📄 ভূমিকা
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على نبينا محمد، وعلى آله وصحبه أجمعين.
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার জন্য, যিনি সমগ্র সৃষ্টিকুলের রব। আর সালাত ও সালাম নবিগণের সেরা ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর এবং তার পরিবার-পরিজন ও সাথি-সঙ্গিদের সকলের উপর।
মনে রাখতে হবে, আসক্তি ও আসক্তির আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে কথা বলা বর্তমান যুগে প্রতিটি নর-নারির জন্য অত্যন্ত জরুরি। কারণ, বর্তমানে আসক্তি-উত্তেজনা ও এর প্রভাব এতই বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আমাদের দেশ ও সমাজ এক অজানা গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তারপরও দেশ, জাতি ও সমাজকে পশুত্ব ও পাশবিকতার করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করার জন্য এ বিষয়ে জাতিকে সতর্ক করা ও খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জানিয়ে দেয়া একান্ত জরুরি। পুস্তিকাটিতে আসক্তির বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা হবে। যেমন-
আসক্তি কি? আসক্তিকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? আসক্তির পূজা করে নিষিদ্ধ বিষয়সমূহে জড়িত হওয়ার কারণগুলো কি? আসক্তির চিকিৎসা কি? ইত্যাদি বিষয়গুলো এ কিতাবে আলোচনা করা হবে।
যারা এ কিতাবটি তৈরি করতে এবং কিতাবের বিষয়গুলোকে একত্র করতে আমাদের সহযোগিতা করেছেন আমরা তাদের সবার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও যাবতীয় কল্যাণ কামনা করছি এবং তাদের জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে প্রার্থনা করি, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন তাদেরকে আরও বেশি বেশি করে ভাল কাজ করার তাওফিক দেন। আমিন!
হে আল্লাহ! তুমি আমাদের হালাল দান করো এবং হারাম বিমুখ কর। তোমার আনুগত্য দ্বারা তোমার অবাধ্যতা থেকে আমাদের হেফাজত কর। আর তোমার অনুগ্রহ দ্বারা আমাদেরকে গাইরুল্লাহ থেকে হেফাজত কর।
وَصَلَّى اللَّهُ وَسَلَّمَ عَلَى نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِين.
শাইখ মুহাম্মাদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ
📄 আসক্তি বা شهوة এর সংজ্ঞা
আসক্তি বা شهوة এর আভিধানিক অর্থ
আল্লামা ইবনু ফারেস রহ. বলেন, شهوة শব্দটি সীন, হা ও মুতাল হরফ ওয়াও দ্বারা গঠিত একটি আরবি শব্দ। অর্থাৎ আসক্তি, বাসনা, আকাঙ্ক্ষা, কামনা ইত্যাদি। আরবিতে বলা হয় رجل شهوان অর্থাৎ লোকটি প্রলুব্ধ, লোভী ও আকাঙ্খাকারী।'
আল্লামা ফাইরুযাবাদী রহ. বলেন-
شهي الشئ وشهاه يشهاه شهوة واشتهاه احبه ورغب فيه.
এ কথাটি তখন বলা হয়ে থাকে, যখন লোকটি কোন বস্তুর আকাঙ্ক্ষা করে, বস্তুটিকে মহব্বত করে, বস্তুটির বিষয়ে তার আগ্রহ থাকে এবং সে বস্তুটি কামনা করে।
টিকাঃ
' মু'জামু মাকায়িসিল লুগাত: ৩/১৭১।
* লিসানুল আরব: ১৪/৪৪৫।
📄 আসক্তি বা شهوة এর পারিভাষিক অর্থ
পরিভাষায় شهوة [আসক্তির চাহিদা] এর একাধিক অর্থ আছে। আমরা গুরুত্বপূর্ণ দু’একটি অর্থ এখানে আলোচনা করব।
এক. এটি মানুষের দৈহিক একটি স্বভাব যার উপর ভিত্তি করেই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার স্বীয় বান্দাদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে মানব সৃষ্টির রহস্য, মহান উদ্দেশ্য ও মহৎ লক্ষ সাধিত হয়।
দুই. আসক্তি হলো নারি ও পুরুষের সংসার করার আগ্রহ।
তিন. কোন বস্তুর প্রতি অন্তরের চাহিদা।
📄 আসক্তি সৃষ্টির কারণ
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবকে সৃষ্টি করার সাথে তার মধ্যে এমন একটি মানবিক চাহিদা দান করেন, যা দ্বারা আল্লাহ মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটি ধারণা দেন।
ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন, "আমরা দুনিয়ার জীবনের সামগ্রিক কল্যাণ অর্জনে যাতে সহযোগিতা লাভ করতে পারি, তাই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের মধ্যে আসক্তি ও কামনা-বাসনাকে সৃষ্টি করেছেন। এছাড়াও তিনি আমাদের মধ্যে খাদ্যের চাহিদা ও তা ভোগ করার চাহিদা সৃষ্টি করেছেন। মূলত: এটি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অনেক বড় নেয়ামত। দুনিয়াতে বেঁচে থাকা এবং দৈহিক ক্ষমতা সচল রাখার জন্য খাদ্য-পানীয় আমাদের অপরিহার্য, খাদ্য পানীয় ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। অনুরূপভাবে বিবাহ করা, স্বামি-স্ত্রী উভয়ে মিলে-মিশে ঘর-সংসার করার নাম। আর এটিও মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অনেক বড় নেয়ামত। বিবাহ দ্বারা বংশ পরিক্রমা ও তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের যে সব কর্ম ও ইবাদত-বন্দেগি করার নির্দেশ দিয়েছেন, যদি আমরা আমাদের শক্তি দ্বারা তা পালন করতে পারি, তাহলে আমরা দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় কল্যাণ লাভে সক্ষম হব।
আর আমরা সে সব লোকদের অন্তর্ভুক্ত হব, যাদের মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বিশেষ নেয়ামত দান করেছেন এবং দুনিয়াতে তাদের সৌভাগ্যবান করেছেন। আর যদি আমরা আমাদের আসক্তির পূজা করি এবং যে সব কর্ম আমাদের ক্ষতির কারণ হয়, তা করতে থাকি, যেমন: হারাম খাওয়া, অন্যায়ভাবে উপার্জন করা, অপচয় করা, আমাদের স্ত্রীদের সাথে সীমালঙ্ঘন করা ইত্যাদি। তাহলে আমরা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে জালেম ও অন্যায়কারী হিসেবে পরিগণিত হব। আমরা কখনোই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নেয়ামতের শুকর গুজার বান্দা হিসেবে বিবেচিত হব না"।
উল্লিখিত আলোচনা হতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, কামনা-বাসনা ও আসক্তি মূলত: কোন খারাপ কিছু নয়, তবে তার ব্যবহারের কারণে তা ভালো ও খারাপে পরিণত। কামনা-বাসনা ও আসক্তিকে যদি বৈধ, ভালো ও কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়, তখন তা অবশ্যই ভালো এবং এবং প্রশংসনীয়। আর তা না করে যদি তাকে খারাপ ও মন্দ কাজে ব্যবহার করা হয়, তখন তা অবশ্যই খারাপ বলে বিবেচিত হবে। এ জন্য এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একজন মানুষ তার কামনা-বাসনা ও আসক্তির পরিচালক। সে তার কামনা-বাসনা ও আসক্তিকে যেভাবে চালাবে তা সেভাবেই চলতে বাধ্য থাকবে।
এতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আরও বড় হিকমত হল, যদি মানুষের মধ্যে কামনা-বাসনা ও আসক্তি না থাকত, তাহলে সে কখনোই বিবাহ করত না, সন্তান লাভের প্রতি তার কোন আকর্ষণ থাকত না এবং সন্তানের চাহিদা থাকত না। ফলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের মানব সৃষ্টির যে উদ্দেশ্য তা হাসিল হত না এবং তার প্রতিফলন ঘটতো না। এ কারণে বলা চলে—আমাদের সৃষ্টির বিশেষ হিকমত ও বুদ্ধিমত্তা হলো মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে এমন এক আসক্তি বা কামনা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে আমাদের অস্তিত্ব ও স্থায়িত্ব। অন্যথায় আমরা টিকে থাকতে পারতাম না, আমাদের বংশ-পরিক্রমা ও তার ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়ে যেত এবং দুনিয়ার স্বাভাবিক গতি রুদ্ধ হত। কিন্তু কামনা-বাসনা ও আসক্তির চাহিদা কখনো কখনো মানব জাতির ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকে এবং তাদের বিপর্যয় ডেকে আনে।
আর সৃষ্টির বিষয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের চিরন্তন পদ্ধতি হল—তিনি বিভিন্ন হিকমত ও মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই তাদের সৃষ্টি করেন। আর দুনিয়াতে তিনি মানুষকে পরিক্ষা করেন। যারা পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, তাদের জন্য রয়েছে উত্তম বিনিময়। আর যারা পরিক্ষায় ফেল করবে তাদের জন্য রয়েছে অসহনীয় যন্ত্রণা ও কঠিন শাস্তি। আর পরিক্ষার বিশেষ অংশ হলো মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের কামনা-বাসনা ও আসক্তির চাহিদা দিয়ে সৃষ্টি করেন, যাতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পার্থক্য স্পষ্ট করে দিতে পারেন কে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অনুগত বান্দা, আর কে অবাধ্য। তিনি আরও স্পষ্ট করেন কে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পবিত্র বান্দা, আর কে অপবিত্র ও অপরাধী।
মালেক ইবনু দীনার রহ. বলেন, "দুনিয়ার জীবনের চাহিদা যার নিকট প্রাধান্য পায়, শয়তান তাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আশ্রয় হতে দূরে সরিয়ে দেয়"।
হাসান বসরি রহ. বলেন-
رُبَّ مَسْتُوْرٍ سَبَتْهُ شَهْوَةٌ فَتَعَرَّى سِتْرُهُ فَانْهَتَكَا صَاحِبُ الشَّهْوَةِ عَبْدُ فَإِذَا غَلَبَ الشَّهْوَةَ أَضْحَى مَلِكا.
"অনেক আত্মগোপনে থাকা মানুষকে তার আসক্তি বন্দি করে ফেলে। অতঃপর যখন সে গোপন পর্দা খুলে যায় তখন তা আবরণশূণ্য হয়ে পড়ে। কামনা-বাসনা ও আসক্তির পূজারী হল একজন দাস, কিন্তু যখন সে তার আসক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তখন সে সত্যিকার বাদশায় পরিণত হয়"।
দুনিয়াতে পুরুষের সবচেয়ে বড় চাহিদা হল নারি। এ কারণে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনুল কারিমে নারিদের কথা প্রথমে আলোচনা করেন। তিনি মানবজাতিকে জানিয়ে দেন, নারিদের ফিতনা সর্বাধিক মারাত্মক, ক্ষতিকর এবং সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে এর প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী ও ভয়াবহ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনুল কারিমে এরশাদ করেন-
زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَآبِ.
"মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে কামনা-বাসনা ও আসক্তির ভালবাসা, নারি, সন্তানাদি, রাশি রাশি সোনা-রূপা, চিহ্নিত ঘোড়া, গবাদি পশু ও শস্যক্ষেত। এগুলো দুনিয়ার জীবনের ভোগ সামগ্রী। আর আল্লাহ, তাঁর নিকট রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল"।
উসামা ইবনু যায়েদ রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةٌ أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ.
"আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য অধিক ক্ষতিকর ও নারিদের চেয়ে খারাপ কোন ফিতনা রেখে যাইনি”।
আবু সাঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
اتَّقُوا الدُّنْيَا، وَاتَّقُوا النِّسَاءَ؛ فَإِنَّ أَوَّلَ فِتْنَةِ بَنِي إِسْرَائِيلَ كَانَتْ فِي النِّسَاءِ.
"তোমরা দুনিয়া বিষয়ে সতর্ক থাক এবং তোমরা নারিদের বিষয়ে সতর্ক থাক। কারণ, বনি ইসরাইলদের সর্বপ্রথম ফিতনা ছিল নারিদের বিষয়ে"।
টিকাঃ
* আল ইসতিকামা: ১/৩৪১-৩৪২।
* হিলইয়াতুল আউলিয়া: ২/৩৬৫।
* রওজাতুল মুহিব্বিন: ৪৮৪।
* সুরা আলে ইমরান: ১৪।
* সহিহ বুখারি: ৫০৯৬; সহিহ মুসলিম: ২৭৪০।
* সহিহ মুসলিম: ২৭৪২।