📘 আসক্তি সমাজ ধ্বংসের হাতিয়ার > 📄 খারাপ ভাবনা প্রতিহত করা

📄 খারাপ ভাবনা প্রতিহত করা


খারাপ ভাবনাসমূহ মানবাত্মাকে ব্যাধিগ্রস্ত ও রোগি বানিয়ে দেয়। মানুষ যখন তার খারাপ ভাবনাসমূহকে প্রতিহত না করে এবং তা নিয়েই ব্যস্ত থাকে, তখন তা চিন্তা হিসেবে দেখা দেয়। তারপর তা চিন্তা থেকে উন্নতি লাভ করে সাধারণ ইচ্ছার রূপ নেয়। তারপর সাধারণ ইচ্ছা থেকে তা উন্নতি লাভ করে তা প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির রূপ নেয় তারপর তা দৃঢ় প্রত্যয় ও প্রতিজ্ঞায় রূপ নেয়। তারপর সে অপকর্মের প্রতি অগ্রসর হয় এবং হারামে লিপ্ত হয়। সুতরাং, প্রথমেই একজন মানুষ তার আত্মাকে খারাপ ভাবনার উদ্রেক থেকে রক্ষা করবে এবং খারাপ ভাবনার সাথে নিজেকে ছেড়ে দিবে না।
অন্তরের বাসনা এটি একটি কঠিন বিষয়। মানুষের ভালো ও মন্দের সূত্রই হল অন্তরের বাসনা। অন্তরে কোন বাসনা জাগ্রত হলে তা যদি প্রাথমিক অবস্থায় প্রতিহত করা হয়, তাহলে তুমি তোমার আসক্তির নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এবং তোমার নফসকে পরাজিত করলে। আর যদি তোমার আসক্তি তোমার উপর বিজয়ী হয়, তাহলে তুমি অবশ্যই গহ্বরে নিপতিত হবে।
মানবাত্মায় বাসনা বারবার উদ্ধৃত হতেই থাকে, শেষ পর্যন্ত সেটি তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে, আর যখন তা তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে তখন তা বাতিল ও ভ্রান্ত আশায় পরিণত হবে। তখন অবস্থা এমন দাঁড়ায় যেমন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনে কারিমে এরশাদ করেন-
كَسَرَابٍ بِقِيعَةٍ يَحْسَبُهُ الظَّمْآنُ مَاءً حَتَّى إِذَا جَاءَهُ لَمْ يَجِدْهُ شَيْئًا وَوَجَدَ اللَّهَ عِندَهُ فَوَفَّاهُ حِسَابَهُ وَاللَّهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ.
“আর যারা কুফরি করে তাদের আমলসমূহ মরুভূমির মরিচিকার মত, পিপাসা কাতর ব্যক্তি যাকে পানি মনে করে থাকে, কিন্তু যখন ব্যক্তি সেটার কাছে আসে তখন দেখে সেটা কিছুই নয় এবং সে পাবে সেখানে আল্লাহকে, অতঃপর তিনি তাকে তার হিসাব পূর্ণমাত্রায় দেবেন।”৪০
সবচেয়ে নিকৃষ্ট মনোবৃত্তির অধিকারী হচ্ছে সে ব্যক্তি, যে মিথ্যা আকাঙ্ক্ষা ও আশার ঘর বাধে। কারণ, মিথ্যা আশা হলো অভাবীদের পুঁজি এবং বেকার লোকদের অবলম্বন, আর মানুষের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর বস্তু। কারণ এটি মানুষের মধ্যে অক্ষমতা, অলসতা ও হতাশার জন্ম দেয়। বান্দাকে যখন তার অন্তরের বাসনার উপর চলতে ছাড় দেয়া হয়, তখন সে হারামে পতিত হয়। তারপর খালেস তাওবার মাধ্যমে আত্মাকে নাপাকী হতে মুক্ত করা ছাড়া তার কোন চিকিৎসা নাই।
আর যদি বান্দা গুনাহের স্বাদ ও পবিত্র থাকার স্বাদ এবং গুনাহের স্বাদ ও শত্রুকে পরাভূত ও শত্রুর উপর শক্তিমত্তার স্বাদ, অনুরূপভাবে গুনাহের স্বাদও শয়তানকে পরাস্ত ও তাকে বিফল করার স্বাদের মধ্যে তুলনা করে তবে তা অবশ্যই গ্রহণ করবে, যা তার বাহির ও ভিতরকে সংশোধন করার কারণ হবে।
একটি কথা মনে রাখতে হবে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ হতে মানবাত্মার মধ্যে কিছু ভালো ভাবনার উৎপত্তি হয়; আবার কিছু ভাবনা আসে শয়তানের পক্ষ হতে, অনুরূপ কিছু ভাবনা তৈরি হয় নিজের আসক্তি থেকেও।
নফস মানুষকে খারাপ কাজের আদেশ দিয়ে থাকে। প্রতিটি কাজের আগেই সেখানে কিছু চিন্তা-দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। মানুষের অন্তরে, জ্ঞান ও নফসের মধ্যে চিন্তা গবেষণা ছাড়া কোন কিছুই হঠাৎ করে বাস্তবায়ন হয়েছে এ কথা কখনোই বলা যাবে না। প্রতিটি বস্তু বাস্তবে অস্তিত্বে আসার জন্য প্রথমে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা এ ফিকির অতিবাহিত হতে হয়।
প্রাথমিক পর্যায়ে যখন কোন কিছুর চিকিৎসা বা সংশোধন হয়, তখন তা পরবর্তীতে খুবই সহজ ও সরল হবে। আর এ কাজটি মানুষ যত তাড়াতাড়ি করবে তার সংশোধনও তত তাড়াতাড়ি হবে।
মানুষ তার ভাবনা-চিন্তাকে কখনোই শেষ করে দিতে পারবে না। কারণ ভাবনা-চিন্তা মানুষের অন্তরে এসে আঘাত করবেই, সে তাতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে না।
শয়তান কোন কোন সাহাবির অন্তরেও আল্লাহ্ সম্পর্কে মারাত্মক কুমন্ত্রণা ঢেলে দিত। যেমন—
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কতক সাহাবি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে তাকে জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের অন্তরে এমন কিছু কামনা বাসনা জাগ্রত হয়, যা আমরা আমাদের মুখে বলতে লজ্জাবোধ করি। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বাস্তবেই কি তোমরা এ ধরনের অনুভব করো? তারা বলল হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটাই হল সত্যিকার ঈমান"। ৪১
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, "এক ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের অন্তরে এমন এমন খারাপ বিষয় জাগ্রত হয়, তা মুখে উচ্চারণ করার চেয়ে আমাদের কয়লা হয়ে যাওয়া অধিক প্রিয়। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। সব প্রশংসা সেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের, যিনি শয়তানের ষড়যন্ত্র ও ধোঁকাকে কু-মন্ত্রণায় রূপান্তর করে দিয়েছেন। "৪২
অর্থাৎ সব প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের। কারণ, শয়তান তোমাদের থেকে একমাত্র কু-মন্ত্রণার উদ্রেক করে, যা তোমরা অপছন্দ কর। তা ছাড়া শয়তান কোন কিছুই হাসিল করতে পারেনি। আর শয়তানের কু-মন্ত্রণাকে তোমরা যে অপছন্দ করছ তাই প্রমাণ করে যে তোমরা সত্যিকার ঈমানদার।
যখন কোন মানুষের অন্তরে শয়তান কুমন্ত্রণা দেয়, তখন তার উচিত হল, তার চিকিৎসা করা। এ ধরনের কুমন্ত্রণা যখন মুসলিমের অন্তরে আসবে, তখন একজন মুসলিমের করণীয় কি?
১. বিতাড়িত শয়তান হতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করবে।
২. শয়তানের কুমন্ত্রণাকে ঈমানি চিন্তা-ভাবনা দ্বারা পরিবর্তন করবে। কারণ, নফস হল যাঁতাকলের মত, তা কোন কিছুকে পিষতেই চায়। যদি কোন ব্যক্তি তার যাঁতাকলে গম রাখে, তাহলে তা পিষলে সেখান থেকে আটা বের হবে। আর যদি কোন ব্যক্তি তার যাঁতাকলে বালি রাখে, তাহলে তা পিষলে তার থেকে বালিই বের হবে, অন্য কিছু নয়।
শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য সহায়ক ভালো ভাবনা-চিন্তাসমূহ:
১. আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এর আজমত ও বড়ত্ব, আসমান ও জমিনের সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করা।
২. ইসলামি শরীয়তের জ্ঞান অর্জন করা। একজন মানুষের জন্য ইলম অর্জন ও জ্ঞানের চর্চা নিয়ে লিপ্ত থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অনেক আলেমগণের অবস্থা এমন যে, তারা হারাম বা অন্যায় কাজ করার মত সময়ই তাদের থাকে না। কারণ, তারা সবসময় শরিয়তের ইলম ও মুসলিম মিল্লাতের সমস্যা সমাধানের কাজে ব্যস্ত থাকে।
৩. আখিরাত ও তার ভয়াবহতা নিয়ে চিন্তা করা। যেমন—মৃত্যু, কবরের আযাব, হাউজে কাউসার, শাফা'আত, মিযান, পুলসিরাত, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি বিষয়ে চিন্তা করা।
৪. হালাল রুজি উপার্জনের জন্য চিন্তা করা। যেমন—ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকুরি ইত্যাদি বিষয়ে চিন্তা ফিকির করতে হবে। দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণে অবসর সময়গুলোকে ব্যয় করা ও কাজে লাগানোর জন্য ফিকির করা।
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন—উল্লিখিত সবকিছুকে যদি তুমি লাভ করতে চাও, তবে যেসব জিনিষ তোমার জানা জরুরি সে সব বিষয়গুলো জানতে এবং তা হাসিল করতে তোমার চিন্তাকে ব্যয় করতে হবে। যেমন—তাওহিদ সম্পর্কে তোমার জানতে হবে এবং তার দায়িত্ব কি তা তোমাকে জানতে হবে। মৃত্যুর পর জান্নাতে প্রবেশ নাকি জাহান্নামে প্রবেশ এ বিষয়ে চিন্তা করার মাধ্যমে তোমাকে অবশ্যই সময় ব্যয় করতে হবে। আর খারাপ ও বদ আমলের পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করতে হবে এবং তার থেকে বাঁচার উপায় কি তা তোমাকে ভেবে বের করতে হবে। ইচ্ছা ও দৃঢ়তার বিষয়ে তোমাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, যে সব কর্মের ইরাদা করলে তোমাকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করবে তারই ইরাদা করতে হবে। আর যেসব কর্মের ইরাদা (সংকল্প) তোমার ক্ষতির কারণ হয় তা পরিহার করতে হবে।
আল্লাহ্র নেককার বান্দাদের মতে—মানবাত্মার জন্য খেয়ানতের আকাঙ্ক্ষা করা, চিন্তা-ফিকিরকে খিয়ানত বিষয়ে ব্যয় করা স্বয়ং খিয়ানত হতে অধিক ক্ষতিকর। '৪৩
সুতরাং যেহেতু মানুষের অন্তরে সবসময় বিভিন্ন কর্মের উদ্রেক ও চিন্তা জাগ্রত হতেই থাকে, আর তা ধীরে ধীরে ইরাদায় (সংকল্পে) রূপ নেয়। তারপর তা প্রত্যয় ও দৃঢ়তায় রূপ নেয়, তাই প্রতিটি স্তরে তাকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে, শুধু ভাবনা-চিন্তার পর্যায়ের চিকিৎসাই যথেষ্ট নয়। আমাদেরকে অবশ্যই ভাবনা-চিন্তার পর্যায় ও পরবর্তী প্রতিটি পর্যায়ের চিকিৎসায় মনোনিবেশ করতে হবে।
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, 'তুমি ভাবনাকে প্রতিহত কর। যদি তা করতে সক্ষম না হও তবে তা চিন্তায় রূপ নেবে। তখন তোমাকে অবশ্যই চিন্তা দূর করার জন্য চেষ্টা করতে হবে। আর তাও যদি করতে সক্ষম না হও তাহলে তা আসক্তিতে পরিণত হবে। তখন তোমাকে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। আর যদি যুদ্ধ করে তা প্রতিহত করতে না পার তখন তা প্রতিজ্ঞায় রূপ নেবে, তখন তোমাকে তা দূর করার জন্য মরণপণ চেষ্টা করতে হবে। তাতে যদি তুমি ফেল কর, তবে তা বাস্তবে রূপ নেবে এবং কর্মে পরিণত হবে। তারপর যদি তাকে তা বিপরীত কোন ভালো কাজ দ্বারা প্রতিহত না কর, তখন তা তোমার অভ্যাসে পরিণত হবে। তখন তার থেকে ফিরে আসা তোমার জন্য পাহাড়কে জায়গা থেকে সরানোর চেয়েও কঠিন কাজ হবে। '৪৪
একটি কথা মনে রাখতে হবে, অন্তরের কু-বাসনাকে সংশোধন করা চিন্তার সংশোধনের চেয়ে অধিক সহজ। আর চিন্তাকে সংশোধন করা ইচ্ছার সংশোধনের চেয়ে অধিক সহজ। আর ইচ্ছার সংশোধন করা খারাপ কর্ম সংশোধন করা হতে সহজ। আর খারাপ কর্ম ঠিক করা অভ্যাস পরিত্যাগ করা হতে সহজ।
যদি তুমি বল কোন জিনিস তোমাকে এ ধরনের কুমন্ত্রণা ও খারাপ ভাবনা-চিন্তাতে গা ভাসিয়ে দেয়া প্রতিহত করতে সাহায্য করবে?
আমরা বলব, এ বিষয়ে কয়েকটি বিষয় সহযোগিতা করবে। যেগুলো একটি অপরটির উপর নির্ভরশীল।
১. এটা ঈমান রাখা ও দৃঢ়ভাবে জানা যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের অন্তরের অন্তঃস্থলে যে সমস্ত ভাবনা উদিত হয় তা সবই জানেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন- يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ.
"চক্ষুসমূহের খেয়ানত এবং অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে তিনি তা জানেন।"৪৫
وَإِن تَجْهَرُ بِالْقَوْلِ فَإِنَّهُ يَعْلَمُ السِّرِّ وَأَخْفَى.
"আর যদি তুমি উচ্চস্বরে কথা বল তবে তিনি গোপন ও অতি গোপন বিষয় জানেন।"৪৬
বান্দা যখন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার অন্তরের বিষয়সমূহ জানার কারণে লজ্জা অনুভব করবে, তখন সে তার অন্তরে যে সব কু ভাবনা-চিন্তা জাগ্রত হয়, তা থেকে সে দূরে থাকবে। এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
২. চিন্তা ফিকির করা:
তোমার অন্তরে যখন কুমন্ত্রণা ও খারাপ চিন্তার উদ্রেক হয়, তখন তুমি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বড়ত্ব সম্পর্কে চিন্তা করবে, আর আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নাম ও গুণসমূহকে তোমার অন্তরে হাজির করবে। অন্তরে এ কথা চিন্তা করবে, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কঠিন আযাব দাতা, শাস্তি দানকারি ও প্রতিশোধ গ্রহণকারি। তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান, শক্তিশালী ও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী।
৩. লজ্জাবোধ করা: আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কুদরতও তিনি যে আমাদের অন্তরের গোপন বিষয়গুলো জানেন তা বিশ্বাস করার পর তোমাকে অবশ্যই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের থেকে লজ্জা করতে হবে। তুমি খারাপ চিন্তা ও শয়তানি চিন্তা হতে নিজেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করবে। যখন তুমি কোন অপকর্ম করছ, ঠিক তখন যদি তোমার পরিচিত কেউ অথবা তোমার কোন বন্ধু তোমার নিকট প্রবেশ করে তখন তোমার কি অবস্থা হবে তা চিন্তা করে দেখ এবং তুমি কি করবে? মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যিনি তোমাকে দেখছেন তার থেকে লজ্জা করা আরও অধিকতর শ্রেয়।
৪. আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বড়ত্ব ও কুদরত সম্পর্কে চিন্তা করা।
৫. আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের রহমত হতে বঞ্চিত হওয়া এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে তুমি একেবারে মূল্যহীন ব্যক্তি হিসেবে পরিণত হওয়ার ভয় করা।
৬. আপন অন্তরের আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত করা। ফলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের মহব্বত ছাড়া আর কোন কিছুর মহব্বতকে অন্তরে স্থান না দেয়া বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া।
৭. অন্তরে শয়তানের কুমন্ত্রণা বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে তা অবশিষ্ট ঈমানকে খেয়ে না ফেলে।
৮. মানুষের অন্তরের কুমন্ত্রণা পাখিকে শিকার করার জন্য নিক্ষিপ্ত দানা-পানির মত। শয়তান তা মানুষের সামনে দানার মত ছিটিয়ে দেয়, যাতে মানুষ তা গ্রহণ করে। শয়তানের প্রতিটি কুমন্ত্রণাই হল মানুষের জন্য তার ঈমানকে শিকার করার জন্য পেতে রাখা ফাঁদ ও জাল।
৯. মনে রাখতে হবে, শয়তানের কুমন্ত্রণা কখনোই ঈমানের সাথে একত্র হতে পারে না।
১০. একটি কথা জানতে হবে—মানুষের অন্তরে শয়তানের কুমন্ত্রণা কুল কিনারাহীন সমুদ্রের মত যার কোন শেষ নেই। যে ব্যক্তি তাতে প্রবেশ করবে তার ডুবে মরাটা অনিবার্য।

টিকাঃ
৪০ সুরা আন নূর: ৩৯।
৪১ সহিহ মুসলিম : ১৩২।
৪২ সুনানু আবু দাউদ: ৫১১২। শুয়াইব আরনাউত হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।
৪৩ আল ফাওয়ায়েদ: ১৭৬।
৪৪ আল ফাওয়ায়েদ: ৩১।
*সূরা গাফের: ১৯।
*সূরা ত্বহা: ৭।

📘 আসক্তি সমাজ ধ্বংসের হাতিয়ার > 📄 আসক্তির চিকিৎসা

📄 আসক্তির চিকিৎসা


বান্দার প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অপার অনুগ্রহ হল, তিনি তার বান্দাদের অনর্থক ছেড়ে দেননি এবং অনর্থক সৃষ্টি করেননি। বরং তিনি তাদের জন্য তাদের জীবনে যত ব্যাধি, সংক্রামক ও বক্রতা আছে তার চিকিৎসার জন্য মজবুত দ্বীন নাযিল করেছেন। জীবনের সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাধি হল, নিষিদ্ধ কামনা-বাসনা, কুআসক্তি বা নিষিদ্ধ চাহিদা। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ মারাত্মক ব্যাধির জন্য একাধিক চিকিৎসা নির্ধারণ করেছেন; যার দ্বারা খারাপ বাসনা ও কুআসক্তির উত্তেজনা স্তিমিত হয় এবং তার দৌরাত্ম্য দূর হয়। নিম্নে এগুলোর সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হল।
এক. বিবাহ
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ، مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ البَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجُ؛ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلبَصَرِ، وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ.
"হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যাদের ক্ষমতা আছে তারা যেন বিবাহ করে। কারণ, তোমাদের চোখের জন্য অধিক হেফাজতকারী এবং তোমাদের লজ্জাস্থানের সংরক্ষক"। ৪৯
উল্লিখিত হাদিসে الباءة শব্দের অর্থ স্ত্রী মিলনে সক্ষম ও বিবাহের খরচ। যখন কোন ব্যক্তি বিবাহের ক্ষমতা রাখে এবং তার নফস বিবাহের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে তাকে অবশ্যই বিবাহ করতে হবে।
বিবাহ হল হালাল উপায়ে মানুষ তার মানবিক ও জৈবিক চাহিদা মেটানোর একটি পথ; যা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষের জন্য বৈধ বিধান হিসেবে চালু করেছেন। বিবাহ হল নবি ও রাসুলগণের সুন্নাত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যারা তাদের নিজেদের উপর বিবাহকে হারাম করেছিল তাদের বিষয়ে বলেন-
لَكِنِّي أُصَلِّي وَأَنَامُ وَأَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي.
"কিন্তু আমি সালাত আদায় করি, ঘুমাই, রোজা রাখি, ইফতার করি এবং নারিদের বিবাহ করি। সুতরাং এ গুলো সবই হল আমার আদর্শ। আর যে ব্যক্তি আমার আদর্শ থেকে দূরে সরে সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়"। ৪৮
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
النِّكَاحُ مِنْ سُنَّتِي، فَمَنْ لَمْ يَعْمَلْ بِسُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي، وَتَزَوَّجُوا فَإِنِّي مُكَاثِرُ بِكُمُ الأُمَمَ، وَمَنْ كَانَ ذَا طَوْلٍ فَلْيَنْكِحُ، وَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَعَلَيْهِ بِالصِّيَامِ ۚ فَإِنَّ الصَّوْمَ لَهُ وِجَاءُ.
"বিবাহ আমার সুন্নাত। যে আমার সুন্নাত অনুযায়ী আমল করে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। তোমরা বিবাহ কর, কারণ আমি আমার উম্মতের আধিক্য নিয়ে আল্লাহর দরবারে গর্ব করব। যার সামর্থ আছে সে অবশ্যই বিবাহ করবে আর যার সামর্থ নাই তার উপর কর্তব্য হল রোজা রাখা। কারণ, রোজা তার জন্য প্রতিষেধক"।৪৯
বিবাহের মাধ্যমে মানুষের দ্বীন ও ঈমানের সংরক্ষণ হয়। আর যিনা ব্যভিচার দ্বারা মানুষ যে নুরের দ্বারা আলোকিত, তা ছিনিয়ে নেয়া হয়।

টিকাঃ
৪৯ সহিহ মুসলিম: ১৪০০।
৪৮ সহিহ মুসলিম: ১৪০১।
৪৯ সহিহ ইবনে মাজাহ ১৮৪৬; শাইখ আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।

📘 আসক্তি সমাজ ধ্বংসের হাতিয়ার > 📄 নেককার মহিলা বা স্ত্রী অর্ধ দ্বীনের ব্যাপারে সাহায্যকারী

📄 নেককার মহিলা বা স্ত্রী অর্ধ দ্বীনের ব্যাপারে সাহায্যকারী


আনাস ইবনু মালেক রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- مَنْ رَزَقَهُ اللهُ امْرَأَةً صَالِحَةٌ فَقَدْ أَعَانَهُ عَلَى شَطْرِ دِينِهِ، فَلْيَتَّقِ اللَّهُ فِي الشَّطْرِ الثاني.
"আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যাকে নেককার স্ত্রী লাভের তাওফিক দেন, তাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অর্ধেক দ্বীনের বিষয়ে সাহায্য করল, বাকি অর্ধেকের বিষয়ে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে"।৫৩
আল্লামা মুনাবি রহ. বলেন, দ্বীনের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর ও মহা মুসিবত হল দুটি জিনিষ। এক: পেটের চাহিদা; দুই: যৌন চাহিদা।
দ্বিতীয় চাহিদা মেটানোর জন্য তাকে বিবাহ করতে হবে। যদি কোন ব্যক্তি দ্বীনদার ও সৎ নারিকে বিবাহ করে, তাহলে সে ব্যভিচার থেকে মুক্ত থাকবে এবং সে অর্ধেক চাহিদা মেটাতে পারবে। তারপর তার অবশিষ্ট অর্ধেক চাহিদা বাকি থাকল। আর তা হল তার পেটের চাহিদা। এ চাহিদা মেটানোর জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তাকওয়া অর্জন করার উপদেশ দেন। তাকওয়ার মাধ্যমে তার দ্বীনদারি পূর্ণতা লাভ করে এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের যে দ্বীন দিয়েছেন সে দ্বীনের উপর অটল অবিচল থাকার তাওফিক হাসিল হয়। ৫৪
এখানে [হাদিসে] নেককার নারির কথা বলার কারণ হল-নারি যদি দ্বীনদার ও নেককার না হয়, তার দ্বারা ব্যভিচার থেকে মুক্তি পেলেও লোকটি তার স্ত্রীর কারণে কোন অপকর্ম ও খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে এবং তার স্ত্রী তাকে হারাম উপার্জন ইত্যাদির প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে পারে; যা তার পরিণতির জন্য খুবই খারাপ।
আল্লামা কুরতুবি রহ. বলেন, বর্তমানকালে কেউ অন্যায়-পাপ থেকে সবর করার ক্ষমতা না রাখে, তার জন্য ওয়াজিব হবে দ্বীনদার স্ত্রী তালাশ করা; যার মাধ্যমে সে তার দ্বীনদারি ঠিক রাখতে পারে। ৫৫

টিকাঃ
৫০ এহইয়াউ উলুমুদ্দিন: ২/২৩।
৫১ তারিখে দামেশক: ৫০/১২৩।
৫২ এহইয়াউ উলুমুদ্দিন: ২/২৩।
50 মুসতাদরাকে হাকিম: ২৬৮১।
৫৪ ফয়জুল কাদির: ২/১৭৭।
** তাফসিরে কুরতুবি: ৪/২৯।

📘 আসক্তি সমাজ ধ্বংসের হাতিয়ার > 📄 বিবাহের মধ্যে রয়েছে ছাওয়াব আর ব্যভিচারে রয়েছে গুনাহ

📄 বিবাহের মধ্যে রয়েছে ছাওয়াব আর ব্যভিচারে রয়েছে গুনাহ


বিবাহের সবচেয়ে কল্যাণকর ও বিশেষ দিক হল, যৌন চাহিদা মিটানোতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এর পক্ষ হতে সাওয়াবের অধিকারী হওয়া যায়। যেমন, হাদিসে বর্ণিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ قالوا: يا رسول الله، أيأتي أحدنا شهوته ويكون له فيها أجر ؟، قال أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي الحَرَامِ أَكَانَ عَلَيْهِ فِيهَا وِزْرُ؟ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الحَلَالِ كَانَ لَهُ أَجْرُ.
“তোমাদের কেউ তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করাতে তার জন্য রয়েছে সদকার সওয়াব। এ কথা শোনে সাহাবিরা বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা যদি আমাদের স্ত্রীদের সাথে যৌন চাহিদা মেটাই তাতেও কি আমাদের সওয়াব রয়েছে? তখন তিনি বললেন, যদি লোকটি কোন হারাম কাজে লিপ্ত হত তাহলে তার গুনাহ হত কিনা? অনুরূপভাবে যখন সে হারাম থেকে বিরত থেকে হালাল কাজে লিপ্ত হও তখন অবশ্যই তোমাদের জন্য সওয়াব ও বিনিময় থাকবে"। ৫৬
ইমাম নববি রহ. বলেন, যেসব কাজগুলো মুবাহ বা হালাল ইবাদতের নিয়ত দ্বারা তা ইবাদতে পরিণত হয়। যেমন—স্ত্রী সহবাসের দ্বারা যদি কোন ব্যক্তি স্ত্রীর অধিকার আদায়, তার সাথে সুন্দর ব্যবহার, নেক সন্তান লাভ, নিজের নফসকে ও স্ত্রীকে ব্যভিচার থেকে হেফাজত করা, খারাপ বা হারামের দিকে তাকানো থেকে বিরত রাখা, খারাপ চিন্তা ও ফিকির হতে বিরত রাখা ইত্যাদি ভালো ও নেক উদ্দেশ্য লাভের নিয়ত করে, তাহলে স্ত্রী সহবাস অবশ্যই ইবাদত বলে পরিগণিত হবে। ৫৭
মনে রাখতে হবে—বিবাহ হল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা যুবকদের অনৈতিক চিন্তাধারা থেকে হেফাজত করে এবং যিনা-ব্যভিচার থেকে রক্ষা করে। বিবাহের মাধ্যমে একজন যুবক হারাম বিষয়ে চিন্তা করা এবং হারাম কাজের ইচ্ছা করা হতে বিরত থাকে।

টিকাঃ
৫৬ সহিহ মুসলিম : ১০০৬।
৫৭ শরহু নববি আলা মুসলিম : ৭/৯৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00