📄 নিষিদ্ধ বিষয়সমূহে লিপ্ত হওয়ার কারণ
প্রথম মূলনীতি: প্রথম: ঈমানের দুর্বলতা
ঈমান হল মুমিনের আত্মরক্ষার জন্য সবচেয়ে মজবুত ও বড় হাতিয়ার; ঈমানই মুমিনের জন্য সবচেয়ে বড় দুর্গ ও আশ্রয়স্থল, যা তাকে খারাপ, মন্দ, ঘৃণিত, নিকৃষ্ট ও নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে। যখন কোন মানুষ আল্লাহর আনুগত্য হতে দূরে সরে যায়, তখন তার ঈমান দুর্বল হয় এবং সে অন্যায় ও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নাফরমানী করা ও অবাধ্য হওয়ার সাহস পায়। এ কারণেই কোন কোন মনীষী বলেন— তিনটি জিনিস হল তাকওয়ার নিদর্শন।
এক. শক্তি-সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও খারাপ কামনা-বাসনা ও আসক্তির চাহিদাকে ছেড়ে দেয়া।
দুই. নফসের বিরোধিতা করে নেক আমলসমূহ পালন করা।
তিন. নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও আমানতকে তার হকদারের নিকট পৌঁছে দেয়া।
এ তিনটি কাজ যে ব্যক্তি করবে তা প্রমাণ করে যে, লোকটির মধ্যে ঈমান ও দ্বীনদারি আছে। কারণ, তার সামনে হারাম কাজ অপেক্ষমাণ কিন্তু সে কেবল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ভয়ে তা হতে বিরত থাকছে। সে তার নফসের চাহিদার বিরুদ্ধে স্বীয় আত্মাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইবাদত বন্দেগিতে লিপ্ত থাকতে বাধ্য করছে। তার শত প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও আমানতের খেয়ানত করেনি। অন্যের আমানতকে প্রকৃত হকদারের নিকট পৌঁছে দিয়েছে।
দ্বিতীয়: অসৎ সঙ্গ
আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ، فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ.
"মানুষ তার বন্ধুর স্বভাবের উপরই প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, সুতরাং তোমরা দেখে শোনে বন্ধু নির্বাচন করবে"।১০
সাধারণত মানুষ যে সব অন্যায়, পাপাচার, অপরাধ ও অপকর্ম করে থাকে, তার অধিকাংশের কারণ হল, তার অসৎ সঙ্গি। যাদের সঙ্গি খারাপ হয়, তারা ইচ্ছা করলেও ভালো থাকতে পারে না। সঙ্গিরা তাদের খারাপ ও অন্যায় কাজের দিকে নিয়ে যায়।
একজন সতের বছরের যুবক তার জীবনে প্রথম অপকর্মের বর্ণনা দিয়ে বলল-"আমি প্রথমে আমার এক বন্ধুর বাসায় তার সাথে সাক্ষাত করতে গিয়ে সেখানে নিষিদ্ধ সিনেমা দেখি। আমি তার কামরায় অবস্থান করলে সে একটি ভিডিও ফিল্ম চালালে আমি তার সাথে বসে তা দেখতে থাকি। এ ছিল আমার জীবনের সর্বপ্রথম অপরাধ"।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নোংরামি, অশ্লীলতা ও ব্যভিচারকে নিষেধ করেন এবং বেহায়াপনা হতে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-
لا يُحِبُّ اللَّهُ الْجَهْرَ بِالسُّوءِ مِنَ الْقَوْلِ إِلَّا مَن ظُلِمَ وَكَانَ اللَّهُ سَمِيعًا عَلِيمًا.
"মন্দ কথার প্রচার আল্লাহ পছন্দ করেন না, তবে কারো উপর যুলুম করা হলে ভিন্ন কথা। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।”১১
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
لَيْسَ المُؤْمِنُ بِالطَّعَانِ وَلَا اللَّيَّانِ وَلَا الفَاحِشِ وَلَا البَدِيءِ.
"ঈমানদার ব্যক্তি খোটাদানকারী নয়, অভিশাপকারীও নয়; অনুরূপভাবে অশ্লীল ও খারাপ বচনবিশিষ্ট ও নোংরা ব্যক্তি হতে পারে না"।১২
তৃতীয়: দৃষ্টির হেফাজত করা
মানুষ যখন রাস্তায় বের হয় তখন তাকে অবশ্যই দৃষ্টির হেফাজত করতে হবে। কারণ, মানুষের দৃষ্টি হল ইবলিসের বিষাক্ত হাতিয়ার বা তীর। দৃষ্টি হেফাজত করতে না পারলে বিভিন্ন ধরনের অপকর্মের শিকার হতে হয়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার বান্দাদের দৃষ্টির ব্যাপারে অধিক সতর্ক করেন এবং ভয় দেখান।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-
قُل لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ.
"মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত"।"
চতুর্থ: বেকারত্ব
বেকারত্ব যুবকদের জন্য মারাত্মক ক্ষতি। শুধু ক্ষতিই নয়, এটি মানব জীবনের জন্য বড় একটি অভিশাপ। যখন তাদের কোন কাজ না থাকে তখন তাদের মস্তিষ্কে খারাপ চিন্তা ঢুকে পড়ে এবং বেকারত্ব তাদের খারাপ ও অশ্লীল কাজের দিকে নিয়ে যায়। তারা খারাপ, অন্যায় ও অশ্লীল কাজের চক আঁকতে থাকে। ধীরে ধীরে তাদের অবস্থা এমন হয় যে, তারা শুধু খারাপ চিন্তাই করতে থাকে। ভালো কোন চিন্তা তাদের মাথায় আসে না। ফলে সে এমন খারাপ অভ্যাসের অনুশীলন করতে থাকে, যা তার জীবনকে ধ্বংসের দ্বার-প্রান্তে পৌঁছে দেয়।
মানবাত্মা যখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আনুগত্য ও ইবাদত বন্দেগিতে সময় ব্যয় করবে না তখন সে অবশ্যই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নাফরমানিতে সময় নষ্ট করবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় বাণীতে এ কথাটিই বলেছেন।
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
نِعْمَتَانِ مَغْبُونُ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصَّحَةُ، وَالفَرَاغُ.
"দুটি নেয়ামত এমন আছে যার মধ্যে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত। এক: সুস্থতা; দুই: অবসরতা"। ১৪
বেকার থাকা একটি বড় মুসিবত এবং আত্মার জন্য মারাত্মক ক্ষতি। যদি মানুষ কোন ভালো কাজে ব্যস্ত না থাকে, তাহলে শয়তান অবশ্যই তাকে খারাপ কাজের দিকে নিয়ে যায়"।
পঞ্চম: নিষিদ্ধ কাজে শৈথিল্য
মানুষ যখন কোন কাজে শিথিলতা দেখায়, তখন তা ধীরে ধীরে বড় আকার ধারণ করে। অধিকাংশ সময় মেয়েদের প্রতি তাকানো ও তাদের সাথে সংমিশ্রণ মানুষকে অশ্লীল কাজ করতে বাধ্য করে। অথচ প্রথম যখন একজন মানুষ কোন মেয়ের সাথে কথা-বার্তা বলে ও তার দিকে তাকায় তখন তার খারাপ কোন উদ্দেশ্য থাকে না। কিন্তু ধীরে ধীরে তার অবনতি হতে থাকে এবং তা বড় আকার ধারণ করে। ছোট হারাম বা ছোট গুণাহের প্রতি শৈথিল্য তাকে বড় হারাম বা কবীরা গুণাহের দিক নিয়ে যায়।
বর্তমান সময়ে অনেক পরিবার এমন আছে, যারা চাকরানিকে তাদের যুবক ছেলের সাথে মিশতে কোন বাধা দেয় না, তারা মনে করে, এতে কোন সমস্যা নাই। কারণ, আমাদের ছেলেরা কি ঘরের চাকরানির সাথে কোন অপকর্ম করতে পারে? কিন্তু পরবর্তীতে যখন দুর্ঘটনা ঘটে যায়, তখন তারা লজ্জায় নিজের আঙুল নিজেই কাটতে থাকে।
আবার অনেক পরিবার আছে যারা তাদের মেয়েদের ড্রাইভারের সাথে ছেড়ে দেয়। মনে করে, সে একজন ড্রাইভার; তার সাথে কি আমাদের মেয়েরা কোন খারাপ চিন্তা করতে পারে? কিন্তু না, দেখা যায় এর পরিণতি খুবই খারাপ হয়। মেয়েরা ড্রাইভারের প্রেমে পড়ে যায় এবং অনেক সময় তা-ই ঘটে যা তুমি কোন দিন চিন্তাই করতে পারনি।
এ ধরনের অনেক ঘটনাই আমাদের শৈথিল্যের কারণে সমাজে সংঘটিত হচ্ছে, যা একজন মানুষকে মহা বিপদ ও ধ্বংসের মধ্যে নিপতিত করে।
ষষ্ঠ: যৌন উত্তেজক বস্তুর সাথে উঠাবসা করা
হারাম বা নিষিদ্ধ কাজে একজন মানুষ তখন লিপ্ত হয়, যখন বিভিন্ন ধরনের যৌন উত্তেজক কাজ যেমন, গান, বাজনা, সিনেমা, মেয়েদের সাথে কথা বলা ও হাসি ঠাট্টা ইত্যাদির সাথে তার সংশ্রব থাকে। এ কারণেই শরিয়ত অপকর্মের সকল উপাদানকে নিষেধ করে। যেমন—শরিয়ত রাস্তার মাঝে বসা হতে নিষেধ করে। কারণ রাস্তায় বসলে বিভিন্ন ধরনের নোংরা ছবি, পোষ্টার ও মেয়েদের দেখারা আশঙ্কা থাকে, যেগুলো একজন মানুষের যৌন উত্তেজনাকে বৃদ্ধি করে এবং অপকর্মের দিক উৎসাহ যোগায়।
আবু সাঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
إِيَّاكُم وَالجُلُوسَ فِي الطُّرُقَاتِ فقالوا يا رسول الله ما لنا بد، من مجالسنا - نتحدث فيها. قال فَإِذَا أَبَيْتُمْ إِلَّا المَجْلِسَ فَأَعْطُوا الطَّرِيقَ حَقَّهَ قالوا: وما حقه؟ قال غَضُّ البَصَرِ، وَكَفُ الأَذَى، وَرَدُّ السَّلَامِ، والأمرُ بِالمَعْرُوفِ والنهي عَنِ المُنْكَرِ.
"তোমরা রাস্তার মাঝে বসা হতে বিরত থাক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এ কথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম বলল, হে আল্লাহর রাসুল! রাস্তায় বসা ছাড়া আমাদের কোন উপায় নাই। আমরা রাস্তায় বসে কথাবার্তা বলি। তাদের কথার উত্তরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি রাস্তায় বসা ছাড়া তোমাদের কোন উপায় না থাকে তাহলে তোমরা রাস্তার হক আদায় করবে। এ কথা শুনে সাহাবিরা বলল, হে আল্লাহর রাসুল! রাস্তার হক কি? তিনি বলেন, রাস্তার হক হলো চক্ষুকে অবনত করা, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তুকে সরানো, সালামের উত্তর দেয়া, ভালো কাজের আদেশ দেয়া এবং খারাপ কাজ হতে নিষেধ করা"। ১৫
ইসলামি শরিয়তও ইবাদতের স্থানে নারি ও পুরুষের একত্রিকরণ এবং তাদের সাথে সংমিশ্রণ-যা যৌন উত্তেজনাকে বৃদ্ধি করে তা নিষেধ করেছেন। কারণ, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সালাতে নারিদের কাতারকে পুরুষের কাতার থেকে আলাদা করেছেন, নারিদের জন্য মসজিদে প্রবেশের দরজা আলাদা করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং নারিদের মসজিদ থেকে পুরুষদের পরে বের হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আর এসবগুলো এজন্যই হলো-যাতে একজন মানুষ যৌন উত্তেজনা হতে দূরে ও সতর্ক থাকে।
টিকাঃ
* হিলইয়াতুল আউলিয়া: ৯/৩৯৩।
১০ সুনানু আবু দাউদ: ৪৭৩৩; সুনানু তিরমিযি: ২৩৭৮। শাইখ আলবানি হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
১১ সুরা নিসা: ১৪৮।
১২ সুনানু তিরমিযি: ১৯৭৭। শাইখ আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।
১৩ সুরা নুর: ৩০।
১৪ সহিহ বুখারি: ৬৪১২।
১৫ সহিহ বুখারি: ২৪৬৫; সহিহ মুসলিম: ২১২১।
📄 নারিদের কাহিনি
ওমর রা. তার খিলাফতের আমলে মুসলিমদের ঘরে ঘরে তাদের অবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য ঘুরে বেড়াত। তখন সে একজন মহিলাকে বলতে শুনল, সে বলতেছে-
تطاول هذا الليل وَاسْوَدَّ جانبه. وأرقني إذ لا حبيب ألاعبه. فلولا الذي فوق السموات عرشه لزعزع من هذا السرير جوانبه.
"আজকের রাতটি অনেক দীর্ঘ ও গভীর অন্ধকার। আর আমার ঘুম দূর হয়েছে এ কারণে যে, এখানে আমার কোন বন্ধু নাই যার সাথে খেলাধুলা করে রাত যাপন করব। যদি সে সত্তা না থাকত, যার আরশ আসমানের উপর। তাহলে এ খাটের আশপাশ ওলট পালট হয়ে যেত”।
পরদিন ওমর রা. সকাল বেলা মহিলাটি তার দরবারে ডেকে নিয়ে আসার জন্য লোক পাঠালেন। ওমর রা. তাকে জিজ্ঞাসা করল এ ধরনের কথাগুলো তুমি বলছিলে? তখন সে বলল, হাঁ, তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, তুমি এ কথাগুলো কেন বললে, তখন সে বলল, আমি আমার স্বামিকে এক যুদ্ধে পাঠাই। তারপর ওমর রা. হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহার নিকট গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, মহিলারা স্বামি ছাড়া কতদিন ধৈর্য ধারণ করে থাকতে পারে। তখন সে বলল-ছয় মাস। তারপর থেকে ওমর রা. ছয় মাস পর সৈন্যদলকে বাড়িতে ফেরত পাঠাতেন। "৮৫
টিকাঃ
৮৫ মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক: ৭/১৫৬; সুনানু বায়হাকি ৯/২৯।
📄 আসক্তির গহ্বরে পড়ে যারা নিজেদের পতনকে নিশ্চিত করেছে তাদের কিছু ঘটনা
উপরে আমরা কতক ধৈর্যশীলদের কথা উল্লেখ করি, যারা তাদের আসক্তির চাহিদার উপর ধৈর্যধারণ করে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয় এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আদর্শ ও অনুকরণীয় হয়ে থাকে। কিন্তু তাদের বিপরীতে এমন কতক লোক আছে যারা তাদের আসক্তির চাহিদার কাছে হার মানে এবং আল্লাহ আযাব ও গজবের অংশীদার হয়।
আবদুল্লাহ ইবনু আব্দুর রহিম (আল্লাহ লোকটির দুর্নাম জিইয়ে রাখুন) ২৭৮ হিজরিতে মারা যায়। এ কমবখত লোকটি একজন মুসলিম মুজাহিদ ছিল, মুসলিমদের পক্ষ নিয়ে রোমানদের সাথে একাধিক যুদ্ধে সে অংশগ্রহণ করে। কোন এক যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যরা রুমের একটি শহরকে ঘেরাও করে ফেললে তখন লোকটি ঐ দুর্গে রোমানদের একজন সুন্দরী মহিলা দেখতে পেল। তাকে দেখে সে তার প্রেমে পড়ল। তার নিকট সে বার্তা পাঠাল যে, তোমার নিকট পৌছার উপায় কি? তখন সে তাকে বলল, তুমি নাসারা বা খ্রিষ্টান হয়ে যাও-আমার নিকট চলে আস।
লোকটি তার প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করল এবং মুসলিমদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করল। সে ঐ মহিলার নিকট অবস্থান করল। এ ঘটনার ফলে মুসলিমরা খুব চিন্তিত হল এবং তারা খুব কষ্ট পেল। অনেক দিন পর মুসলিমরা ঐ দুর্গ দিয়ে অতিক্রম করলে তারা দেখতে পেল লোকটি ঐ মহিলার সাথেই আছে। তখন তারা জিজ্ঞাসা করল, তোমার কুরআনের কি অবস্থা? তোমার ইলমের কি অবস্থা? তোমার সালাতের অবস্থা কি? তোমার জিহাদের কি অবস্থা? এবং তোমার সিয়ামের কি অবস্থা?
তখন সে বলল, আমি সমগ্র কুরআন ভুলে গেছি কেবল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এ বাণী ছাড়া; মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-
رُبَمَا يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْ كَانُوا مُسْلِمِينَ. ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ.
"যারা কুফরি করেছে, তারা একসময় কামনা করবে যদি তারা মুসলমান হত! তাদেরকে ছেড়ে দাও, আহারে ও ভোগে তারা মত্ত থাকুক এবং আশা তাদেরকে গাফেল করে রাখুক, আর অচিরেই তারা জানতে পারবে।"৮৬
বর্ণিত আছে মিসরের একজন লোক সে মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের আযান দিত এবং সব সময় মসজিদে অবস্থান করত। সে সর্বদা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আদেশের আনুগত্য করত এবং তার চেহারা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইবাদতের কারণে নূরের আলোতে ছিল পরিপূর্ণ। একদিন সে তার রুটিন মোতাবেক আযান দেয়ার জন্য মিনারে উঠল। মিনারের নিচে খ্রিষ্টানদের একটি বাড়ি ছিল। লোকটি বাড়িটির দিকে তাকিয়ে বাড়িওয়ালার মেয়েকে দেখতে পেল। তাকে দেখে লোকটির মনে তার প্রতি ভালোবাসা জন্মিল। তারপর সে আযান না দিয়ে মিনার থেকে নেমে তার ঘরে প্রবেশ করল। তাকে দেখে মেয়েটি বলল, তোমার কি হয়েছে? তুমি কি চাও? সে বলল, আমি তোমাকে চাই! সে বলল, কেন? বলল, তুমি আমার ভালোবাসা কেড়ে নিলে এবং আমার অন্তর ভালোবাসার আগুন জ্বালিয়ে দিলে। মেয়েটি বলল, আমি কখনোই তোমার আহ্বানে সাড়া দিব না। সে বলল, আমি তোমাকে বিবাহ করব। মেয়েটি বলল, তুমি একজন মুসলিম আর আমি খ্রিষ্টান। আমার পিতা আমাকে তোমার নিকট বিবাহ দেবে না। তখন সে বলল, আমি তাহলে খ্রিষ্টান হয়ে যাব। সে বলল, যদি তুমি তা কর তবে আমি তোমার সাথে বিবাহ করতে রাজি আছি। তারপর লোকটি ঐ মেয়েকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে খ্রিষ্টান হয়ে গেল এবং তাদের সাথে তাদের ঘরেই অবস্থান করল। পরদিন লোকটি ঐ বাড়ির ছাদের উপর উঠলে ছাদ থেকে পড়ে মারা গেল। তারপর সে ঐ মেয়েকেও পেল না, আর নিজের দ্বীনকেও বরবাদ করল।
আমরা আল্লাহ রাব্বুল নিকট তাঁর দ্বীনের উপর অবিচল থাকা কামনা করি।
টিকাঃ
৮৬ সুরা আল হিজর: ২-৩।
📄 পরিশিষ্ট
কুআসক্তি বিষয়ে যে আলোচনা তুলে ধরা হল, তাতে শুধু যুবক-যুবতি কিংবা খারাপ প্রকৃতির লোকেরা আক্রান্ত হয় তা ঠিক নয়। বরং অনেক সময় দেখা যায়, যারা ভালো ও সৎলোক বলে পরিচিত এবং যারা উন্নত ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করে তারাও আসক্তির বেড়াজালে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এছাড়াও যারা মানুষকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দিকে আহ্বান করে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দ্বীনের সত্যিকার ইলম অর্জনে সর্বদা নিয়োজিত থাকে, মানুষকে দীনি ইলম ও শরীয়তের মাসআলা-মাসায়েল শিক্ষা দেয়-জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে এবং তারা মানুষকে কুআসক্তি হতে দূরে থাকার জন্য বিভিন্ন ধরনের ওয়াজ নছিহত করে থাকে, তারাও দেখা যায় তাদের নফস বা কুআসক্তির ধোঁকায় পড়ে যায়। বরং অনেক সময় দেখা যায় তাদের কুআসক্তি ও নফসের চাহিদা অন্য খারাপ লোকদের তুলনায় আরও বেশি মারাত্মক আকার ধারণ করে। কিন্তু তারা তাদের কুআসক্তি ও নফসের চাহিদাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ভয়ে এবং আখিরাতের বিনিময় ও ছাওয়াব লাভের আশায় নিয়ন্ত্রণ করে এবং দমিয়ে রাখে।
সুতরাং এ দুনিয়ার অবস্থার প্রতি সূক্ষ্ম ও গভীরভাবে চিন্তা করলে একজন ব্যক্তি এর কল্যাণ গ্রহণ করতে পারবে এবং দুনিয়ার অকল্যাণ হতে মুক্ত থাকতে পারবে। পক্ষান্তরে যে এর খারাপ পরিণতি দেখতে পাবে না ও এ সম্পর্কে সাবধান হবে না, তার উপর তার ইন্দ্রিয় প্রাধান্য পাবে, ফলে তা তার জন্য কষ্টের কারণ হবে এবং তাকে অজস্র জ্বালা যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে আমাদের পরম চাওয়া হল-তিনি যেন আমাদেরকে হারাম হতে বিরত রাখেন এবং আমাদের মাঝে ও হারামের মাঝে নির্মাণ করেন বরযখ বা পর্দা, সুদৃঢ় প্রাচীর ও মজবুত প্রতিবন্ধক। আর আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন, যারা যখন কোন ভুল বা অপরাধ করে, সাথে সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর যখন তারা কোন ভালো কাজ করেন, তখন তারা খুশি হন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিকট আমাদের আরও প্রার্থনা হল-তিনি যেন আমাদের আসক্তিকে তিনি যা পছন্দ করেন এবং যে সব কাজে সন্তুষ্ট হন সে কাজে ব্যবহার করতে পারি, সে তাওফিক দেন। আমিন।
وصلى الله وسلم على نبينا محمد، وعلى آله وصحبه أجمعين.