📘 আস সারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসূল > 📄 ইজমা থেকে প্রমাণ

📄 ইজমা থেকে প্রমাণ


সাহাবাগণ এই মাসআলায় ইজমা বা ঐকমত্য পোষণ করেছেন। কেননা এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনায় সাহাবাগণ থেকে একই রকম কথা ও মতামত বর্ণিত হয়েছে, কারও থেকেই ভিন্ন কোনো মত বা কথা সাব্যস্ত নেই। তাই বলা যায়, এ বিষয়ে সাহাবিগণের ইজমা সাব্যস্ত হয়ে যায়।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, জানা জরুরি যে, কোনো শাখাগত মাসআলায় সাহাবাগণের ইজমা আছে—প্রমাণ করার যত পদ্ধতি আছে সবগুলোর মধ্যে ওপরে বর্ণিত পদ্ধতিই উত্তম।[৯৯] এ-জাতীয় ঘটনায় সাহাবিগণের কিছু কর্মপদ্ধতি তুলে ধরা হলো।
১/
সাইফ ইবনে উমর আত-তামিমি বর্ণনা করেন। মুহাজির আল-মাখযুমি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সামনে দুজন গায়িকাকে আনা হলো। তাদের একজন নবীজিকে কটূক্তি করে গান গেয়েছিল। মুহাজির আল-মাখযুমি রাদিয়াল্লাহু আনহু তার এক হাত কেঁটে ফেললেন এবং তার সামনের দাঁতগুলো উপড়ে ফেললেন। আরেকজন মুসলমানদেরকে বিষদাগার করে গান গেয়েছিল। তিনি তার এক হাত কেঁটে ফেললেন এবং তারও সামনের দাঁতগুলো উপড়ে ফেললেন।
পরে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মুহাজির আল-মাখযুমির নিকট পত্র লিখেন: 'যে নারী নবীজিকে কটূক্তি করে গান গেয়েছিল, তার বিষয়ে আপনার ফয়সালার সংবাদ আমার কাছে পৌঁছেছে। যদি আপনি আমাকে আগে জানাতেন, আমি আপনার প্রতি তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিতাম। কেননা নবীদেরকে কটূক্তি করার শাস্তি অন্যন্য শাস্তির মতো নয়। এহেন কাজ কোনো মুসলিম করলে সে মুরতাদ, আর কোনো যিম্মি করলে সে বিশ্বাসঘাতক ও কতলের উপযুক্ত।
আর যে নারী মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ-পোষণ করে গান গেয়েছিল, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু পত্রে তার ব্যাপারে লিখেন: 'আমার নিকট এও সংবাদ এসেছে যে, মুসলিমদেরকে নিন্দা করে গান গাওয়ার অপরাধে আপনি এক নারীর হাত কেটে দিয়েছেন ও সামনের একটা দাঁত উপড়ে ফেলেছেন। সে যদি মুসলিম নারী হয়ে থাকে, তা হলে তাকে আদব শিক্ষা দেওয়া দরকার ছিল, তবে আদব শিখাতে গিয়ে শারীরিক বিকৃতি করা যাবে না। আর সে যদি যিম্মি হয়, তা হলে তো আপনি যে শিরক ক্ষমা করেছেন, তা আরও গুরুতর ছিল। এমন কোনো অপরাধ করে যদি আমি আপনার কাছে উপস্থিত হতাম তা হলে আমি আপনার নিন্দার উপযুক্ত হতাম। সহজতার নীতি অবলম্বন করুন, মানুষের দেহ বিকৃতকরণ থেকে বিরত থাকুন। অন্য কোনো অপরাধের কারণে অঙ্গবিকৃতি করা যাবে না। কেননা তা মানুষের মনে বৈরিতা সৃষ্টির উপকরণ, তবে কিসাসের বিধানের কথা ভিন্ন।'
সাইফ আত-তামিমি ছাড়াও অন্যরা ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। উপরিউক্ত বর্ণনার সাথে তাদের বর্ণনার মিল রয়েছে। তবে তাদের বর্ণনায় এ কথাটুকুও আছে-'যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কটূক্তি করবে, তাকে হত্যা করা হবে তবে নবীজি ছাড়া অন্য কাউকে কটূক্তি করলে হত্যা করা যাবে না।'
হাদীসের ভাষ্য এই ব্যাপারে স্পষ্ট যে, যে-ই নবীজিকে গালি দিবে তাকেই হত্যা করতে হবে। মুসলিম গালি দিক কিংবা যিম্মি, কিংবা নারী—যেই হোক না কেন, তাকে তাওবা সুযোগ না দিয়েই হত্যা করা হবে। তবে অন্যান্যদেরকে গালি দিলে হত্যা করা হবে না। অন্যদেরকে গালি দেওয়ার শাস্তি যেমন বেত্রাঘাত, তেমনি নবীগণকে গালি দেওয়ার শাস্তি কতল।
তবে (উল্লেখিত) হাদীসে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মুহাজির আল-মাখযুমি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে এমন কোনো আদেশ করেননি যে, ওই মহিলাকে হত্যা করে ফেলতে হবে। কেননা মুহাজির আল-মাখযুমি রাদিয়াল্লাহু আনহু ইজতিহাদ করে ইতিমধ্যেই তাকে একটি শাস্তি দিয়েছেন। তাই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু একই সাথে দুই ধরনের শাস্তি দেওয়াটা অপছন্দ করেছেন।
এও হতে পারে, কটূক্তিকারী ইসলাম গ্রহণ করেছিল কিংবা পূর্ব থেকেই মুসলিম হলে তাওবা করেছিল, আর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পত্র তাঁর হাতে পৌঁছার পূর্বেই মুহাজির রাদিয়াল্লাহু আনহু তার ইসলাম বা তাওবাকে গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নিয়েছিলেন। ইজতিহাদ করে আগেই একপ্রকারের ফয়সালা হয়ে গেছে, তাই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুও ইজতিহাদি ফয়সালাকে আর পরিবর্তন করেননি। কারণ মূলনীতি হলো যে, একজনের ইজতিহাদকে অন্যজনের ইজতিহাদ দিয়ে প্রত্যাখ্যান করা যায় না।
২/
হারব আল-কিরমানি রাহিমাহুল্লাহ তাঁর মাসায়িলু হারব লিল ইমাম আহমাদ গ্রন্থে ইমাম লাইস থেকে বর্ণনা করেন, মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এক লোককে নিয়ে আসা হলো। সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করেছিল। উমর তাকে হত্যা করেন। তারপর তিনি বলেন, ‘কেউ যদি আল্লাহ, তাঁর রাসূল অথবা কোনো নবীকে কটূক্তি করে, তা হলে তাকে হত্যা করো।’
মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন- ‘যদি কোনো মুসলিম আল্লাহ, তাঁর রাসূল অথবা অন্যকোনো নবীকে গালি দেয়, তা হলে সে অবশ্যই আল্লাহর রাসূলকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করল। আর আল্লাহর রাসূলকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করার অর্থ দ্বীন পরিত্যাগ। তাকে তাওবার সুযোগ দেওয়া হবে। যদি সে তাওবা করে তা হলে তার তাওবা গ্রহণ করা হবে, অন্যথায় তাকে হত্যা করা হবে। আর কোনো যিম্মি যদি কোনো নবীকে গালি দেয়, তা হলে সে তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করল, তোমরা তাকে হত্যা করো।’
হারব আল-কিরমানি রাহিমাহুল্লাহ আরও বর্ণনা করেন যে, আন-নাবাতি নামক এক ব্যক্তি নবীজিকে গালমন্দ করেছিল। যখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু শামে প্রবেশ করেন তখন সে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট পত্র লিখেছিল। প্রত্যুত্তরে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেন, ‘আমরা তো তোমাকে এ জন্য নিরাপত্তা দিইনি যে, তুমি আমাদের বিরুদ্ধে গিয়ে আমাদেরই দ্বীনে নাক-গলাবে। তুমি যদি এ রকম কাজ আবার করো, তা হলে আমি তোমার গর্দান উড়িয়ে দিব!’
এই হলেন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু! তিনি যাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন, তাকে তিনি আনসার ও মুহাজির সাহাবিগণের উপস্থিতিতে বলছেন, ‘আমরা দ্বীনে নাক-গলানোর জন্য তোমাকে নিরাপত্তা দিইনি।’ (সাহাবিগণের উপস্থিতিতে) উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কসম করে বলেছিলেন, ‘সে যদি এ কাজ পুনরায় করে তা হলে তার গর্দান উড়িয়ে দিব।’
এখান থেকে বোঝা গেল, এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের ইজমা হয়ে গিয়েছিল যে, আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে আপত্তি করার অধিকার কোনো যিম্মির নেই এবং দ্বীন নিয়ে আপত্তি করলে যিম্মির রক্ত হালাল হয়ে যায়। আর সবচেয়ে বড় আপত্তি হলো নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করা। এটা পরিষ্কার কথা, কোনো অস্পষ্টতা নেই।
ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সম্পর্কে বর্ণিত যে, তিনি এক পাদরির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তাকে বলা হলো, এই পাদরি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করে। ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, 'আমি যদি শুনতাম, তা হলে তাকে কতল করতাম।'
একাধিক বর্ণনাকারী এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে সাবিগের ঘটনা-সম্বলিত হাদীসটি ইতিপূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-সহ অন্যন্য উম্মুল মুমিনীনদের ব্যাপারে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর হাদীসও পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে।
এ ছাড়াও খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি এক নারীকে হত্যা করেছিলেন, কারণ সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করেছিল। হাদীসটি ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন।[১০০]
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ সনদ-সহ বর্ণনা করেন যে, এক নাসারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করেছিল, আর গারাফা ইবনে হারিস আল-কিন্দি রাদিয়াল্লাহু আনহু-নামক জনৈক সাহাবি তা শুনেছিলেন। তখন তিনি আঘাত করে তার নাকের হাড্ডি গুড়ো করে ফেলেন। ফলে বিষয়টি আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে উত্থাপিত হয়। তিনি গারাফা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, 'আমরা তো এদেরকে নিরাপত্তা দিয়েছি।' গারাফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহর পানাহ! রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালি দেওয়ার পরও আমরা তাকে নিরাপত্তা দিব?' তখন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'না! তুমি ঠিক বলেছ!'[১০১]
এই হলো সাহাবা ও তাঁদের একনিষ্ঠ তাবেয়ীগণের কিছু বক্তব্য। আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর সন্তুষ্ট থাকুন।

টিকাঃ
[৯৯] অর্থাৎ এ-জাতীয় ঘটনায় সকল থেকে একই ধরনের কথা বর্ণিত হয়েছে, কারো থেকে ব্যতিক্রম কথা আসেনি।
[১০০] খাল্লাল, আল-জামি: ২/৩৪২。
[১০১] মূলত ঘটনাটি ঘটেছিল উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে। যথাসম্ভব এখানে ভুলক্রমে আমর ইবনুল আসের নাম এসেছে। (অনুবাদক)

সাহাবাগণ এই মাসআলায় ইজমা বা ঐকমত্য পোষণ করেছেন। কেননা এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনায় সাহাবাগণ থেকে একই রকম কথা ও মতামত বর্ণিত হয়েছে, কারও থেকেই ভিন্ন কোনো মত বা কথা সাব্যস্ত নেই। তাই বলা যায়, এ বিষয়ে সাহাবিগণের ইজমা সাব্যস্ত হয়ে যায়।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, জানা জরুরি যে, কোনো শাখাগত মাসআলায় সাহাবাগণের ইজমা আছে—প্রমাণ করার যত পদ্ধতি আছে সবগুলোর মধ্যে ওপরে বর্ণিত পদ্ধতিই উত্তম।[৯৯] এ-জাতীয় ঘটনায় সাহাবিগণের কিছু কর্মপদ্ধতি তুলে ধরা হলো।
১/
সাইফ ইবনে উমর আত-তামিমি বর্ণনা করেন। মুহাজির আল-মাখযুমি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সামনে দুজন গায়িকাকে আনা হলো। তাদের একজন নবীজিকে কটূক্তি করে গান গেয়েছিল। মুহাজির আল-মাখযুমি রাদিয়াল্লাহু আনহু তার এক হাত কেঁটে ফেললেন এবং তার সামনের দাঁতগুলো উপড়ে ফেললেন। আরেকজন মুসলমানদেরকে বিষদাগার করে গান গেয়েছিল। তিনি তার এক হাত কেঁটে ফেললেন এবং তারও সামনের দাঁতগুলো উপড়ে ফেললেন।
পরে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মুহাজির আল-মাখযুমির নিকট পত্র লিখেন: 'যে নারী নবীজিকে কটূক্তি করে গান গেয়েছিল, তার বিষয়ে আপনার ফয়সালার সংবাদ আমার কাছে পৌঁছেছে। যদি আপনি আমাকে আগে জানাতেন, আমি আপনার প্রতি তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিতাম। কেননা নবীদেরকে কটূক্তি করার শাস্তি অন্যন্য শাস্তির মতো নয়। এহেন কাজ কোনো মুসলিম করলে সে মুরতাদ, আর কোনো যিম্মি করলে সে বিশ্বাসঘাতক ও কতলের উপযুক্ত।
আর যে নারী মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ-পোষণ করে গান গেয়েছিল, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু পত্রে তার ব্যাপারে লিখেন: 'আমার নিকট এও সংবাদ এসেছে যে, মুসলিমদেরকে নিন্দা করে গান গাওয়ার অপরাধে আপনি এক নারীর হাত কেটে দিয়েছেন ও সামনের একটা দাঁত উপড়ে ফেলেছেন। সে যদি মুসলিম নারী হয়ে থাকে, তা হলে তাকে আদব শিক্ষা দেওয়া দরকার ছিল, তবে আদব শিখাতে গিয়ে শারীরিক বিকৃতি করা যাবে না। আর সে যদি যিম্মি হয়, তা হলে তো আপনি যে শিরক ক্ষমা করেছেন, তা আরও গুরুতর ছিল। এমন কোনো অপরাধ করে যদি আমি আপনার কাছে উপস্থিত হতাম তা হলে আমি আপনার নিন্দার উপযুক্ত হতাম। সহজতার নীতি অবলম্বন করুন, মানুষের দেহ বিকৃতকরণ থেকে বিরত থাকুন। অন্য কোনো অপরাধের কারণে অঙ্গবিকৃতি করা যাবে না। কেননা তা মানুষের মনে বৈরিতা সৃষ্টির উপকরণ, তবে কিসাসের বিধানের কথা ভিন্ন।'
সাইফ আত-তামিমি ছাড়াও অন্যরা ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। উপরিউক্ত বর্ণনার সাথে তাদের বর্ণনার মিল রয়েছে। তবে তাদের বর্ণনায় এ কথাটুকুও আছে-'যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কটূক্তি করবে, তাকে হত্যা করা হবে তবে নবীজি ছাড়া অন্য কাউকে কটূক্তি করলে হত্যা করা যাবে না।'
হাদীসের ভাষ্য এই ব্যাপারে স্পষ্ট যে, যে-ই নবীজিকে গালি দিবে তাকেই হত্যা করতে হবে। মুসলিম গালি দিক কিংবা যিম্মি, কিংবা নারী—যেই হোক না কেন, তাকে তাওবা সুযোগ না দিয়েই হত্যা করা হবে। তবে অন্যান্যদেরকে গালি দিলে হত্যা করা হবে না। অন্যদেরকে গালি দেওয়ার শাস্তি যেমন বেত্রাঘাত, তেমনি নবীগণকে গালি দেওয়ার শাস্তি কতল।
তবে (উল্লেখিত) হাদীসে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মুহাজির আল-মাখযুমি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে এমন কোনো আদেশ করেননি যে, ওই মহিলাকে হত্যা করে ফেলতে হবে। কেননা মুহাজির আল-মাখযুমি রাদিয়াল্লাহু আনহু ইজতিহাদ করে ইতিমধ্যেই তাকে একটি শাস্তি দিয়েছেন। তাই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু একই সাথে দুই ধরনের শাস্তি দেওয়াটা অপছন্দ করেছেন।
এও হতে পারে, কটূক্তিকারী ইসলাম গ্রহণ করেছিল কিংবা পূর্ব থেকেই মুসলিম হলে তাওবা করেছিল, আর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পত্র তাঁর হাতে পৌঁছার পূর্বেই মুহাজির রাদিয়াল্লাহু আনহু তার ইসলাম বা তাওবাকে গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নিয়েছিলেন। ইজতিহাদ করে আগেই একপ্রকারের ফয়সালা হয়ে গেছে, তাই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুও ইজতিহাদি ফয়সালাকে আর পরিবর্তন করেননি। কারণ মূলনীতি হলো যে, একজনের ইজতিহাদকে অন্যজনের ইজতিহাদ দিয়ে প্রত্যাখ্যান করা যায় না।
২/
হারব আল-কিরমানি রাহিমাহুল্লাহ তাঁর মাসায়িলু হারব লিল ইমাম আহমাদ গ্রন্থে ইমাম লাইস থেকে বর্ণনা করেন, মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এক লোককে নিয়ে আসা হলো। সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করেছিল। উমর তাকে হত্যা করেন। তারপর তিনি বলেন, ‘কেউ যদি আল্লাহ, তাঁর রাসূল অথবা কোনো নবীকে কটূক্তি করে, তা হলে তাকে হত্যা করো।’
মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন- ‘যদি কোনো মুসলিম আল্লাহ, তাঁর রাসূল অথবা অন্যকোনো নবীকে গালি দেয়, তা হলে সে অবশ্যই আল্লাহর রাসূলকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করল। আর আল্লাহর রাসূলকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করার অর্থ দ্বীন পরিত্যাগ। তাকে তাওবার সুযোগ দেওয়া হবে। যদি সে তাওবা করে তা হলে তার তাওবা গ্রহণ করা হবে, অন্যথায় তাকে হত্যা করা হবে। আর কোনো যিম্মি যদি কোনো নবীকে গালি দেয়, তা হলে সে তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করল, তোমরা তাকে হত্যা করো।’
হারব আল-কিরমানি রাহিমাহুল্লাহ আরও বর্ণনা করেন যে, আন-নাবাতি নামক এক ব্যক্তি নবীজিকে গালমন্দ করেছিল। যখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু শামে প্রবেশ করেন তখন সে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট পত্র লিখেছিল। প্রত্যুত্তরে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেন, ‘আমরা তো তোমাকে এ জন্য নিরাপত্তা দিইনি যে, তুমি আমাদের বিরুদ্ধে গিয়ে আমাদেরই দ্বীনে নাক-গলাবে। তুমি যদি এ রকম কাজ আবার করো, তা হলে আমি তোমার গর্দান উড়িয়ে দিব!’
এই হলেন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু! তিনি যাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন, তাকে তিনি আনসার ও মুহাজির সাহাবিগণের উপস্থিতিতে বলছেন, ‘আমরা দ্বীনে নাক-গলানোর জন্য তোমাকে নিরাপত্তা দিইনি।’ (সাহাবিগণের উপস্থিতিতে) উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কসম করে বলেছিলেন, ‘সে যদি এ কাজ পুনরায় করে তা হলে তার গর্দান উড়িয়ে দিব।’
এখান থেকে বোঝা গেল, এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের ইজমা হয়ে গিয়েছিল যে, আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে আপত্তি করার অধিকার কোনো যিম্মির নেই এবং দ্বীন নিয়ে আপত্তি করলে যিম্মির রক্ত হালাল হয়ে যায়। আর সবচেয়ে বড় আপত্তি হলো নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করা। এটা পরিষ্কার কথা, কোনো অস্পষ্টতা নেই।
ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সম্পর্কে বর্ণিত যে, তিনি এক পাদরির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তাকে বলা হলো, এই পাদরি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করে। ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, 'আমি যদি শুনতাম, তা হলে তাকে কতল করতাম।'
একাধিক বর্ণনাকারী এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে সাবিগের ঘটনা-সম্বলিত হাদীসটি ইতিপূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-সহ অন্যন্য উম্মুল মুমিনীনদের ব্যাপারে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর হাদীসও পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে।
এ ছাড়াও খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি এক নারীকে হত্যা করেছিলেন, কারণ সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করেছিল। হাদীসটি ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন।[১০০]
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ সনদ-সহ বর্ণনা করেন যে, এক নাসারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করেছিল, আর গারাফা ইবনে হারিস আল-কিন্দি রাদিয়াল্লাহু আনহু-নামক জনৈক সাহাবি তা শুনেছিলেন। তখন তিনি আঘাত করে তার নাকের হাড্ডি গুড়ো করে ফেলেন। ফলে বিষয়টি আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে উত্থাপিত হয়। তিনি গারাফা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, 'আমরা তো এদেরকে নিরাপত্তা দিয়েছি।' গারাফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহর পানাহ! রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালি দেওয়ার পরও আমরা তাকে নিরাপত্তা দিব?' তখন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'না! তুমি ঠিক বলেছ!'[১০১]
এই হলো সাহাবা ও তাঁদের একনিষ্ঠ তাবেয়ীগণের কিছু বক্তব্য। আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর সন্তুষ্ট থাকুন।

টিকাঃ
[৯৯] অর্থাৎ এ-জাতীয় ঘটনায় সকল থেকে একই ধরনের কথা বর্ণিত হয়েছে, কারো থেকে ব্যতিক্রম কথা আসেনি।
[১০০] খাল্লাল, আল-জামি: ২/৩৪২。
[১০১] মূলত ঘটনাটি ঘটেছিল উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে। যথাসম্ভব এখানে ভুলক্রমে আমর ইবনুল আসের নাম এসেছে। (অনুবাদক)

📘 আস সারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসূল > 📄 কিয়াস থেকে প্রমাণ

📄 কিয়াস থেকে প্রমাণ


কুরআন, হাদীস ও সাহাবি-তাবেয়ীদের বক্তব্য থেকে বিভিন্নভাবেই শিক্ষা নেওয়া যায়-
১/ আমাদের দ্বীনের দোষ-ধরা ও আমাদের নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তি করার অর্থ আমাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও যুদ্ধ ঘোষণা করা। হাত দ্বারা যুদ্ধ করলে যেমন নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যায়, মুখ দ্বারা আঘাতের দ্বারাও নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যাবে, বরং আরও আগেই ভাঙবে। আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণী আমাদের কথাকে আরও সুস্পষ্ট করে-
وَجَاهِدُوا بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ 'আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তোমাদের জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করো।[১০২]
জীবন দিয়ে জিহাদ দুভাবে হতে পারে—জিহ্বা দিয়ে ও হাত দিয়ে।
২/ আমরা যিম্মিদেরকে তাদের কুফরি বিশ্বাসসমূহের ওপর বহাল থাকার স্বীকৃতি দিয়েছি এ কথা মেনেই যে, তারা গোপনে আমাদের সাথে শত্রুতা রাখে। তবে তারা যদি প্রকাশ্যে আল্লাহ, রাসূল ও দ্বীনকে কটূক্তি প্রকাশ করে, তবে এটা যুদ্ধ ঘোষণার নামান্তর। এর ফলে নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যায়।
৩/ আমাদের মাঝে আর কাফেরদের মাঝে যদি কোনো সাধারণ নিরাপত্তা-চুক্তি সম্পাদিত হয় তা হলে এর অনিবার্য দাবি হলো— তারা যেভাবে চুক্তিবদ্ধ অবস্থায় রক্তপাত থেকে বিরত থাকে, সেভাবে তারা অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শানে কটূক্তি করা থেকেও বিরত থাকবে। বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কটূক্তি করা আমাদের কাছে রক্তপাতের চেয়েও জঘন্য অপরাধ। কেননা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মান ও দ্বীনের বিজয়ের জন্য আমরা আমাদের জান-মাল বিলিয়ে দিই। আর আমাদের দ্বীনের এ বিষয়গুলো তারাও জানে। এরপরও যখন তারা এর অন্যথা করবে, তখন তাদের নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যাবে।
৮/
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কাফেরদের সাথে যে নিরাপত্তা-চুক্তি করেছিলেন সেখানেও তিনি এ শর্ত স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছিলেন। এমনটাই বর্ণনা করেছেন হারব রাহিমাহুল্লাহ আব্দুর রহমান ইবনে গানম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে সহীহ সনদে।
৫/
যিম্মিদের সাথে আমাদের চুক্তি হয় এই শর্তে যে, ভূখণ্ড আমাদের, এখানে ইসলামের বিধি-বিধান জারি থাকবে। যিম্মিরা অনুগত ও নমনীয় হয়ে। এসব শর্তেই তাদের সাথে চুক্তি ও সন্ধি হয়। এরপর তারা যদি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করে ও দ্বীনকে আঘাত করে কথা বলে, তা হলে এ আচরণ তাদের 'অনুগত ও নমনীয় হয়ে থাকা'র শর্ত পরিপন্থী।
৬/
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমর্থন করা, শক্তি জোগানো, সম্মান করা, সাহায্য করা, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা, তাঁর প্রতি সম্মান প্রকাশ করা আমাদের জন্য ফরয। আল্লাহ (এসব দায়িত্ব) ফরয করেছেন। এ দায়িত্বের অপরিহার্য্য দাবি হলো সর্ব দিক থেকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা।
৭/
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহায্য করা আমাদের জন্য ফরয। কেননা তা আল্লাহর রাসূলকে শক্তি জোগানোর অন্তর্ভুক্ত। আর তা সর্বোত্তম জিহাদ। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ 'যদি তোমরা রাসূলকে সাহায্য না করো, তবে আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছিলেন...।' [১০৩]
বরং প্রতিটি মুসলিমকে সাহায্য করা ওয়াজিব, তা হলে শ্রেষ্ঠ আদম-সন্তান রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহায্য করার বিষয়টি কেমন হতে পারে।
৮/ কাফেরদের সাথে এ শর্তেই চুক্তি করা হয় যে, তাদের ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত যে অন্যায় আছে, সেগুলো তারা প্রকাশ্যে করবে না। যদি তারা এগুলো প্রকাশ করে, তা হলে তাদেরকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। তেমনিভাবে যদি তাদের থেকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি কটূক্তি প্রকাশ পায়, তা হলে তাদেরকে সাঁজা দেওয়া হবে।
৯/ মুসলিমদের মধ্যে এ ব্যাপারে কোনো মতবিরোধ নেই যে, যে-কোনো ধরনের কটূক্তি কাফেরদের জন্য নিষিদ্ধ। কেউ যদি নিষিদ্ধ কোনো কাজ করে তা হলে তাকে শাস্তি পেতে হয়। যেহেতু তাদেরকে কটূক্তির অধিকার দেওয়া হয়নি, তাই তারা যদি এমন অন্যায় করে যার আধিকার তাদেরকে দেওয়া হয়নি তা হলে তারা তো সর্বসম্মতিক্রমে শাস্তির উপযুক্ত হবে।
যিম্মিরা যদি কোনো সাধারণ মুসলিমকেও গালি দেয় তা হলে তাদেরকে বেত্রাঘাত করা হয়, সেখানে কেউ যদি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করে তা হলে তাকে হত্যা করা হবে।
১০/ স্পষ্ট কিয়াস ও যুক্তির দাবি হলো, যে বিষয়ে যিম্মি কাফেরদের সাথে চুক্তি হয়েছে, তার কোনো কিছু যদি তারা ভঙ্গ করে তা হলে তাদের চুক্তিও ভেঙে যাবে, যেমনটা কতিপয় ফকিহ বলেছেন।
যে বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে, তা যদি তারা পূর্ণ না করে তা হলে তো তাদের চুক্তি ভেঙে যাবে, যেমন বিক্রি-জাতীয় চুক্তিও ভেঙে যায় যদি দুই পক্ষের কোনো এক পক্ষ শর্ত পূরণ না করে। কারণটা স্পষ্ট। কেননা উভয় পক্ষের জন্য চুক্তি পূরণ করা আবশ্যক এ শর্তেই যে, তারা উভয়েই শর্ত পূরণ করবে। যখন একজন সে শর্ত পূরণ না করে, তখন অপরের জন্য সেই চুক্তি পূরণ করা অপরিহার্য থাকে না। কেননা সকল বুদ্ধিমানের মতেই, শর্তযুক্ত কোনো কিছু তখনই অপরিহার্য হয় যখন শর্ত পূরণ হয়।
উপরিউক্ত মূলনীতিটি যদি স্পষ্ট হয়ে থাকে তা হলে আমরা বলব, চুক্তিকৃত বিষয়টা যদি কোনো একজন চুক্তিকারীর ব্যক্তিগত অধিকার হয় তা হলে তার অধিকার রয়েছে যে, সে অপর পক্ষ থেকে শর্ত পূরণ ছাড়াই চুক্তি পূরণ করবে। আর এ ধরনের ক্ষেত্রে শর্ত লঙ্ঘন হওয়ার দ্বারা চুক্তি ভেঙে যায় না, তবে তার ভাঙ্গার অধিকার থাকে। যেমন কেউ বাকিতে বিক্রি করার সময় ক্রেতাকে বন্ধক রাখার শর্ত জুড়ে দিল। (পরে ক্রেতা সেই শর্ত পূরণ না করলেও বিক্রেতার বিক্রির চুক্তি বহাল রাখার অধিকার আছে)
আর চুক্তিতে শর্তকৃত বিষয়টি যদি কারও ব্যক্তিগত অধিকার না হয়ে বরং আল্লাহর হক হয় বা কোনো বান্দার হক হয়, আর চুক্তিকারী কেবল তত্ত্বাবধানের অধিকার-বলে তাতে হস্তক্ষেপ করে, তা হলে চুক্তির শর্ত পাওয়া না গেলে চুক্তি ভেঙে যাবে কিংবা এই চুক্তি ভেঙে দেওয়া আবশ্যক হয়ে পড়বে।
উদাহরণ: কেউ কোনো নারীকে স্বাধীন ও মুসলিম হওয়ার শর্তে বিয়ে করল, কিন্তু পরে দেখা গেল, নারীটি মুর্তিপূজারি। (সেক্ষেত্রে বিয়ে ভেঙে যাবে, আলাদা করে বিয়ে ভাঙ্গার প্রয়োজন হবে না)
তেমনি (ইসলামি রাষ্ট্রে) কাফেরদের সাথে যিম্মি বা নিরাপত্তা-দানের চুক্তি করা মুসলিম নেতা বা খলিফার হক নয়, বরং এটা আল্লাহ তাআলা ও সমগ্র মুসলিম জনগণের হক। সুতরাং তারা যদি চুক্তির কোনো শর্ত লঙ্ঘন করে, তা হলে কেউ কেউ বলেন, ইমামের ওপর ওয়াজিব হবে সেই চুক্তি রহিত করা। আর রহিতকরণের স্বরূপ হলো, তাকে নিরাপত্তার সাথে ইসলামি রাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়া হবে। তবে এ মতটা দুর্বল। কেননা যিম্মিদের সাথে করা শর্তগুলো মূলত আল্লাহর হক। তাই খলিফা রহিত না করলেও তা রহিত হয়ে যাবে। আমাদের মূল আলচনা এটিই-যিম্মিদের সাথে শর্তকৃত বিষয়গুলো মূলত আল্লাহর হক। যদি মেনে নেওয়া হয়, তাদেরকে কোনো ধরনের শর্ত ছাড়াই ইসলামী ভূখন্ডে থাকতে দেওয়া হয়েছে, তবুও সে অধিকার ততটুকুই যতটুকু অধিকার মুসলিমদের ক্ষতি না করে দেওয়া সম্ভব। যখন তাদের দ্বারা মুসলিমদের ক্ষতি হবে, তখন কোনো অবস্থাতেই তাদেরকে আর থাকতে দেওয়া হবে না। আর যদি মেনেও নেওয়া হয় যে, মুসলিমদের ক্ষতি হলেও তাদেরকে থাকার অনুমতি দেওয়া হবে, তবুও কোনোভাবেই জায়েজ হতে পারে না এবং মেনে নেওয়া যেতে পারে না যে, আল্লাহর হক লঙ্ঘন হলেও এবং দ্বীনের ক্ষতি হলেও আর তারা ইসলামকে আঘাত করলেও তাদেরকে থাকতে দেওয়া হবে। যিম্মির সাথে করা চুক্তির অপরিহার্য দাবি হলো তারা আল্লাহর রাসূলকে কটূক্তি করবে না। নিঃশর্ত বিক্রির চুক্তিতে যেমন- পণ্য দোষমুক্ত থাকা ও মূল্য নগদ হওয়া শর্ত তেমনিভাবে নিঃশর্ত বিয়ের চুক্তিতে সাধারণ কিছু বিষয় থেকে স্বামী-স্ত্রীকে মুক্ত থাকতে হয়, যেমন স্বাধীন হওয়া, মুসলিম হওয়া ইত্যাদি। কেননা এ-জাতীয় শর্ত স্পষ্ট করে করার প্রয়োজন হয় না, রীতিগতভাবেই বোঝা যায়। একইভাবে কাফেরদের সাথে চুক্তি করার সময় যদিও আল্লাহর রাসূলকে কটূক্তি করা বা দ্বীনকে আঘাত-করা-সংক্রান্ত কোনো শর্ত না থাকে, তবুও জানা কথা, যিম্মিদের সাথে চুক্তির সময় মুসলিমদের উদ্দেশ্য এটাই থাকে যে, তারা কোনোভাবেই নবীকে কটূক্তি করতে পারবে না। যেমন: ধরে নেওয়া হয় যে, তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবে না। রাসূলকে কষ্ট না-দেওয়ার বিষয়টি আরও বেশি কাম্য। কেননা তা অধিক কষ্টদায়ক। তবে কেউ যদি আপত্তি করে বলে যে, 'আমরা তো আবদ্ধ কাফেরদেরকে নিরাপত্তা দিয়েছি এ শর্ত মেনেই যে, তারা তাদের ধর্ম পালন করবে। আর (তাদের ধর্মের বিরোধী হওয়ায়) নবীজিকে গালমন্দ করা (হয়তো) তাদের ধর্মের অংশ!' আমরা তাদের উত্তরে বলব, মুসলিমদের সাথে লড়াই করা, যে-কোনো পন্থায় তাদের ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া এবং মুসলিমদের সাথে শত্রুতা করাও তো তাদের ধর্মের অংশ। তাদের ধর্মের অংশ হলেও মুসলিমদের সাথে চুক্তি রেখে তারা এগুলো করতে পারে না। যখন তারা এ ধরনের কাজ করবে তখন তাদের চুক্তি ভেঙে যাবে। কেননা যদিও আমরা তাদেরকে থাকতে দিয়েছি এ কথা মেনে যে, তারা তাদের যা বিশ্বাস করার করবে এবং যা গোপন রাখার রাখবে, তাই বলে তাদের সেগুলো প্রকাশ করার এবং সেগুলো মুসলিমদের মাঝে বলার অধিকার আমরা দিইনি। তবে আমরা কারও নিরাপত্তা-চুক্তি ভাঙ্গার কথা বলি না যতক্ষণ-না আমরা তাদেরকে সেগুলো বলতে শুনব বা মুসলিমরা শুনে এর সাক্ষ্য দিবে। যখন আমরা শুনব বা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য সাব্যস্ত হবে তখন ফয়সালা দেওয়া হবে, তারা কটূক্তি করেছে। যদি আমরা তাদেরকে (শর্ত ছাড়াই) তাদের ধর্ম মানার অধিকার দিই, তা হলে তো তাদেরকে মসজিদ ধ্বংস করার, কুরআন পুড়ানোর, আলেম ও সৎ-ব্যক্তিদেরকে হত্যা করার অধিকার দিতে হবে। কেননা তারা এগুলোকেও ধর্ম হিসাবে বিশ্বাস করে। কোনো বিরোধ নেই যে, তাদেরকে এসব অধিকার দেওয়া হবে না।

টিকাঃ
[১০২] সূরা তাওবা, ৯:৪১
[১০৩] সূরা তাওবা, ৯: ৪০

কুরআন, হাদীস ও সাহাবি-তাবেয়ীদের বক্তব্য থেকে বিভিন্নভাবেই শিক্ষা নেওয়া যায়-
১/ আমাদের দ্বীনের দোষ-ধরা ও আমাদের নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তি করার অর্থ আমাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও যুদ্ধ ঘোষণা করা। হাত দ্বারা যুদ্ধ করলে যেমন নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যায়, মুখ দ্বারা আঘাতের দ্বারাও নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যাবে, বরং আরও আগেই ভাঙবে। আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণী আমাদের কথাকে আরও সুস্পষ্ট করে-
وَجَاهِدُوا بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ 'আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তোমাদের জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করো।[১০২]
জীবন দিয়ে জিহাদ দুভাবে হতে পারে—জিহ্বা দিয়ে ও হাত দিয়ে।
২/ আমরা যিম্মিদেরকে তাদের কুফরি বিশ্বাসসমূহের ওপর বহাল থাকার স্বীকৃতি দিয়েছি এ কথা মেনেই যে, তারা গোপনে আমাদের সাথে শত্রুতা রাখে। তবে তারা যদি প্রকাশ্যে আল্লাহ, রাসূল ও দ্বীনকে কটূক্তি প্রকাশ করে, তবে এটা যুদ্ধ ঘোষণার নামান্তর। এর ফলে নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যায়।
৩/ আমাদের মাঝে আর কাফেরদের মাঝে যদি কোনো সাধারণ নিরাপত্তা-চুক্তি সম্পাদিত হয় তা হলে এর অনিবার্য দাবি হলো— তারা যেভাবে চুক্তিবদ্ধ অবস্থায় রক্তপাত থেকে বিরত থাকে, সেভাবে তারা অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শানে কটূক্তি করা থেকেও বিরত থাকবে। বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কটূক্তি করা আমাদের কাছে রক্তপাতের চেয়েও জঘন্য অপরাধ। কেননা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মান ও দ্বীনের বিজয়ের জন্য আমরা আমাদের জান-মাল বিলিয়ে দিই। আর আমাদের দ্বীনের এ বিষয়গুলো তারাও জানে। এরপরও যখন তারা এর অন্যথা করবে, তখন তাদের নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যাবে।
৮/
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কাফেরদের সাথে যে নিরাপত্তা-চুক্তি করেছিলেন সেখানেও তিনি এ শর্ত স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছিলেন। এমনটাই বর্ণনা করেছেন হারব রাহিমাহুল্লাহ আব্দুর রহমান ইবনে গানম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে সহীহ সনদে।
৫/
যিম্মিদের সাথে আমাদের চুক্তি হয় এই শর্তে যে, ভূখণ্ড আমাদের, এখানে ইসলামের বিধি-বিধান জারি থাকবে। যিম্মিরা অনুগত ও নমনীয় হয়ে। এসব শর্তেই তাদের সাথে চুক্তি ও সন্ধি হয়। এরপর তারা যদি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করে ও দ্বীনকে আঘাত করে কথা বলে, তা হলে এ আচরণ তাদের 'অনুগত ও নমনীয় হয়ে থাকা'র শর্ত পরিপন্থী।
৬/
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমর্থন করা, শক্তি জোগানো, সম্মান করা, সাহায্য করা, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা, তাঁর প্রতি সম্মান প্রকাশ করা আমাদের জন্য ফরয। আল্লাহ (এসব দায়িত্ব) ফরয করেছেন। এ দায়িত্বের অপরিহার্য্য দাবি হলো সর্ব দিক থেকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা।
৭/
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহায্য করা আমাদের জন্য ফরয। কেননা তা আল্লাহর রাসূলকে শক্তি জোগানোর অন্তর্ভুক্ত। আর তা সর্বোত্তম জিহাদ। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ 'যদি তোমরা রাসূলকে সাহায্য না করো, তবে আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছিলেন...।' [১০৩]
বরং প্রতিটি মুসলিমকে সাহায্য করা ওয়াজিব, তা হলে শ্রেষ্ঠ আদম-সন্তান রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহায্য করার বিষয়টি কেমন হতে পারে।
৮/ কাফেরদের সাথে এ শর্তেই চুক্তি করা হয় যে, তাদের ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত যে অন্যায় আছে, সেগুলো তারা প্রকাশ্যে করবে না। যদি তারা এগুলো প্রকাশ করে, তা হলে তাদেরকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। তেমনিভাবে যদি তাদের থেকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি কটূক্তি প্রকাশ পায়, তা হলে তাদেরকে সাঁজা দেওয়া হবে।
৯/ মুসলিমদের মধ্যে এ ব্যাপারে কোনো মতবিরোধ নেই যে, যে-কোনো ধরনের কটূক্তি কাফেরদের জন্য নিষিদ্ধ। কেউ যদি নিষিদ্ধ কোনো কাজ করে তা হলে তাকে শাস্তি পেতে হয়। যেহেতু তাদেরকে কটূক্তির অধিকার দেওয়া হয়নি, তাই তারা যদি এমন অন্যায় করে যার আধিকার তাদেরকে দেওয়া হয়নি তা হলে তারা তো সর্বসম্মতিক্রমে শাস্তির উপযুক্ত হবে।
যিম্মিরা যদি কোনো সাধারণ মুসলিমকেও গালি দেয় তা হলে তাদেরকে বেত্রাঘাত করা হয়, সেখানে কেউ যদি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করে তা হলে তাকে হত্যা করা হবে।
১০/ স্পষ্ট কিয়াস ও যুক্তির দাবি হলো, যে বিষয়ে যিম্মি কাফেরদের সাথে চুক্তি হয়েছে, তার কোনো কিছু যদি তারা ভঙ্গ করে তা হলে তাদের চুক্তিও ভেঙে যাবে, যেমনটা কতিপয় ফকিহ বলেছেন।
যে বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে, তা যদি তারা পূর্ণ না করে তা হলে তো তাদের চুক্তি ভেঙে যাবে, যেমন বিক্রি-জাতীয় চুক্তিও ভেঙে যায় যদি দুই পক্ষের কোনো এক পক্ষ শর্ত পূরণ না করে। কারণটা স্পষ্ট। কেননা উভয় পক্ষের জন্য চুক্তি পূরণ করা আবশ্যক এ শর্তেই যে, তারা উভয়েই শর্ত পূরণ করবে। যখন একজন সে শর্ত পূরণ না করে, তখন অপরের জন্য সেই চুক্তি পূরণ করা অপরিহার্য থাকে না। কেননা সকল বুদ্ধিমানের মতেই, শর্তযুক্ত কোনো কিছু তখনই অপরিহার্য হয় যখন শর্ত পূরণ হয়।
উপরিউক্ত মূলনীতিটি যদি স্পষ্ট হয়ে থাকে তা হলে আমরা বলব, চুক্তিকৃত বিষয়টা যদি কোনো একজন চুক্তিকারীর ব্যক্তিগত অধিকার হয় তা হলে তার অধিকার রয়েছে যে, সে অপর পক্ষ থেকে শর্ত পূরণ ছাড়াই চুক্তি পূরণ করবে। আর এ ধরনের ক্ষেত্রে শর্ত লঙ্ঘন হওয়ার দ্বারা চুক্তি ভেঙে যায় না, তবে তার ভাঙ্গার অধিকার থাকে। যেমন কেউ বাকিতে বিক্রি করার সময় ক্রেতাকে বন্ধক রাখার শর্ত জুড়ে দিল। (পরে ক্রেতা সেই শর্ত পূরণ না করলেও বিক্রেতার বিক্রির চুক্তি বহাল রাখার অধিকার আছে)
আর চুক্তিতে শর্তকৃত বিষয়টি যদি কারও ব্যক্তিগত অধিকার না হয়ে বরং আল্লাহর হক হয় বা কোনো বান্দার হক হয়, আর চুক্তিকারী কেবল তত্ত্বাবধানের অধিকার-বলে তাতে হস্তক্ষেপ করে, তা হলে চুক্তির শর্ত পাওয়া না গেলে চুক্তি ভেঙে যাবে কিংবা এই চুক্তি ভেঙে দেওয়া আবশ্যক হয়ে পড়বে।
উদাহরণ: কেউ কোনো নারীকে স্বাধীন ও মুসলিম হওয়ার শর্তে বিয়ে করল, কিন্তু পরে দেখা গেল, নারীটি মুর্তিপূজারি। (সেক্ষেত্রে বিয়ে ভেঙে যাবে, আলাদা করে বিয়ে ভাঙ্গার প্রয়োজন হবে না)
তেমনি (ইসলামি রাষ্ট্রে) কাফেরদের সাথে যিম্মি বা নিরাপত্তা-দানের চুক্তি করা মুসলিম নেতা বা খলিফার হক নয়, বরং এটা আল্লাহ তাআলা ও সমগ্র মুসলিম জনগণের হক। সুতরাং তারা যদি চুক্তির কোনো শর্ত লঙ্ঘন করে, তা হলে কেউ কেউ বলেন, ইমামের ওপর ওয়াজিব হবে সেই চুক্তি রহিত করা। আর রহিতকরণের স্বরূপ হলো, তাকে নিরাপত্তার সাথে ইসলামি রাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়া হবে। তবে এ মতটা দুর্বল। কেননা যিম্মিদের সাথে করা শর্তগুলো মূলত আল্লাহর হক। তাই খলিফা রহিত না করলেও তা রহিত হয়ে যাবে। আমাদের মূল আলচনা এটিই-যিম্মিদের সাথে শর্তকৃত বিষয়গুলো মূলত আল্লাহর হক। যদি মেনে নেওয়া হয়, তাদেরকে কোনো ধরনের শর্ত ছাড়াই ইসলামী ভূখন্ডে থাকতে দেওয়া হয়েছে, তবুও সে অধিকার ততটুকুই যতটুকু অধিকার মুসলিমদের ক্ষতি না করে দেওয়া সম্ভব। যখন তাদের দ্বারা মুসলিমদের ক্ষতি হবে, তখন কোনো অবস্থাতেই তাদেরকে আর থাকতে দেওয়া হবে না। আর যদি মেনেও নেওয়া হয় যে, মুসলিমদের ক্ষতি হলেও তাদেরকে থাকার অনুমতি দেওয়া হবে, তবুও কোনোভাবেই জায়েজ হতে পারে না এবং মেনে নেওয়া যেতে পারে না যে, আল্লাহর হক লঙ্ঘন হলেও এবং দ্বীনের ক্ষতি হলেও আর তারা ইসলামকে আঘাত করলেও তাদেরকে থাকতে দেওয়া হবে। যিম্মির সাথে করা চুক্তির অপরিহার্য দাবি হলো তারা আল্লাহর রাসূলকে কটূক্তি করবে না। নিঃশর্ত বিক্রির চুক্তিতে যেমন- পণ্য দোষমুক্ত থাকা ও মূল্য নগদ হওয়া শর্ত তেমনিভাবে নিঃশর্ত বিয়ের চুক্তিতে সাধারণ কিছু বিষয় থেকে স্বামী-স্ত্রীকে মুক্ত থাকতে হয়, যেমন স্বাধীন হওয়া, মুসলিম হওয়া ইত্যাদি। কেননা এ-জাতীয় শর্ত স্পষ্ট করে করার প্রয়োজন হয় না, রীতিগতভাবেই বোঝা যায়। একইভাবে কাফেরদের সাথে চুক্তি করার সময় যদিও আল্লাহর রাসূলকে কটূক্তি করা বা দ্বীনকে আঘাত-করা-সংক্রান্ত কোনো শর্ত না থাকে, তবুও জানা কথা, যিম্মিদের সাথে চুক্তির সময় মুসলিমদের উদ্দেশ্য এটাই থাকে যে, তারা কোনোভাবেই নবীকে কটূক্তি করতে পারবে না। যেমন: ধরে নেওয়া হয় যে, তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবে না। রাসূলকে কষ্ট না-দেওয়ার বিষয়টি আরও বেশি কাম্য। কেননা তা অধিক কষ্টদায়ক। তবে কেউ যদি আপত্তি করে বলে যে, 'আমরা তো আবদ্ধ কাফেরদেরকে নিরাপত্তা দিয়েছি এ শর্ত মেনেই যে, তারা তাদের ধর্ম পালন করবে। আর (তাদের ধর্মের বিরোধী হওয়ায়) নবীজিকে গালমন্দ করা (হয়তো) তাদের ধর্মের অংশ!' আমরা তাদের উত্তরে বলব, মুসলিমদের সাথে লড়াই করা, যে-কোনো পন্থায় তাদের ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া এবং মুসলিমদের সাথে শত্রুতা করাও তো তাদের ধর্মের অংশ। তাদের ধর্মের অংশ হলেও মুসলিমদের সাথে চুক্তি রেখে তারা এগুলো করতে পারে না। যখন তারা এ ধরনের কাজ করবে তখন তাদের চুক্তি ভেঙে যাবে। কেননা যদিও আমরা তাদেরকে থাকতে দিয়েছি এ কথা মেনে যে, তারা তাদের যা বিশ্বাস করার করবে এবং যা গোপন রাখার রাখবে, তাই বলে তাদের সেগুলো প্রকাশ করার এবং সেগুলো মুসলিমদের মাঝে বলার অধিকার আমরা দিইনি। তবে আমরা কারও নিরাপত্তা-চুক্তি ভাঙ্গার কথা বলি না যতক্ষণ-না আমরা তাদেরকে সেগুলো বলতে শুনব বা মুসলিমরা শুনে এর সাক্ষ্য দিবে। যখন আমরা শুনব বা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য সাব্যস্ত হবে তখন ফয়সালা দেওয়া হবে, তারা কটূক্তি করেছে। যদি আমরা তাদেরকে (শর্ত ছাড়াই) তাদের ধর্ম মানার অধিকার দিই, তা হলে তো তাদেরকে মসজিদ ধ্বংস করার, কুরআন পুড়ানোর, আলেম ও সৎ-ব্যক্তিদেরকে হত্যা করার অধিকার দিতে হবে। কেননা তারা এগুলোকেও ধর্ম হিসাবে বিশ্বাস করে। কোনো বিরোধ নেই যে, তাদেরকে এসব অধিকার দেওয়া হবে না।

টিকাঃ
[১০২] সূরা তাওবা, ৯:৪১
[১০৩] সূরা তাওবা, ৯: ৪০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00