📘 আসক্তি সমাজ ধ্বংসের হাতিয়ার > 📄 আসক্তি বা شهوة এর পারিভাষিক অর্থ

📄 আসক্তি বা شهوة এর পারিভাষিক অর্থ


পরিভাষায় شهوة [আসক্তির চাহিদা] এর একাধিক অর্থ আছে। আমরা গুরুত্বপূর্ণ দু’একটি অর্থ এখানে আলোচনা করব।
এক. এটি মানুষের দৈহিক একটি স্বভাব যার উপর ভিত্তি করেই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার স্বীয় বান্দাদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে মানব সৃষ্টির রহস্য, মহান উদ্দেশ্য ও মহৎ লক্ষ সাধিত হয়।
দুই. আসক্তি হলো নারি ও পুরুষের সংসার করার আগ্রহ।
তিন. কোন বস্তুর প্রতি অন্তরের চাহিদা।

📘 আসক্তি সমাজ ধ্বংসের হাতিয়ার > 📄 আসক্তি সৃষ্টির কারণ

📄 আসক্তি সৃষ্টির কারণ


আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবকে সৃষ্টি করার সাথে তার মধ্যে এমন একটি মানবিক চাহিদা দান করেন, যা দ্বারা আল্লাহ মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটি ধারণা দেন।
ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন, "আমরা দুনিয়ার জীবনের সামগ্রিক কল্যাণ অর্জনে যাতে সহযোগিতা লাভ করতে পারি, তাই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের মধ্যে আসক্তি ও কামনা-বাসনাকে সৃষ্টি করেছেন। এছাড়াও তিনি আমাদের মধ্যে খাদ্যের চাহিদা ও তা ভোগ করার চাহিদা সৃষ্টি করেছেন। মূলত: এটি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অনেক বড় নেয়ামত। দুনিয়াতে বেঁচে থাকা এবং দৈহিক ক্ষমতা সচল রাখার জন্য খাদ্য-পানীয় আমাদের অপরিহার্য, খাদ্য পানীয় ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। অনুরূপভাবে বিবাহ করা, স্বামি-স্ত্রী উভয়ে মিলে-মিশে ঘর-সংসার করার নাম। আর এটিও মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অনেক বড় নেয়ামত। বিবাহ দ্বারা বংশ পরিক্রমা ও তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের যে সব কর্ম ও ইবাদত-বন্দেগি করার নির্দেশ দিয়েছেন, যদি আমরা আমাদের শক্তি দ্বারা তা পালন করতে পারি, তাহলে আমরা দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় কল্যাণ লাভে সক্ষম হব।
আর আমরা সে সব লোকদের অন্তর্ভুক্ত হব, যাদের মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বিশেষ নেয়ামত দান করেছেন এবং দুনিয়াতে তাদের সৌভাগ্যবান করেছেন। আর যদি আমরা আমাদের আসক্তির পূজা করি এবং যে সব কর্ম আমাদের ক্ষতির কারণ হয়, তা করতে থাকি, যেমন: হারাম খাওয়া, অন্যায়ভাবে উপার্জন করা, অপচয় করা, আমাদের স্ত্রীদের সাথে সীমালঙ্ঘন করা ইত্যাদি। তাহলে আমরা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে জালেম ও অন্যায়কারী হিসেবে পরিগণিত হব। আমরা কখনোই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নেয়ামতের শুকর গুজার বান্দা হিসেবে বিবেচিত হব না"।
উল্লিখিত আলোচনা হতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, কামনা-বাসনা ও আসক্তি মূলত: কোন খারাপ কিছু নয়, তবে তার ব্যবহারের কারণে তা ভালো ও খারাপে পরিণত। কামনা-বাসনা ও আসক্তিকে যদি বৈধ, ভালো ও কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়, তখন তা অবশ্যই ভালো এবং এবং প্রশংসনীয়। আর তা না করে যদি তাকে খারাপ ও মন্দ কাজে ব্যবহার করা হয়, তখন তা অবশ্যই খারাপ বলে বিবেচিত হবে। এ জন্য এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একজন মানুষ তার কামনা-বাসনা ও আসক্তির পরিচালক। সে তার কামনা-বাসনা ও আসক্তিকে যেভাবে চালাবে তা সেভাবেই চলতে বাধ্য থাকবে।
এতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আরও বড় হিকমত হল, যদি মানুষের মধ্যে কামনা-বাসনা ও আসক্তি না থাকত, তাহলে সে কখনোই বিবাহ করত না, সন্তান লাভের প্রতি তার কোন আকর্ষণ থাকত না এবং সন্তানের চাহিদা থাকত না। ফলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের মানব সৃষ্টির যে উদ্দেশ্য তা হাসিল হত না এবং তার প্রতিফলন ঘটতো না। এ কারণে বলা চলে—আমাদের সৃষ্টির বিশেষ হিকমত ও বুদ্ধিমত্তা হলো মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে এমন এক আসক্তি বা কামনা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে আমাদের অস্তিত্ব ও স্থায়িত্ব। অন্যথায় আমরা টিকে থাকতে পারতাম না, আমাদের বংশ-পরিক্রমা ও তার ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়ে যেত এবং দুনিয়ার স্বাভাবিক গতি রুদ্ধ হত। কিন্তু কামনা-বাসনা ও আসক্তির চাহিদা কখনো কখনো মানব জাতির ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকে এবং তাদের বিপর্যয় ডেকে আনে।
আর সৃষ্টির বিষয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের চিরন্তন পদ্ধতি হল—তিনি বিভিন্ন হিকমত ও মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই তাদের সৃষ্টি করেন। আর দুনিয়াতে তিনি মানুষকে পরিক্ষা করেন। যারা পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, তাদের জন্য রয়েছে উত্তম বিনিময়। আর যারা পরিক্ষায় ফেল করবে তাদের জন্য রয়েছে অসহনীয় যন্ত্রণা ও কঠিন শাস্তি। আর পরিক্ষার বিশেষ অংশ হলো মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের কামনা-বাসনা ও আসক্তির চাহিদা দিয়ে সৃষ্টি করেন, যাতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পার্থক্য স্পষ্ট করে দিতে পারেন কে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অনুগত বান্দা, আর কে অবাধ্য। তিনি আরও স্পষ্ট করেন কে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পবিত্র বান্দা, আর কে অপবিত্র ও অপরাধী।
মালেক ইবনু দীনার রহ. বলেন, "দুনিয়ার জীবনের চাহিদা যার নিকট প্রাধান্য পায়, শয়তান তাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আশ্রয় হতে দূরে সরিয়ে দেয়"।
হাসান বসরি রহ. বলেন-
رُبَّ مَسْتُوْرٍ سَبَتْهُ شَهْوَةٌ فَتَعَرَّى سِتْرُهُ فَانْهَتَكَا صَاحِبُ الشَّهْوَةِ عَبْدُ فَإِذَا غَلَبَ الشَّهْوَةَ أَضْحَى مَلِكا.
"অনেক আত্মগোপনে থাকা মানুষকে তার আসক্তি বন্দি করে ফেলে। অতঃপর যখন সে গোপন পর্দা খুলে যায় তখন তা আবরণশূণ্য হয়ে পড়ে। কামনা-বাসনা ও আসক্তির পূজারী হল একজন দাস, কিন্তু যখন সে তার আসক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তখন সে সত্যিকার বাদশায় পরিণত হয়"।
দুনিয়াতে পুরুষের সবচেয়ে বড় চাহিদা হল নারি। এ কারণে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনুল কারিমে নারিদের কথা প্রথমে আলোচনা করেন। তিনি মানবজাতিকে জানিয়ে দেন, নারিদের ফিতনা সর্বাধিক মারাত্মক, ক্ষতিকর এবং সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে এর প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী ও ভয়াবহ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনুল কারিমে এরশাদ করেন-
زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَآبِ.
"মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে কামনা-বাসনা ও আসক্তির ভালবাসা, নারি, সন্তানাদি, রাশি রাশি সোনা-রূপা, চিহ্নিত ঘোড়া, গবাদি পশু ও শস্যক্ষেত। এগুলো দুনিয়ার জীবনের ভোগ সামগ্রী। আর আল্লাহ, তাঁর নিকট রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল"।
উসামা ইবনু যায়েদ রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةٌ أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ.
"আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য অধিক ক্ষতিকর ও নারিদের চেয়ে খারাপ কোন ফিতনা রেখে যাইনি”।
আবু সাঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
اتَّقُوا الدُّنْيَا، وَاتَّقُوا النِّسَاءَ؛ فَإِنَّ أَوَّلَ فِتْنَةِ بَنِي إِسْرَائِيلَ كَانَتْ فِي النِّسَاءِ.
"তোমরা দুনিয়া বিষয়ে সতর্ক থাক এবং তোমরা নারিদের বিষয়ে সতর্ক থাক। কারণ, বনি ইসরাইলদের সর্বপ্রথম ফিতনা ছিল নারিদের বিষয়ে"।

টিকাঃ
* আল ইসতিকামা: ১/৩৪১-৩৪২।
* হিলইয়াতুল আউলিয়া: ২/৩৬৫।
* রওজাতুল মুহিব্বিন: ৪৮৪।
* সুরা আলে ইমরান: ১৪।
* সহিহ বুখারি: ৫০৯৬; সহিহ মুসলিম: ২৭৪০।
* সহিহ মুসলিম: ২৭৪২।

📘 আসক্তি সমাজ ধ্বংসের হাতিয়ার > 📄 নিষিদ্ধ বিষয়সমূহে লিপ্ত হওয়ার কারণ

📄 নিষিদ্ধ বিষয়সমূহে লিপ্ত হওয়ার কারণ


প্রথম মূলনীতি: প্রথম: ঈমানের দুর্বলতা
ঈমান হল মুমিনের আত্মরক্ষার জন্য সবচেয়ে মজবুত ও বড় হাতিয়ার; ঈমানই মুমিনের জন্য সবচেয়ে বড় দুর্গ ও আশ্রয়স্থল, যা তাকে খারাপ, মন্দ, ঘৃণিত, নিকৃষ্ট ও নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে। যখন কোন মানুষ আল্লাহর আনুগত্য হতে দূরে সরে যায়, তখন তার ঈমান দুর্বল হয় এবং সে অন্যায় ও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নাফরমানী করা ও অবাধ্য হওয়ার সাহস পায়। এ কারণেই কোন কোন মনীষী বলেন— তিনটি জিনিস হল তাকওয়ার নিদর্শন।
এক. শক্তি-সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও খারাপ কামনা-বাসনা ও আসক্তির চাহিদাকে ছেড়ে দেয়া।
দুই. নফসের বিরোধিতা করে নেক আমলসমূহ পালন করা।
তিন. নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও আমানতকে তার হকদারের নিকট পৌঁছে দেয়া।
এ তিনটি কাজ যে ব্যক্তি করবে তা প্রমাণ করে যে, লোকটির মধ্যে ঈমান ও দ্বীনদারি আছে। কারণ, তার সামনে হারাম কাজ অপেক্ষমাণ কিন্তু সে কেবল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ভয়ে তা হতে বিরত থাকছে। সে তার নফসের চাহিদার বিরুদ্ধে স্বীয় আত্মাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইবাদত বন্দেগিতে লিপ্ত থাকতে বাধ্য করছে। তার শত প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও আমানতের খেয়ানত করেনি। অন্যের আমানতকে প্রকৃত হকদারের নিকট পৌঁছে দিয়েছে।
দ্বিতীয়: অসৎ সঙ্গ
আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ، فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ.
"মানুষ তার বন্ধুর স্বভাবের উপরই প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, সুতরাং তোমরা দেখে শোনে বন্ধু নির্বাচন করবে"।১০
সাধারণত মানুষ যে সব অন্যায়, পাপাচার, অপরাধ ও অপকর্ম করে থাকে, তার অধিকাংশের কারণ হল, তার অসৎ সঙ্গি। যাদের সঙ্গি খারাপ হয়, তারা ইচ্ছা করলেও ভালো থাকতে পারে না। সঙ্গিরা তাদের খারাপ ও অন্যায় কাজের দিকে নিয়ে যায়।
একজন সতের বছরের যুবক তার জীবনে প্রথম অপকর্মের বর্ণনা দিয়ে বলল-"আমি প্রথমে আমার এক বন্ধুর বাসায় তার সাথে সাক্ষাত করতে গিয়ে সেখানে নিষিদ্ধ সিনেমা দেখি। আমি তার কামরায় অবস্থান করলে সে একটি ভিডিও ফিল্ম চালালে আমি তার সাথে বসে তা দেখতে থাকি। এ ছিল আমার জীবনের সর্বপ্রথম অপরাধ"।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নোংরামি, অশ্লীলতা ও ব্যভিচারকে নিষেধ করেন এবং বেহায়াপনা হতে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-
لا يُحِبُّ اللَّهُ الْجَهْرَ بِالسُّوءِ مِنَ الْقَوْلِ إِلَّا مَن ظُلِمَ وَكَانَ اللَّهُ سَمِيعًا عَلِيمًا.
"মন্দ কথার প্রচার আল্লাহ পছন্দ করেন না, তবে কারো উপর যুলুম করা হলে ভিন্ন কথা। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।”১১
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
لَيْسَ المُؤْمِنُ بِالطَّعَانِ وَلَا اللَّيَّانِ وَلَا الفَاحِشِ وَلَا البَدِيءِ.
"ঈমানদার ব্যক্তি খোটাদানকারী নয়, অভিশাপকারীও নয়; অনুরূপভাবে অশ্লীল ও খারাপ বচনবিশিষ্ট ও নোংরা ব্যক্তি হতে পারে না"।১২
তৃতীয়: দৃষ্টির হেফাজত করা
মানুষ যখন রাস্তায় বের হয় তখন তাকে অবশ্যই দৃষ্টির হেফাজত করতে হবে। কারণ, মানুষের দৃষ্টি হল ইবলিসের বিষাক্ত হাতিয়ার বা তীর। দৃষ্টি হেফাজত করতে না পারলে বিভিন্ন ধরনের অপকর্মের শিকার হতে হয়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার বান্দাদের দৃষ্টির ব্যাপারে অধিক সতর্ক করেন এবং ভয় দেখান।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-
قُل لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ.
"মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত"।"
চতুর্থ: বেকারত্ব
বেকারত্ব যুবকদের জন্য মারাত্মক ক্ষতি। শুধু ক্ষতিই নয়, এটি মানব জীবনের জন্য বড় একটি অভিশাপ। যখন তাদের কোন কাজ না থাকে তখন তাদের মস্তিষ্কে খারাপ চিন্তা ঢুকে পড়ে এবং বেকারত্ব তাদের খারাপ ও অশ্লীল কাজের দিকে নিয়ে যায়। তারা খারাপ, অন্যায় ও অশ্লীল কাজের চক আঁকতে থাকে। ধীরে ধীরে তাদের অবস্থা এমন হয় যে, তারা শুধু খারাপ চিন্তাই করতে থাকে। ভালো কোন চিন্তা তাদের মাথায় আসে না। ফলে সে এমন খারাপ অভ্যাসের অনুশীলন করতে থাকে, যা তার জীবনকে ধ্বংসের দ্বার-প্রান্তে পৌঁছে দেয়।
মানবাত্মা যখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আনুগত্য ও ইবাদত বন্দেগিতে সময় ব্যয় করবে না তখন সে অবশ্যই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নাফরমানিতে সময় নষ্ট করবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় বাণীতে এ কথাটিই বলেছেন।
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
نِعْمَتَانِ مَغْبُونُ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصَّحَةُ، وَالفَرَاغُ.
"দুটি নেয়ামত এমন আছে যার মধ্যে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত। এক: সুস্থতা; দুই: অবসরতা"। ১৪
বেকার থাকা একটি বড় মুসিবত এবং আত্মার জন্য মারাত্মক ক্ষতি। যদি মানুষ কোন ভালো কাজে ব্যস্ত না থাকে, তাহলে শয়তান অবশ্যই তাকে খারাপ কাজের দিকে নিয়ে যায়"।
পঞ্চম: নিষিদ্ধ কাজে শৈথিল্য
মানুষ যখন কোন কাজে শিথিলতা দেখায়, তখন তা ধীরে ধীরে বড় আকার ধারণ করে। অধিকাংশ সময় মেয়েদের প্রতি তাকানো ও তাদের সাথে সংমিশ্রণ মানুষকে অশ্লীল কাজ করতে বাধ্য করে। অথচ প্রথম যখন একজন মানুষ কোন মেয়ের সাথে কথা-বার্তা বলে ও তার দিকে তাকায় তখন তার খারাপ কোন উদ্দেশ্য থাকে না। কিন্তু ধীরে ধীরে তার অবনতি হতে থাকে এবং তা বড় আকার ধারণ করে। ছোট হারাম বা ছোট গুণাহের প্রতি শৈথিল্য তাকে বড় হারাম বা কবীরা গুণাহের দিক নিয়ে যায়।
বর্তমান সময়ে অনেক পরিবার এমন আছে, যারা চাকরানিকে তাদের যুবক ছেলের সাথে মিশতে কোন বাধা দেয় না, তারা মনে করে, এতে কোন সমস্যা নাই। কারণ, আমাদের ছেলেরা কি ঘরের চাকরানির সাথে কোন অপকর্ম করতে পারে? কিন্তু পরবর্তীতে যখন দুর্ঘটনা ঘটে যায়, তখন তারা লজ্জায় নিজের আঙুল নিজেই কাটতে থাকে।
আবার অনেক পরিবার আছে যারা তাদের মেয়েদের ড্রাইভারের সাথে ছেড়ে দেয়। মনে করে, সে একজন ড্রাইভার; তার সাথে কি আমাদের মেয়েরা কোন খারাপ চিন্তা করতে পারে? কিন্তু না, দেখা যায় এর পরিণতি খুবই খারাপ হয়। মেয়েরা ড্রাইভারের প্রেমে পড়ে যায় এবং অনেক সময় তা-ই ঘটে যা তুমি কোন দিন চিন্তাই করতে পারনি।
এ ধরনের অনেক ঘটনাই আমাদের শৈথিল্যের কারণে সমাজে সংঘটিত হচ্ছে, যা একজন মানুষকে মহা বিপদ ও ধ্বংসের মধ্যে নিপতিত করে।
ষষ্ঠ: যৌন উত্তেজক বস্তুর সাথে উঠাবসা করা
হারাম বা নিষিদ্ধ কাজে একজন মানুষ তখন লিপ্ত হয়, যখন বিভিন্ন ধরনের যৌন উত্তেজক কাজ যেমন, গান, বাজনা, সিনেমা, মেয়েদের সাথে কথা বলা ও হাসি ঠাট্টা ইত্যাদির সাথে তার সংশ্রব থাকে। এ কারণেই শরিয়ত অপকর্মের সকল উপাদানকে নিষেধ করে। যেমন—শরিয়ত রাস্তার মাঝে বসা হতে নিষেধ করে। কারণ রাস্তায় বসলে বিভিন্ন ধরনের নোংরা ছবি, পোষ্টার ও মেয়েদের দেখারা আশঙ্কা থাকে, যেগুলো একজন মানুষের যৌন উত্তেজনাকে বৃদ্ধি করে এবং অপকর্মের দিক উৎসাহ যোগায়।
আবু সাঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
إِيَّاكُم وَالجُلُوسَ فِي الطُّرُقَاتِ فقالوا يا رسول الله ما لنا بد، من مجالسنا - نتحدث فيها. قال فَإِذَا أَبَيْتُمْ إِلَّا المَجْلِسَ فَأَعْطُوا الطَّرِيقَ حَقَّهَ قالوا: وما حقه؟ قال غَضُّ البَصَرِ، وَكَفُ الأَذَى، وَرَدُّ السَّلَامِ، والأمرُ بِالمَعْرُوفِ والنهي عَنِ المُنْكَرِ.
"তোমরা রাস্তার মাঝে বসা হতে বিরত থাক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এ কথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম বলল, হে আল্লাহর রাসুল! রাস্তায় বসা ছাড়া আমাদের কোন উপায় নাই। আমরা রাস্তায় বসে কথাবার্তা বলি। তাদের কথার উত্তরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি রাস্তায় বসা ছাড়া তোমাদের কোন উপায় না থাকে তাহলে তোমরা রাস্তার হক আদায় করবে। এ কথা শুনে সাহাবিরা বলল, হে আল্লাহর রাসুল! রাস্তার হক কি? তিনি বলেন, রাস্তার হক হলো চক্ষুকে অবনত করা, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তুকে সরানো, সালামের উত্তর দেয়া, ভালো কাজের আদেশ দেয়া এবং খারাপ কাজ হতে নিষেধ করা"। ১৫
ইসলামি শরিয়তও ইবাদতের স্থানে নারি ও পুরুষের একত্রিকরণ এবং তাদের সাথে সংমিশ্রণ-যা যৌন উত্তেজনাকে বৃদ্ধি করে তা নিষেধ করেছেন। কারণ, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সালাতে নারিদের কাতারকে পুরুষের কাতার থেকে আলাদা করেছেন, নারিদের জন্য মসজিদে প্রবেশের দরজা আলাদা করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং নারিদের মসজিদ থেকে পুরুষদের পরে বের হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আর এসবগুলো এজন্যই হলো-যাতে একজন মানুষ যৌন উত্তেজনা হতে দূরে ও সতর্ক থাকে।

টিকাঃ
* হিলইয়াতুল আউলিয়া: ৯/৩৯৩।
১০ সুনানু আবু দাউদ: ৪৭৩৩; সুনানু তিরমিযি: ২৩৭৮। শাইখ আলবানি হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
১১ সুরা নিসা: ১৪৮।
১২ সুনানু তিরমিযি: ১৯৭৭। শাইখ আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।
১৩ সুরা নুর: ৩০।
১৪ সহিহ বুখারি: ৬৪১২।
১৫ সহিহ বুখারি: ২৪৬৫; সহিহ মুসলিম: ২১২১।

📘 আসক্তি সমাজ ধ্বংসের হাতিয়ার > 📄 নারিদের কাহিনি

📄 নারিদের কাহিনি


ওমর রা. তার খিলাফতের আমলে মুসলিমদের ঘরে ঘরে তাদের অবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য ঘুরে বেড়াত। তখন সে একজন মহিলাকে বলতে শুনল, সে বলতেছে-
تطاول هذا الليل وَاسْوَدَّ جانبه. وأرقني إذ لا حبيب ألاعبه. فلولا الذي فوق السموات عرشه لزعزع من هذا السرير جوانبه.
"আজকের রাতটি অনেক দীর্ঘ ও গভীর অন্ধকার। আর আমার ঘুম দূর হয়েছে এ কারণে যে, এখানে আমার কোন বন্ধু নাই যার সাথে খেলাধুলা করে রাত যাপন করব। যদি সে সত্তা না থাকত, যার আরশ আসমানের উপর। তাহলে এ খাটের আশপাশ ওলট পালট হয়ে যেত”।
পরদিন ওমর রা. সকাল বেলা মহিলাটি তার দরবারে ডেকে নিয়ে আসার জন্য লোক পাঠালেন। ওমর রা. তাকে জিজ্ঞাসা করল এ ধরনের কথাগুলো তুমি বলছিলে? তখন সে বলল, হাঁ, তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, তুমি এ কথাগুলো কেন বললে, তখন সে বলল, আমি আমার স্বামিকে এক যুদ্ধে পাঠাই। তারপর ওমর রা. হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহার নিকট গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, মহিলারা স্বামি ছাড়া কতদিন ধৈর্য ধারণ করে থাকতে পারে। তখন সে বলল-ছয় মাস। তারপর থেকে ওমর রা. ছয় মাস পর সৈন্যদলকে বাড়িতে ফেরত পাঠাতেন। "৮৫

টিকাঃ
৮৫ মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক: ৭/১৫৬; সুনানু বায়হাকি ৯/২৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00