📄 গুনাহ পরিত্যাগ করার উপকারিতা
গুনাহ পরিত্যাগ করার মাঝে অনেক কল্যাণ ও উপকারিতা রয়েছে। এখানে তার বেশ কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।
গুনাহ ও পাপকর্ম পরিত্যাগ করার ফলে সমাজে মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষের জান-মাল ও ইজ্জত-আবরু সুরক্ষিত থাকে। পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহমর্মিতা অটুট থাকে। জীবনোপকরণ উত্তম ও পবিত্র হয়। শরীর ও মনের প্রশান্তি অর্জিত হয়। অন্তরে সাহসিকতা ও সদিচ্ছার সঞ্চার হয়। হৃদয় প্রশস্ত হয়। অসাধু ও পাপিষ্ঠ লোকদের দৌরাত্ম্য থেকে নিরাপত্তা লাভ করা যায়। পেরেশানি ও দুশ্চিন্তা কমে যায়। নাফরমানির অন্ধকার কলবের নুর ছাপিয়ে যাওয়াকে প্রতিহত করে। রিজিকে প্রশস্ততা আসে। অভাবনীয়ভাবে রিজিকের সুব্যবস্থা হয়। ফাসিক ও নাফরমান ব্যক্তিরা যে মনঃকষ্টে ভোগে, গুনাহ ও নাফরমানি ছেড়ে দিলে সে কষ্ট দূর হয়ে যায়। ইবাদত-বন্দেগি সহজ হয়ে যায়। জ্ঞান-বুদ্ধি প্রখর হয়। মানুষের প্রশংসা ও দুআ অর্জিত হয়।
যে ব্যক্তি গুনাহ থেকে বিরত থাকে, লোকজন তাকে সমীহ করে। তাদের অন্তরে তার প্রতি সম্মান ও মর্যাদাবোধ সৃষ্টি হয়। সে কষ্টাক্রান্ত হলে কিংবা তার প্রতি জুলুম করা হলে লোকজন তার পাশে দাঁড়ায়। গিবতকারীর গিবত থেকে তাকে রক্ষা করে। আল্লাহর দরবারে তার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। তার দুআ দ্রুত কবুল করা হয়। আল্লাহ ও তার মাঝে অপরিচিতি ভাব দূর হয়ে ঘনিষ্ঠ এক সম্পর্ক কায়িম হয়। ফেরেশতাগণ তার কাছাকাছি থাকেন। মনুষ্য ও জিন শয়তান তার থেকে দূরে সরে যায়। মানুষজন তার সেবা ও প্রয়োজন পূরণে স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসে। ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিয়ে তার উপদেশ শোনে।
যে ব্যক্তি গুনাহ ছেড়ে দেয়, তার মৃত্যুভয় থাকে না; বরং মৃত্যুতে সে আনন্দিত হয়। কারণ, মৃত্যুই আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের একমাত্র মাধ্যম। দুনিয়া তার চোখে খুব তুচ্ছ ও নগণ্য এবং আখিরাত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দেখায়। সে মনঃপ্রাণে একটা বিষয়ই কামনা করে- আখিরাতের চূড়ান্ত সফলতা।
যে ব্যক্তি গুনাহ ছেড়ে দেয়, সে ইবাদত ও ইমানের সুমিষ্ট স্বাদ আস্বাদন করে। আরশ বহনকারী ও প্রদক্ষিণকারী ফেরেশতাগণ তার জন্য দুআ করেন। লেখক ফেরেশতাগণও তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন এবং দুআ করেন। তার জ্ঞান, বুদ্ধি, ইমান ও মারিফাতে (আল্লাহর পরিচয়) উন্নতি সাধন হয়। সর্বোপরি আল্লাহর ভালোবাসা, বিশেষ মনোযোগ ও সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। এ সবই গুনাহ ও নাফরমানি ত্যাগ করার কল্যাণে দুনিয়াতে অর্জিত হয়।
আখিরাতেও রয়েছে গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার বিশেষ পুরস্কার। সুতরাং গুনাহ পরিত্যাগকারী ব্যক্তি যখন মৃত্যুবরণ করবে, তখন রহমতের ফেরেশতাগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে জান্নাতের শুভ সংবাদ নিয়ে তার কাছে আগমন করবেন। তারা তাকে অভয়বাণী শোনাবেন, 'আজ তোমার কোনো ভয় নেই, কোনো পেরেশানি নেই।' অতঃপর তাকে পৃথিবী নামক সংকীর্ণ কারাপ্রকোষ্ঠ থেকে ফুলে ফলে সুশোভিত জান্নাতের এক বিশাল কাননে নিয়ে যাবেন। কিয়ামত পর্যন্ত সেখানে প্রভুর নিয়ামতরাজির মাঝে অবগাহন করতে থাকবে সে।
অতঃপর যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন প্রচণ্ড গরমে মানুষের শরীর থেকে ঘামের ফোয়ারা ছুটবে। বিন্দু বিন্দু ঘাম পরিণত হবে বিশাল সাগরে। সেই সাগরে তারা অসহায়ের মতো হাবুডুবু খাবে। গুনাহ পরিত্যাগকারী ব্যক্তি তখন আরশের ছায়াতলে ভিআইপি লাউঞ্জে অবস্থান করবে। চারপাশে মৌ মৌ করবে জান্নাতি খুশবো। বেহেশতি শীতল সমীরণ শরীর-মনে সুখের পরশ বুলিয়ে প্রবাহিত হবে একটু পরপর। অতঃপর যখন সকল মানুষকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত করা হবে, তখন তার ডানহাতে আমলনামা দেওয়া হবে। মুত্তাকি ও সফলকাম দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে সেও চলে যাবে শান্তি ও স্বপ্নের সবুজ জান্নাতে।২০
কবি বলেন: يا أيها الغافل جد في الرحيل *** وأنت في لهو وزاد قليل لو كنت تدري ما تلاقي غدًا *** لذبت من فيض البكاء والعويل
فأخلص التوبة تحظى بها *** فما بقي في العمر إلا القليل
ولا تنم إن كنت ذا غبطة *** فإن قدامك نوم طويل
'ওহে গাফিল, অন্তিম যাত্রার টিকিট কাটা হয়ে গেছে, অথচ তুমি খেল-তামাশার মাঝে বিভোর এবং (তোমার) পাথেয় অপ্রতুল! যদি তুমি অবগত থাকতে আগামীকাল কী বিপদের সম্মুখীন হবে, তবে তুমি কান্না আর আর্তনাদের বানে তা ভাসিয়ে দিতে। তুমি খাঁটি মনে তাওবা করে সফলতার পথ বেছে নাও। কারণ, জীবনকাল তো অল্পই বাকি আছে। নিদ্রা পরিহার করে ঈর্ষণীয় জীবন ধারণ করো। যেহেতু তোমার সামনে রয়েছে (বিশ্রামের জন্য) এক বিশাল জীবন।'২১
আয়িশা রা. বলেন, 'গুনাহ কমিয়ে দাও। কারণ, কম গুনাহ নিয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করার চেয়ে সুখকর আর কিছু নেই।'
মাওরিক আল-আজলি রহ. বলেন, 'মুমিনের উদাহরণ সেই ব্যক্তি, যে অথই সাগরের বুকে শুকনো কাঠের ওপর বসে “ইয়া রব, ইয়া রব” বলে আল্লাহকে ডাকে, যেন তিনি তাকে সেখান থেকে বাঁচিয়ে আনেন।'২২
আল্লাহর আজাবের ভয় ও তাঁর নিয়ামতের আশায় প্রত্যেক মুমিনকে ওই ব্যক্তির মতোই হতে হবে।
টিকাঃ
২০. আল-ফাওয়ায়িদ : ১৯৮ (ঈষৎ সংক্ষেপিত)
২১. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ১৯
২২. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/২৩৫, সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/২৫০
📄 সালাফের আল্লাহভীতি
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন মানবকুলের সর্দার। তবুও তিনি রাত্রি জাগরণ করে আল্লাহর ইবাদত করতেন। এতে অনেক সময় তাঁর পা মুবারক ফুলে যেত।
আবু বকর রা. এত বেশি কাঁদতেন যে, এর ফলে বুকের ভেতর ব্যথা অনুভব করতেন।
উমর রা.-এর দুই কপোলে অশ্রুধারার দাগ বসে গিয়েছিল।
উসমান রা. এক রাকআতেই পুরো কুরআন শেষ করতেন।
আলি রা. রাতে মিহরাবে বসে এত বেশি ক্রন্দন করতেন যে, তাঁর দাড়ি বেয়ে টপটপ করে অশ্রু ঝরত। এবং বলতেন, 'হে পৃথিবী, আমার বিকল্প খুঁজো, তোমার সাথে আমার সম্পর্ক নেই।'
সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব রহ. মসজিদে খিদমত করতেন। এ সুবাদে দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর্যন্ত কোনো নামাজের জামাআত তাঁর ছোটেনি। ২৩
প্রিয় ভাই, তিনটি জায়গায় তোমার অন্তরকে তালাশ করো: কুরআন শ্রবণ করার সময়, জিকিরের মজলিসে ও একাকিত্বের সময়। এ তিন জায়গায় যদি তোমার অন্তরকে পাওয়া না যায়, তাহলে আল্লাহর কাছে অন্তর ভিক্ষা চাও। কারণ, তোমার মাঝে অন্তর নেই। ২৪
আল্লাহ ও আখিরাতের পথে তোমার সফর সুনিশ্চিত। যাত্রাপথ থেকে ফলক উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন তুমি চলমান কাফেলার সদস্য। তাই পূর্ণ মনোযোগ সফরের ওপরেই নিবদ্ধ রাখো। গন্তব্যে পৌঁছার পূর্বেই নিজের ও আমলের ভুলত্রুটি ও ভ্রষ্টতা শুধরে নাও। ২৫
কবি বলেন: اتخذ طاعة الإله سبيلا *** تجد الفوز بالجنان وتنجو واترك الإثم والفواحش طرا *** يؤتك الله ما تروم وترجو
'প্রভুর আনুগত্যকে জীবনপদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করো। তবেই তুমি নাজাত পেয়ে জান্নাতলাভে ধন্য হবে। পাপাচার ও অশ্লীলতা ত্যাগ করো। আল্লাহ তাআলা তোমার সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করবেন।'২৬
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন, 'আমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় আত্মপ্রবঞ্চনা হলো: ১. আল্লাহর ক্ষমার আশা নিয়ে নির্লজ্জের মতো পাপাচারে ডুবে থাকা; ২. ইবাদত ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের আকাঙ্ক্ষা করা; ৩. জাহান্নামের বীজ বপন করে জান্নাতের ফল লাভের স্বপ্ন দেখা; ৪ নাফরমানি করে অনুগতদের আবাস কামনা করা; আমল না করে প্রতিদানের আশা রাখা এবং ৫. আল্লাহর প্রতি ভরসা করার ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করা।'
কবি বলেন:
ترجو النجاة ولم تسلك مسالكها *** إن السفينة لا تجري على اليبس 'তুমি মুক্তির আশা করো, অথচ সে পথে চলো না! জেনে রেখো, নৌকা কখনো স্থলপথে চলে না।'২৭
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন, 'যে ব্যক্তি জান্নাতের স্বপ্ন দেখে, তার উচিত প্রবৃত্তির অনুগমন থেকে বিরত থাকা। যে ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে মুক্তি কামনা করে, সে যেন পাপকর্ম থেকে বেঁচে থাকে। অথচ আমরা হাঁটি তার উল্টো পথে। তাওবার পথ পেছনে ফেলে ভিন্নপথে মোড় ঘুরিয়ে দিই। আমাদের অবস্থা ঠিক তেমনই যেমনটা হাসান রহ. এক ব্যক্তির প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন। লোকটি হাসান রহ.-কে প্রশ্ন করল, “আপনার সকাল কেমন হলো?” তিনি উত্তরে বললেন, “ভালো।” লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করল, 'কেমন আছেন?” প্রত্যুত্তরে হাসান রহ. হেসে দিলেন এবং বললেন, “আমার অবস্থা জানতে চাও? আচ্ছা বলো, এমন লোকদের ব্যাপারে তোমার কী ধারণা, যারা সমুদ্রপথে সফরে বের হয়েছে। সমুদ্রের ঠিক মাঝখানে গিয়ে তাদের নৌকাটি ভেঙে গেছে। ফলে প্রত্যেক যাত্রী নৌকার একটি করে কাঠ আঁকড়ে ধরে আছে—তাদের অবস্থা কেমন?” লোকটি উত্তর দিল, “তাদের অবস্থা তো খুবই খারাপ।” হাসান রহ. বললেন, “আমার অবস্থা তাদের চেয়েও খারাপ।”'২৮
কবি বলেন:
عيني هلا تبكيان على ذنبي *** تناثر عمري من يدي ولا أدري أنت في غفلة وقلبك ساه *** ذهب العمر والذنوب كما هي
'কেন নিজের গুনাহের জন্য চক্ষু কাঁদে না। একদিন একদিন করে অজান্তেই জীবনটা হাতছাড়া হয়ে গেছে। তুমি যে রয়েছ গাফিলতির মাঝে এবং মন হয়েছে অচেতন। জীবন ফুরিয়ে এল, কিন্তু গুনাহ সে আগের মতোই রয়ে গেছে।'২৯
ভাই, পৃথিবীতে ওই লোকেরা সবচেয়ে বড় বোকা, যারা দুনিয়ার ক্ষণিকের জীবনকে আখিরাতের স্থায়ী জীবনের ওপর প্রাধান্য দেয়। অধিকাংশ সময় তাদের শেষ পরিণতি খুবই মন্দ হয়। অনেক রাজা-বাদশা ও ধনকুবেরদের ব্যাপারে আমরা শুনেছি। তারা প্রবৃত্তির ইচ্ছা অনুযায়ী টাকা-পয়সা উড়িয়ে বেড়াত এবং হালাল-হারামের তোয়াক্কা না করে জীবনযাপন করত। কিন্তু মৃত্যুর সময় তারা এমন লজ্জা ও তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে, যার সামনে তাদের পুরো জীবনের সুখ ও উপভোগ কিছুই নয়। এটা যদি তারা জানত, তাহলে সুখ-উপভোগের চেয়ে কষ্ট-পেরেশানিতে থাকাকেই তারা পছন্দ করত। কেনই বা করবে না? কষ্ট-পেরেশানির পরেই তো স্থায়ী সুখ আসে।
স্বভাবগতভাবেই দুনিয়া মানুষের প্রিয়-এতে কোনো সন্দেহ নেই। দুনিয়া অন্বেষণকারী ও দুনিয়ার আসক্তিকে যারা প্রাধান্য দেয়, তাদের প্রতিও আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি শুধু এতটুকু বলছি যে, দুনিয়া অর্জন করার সময় একটু খেয়াল রেখো এবং দুনিয়া অর্জনের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানো; যাতে খারাপ পরিণামের সম্মুখীন হতে না হয়। কেননা, সেই স্বাদের কোনো মূল্য নেই, যার পরে রয়েছে জাহান্নামের অসহনীয় আগুন।
এক ব্যক্তিকে বলা হলো, 'তুমি কিছুদিন আমাদের রাজত্ব করো, অতঃপর আমরা তোমাকে হত্যা করব।' এখন সে ব্যক্তি যদি এতে সম্মত হয়, তাকে কি বুদ্ধিমান বলা যাবে? নাকি বোকার সর্দার বলে আখ্যায়িত করা হবে? ২৯
কারণ, বুদ্ধিমান তো সেই লোক, যে পরকালীন চূড়ান্ত শান্তির আশায় এক-দু বছর কষ্ট সহ্য করাকে বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেয়।৩০
হাসান রহ. বলেন, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, সেই ব্যক্তি জাহান্নামকে পূর্ণরূপে বিশ্বাস করেনি, যার জন্য দুনিয়াটা প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও সংকীর্ণ হয়ে যায়নি। আর জাহান্নাম যদি এই দেয়ালের পেছনে চলে আসে, তখনও মুনাফিক ব্যক্তি তা বিশ্বাস করবে না, যতক্ষণ না আগুন তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।'
কবি বলেন: تصل الذنوب إلى الذنوب وترتجي *** درج الجنان لدى النعيم الخالد *** ملكوتها الأعلى بذنب واحد ولقد علمنا أخرج الأبوين من
'গুনাহের পর গুনাহ করে যাচ্ছ, অথচ স্বপ্ন দেখছ জান্নাতের সুউচ্চ ইমারতের! অথচ আমাদের সবার জানা-আমাদের আদি পিতামাতাকে সামান্য একটি অপরাধের কারণেই সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।'৩১
আমরা পৃথিবীতে বিচরণ করছি। এ জীবন একসময় শেষ হয়ে যাবে, তা যেন আমাদের মনেই নেই। কিন্তু হঠাৎ একদিন এসে যাবে আল্লাহর নির্দেশ। মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে হাজির হবেন মালাকুল মাওত। তাওবা না করে এবং আখিরাতের পাথেয় না নিয়েই পাড়ি জমাতে হবে চিরস্থায়ী জগতে।
হাসান বসরি রহ. বলেন, 'কিছু লোক আল্লাহর মাগফিরাতের আশায় আত্মপ্রবঞ্চনায় ভোগে। বলে, “অনেক সময় তো পড়ে আছে, কিছুদিন জীবনটাকে উপভোগ করে নিই, পরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেব... তিনি তো পরম ক্ষমাশীল।” কিন্তু একসময় তাওবা না করেই দুনিয়া থেকে চলে যায় তারা। তাদের কেউ কেউ দাবি করে, “আমি আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করি (তাই তিনি আমাকে ক্ষমা করে দেবেন)।” তাদের দাবি চরম মিথ্যাচার। কারণ, তারা যদি আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করত, তাহলে অবশ্যই উত্তম আমল করত।'৩২
টিকাঃ
২৩. সাইদুল খাতির: ১০৬
২৪. আল-ফাওয়ায়িদ: ১৯৫
২৫. উদ্দাতুস সাবিরিন: ৩৩৮
২৬. তাবাকাতুল হানাবিলা : ৪/১৭৭
২৭. তাজকিয়াতুন নুফুস : ১১৪
২৮. আল-ইহইয়া: ৪/১৯৭
২৯. মুকাশাফাতুল কুলুব: ৩৪
৩০. সাইদুল খাতির: ২৩৯
৩১. আল-জাওয়াবুল কাফি: ১৪২
৩২. আল-জাওয়াবুল কাফি: ৩
📄 সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের আলামত
ভাই আমার, বান্দার সৌভাগ্য ও স্বার্থকতার আলামত হলো-যখন তার ইলম বৃদ্ধি হয়, তখন তার মাঝে দয়া ও নম্রতা বেড়ে যায়; যখন আমলে উন্নতি হয়, তখন আল্লাহভীতি প্রবল হয়; যখন বয়স বাড়ে, তখন লোভ- লালসা কমে যায়; সম্পদে প্রবৃদ্ধি ঘটলে বদান্যতা ও উদারতার গুণ ব্যাপক হয়ে ওঠে; মান-ইজ্জত বৃদ্ধি পেলে মানুষের প্রতি নৈকট্য ও তাদের প্রয়োজন পূরণ করে দেওয়ার মানসিকতা দৃঢ় হয়।
দুর্ভাগ্য ও ব্যর্থতার আলামত হলো—ইলম বৃদ্ধি পেলে অহংকারী হয়ে ওঠে; আমল বৃদ্ধি পেলে অন্তরে গর্ববোধ সৃষ্টি হয় এবং অন্যান্য লোকের প্রতি অবজ্ঞাভাব আসে; নিজের ব্যাপারে আত্মতুষ্টি আসে; বয়স বাড়ার সাথে সাথে লোভ-লালসাও বেড়ে যায়; ধনসম্পদ যত বাড়ে, ততই কৃপণ হয়ে ওঠে; সম্মান ও মর্যাদায় প্রবৃদ্ধি ঘটলে চরম অহংকার ও আমিত্বের মাদকতায় মত্ত হয়।
ইলম, আমল, বয়স, ধনসম্পদ, মান-মর্যাদা-এ বিষয়গুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের পরীক্ষা করেন। সে পরীক্ষায় কেউ কৃতকার্য হয়; কেউ হয় অকৃতকার্য। ৫৬
ভেবে দেখো, তুমি কোথায়? কোন পথের ওপর তুমি দাঁড়িয়ে আছ? এখানে ইমাম মালিক রহ.-এর একটি নসিহত উল্লেখ করা সমীচীন মনে করছি। এক ব্যক্তিকে লক্ষ করে তিনি বলেন, 'যদি তুমি কোনো ইবাদত করার ইচ্ছে করো, তখন "অবসর সময়ে করব" ভেবে বসে থেকো না। কেননা, সামনে কী ঘটতে পারে, সে সম্পর্কে তোমার ধারণা নেই। আর যদি কোনো খারাপ কাজ করতে মন চায়, তখন না করার কোনো সুযোগ পেলে সাথে সাথে তা থেকে বিরত থাকো। হতে পারে, এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তোমাকে বিরত রাখছেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে মোটেই লজ্জাবোধ করবে না। কুরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেন : وَاللَّهُ لَا يَسْتَحْيِي مِنَ الْحَقِّ )আল্লাহ তাআলা সত্য প্রকাশে লজ্জাবোধ করেন না)। তোমার কাপড়-চোপড় পরিষ্কার রাখো। সেগুলোকে আল্লাহর নাফরমানি থেকে পরিচ্ছন্ন রাখো। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহে মনোযোগ দাও। তুচ্ছ ও গুরুত্বহীন বিষয় নিয়ে মাথা ঘামিও না। আল্লাহ তাআলা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ পছন্দ করেন এবং তুচ্ছ ও গুরুত্বহীন বিষয় পছন্দ করেন না। অধিক হারে কুরআন তিলাওয়াত করো। লক্ষ রাখবে, আল্লাহর জিকির ব্যতীত রাত বা দিনের কোনো ঘণ্টা যেন ব্যয় না হয়। নিজের স্বাধীনতা অন্যের হাতে তুলে দিয়ো না। নিজের সব কাজ স্বাধীনভাবে করবে। '৫৭
উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ. তাঁর এক খুতবায় বলেন, 'প্রত্যেক সফরের জন্য পাথেয় প্রয়োজন। সুতরাং তোমরা দুনিয়া থেকে আখিরাতের সফরের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করো। এমন হও, যেন তোমরা নিজ চোখে আল্লাহর প্রস্তুতকৃত শাস্তি ও পুরস্কার প্রত্যক্ষ করেছ; আর তোমরা পুরস্কার লাভের জন্য আগ্রহী আর শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য ভীত-সন্ত্রস্ত। তোমরা এমন হয়ে যাও—তোমাদের কামনা-বাসনা যেন অধিক না হয়। অন্যথায় তোমাদের অন্তর কঠোর হয়ে যাবে, তোমরা তোমাদের শত্রুর অনুগত হয়ে পড়বে। সে ব্যক্তির আশা-আকাঙ্ক্ষা বিস্তৃত করে কী লাভ, যার জানা নেই, সকালের পর তার জীবনে আর সন্ধ্যা আসবে কি না, অথবা আসবে কি না সন্ধ্যার পর তার জীবনের পরবর্তী সকাল? এ দুইয়ের মাঝে তার জন্য ওত পেতে বসে আছে মৃত্যু। সে কী করে আশ্বস্ত হতে পারে আল্লাহর আজাব ও কিয়ামত দিবসের ভয়াবহ অবস্থার ব্যাপারে? আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার আঘাতের একটি ক্ষতের চিকিৎসা করতে না করতে অন্য দিক থেকে আবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়, সে কীভাবে আশ্বস্ত হতে পারে?'৫৮
কবি বলেন:
نَمُوتُ ونَبْلَى غَيْرَ أَنَّ ذُنُوبَنَا *** إِذَا نَحْنُ مِتْنَا لَا تَمُوْتُ وَلَا تَبْلَى أَلَا رُبَّ عَيْنَيْنِ لَا تَنْفَعَانِهِ *** وَمَا تَنْفَعُ الْعَيْنَانِ مَنْ قَلْبُهِ أَعْمَى
'মৃত্যুর পর মাটিতে মিশে যাব আমরা, কিন্তু আমাদের গুনাহগুলো অক্ষয় থাকবে চিরকাল, আমাদের মৃত্যুর পরও! চোখ থেকেও সবার কাজে আসে না; যার হৃদয় অন্ধ, চোখ তার কী উপকারে আসবে?'
প্রিয় তাওবাকারী ভাই, নিজের নফস বা প্রবৃত্তির আসক্তি থেকে বেঁচে থাকো। মানুষের জীবনে যত বিপদ আসে, সবই প্রবৃত্তির আসক্তির ফল। প্রবৃত্তির সাথে সুসম্পর্ক রেখো না। কেননা, তাকে যে অসম্মানিত করে, সে সম্মানিত হয়; যে সম্মান করে, সে লাঞ্ছিত হয়। তাকে যে ভেঙে দেয় না, সে সুগঠিত হতে পারে না। আরাম পেতে হলে তাকে কষ্ট দিতে হয়। নিরাপদ থাকতে চাইলে তাকে ভীতি প্রদর্শন করতে হয়। আনন্দ পেতে চাইলে তাকে কষ্ট দিতে হয়। ৫৯
আবু বকর বিন আইয়াশ রহ. বলেন, 'আমি যখন যুবক ছিলাম, তখন জনৈক ব্যক্তি আমাকে বলল, “আখিরাতের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য দুনিয়াতে থাকতেই যথাসাধ্য চেষ্টা করো। কারণ, আখিরাতে বন্দীদের মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।”'৬০
তাওবাকারী ভাই আমার, তাওবার যে পথে তুমি হাঁটছ, তার ওপরই অটল থাকো। হোক তা কণ্টকাকীর্ণ। ইনশাআল্লাহ এই পথ জান্নাতের সবুজ প্রান্তরে গিয়ে শেষ হবে। তোমার প্রবৃত্তি ও শয়তান—দুজন মিলে তোমাকে পাপাচারের মসৃণ ও কুসুমাস্তীর্ণ পথের দিকে লালায়িত করবে। খবরদার! বিভ্রান্ত হবে না। তাওবার যে পথের ওপর তুমি আছ, তার ওপরই অটল থাকো। এ পথেই রয়েছে তোমার চূড়ান্ত সফলতা ও মুক্তি।
হাসান রহ. বলেন, 'হে আদম-সন্তান, কিয়ামতের দিন তোমার সব আমল স্বচক্ষে দেখতে পাবে। ভালো ও মন্দ—উভয় প্রকারের আমল পরিমাপ করা হবে। সুতরাং ছোট গুনাহকেও তুচ্ছ মনে কোরো না। সেই ছোট গুনাহটিই মিজানের (আমল পরিমাপের পাল্লা) ওপর ভারী হয়ে তোমার সর্বনাশের কারণ হতে পারে।'৬১
ভাই আমার, নফস বা প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ অনেক দীর্ঘ। আজীবন কাটিয়ে দিতে হয় কঠিন এ জিহাদের মাঠে। এর স্বাদও অনেক তিক্ত। পথ কণ্টকাকীর্ণ। তবুও তোমাকে নিরন্তর এ জিহাদ করে যেতে হবে। খবরদার! কক্ষনো ওই ব্যক্তির মতো হোয়ো না, যাকে ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. মিসকিন বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, 'বনি আদমের মধ্যে মিসকিন সেই ব্যক্তি, যার কাছে গুনাহ ত্যাগ করার চেয়ে পাহাড় উপড়ে ফেলা সহজ। '৬২
কবি বলেন: يَا مُدْمِنَ الذَّنْبِ أَمَا تَسْتَحْيِي *** وَاللَّهُ فِي الْخَلْوَةِ ثَانِيكًا غَرَّكَ مِنْ رَبِّكَ إِمْهَالُهُ *** وَسَتْرُهُ طُولَ مَسَاوِيحًا 'ওহে পাপাসক্ত, লজ্জা হয় না তোমার? আল্লাহ তো নির্জন স্থানেও তোমার সঙ্গে থাকেন। রব তোমাকে ছাড় দিচ্ছেন, লোকচক্ষুর আড়ালে রাখছেন তোমার অজস্র গুনাহ; তাই তুমি প্রবঞ্চনার শিকার!'৬৩
হাতিম আসম রহ. বলেন, 'যার অন্তরে চারটি আশঙ্কা নেই, সে প্রতারণার শিকার।
১. অঙ্গীকার নেওয়ার দিনের আশঙ্কা, যেদিন আল্লাহ বলেছিলেন, “এরা জান্নাতি, এতে আমার কিছু যায় আসে না; আর এরা জাহান্নামি, এতেও আমার কিছু যায় আসে না।” তার জানা নেই, সেদিন সে কোন দলে ছিল।
২. সেই দিনের আশঙ্কা, যেদিন তিনটি অন্ধকারের ভেতর তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, অতঃপর একজন ফেরেশতা তার সৌভাগ্যবান হওয়া অথবা দুর্ভাগা হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আর সে জানে না, তাকে কি সৌভাগ্যবান ঘোষণা করা হয়েছে, না দুর্ভাগাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
৩. পুনরুত্থিত হওয়ার সময়ের আশঙ্কা, যার ব্যাপারে তার জানা নেই যে, তখন সে কি আল্লাহর সন্তুষ্টির সুসংবাদ পাবে, না অসন্তুষ্টির দুঃসংবাদ পাবে।
৪. সেদিনের আশঙ্কা, যেদিন দলে দলে মানুষ কবর থেকে বের হবে। সে জানে না, দুই পথের কোনটি দিয়ে সে পথ চলবে। '৬৪
কবি বলেন:
لَا تَحْسَبَنَّ سُرُوْرًا دَائِمًا أَبَدًا *** مَنْ سَرَّهُ زَمَنْ سَاءَتْهُ أَزْمَانُ لَا تَغْتَرَ بِشَبَابٍ آئِفٍ خَضِلٍ *** فَكَمْ تَقَدَّمَ قَبْلَ الشَّيْبِ شُبَّانُ وَيَا أَخَا الشَّيْبِ لَوْ نَا صَحْتَ نَفْسَكَ * لَمْ يَكُنْ لِمِثْلِكَ فِي الَّلذَّاتِ إِمْعَانُ
'ক্ষণিকের আনন্দকে ভেবো না চিরস্থায়ী। একটি মুহূর্ত যাকে আনন্দ দেয়, কষ্ট দেয় তাকে অনেক মুহূর্ত। টসটসে যৌবন দেখে প্রবঞ্চিত হয়ো না; কত যুবক গত হয়েছে বার্ধক্যে উপনীত হওয়ার আগেই। ওহে বৃদ্ধ, যদি নিজের কল্যাণকামী হতে—এভাবে মজে থাকতে না দুনিয়ার সুখ ও বিলাসে।'
হাসান বিন ইয়াসার রহ. প্রায় সময় বলতেন, 'হে আদম-সন্তান, গতকাল তুমি ছিলে একটি শুক্রাণু, আগামীকাল তোমার পরিচয় একটি লাশ। এ দুইয়ের মাঝেই তোমার ক্রম-ক্ষয়মাণ অস্তিত্ব। এটার যত্ন নিতে হবে, গুনাহ ও পাপাচারের ভাইরাস যেন তাকে আক্রান্ত না করে। প্রকৃত সুস্থ ব্যক্তি সেই, যে পাপজ্বরে আক্রান্ত নয়। প্রকৃত পবিত্র সেই ব্যক্তি, যাকে গুনাহের কদর্য স্পর্শ করেনি। আখিরাতের স্মরণ ওই ব্যক্তির মাঝেই সবচেয়ে বেশি আছে, যে ব্যক্তি দুনিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত। আখিরাত থেকে সেই ব্যক্তি সব থেকে বেশি বিস্মৃত, যে সবচেয়ে বেশি দুনিয়াকে স্মরণ করে। প্রকৃত ইবাদতগুজার সেই ব্যক্তি, যে নিজেকে মন্দ কর্ম থেকে বিরত রাখে। প্রকৃত দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি সেই, যে হারামকে দেখতে পায়, ফলে তার কাছেও ঘেঁষে না। সেই প্রকৃত বুদ্ধিমান, যে কিয়ামত দিবস ও হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে বিস্মৃত নয়। '৬৫
টিকাঃ
৫৬. আল-ফাওয়ায়িদ: ২০১
৫৭. তারতিবুল মাদারিক: ১/১৮৭
৫৮. আল-ইহইয়া: ৪/৪৮৩
৫৯. আল-ফাওয়ায়িদ: ৯০
৬০. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/১৬৪
৬১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯/৩০৭
৬২. আস-সিয়ার: ১৩/১৫
৬৩. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ১৯৬
৬৪. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ৭১
৬৫. আজ-জুহদ, বাইহাকি : ৯৪
📄 গুনাহের কুফল
নিষিদ্ধ সুখ-যখন তা উপভোগ করা হয়, তখন মন্দত্ব ও কদর্যতামিশ্রিত সুখানুভূতি হয়। তা ছেড়ে দিতে কষ্ট লাগে। এখন তোমার মন যদি তোমাকে নিষিদ্ধ সুখের প্রতি আহ্বান করে, তখন চিন্তা করে দেখো, তা উপভোগ করে কদর্যতামিশ্রিত সুখানুভূতি তোমার জন্য উত্তম, নাকি ছেড়ে দিয়ে কষ্ট সহ্য করার পবিত্রানুভূতি উত্তম? দুইটার মাঝে পার্থক্য করে দেখো, কোনটাতে তোমার লাভ। ১০৩
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বলেন, 'পুণ্য মানুষের চেহারায় লাবণ্য সৃষ্টি করে, অন্তঃকরণ আলোকিত করে, রিজিকে প্রশস্ততা আনে এবং শরীরে শক্তি জোগায়। এ ছাড়াও পুণ্যের কারণে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা যায়। পক্ষান্তরে, পাপের কারণে চেহারার লাবণ্য ও সৌন্দর্য বিনষ্ট হয়, অন্তর অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, শরীর দুর্বল হয়ে যায় এবং রিজিকের বরকত চলে যায়। তা ছাড়া পাপী ব্যক্তিকে মানুষ অপছন্দ করতে শুরু করে। '১০৪
গুনাহের কুফল বর্ণনা করতে গিয়ে আবু দারদা রা. বলেন, 'প্রত্যেক ব্যক্তিকে মুমিনের হৃদয়ের অজ্ঞাত অভিশাপ থেকে বেঁচে থাকা চাই।' অতঃপর বললেন, 'তোমরা কি জানো, সেই অজ্ঞাত অভিশাপ কী? তা হলো, বান্দা যখন গুনাহ করে, তখন আল্লাহ তাআলা মুমিনের অন্তরে তার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে দেন, যা সে বুঝতেও পারে না।'১০৫
ইবাদত করা কষ্টের কাজ। তবে তার বিনিময়ে দীর্ঘস্থায়ী সুখ অর্জিত হয়। আর ইবাদত না করলে সাময়িক সুখ পাওয়া যায় বটে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী কষ্টের মাধ্যমে এ সুখের চড়া মূল্য দিতে হয়। এখন ইবাদত করতে যদি তোমার মন না চায়, তবে ভেবে দেখো-ইবাদত করার সাময়িক কষ্ট তোমার জন্য উত্তম, নাকি না করার সাময়িক সুখ উত্তম? দুইয়ের মাঝে তুলনা করে উত্তমকে অনুত্তমের ওপর প্রাধান্য দাও। কোনো কাজের মধ্যে যে কষ্ট আছে, তার প্রতি লক্ষ না করে সে কাজের ফলাফলে যে আনন্দ, স্বাদ ও সুখ রয়েছে, তার প্রতি নজর দাও। অনুরূপভাবে নিষিদ্ধ সুখ উপভোগ না করলে সাময়িক কষ্ট হবে ঠিকই, কিন্তু তা উপভোগ করলে পরিণামে তার চেয়ে ঢের বেশি কষ্ট পেতে হবে। দুই কষ্টের মাঝে তুলনা করে দেখো তো, কোনটা তোমার জন্য উত্তম?১০৬
প্রিয় ভাই, গুনাহের কুফলসমূহ নিয়ে চিন্তা করো; চিন্তা করো সে বিষণ্ণতা নিয়ে, যা গুনাহ করার কারণে তোমার অন্তরে অনুভূত হয়। অতঃপর পুণ্যের নুরের দিকে লক্ষ করো। লক্ষ করো, পুণ্য অন্তরকে কেমন আলোকিত করে তোলে। অতঃপর পাপ ছেড়ে দিয়ে পুণ্যের কাজে লেগে যাও।
আবুল হাসান মুজানি রহ. বলেন, 'গুনাহ তার পূর্বের গুনাহের শাস্তি এবং পুণ্য তার পূর্বের পুণ্যের পুরস্কার। '১০৭
গুনাহ নিঃসন্দেহে ক্ষতিকর। বিষ শরীরের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনই গুনাহ অন্তরের জন্য ক্ষতিকর। দুনিয়া ও আখিরাতের সকল খারাপ পরিণতির জন্য গুনাহই দায়ী।
এ জন্যই ইবনে আব্বাস রা. আমাদের গুনাহ থেকে ভয় প্রদর্শন করে বলেন, 'গুনাহের ভয়াবহ পরিণতি থেকে নিজেদের নিরাপদ ভেবো না। গুনাহের পরিণতি গুনাহের চেয়েও মারাত্মক।'১০৮
প্রিয় ভাই আমার, সালাফ কোন পথে ছিলেন, আমরা কোন পথে?
হিশাম বিন হাসসান রহ. বলেন, 'আমি আলা বিন জিয়াদ রহ.-এর সাথে পথ চলছিলাম। চলার পথে সতর্ক ছিলাম যেন কাদামাটি আমার পায়ে না লাগে। কিন্তু এক ব্যক্তির সাথে আমার ধাক্কা লাগলে আমার পা কাদামাটিতে প্রবিষ্ট হয়ে যায়। তাই আমি পানিতে পা ডুবিয়ে তা ধুয়ে নিলাম। যখন আলা বিন জিয়াদ রহ.-এর দরজার কাছে পৌঁছলাম, তখন তিনি বললেন, “দেখেছ হিশাম, আজ তোমার সাথে কী হলো? মুসলমানদের অবস্থাও ঠিক তোমার মতো হওয়া চাই। তারা গুনাহ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করবে, তবে কখনো যদি তা করে ফেলে, তখন সাথে সাথে (তাওবার মাধ্যমে) তা ধুয়ে ফেলবে।””১০৯
বান্দা যখন গুনাহ করে, তখন প্রভুর অবাধ্যতা কিংবা তাঁর নিষেধাজ্ঞার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুল প্রদর্শন করা তার উদ্দেশ্য থাকে না। কিন্তু প্রবৃত্তি ও শয়তানের কুমন্ত্রণা ও আল্লাহর ক্ষমাগুণের প্রতি অতি নির্ভরতা তাকে গুনাহ করতে প্ররোচিত করে। এটা বান্দার পক্ষ থেকে গুনাহ সংঘটিত হওয়ার কারণ।
বান্দা থেকে গুনাহ প্রকাশ করার ক্ষেত্রে আল্লাহর উদ্দেশ্য হলো—তাঁর বিধান বাস্তবায়ন করা এবং প্রভুত্বের উচ্চতা, দাসত্বের নিম্নতা ও তাঁর প্রতি বান্দার পূর্ণ মুখাপেক্ষিতা প্রমাণ করা। এ ছাড়াও তাঁর সুন্দর গুণবাচক নামগুলোর যথার্থতা প্রমাণ করাও এর অন্যতম কারণ। যেমন: বান্দা গুনাহ করার পর যখন লজ্জিত হয়ে তাওবা করে, তখন তাঁর 'মহান মার্জনাকারী, পরম ক্ষমাশীল, তাওবা কবুলকারী, পরম সহনশীল' প্রভৃতি গুণবাচক নামের যথার্থতা প্রমাণিত হয়। আর যারা গুনাহ করার পর লজ্জিত হয় না; বরং গুনাহের ওপর অটল থাকে, তাদের ক্ষেত্রে তাঁর গুণবাচক নাম 'ন্যায়পরায়ণ, প্রতিশোধ গ্রহণকারী, শক্ত পাকড়াওকারী' ইত্যাদির যথার্থতা প্রমাণিত হয়।
আল্লাহ তাআলা গুনাহ সৃষ্টি করেছেন, যেন বান্দাকে প্রভুর পূর্ণতা, বান্দার অপূর্ণতা ও প্রভুর প্রতি বান্দার মুখাপেক্ষিতা দেখাতে পারেন। প্রদর্শন করতে পারেন তাঁর স্বতন্ত্র ক্ষমতা ও মর্যাদা, স্বতন্ত্র ক্ষমাগুণ ও দয়া, তাঁর ন্যায়পরায়ণতা, দোষ গোপন করার মহানুভবতা ও গুনাহ মুছে দেওয়ার মতো মহান সব গুণ। যেন বোঝাতে পারেন যে, তাঁর রহম ও দয়া বান্দার প্রতি তাঁর একান্ত করুণা; আমলের বিনিময় নয়। তিনি যদি বান্দাকে রহমতের চাদরে বেষ্টন করে না নেন, তখন তার ধ্বংস অনিবার্য।
মোট কথা, গুনাহ সৃষ্টি করার পেছনে আল্লাহ তাআলার উপর্যুক্ত হিকমতসহ আরও অনেক হিকমত রয়েছে। তবে তিনি গুনাহ যেমন সৃষ্টি করেছেন, তেমনই সবার জন্য তাওবার পথ উন্মুক্ত করে রেখেছেন, যেন এর মাধ্যমে বান্দা তাঁর রহমতের উপযোগী হতে পারে।১১০
সুলাইমান আত-তাইমি রহ. বলেন, 'কোনো ব্যক্তি যখন গুনাহ করে, তখন সে গুনাহের লাঞ্ছনা বহন করে সকালে উপনীত হয়।'
তাওবাকারী ভাই আমার, وَإِنِ امْرُؤُ لَمْ يَصْفُ اللَّهُ قَلْبُهُ *** لَفِي وَحْشَةٍ مِنْ كُلِّ نَظْرَةِ نَاظِرٍ وَإِنِ امْرُؤٌ لَمْ يَرْتَحِلْ بِبِضَاعَةٍ *** إِلَى دَارِهِ الْأُخْرَى فَلَيْسَ بِتَاجِرٍ وَإِنِ امْرُؤُ ابْتَاعَ دُنْيَا بِدِيْنِهِ *** لَمُنْقَلِبُ مِنْهَا بِصَفْقَةِ خَاسِرٍ
'যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নিজের মনকে একনিষ্ঠ করেনি, কৃপাদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়ে সে বিষণ্ণতায় ভোগে। আখিরাতপানে সওদা হাতে যে আজও রওনা করেনি, নিঃসন্দেহে তার ব্যবসা সফল হতে পারে না। কেউ যদি দ্বীনের বিনিময়ে খরিদ করে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া, এ লেনদেনে তার প্রাপ্তি থাকবে শুধুই নির্মম লোকসান।'১১১
গুনাহ করার পর তাওবা করা অসুস্থ ব্যক্তির ওষুধ সেবন করার মতো। অনেক গুনাহ-আক্রান্ত রোগী তাওবার ওষুধ সেবন করে সুস্থ হয়ে গিয়েছে। ১১২
গুনাহের প্রভাব খুবই খারাপ। বাহ্যিক দৃষ্টিতে গুনাহের মাঝে যে মিষ্টতা ও স্বাদ পরিলক্ষিত হয়, অভ্যন্তরীণ তিক্ততা তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি। তা ছাড়া গুনাহের বোঝা বহন করা অবস্থায় মৃত্যু এসে গেলে তো আর রক্ষা নেই। তাই গুনাহ হয়ে গেলে সাথে সাথে তাওবা করে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। মনে রাখতে হবে, মৃত্যু কাউকে বলে কয়ে আসে না।
ভাই, জীবনের অন্তিম মুহূর্তে তাওবা করে নেওয়ার মিথ্যে আশায় বসে থেকো না। কেননা, প্রতিটা গুনাহ একেকটা আঘাত। কোনো কোনো আঘাত তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটায়। ১১৩
অনেক সময় একটি মৃদু আঘাতই মৃত্যুর ঘাঁটি পার করিয়ে দেয়। একটি স্বাভাবিক পদস্খলন ধ্বংসের কারণ হয়ে যেতে পারে। অনেক ছোট জখম এমন আছে, যেগুলো ভালো করার কোনো উপায় থাকে না। তাই প্রতিটা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে হবে। একান্ত কোনো গুনাহ হয়ে গেলে সাথে সাথে লজ্জিত হয়ে তাওবা করে নিতে হবে। কারণ প্রতিটা গুনাহ মারাত্মক। তোমার জানা নেই, কোন গুনাহ তোমার সর্বনাশ করে ছাড়বে।
হাসান বসরি রহ. যখন كَأَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَهَا لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا عَشِيَّةً أَوْ ضُحَاهَا (যেদিন তা তারা দেখবে, মনে করবে তারা যেন এক সকাল অথবা এক সন্ধ্যা ছাড়া অবস্থান করেনি। ১১৪)-এ আয়াতটি পড়তেন, তখন বলতেন, 'একটি সকাল কিংবা একটি বিকালও গুনাহের ওপর অটল থাকা বনি আদমের জন্য উচিত নয়। '১১৫
টিকাঃ
১০৩. আল-ফাওয়ায়িদ: ২৪৮
১০৪. আল-জাওয়াবুল কাফি : ৯৯
১০৫. আল-জাওয়াবুল কাফি : ৯৬
১০৬. আল-ফাওয়ায়িদ: ২৪৮
১০৭. সিফাতুস সাফওয়াহ : ২/২২৬
১০৮. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ৪৩০
১০৯. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/২৪৪
১১০. আল-ফাওয়ায়িদ : ৮৮
১১১. আল-ফাওয়ায়িদ: ৮৮
১১২. আল-ফাওয়ায়িদ: ৮৮
১১৩. আল-ফাওয়ায়িদ: ৫৪
১১৪. সুরা আন-নাজিআত: ৪৬
১১৫. সাজারাতুজ জাহাব: ১/১৬৫