📄 ভূমিকা
الحمد لله غافر الذنب وقابل التوب شديد العقاب، والصلاة والسلام على من بعثه رحمة للعالمين
সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি একদিকে গুনাহ ক্ষমাকারী ও তাওবা কবুলকারী; অপরদিকে কঠিন আজাব প্রদানকারী। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক সে মহামানবের প্রতি, যাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করা হয়েছে।
এবার আমরা পাঠকসমীপে أين نحن من هؤلاء (সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা!) সিরিজের অষ্টম বই উপস্থাপন করতে যাচ্ছি। (আরবিতে) এটির নামকরণ করা হয়েছে الفجر الصادق। এটি (ঊষার) সেই আলো, যা মুসলমানদের জীবনের মধ্যগগনে সৌভাগ্যের বার্তা নিয়ে উদিত হয়েছে; সেই আলো, যা গুনাহের অন্ধকার দূরীভূত করতে এবং মানবহৃদয়ে পুণ্যের আলো জ্বালাতে উদিত হয়েছে।
গোটা মানবসমাজ আজ পাপে নিমজ্জিত। দিকভ্রান্তের মতো গন্তব্যহীন পথে ছুটছে সবাই। তাদের মুক্তির পথ একটাই—তাওবার পথ। এ ঊষার আলো মানবসমাজকে সেই পথের দিশা দেবে। তাদের শুনিয়ে দেবে মহান আল্লাহর সেই ঘোষণা, যা তিনি সর্বময় প্রচার করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ করেছেন: نَبِّئْ عِبَادِي أَنِّي أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
'আপনি আমার বান্দাদের জানিয়ে দিন যে, আমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল দয়ালু।'১
এ ঊষার আলো প্রতিটি কানে পৌছে দেবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী-যা তিনি উম্মাহকে পাপের পথ ছেড়ে পুণ্যের পথে ফিরে আসতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য উচ্চারণ করেছেন। যেমন তিনি ইরশাদ করেন:
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَبْسُطُ يَدَهُ بِاللَّيْلِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ النَّهَارِ، وَيَبْسُطُ يَدَهُ بِالنَّهَارِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ اللَّيْلِ، حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا
'মহান আল্লাহ রাতে নিজ হাত প্রসারিত করে দেন, যেন দিনে পাপকারী বান্দা (রাতে) তাওবা করে এবং দিনে নিজ হাত প্রসারিত করে দেন, যেন রাতে পাপকারী বান্দা (দিনে) তাওবা করে-যে পর্যন্ত না সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হয় (অর্থাৎ কিয়ামত পর্যন্ত তাওবা করার সুযোগ রয়েছে)।'২
পরিশেষে বিনীতভাবে প্রার্থনা করি, মহান আল্লাহ যেন আমাদেরকে গুনাহ ও পদস্খলনের পর সাথে সাথে তাওবা-ইসতিগফারের তাওফিক দান করেন এবং আমাদের কথা ও কাজে ইখলাস দান করেন, আমিন।
-আব্দুল মালিক বিন মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান আল-কাসিম
টিকাঃ
১. সুরা আল-হিজর : ৪৯
২. সহিহু মুসলিম: ২৭৫৯
📄 কুরআন-হাদিসের আলোকে তাওবা
আল্লাহ তাআলার দাসত্ব ও ইবাদত করাই মানবসৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য। মানুষ মাত্রই ভুল করে। সৃষ্টির উদ্দেশ্য সাধনেও তার ভুল হয়। পদস্खলন ঘটে। আল্লাহ তাআলা তা জানেন। তাই তিনি মানবজাতির ভুলভ্রান্তি ও পদস্খলনের ক্ষতিপূরণ করার পথ উন্মুক্ত করে রেখেছেন। আর তা হচ্ছে তাওবার পথ।
মানুষ কখনোই অপরাধ ও ভুলভ্রান্তি থেকে নিরাপদ নয়। সময়ে অসময়ে, যেকোনো মুহূর্তে মানুষ গুনাহ করে বসে। জড়িয়ে পড়ে পাপকর্মে। এ জন্য তাওবা করা মানুষের জন্য সব সময় আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে তাওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাওবাকারীদের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা ব্যক্ত করেছেন। ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ اللهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদের।'৩
অপর এক আয়াতে তিনি বলেন:
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ 'আর তোমরা সবাই আল্লাহর নিকট তাওবা করো হে মুমিনগণ, যাতে তোমরা সফলকাম হও।'৪
হিদায়াত ও রহমতের নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিস শরিফে ইরশাদ করেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوبُوا إِلَى اللَّهِ، فَإِنِّي أَتُوبُ فِي الْيَوْمِ إِلَيْهِ مِائَةَ مَرَّةٍ 'হে লোকসকল, তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবা করো। নিশ্চয় আমি প্রতিদিন একশ বার তাঁর নিকট তাওবা করি।'৫
আরেক হাদিসে ইরশাদ করেন: كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءُ، وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
'প্রত্যেক আদম-সন্তানই ভুল-ত্রুটিকারী। আর ভুল-ত্রুটিকারীদের মধ্যে উত্তম হলো, যারা (ভুল বা গুনাহের পরে) তাওবা করে।'৬
তাওবার মাধ্যমে যারা গুনাহের পথ ছেড়ে পুণ্যের পথে ফিরে আসে, তাদের ফজিলত ঈর্ষণীয়। এ সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন: التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ، كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ
'গুনাহ থেকে যে তাওবা করে, সে (তাওবার পরে) এমন ব্যক্তির ন্যায় হয়ে যায়, যার কোনো গুনাহ নেই।'৭
আসমানের দরজা তাওবাকারীদের জন্য উন্মুক্ত। প্রত্যাবর্তনকারীদের জন্য খোলা। পাপ-পঙ্কিলতার পথ ত্যাগ করে এ দরজা দিয়ে শান্তি ও স্বপ্নের জান্নাতে প্রবেশ করা যায়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন: كُلُّ أُمَّتِي يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ إِلَّا مَنْ أَبَى، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، وَمَنْ يَأْبَى؟ قَالَ: مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الْجَنَّةَ، وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أَبَى
'অস্বীকারকারীরা ব্যতীত আমার উম্মতের সকলে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সাহাবিগণ প্রশ্ন করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল, অস্বীকারকারী কে?” তিনি উত্তর দিলেন, “যে আমার আনুগত্য করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে; আর যে আমার অবাধ্যতা করবে, সে-ই হলো অস্বীকারকারী।”'৮
এই হাদিসটি সকল মুসলমানকে জান্নাতের সুসংবাদ শোনায়। তবে একশ্রেণির লোক, যারা অজ্ঞতা বা অলসতার কারণে ওই রাস্তার ওপর চলে না, যে রাস্তা চিরশান্তি ও স্বপ্নের জান্নাতে পৌঁছে দেয় এবং যারা জান্নাতের অবিনশ্বর নিয়ামতের ওপর নশ্বর ইহজীবনের ভোগ্যবস্তুসমূহকে অগ্রাধিকার দেয়—এই হাদিসে তাদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নেই।”
টিকাঃ
৩. সুরা আল-বাকারা: ২২২
৪. সুরা আন-নুর: ৩১
৫. সহিহু মুসলিম: ২৭০২
৬. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪২৫১
৭. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪২৫০
৮. সহিহুল বুখারি: ৭২৮০
৯. ওয়াহাতুল ইমান: ১/১২৫
📄 ফিরে আসো তাওবার পথে
তুমি একনাগাড়ে গুনাহ করে যাচ্ছ; তাওবা করে গুনাহ থেকে ফিরে আসার ভাবনা নেই তোমার মাঝে। কোন সে মিথ্যে স্বপ্ন, যার মাঝে তুমি বিভোর হয়ে আছ? অথচ তোমার আমলনামায় পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরে যাচ্ছে পাপের বয়ানে। আফসোস! তোমার বুদ্ধিসুদ্ধি কোথায় হারিয়ে গেল? তোমাকে এত করে বলছি, পুণ্যের পথে ফিরে আসো। কিন্তু কী আশ্চর্য! ফিরে আসার নামগন্ধও নেই তোমার মুখে। হে ভাই, কখন ভাঙবে তোমার এ নিদ্রা? কখন তুমি দুনিয়ার অলসতা থেকে গা ঝাড়া দিয়ে আখিরাতের আমল নিয়ে ব্যস্ত হবে? ব্যস্তময় পৃথিবীর ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে নিয়ে একটু ভাবো। দেখো, কী করুণ অবস্থা হয়েছে তোমার? তোমার অন্তর কি পাষাণ হয়ে যায়নি? তুমি কি আলস্য-নিদ্রায় বিভোর নও? মিথ্যে আশা কি তোমায় প্রতারিত করে রাখেনি? হে ভাই, এ সবই শয়তানি ওয়াসওয়াসা। সময় থাকতেই এসব পরিত্যাগ করো।
হাসান বসরি রহ. বলেন, ‘হে আদম-সন্তান, গুনাহ ছেড়ে দেওয়া তাওবা করার চেয়ে অনেক সহজ।’১০
কবি বলেন: إني بليت بأربع يرمينني *** بالنبل قد نصبوا علي شراكا إبليس والدنيا ونفسي والهوى *** من أين أرجو بينهن فكاكا يا رب ساعدني بعفو إنني *** أصبحت لا أرجو لهن سواكا
'চারটি ধারালো তির চার দিক থেকে আমার দিকে ধেয়ে আসছে। ইবলিস, দুনিয়া, নফস ও আসক্তি। কোনদিকে গেলে আমি তিরসমূহের লক্ষ্যস্থলের বাইরে যেতে পারব? হে প্রভু, আমাকে আবদ্ধ করে নাও তোমার ক্ষমার আবরণে। অন্যথায় ধেয়ে আসা তিরসমূহ থেকে বাঁচার কোনো পথ নেই আমার।'১১
হুমাইদ রহ. তার কোনো এক ভাইকে বললেন, 'আমাকে নসিহত করুন।' তিনি বললেন, 'ভাই, আল্লাহ তোমাকে দেখছেন—এ বোধ থাকা সত্ত্বেও যদি তুমি গুনাহ করো, তখন তা হবে চরম ধৃষ্টতা। আর যদি মনে করো, আল্লাহ তোমাকে দেখছেন না, তখন ধরে নাও, তোমার চেয়ে মূর্খ আর কেউ নেই।'
ওয়াহাইব বিন ওয়ারদ রহ.-কে জনৈক ব্যক্তি বললেন, 'আমাকে উপদেশ দিন।' তিনি বললেন, 'তোমাকে যারা দেখতে পায়, তাদের মধ্যে আল্লাহর দৃষ্টিকে সবচেয়ে তুচ্ছ মনে করা থেকে বেঁচে থাকো।'১২
প্রিয় মুসলিম ভাই, মনে করো তুমি একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির নিবিড় তত্ত্বাবধানে আছ, কিংবা তোমার ওপর চোখ মেলে তাকিয়ে আছে কোনো সিসি ক্যামেরা-তখন তোমার অবস্থা কেমন হয়? অবৈধ বা অপরাধমূলক কাজ করার সাহস কি তখন তোমার হয়? মহান আল্লাহ এর চেয়ে তীক্ষ্ণভাবে তোমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তোমার ছোট-বড় সব বিষয়ে তিনি পূর্ণ অবগত। তিনি তো চোখের গোপন চাহনি ও অন্তরের অপ্রকাশিত কল্পনা সম্পর্কেও জানেন! তবুও কী করে লাগাতার পাপকর্ম করে যাও তুমি? হ্যাঁ, এর কারণ একটাই। তোমার হৃদয় পাষাণ হয়ে গিয়েছে এবং অন্তর ভালো কর্মের উৎসাহ হারিয়ে বসেছে। তাই তোমাকে প্রথমে পাষাণ হৃদয় বিগলিত করতে হবে। অন্যথায় আল্লাহ থেকে তোমার দূরত্ব আরও বেড়ে যাবে। কারণ, পাষাণ হৃদয়ই হলো আল্লাহ থেকে সর্বাধিক দূরত্বে অবস্থানকারী হৃদয়। এ পাষাণ হৃদয় গলানোর জন্যই জাহান্নামের সৃষ্টি। হৃদয় পাষাণ হওয়ার বাহ্যিক একটা আলামত আছে। তা হলো, চোখ অশ্রুশূন্য হয়ে পড়া।
প্রিয় ভাই, চারটি বিষয়ে সীমালঙ্ঘনের ফলে অন্তর কঠোর হয় : খানা, ঘুমানো, কথা বলা ও মানুষের সাথে মেলামেশা করা। এ চারটি বিষয়ে কেউ যদি অতিরঞ্জন ও সীমালঙ্ঘন করে, তখন তার অন্তর কঠোর হয়ে যায়। শরীর যখন অসুস্থ হয়, তখন খাদ্য ও পানীয় শরীরের উপকার সাধনে ব্যর্থ হয়। তেমনিভাবে অন্তর যখন প্রবৃত্তি-জ্বরে আক্রান্ত হয়, তখন ওয়াজ-নসিহত সে অন্তরে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না।
যে ব্যক্তি অন্তরকে পরিশুদ্ধ রাখতে চায়, তার উচিত আল্লাহর বিধিনিষেধকে নিজের প্রবৃত্তির চাহিদার ওপর প্রাধান্য দেওয়া। কারণ, যেসব অন্তর প্রবৃত্তির চাহিদার অনুগামী, সেগুলো আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন। এ ছাড়াও পৃথিবীর বুকে অন্তর হলো আল্লাহকে ধারণ করার পাত্র। এ জন্য অন্তরকে সব সময় নম্র, স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। এমন অন্তরই আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে অন্তরসমূহ শুধু দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত। আল্লাহ ও আখিরাত নিয়ে ভাবার ফুরসত তাদের নেই। যদি থাকত, তাহলে তারা পবিত্র কুরআনের মর্ম ও প্রসিদ্ধ আয়াতসমূহ নিয়ে অবশ্যই ফিকির করত। ১৩
কবি বলেন:
يا من تمتع بالدنيا وزينتها *** ولا تنام عن اللذات عيناه أفنيت عمرك فيما لست تدركه *** تقول الله ماذا حين تلقاه؟
'দুনিয়ার ভোগবিলাসে মত্ত হে মানব, সুখ ও সমৃদ্ধির উদগ্র বাসনা কেড়ে নিয়েছে তোমার ঘুম। জীবন তো বরবাদ করে দিলে, ধূসর মরীচিকার পেছনে ছুটে। কাল যখন প্রভুর সামনে গিয়ে দাঁড়াবে, কী জবাব দেবে তাঁকে?'১৪
হাসান রহ. প্রায় সময় বলতেন:
'হে যুবক সম্প্রদায়, আখিরাতকে অন্বেষণ করো। কারণ, আমি এমন লোকদের দেখেছি, যারা আখিরাত অন্বেষণ করতে গিয়ে তার সাথে দুনিয়াকেও পেয়েছেন। তবে এমন কাউকে আমি দেখিনি, যে দুনিয়া অন্বেষণ করতে গিয়ে আখিরাতকেও পেয়ে গেছে।'১৫
হে ভাই. বান্দা চূড়ান্তভাবে আরামবোধ করবে কেবল 'তুবা' গাছের ছায়ায়। প্রেমিকের স্থিরতা আসবে কেবল কিয়ামতের দিন। তাই পার্থিব জীবনে এমন কর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকো, যা আখিরাতের জীবনে তোমার কাজে আসবে।১৬
কবি বলেন: *** تعصي الإله وأنت تظهر حبه هذا العمري في القياس بديع لو كان حبك صادقًا لأطعته *** إن المحب لمن يحب مطيع
'তুমি প্রভুর নাফরমানিতে নিমজ্জিত, অথচ দাবি করো তাঁকে ভালোবাসো। চরম মিথ্যা তোমার এই দাবি। তোমার ভালোবাসা যদি সত্য হতো, তুমি অবশ্যই তাঁর আনুগত্য করতে। প্রেমিক তার প্রেমাস্পদেরই আনুগত্য করে।'১৭
প্রিয় মুসলিম ভাই, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে আমাদের শরীর অসুস্থ হয়। তখন আরোগ্যলাভের জন্য আমরা ওষুধ সেবন করি। এভাবে আমাদের কলবেরও অসুখ হয়। অসুস্থ মনের প্রতিষেধক হলো তাওবা করা এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। আয়না অনেক সময় ঝাপসা হয়ে যায়। তখন ধুয়ে বা মুছে তার স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা হয়। একইভাবে আমাদের অন্তঃকরণও ঝাপসা হয়ে যায়। আল্লাহর জিকির সেই ঝাপসা আবরণ দূর করে। অনুরূপভাবে মানুষের শরীর যেভাবে বিবস্ত্র হয়, একইভাবে অন্তরও বিবস্ত্র হয়। অন্তরের বস্ত্র হলো তাকওয়া। ১৮
সুতরাং সেই সত্তার ব্যাপারে গাফিলতি কোরো না, যিনি তোমার জীবনের নির্দিষ্ট সীমারেখা অঙ্কন করে রেখেছেন। তোমার সময় ও নিশ্বাসের মেয়াদ নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। যিনি এমন এক সত্তা, যাঁকে ছাড়া তোমার কোনো উপায় নেই। ১৯
টিকাঃ
১০. আজ-জুহদ, ইমাম আহমাদ: ২৪২
১১. আত-তাজকিরাহ: ৪৭৫
১২. জামিউল উলুম : ১৯৫, হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৮/১৪২
১৩. আল-ফাওয়ায়িদ: ১২৮
১৪. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/৫১২
১৫. আজ-জুহদ, বাইহাকি : ৯
১৬. আল-ফাওয়ায়িদ: ১২৯
১৭. আজ-জুহদ, বাইহাকি: ৩২৯
১৮. আল-ফাওয়ায়িদ: ১২৯
১৯. আল-ফাওয়ায়িদ: ১২৯
📄 গুনাহ পরিত্যাগ করার উপকারিতা
গুনাহ পরিত্যাগ করার মাঝে অনেক কল্যাণ ও উপকারিতা রয়েছে। এখানে তার বেশ কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।
গুনাহ ও পাপকর্ম পরিত্যাগ করার ফলে সমাজে মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষের জান-মাল ও ইজ্জত-আবরু সুরক্ষিত থাকে। পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহমর্মিতা অটুট থাকে। জীবনোপকরণ উত্তম ও পবিত্র হয়। শরীর ও মনের প্রশান্তি অর্জিত হয়। অন্তরে সাহসিকতা ও সদিচ্ছার সঞ্চার হয়। হৃদয় প্রশস্ত হয়। অসাধু ও পাপিষ্ঠ লোকদের দৌরাত্ম্য থেকে নিরাপত্তা লাভ করা যায়। পেরেশানি ও দুশ্চিন্তা কমে যায়। নাফরমানির অন্ধকার কলবের নুর ছাপিয়ে যাওয়াকে প্রতিহত করে। রিজিকে প্রশস্ততা আসে। অভাবনীয়ভাবে রিজিকের সুব্যবস্থা হয়। ফাসিক ও নাফরমান ব্যক্তিরা যে মনঃকষ্টে ভোগে, গুনাহ ও নাফরমানি ছেড়ে দিলে সে কষ্ট দূর হয়ে যায়। ইবাদত-বন্দেগি সহজ হয়ে যায়। জ্ঞান-বুদ্ধি প্রখর হয়। মানুষের প্রশংসা ও দুআ অর্জিত হয়।
যে ব্যক্তি গুনাহ থেকে বিরত থাকে, লোকজন তাকে সমীহ করে। তাদের অন্তরে তার প্রতি সম্মান ও মর্যাদাবোধ সৃষ্টি হয়। সে কষ্টাক্রান্ত হলে কিংবা তার প্রতি জুলুম করা হলে লোকজন তার পাশে দাঁড়ায়। গিবতকারীর গিবত থেকে তাকে রক্ষা করে। আল্লাহর দরবারে তার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। তার দুআ দ্রুত কবুল করা হয়। আল্লাহ ও তার মাঝে অপরিচিতি ভাব দূর হয়ে ঘনিষ্ঠ এক সম্পর্ক কায়িম হয়। ফেরেশতাগণ তার কাছাকাছি থাকেন। মনুষ্য ও জিন শয়তান তার থেকে দূরে সরে যায়। মানুষজন তার সেবা ও প্রয়োজন পূরণে স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসে। ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিয়ে তার উপদেশ শোনে।
যে ব্যক্তি গুনাহ ছেড়ে দেয়, তার মৃত্যুভয় থাকে না; বরং মৃত্যুতে সে আনন্দিত হয়। কারণ, মৃত্যুই আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের একমাত্র মাধ্যম। দুনিয়া তার চোখে খুব তুচ্ছ ও নগণ্য এবং আখিরাত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দেখায়। সে মনঃপ্রাণে একটা বিষয়ই কামনা করে- আখিরাতের চূড়ান্ত সফলতা।
যে ব্যক্তি গুনাহ ছেড়ে দেয়, সে ইবাদত ও ইমানের সুমিষ্ট স্বাদ আস্বাদন করে। আরশ বহনকারী ও প্রদক্ষিণকারী ফেরেশতাগণ তার জন্য দুআ করেন। লেখক ফেরেশতাগণও তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন এবং দুআ করেন। তার জ্ঞান, বুদ্ধি, ইমান ও মারিফাতে (আল্লাহর পরিচয়) উন্নতি সাধন হয়। সর্বোপরি আল্লাহর ভালোবাসা, বিশেষ মনোযোগ ও সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। এ সবই গুনাহ ও নাফরমানি ত্যাগ করার কল্যাণে দুনিয়াতে অর্জিত হয়।
আখিরাতেও রয়েছে গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার বিশেষ পুরস্কার। সুতরাং গুনাহ পরিত্যাগকারী ব্যক্তি যখন মৃত্যুবরণ করবে, তখন রহমতের ফেরেশতাগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে জান্নাতের শুভ সংবাদ নিয়ে তার কাছে আগমন করবেন। তারা তাকে অভয়বাণী শোনাবেন, 'আজ তোমার কোনো ভয় নেই, কোনো পেরেশানি নেই।' অতঃপর তাকে পৃথিবী নামক সংকীর্ণ কারাপ্রকোষ্ঠ থেকে ফুলে ফলে সুশোভিত জান্নাতের এক বিশাল কাননে নিয়ে যাবেন। কিয়ামত পর্যন্ত সেখানে প্রভুর নিয়ামতরাজির মাঝে অবগাহন করতে থাকবে সে।
অতঃপর যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন প্রচণ্ড গরমে মানুষের শরীর থেকে ঘামের ফোয়ারা ছুটবে। বিন্দু বিন্দু ঘাম পরিণত হবে বিশাল সাগরে। সেই সাগরে তারা অসহায়ের মতো হাবুডুবু খাবে। গুনাহ পরিত্যাগকারী ব্যক্তি তখন আরশের ছায়াতলে ভিআইপি লাউঞ্জে অবস্থান করবে। চারপাশে মৌ মৌ করবে জান্নাতি খুশবো। বেহেশতি শীতল সমীরণ শরীর-মনে সুখের পরশ বুলিয়ে প্রবাহিত হবে একটু পরপর। অতঃপর যখন সকল মানুষকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত করা হবে, তখন তার ডানহাতে আমলনামা দেওয়া হবে। মুত্তাকি ও সফলকাম দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে সেও চলে যাবে শান্তি ও স্বপ্নের সবুজ জান্নাতে।২০
কবি বলেন: يا أيها الغافل جد في الرحيل *** وأنت في لهو وزاد قليل لو كنت تدري ما تلاقي غدًا *** لذبت من فيض البكاء والعويل
فأخلص التوبة تحظى بها *** فما بقي في العمر إلا القليل
ولا تنم إن كنت ذا غبطة *** فإن قدامك نوم طويل
'ওহে গাফিল, অন্তিম যাত্রার টিকিট কাটা হয়ে গেছে, অথচ তুমি খেল-তামাশার মাঝে বিভোর এবং (তোমার) পাথেয় অপ্রতুল! যদি তুমি অবগত থাকতে আগামীকাল কী বিপদের সম্মুখীন হবে, তবে তুমি কান্না আর আর্তনাদের বানে তা ভাসিয়ে দিতে। তুমি খাঁটি মনে তাওবা করে সফলতার পথ বেছে নাও। কারণ, জীবনকাল তো অল্পই বাকি আছে। নিদ্রা পরিহার করে ঈর্ষণীয় জীবন ধারণ করো। যেহেতু তোমার সামনে রয়েছে (বিশ্রামের জন্য) এক বিশাল জীবন।'২১
আয়িশা রা. বলেন, 'গুনাহ কমিয়ে দাও। কারণ, কম গুনাহ নিয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করার চেয়ে সুখকর আর কিছু নেই।'
মাওরিক আল-আজলি রহ. বলেন, 'মুমিনের উদাহরণ সেই ব্যক্তি, যে অথই সাগরের বুকে শুকনো কাঠের ওপর বসে “ইয়া রব, ইয়া রব” বলে আল্লাহকে ডাকে, যেন তিনি তাকে সেখান থেকে বাঁচিয়ে আনেন।'২২
আল্লাহর আজাবের ভয় ও তাঁর নিয়ামতের আশায় প্রত্যেক মুমিনকে ওই ব্যক্তির মতোই হতে হবে।
টিকাঃ
২০. আল-ফাওয়ায়িদ : ১৯৮ (ঈষৎ সংক্ষেপিত)
২১. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ১৯
২২. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/২৩৫, সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/২৫০