুসলিম: ১৪০১।
৪৯ সহিহ ইবনে মাজাহ ১৮৪৬; শাইখ আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।
📄 নেককার মহিলা বা স্ত্রী অর্ধ দ্বীনের ব্যাপারে সাহায্যকারী
আনাস ইবনু মালেক রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- مَنْ رَزَقَهُ اللهُ امْرَأَةً صَالِحَةٌ فَقَدْ أَعَانَهُ عَلَى شَطْرِ دِينِهِ، فَلْيَتَّقِ اللَّهُ فِي الشَّطْرِ الثاني.
"আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যাকে নেককার স্ত্রী লাভের তাওফিক দেন, তাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অর্ধেক দ্বীনের বিষয়ে সাহায্য করল, বাকি অর্ধেকের বিষয়ে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে"।৫৩
আল্লামা মুনাবি রহ. বলেন, দ্বীনের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর ও মহা মুসিবত হল দুটি জিনিষ। এক: পেটের চাহিদা; দুই: যৌন চাহিদা।
দ্বিতীয় চাহিদা মেটানোর জন্য তাকে বিবাহ করতে হবে। যদি কোন ব্যক্তি দ্বীনদার ও সৎ নারিকে বিবাহ করে, তাহলে সে ব্যভিচার থেকে মুক্ত থাকবে এবং সে অর্ধেক চাহিদা মেটাতে পারবে। তারপর তার অবশিষ্ট অর্ধেক চাহিদা বাকি থাকল। আর তা হল তার পেটের চাহিদা। এ চাহিদা মেটানোর জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তাকওয়া অর্জন করার উপদেশ দেন। তাকওয়ার মাধ্যমে তার দ্বীনদারি পূর্ণতা লাভ করে এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের যে দ্বীন দিয়েছেন সে দ্বীনের উপর অটল অবিচল থাকার তাওফিক হাসিল হয়। ৫৪
এখানে [হাদিসে] নেককার নারির কথা বলার কারণ হল-নারি যদি দ্বীনদার ও নেককার না হয়, তার দ্বারা ব্যভিচার থেকে মুক্তি পেলেও লোকটি তার স্ত্রীর কারণে কোন অপকর্ম ও খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে এবং তার স্ত্রী তাকে হারাম উপার্জন ইত্যাদির প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে পারে; যা তার পরিণতির জন্য খুবই খারাপ।
আল্লামা কুরতুবি রহ. বলেন, বর্তমানকালে কেউ অন্যায়-পাপ থেকে সবর করার ক্ষমতা না রাখে, তার জন্য ওয়াজিব হবে দ্বীনদার স্ত্রী তালাশ করা; যার মাধ্যমে সে তার দ্বীনদারি ঠিক রাখতে পারে। ৫৫
টিকাঃ
৫০ এহইয়াউ উলুমুদ্দিন: ২/২৩।
৫১ তারিখে দামেশক: ৫০/১২৩।
৫২ এহইয়াউ উলুমুদ্দিন: ২/২৩।
50 মুসতাদরাকে হাকিম: ২৬৮১।
৫৪ ফয়জুল কাদির: ২/১৭৭।
** তাফসিরে কুরতুবি: ৪/২৯।
📄 বিবাহের মধ্যে রয়েছে ছাওয়াব আর ব্যভিচারে রয়েছে গুনাহ
বিবাহের সবচেয়ে কল্যাণকর ও বিশেষ দিক হল, যৌন চাহিদা মিটানোতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এর পক্ষ হতে সাওয়াবের অধিকারী হওয়া যায়। যেমন, হাদিসে বর্ণিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ قالوا: يا رسول الله، أيأتي أحدنا شهوته ويكون له فيها أجر ؟، قال أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي الحَرَامِ أَكَانَ عَلَيْهِ فِيهَا وِزْرُ؟ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الحَلَالِ كَانَ لَهُ أَجْرُ.
“তোমাদের কেউ তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করাতে তার জন্য রয়েছে সদকার সওয়াব। এ কথা শোনে সাহাবিরা বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা যদি আমাদের স্ত্রীদের সাথে যৌন চাহিদা মেটাই তাতেও কি আমাদের সওয়াব রয়েছে? তখন তিনি বললেন, যদি লোকটি কোন হারাম কাজে লিপ্ত হত তাহলে তার গুনাহ হত কিনা? অনুরূপভাবে যখন সে হারাম থেকে বিরত থেকে হালাল কাজে লিপ্ত হও তখন অবশ্যই তোমাদের জন্য সওয়াব ও বিনিময় থাকবে"। ৫৬
ইমাম নববি রহ. বলেন, যেসব কাজগুলো মুবাহ বা হালাল ইবাদতের নিয়ত দ্বারা তা ইবাদতে পরিণত হয়। যেমন—স্ত্রী সহবাসের দ্বারা যদি কোন ব্যক্তি স্ত্রীর অধিকার আদায়, তার সাথে সুন্দর ব্যবহার, নেক সন্তান লাভ, নিজের নফসকে ও স্ত্রীকে ব্যভিচার থেকে হেফাজত করা, খারাপ বা হারামের দিকে তাকানো থেকে বিরত রাখা, খারাপ চিন্তা ও ফিকির হতে বিরত রাখা ইত্যাদি ভালো ও নেক উদ্দেশ্য লাভের নিয়ত করে, তাহলে স্ত্রী সহবাস অবশ্যই ইবাদত বলে পরিগণিত হবে। ৫৭
মনে রাখতে হবে—বিবাহ হল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা যুবকদের অনৈতিক চিন্তাধারা থেকে হেফাজত করে এবং যিনা-ব্যভিচার থেকে রক্ষা করে। বিবাহের মাধ্যমে একজন যুবক হারাম বিষয়ে চিন্তা করা এবং হারাম কাজের ইচ্ছা করা হতে বিরত থাকে।
টিকাঃ
৫৬ সহিহ মুসলিম : ১০০৬।
৫৭ শরহু নববি আলা মুসলিম : ৭/৯৬।
📄 এক: বিবাহিত ব্যক্তিকে পবিত্র ও সৎ থাকতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সাহায্য করে
কোনো ব্যক্তি যদি বিবাহের মাধ্যমে পবিত্র থাকতে চায়, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্বীয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জবানে তাকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কারণ, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বান্দা থেকে সব ধরনের অশ্লীলতা দূর করতে চান এবং তাকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার জন্য যেসব কর্মকে হালাল করেছেন, তার দিকে ধাবিত করতে এবং হারাম থেকে বিরত রাখতে চান। আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
ثَلَاثَةٌ حَقٌّ عَلَى الله عَوْنُهُمْ المُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ الله، وَالْمَكَاتَبُ الَّذِي يُرِيدُ الأداءَ، وَالنَّاكِحُ الَّذِي يُرِيدُ العَفَافَ.
“তিন ব্যক্তিকে সাহায্য করা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের উপর ওয়াজিব। এক: আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদ। দুই: চুক্তিবদ্ধ গোলাম—যে মুক্তিপণ আদায় করতে চায়। তিন: বিবাহিত ব্যক্তি—যে পবিত্র থাকতে চায়”।৫৮
যদি কোন ব্যক্তি এমন হয়, একটি স্ত্রী দ্বারা তার আসক্তির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না এবং সে তার নিজের বিষয়ে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করছে, তাহলে তার উপর একাধিক বিবাহ করা ওয়াজিব, যাতে সে হারাম থেকে বাঁচতে পারে। আর যদি এক স্ত্রী দ্বারা তার আসক্তির ক্ষুধা নিবারণ হচ্ছে, তবে একটি স্ত্রী নিয়ে থাকাতে তার কষ্ট হচ্ছে, তাহলে তার জন্য পরবর্তী বিবাহ করা মোস্তাহাব।
টিকাঃ
৫৮ সুনানু তিরমিযি: ১৬৫৫। হাদিসটি হাসান।