📄 গুনাহের কুফল
নিষিদ্ধ সুখ-যখন তা উপভোগ করা হয়, তখন মন্দত্ব ও কদর্যতামিশ্রিত সুখানুভূতি হয়। তা ছেড়ে দিতে কষ্ট লাগে। এখন তোমার মন যদি তোমাকে নিষিদ্ধ সুখের প্রতি আহ্বান করে, তখন চিন্তা করে দেখো, তা উপভোগ করে কদর্যতামিশ্রিত সুখানুভূতি তোমার জন্য উত্তম, নাকি ছেড়ে দিয়ে কষ্ট সহ্য করার পবিত্রানুভূতি উত্তম? দুইটার মাঝে পার্থক্য করে দেখো, কোনটাতে তোমার লাভ। ১০৩
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বলেন, 'পুণ্য মানুষের চেহারায় লাবণ্য সৃষ্টি করে, অন্তঃকরণ আলোকিত করে, রিজিকে প্রশস্ততা আনে এবং শরীরে শক্তি জোগায়। এ ছাড়াও পুণ্যের কারণে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা যায়। পক্ষান্তরে, পাপের কারণে চেহারার লাবণ্য ও সৌন্দর্য বিনষ্ট হয়, অন্তর অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, শরীর দুর্বল হয়ে যায় এবং রিজিকের বরকত চলে যায়। তা ছাড়া পাপী ব্যক্তিকে মানুষ অপছন্দ করতে শুরু করে। '১০৪
গুনাহের কুফল বর্ণনা করতে গিয়ে আবু দারদা রা. বলেন, 'প্রত্যেক ব্যক্তিকে মুমিনের হৃদয়ের অজ্ঞাত অভিশাপ থেকে বেঁচে থাকা চাই।' অতঃপর বললেন, 'তোমরা কি জানো, সেই অজ্ঞাত অভিশাপ কী? তা হলো, বান্দা যখন গুনাহ করে, তখন আল্লাহ তাআলা মুমিনের অন্তরে তার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে দেন, যা সে বুঝতেও পারে না।'১০৫
ইবাদত করা কষ্টের কাজ। তবে তার বিনিময়ে দীর্ঘস্থায়ী সুখ অর্জিত হয়। আর ইবাদত না করলে সাময়িক সুখ পাওয়া যায় বটে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী কষ্টের মাধ্যমে এ সুখের চড়া মূল্য দিতে হয়। এখন ইবাদত করতে যদি তোমার মন না চায়, তবে ভেবে দেখো-ইবাদত করার সাময়িক কষ্ট তোমার জন্য উত্তম, নাকি না করার সাময়িক সুখ উত্তম? দুইয়ের মাঝে তুলনা করে উত্তমকে অনুত্তমের ওপর প্রাধান্য দাও। কোনো কাজের মধ্যে যে কষ্ট আছে, তার প্রতি লক্ষ না করে সে কাজের ফলাফলে যে আনন্দ, স্বাদ ও সুখ রয়েছে, তার প্রতি নজর দাও। অনুরূপভাবে নিষিদ্ধ সুখ উপভোগ না করলে সাময়িক কষ্ট হবে ঠিকই, কিন্তু তা উপভোগ করলে পরিণামে তার চেয়ে ঢের বেশি কষ্ট পেতে হবে। দুই কষ্টের মাঝে তুলনা করে দেখো তো, কোনটা তোমার জন্য উত্তম?১০৬
প্রিয় ভাই, গুনাহের কুফলসমূহ নিয়ে চিন্তা করো; চিন্তা করো সে বিষণ্ণতা নিয়ে, যা গুনাহ করার কারণে তোমার অন্তরে অনুভূত হয়। অতঃপর পুণ্যের নুরের দিকে লক্ষ করো। লক্ষ করো, পুণ্য অন্তরকে কেমন আলোকিত করে তোলে। অতঃপর পাপ ছেড়ে দিয়ে পুণ্যের কাজে লেগে যাও।
আবুল হাসান মুজানি রহ. বলেন, 'গুনাহ তার পূর্বের গুনাহের শাস্তি এবং পুণ্য তার পূর্বের পুণ্যের পুরস্কার। '১০৭
গুনাহ নিঃসন্দেহে ক্ষতিকর। বিষ শরীরের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনই গুনাহ অন্তরের জন্য ক্ষতিকর। দুনিয়া ও আখিরাতের সকল খারাপ পরিণতির জন্য গুনাহই দায়ী।
এ জন্যই ইবনে আব্বাস রা. আমাদের গুনাহ থেকে ভয় প্রদর্শন করে বলেন, 'গুনাহের ভয়াবহ পরিণতি থেকে নিজেদের নিরাপদ ভেবো না। গুনাহের পরিণতি গুনাহের চেয়েও মারাত্মক।'১০৮
প্রিয় ভাই আমার, সালাফ কোন পথে ছিলেন, আমরা কোন পথে?
হিশাম বিন হাসসান রহ. বলেন, 'আমি আলা বিন জিয়াদ রহ.-এর সাথে পথ চলছিলাম। চলার পথে সতর্ক ছিলাম যেন কাদামাটি আমার পায়ে না লাগে। কিন্তু এক ব্যক্তির সাথে আমার ধাক্কা লাগলে আমার পা কাদামাটিতে প্রবিষ্ট হয়ে যায়। তাই আমি পানিতে পা ডুবিয়ে তা ধুয়ে নিলাম। যখন আলা বিন জিয়াদ রহ.-এর দরজার কাছে পৌঁছলাম, তখন তিনি বললেন, “দেখেছ হিশাম, আজ তোমার সাথে কী হলো? মুসলমানদের অবস্থাও ঠিক তোমার মতো হওয়া চাই। তারা গুনাহ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করবে, তবে কখনো যদি তা করে ফেলে, তখন সাথে সাথে (তাওবার মাধ্যমে) তা ধুয়ে ফেলবে।””১০৯
বান্দা যখন গুনাহ করে, তখন প্রভুর অবাধ্যতা কিংবা তাঁর নিষেধাজ্ঞার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুল প্রদর্শন করা তার উদ্দেশ্য থাকে না। কিন্তু প্রবৃত্তি ও শয়তানের কুমন্ত্রণা ও আল্লাহর ক্ষমাগুণের প্রতি অতি নির্ভরতা তাকে গুনাহ করতে প্ররোচিত করে। এটা বান্দার পক্ষ থেকে গুনাহ সংঘটিত হওয়ার কারণ।
বান্দা থেকে গুনাহ প্রকাশ করার ক্ষেত্রে আল্লাহর উদ্দেশ্য হলো—তাঁর বিধান বাস্তবায়ন করা এবং প্রভুত্বের উচ্চতা, দাসত্বের নিম্নতা ও তাঁর প্রতি বান্দার পূর্ণ মুখাপেক্ষিতা প্রমাণ করা। এ ছাড়াও তাঁর সুন্দর গুণবাচক নামগুলোর যথার্থতা প্রমাণ করাও এর অন্যতম কারণ। যেমন: বান্দা গুনাহ করার পর যখন লজ্জিত হয়ে তাওবা করে, তখন তাঁর 'মহান মার্জনাকারী, পরম ক্ষমাশীল, তাওবা কবুলকারী, পরম সহনশীল' প্রভৃতি গুণবাচক নামের যথার্থতা প্রমাণিত হয়। আর যারা গুনাহ করার পর লজ্জিত হয় না; বরং গুনাহের ওপর অটল থাকে, তাদের ক্ষেত্রে তাঁর গুণবাচক নাম 'ন্যায়পরায়ণ, প্রতিশোধ গ্রহণকারী, শক্ত পাকড়াওকারী' ইত্যাদির যথার্থতা প্রমাণিত হয়।
আল্লাহ তাআলা গুনাহ সৃষ্টি করেছেন, যেন বান্দাকে প্রভুর পূর্ণতা, বান্দার অপূর্ণতা ও প্রভুর প্রতি বান্দার মুখাপেক্ষিতা দেখাতে পারেন। প্রদর্শন করতে পারেন তাঁর স্বতন্ত্র ক্ষমতা ও মর্যাদা, স্বতন্ত্র ক্ষমাগুণ ও দয়া, তাঁর ন্যায়পরায়ণতা, দোষ গোপন করার মহানুভবতা ও গুনাহ মুছে দেওয়ার মতো মহান সব গুণ। যেন বোঝাতে পারেন যে, তাঁর রহম ও দয়া বান্দার প্রতি তাঁর একান্ত করুণা; আমলের বিনিময় নয়। তিনি যদি বান্দাকে রহমতের চাদরে বেষ্টন করে না নেন, তখন তার ধ্বংস অনিবার্য।
মোট কথা, গুনাহ সৃষ্টি করার পেছনে আল্লাহ তাআলার উপর্যুক্ত হিকমতসহ আরও অনেক হিকমত রয়েছে। তবে তিনি গুনাহ যেমন সৃষ্টি করেছেন, তেমনই সবার জন্য তাওবার পথ উন্মুক্ত করে রেখেছেন, যেন এর মাধ্যমে বান্দা তাঁর রহমতের উপযোগী হতে পারে।১১০
সুলাইমান আত-তাইমি রহ. বলেন, 'কোনো ব্যক্তি যখন গুনাহ করে, তখন সে গুনাহের লাঞ্ছনা বহন করে সকালে উপনীত হয়।'
তাওবাকারী ভাই আমার, وَإِنِ امْرُؤُ لَمْ يَصْفُ اللَّهُ قَلْبُهُ *** لَفِي وَحْشَةٍ مِنْ كُلِّ نَظْرَةِ نَاظِرٍ وَإِنِ امْرُؤٌ لَمْ يَرْتَحِلْ بِبِضَاعَةٍ *** إِلَى دَارِهِ الْأُخْرَى فَلَيْسَ بِتَاجِرٍ وَإِنِ امْرُؤُ ابْتَاعَ دُنْيَا بِدِيْنِهِ *** لَمُنْقَلِبُ مِنْهَا بِصَفْقَةِ خَاسِرٍ
'যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নিজের মনকে একনিষ্ঠ করেনি, কৃপাদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়ে সে বিষণ্ণতায় ভোগে। আখিরাতপানে সওদা হাতে যে আজও রওনা করেনি, নিঃসন্দেহে তার ব্যবসা সফল হতে পারে না। কেউ যদি দ্বীনের বিনিময়ে খরিদ করে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া, এ লেনদেনে তার প্রাপ্তি থাকবে শুধুই নির্মম লোকসান।'১১১
গুনাহ করার পর তাওবা করা অসুস্থ ব্যক্তির ওষুধ সেবন করার মতো। অনেক গুনাহ-আক্রান্ত রোগী তাওবার ওষুধ সেবন করে সুস্থ হয়ে গিয়েছে। ১১২
গুনাহের প্রভাব খুবই খারাপ। বাহ্যিক দৃষ্টিতে গুনাহের মাঝে যে মিষ্টতা ও স্বাদ পরিলক্ষিত হয়, অভ্যন্তরীণ তিক্ততা তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি। তা ছাড়া গুনাহের বোঝা বহন করা অবস্থায় মৃত্যু এসে গেলে তো আর রক্ষা নেই। তাই গুনাহ হয়ে গেলে সাথে সাথে তাওবা করে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। মনে রাখতে হবে, মৃত্যু কাউকে বলে কয়ে আসে না।
ভাই, জীবনের অন্তিম মুহূর্তে তাওবা করে নেওয়ার মিথ্যে আশায় বসে থেকো না। কেননা, প্রতিটা গুনাহ একেকটা আঘাত। কোনো কোনো আঘাত তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটায়। ১১৩
অনেক সময় একটি মৃদু আঘাতই মৃত্যুর ঘাঁটি পার করিয়ে দেয়। একটি স্বাভাবিক পদস্খলন ধ্বংসের কারণ হয়ে যেতে পারে। অনেক ছোট জখম এমন আছে, যেগুলো ভালো করার কোনো উপায় থাকে না। তাই প্রতিটা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে হবে। একান্ত কোনো গুনাহ হয়ে গেলে সাথে সাথে লজ্জিত হয়ে তাওবা করে নিতে হবে। কারণ প্রতিটা গুনাহ মারাত্মক। তোমার জানা নেই, কোন গুনাহ তোমার সর্বনাশ করে ছাড়বে।
হাসান বসরি রহ. যখন كَأَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَهَا لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا عَشِيَّةً أَوْ ضُحَاهَا (যেদিন তা তারা দেখবে, মনে করবে তারা যেন এক সকাল অথবা এক সন্ধ্যা ছাড়া অবস্থান করেনি। ১১৪)-এ আয়াতটি পড়তেন, তখন বলতেন, 'একটি সকাল কিংবা একটি বিকালও গুনাহের ওপর অটল থাকা বনি আদমের জন্য উচিত নয়। '১১৫
টিকাঃ
১০৩. আল-ফাওয়ায়িদ: ২৪৮
১০৪. আল-জাওয়াবুল কাফি : ৯৯
১০৫. আল-জাওয়াবুল কাফি : ৯৬
১০৬. আল-ফাওয়ায়িদ: ২৪৮
১০৭. সিফাতুস সাফওয়াহ : ২/২২৬
১০৮. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ৪৩০
১০৯. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/২৪৪
১১০. আল-ফাওয়ায়িদ : ৮৮
১১১. আল-ফাওয়ায়িদ: ৮৮
১১২. আল-ফাওয়ায়িদ: ৮৮
১১৩. আল-ফাওয়ায়িদ: ৫৪
১১৪. সুরা আন-নাজিআত: ৪৬
১১৫. সাজারাতুজ জাহাব: ১/১৬৫
📄 গুনাহগারের প্রতি উপদেশ
জনৈক ব্যক্তি তার কৃত গুনাহের কারণে খুব মর্মপীড়ায় ভুগছিল। সে ইবনে মাসউদ রা.-এর নিকট এসে বলল, 'আমার জন্য তাওবার সুযোগ আছে কি না?' ইবনে মাসউদ রা. মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে দেখতে পেলেন, লোকটির দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে। তখন তিনি বললেন, 'জান্নাতের দরজা আটটি। সেগুলো কখনো খুলে দেওয়া হয়; আর কখনো বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু তাওবার দরজা এর ব্যতিক্রম। এটি সবার জন্য সব সময় উন্মুক্ত থাকে। সেখানে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করা হয়েছে, যেন দরজাটি কখনো বন্ধ হয়ে না যায়। সুতরাং সৎকর্ম করে যাও এবং কক্ষনো নিরাশ হয়ো না।'১১৬
প্রিয় ভাই, আমরা সবাই পাপী, গুনাহগার। গুনাহ করার ক্ষেত্রে আমরা সকলেই সমান। কিন্তু যে ব্যক্তি তাওবা করে এবং লজ্জিত হয়ে আল্লাহর সামনে অশ্রু বিসর্জন দেয়, সে আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।
আবু কিলাবা রহ. বর্ণনা করেন, একদা আবু দারদা রা. এক ব্যক্তির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যে সদ্য একটি গুনাহের কাজ করেছে। সেই গুনাহের কারণে লোকেরা তাকে তিরস্কার করছিল। আবু দারদা রা. বললেন, 'এই লোকটা যদি কোনো কূপে পড়ে যেত, তোমরা কি তাকে তুলে নিতে না?' তারা বলল, 'অবশ্যই তুলে নিতাম।' তিনি বললেন, 'তাহলে তোমাদের ভাইকে তিরস্কার করো না। বরং এই গুনাহ থেকে তোমাদের বিরত রাখার ওপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো।' লোকেরা বলল, 'আমরা কি তাকে ঘৃণাও করতে পারব না?' তিনি বললেন, 'এখানে তার কর্মটিই ঘৃণার যোগ্য। যদি সে কাজটি ছেড়ে দেয়, তখন সে তোমাদেরই ভাই।'১১৭
এক ব্যক্তি খুবই ভালো ছিল। কিন্তু একদিন সে পাপকর্ম করে বসল। তখন বন্ধুরা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তাকে একঘরে করে দিল। ইবরাহিম নাখয়ি রহ. যখন খবরটি শুনলেন, তখন লোকটির বন্ধুদের ডেকে বললেন, 'যাও, তার কাছে গিয়ে তাকে বুকে টেনে নাও। তাকে এভাবে একঘরে করে দেওয়া তোমাদের মোটেই উচিত হয়নি।'১১৮
ভালোবাসা ও কল্যাণকামিতার দাবি হলো, কোনো মুসলমান যদি গুনাহ করে ফেলে, তখন তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না। এতে তার গুনাহ আরও বেড়ে যায়। বরং তাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে গুনাহের পথ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। অবশ্য ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার সর্বোত্তম বহিঃপ্রকাশ হলো, পদস্খলনের পূর্বে হাত ধরে ফেলা অর্থাৎ পাপকর্মে জড়িয়ে পড়ার পূর্বেই তা থেকে বিরত রাখা।
রাজা বিন হাইওয়াহ রহ. দুজন ব্যক্তিকে নসিহত করার সময় বলেন, 'যে আমল নিয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করাকে পছন্দ করো, তা আজই করে ফেলো। এবং যে আমল নিয়ে তাঁর সামনে উপস্থিত হওয়াকে অপছন্দ করো, তা আজই ছেড়ে দাও।'১১৯
সেসব লোক কত ভাগ্যবান, যারা যথাসময়ে ভুলভ্রান্তি ও স্খলন শুধরিয়ে নেয়! অশ্রুর বান তাদেরকে নিষিদ্ধ বস্তুর কাছে পৌঁছতে দেয় না। জিহ্বাকে নীরবতার বন্দিদশায় আবদ্ধ করে রাখে, যাতে ধ্বংসকারী কোনো শব্দ মুখ দিয়ে বের না হয়। তাদের হাত অবৈধ বিষয়সমূহ থেকে কুঁকড়ে থাকে আল্লাহর ভয়ে। আত্মপর্যালোচনার প্যাঁচে আবদ্ধ থাকে তাদের পা। চলতে পারে না পাপের পথে। তারা গভীর রাতে দুহাত তুলে আল্লাহকে ডাকে। দিনের বেলায় নিষিদ্ধ স্বাদ ও সুখ বিসর্জন দিয়ে দিন কাটায়। এভাবে মৃত্যু পর্যন্ত অনেক সুখ ও স্বাদের দেখা তারা পায় না। কিন্তু মৃত্যুর পরেই শুরু হয় তাদের সুখের জীবন।
প্রিয় ভাই, ইবাদতে ইখলাস বা নিষ্ঠা ছাড়া মুক্তির আশা এবং ধ্বংসকারী পাপকর্মের মাঝে ডুবে থেকে নাজাতের স্বপ্ন দেখা বাদ দাও।
কবি বলেন:
هَمَّرْ عَسَى أَنْ يَنْفَعَ التَّشْمِيْرُ *** وَانْظُرْ بِفِكْرِكَ مَا إِلَيْهِ تَصِيرُ طَوَّلْتَ آمَالاً تَكْنِفُهَا الهَوَى *** ونَسِيْتَ أَنَّ العُمُرَ مِنْكَ قَصِيرُ قَدْ أَفْصَحَتْ دُنْيَاكَ عَنْ غَدَرَاتِهَا *** وَأَنَّى مَشِيْبُكَ وَالمَشِيبُ نَذِيرُ دَارُ لَهَوْتَ بِهَا زَهْوًا مُتَمَتِّعًا *** تَرْجُو المُقَامَ بِهَا وَأَنْتَ تَسِيرُ
'অন্তিম সফরের জন্য প্রস্তুতি নাও, এটাই তোমার জন্য কল্যাণকর। ভেবে দেখো, তোমার আসল ঠিকানা কোথায়! প্রবৃত্তির প্রশ্রয়ে তোমার স্বপ্নগুলোর সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। বয়স যে ফুরিয়ে এসেছে, তা তুমি বেমালুম ভুলে বসেছ। আর কত স্বপ্ন দেখবে? প্রিয় পৃথিবী তো স্পষ্ট করে দিয়েছে তার বিশ্বাসঘাতকতা। সতর্কবাণী নিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে এসেছে বার্ধক্য। যার সৌন্দর্যে তুমি মজে ছিলে, স্বপ্ন দেখেছ যেখানে স্থায়ী আবাস গড়ার, সেখান থেকে বিদায় নেওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে।'১২০
প্রিয় ভাই আমার, আজ বাজার বসেছে। মূল্য তোমার হাতে উপস্থিত। সামানপাতিও সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে। তাই আজই সওদা করে নাও। নিজের নফসের বিনিময়ে সস্তায় কিনে নাও আখিরাতের সামান। কারণ, আগামীকাল বাজার বসবে না। তখন আখিরাতের সামান ক্রয় করার কোনোই সুযোগ থাকবে না। না কম মূল্যে, না বেশি মূল্যে। সেদিনটি হবে পরস্পর ঠকানোর দিন, যেদিন অত্যাচারী ব্যক্তি অনুশোচনায় নিজের হাত কামড়াবে।
প্রিয় ভাই, কবি বলেন :
إِذَا أَنْتَ لَمْ تَرْحَلْ بِزَادٍ مِنَ التَّقَى *** وَأَبْصَرْتَ يَوْمَ الحَشْرِ مَنْ قَدْ تَزَوَّدَا لَا تَكُوْنَ كَمِثْلِهِ *** وَأَنَّكَ لَمْ تُرْصِدْ كَمَا كَانَ أَرْصَدًا نَدِمْتَ عَلَى أَنْ لَا
'তাকওয়ার পাথেয় না নিয়েই যদি পৃথিবী থেকে বিদায় নাও, হাশরের দিন দেখতে পাবে যারা পাথেয় সংগ্রহ করেছে, তাদের মর্যাদা। তখন অনুতাপে দগ্ধ হতে হবে তোমার—কেন তুমি ওদের মতো হওনি? আখিরাতের জন্য তারা যেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিল, তুমি কেন ওভাবে নাওনি?'১২১
টিকাঃ
১১৬. আল-ইহইয়া: ৪/১৬
১১৭. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/৬৮০, হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১/২২৫
১১৮. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/৮৯
১১৯. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/২১৪
১২০. আত-তাবসিরাহ: ১/১২০
১২১. আল-ফাওয়ায়িদ: ৬৪
📄 জীবনের যত্ন কীভাবে নেব?
জীবন ক্রমেই নিঃশেষ হয়ে যায়। জীবন এমন কতগুলো সময়ের সমষ্টি, যা একবার চলে গেলে দ্বিতীয়বার আসে না। জীবন থেকে একটি দিন অতিবাহিত হয়ে গেলে সেই দিন আর কখনো আসে না। একটি দিনের পর একটি রাত, একটি রাতের পর আরেকটি নতুন দিন... এভাবেই জীবনের একেকটি দিন ও একেকটি রাত অতিবাহিত হয়ে যায়। বিগত দিন-রাত আর ফিরে আসে না কখনো।
ইয়াজিদ রাক্কাশি রহ. নিজেকে উদ্দেশ্য করে বলতেন, 'আফসোস তোমার জন্য হে ইয়াজিদ! তোমার মৃত্যুর পর তোমার নামাজগুলো কে পড়ে দেবে? রোজাগুলো কে রেখে দেবে? মৃত্যুর পর তোমার প্রতি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য কে চেষ্টা করবে? কেন তুমি মৃত্যুর আগে আগে নিজেই সব করে নিচ্ছ না?' অতঃপর লোকদের উদ্দেশ্য করে বলতেন, 'জীবনের সিংহভাগ সময় তো অতিবাহিত করে এসেছ। এখন বাকি জীবনটা কেঁদে কেঁদে কাটাও। মৃত্যু তোমাদের খুঁজে ফিরছে। কবর তোমাদের ঘর হওয়ার জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছে। মাটি তোমাদের বিছানা হওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। মাটির নিচের পোকামাকড় তোমাদের সঙ্গী হওয়ার জন্য কিলবিল করছে। এসবের পরে কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতা তো আছেই সবার জন্য। এবার তোমরাই বলো, বাকি জীবনটা আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে কাটাতে হবে, নাকি আগের মতো সেই হাসি-উল্লাসে কাটালেও চলবে?'১২২
মাইমুন বিন মিহরান রহ. তার মজলিসের বৃদ্ধ লোকদের দিকে তাকিয়ে বলেন, 'হে বৃদ্ধ সম্প্রদায়, ফসল যখন পেকে যায়, তখন কীসের অপেক্ষায় থাকেন? তারা উত্তর দিলেন, 'কেটে ফেলার অপেক্ষায় থাকি।' অতঃপর যুবকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, 'হে যুবকসমাজ, অনেক সময় ফসল পাকার পূর্বেই তা নষ্ট হয়ে যায়।'
প্রিয় ভাই আমার, জলদি মৃত্যুর প্রস্তুতি নাও। জীবন ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে। কবি বলেন:
وَمَا مَاضِي الشَّبَابِ بِمُسْتَرَدَّ *** وَلَا يَوْمٌ يَمُرَ بِمُسْتَعَادِ 'বিগত যৌবন প্রত্যাবর্তন করবে না আর, চলে যাওয়া দিন পুনরায় আসবে না ফিরে।'
ইমাম শাফিয়ি রহ. বলেন :
دَعْ عَنكَ مَا قَدْ فَاتَ فِي زَمَنِ الصِّبَا *** وَاذْكُرْ ذُنُوبَكَ وَابْكِهَا يَا مُذْنِبُ واخْشَ مُنَاقَشَةَ الحِسَابِ فإِنَّهُ *** لَا بُدَّ مُحْصٍ مَا جَنَيْتَ وَيُكْتَبُ لم ينسه الملكان حين نسيتهُ *** بَلْ أثبتاه وأنت لا تلعب 'ওহে পাপাচারী, শৈশবের হারানো দিনগুলোর কথা ভুলে যাও, আজ অশ্রু ঝরাও অতীতের কৃত গুনাহের অনুশোচনায়। শেষ বিচারের হিসাবকে ভয় করো, নিঃশেষে তোমার সব অপরাধ উঠে আসবে সেথায়। তুমি ভুলে গেলেও কাঁধের ফেরেশতাদ্বয় তা মনে রেখেছেন। যখন তুমি হেলায় ফেলায় গা ভাসিয়েছিলে, তখনই তারা টুকে নিয়েছেন হিসাবের খাতায়।'১২৩
ভাই, পরিণাম ভেবে যারা কাজ করে, তারাই বুদ্ধিমান। স্থূলবুদ্ধির লোকেরা বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে কাজ করে। এই কাজের পরিণাম কী হতে পারে, তা ভেবে দেখে না। চোরের সামনে কেবল মালপ্রাপ্তির সুখানুভূতি ভাসে, এরপরে যে তার হাত কেটে ফেলা হবে, তা তার মাথায় আসে না। অকর্মণ্য লোক কেবল বিশ্রাম ও অবসরের সুখকে দেখতে পায়; এর ফলস্বরূপ সে যে ইলম অর্জন ও সম্পদ উপার্জন থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে, তা সে ভেবে দেখে না। সে ভেবে দেখে না, যখন সে বড় হবে, তখন মানুষ তাকে বড় জ্ঞানী মনে করে বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞেস করবে; তখন তাদের উত্তর দিতে না পেরে তাকে লাঞ্ছিত হতে হবে। অকর্মণ্য লোক একসময় বেকার থাকার ওপর আফসোস করে মাথার চুল ছিঁড়ে, কিন্তু তখন তার করার কিছুই থাকে না।
সুতরাং যদি তুমি বুদ্ধিমান হও, তাহলে দুনিয়ার ক্ষণিকের সুখকে প্রাধান্য দিয়ে আখিরাতের স্থায়ী সুখ থেকে বঞ্চিত হয়ে যেয়ো না। দুনিয়ার কষ্টের ওপর ধৈর্য ধরো, পরিণামে স্থায়ী শান্তি অর্জিত হবে। ১২৪
আব্দুল আজিজ বিন আবু রাওয়াদ রহ. বলেন, 'যে ব্যক্তি তিনটি বিষয় থেকে উপদেশ গ্রহণ না করে, দুনিয়ার আর কোনো কিছু থেকে সে উপদেশ গ্রহণ করতে পারবে না। বিষয় তিনটি হলো: ইসলাম, কুরআন ও বার্ধক্য।'১২৫
আবু আব্দুল্লাহ আল-কারশি রহ. বলেন, 'খোঁড়া ও ভগ্ন পা নিয়ে আল্লাহর দিকে অগ্রসর হও। সুস্থতার অপেক্ষায় থেকো না। কেননা, সুস্থতার অপেক্ষায় বসে থাকাও এক প্রকার বেকারত্ব।'১২৬
জনৈק সালাফ বলেন, 'অধিকাংশ মানুষ বার্ধক্যে উপনীত হওয়ার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করে। দুনিয়াতে বৃদ্ধলোকের সংখ্যালঘিষ্ঠতা এ কথার প্রমাণ।' সুতরাং হে ভাই, সব সময় শঙ্কিত থাকো, প্রস্তুত থাকো; যেন পাথেয় ছাড়া পাড়ি দিতে না হয় কবরের পথে।
হে ভাই, প্রতিটা কদম হিসাব করে ফেলো, যেমনটি মুহাম্মাদ বিন ফুজাইল রহ. করতেন। তিনি বলেন, 'চল্লিশ বছর পর্যন্ত একটা কদমও আমি আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে ফেলিনি।’১২৭
খারিজা বিন মুসআব রহ. বলেন, 'আমি চব্বিশ বছর যাবৎ আব্দুল্লাহ বিন আওফ রহ.-এর সুহবতে ছিলাম। আমার জানামতে, ওই সময়ে তাঁর কোনো গুনাহ ফেরেশতাদের লিখতে হয়নি।'১২৮
প্রিয় ভাই, আজ সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা!?
আমাদের দিনগুলো আপন গতিতে বিরামহীনভাবে চলে যাচ্ছে। সময় যত গড়াচ্ছে, আমাদের হায়াতও তত কমে আসছে। অথচ আমরা এখনো গাফিলতির চাদর জড়িয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছি। তাওবা করার কথা ভাবনাতেই আনছি না। মিথ্যে আশার ধূসর মরীচিকার পেছনে ছুটে চলেছি নিরন্তর। গতকাল যে অবস্থা ছিল, আজকের অবস্থাও ঠিক তাই। অথচ আবু সুলাইমান আদ-দারানি রহ. বলেন, 'যার আজকের দিন হুবহু গতকালের মতো (আমলে কোনো উন্নতি হয়নি), সে চরম ক্ষতিগ্রস্ত।'
যথার্থই বলেছেন তিনি। সে গতকাল মৃত্যুর যতটুকু নিকটে ছিল, আজ আরও কাছে চলে এসেছে। তাই আজ মৃত্যুর প্রস্তুতি বেশি নেওয়ার কথা। কিন্তু পূর্বের মতোই সে অলস বসে আছে। সময়ের সদ্ব্যবহার করছে না। সে ক্ষতিগ্রস্ত নয়, তো কে?
আতা আস-সুলাইমি রহ.-এর ইবাদতের আধিক্য দেখে স্বজনরা তাঁকে বলল, 'এভাবে ইবাদত করলে তো স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটবে?' তিনি বললেন, 'তোমরা কি আমাকে ইবাদত কমিয়ে দিতে বলছ? অথচ মৃত্যু ক্রমেই আমার কাছে চলে আসছে, কবর আমাকে বরণ করে নেওয়ার জন্য তৈরি হয়ে আছে, জাহান্নাম হা করে দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে, আর আমি জানি না, আল্লাহ তাআলা আমার ব্যাপারে কী ফয়সলা করবেন?' ১২৯
সাইদ বিন জুবাইর রহ. বলেন, 'মুসলমানের জীবনের প্রতিটি দিন তার জন্য গনিমতস্বরূপ। প্রতিদিন নামাজ, দুআ ও যথাসম্ভব জিকিরের মাধ্যমে তার সদ্ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয়।'১৩০
মাইমুন বিন মিহরান রহ. বলেন, 'দুনিয়াতে কেবল দুই ব্যক্তির জন্য কল্যাণ রয়েছে : ১. যে ব্যক্তি তাওবা করে। ২. যে ব্যক্তি প্রতিদিন নেক আমলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। ১৩১
ইবনুল জাওজি রহ. বলেন, 'জাহান্নামে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করে দেখলাম, গুনাহই মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যায়। অতঃপর গুনাহ সম্পর্কে গবেষণা করলাম। দেখলাম, স্বাদ, আসক্তি, উপভোেগ ইত্যাদি বিষয়ের মাঝেই গুনাহ লুকিয়ে আছে। আরেকটু গভীরে গিয়ে দেখতে পেলাম, গুনাহের স্বাদ, সুখ, উপভোগ—আসলে সবই ধোঁকা। ভয়ংকর প্রতারণা। বাইরে সুখ ও স্বাদের প্রলেপ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভেতরে নোংরা ও তিক্ততায় ভরা। বাইরে সুখের আবরণ দেখে মানুষ তাতে প্রবেশ করে, কিন্তু বের হয় অসহনীয় তিক্ত স্বাদ নিয়ে। সুতরাং কোনো বুদ্ধিমান এমন নোংরা ও বিস্বাদ বস্তুর দ্বারা জাহান্নামের মতো শান্তির স্থান কী করে বেছে নিতে পারে? স্বীকার করছি, কিছু সুখ ও মজাও অবশ্য আছে গুনাহের মধ্যে, কিন্তু তা এত বেশি নয় যে, তার বিনিময়ে আখিরাতের স্থায়ী শান্তি বিক্রি করে দেওয়া যায়। '১৩২
কবি বলেন : وَلا خَيْرَ فِي الدُّنْيَا لِمَنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ *** مِنَ اللَّهِ فِي دَارِ الْمُقَامِ نَصِيبُ فَإِنْ تُعْجِبِ الدُّنْيَا رِجَالاً فَإِنَّهُ *** مَتَاعٌ قَلِيلٌ وَالزَّوَالُ قَرِيبُ 'আখিরাতে যে পাবে না চিরসুখের জান্নাত, তার দুনিয়াদারিতে কল্যাণের ছিটেফোঁটাও নেই। দুনিয়া কিছু লোকের চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেয়, অথচ তা ক্ষণিকের উপভোগ মাত্র, অচিরেই যা ধ্বংস হবে।'
রিয়াহ আল-কাইস রহ. বলেন, 'আমি চল্লিশের কয়েকটি বেশি গুনাহ করেছি এবং প্রতিটি গুনাহের জন্য এক লক্ষ বার করে ইসতিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করেছি।'১৩৩
সালাফের গুনাহ হাতে গণনা করা যেত, তবুও তাদের কেমন ভয় ছিল। আর আমাদের গুনাহ অগণিত, কিন্তু তা নিয়ে আমাদের কোনো চিন্তাই নেই! সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা!?
আবু ইসহাক কারশি রহ. বলেন, 'আমার ভাই মক্কা থেকে আমাকে চিঠি লিখলেন, “ভাই আমার, জীবনের সিংহভাগ তুমি দুনিয়ার জন্য ব্যয় করেছ। জীবনের সামান্য অংশ এখন বাকি আছে। অন্তত সেটাকে আখিরাতের জন্য ব্যয় করো।”'১৩৪
সারয়ি রহ. বলেন, 'হে যুবক সম্প্রদায়, আমার মতো বুড়ো হয়ে যাওয়ার পূর্বেই আখিরাতের জন্য সম্বল জোগাড় করে নাও। এ বয়সে এলে আমার মতো দুর্বল ও আমল করতে অক্ষম হয়ে পড়বে।' অথচ সে সময় আমলের ময়দানে যুবকদের হারিয়ে দিতেন তিনি।
আলা বিন জিয়াদ রহ. বলতেন, 'তোমাদের মৃত্যু উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা কিছুক্ষণের জন্য তোমাদের সময় দিয়েছেন, যেন তোমরা ভালো হয়ে যেতে পারো। সুতরাং তাঁর ইবাদত-বন্দেগি করে বাকি জীবনটা কাটাও।'
সত্যিই তো, আল্লাহ তাআলা আমাদের সুযোগ দিচ্ছেন। তিনি আমাদের জীবনকে যথেষ্ট দীর্ঘ করেছেন এবং তাওবার দরজা উন্মুক্ত করে রেখেছেন। আর কী চাই আমাদের? এত সুযোগ পেয়েও যদি তার সদ্ব্যবহার না করি, তাওবা করে পুণ্যের পথে ফিরে না আসি এবং উত্তম আমল না করি, তখন আমাদের চেয়ে কপালপোড়া আর কে হতে পারে?
কবি বলেন: تَصِلُ الذُّنُوبَ إِلَى الذُّنُوبِ وَتَرْتَجِي *** دَرْجَ الجِنَانِ وَطِيْبَ عَيْشِ العَابِدِ وَنَسِيتَ أَنَّ اللَّهَ أَخْرَجَ آدَمَ *** مِنْهَا إِلَى الدُّنْيَا بِذَنْبٍ وَاحِدِ 'গুনাহের পর গুনাহ করে যাচ্ছ, অথচ অলীক স্বপ্ন দেখছ জান্নাতের সুউচ্চ ইমারত ও ইবাদতগুজারদের সুখময় জীবনের। তুমি যে ভুলে গেছ, আদম আ.-কে জান্নাত থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল সামান্য একটি ভুলের কারণেই!'১৩৫
আমরা কত অদ্ভুত! কত বোকা! নিজেদের জাগতিক প্রয়োজনসমূহ আল্লাহর কাছে চাই, কিন্তু গুনাহসমূহ ক্ষমা চাইতে ভুলে যাই। কয়েকটি বছর নিয়ে গঠিত পার্থিব জীবনকে উন্নত করতে কত চেষ্টা-মেহনত করি, কিন্তু চিরস্থায়ী আখিরাতের জীবনের ব্যাপারে উদাসীন থাকি। জনৈক ব্যক্তি আবু হাজিম রহ.-কে বলল, 'আমাকে নসিহত করুন।' তিনি বললেন, 'যে কর্মের ওপর তোমার মৃত্যু আসাকে তুমি গনিমত মনে করো, সেটাকে আকড়ে ধরো; আর যে কর্মের ওপর মৃত্যু আসাকে বিপদ মনে করো, সেটা ছেড়ে দাও।'১৩৬
হাসান রহ. আমাদের অবস্থার বর্ণনা দিয়ে বলেন, 'মুমিন বান্দা শঙ্কিত অবস্থায় সকালে উপনীত হয়। তার ভেতর দুটি গুনাহের ভয় কাজ করে। একটি বিগত সময়ের গুনাহ, যার ব্যাপারে সে জানে না যে, তার শাস্তি কী হতে পারে। দ্বিতীয়টি সামনের সময়ের গুনাহ, অর্থাৎ ভবিষ্যতে তার আমলনামায় কী কী গুনাহ লিপিবদ্ধ হবে, সে ব্যাপারে শঙ্কিত থাকে।'
তিনি বলেন, 'বনি আদম তিনটা আফসোস নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়। ১. যা অর্জন করেছিল, তা পুরোপুরি উপভোগ করতে পারেনি। ২. যা যা আশা করেছিল, তার সবগুলো পূরণ হয়নি। ৩. আখিরাতের জন্য উত্তম পাথেয় সংগ্রহ করতে পারেনি।'১৩৭
ইবনুল জাওজি রহ. বলেন, 'দুনিয়াটা একটি যুদ্ধক্ষেত্র। সকল মানুষ দাঁড়িয়ে আছে যুদ্ধের সারিতে। শয়তান হলো এ যুদ্ধের প্রতিপক্ষ। সে মানুষদের লক্ষ্য করে একের পর এক ছুড়ে যায় আসক্তির তির। সুখ ও স্বাদের তরবারি দিয়ে আঘাত করে যায় নিরন্তর। যারা আসক্তি ও স্বাদে মজে যায়, তারা হয় ভূপাতিত, পরাজিত। কিন্তু মুত্তাকিরা যুদ্ধে অটল ও অবিচল থাকে। আসক্তি ও স্বাদের আঘাত তাদের ঘায়েল করতে পারে না। অবশ্য মাঝেমধ্যে আহত হয়ে পড়ে এবং চিকিৎসা করে ভালো হয়ে যায়। কিন্তু কখনো চূড়ান্ত পরাজয় বরণ করে না। প্রকৃত মুত্তাকি মুজাহিদগণ এ যুদ্ধে সামান্য আহত হওয়াকেও মর্যাদাহানি মনে করে, তাই খুব সতর্ক হয়ে যুদ্ধ করে তারা।'১৩৮
প্রিয় ভাই, এ দুনিয়ায় কোন বিষয়কে তুমি বেশি গুরুত্ব দাও? তোমার আশা-আকাঙ্ক্ষা কী? তুচ্ছ দুনিয়া অর্জন, নাকি আখিরাতে জান্নাতলাভ-যার প্রশস্ততা সপ্ত আসমান ও সপ্ত জমিনের সমান? কোনো বিষয়ের প্রতি তুমি যে গুরুত্ব দাও, তা কি দুনিয়ার জন্য, না আখিরাতের জন্য? সব বিষয় খুব গভীরভাবে পর্যালোচনা করো। অতঃপর যা তোমার জন্য উপকারী নয়, তা বর্জন করো। অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকা আল্লাহর সাথে সম্পর্ককে বাধাগ্রস্ত করে। জুনাইদ বিন মুহাম্মাদ রহ. বলেন, 'আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার আলামত হলো, সে অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। '১৩৯
সুতরাং হে ভাই, দুনিয়ার বাহ্যিক সৌন্দর্য ও চাকচিক্য যেন তোমাকে আখিরাতের কাজ থেকে ব্যস্ত করে রাখতে না পারে।
কবি বলেন: نَسِيرُ إِلَى الْآجَالِ فِي كُلِّ لَحْظَةٍ *** وأَعْمَارُنَا تُطْوَى وَهُنَّ مَراحل وَلَمْ أَرَ مِثْلَ الْمَوْتِ حَقًّا كَأَنَّهُ ** إِذَا مَا تَخَطَتْهُ الْأَمَانِيُّ بَاطِلُ ومَا أَقْبَحَ التَّفْرِيطُ فِي زَمَنِ الصَّبًا *** فَكَيْفَ وَالشَّيْبُ لِلرَّأْسِ شَاغِلُ؟ فارحل من الدنيا بزادٍ من التقى *** فَعُمْرُكَ أَيامُ وهُنَّ قلائل
'প্রতি মুহূর্তে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি মৃত্যুর দিকে। পেছনে মিলিয়ে যাচ্ছে দিনগুলো-যেন জীবনসফরের একেকটি মারহালা। মৃত্যুর মতো মহাসত্য আর নেই, অগণিত স্বপ্ন-আশার ভিড়ে তাও আমাদের নিকট অবাস্তব! যৌবনকালে উদাসীন থাকা কী জঘন্য! শুভ্রতা যখন চুল-দাড়িতে জেঁকে বসবে তখন কী হবে? দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পূর্বেই সংগ্রহ করে নাও তাকওয়ার পাথেয়। কারণ, জীবন তোমার অল্প কটি দিনের সমষ্টি!'
টিকাঃ
১২২. আত-তাজকিরাহ, কুরতুবি: ১০
১২৩. দিওয়ানুল ইমামিশ শাফিয়ি : ৪৭
১২৪. সাইদুল খাতির: ৬১৩
১২৫. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২২৯
১২৬. ওয়াফায়াতুল আ'ইয়ান: ৪/৩০৬
১২৭. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ৯৩০
১২৮. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/৩৭
১২৯. আজ-জুহদ, বাইহাকি : ২২৮
১৩০. আস-সিয়ার: ৪/৩২৬
১৩১. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৪/৮৩
১৩২. সাইদুল খাতির: ৫৫৩
১৩৩. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/৩৬৮
১৩৪. আজ-জুহদ, বাইহাকি: ১৭৫
১৩৫. আল-জাওয়াবুল কাফি : ১৪২
১৩৬. আল-ইহইয়া: ৪/২৮
১৩৭. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৬/২৭২
১৩৮. সাইদুল খাতির: ২৫৭
১৩৯. সিফাতুস সাফওয়াহ : ২/৪১৭
📄 মানুষ কখন সৃষ্টির সেরা জীব?
'মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব'—কথাটি ব্যাপকভাবে সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বরং মানুষ যখন আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করে, তাঁর বিধিনিষেধ মেনে চলে, তাঁর সন্তুষ্টিকে নিজের প্রবৃত্তির চাহিদার ওপর প্রাধান্য দেয়-তখনই সে সৃষ্টির সেরা জীব। আর যদি আল্লাহর কাছ থেকে দূরে থাকে এবং তাঁর বিধিনিষেধের থোড়াই কেয়ার করে স্বীয় প্রবৃত্তির ইচ্ছা অনুযায়ী জীবনযাপন করে, তখন সে হয় সৃষ্টির সর্বনিকৃষ্ট জীব। কারণ, মানুষ যখন আল্লাহর নিকটে থাকে এবং তাঁর ইচ্ছাকে নিজের মনের ইচ্ছার ওপর অগ্রাধিকার দেয়, তখন তার কলব, বিবেক ও ইমান প্রবৃত্তি ও শয়তানের ওপর হুকুম চালায়। তার হিদায়াত গোমরাহির ওপর বিজয়ী থাকে। আর যদি আল্লাহর কাছ থেকে দূরে থাকে এবং নিজের ইচ্ছাকে তাঁর বিধানের ওপর প্রাধান্য দেয়, তখন তার বিবেক, কলব ও হিদায়াতের ওপর প্রবৃত্তি ও শয়তান রাজত্ব করে। ১৪০
মাসরুক বিন আজদা' রহ. বলেন, 'প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য এমন কিছু মজলিস থাকা চাই, যেখানে সে একাকী বসে নিজের গুনাহ স্মরণ করবে এবং আল্লাহর কাছে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে। '১৪১
ইমাম ইবনে আবি জি'ব রহ.-সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি এত বেশি ইবাদত করতেন যে, তাকে যদি বলা হতো, 'আগামীকাল কিয়ামত সংঘটিত হবে', তখন অতিরিক্ত করার মতো কোনো ইবাদত থাকত না। ১৪২
মানুষের বিষয়টা সত্যিই খুব আশ্চর্যজনক। অনেক সময় মনে হয়, তাদের বুদ্ধিসুদ্ধি সব হাওয়া হয়ে গিয়েছে। কারণ, যখন তারা নসিহত শ্রবণ করে এবং তাদের সামনে আখিরাতের আলোচনা করা হয়, তখন নসিহতকারীর সত্যায়ন করে এবং নিজেদের অবহেলা ও শিথিলতার ওপর অনুশোচনা করে চোখের পানি ঝরায়। সামনে শুধরে যাওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে। কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই প্রতিজ্ঞার বিপরীত কাজ করা শুরু করে দেয়।
তাকে যখন বলা হয়, 'যার ব্যাপারে তুমি প্রতিজ্ঞা করেছ, সে বিষয়ে তোমার কি কোনো সন্দেহ আছে?' তখন সে বলে, 'কী যে বলো, সন্দেহ থাকবে কেন?' তখন তাকে বলা হয়, 'তাহলে সে অনুযায়ী আমল করছ না কেন?।' তখন সে আমল করার পাক্কা নিয়ত করে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার আগের মতো হয়ে যায়। আমল থেকে অব্যাহতি নেয়। অনেক সময় তো নিষিদ্ধ সুখ ও স্বাদের দিকে ধাবিত হয়ে যায়। অথচ সে জানে, এটা নিষিদ্ধ। ১৪৩
আবু দারদা রা. বলেন, 'পরিপূর্ণ তাকওয়া হলো, বান্দা পরমাণুসম গুনাহের ব্যাপারেও আল্লাহকে ভয় করা।'১৪৪
প্রিয় তাওবাকারী ভাই, গুনাহ থেকে খুব বেঁচে থাকো। কারণ, গুনাহের পরিণাম খুবই ভয়াবহ। গুনাহ তার কর্তাকে সব সময় অধঃপতনের মধ্যে রাখে। অনেক সময় তীব্র দারিদ্র্য, দুনিয়া না পাওয়ার আফসোস ও যারা দুনিয়া অর্জন করেছে, তাদের প্রতি হিংসার যন্ত্রণা গুনাহের কারণে বৃদ্ধি পায়।
সুতরাং হে ভাই, সব সময় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো। বিশেষ করে নির্জনতা ও একাকিত্বের সময় গুনাহ করা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, নির্জন মুহূর্তে গুনাহ করা মানে আল্লাহর চোখে চোখ রেখে তাঁর নাফরমানি করা। এর কারণে বান্দার প্রতি আল্লাহ খুব রুষ্ট হন। পক্ষান্তরে, নির্জন অবস্থায় নিজেকে গুনাহ থেকে পরিচ্ছন্ন রাখলে আল্লাহ তাআলা প্রকাশ্যে পরিচ্ছন্ন থাকার তাওফিক দেন।
গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার পাশাপাশি সব সময় তাওবাও করতে হবে। তাওবা গুনাহের শাস্তিকে রহিত করে দেয়। আল্লাহ তাআলা সাধারণত বান্দার গুনাহসমূহকে গোপন রাখেন। শাস্তি কার্যকর করতেও বিলম্ব করেন। এতে ধোঁকা খেয়ো না। বরং সর্বদা কেঁদেকেটে তাঁর নিকট গুনাহের ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে। ১৪৫
টিকাঃ
১৪০. আল-ফাওয়ায়িদ: ২২৫
১৪১. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/২৬
১৪২. তাজকিরাতুল হুফফাজ: ১/১৯১
১৪৩. সাইদুল খাতির: ৪৬১
১৪৪. জামিউল উলুম : ১৯২
১৪৫. সাইদুল খাতির: ২৬৪