📄 চোখের হেফাজতকে লজ্জা স্থানের হেফাজতের পূর্বে উল্লেখ করার কারণ
চোখের হেফাজতকে লজ্জাস্থানের হেফাজতের পূর্বে উল্লেখ করার কারণ হল, মানুষের দৃষ্টি যিনা, ব্যভিচার ও অপকর্মের বার্তাবাহক ও প্রারম্ভিকতা। ২৯
এ কারণেই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনুল কারিমে তাকে প্রথমে উল্লেখ করেন।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, মানুষ যত ধরনের অন্যায়, যিনা, ব্যভিচার ও অপরাধ করে থাকে, সবকিছুর মূল কারণ হল মানুষের দৃষ্টি। দৃষ্টি মানুষের অন্তরে প্রথম উদ্রেককে জাগ্রত করে, আর যখন কোন কিছুর উদ্রেক হয় তা রূপান্তরিত হয় চিন্তায়, চিন্তা থেকে জাগ্রত হয় চাহিদা বা আসক্তি। আর আসক্তি হতে জাগ্রত হয় ইচ্ছা তারপর ইচ্ছাটি ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে তা রূপ নেয় প্রত্যয়ে তারপর তা সংঘটিত হয় ব্যভিচারে; যদি কোন বাধাদানকারী বাধা না দেয়। এ বিষয়ে আরও বলা হয়ে থাকে চোখের হেফাজতের উপর ধৈর্য ধরা তার পরবর্তী কর্মের শাস্তির উপর ধৈর্য ধারণ হতে সহজ।
এ কারণেই কোন এক কবি বলেন-
كُلُّ الْحَوَادِثِ مَبْدَاهَا مِنَ النَّظَرِ وَمُعْظَمُ النَّارِ مِنْ مُسْتَصْغَرِ الشَّرَرِ كَمْ نَظْرَةٍ بَلَغَتْ في قَلْب صَاحِبِهَا كَمَبْلَغِ السَّهْمِ بَيْنَ الْقَوْسِ وَالْوَتَرِ وَالْعَبْدُ مَا دَامَ ذَا طَرْفٍ يُقَلِّبُهُ فِي أَعْيُنِ الْغِيدِ مَوْقُوفٌ عَلَى الْخَطَرِ
يَسُرُّ مُقَلَتُهُ مَا ضَرَّ مُهْجَتَهُ لَا مَرْحَباً بِسُرُورٍ عَادَ بِالضَّرَرِ.
“সব ধরনের অপকর্মের মূল কারণ হল-দৃষ্টি। বড় বড় আগুনের মূল হচ্ছে কোন অগ্নিস্ফুলিঙ্গকে ছোট মনে করা। এমন বহু দৃষ্টি রয়েছে-যা সে দৃষ্টিপ্রদানকারীর অন্তরে এমনভাবে নাড়া দেয়; যেমন কোন তীর তার বাঁকা ধনুক ও সুতার মাঝে নাড়া দেয়। আর কোন মানুষ যতক্ষণ চক্ষুপালক বিশিষ্ট হবে, এবং তা সুন্দরীদের চোখের সামনে নাড়াচাড়া করবে ততক্ষণ সে বিপদে থাকবে। তার চোখের পালক এমন কিছু গোপন করবে যা তার সম্মানহানি করবে, সুতরাং এমন আনন্দের জন্য কোন শুভেচ্ছা নেই, যে আনন্দ ক্ষতি নিয়েই ফিরে আসে।
আর এ দৃষ্টির একটি বড় বিপদ হচ্ছে-এটি আফসোস এবং বড় বড় দীর্ঘশ্বাসের উদ্রেক করে, তখন বান্দা এমন কিছু দেখে যা করতে সে সক্ষম নয় আর তা থেকে ধৈর্য ধারণ করতেও সে অপারগ।”৩০
ঐসব লোকেরা বাজারে গিয়ে সুন্দর সুন্দর নারিদের বেপর্দা অবস্থায় দেখে, তাদের অন্তর আফসোস করতে থাকে এবং তারা তাদের অন্তরে না পাওয়ার ব্যাথা ও কষ্ট অনুভব করে।
কেউ কেউ বলতে পারে-অধিকাংশ দৃষ্টিই ব্যভিচার পর্যন্ত গড়ায় না এবং তার সাথে নিষিদ্ধ কাজ পর্যন্ত যায় না।
আমরা বলব-বরং দৃষ্টির শেষ পরিণতি হল-আফসোস, ব্যাথা ও কষ্ট। কারণ, সে তার সামনে এমন একটি ফেতনা দেখতে পায়, যা সে লাভ করতে সক্ষম হয় না। ফলে সে আফসোস এবং ব্যাথা অনুভব করতে থাকে। অনেক সময় সে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়, তখন তার আফসোস, গ্লানি ও দুশ্চিন্তা আরও বৃদ্ধি পায়”।
তারপর আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, "এটি একটি বড় আযাব। তুমি একটি বিষয় হাসিল করতে চাইলে তা না পাওয়ার কষ্টের উপর ধৈর্য ধারণ করতে পারলে না, আবার তা লাভ করার ক্ষমতাও তুমি রাখ না। এর চেয়ে বড় আযাব আর কী হতে পারে? কোন এক কবি বলেন-
وَكُنْتَ مَتَى أَرْسَلْتَ طَرْفَكَ رَائِداً لقَلْبِكَ يَوْمًا أَنْعَبَتْكَ المَناظِرُ رأَيْتِ الَّذِي لَا كُلَّهُ أَنْتَ قَادِرُ عَلَيْهِ وَلَا عَنْ بَعْضِهِ أَنْتَ صَابِرُ.
"যখন তুমি কোন দিন তোমার চক্ষুদ্বয়কে তোমার মনের পরিচালক হিসেবে, অনুসন্ধানকারী হিসেবে লাগামহীনভাবে ছেড়ে দিলে, তখন সে দৃষ্টিসমূহের দৃশ্য তোমাকে ব্যথিত করবে। তুমি যা দেখলে তার পুরোটা লাভ করতে তুমি সক্ষম নও, আর না তুমি আংশিকের উপরও ধৈর্যশীল।"
যারা তাদের চক্ষুকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়, তারা তা হতে বিরত থাকতে পারে না। সে অপকর্মের মধ্যেই হাবুডুবু খেতে থাকে। যেমন, কোন এক কবি বলেন-
يَا نَاظِرًا مَا أَقْلَعَتْ الحَظَاتُهُ حَتَّى تَشَحَّطَ بَيْنَهُنَّ قَتِيلًا.
"হে দর্শক! তুমি তোমার দৃষ্টিকে বিরত রাখলে না। তুমি তোমার চোখের অপকর্মেই জীবনকে ব্যয় করলে"।
এর চেয়েও বড় আশ্চর্য হল-দৃষ্টি মানুষের অন্তরকে আহত করে তখন ব্যাথার উপর ব্যাথা তাকে আরও অধিক কষ্ট দিতে থাকে। তারপর তার ক্ষতের ব্যথা বার বার আহত করা হতে তাকে কেউ বারণ করে না। কবি বলেন-
مَا زِلْتُ تُتَّبِعُ نَظْرَةً فِي نَظْرَةٍ فِي إِثْرِ كُلِّ مَلِيحَةٍ وَمَلِيحٍ وَتَظُنُّ ذَاكَ دَوَاءَ جُرْحِكَ وَهُوَ فِي التَحْقِيقِ تَجْرِيحُ عَلَى تَجْرِيح فَذَبَحْتَ طَرْفَكَ بِاللَّحَاظِ وَبِالبُكا فَالقَلْبُ مِنْكَ ذَبِيحُ أَيُّ ذَبِيحِ.
“তুমি প্রত্যেক সুন্দর পুরুষ ও নারীর প্রতি একের পর এক দৃষ্টি দিয়েই যাচ্ছ, আর তুমি মনে করছ যে এটা বোধ হয় তোমার ক্ষতের ঔষধ, প্রকৃতপক্ষে তা ক্ষতের উপর ক্ষতই বাড়িয়ে দেয়; এভাবে তুমি তোমার দৃষ্টিশক্তিকে দেখা ও কান্নার মধ্যে যবাই করে দিলে, সুতরাং তোমার অন্তর ও মন তোমার দ্বারা শুধু যবাই হতে থাকল, সেটা যে কোন ধরনের যবাই তা বলার অপেক্ষা রাখে না।”
আর এ জন্যই বলা হয়ে থাকে- “দৃষ্টিকে ক্ষণিকের জন্য বিরত রাখতে সচেষ্ট হওয়া আজীবন আফসোস করা থেকে উত্তম।"৩১
যে ব্যক্তি হারামের দিকে তাকিয়ে থাকে তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ ব্যক্তির মত যে সাগরের পানি পান করে তৃপ্তি পেতে চায়, তুমি কি তার পিপাসা নিবারিত হতে দেখেছ? কখনও তার পিপাসা নিবারণ হয় না বরং সে পানি পান করার কারণে তার পানির পিপাসা আরও বৃদ্ধি পায়। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি হারামের দিকে তাকায় সেও আসক্তির চাহিদা মিটাতে না পারার কারণে তার চাহিদা আরও চাঙ্গা হতে থাকে"।
ঐ হাদিসটির বিষয়ে চিন্তা করে দেখুন, যেখানে অশ্লীল কাজে লিপ্ত হওয়া ও চোখের খিয়ানত বা চোখের হেফাজত না করার মধ্যে সম্পর্ক দেখানো হয়েছে।
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
إِنَّ اللهَ كَتَبَ عَلَى ابْنِ آدَمَ حَظِّهُ مِنَ الزِّنَا، أَدْرَكَ ذَلِكِ لَا مَحَالَةً، فَزِنَا العَيْنِ النَّظَرُ، وَزِنَا اللَّسَانُ المَنْطِقُ، وَالنَّفْسُ تَمَنَّى وَتَشْتَهِي، وَالفَرْجُ يُصَدِّقُ ذَلِكَ كُلَّهُ أَوْ يُكَذِّبُهُ.
"আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আদম সন্তানের উপর যিনার কিছু অংশ নির্ধারণ করে রেখেছেন। জীবদ্দশায় তাতে সে আক্রান্ত হবেই। যেমন- চোখের যিনা হল দৃষ্টি, মুখের যিনা হল কথা, আর আত্মা কামনা করে ও আসক্তি তৈরি করে। আর লজ্জাস্থান তার আশার সত্যায়ন করে বা মিথ্যায় পরিণত করে"। ৩২
চিন্তা করে দেখো! দৃষ্টি কত মারাত্মক! এ হাদিসে দৃষ্টিকে ব্যভিচার বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। একজন মুমিন অবশ্যই ব্যভিচারকে ঘৃণা করে এবং তা হতে দূরে থাকে।
আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, “হে বন্ধু! আল্লাহ তোমাকে তাওফিক দান করুন; তুমি দৃষ্টির অনিষ্টতা থেকে নিজেকে বাঁচাও! এ দৃষ্টি বহু ইবাদতকারীকেই ধ্বংস করেছে! কত পরহেজগার মুত্তাকিকে দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে! তুমি দৃষ্টির হেফাজত কর! কারণ, দৃষ্টিই হল সব বিপদের মূল কারণ। তবে শুরুতে তার চিকিৎসা করা সহজ। কিন্তু যদি তা বার বার হয়ে থাকে, তখন তা শক্তিশালী ব্যাধিতে পরিণত হয়; তার চিকিৎসা আর সহজ হয় না, তখন তার চিকিৎসা খুবই কষ্টকর।"
দৃষ্টি নেশার পাত্র, আর তার নেশা হল-প্রেম। আর প্রেমের নেশা মদের নেশা হতেও মারাত্মক। কারণ, মদপানে নেশাগ্রস্থ মাতাল-তাদের আবার জ্ঞান ফিরে আসে। আর প্রেমের নেশায় যারা মাতাল, তাদের কখনোই জ্ঞান ফিরে আসে না।
আর দৃষ্টি ও আসক্তি উভয় মানুষকে প্রেমের দিকে টেনে নিয়ে যায়। আর অন্তরসমূহ ধ্বংসের জন্য এ হলো সর্বাধিক ক্ষতিকর ও মারাত্মক ব্যাধি। তুমি এ ভয়ানক ও ক্ষতিকর তীরের আঘাত থেকে সতর্ক থাক। কারণ, তার আঘাতে যদি তুমি হত্যা না হও, তোমাকে তা অবশ্যই যখমি করে দিবে। আর যখন যখমি বা আঘাত অধিক হবে, তখন তোমার ধ্বংস অনিবার্য।
টিকাঃ
২৯ রুহুল মাআনি লিল উলুসি: ১৮/১৩৯।
৩০ জওয়াবুল কাফি: ১০২।
৩১ জওয়াবুল কাফি: ১০৬-১০৭।
৩২ সহিহ বুখারি: ৬২৪৩; সহিহ মুসলিম: ৬২৫৭।
৩৩ জুল হাওয়া: ৯৪।
📄 হঠাৎ দৃষ্টি
জারীর ইবনু আব্দুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হঠাৎ দৃষ্টি পড়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে, তিনি আমাকে নির্দেশ দেন যে—আমি যেন আমার দৃষ্টিকে ফিরিয়ে রাখি”। ৩৪
হঠাৎ দৃষ্টি বা [انظر الفجاءة] এর অর্থ হল, অনিচ্ছায় বা হঠাৎ কোন অপরিচিত নারীর উপর দৃষ্টি পড়া। ৩৫
এ ধরনের দৃষ্টির বিধান হলো—প্রথমবার এতে কোন গুনাহ নাই। তবে শর্ত হল—সাথে সাথে চক্ষুকে ফিরিয়ে নিতে হবে। আর যদি সে তার দৃষ্টিকে দীর্ঘায়িত করে, তখন তার উপর গুনাহ অবশ্যই বর্তাবে।" ৩৬
ইবনু বুরাইদা রা. তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলি রা.-কে বলেন:
يَا عَلِيُّ، لَا تُتْبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ؛ فَإِنَّ لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ.
“হে আলি! তুমি প্রথম দৃষ্টির পর দ্বিতীয়বার দেখবে না। কারণ, তোমার জন্য প্রথম দৃষ্টি আর পরবর্তী দৃষ্টি তোমার জন্য নয়”।৩৭
অর্থাৎ প্রথম দৃষ্টির পর আবার দেখো না এবং একবার তাকানোর পর দ্বিতীয়বার তাকাবে না। অনিচ্ছাকৃত প্রথম দৃষ্টির কারণে তোমার কোন গুনাহ হবে না। কিন্তু তোমার জন্য দ্বিতীয়বার তাকানোর কোন অনুমতি নাই। কারণ, এতে তোমার ইচ্ছা যুক্ত হওয়ার কারণে তোমার গুনাহ হবে।
[এখানে এ কথা স্পষ্ট হয়—ইচ্ছা করে যদি প্রথমবার তাকায় তাহলেও গুনাহ হবে। আর যদি অনিচ্ছায় তাকায় এবং সাথে সাথে চোখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে গুনাহ হবে না।]
যেসব লোক মশকরা করে বলে—প্রথমবার দেখে যদি কোন ব্যক্তি চোখ বন্ধ করা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকে তার কোন গুনাহ হবে না, তাদের কথা যে ভ্রান্ত তা এ ব্যাখ্যার দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণিত হল। কারণ, এখানে বলা হয়েছে ইচ্ছা করে তাকানো অপরাধ। চাই প্রথমবার হোক অথবা দ্বিতীয় বার।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-
قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِنْ أَخَذَ اللَّهُ سَمْعَكُمْ وَأَبْصَارَكُمْ وَخَتَمَ عَلَى قُلُوبِكُم مِّنْ إِلَهُ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُم بِهِ انظُرْ كَيْفَ نُصَرِفُ الْآيَاتِ ثُمَّ هُمْ يَصْدِفُونَ.
"বলুন, 'তোমরা কি ভেবে দেখেছ, আল্লাহ্ যদি তোমাদের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেন এবং তোমাদের হৃদয়ে মোহর করে দেন তবে আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন প্রকৃত ইলাহ্ আছে, যে তোমাদের এগুলো ফিরিয়ে দেবে?' দেখুন, আমরা কিরূপে আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করি; এরপরও তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়"। ৩৮
চক্ষু হল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ হতে বড় নেয়ামত। গুনাহের কারণে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যাতে চক্ষু না নিয়ে যায় সেজন্য আল্লাহকে ভয় করতে হবে।
হারাম থেকে চক্ষুকে বিরত রাখার মধ্যে অনেক ফায়দা:
১. আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আদেশের আনুগত্য করা, যাতে রয়েছে অনেক সৌভাগ্য ও কল্যাণ।
২. চক্ষুর বিষাক্ত তীরের আঘাত থেকে অন্তর নিরাপদ থাকে।
৩. অন্তরে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সাথে সখ্যতা ও তার উপর ঐক্য গড়ে উঠে। যারা তাদের অন্তরকে হারামের মধ্যে ছেড়ে দেয়, তাদের অন্তর মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এ সখ্যতা থেকে বঞ্চিত হয়। কারণ, অন্তর বিক্ষিপ্ত থাকার কারণে তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্যই বিশেষভাবে নির্ধারিত হয় না এবং তাঁর জন্যই মহব্বতপূর্ণ হতে পারে না।
৪. চোখের হেফাজত না করলে আত্মা যেমন দুর্বল ও হতাশাগ্রস্ত হয় অনুরূপভাবে চোখের হেফাজতের কারণে মানবাত্মা শক্তিশালী ও প্রশান্তি লাভে ধন্য হয়।
৫. অন্তর নুরের আলো দ্বারা আলোকিত হয়, পক্ষান্তরে চোখের হেফাজত না করলে অন্তর অন্ধকারে ছেয়ে যায়।
৬. চক্ষুর হেফাজত দ্বারা একজন বান্দার মধ্যে হক ও বাতিল এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করার মত সত্যিকার যোগ্যতা ও দূরদর্শিতা সৃষ্টি হয়। আর তা সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে ও উন্নত অবস্থানে পৌঁছতে সাহায্য করে। আর মানুষের সাথে সব ধরনের লেনদেনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সহায়ক হয়।
৭. অন্তরে সাহসিকতা ও অবিচলতা সৃষ্টি করে। ফলে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার জন্য আধ্যাত্মিক শক্তি যথা, দূরদর্শিতা, প্রমাণ এবং বাহ্যিক শক্তি যথা-ক্ষমতা ও শক্তি উভয়কে একত্র করে দেন।
৮. শয়তানের প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দেয়। কারণ, দৃষ্টি হল শয়তানের জন্য সবচেয়ে বড় দরজা।
৯. অন্তর ভালো চিন্তার জন্য খালি হয় এবং ভালো কাজেই ব্যস্ত থাকে। কারণ, যখন কোন অন্তর নারি ও সুন্দর ছেলেদের ছবি তাদের চিন্তা ও প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন সে কীভাবে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আয়াত সম্পর্কে চিন্তা করবে? হাদিস থেকে একটি মাসআলা শিখবে? ফিকহবিদদের কথা কীভাবে সে বুঝবে? এবং আসমান ও জমিনের বিষয়ে কীভাবে চিন্তা করবে?
১০. চোখের হেফাজতের দ্বারা অন্তর নিরাপদ থাকে। কারণ, অন্তর ও চক্ষু উভয়ের মাঝে নিবিড় সম্পর্ক ও সংযোগ রয়েছে, উভয়ের একটি অপরটি দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং একটি কর্ম অপরটিকে প্রাণচাঞ্চল্যতা দান করে। ফলে একটি সংশোধন হলে অপরটির সংশোধন হয়, আর একটি নষ্ট হলে অপরটি নষ্ট হয়। যখন বান্দার দৃষ্টি নিরাপদ থাকে তখন তার আত্মাও নিরাপদ ও ঠিক থাকে, আর যখন মানুষের দৃষ্টি সঠিক না থাকে এবং খারাপ বস্তুর দিক দেখার কারণে নষ্ট হয়ে যায়, তখন তার অন্তর বা আত্মাও খারাপ ও নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
اضْمَنُوا لِي سِتّاً مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَضمَنُ لَكُمُ الجَنَّةَ: اصْدُقُوا إِذَا حَدَّثْتُمْ، وَأَوْفُوا إِذَا وَعَدتُمْ، وَأَدُّوا إِذَا اؤْتُمِنْتُمْ، وَاحْفَظُوا فُرُوجَكُمْ، وَغُضُّوا أَبْصَارَكُمْ، وَكُفُّوا أَيْدِيَكُمْ.
"তোমরা আমার জন্য ছয়টি জিনিসের দায়িত্ব নাও আমি তোমাদের জান্নাতের দায়িত্ব নেব। যখন কথা বল সত্য বল। আর যখন ওয়াদা কর, তখন তা পূর্ণ কর, আর যখন তোমার নিকট আমানত রাখা হয় তা তুমি হকদারদের নিকট পৌছে দাও। তোমরা তোমাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত কর। তোমাদের চক্ষুকে অবনত রাখ আর তোমাদের হাতদ্বয় হারাম থেকে গুটিয়ে রাখ"।৩৯
টিকাঃ
৩৪ সহিহ মুসলিম: ২১৫৭।
৩৫ তোহফাতুল আহওজিয়্যু: ৮/৪৯।
৩৬ তোহফাতুল আহওজিয়্যু: ৮/৪৯।
৩৭ সুনানু আবু দাউদ: ২১৪৯; সুনানু তিরমিযি: ২৭৭৭। হাদিসটি হাসান।
৩৮ সুরা আল-আন'আম: ৪৬।
৩৯ মুসনাদু আহমাদ: ২২২৫১। শাইখ আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।