📄 কটুক্তিকারীকে তাওবার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না
নবীজির কটূক্তিকারীকে হত্যা করতে হবে। ওকে তাওবার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। চাই সে মুসলিম হোক কিংবা কাফের।
হাম্বলী মাজহাব ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তিই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালি দিবে, তাকে হত্যা করা আবশ্যক। সে যে-ই হোক না কেন—মুসলিম ও কাফেরদের মধ্যে এই ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই। আর এই জন্য তাকে তাওবারও কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।
কটূক্তিকারী যদি মুসলমান হয় তা হলে এতে সে মুরতাদ হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি কাফের যিম্মি হয়, তা হলে এতে তার নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যাবে।
ইমাম আহমাদের জমহুর বা অধিকাংশ অনুসারীই অনুরূপ বলেছেন যে, এ ধরনের লোককে হত্যা করা হবে। তাকে তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে বলা হবে কিংবা তাকে তাওবা করতে বলা হবে—এই জাতীয় কথা তারা বলেননি। এমনকি যারা নবীর মায়ের ওপর অপবাদ আরোপ করবে, ওকেও অবিলম্বে হত্যা করার কথা তারা বলেছেন। তাকে তাওবার সুযোগ দেওয়ার কথা তারা বলেননি। আর যদি নবীজিকে গালমন্দ করার অপরাধ ছাড়া অন্য কোনো কারণে যদি কেউ মুরতাদ হয়ে থাকে, তা হলে তাকে তাওবার সুযোগ দেওয়া হবে। তবে সুযোগ দেওয়াটা কি ওয়াজিব না মুস্তাহাব, এ ব্যাপারে তাদের দুই ধরনের রেওয়ায়াতই আছে।
যদি কোনো মুসলিম নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালি দেয় এবং পুনরায় ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে তাওবা করে, অথবা যদি কোনো যিম্মি কটূক্তি করে আবার সেই কটূক্তি প্রত্যাহার করে নিরাপত্তা-চুক্তিতে ফিরে আসে, তবে তার তাওবা বা ফিরে-আসা গ্রহণযোগ্য হবে কি না, এ ব্যাপারে কাযি ইয়ায রাহিমাহুল্লাহ-সহ অনেকেই বলেন-যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করবে, তাদের তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা, গালি দেওয়ার ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যে অসম্মান করার, তা তো হয়েই গেছে। তাওবা করার ফলে তা দূরীভূত হবে না। ইবনে আকিলও অনুরূপ বলেছেন। তিনি বলেছেন, (কটূক্তির দ্বারা মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হক লঙ্ঘন হয়েছে), যা বান্দার হক। তাওবার দ্বারা বান্দার হক রহিত হয় না। হাম্বলী মাজহাবের শীর্ষ আলেমগণ বলেন, কটূক্তিকারী তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। তাওবা করলেও তাকে হত্যা করা হবে।
এক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করেছেন ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেঈ রাহিমাহুমুল্লাহ। তারা বলেন, গালিদাতা যদি মুসলিম হয় তা হলে তাকে তাওবা করতে বলা হবে। তাওবা করলে ভালো, অন্যথায় তাকে হত্যা করা হবে। আর যদি কটূক্তিকারী অমুসলিম বা যিম্মি হয়, তবে যিম্মি মুসলিম হলে তার নিরাপত্তা-চুক্তি ভাঙবে না। অবশ্য শাফেঈ মাজহাবের অনুসারীগণ এ মাসআলায় মতবিরোধ করেছেন।
শাফেঈ মাজহাবের নির্ভরযোগ্য একজন বর্ণনাকারী হলেন ইমাম শরিফ রাহিমাহুল্লাহ। আল-ইরশাদ নামক গ্রন্থে তিনি বলেন, 'যে ব্যক্তি নবীজিকে গালি দিবে তাকে হত্যা করা হবে। তাওবার সুযোগ দেওয়া হবে না। গালিদাতা যদি কাফের যিম্মি হয় এবং ইসলামও গ্রহণ করে, তবুও তাকে হত্যা করা হবে।'
আবু আলী ইবনুল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি নবীজিকে গালি দিবে তাকে হত্যা করা ওয়াজিব। তার তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। কাফের গালি দেওয়ার পর যদি ইসলাম গ্রহণ করে, তবুও মাজহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী তাকে হত্যা করতে হবে। তাওবার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।'
মালিকি মাজহাব
এ ব্যাপারে মালিকি মাজহাবও আমাদের মাজহাবের মতোই। তাদের মতেও কটূক্তিকারীকে হত্যা করা ওয়াজিব। চাই সে মুসলমান হোক বা কাফের। তাওবা, ইসলাম-গ্রহণ বা অন্য কোনো কিছুতে এ বিধান রহিত হবে না।
জামিউস সাগির গ্রন্থে কাযি ইয়ায রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি নবীজিকে গালি দিবে তাকে হত্যা করা হবে। তার তাওবা কবুল করা হবে না। তবে সে যদি কাফের হয় তা হলে তার ব্যাপারে দুই ধরনের বক্তব্য রয়েছে।
যে ব্যক্তি নবীজির মা-কে গালি দিবে—আবুল খাত্তাব রাহিমাহুল্লাহ ওই ব্যক্তির ব্যাপারেও অনুরূপ বিধানের কথা বলেছেন যে, ওকে হত্যা করা হবে। ওর তাওবা কবুল করা হবে না। যদি সে কাফের হয় তবে তার ব্যাপারে দুই রকম বক্তব্য রয়েছে।
ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ-এর কতিপয় সঙ্গী তাঁর থেকে ভিন্ন একটি মত বর্ণনা করেছেন যে, কোনো মুসলমান নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালি দেওয়ার পর তার কৃতকর্মের ওপর অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করলে, তা গ্রহণ করা হবে। আবুল খাত্তাব এবং তাঁর অনুসারী কতিপয় পরবর্তী (মুতাআখখির) আলেম এমনটিই উল্লেখ করেছেন।
সারসংক্ষেপ
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে গালি দিবে, তার তাওবা গ্রহণ করা হবে কি না, এ ব্যাপারে ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে তিন ধরনের বর্ণনা রয়েছে।
১. গ্রহণ করা হবে না। এ বক্তব্যটিই দলিল-প্রমাণের দিক থেকে অধিক শক্তিশালী।
২. গ্রহণ করা হবে।
৩. এ বিধানের ক্ষেত্রে কাফের এবং মুসলমানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কাফেরের তাওবা কবুল হবে। মুসলমানের তাওবা কবুল হবে না। কাফের তাওবা করার অর্থ হলো, মুসলিম হয়ে যাওয়া। তা না হয়ে যদি গালি প্রত্যাহার করে এবং পুনরায় নিরাপত্তা-চুক্তির আবেদন জানায়, তবে তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে না।
যে বর্ণনা অনুযায়ী মুসলমানের তাওবা গ্রহণযোগ্য হয়, সে বর্ণনা অনুযায়ী অমুসলিম যিম্মি গালি প্রত্যাহার করে নিলে, নিরাপত্তা-চুক্তিতে ফিরে আসার বৈধতাও সাব্যস্ত হয়। অথচ এর পক্ষে কোনো মনীষীর উদ্ধৃতি নেই।
আবুল খাত্তাবের বর্ণনা অনুযায়ী অমুসলিম যিম্মি ইসলাম গ্রহণ করলে তার হত্যা রহিত হবে। আর যারা বলেন, 'প্রতিটি কাফেরকে দাওয়াত দেওয়া ওয়াজিব' তাদের বক্তব্য অনুযায়ী অমুসলিম যিম্মিকে তাওবা করতে বলাও ওয়াজিব।
মালিকি মাজহাবের শীর্ষ আলেমগণ তাওবা গ্রহণযোগ্য হওয়া না-হওয়ার ব্যাপারে মুসলিম-অমুসলিমের মাঝে যে পার্থক্য বর্ণনা করেছেন ইমাম সামিরি রাহিমাহুল্লাহ তাঁর সম্পূর্ণ বিপরীত মত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মুসলমানের তাওবা গ্রহণযোগ্য হওয়া না-হওয়া উভয় বর্ণনাই আছে। তবে কাফেরের তাওবা যে গ্রহণযোগ্য হবে না, এ ব্যাপারে ভিন্ন কোনো বর্ণনা নেই। মূলত বিষয়টি এমন নয়। কেননা, এতে সন্দেহ নেই যে, কোনো মুসলমান পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করে তাওবা করলে তা যদি গ্রহণযোগ্য হয়, তবে কোনো অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করে তাওবা করলে তা গ্রহণযোগ্য হওয়া আরও অধিক যুক্তিযুক্ত।
অতএ, শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, সামিরি রাহিমাহুল্লাহ যে পার্থক্য করেছেন, তার ব্যাখ্যায় বলা হয় যে, কদাচিৎ গালি যদি মুসলমান থেকে ভুলবশত প্রকাশ পায়-যা বিশ্বাসগত দিক থেকে নয়-তবে এটাকে তার কলম ও জবানের বিচ্যুতি ধরে তার তাওবা কবুল করা হবে। আর কাফেরের ক্ষেত্রে তা যদি নিঃসন্দেহে শুধু কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে হয়, তবে এতে যখন তার ওপর হদ ওয়াজিব হবে তখন অন্যান্য হদের মতো ইসলাম-গ্রহণ করার ফলে তা রহিত হবে না।
মোদ্দা কথা
ইমাম আহমাদের প্রসিদ্ধ বর্ণনা-মতে, (কটূক্তি করলে) মুসলিম-অমুসলিম কাউকেই তাওবা করতে বলা হবে না। যদি সে স্বতঃস্ফূর্ত তাওবা করে তবুও তা কবুল করা হবে না।
তাঁর থেকে আরেকটি বর্ণনা আছে যে, যিম্মি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করলে তার থেকে হত্যা রহিত হয়ে যাবে। আরও একটি বর্ণনা আছে যে, মুসলমানকে তাওবা করতে বলা হবে। সে তাওবা করলে তার তাওবা গ্রহণ করা হবে।
এর ওপর কিয়াস করে বলা হয় যে, যিম্মিকেও তাওবা করতে বলা হবে। তবে কিয়াস সুদূর পরাহত।
📄 গালি এবং অপবাদের মধ্যে বিধানগত পার্থক্য
হাম্বলী মাজহাব হত্যা ওয়াজিব হওয়ার ক্ষেত্রে গালি এবং অপবাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ, তাঁর সকল সঙ্গী ও অধিকাংশ আলেমদের।
তবে আল্লামা ইবনে কুদামাহ রাহিমাহুল্লাহ অপবাদ ও গালির মধ্যে পার্থক্য করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর অপবাদ আরোপ করার পর তাওবা করলে তার তাওবা কবুল হবে কি না, এ ব্যাপারে দুই ধরনের বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। এরপর বলেছেন, অপবাদ আরোপ না করে যদি এমনিতেই তাঁকে গালি দেয় কিংবা তাঁর ব্যাপারে মন্দ কথা বলে, তা হলেও হুকুম অনুরূপই। অর্থাৎ, তাকে হত্যা করা ওয়াজিব। তবে সে যদি ইসলাম গ্রহণ করে, তা হলে তার হত্যার বিধান রহিত হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা চতুর্থ মাসআলাতে করা হয়েছে।
মালিকি মাজহাব মালিকি মাজহাব অনুসারে যে ব্যক্তি নবীজিকে গালি দিবে, তাকে হত্যা করা হবে। এ জন্য তাকে তাওবা করতে বলা হবে না। ইমাম মালিকের প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, কোনো মুসলমান নবীজিকে গালি দেওয়ার পর তাওবা করলেও, তার তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। তার বিধান যিন্দিকের বিধানের অনুরূপ হবে। হদ বা দণ্ডবিধি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তাকে হত্যা করা হবে। কেননা, তাওবা করলেও হদ রহিত হয় না।
ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ থেকে আরেকটি বর্ণনা আছে যে, তিনি একে রিদ্দাহ তথা ধর্মান্তর সাব্যস্ত করেছেন। এর ওপর ভিত্তি করে তাঁর অনুসারীগণ বলেছেন,
মুসলিমকে তাওবা করতে বলা হবে। যদি তাওবা করে, তা হলে হত্যা করা হবে না। অন্যথায় হত্যা করা হবে। আর অমুসলিম-যিম্মি যদি নবীজিকে গালি দেওয়ার পর ইসলাম গ্রহণ করে, তা হলে তার ইসলাম-গ্রহণ হত্যা রহিত করবে কি না, এ ব্যাপারে দুই ধরনের বক্তব্যই রয়েছে।
শাফেঈ মাজহাব
শাফেঈ মাজহাবে নবীজিকে গালিদাতার ব্যাপারে দুটি বক্তব্য রয়েছে: ১. তার বিধান মুরতাদের বিধানের ন্যায়। তাওবা করলে হত্যা রহিত হয়ে যাবে। ২. তার হদ বা নির্ধারিত দণ্ডবিধি হচ্ছে হত্যা। যা কিনা কোনো অবস্থাতেই রহিত হবে না।
আবু বকর সাইদালালি রাহিমাহুল্লাহ তৃতীয় আরেকটি বক্তব্য উল্লেখ করেছেন যে, সেই গালি বা মন্দকথা যদি মিথ্যা অপবাদ হয়, তা হলে তার হুকুম রিদ্দাহ তথা ধর্মান্তরিতের ন্যায়। ধর্মান্তরের কারণে তাকে হত্যা করা হবে। যদি তাওবা করে, তা হলে হত্যা রহিত হয়ে যাবে। তবে অপবাদের শাস্তিস্বরূপ ৮০টি বেত্রাঘাত করা হবে। আর যদি তা অপবাদ না হয়, বরং স্রেফ গালি হয় তা হলে তাকে তার অবস্থা অনুপাতে শাস্তি দেওয়া হবে।
যারা বলেছেন নবীজিকে গালিদাতার কোনো প্রকারের তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না, শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ তাদের পক্ষে বিস্তারিত দলিল-প্রমাণ উল্লেখ করেছেন এবং প্রতিপক্ষের দলিল-প্রমাণগুলো খণ্ডন করে সমুচিত জবাবও দিয়েছেন। (নবীজিকে গালিদাতার কোনো তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে না) এই মর্মে কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস থেকে এমন সব দলিল-প্রমাণ এনেছেন, যেগুলো খণ্ডন করার সাধ্য কারও নেই। যার কলেবর দেশীয় আটটি খাতা সমপরিমাণ হবে। বিস্তারিত জানতে শাইখুল ইসলামের সেই অমর গ্রন্থটি অধ্যয়ন করা যেতে পারে।