📄 কটুক্তি ও কুফরির মাঝে পার্থক্য
বিষয়টি প্রমাণিত যে, সমস্ত কুফরি কটূক্তি নয়; তবে যে-সমস্ত কটুবাক্য ও গালিগালাজ রক্ত হালাল করে, তা কুফরি। আমরা কটূক্তি ও কুফরির বিভাজন নিয়ে আলেমগণের বক্তব্য নিম্নে তুলে ধরছি।
ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি রাসূলকে গালি দিবে এবং তাঁর ত্রুটি উল্লেখ করবে, তাকে হত্যা করা আবশ্যক এবং তাকে তাওবার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।
তিনি আরও বলেন, যে ব্যক্তি কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কথা বলে, তাকে হত্যা করা অপরিহার্য। [১০৮]
আমাদের সঙ্গীগণ বলেন, আল্লাহ ও রাসূলকে সুস্পষ্ট-ভাষায় কটূক্তি করার মতো ইঙ্গিতে কটূক্তি করার দ্বারাও মানুষ মুরতাদ হয়ে যায়। [১০৯]
আমাদের সঙ্গীদের মাঝে এ বিষয়ে মতভিন্নতা নেই যে, রাসূলের মায়ের নামে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা ওই সমস্ত কটূক্তির অন্তর্ভুক্ত, যা কতলকে আবশ্যক করে; বরং এটা আরও গুরুতর কটূক্তি।
কাযি ইয়ায বলেন, ওই ব্যক্তি রাসূলের কটূক্তিকারী বলে গণ্য হবে যে—
• রাসূলকে কটূক্তি করবে,
• তাঁর দোষ ধরবে,
• তাঁর নামে, তার বংশসূত্র ধরে, তাঁর দ্বীন অথবা তাঁর কোনো বৈশিষ্ট্যের সাথে ত্রুটি সম্পৃক্ত করবে,
• তাঁকে নিন্দা করবে,
• গালি দেওয়া, তাচ্ছিল্য করা, অবজ্ঞা করা বা দোষ ধরার মতো করে তাঁকে কোনো কিছুর সাথে তুলনা করবে।
এমন ব্যক্তি (কটূক্তিকারী) স্পষ্ট করে বলুক কিংবা ইঙ্গিতে—তাকে হত্যা করা হবে। তেমনিভাবে যে ব্যক্তি রাসুলকে অভিশাপ দিবে, তাঁর জন্য ক্ষতি কামনা করবে, তাঁর বিরুদ্ধে বদদুআ করবে, অপমান করার উদ্দেশ্যে তাঁর শানের খেলাফ কোনো বিষয়কে তাঁর সাথে সম্পৃক্ত করবে, ঐ ব্যক্তিকেও হত্যা করা হবে। একইভাবে যে ব্যক্তি রাসুলের শানে কোনো উপহাসমূলক, পরিত্যাজ্য, অন্যায় ও মিথ্যা কথা শুনে রাসুলকে সেসব কথা বলে দোষারোপ করবে, রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর দিয়ে অতিক্রান্ত বিপদ ও পরীক্ষার কথা বলে তাকে ত্রুটি যুক্ত করবে[১১০]। কিংবা বৈধ ও মানবীয় ভুলের কারণে তাঁকে তাচ্ছিল্য করবে, সে ব্যক্তিও কাফের।
কাযি ইয়ায বলেন, এ বিষয়ে নবী মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসারী উলামা ও ইমামগণের ইজমা রয়েছে।
ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করবে তাকে হত্যা করা হবে। তাকে তাওবার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।
ইবনুল কাসেম রাহিমাহুল্লাহ ‘কটূক্তি করবে’— কথাটির সাথে আরও যুক্ত করে বলেন—কিংবা যে ব্যক্তি তাঁকে গালি দিবে, দোষারোপ করবে, কিংবা তাঁর নামে কোনো ত্রুটি উল্লেখ করবে... এ ব্যক্তিকে যিন্দিকের মতো হত্যা করা হবে।[১১১]
মালিকি মাজহাবের কতিপয় ফকিহ বলেন, যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরুদ্ধে কোনো বদদুআ করবে তাকে তাওবার অবকাশ না দিয়েই হত্যা করা হবে।
কাযি ইয়ায কিছু কিছু ক্ষেত্র উল্লেখ করেন, যে ক্ষেত্রগুলোতে মালিকি মাজহাবের প্রসিদ্ধ একদল ফকিহের বক্তব্য অনুসারে—তাওবার অবকাশ না দিয়েই কটূক্তিকারীকে হত্যা করা হবে।
প্রথম ধরন: একব্যক্তি কিছু মানুষকে রাসূলের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে শুনল। তখন সে দেখল, সেখান দিয়ে অসুন্দর দাড়িবিশিষ্ট কুৎসিত চেহারার এক লোক যাচ্ছে। তখন সে বলে উঠল—তোমরা রাসূলের আকৃতি জানতে চাও? তার রূপ হুবহু এই চলে-যাওয়া লোকটির মতো।
দ্বিতীয় ধরন: কোনো ব্যক্তি বলল, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কালো ছিল।
তৃতীয় ধরন: (কোনো এক বিষয়ে) কেউ কাউকে বলল, না! আল্লাহর রাসূলের হকের কসম! তখন সেই সম্বোধিত ব্যক্তি বলে উঠল, রাসূলের সাথেই তো আল্লাহ এমন এমন আচরণ করেছেন। (অর্থাৎ সে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তুচ্ছ করে দেখল)
চতুর্থ ধরন: চাঁদাগ্রহণকারী একব্যক্তি কাউকে বলল, চাঁদা আদায় কর। (পারলে) রাসূলকে গিয়ে অভিযোগ কর।
পঞ্চম ধরন: কোনো এক বিতার্কিক তার বিতর্কের মাঝে রাসূলের শানে তাচ্ছিল্যভরে 'ইয়াতীম' ইত্যাদি শব্দ প্রয়োগ করল। সে দাবি করল যে, রাসূলের দুনিয়াবিমুখতা স্বেচ্ছায় ছিল না। তিনি যদি উত্তম উত্তম খাদ্য পেতেন, তা হলে তিনি তা গ্রহণ করতেন। ইত্যাদি ইত্যাদি কথা।
ইমাম শাফেঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি তাচ্ছিল্য প্রকাশ পায়—এমন প্রতিটি অভিব্যক্তি কটূক্তি বলে গণ্য হবে।
ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ ও তাঁর সঙ্গীগণ বলেন, যে ব্যক্তি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে কোনো ত্রুটিপূর্ণ কথা বলে, কিংবা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে নিজেকে সম্পর্কছিন্ন ঘোষণা করে কিংবা রাসূলকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করে, সে মুরতাদ। [১১২]
সুতরাং এ বিষয়ে সকল উলামাগণের বক্তব্য একই—রাসূলের শানে কোনো ত্রুটিপূর্ণ মন্তব্য করা কুফরি; এর দ্বারা কটূক্তিকারীর রক্ত বৈধ হয়ে যায়। কটূক্তিকারীর উদ্দেশ্য যাই হোক! সে রাসূলের দোষ বলার উদ্দেশ্যে বলুক, কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে বলুক; সে রাসূলকে উপহাস করতে গিয়ে বলুক কিংবা কৌতুক করে বলুক। তবে এহেন কুফরিকারীকে তাওবার সুযোগ দেওয়া হবে কি না, এ নিয়ে আলেমগণের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। কেননা বান্দা যদি এমন কথাও বলে যা সে মন থেকে বলেনি। [১১৩] তবু এমন কথার কারণে তাকে জাহান্নামের দুই মেরুর সমান গভীরে নিক্ষেপ করা হয়।
তা ছাড়া, যে ব্যক্তি (আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শানে) কটূক্তিমূলক ও কলঙ্কজাতীয় কথা বলে, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিল। আর (মূলনীতি হলো-) যে ব্যক্তি মানুষকে এমন কিছু বলে যা আসলেই কষ্টদায়ক, তবে তাকে কষ্ট দেওয়ার অপরাধে পাকড়াও করা হয়। বিষয়টি যদি এমনও হয় যে, সে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে কথাটা বলেনি, (তবুও তাকে পাকড়াও করা হবে)। আপনি কি আল্লাহর বাণী শোনেননি?
لَيَقُولُنَّ إِنَّমَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ
'আমরা তো শুধুমাত্র হাসি-তামাশা ও খেলা করছিলাম'। [১১৪]
যে ব্যক্তি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফয়সালা মেনে নেওয়া নিয়ে কারও সাথে বিতর্ক করে এবং রাসূলের শানে আজেবাজে কথা বলে, সে ওহির সুস্পষ্ট বক্তব্য অনুযায়ী কাফের। তার এ ধরনের কোনো ওজর গ্রহণ করা হবে না যে- প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করাই আমার উদ্দেশ্য ছিল।
কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ۞
তোমার রবের কসম! তারা ততক্ষণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ-না তারা তোমাকে তাদের বিরোধপূর্ণ বিষয়ে বিচারক মেনে নেয়। [১১৫]
এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত আরও কিছু কথা-যেমন একব্যক্তি বলেছিলেন, '(রাসূলের) এই বণ্টন দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা হয়নি। [১১৬] আরেক সাহাবি (রাসূলকে) বলেছিলেন-ইনসাফ করুন, কেননা আপনি ইনসাফ করেননি।[১১৭] আরেক আনসারি ব্যক্তি (রাসূলকে) বলেছিলেন-যুবাইর বিন আওয়াম তো আপনার ফুফাতো ভাই।[১১৮] এগুলোও নিঃসন্দেহে সুস্পষ্ট কুফরি। তবে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্ষমা করে দিয়েছেন। ইতিপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি যে, একজন ব্যক্তি রাসূলের বিচার নিয়ে আপত্তি করেছিল, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে হত্যা করেছিলেন। তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সমর্থনে আল্লাহ তাআলা কুরআনের আয়াত নাযিল করেছেন।
ইবনে আকীল-সহ শাফেঈ মাজহাবের কিছু কিছু ফকিহদের অভিমত হলো উপরিউক্ত ব্যক্তিদের শাস্তি ছিল তা'যীর; আর (শরিয়তে) তা'যীর করতেই হবে এমন নয়, এ জন্যই কারও কারও মতে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে তা'যীর করেননি। অপরদিকে কারও কারও মতে, সেই ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া ছিল রাসূলের হক। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হক ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
এ সবই অগ্রহণযোগ্য কথা। চিন্তাশীল ব্যক্তির সংশয় থাকার কথা না যে, সে কতলের উপযুক্ত ছিল।
কেউ কেউ (আপত্তি করে) বলতে পারে, যে সাহাবি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিচার নিয়ে আপত্তি করেছিলেন। এক বর্ণনা অনুযায়ী-তিনি তো বদর-যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবি ছিলেন। অথচ বদরের সাহাবির বিষয়ে এ ধরনের কথা সঙ্গত নয় যে, তিনি কুফরি করেছেন! তাদের আপত্তির জবাবে বলা হবে-তিনি যে বদর-যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবি ছিলেন- এ অংশটুকু আবুল ইয়ামান শুয়াইব থেকে বর্ণনা করেছেন। অধিকাংশ বর্ণনাকারীগণ তা বর্ণনা করেননি। সুতরাং এ অতিরিক্ত অংশটি 'অহম' অর্থাৎ অনিচ্ছাকৃত ভুল। যেমন এক হাদীসে আছে-কা'ব ও হিলাল ইবনে উমাইয়া বদর-যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। অথচ রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুদ্ধ ও সীরাত-বিশারদদের মাঝে এ বিষয়ে কোনো মতবিরোধ নেই যে, তারা বদর-যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। এ জন্য ইবনে ইসহাক যুহরি থেকে তাঁর বর্ণনায় এ বিষয়টি উল্লেখ করেননি। অথচ বাহ্যিকভাবে তো হাদীসটি বিশুদ্ধ ছিল।[১১৯]
আপত্তিকারী সেই সাহাবি যদি আসলেই বদর-যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে থাকেন, তা হলে আমরা বলব, (আপত্তির) ঘটনাটি হয়তো বদর-যুদ্ধের পূর্বে ঘটেছে। তবুও তাকে হাদীসে বদরের সাহাবি বলা হয়েছে। কেননা ইবনে যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু হাদীসটি বদর যুদ্ধের পর বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ ওই সাহাবি যখন বদরের সাহাবির পরিচয় লাভ করেছেন তার পরে। আর যদি ঘটনা বদর-যুদ্ধে অংশগ্রহণের পর হয়ে থাকে, তা হলে বলব—তিনি তাওবা করেছন। নিঃসন্দেহে তাওবা ও ইস্তিগফার পিছনের সমস্ত গোনাহ মুছে দেয়।
টিকাঃ
[১০৮] আল-জামি: ২/৩৩৯
[১০৯] আল-ইনসাফ: ১০/৩৩৩
[১১০] যেমন কেউ বলল, যদি সে আল্লাহর রাসুল হয়, তবে কেন তার ওপর দিয়ে এ ধরনের বিপদ গেল?
[১১১] আশ-শিফা: ২/৩৯৫
[১১২] মুরতাদের শাস্তি কতল।
[১১৩] বাস্তবিক অর্থে বলেনি।
[১১৪] সূরা তাওবা, ৯: ৬৫। এখানে আল্লাহ কিছু মুনাফিকের বক্তব্য তুলে ধরেছেন, যারা হাসিচ্ছলে কুরআনের আয়াত নিয়ে উপহাস করছিল। তারপরও আল্লাহ তাদের নিন্দা করেছেন। সুতরাং যে দুষ্টমির ছলে রাসূলকে গালি দিবে সেও হত্যার উপযুক্ত বলে গণ্য হবে。
[১১৫] সূরা নিসা, ৪: ৬৫
[১১৬] কথাটি একজন সাহাবি বলেছিলেন。
[১১৭] রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বণ্টন নিয়ে এক সাহাবি তাঁর উদ্দেশ্যে এই মন্তব্য করেন।
[১১৮] তিনি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি পক্ষপাতিত্বের ইঙ্গিত দিয়ে কথাটি বলেছিলেন।
[১১৯] হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানীর মতে : তারা বদর-যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। ইবনুল কাইয়িমের মতে তিনি বদর-যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেননি。
📄 কটুক্তির তাওবা নেই, গোণাহের তাওবা আছে
আমাদের কাছে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, সরাসরি কিংবা ইশারা-ইঙ্গিতে রাসূলের শানে যে-কোনো ধরনের কটূক্তি(-র কারণে কটূক্তিকারীকে) কতল করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এখন আমাদের জন্য এটাও জানা জরুরি হয়ে পড়েছে যে, কটূক্তি ও সাধারণ কুফরির মাঝে পার্থক্য রয়েছে।
কটূক্তির প্রসংজ্ঞটি কুরআন ও সুন্নাহতে «আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া» নামে আলোচিত হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো কোনো হাদীসে 'শাতম ও সাব্ব' শব্দ দুটি উল্লেখ আছে। তেমনি সাহাবি ও ফকিহগণের আলোচনাতেও শাতম ও সাব্ব শব্দ দুটি এসেছে।
অভিধানে যে শব্দের আলাদা কোনো সংজ্ঞা নেই[১২০] এবং শরীয়তেও যার বিশেষ কোনো সংজ্ঞা নেই,[১২১] সে ধরনের শব্দকে সাধারণ প্রচলিত অর্থে ব্যবহার করা হয়।[১২২] সুতরাং 'আযা'[১২৩], 'সাব্ব'[১২৪] ও শাতম'[১২৫]-এ শব্দগুলোর প্রচলিত অর্থের দিকে আমাদের মনোনিবেশ করতে হবে। সমাজের মানুষ যাকে সাব্ব তথা কটূক্তি বা ত্রুটি বা দোষ বা অপবাদ ইত্যাদি হিসাবে গণ্য করে তা-ই সাব্ব তথা কটূক্তি। তবে যে কুফরি এ-জাতীয় কথা নয় তা নিছক কুফরি, তা 'সাব্ব' বা কটূক্তি হবে না। (এখানে বিবেচ্য বিষয় হলো কোনটি রাসূলের জন্য 'সাব্ব' বা কটূক্তি হিসাবে গণ্য হবে। এমনও হতে পারে অন্যদের জন্য যে কথা স্বভাভিক, রাসূলের সম্মানে তাই সাব্ব বা গালি)। এ অনুযায়ী যে কথা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া অন্যদেরকে বললে তাযীর বা হদ্দ অবধারিত হয়, সে কথা রাসূলের ক্ষেত্রে বললে সাব্বা বা কটূক্তি হয়ে যায়।
টিকাঃ
[১২০] অভিধানে যে শব্দের আলাদা কোনো সংজ্ঞা আছে-আকাশ ও পৃথিবী
[১২১] শরীয়ায় যে শব্দের আলাদা সংজ্ঞা আছে-সালাত, যাকাত ও কুফর
[১২২] প্রচলিত অর্থে ব্যবহৃত শব্দ—কবজ ও হিরজ। কবজের শাব্দিক অর্থ: মজবুত করে ধরা। প্রচলিত অর্থ: মালিকানায় নিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জন করা। হিরয অর্থ: বিরত থাকা। প্রচলিত অর্থ: সংরক্ষণ অর্থে ব্যবহৃত হয়।
[১২৩] কষ্ট দেওয়া
[১২৪] কটূক্তি করা, গালমন্দ করা
[১২৫] গালি দেওয়া
📄 যিম্মি-ব্যক্তির কুফরি-কথা ও কটুক্তিমূলক কথার মাঝে পার্থক্য
জানা আবশ্যক যে, যিম্মি-ব্যক্তির কুফরি-কথা ও কটূক্তির মাঝে পার্থক্য রয়েছে। কেননা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অবিশ্বাস করার ফলে সর্বসম্মতিক্রমে তার কৃত-প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয় না এবং এর দ্বারা তার রক্তও বৈধ হয় না। তবে যিম্মি যদি আল্লাহ বা রাসূলকে কটূক্তি করে, এর দ্বারা তার 'নিরাপত্তা-চুক্তি' ভেঙে যায় এবং তার রক্ত প্রবাহও আবশ্যক হয়ে যায়। কাযি ইয়ায বলেন, (ইসলামি রাষ্ট্রে) যিম্মির নিরাপত্তা-বিধান দ্বারা তার কুফরিকে মেনে নেওয়া হয়, তাই বলে তার কটূক্তিকে নয়।
আমরা বলি, 'শাতেমে রাসূল'-এর বিষয়ে সাহাবা ও সালাফগণের যত 'আসার' বর্ণিত হয়েছে, সবই 'মুতলাক'। অর্থাৎ তাঁরা কোনো পার্থক্য করেননি যে, কটূক্তিকারী কি যিম্মি নাকি মুসলিম। তাঁরা এ বিষয়েও কোনো পার্থক্য করেননি যে, কটূক্তি কি একবারই করা হয়েছে নাকি বারবার, এবং প্রকাশ্যে নাকি অপ্রকাশ্যে। 'অপ্রকাশ্যে করা'র দ্বারা উদ্দেশ্য একদল মুসলিমের সামনে বলা। অন্যথায় (কটূক্তি সাব্যস্ত হওয়ার জন্য অন্তত দুজন মুসলিমের উপস্থিতি আবশ্যক)। কমপক্ষে দুজন মুসলিম সাক্ষ্য দিবে যে, আমরা তাকে কটূক্তি করতে শুনেছি কিংবা সে নিজেই কটূক্তির কথা স্বীকার করে নিবে। এ ছাড়া কোনো হদ্দ-ই প্রমাণিত হয় না। তবে যদি বিষয়টি এমন হয় যে, সে একাকী ঘরে রাসূলকে গালিগালাজ করল, কিন্তু তার মুসলিম প্রতিবেশীরা শুনে ফেলল অথবা কেউ কান পেতে শুনল, তা হলে ভিন্ন কথা। (দুজনের সামনে না বললেও তার কটূক্তি সাব্যস্ত হবে)
ইমাম মালিক ও আহমাদ রহিমাহুমুল্লাহ বলেন, মুসলিম হোক কিংবা কাফের, রাসূলকে যে-ই কটূক্তি করবে অথবা খাটো করবে তাকেই কতল করা হবে। আমাদের ইমামগণও শর্তহীনভাবে বলেছেন, যে-ই রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হেয় করবে তাকেই কতল করতে হবে! হোক সে মুসলিম কিংবা কাফের।
কাযি ইয়া'লা ও ইবনে আকীল উল্লেখ করেন, যে-সমস্ত কথা একজন মুসলিম বললে ঈমান চলে যায়, সে-সমস্ত কথা কোনো যিম্মি জনসম্মুখে বললে 'আমান' [১২৬] ভেঙে যায়।
ইবনে আকীল বলেন, দ্বিত্ববাদ ও ত্রিত্ববাদের মতো যে-সমস্ত বিশ্বাস ঈমান ভেঙে দেয়, সর্বক্ষেত্রেই এ কিয়াসটি প্রযোজ্য। যেমন খ্রিষ্টানরা বলে—আল্লাহ তিনজনের একজন। এ ধরনের যে-সমস্ত বিশ্বাসকে যিম্মি তার ধর্ম হিসাবে জানে, সে-সমস্ত কথাও যদি সে প্রকাশ্যে বলে তা হলে তার 'নিরাপত্তা-চুক্তি' ভেঙে যায়।
কাযি ইয়া'লা বলেন, এ বিষয়ে ইমাম আহমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে—যে রবকে টিটকারি করে কিছু বলল, মুসলিম হোক কিংবা কাফের, তার অনিবার্য পরিণতি হত্যা। এটিই মদীনার আলেমগণের মাজহাব। [১২৭]
এক ইহুদি ব্যক্তি মুয়াযযিনের আযান শুনে বলল, তুমি মিথ্যা বলেছ। এ ব্যক্তি সম্পর্কে Imam আহমাদ বিন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তাকে হত্যা করতে হবে। কারণ সে 'শাতম' বা কটূক্তি করেছে। [১২৮]
ইবনুল কাসিম বলেন, যে ব্যক্তি বলবে—মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবী বা রাসূল নয়, কিংবা তাঁর ওপর কুরআন অবতীর্ণ হয়নি বরং কুরআন শুধুমাত্র তাঁর মুখের কথা, সে কটূক্তি করল। তাকে হত্যা করা জরুরি। আর যে বলবে—সে আমাদের রাসূল নয়, সে শুধু মুসলিমদের রাসূল। অথবা আমাদের নবী শুধু মূসা ও ঈসা, তাকে কিছু বলা হবে না (কারণ সে তার ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকাশ করেছে)। [১২৯]
আর যদি সে বলে, আমাদের ধর্ম মুহাম্মাদের ধর্ম থেকে উত্তম তা হলে তাকে শায়েস্তা করা হবে এবং দীর্ঘদিন কারাগারে বন্দি রাখা হবে। এটি মুহাম্মাদ বিন সুহনূন রাহিমাহুল্লাহ-এর অভিমত। তিনি এ মতটি তাঁর পিতার বলে উল্লেখ করেন। (তিনি আরও বলেন) যিম্মি যে বিশ্বাসের কারণে কাফের, সেই কথাগুলো যদি সে স্বাভাবিকভাবে বলে, তা হলে তাকে হত্যা করা হবে না। আর যদি সে কটূক্তি করে বলে, তা হলে তাকে হত্যা করা হবে। তবে যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে (তা হলে ভিন্ন কথা)। [১৩০]
মুয়াযযিন আযানে তাশাহহুদ বলছিলেন। তখন মুয়াযযিনের উদ্দেশ্যে এক ইহুদি বলল, 'তুমি মিথ্যা বলেছ'। এ ব্যক্তি সম্পর্কে মুহাম্মাদ বিন সুহনূন বলেন, তাকে শাস্তি দিতে হবে এবং জেলে ভরতে হবে। অবশ্য পূর্বে আলোচিত হয়েছে—এ ধরনের একটি সুরতে ইমাম আহমাদ কতলের কথা বলেছেন, কেননা তা 'শাতম' বা কটূক্তি।
একইভাবে আমাদের মত অনুযায়ী যেসব কটূক্তির দ্বারা যিম্মির আমান বা নিরাপত্তা শেষ হয়ে যায় এবং তাকে হত্যা করতে হয়, সে-সমস্ত ক্ষেত্রে শাফেঈ ফকিহগণ দুটি মত দিয়েছেন—
১. তাদের অধিকাংশের মত হলো রাসূলের শানে যে-কোনো ধরনের কটূক্তিমূলক কথা এবং আমাদের দ্বীন নিয়ে যে-কোনো ধরনের আক্রমণাত্মক কথা প্রকাশ্যে বলার দ্বারাই 'আমান' শেষ হয়ে যাবে।
২. যদি তারা প্রকাশ্যে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস হিসাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নামে কিছু বলে, যেমন—মুহাম্মাদ রাসূল নয় কিংবা কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, তবে সেগুলো ইসলাম বহির্ভূত তাদের অন্যন্য ধর্মীয় কথার মতোই হবে। যেমন—ঈসা আলাইহিস সালাম ও ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস-সংক্রান্ত কথা। তারা বলেন, কোনো সন্দেহ নেই যে, এ-জাতীয় কথা বলার দ্বারা 'আমান' ভঙ্গ হবে না, বরং তাদেরকে প্রকাশ্যে বলার কারণে 'তাযীর' বা সাধারণ শাস্তি দেওয়া হবে। আর যদি তারা এমন কোনো কথা বলে, যা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস নয়—যেমন আল্লাহর রাসূলের বংশ নিয়ে অপবাদ দেওয়া ইত্যাদি—তবে তাদের নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যাবে। এটিই সায়দালানী, আবুল মাআলী ও অন্যন্যদের মত।
বিভিন্ন দলিল দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে, সব ধরনের কটূক্তির বিধান একই। যে-কোনো ধরনের কটূক্তির শাস্তি হত্যা, যিম্মি সেগুলো ধর্ম হিসাবে বিশ্বাস করুক কিংবা না-ই করুক। পূর্বে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়েছে। কেননা মানুষ যা কিছু বিশ্বাস করে, সেগুলো বলেই আল্লাহ বা তাঁর রাসূলের নিন্দা করে, দোষারোপ করে। বিভিন্ন দলিল দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে, সর্বধরনের কটূক্তির বিধান একই—যে-কোনো ধরনের কটূক্তির শাস্তি হত্যা, যিম্মি সেগুলো ধর্ম হিসাবে বিশ্বাস করুক কিংবা না করুক। পূর্বে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়েছে। কেননা মানুষ যা কিছু বিশ্বাস করে, সেগুলো বলেই আল্লাহ বা তাঁর রাসূলের নিন্দা করে, দোষারোপ করে, এ সত্ত্বেও তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তা ছাড়া, যদি আমরা বলি, যে কথা তারা দ্বীন হিসাবে বিশ্বাস করে না, এমন কথাই কেবল কটূক্তি হবে, তা হলে সবাই কটূক্তি করে বলবে, এটা আমরা দ্বীনি-বিশ্বাস। সে ক্ষেত্রে আমরা বলব, রাসূলের কটূক্তির উদাহরণ টানা এবং কটূক্তির ধরণ উল্লেখ করা আমাদের অন্তর ও জিহ্বার জন্য বড় কঠিন। এগুলো আমাদের কাছে এত গুরুতর যে, আমরা এগুলো মুখেও আনতে পারি না। কিন্তু আলোচনার প্রয়োজনে এ প্রসঙ্গে কথা বলা। সুতরাং (কোনো ধরনের উদাহরণ ও ধরন উল্লেখ ছাড়াই) আমরা কোনো বিশেষণ ছাড়াই সমস্ত ধরনের কটূক্তিই কথা বলছি। আর ফকিহও এ বিষয়ে আলোচনায় সতর্কতা অবলম্বন করেন। আমরা বলব-
কটূক্তি দুই প্রকার: বিবৃতিমূলক কটূক্তি ও দুআর মাধ্যমে কটূক্তি
• দুআর মাধ্যমে কটূক্তি: যেমন কেউ কাউকে বলল, আল্লাহ 'তাকে' লানত করুন, আল্লাহ তাকে বিশ্রী করুন, আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করুন, আল্লাহ তাকে দয়া না করুক, আল্লাহ তার বংশ নির্মূল করুক। এ-জাতীয় কথা শুধু নবীগণ নন, যে-কারও ক্ষেত্রেই কটূক্তি হিসেবে গণ্য হবে। আর দ্বীন, দুনিয়া বা আখিরাতের অপকার নিহিত আছে—এমন যে-কোনো দুআ যদি কোনো মুসলিম বা যিম্মি বলে, তবে তা কটূক্তি হিসাবে গণ্য হবে। যেমন কেউ রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলে, যে আল্লাহ তাঁর ওপর সালাত ও সালাম বর্ষণ না করুন, আল্লাহ তাঁর আলোচনা বুলন্দ না করুন, আল্লাহ তাঁর নামকে নিশ্চিহ্ন করুন।
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে এ-জাতীয় কটূক্তি কোনো মুসলিম করলে তাকে সর্বাবস্থায় হত্যা করতে হবে আর কোনো যিম্মি যদি জনসম্মুখে বলে, তবে তাকেও হত্যা করা হবে।
কখনও এমন হয়—কেউ বাহ্যত দেখায় রাসূলের জন্য দুআ করছে, আর মনে মনে রাসূলের জন্য বদদুআ করে। সে যে বদদুআ করছে, এটা তার বাচনভঙ্গি থেকে বোঝা যায়, আবার সবাই বোঝেও না যে, সে বদদুআ করছে, বরং কেউ কেউ বোঝে আর কেউ কেউ বোঝে না। যেমন: কেউ সম্ভাষণের মতো করে 'আস-সামু আলাইকুম' বলল, কন্তু সাধারণত যে-কেউ বুঝবে, সে 'আস-সালামু আলাইকুম বলেছে। [১৩১] এ ধরনের ক্ষেত্রে দুটি মত আছে।
১. এটি কটূক্তি হিসাবে গণ্য হবে এবং কটূক্তিকারীকে হত্যা করা হবে। এক ইহুদি এই ধরনের সম্ভাষণ করার পরও রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, কেননা ইসলাম তখন ছিল দুর্বল আর রাসূলের প্রতি আদেশ ছিল তখন সব ক্ষমা করে দেওয়ার। এটি মালিকি, শাফেঈ ও হাম্বলী মাজহাবের একদল ফকিহের মত।
২. এটা এ ধরনের কটূক্তি নয়, যার দ্বারা নিরাপত্তা-চুক্তি বাতিল হয়ে যায়, কেননা তারা কটূক্তি প্রকাশ করেনি এবং প্রকাশ্যেও বলেনি। তারা বাহ্যিক অবস্থা ও শব্দ দিয়ে সম্ভাষণ ও সালাম প্রকাশ করেছে, আর সালামের মাঝে বিদ্যমান 'লাম' অক্ষরটিকে আত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে উহ্য রেখেছে, যা কম শ্রোতারাই বুঝতে পারে। এ জন্যই এ ধরনের কথা তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এ বিধানকে আমাদের মাঝে বহাল রাখা হয়েছে। এটি হাম্বলী মাজহাবের পূর্ববর্তী কতিপয় আলেম-সহ আরও কিছু ফকীহের মত।
এটা বলা যাবে না যে, মৃত্যু তো বাস্তব সত্য। সুতরাং কারও জন্য মৃত্যুর দুআ করলে তা বদদুআ হবে না। বরং মুসলিমদের জন্য মৃত্যু ও বেদ্বীন হওয়ার দুআ আরও গুরুতর বদদুআ, যেমন কারও জন্য সুস্থতা ও শান্তির দুআ করাটা তার জন্য মর্যাদা।
• বিবৃতির মাধ্যমে কটূক্তি: পূর্বে আলোচিত হয়েছে যে, মানুষ যা কিছুকে গালি, কটূক্তি বা কলঙ্কলেপন মনে করে, সেটাই কুফরি—যার দ্বারা কতল আবশ্যক। কেননা কোনো কিছু কুফরি হওয়ার জন্য কটূক্তি হওয়া জরুরি নয়, আর কখনও কখনও একই কথা কোনো অবস্থায় কটূক্তি, অন্য অবস্থায় কটূক্তি নয়। এ থেকে বোঝা গেল—ব্যক্তি, অবস্থা ও কথার ভিন্নতার কারণে কটূক্তিও ভিন্ন ভিন্ন হয়। তার মানে কটূক্তির আলাদা কোনো শাব্দিক বা পারিভাষিক সংজ্ঞা নেই। সুতরাং কোন শব্দটি কটূক্তি হবে, সেটা নির্ভর করবে প্রচলনের ওপর। সামাজের কাছে যেটা কটূক্তি, সাহাবি ও আলেমগণের কথাকে সে ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হবে। সমাজের কাছে যেটা কটূক্তি নয়, সে ক্ষেত্রে কটূক্তির বিধান প্রযোজ্য হবে না। কয়েক প্রকার বিবৃতিমূলক কটূক্তির আলোচনা আমরা করছি ইন-শা-আল্লাহ।
কোনো সন্দেহ নেই যে, রাসূলের শানে যে-কোনো ধরনের অপমানজনক ও উপহাসমূলক কথা মুসলিমদের নিকট কটূক্তি হিসাবে গণ্য। যেমন: তাঁকে গাধা বা কুকুর বলা, কিংবা তাঁর গুণ হিসাবে মিসকীন বা অপমানজনক ও লাঞ্ছনাকর শব্দ প্রয়োগ করা, কিংবা এ ধরনের কথা বলা যে, তিনি জাহান্নামে যাবেন, সমস্ত মাখলুকের পাপ তার ওপর বর্তাবে ইত্যাদি। তেমনি আক্রমণাত্মক ভাষায় তার প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশ করাও কটূক্তি, যেমন কেউ বলল—সে নবি নয় বরং জাদুকর ও প্রতারক, সে তো তাঁর অনুসারীদের ক্ষতি করবে ইত্যাদি। আর যদি কেউ কটূক্তিমূলক কবিতা রচনা করে, তাহলে তা আরও গুরুতর। কারণ কবিতা অন্যদের মুখেও থাকে।
আর কেউ যদি আক্রমণাত্মক ভাষায় অস্বীকার না করে, বরং সাধারণভাবে অবিশ্বাস প্রকাশ করে, আর রাসূলকে খাটো করে দেখার কোনো লক্ষণও না থাকে, তা হলে তা কটূক্তি হবে না; ধরা হবে, সে তার ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকাশ করেছে। হয়তো এ অবিশ্বাসের পিছনে তার হিংসা, বিদ্বেষ বা পূর্বসূরিদের অন্ধ অনুকরণ দায়ী। যেমন: কেউ বলল, আমি তার অনুসারী নয়, বা আমি তার অনুসরণ করব না, আমি তাকে ভালোবাসি না, বা আমি তাকে মানি না ইত্যাদি ইত্যাদি কথা।
আর যদি কেউ বলে, সে রাসূল বা নবি নয়, তা হলে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্পষ্টভাবে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করা হয়। আর মিথ্যাপ্রতিপন্ন করা মানেই হলো তাঁকে মিথ্যার সাথে সম্পৃক্ত করা এবং তাঁকে মিথ্যাবাদী বলা। তবে হ্যাঁ, 'সে নবী নয়' আর 'সে মিথ্যাবাদী' -এ দুই কথার মাঝে পার্থক্য রয়েছে। কেননা 'সে নবী বা রাসূল নয়' কথাটি বলার মাধ্যমে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করা হয় প্রচ্ছন্নভাবে। কারণ আমরা জানি যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমি রাসূল।' (তিনি নিজেকে রাসূল বলার পরও এ কথা বলা—'তিনি রাসূল নন' মানে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করা।) অন্য কারও ব্যাপারে কোনো গুণ নাকচ করা আর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যাপারে কোনো গুণ নাকচ করা এককথা নয়। আর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে কোনো গুণ নিছক নাকচ করা আর নাকচ করার সাথে সাথে মিথ্যাবাদী বলাও এককথা নয়। একটি ক্ষেত্রে নাকচ করা আংশিক কটূক্তি আরেকটি নাকচ সর্বদিক থেকেই কটূক্তি।
টিকাঃ
[১২৬] ইসলামি রাষ্ট্র-কর্তৃক যিম্মিকে প্রদত্ত নিরাপত্তা。
[১২৭] আস-সারিম: ৯৮
[১২৮] আল-জামি: ২/৩৩৯
[১২৯] আশ-শিফা: ২/৪৮৫
[১৩০] আশ-শিফা: ২/৪৮৬