📄 সুন্নাহ থেকে দলিল
• প্রথম হাদীস ইমাম শাবি রাহিমাহুল্লাহ আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে,
أَنَّ يَهُودِيَّة كَانَتْ تَشْتِمُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَتَقَعُ فِيهِ فَخَنَقَهَا رَجُلٌ حَتَّى مَاتَتْ فَأَبْطَلَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم دَمَهَا
'এক ইহুদি মহিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করত। ফলে একলোক তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মুক্তিপণের পরিবর্তে) ওই মহিলার রক্ত মূল্যহীন ঘোষণা করেন। [৫৯]
হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আবু দাউদ ও ইবনে বাত্তাহ রাহিমাহুমুল্লাহ। ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। [৬০]
আরেক বর্ণনায় এসেছে, সেই হত্যাকারী লোকটি অন্ধ ছিলেন। হাদীসটির সনদ জাইয়িদ ও মুত্তাসিল। কেননা ইমাম শাবি রাহিমাহুল্লাহ আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। আর যদি মুরসালও হয়, তবুও হাদীসটি সর্বসম্মতিক্রমে প্রমাণযোগ্য। কেননা ইমাম শাবি রাহিমাহুল্লাহ বর্ণিত মুরসাল বর্ণনাগুলোও মুহাদ্দিসগণের নিকটে সহীহ। কারণ তার যত মুরসাল বর্ণনা আছে, সবই সহীহ হিসেবে প্রমাণিত।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করার কারণে অভিশপ্ত ইহুদি নারীকে হত্যা করার ব্যাপারে হাদীসটি একেবারেই দ্ব্যর্থহীন। আর এই হাদীসটি আরও স্পষ্টভাবে ওই সকল যিম্মি ও মুসলিম নারী-পুরুষের রক্ত হালাল বানানোর দলিল, যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করে।
• দ্বিতীয় হাদীস ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত, 'এক অন্ধ লোকের একটি 'উম্মু ওয়ালাদ। [৬১] দাসী ছিল। সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করত, তাকে নিয়ে কটূক্তি করত। ফলে অন্ধ লোকটি ধারালো একটি ছুরি নিয়ে দাসীর পেটে বিঁধিয়ে দিয়ে চেপে ধরে রাখলেন। এই ঘটনা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শুনানো হলে তিনি ওই দাসীর রক্ত মূল্যহীন ঘোষণা করেন। [৬২]
আবু দাউদ ও নাসাঈ রাহিমাহুমাল্লাহ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমাদ হাদীসটিকে দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। হতে পারে এই ঘটনাটা হুবহু প্রথম ঘটনা। সেক্ষেত্রে এই ঘটনার বাদিও ইহুদি হবে। কাযি আবু ইয়া'লা রাহিমাহুমুল্লাহ-সহ অন্যান্য আলেমদের অভিমত এটাই। তারা উভয় হাদীসের ঘটনাকে একই ঘটনা মনে করেন। অথবা হতে পারে এটা ভিন্ন আরেকটা ঘটনা।
ইমাম খাত্তাবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
وفيه بيان ان ساب النبي مقتول وذلك أن السب منها لرسول الله ارتداد عن الدين
'এ হাদীস থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গালমন্দকারীকে হত্যা করা হবে। কারণ, গালমন্দ বা অমার্জিত ভাষা ব্যবহার করা মানে মুরতাদ হয়ে যাওয়া বা ইসলাম ত্যাগ করা। [৬৩]
ইমাম খাত্তাবি রাহিমাহুল্লাহ-এর কথা এ দিকে ইঙ্গিত করে যে, তিনি কিটূক্তিকারী নারীটিকে মুসলিম ছিল বলে মনে করেন। কেননা ইমাম খাত্তাবির কথায় ব্যবহৃত 'ইরতিদাদ' মানে ইসলাম ত্যাগ করা। কটূক্তিকারী নারীটির মুসলিম হওয়ার কোনো দলিল হাদীসের মধ্যে নেই, বরং হাদীস থেকে বাহ্যত বোঝা যায়, মহিলাটি কাফের ছিল। কেননা হাদীসে উল্লেখ আছে যে, কটূক্তিকারী দাসীর মনিব তাকে এহেন কাজ থেকে কয়েকবার নিষেধ করেছিলেন। সুতরাং দাসীটি যদি মুরতাদ হতো তা হলে তার সাথে সহবাস করা ও দীর্ঘ সময় ধরে নিজের অধীনে রাখা কোনোভাবেই মুসলিম মনিবের জন্য বৈধ হতো না।
• তৃতীয় হাদীস এটি সেই হাদীস, যে হাদীস দিয়ে ইমাম শাফেঈ রাহিমাহুল্লাহ দলিল দেন যে, কোনো যিম্মিও যদি রাসূলকে কটূক্তি করে, তা হলে তাকে হত্যা করা হবে। হাদীসটি ইহুদি কবি ও গোত্রনেতা কাব ইবনে আশরাফের ঘটনা-সম্বলিত বর্ণনা। ঘটনাটি প্রসিদ্ধ ও স্বতঃসিদ্ধ। একবার নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
مَنْ لِكَعْبِ بْنِ الْأَشْرَفِ فَإِنَّهُ قَدْ آذَى اللهَ وَرَسُولَهُ 'কে আছো কাব ইবনে আশরাফের জন্য? সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে।'
তখন মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রাদিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি চান আমি তাকে হত্যার দায়িত্ব নিই?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' তখন সাহাবি বললেন, 'তা হলে আমাকে কিছু কৌশলী কথা বলার অনুমতি দিন।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুমতি দিলেন। মুহাম্মাদ বিন মাসলামা কাবের কাছে এসে বললেন, এই লোকটা (মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তো এখন আমাদের কাছে সাদাকা চাচ্ছে। লোকটা আমাদেরকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।' কাব এ কথা শুনে বলল, তোমরা তার ব্যাপারে আরও অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে।' (এভাবে তিনি কাবের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।) পরিশেষে তিনি তাকে হত্যা করেন। [৬৪]
হাদীসটি বুখারী ও মুসলিমে আছে। কাব ইবনে আশরাফ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিন্দা করত। ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে হত্যা করার আহ্বান জানান। কাবের জনবল নবীজির কাছে এসে বলল, 'আমাদের সরদার কাবকে গুপ্তহত্যা করা হয়েছে।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'অন্যদের মতো সেও যদি সংযত থাকত তা হলে সে ক্ষতির মুখোমুখি হত না। আমরা তার থেকে কষ্ট পেয়েছি, সে আমাদের নামে নিন্দা-কাব্য রচনা করেছে। তোমাদের কেউ যদি এমন জঘন্য কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, তা হলে তরবারিই তার ফয়সালা করবে।'
এ পর্যায়ে ইহুদিরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। কাব ইবনুল আশরাফের হত্যার পর থেক তারা পুরোপুরি সাবধান হয়ে যায়।
কাব ইবনুল আশরাফ তো নিরাপত্তা-চুক্তিতে আবদ্ধ যিম্মি ছিল। যখন সে কটূক্তি করল, তখন তার নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে গেল। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ব্যাপারে বলেন,
فَإِنَّهُ قَدْ آذَى اللهَ وَرَسُولَهُ
'কেননা সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে।'
সুতরাং যে-কেউই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিবে তাকে হত্যা করা হবে। আর মুসলমানদের সর্বসম্মতিক্রমে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কটূক্তি করার দ্বারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া হয়। সুতরাং কটূক্তির কারণে হত্যার বিধান অবধারিত।
• চতুর্থ হাদীস
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ سَبَّ نَبِيًّا قُتِلَ، وَمَنْ سَبَّ أَصْحَابِي جُلِدَ
'যে ব্যক্তি কোনো নবীকে গালি দিবে তাকে হত্যা করা হবে, আর যে ব্যক্তি আমার কোনো সাহাবিকে গালি দিবে তাকে বেত্রাঘাত করা হবে।[৬৫]
হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আবু মুহাম্মাদ আল-খাল্লাল, আল-আযাজিয়্যি ও আল-হারাওয়ি। হাদীসের থেকে বোঝা যায় যে, এমন ব্যক্তিকে হত্যা করতে হবে, তাওবার সুযোগ দেওয়া হবে না।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী হলো আব্দুল আযিয ইবনে হাসান ইবনে যাবালাহ, তিনি হাদীস বর্ণনায় দুর্বল।
• পঞ্চম হাদীস
আব্দুল্লাহ ইবনে কুদামা রাহিমাহুল্লাহ আবু বারযাহ আসলামি থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এক লোক আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতি কঠিন-ভাষা ব্যবহার করেন। আমি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললাম, আমি কি তাকে হত্যা করব?
তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, 'এমন হুকুম তো নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দকারী ছাড়া অন্য কারও জন্য নয়।'[৬৬]
আরেক বর্ণনায় আছে, এক লোক আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে গালি দিয়েছিল। তখন তিনি উক্ত কথাটি বলেন। আবু দাউদ রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি তার সুনানে সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন।[৬৭]
অনেক আলেম এ হাদীস দ্বারা দলিল পেশ করেছেন যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দকারীর শাস্তি হত্যা। এই অভিমত-পোষণকারীদের মধ্যে আছেন ইমাম আবু দাউদ, ইসমাইল ইবনে ইসহাক, আবু বকর আব্দুল আযিয এবং কাযি আবু ইয়া'লা প্রমুখ। এই হাদীসটি থেকে বোঝা গেল, যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করবে তাকে হত্যা করা বৈধ। হাদীসটি কাফের-মুসলিম উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
• ষষ্ঠ হাদীস
আসমা বিনতু মারওয়ানের ঘটনা। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, খাতমা গোত্রের এক নারী কবিতায় রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অপমান করে। তখন নবীজি বললেন— 'এই মহিলার ব্যাপারে আমার পক্ষে কে আছ?' অখন তার গোত্রের এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি।'
এরপর লোকটা উঠে গিয়ে সেই মহিলাকে হত্যা করল। হত্যা করে ফিরে এসে সংবাদটা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানালে তিনি বললেন, 'মাদি ছাগল দুটো তাকে নিয়ে আর গুঁতোগুঁতি করবে না।[৬৮]
বিভিন্ন মাগাযি-বিশেষজ্ঞদের কাছে ঘটনাটা প্রচলিত। এই মহিলাকে হত্যা করা হয় রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদর থেকে ফিরে আসার পর, পঁচিশে রমাদান। ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন ইতিহাস-বিশেষজ্ঞগণ। যেমন ইবনে সাদ, আল-আসকারি, আবু উবাইদ তার আল-আমওয়াল গ্রন্থে এবং ওয়াকিদি-সহ এবং অন্যান্যরা। এটি একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা। আর এই অভিশপ্ত মহিলাকে হত্যা করার কারণ ছিল সে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করত।
• সপ্তম হাদীস ইহুদি আবু আফাকের ঘটনা। মাগাযি-বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসবিদগণ এটি উল্লেখ করেছেন। তার কাজই ছিল রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে কটূক্তিমূলক কবিতা আবৃত্তি করা।
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বদরের যুদ্ধে বেরিয়ে পড়লেন এবং আল্লাহর সাহায্যে বিজয় লাভ করে ফিরলেন, তখন সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরও হিংসা করতে লাগল। সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিন্দা করে কবিতা আবৃত্তি করল এবং নবীজির অনুসারীদেরকেও কটূক্তি করল। তার কবিতার জঘন্যতম একটি অংশ ছিল-
'এক আরোহী তাদের তাদের বৈধ-অবৈধ সবকিছুই ছিনিয়ে নেয়।'
সালিম ইবনে উমাইর বলেন, 'আমি নযর করেছি, তাকে আমি হত্যা করব।' ইবনে সাদ উল্লেখ করেছেন যে, 'সে ইহুদি ছিল।' তবে এ বর্ণনাটি ইতিহাসবিদদের। তারপরও নিশ্চিতভাবে এটি এ-সংক্রান্ত অন্যন্য হাদীসকে সমর্থন ও জোড়ালো করতে পারে।
• অষ্টম হাদীস আনাস ইবনে যুনাইম আদদিলির ঘটানাটি। সীরাত-বিশারদদের কাছে হাদীসটি প্রসিদ্ধ। ইবনে ইসহাক, ওয়াকিদি-সহ অন্যান্য আলেমগণ এটি বর্ণনা করেছেন। এই লোকটা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করে কবিতা রচনা করেছিল। খুযায়াহ গোত্রের এক মুসলিম তরুণ বিষয়টা শুনতে পেয়ে তার মাথা ফাটিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রক্তকে মূল্যহীন ঘোষণা করেন। অর্থাৎ এই অপরাধের কারণে আঘাতকারীকে কোনো শাস্তিই দেননি।
আনাস ইবনে যুনাইম যখন নবীজির পক্ষ থেকে তার রক্তমূল্যহীনতার ফরমান সম্পর্কে অবহিত হয় তখন সে নবীজির কাছে নিজের অপরাগতার কথা প্রকাশ করে এবং নবীজির ভূয়সী প্রশংসা করে একটি কবিতা আবৃত্তি করে। কবিতার প্রথমাংশ নিম্নরূপ-
আপনি কি সেই মহান ব্যক্তি নন, [৬৯]
যার আদেশে 'মায়াদ' গোত্রকে হিদায়াত দেওয়া হয়? বরং হিদায়াত আল্লাহ দেন, আর আপনাকে বলেন, তুমি সাক্ষী থেকো। কোনো উটনী বহন করেনি নিজের পরে মুহাম্মদের চেয়ে সৎ, মহৎ ও আমানতদারকে।
হে রাসূল! আপনি আমাকে পাকড়াও করতে সক্ষম। আপনার পক্ষ থেকে একটি হুঁশিয়ারিই তো পাকড়াও সমতুল্য। হে রাসূল! তিহামাহ ও নজদের সমস্ত অধিবাসীর ওপর আপনি তো কর্তৃত্ব প্রয়োগের অধিকার রাখেন।
রাসূলকে বলা হয়েছে, আমি নাকি তার মানহানি করেছি। (রটনাকারীরা জেনে নিক) আমার চাবুক নিজের ওপরে চাবুক মারেনি। আমি না কারও মানহানি করেছি, আর না কারও খুন ঝরিয়েছি। একটু ভেবে দেখুন, হে সত্যের প্রসারী! এরপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।
যখন তার এই কবিতা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে পৌঁছে এবং তিনি তার পক্ষ থেকে অপরাগতা স্বীকারের কথা জানতে পারেন, তখন তিনি নওফাল ইবনে মুয়াবিয়ার সাথে তার ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করেন। তখন নাওফালও তার জন্য সুপারিশ করেন, অন্যদিকে বনু খুযায়ার এক বালক তো তার মাথা আগেই ফাটিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'ঠিক আছে, আমি তাকে মাফ করে দিলাম।'
তখন নাওফাল বলেন, 'আমার মা-বাবা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক।' এরপর আনাস ইবনে যুনাইম রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে আবার ওযর পেশ করে বলেন, তারা আমার নামে মিথ্যা বলেছে।
এখানে দলিল হলো, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশদের সাথে দশ বছরের জন্য সন্ধিচুক্তি করেন। এই চুক্তির আওতায় বনু খুযায়াহ ও বনু বকরও অন্তর্ভুক্ত ছিল [৭০]।। এ চুক্তির অধীনে আনাস ইবনে যুনাইমও ছিল। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিন্দা করে কবিতা আবৃত্তি করেছিল, যার ফলে চুক্তিবদ্ধ থাকা সত্বেও অন্য আরেকজন তার মাথা ফাটিয়ে দেয়।
তারা যদি না জানতেন যে, চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তিও যদি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যাপারে কটূক্তি করে তা হলে তাকেও শায়েস্তা করা অপরিহার্য, তা হলে তারা তো তার মাথা ফাটিয়ে দিতেন না।
তাই তো প্রথমে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রক্তকে মূল্যহীন ঘোষণা করেছিলেন। আর এই হুকুমই বোঝায় যে, কটূক্তিকারী চুক্তিবদ্ধ হলেও তার রক্ত বৈধ। এরপর সে যখন নিজের কবিতার মধ্য দিয়ে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেয়, তখন থেকে সবাই তাকে সাহাবাদের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন।
তার কবিতার এই অংশের প্রতি লক্ষ্য করুন, 'জেনে নিন হে আল্লাহর রাসূল!' এই বাক্যটি তার ইসলাম প্রমাণ করে। সাথে সাথে সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমালোচনার বিষয়টিও অস্বীকার করে। এমনকি তার বিরুদ্ধে যারা সাক্ষ্য প্রদান করেছিল সে তাদের সাক্ষ্যকে এই বলে প্রত্যাখ্যান করেছে যে, এরা তো আমার শত্রুগোত্র, আমাদের মধ্যে অনেক যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছে।
আমাদের বক্তব্য হলো, রাসূলকে কটূক্তি করার কারণে যদি রক্ত বৈধ বা মূল্যহীন না হত তা হলে তো এসব কোনো কিছুরই প্রয়োজন হতো না।
তারপরও, সে ইসলাম এনে, ওযর পেশ করে, বিরোধীদের বক্তব্য খণ্ডন ও মিথ্যা-প্রতিপন্ন করে এবং নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রশংসা করেও, রাসূলের কাছে ক্ষমা চাচ্ছে, যেন তিনি তার হত্যা ও রক্ত-বৈধতার ফরমান উঠিয়ে নেন। অপরাধীকে যখন শাস্তি দেওয়া বৈধ, ক্ষমা তো তখনই যথার্থ হয়ে থাকে।
তাই বোঝা যায়, সে মুসলিম হয়ে, ওযর পেশ করেও শাস্তি পাওয়ার যোগ্য ছিল এবং নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাইলে তাকে শাস্তি দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজের মহানুভবতা ও দায়ার কারণে তাকে ক্ষমা করে দেন। তা ছাড়া তার সাথে যে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল সেটা ছিল যুদ্ধবিরতিমূলক চুক্তি, জিযিয়াভিত্তিক কোনো চুক্তি ছিল না। যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে আবদ্ধ ব্যক্তি নিজের দেশে যা ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারে। যতক্ষণ-না সে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উস্কানি বা ঘোষণা দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সে চুক্তি ভঙ্গ হয় না।
তা হলে জানা গেল, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তি করা একপ্রকার যুদ্ধে-নামার মতো, বরং আরও গুরুতর। আর যে কটূক্তিকারী, তার জন্য কোনো ধরনের নিরাপত্তা-বিধান থাকবে না।
• নবম হাদীস
ঘটনাটা ইবনে আবি সারহের। এই ঘটনার ব্যাপারে আহলুল ইলমগণ একমত। বিষয়টা তাদের কাছে এতটাই প্রসিদ্ধ যে, এটি এক ব্যক্তির বর্ণনা হওয়ার সুযোগই নেই। ঘটনাটা হলো—
মক্কা বিজয়ের দিন আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট লুকিয়ে থাকেন। কোনোমতে তাকে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত করেন তিনি এবং বলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আব্দুল্লাহকে (ইসলামের ওপর) বাইয়াত করান।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথা উঠিয়ে তার দিকে তাকান। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তিনবার একই কথা পুনরাবৃত্তি করেন। আর প্রত্যেকবারই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বাইয়াত করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনবারের পর তাকে বাইয়াত করে নেন। তারপর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের বললেন,
أَمَا كَانَ فِيكُمْ رَجُلٌ رَشِيدٌ يَقُومُ إِلَى هَذَا حَيْثُ رَآنِي كَفَفْتُ يَدِي عَنْ بَيْعَتِهِ فَيَقْتُلُهُ
'কী ব্যাপার! তোমাদের মধ্যে কি এমন কোনো চৌকস লোক নেই, যে আমাকে যখন দেখল আমি তার দিকে হাত বাড়াইনি, তখনই তার গর্দান উড়িয়ে দিত?'
সাহাবায়ে কেরাম জবাব দিলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তো জানি না আপনার মনের চাওয়া কী ছিল। আপনি আমাদেরকে কেন চোখ দিয়ে ইঙ্গিত করলেন না?' তখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা কী জানো না যে, কোনো নবীর জন্য চোখের খেয়ানত সমীচীন নয়?'[৭১]
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো তার রক্ত মূল্যহীন করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর দুধভাই ছিল। তাই উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটে তার জন্য সুপারিশ করেছিলেন, ফলে তিনি তাকে মাফ করে দেন।
কিন্তু সে ইসলাম গ্রহণের পর ফের মুরতাদ হয়ে মুশরিকদের দল ভারি করে। অথচ সে ইসলাম গ্রহণের পর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওহি-লেখকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরপর সে মুশরিকদের দলে ভিড়ে প্রচার করতে থাকে, 'আমি যেভাবে চাইতাম সেভাবেই কুরআনকে পরিবর্তন করতাম, কেননা তিনি আমাকে কিছু (ওহি) লিখার আদেশ দিতেন। আমি তাকে বলতাম, 'এমন অথবা এমন লিখলে হবে?' তিনি বলতেন, 'হাঁ, হবে।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতেন 'আলেমুন হাকিম' লেখো। সে বলত, 'আযিযুন হাকিম' লিখলে হবে কি? তিনি বলতেন, হ্যাঁ! দুটো তো একই।[৭২]
বলা হয় যে, এই আয়াতটি তার ব্যাপারে নাযিল হয়েছিল।[৭৩]
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللهِ كَذِبًا أَوْ قَالَ أُوحِيَ إِلَيَّ وَلَمْ يُوحَ إِلَيْهِ شَيْءٌ وَمَنْ قَالَ سَأُنْزِلُ مِثْلَ مَا أَنْزَلَ اللهُ ...
ওই ব্যক্তির চেয়ে বড় জালিম কে হতে পারে, যে আল্লাহর নামে মিথ্যা বলে কিংবা বলে-আমার প্রতি ওহি অবতীর্ণ হয়েছে, অথচ তার প্রতি কিছুই অবতীর্ণ হয়নি অথবা বলে আল্লাহ যেমন নাযিল করেছেন, ওমন আমিও অচিরেই ওহি নাযিল করব।[৭৪]
এই হাদীস থেকে জানা যায়, সে নবীর ওপর মিথ্যা আরোপ করে এবং মানুষের মাঝে বানোয়াট কথা ছড়াতে থাকে যে, তিনি তাকে ওহি লেখতে বলতেন, তার যা ইচ্ছা হত, তাই লিখত আর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেটাকেই বহাল রাখতেন। নিশ্চয় এ মিথ্যাচারও নবীর নামে একপ্রকারের কটূক্তি। ওহি বিকৃতকরণের দাবি সে ছাড়াও আরেকজন করেছিল। আল্লাহ তাআলা তাকে পাকড়াও করেন। তার মৃত্যুর পর লোকেরা তাকে যেখানেই দাফন করে মাটি তাকে উগড়ে দেয়।[৭৫] আর এটাই হচ্ছে সুস্পষ্ট দলিল যে, যে বা যারাই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যাপারে অশালীন মন্তব্য করবে আল্লাহ তাআলা তার থেকে প্রতিশোধ নিবেন, তাকে শায়েস্তা করবেন। সুতরাং তাওবা করে ইসলাম গ্রহণের পরও আব্দুল্লাহ ইবনে আবি সারহের রক্ত বৈধ হওয়া, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে 'কেন তোমরা তাকে হত্যা করোনি?'-এ কথা বলা, এরপর তাকে ক্ষমা করে দেওয়া এসব প্রক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাইলে তাকে হত্যা করতে পারেন, চাইলে ক্ষমাও করতে পারেন।
আবার এটাও প্রমাণ হয় যে, যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করবে তিনি তাকে হত্যা করার পূর্ণ অধিকার রাখেন, যদিও সে তাওবা করে ইসলামের দিকে ফিরে আসে।
বিশুদ্ধ বর্ণনায় [৭৬] আছে, ইবনে আবি সারহ মক্কা-বিজয়ের আগেই ইসলামে ফিরে আসে। সে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলে, 'আমি সত্যিই অনেক বড় অপরাধ করেছি। এখন আমি তাওবা করে আবার ফিরে এসেছি।' তারপর লোকজন যখন একটু স্থিমিত ও প্রশান্ত হয় তখন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে নিয়ে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে হাজির হন। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মনে মনে চাইছিলেন যেন মুসলমানরা তাকে হত্যা করে ফেলে। এ জন্য তিনি বেশ কিছুক্ষণ সময় অপেক্ষা করেন, এরই মধ্যে কেউ তাকে স্বেচ্ছায় হত্যা করে কি না এ জন্যে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভাবছিলেন, হয়তো কেউ তাকে শীঘ্র হত্যা করে ফেলবে। ... এই যে এতকিছু ঘটল, এগুলো স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, ইসলাম গ্রহণের পরও তাকে হত্যা করা বৈধ ছিল।
আব্দুল্লাহ ইবনে আবি সারহ এবং আরেকজন খ্রিষ্টান ওহি-লেখক নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর যে মিথ্যা অভিযোগ করে বলে, তাদের ওহি-বিকৃতির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি জানতেন (কিন্তু কিছুই বলতেন না, বরং সমর্থন করতেন)- এটা ডাহা মিথ্যা কথা। কেননা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওইটাই লেখাতেন যেটা আল্লাহ তাআলা নাযিল করতেন, ওইটাকেই ঠিক রাখতে বলতেন যেটাকে আল্লাহ তাআলা ঠিক রাখতে বলেছেন। নিজের ইচ্ছামাফিক কোনো রদবদল করতেন না। বরং আল্লাহ তাআলা যেভাবে চাইতেন সেভাবেই তিনি লিপিবদ্ধ করাতেন। তবে আহলুল ইলমগণ এতটুকু মতবিরোধ করেন যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে যেটা লেখার নির্দেশ দিতেন তার বিপরীত লিখলেও কি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমর্থন করতেন এবং তাকে এ ব্যাপারে কিছুই বলতেন না? এ ব্যাপারে আলেমগণ দুটো মত পেশ করেছেন-
✓ প্রথম মত এই খ্রিষ্টান ও ইবনে আবি সারহ আগাগোড়োই মিথ্যাচার করেছে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা লিখতে দিয়েছিলেন তার বিপরীত কোনো কিছু স্বীকৃতি দেওয়ার মতো কোনো ঘটনাই ঘটেনি। বরং তারা উভয়ে মনগড়াভাবে বানিয়ে-বুনিয়ে মানুষের সামনে ছড়িয়ে দেয় লোকদেরকে ইসলামের ব্যাপারে সন্দিহান করে তোলার জন্য।
✓ দ্বিতীয় মত হ্যাঁ, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে লিখতে বলতেন। অর্থাৎ তিনি তার সামনে পাঠ করে, তাকে লিখতে বলতেন, سَمِيعًا بَصِيرًا কিন্তু সে লিখত سَمِيعًا عَلِيمًا। ফলে তাকে বলতেন ঠিক আছে, যেভাবে আছে সেভাবেই রেখে দাও-এ- জাতীয় কিছু কথাবার্তা হত। [৭৭]
হতে পারে দুভাবেই নাযিল হয়েছিল, ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতেন, 'এভাবে লিখো, চাইলে ওভাবেও লিখতে পারো। কেননা উভয়টাই সঠিক।' কেননা আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে স্পষ্টভাবে হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন-
أُنْزِلَ الْقُرْآنُ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ 'কুরআন সাত রীতি বা পাঠ-পদ্ধতিতে অবতীর্ণ হয়েছে। [৭৮]
সকল পদ্ধতিই তৃপ্তিদায়ক ও গ্রহণযোগ্য। আপনি যদি عزیز حكيم এর পরিবর্তে غفور رحيم বলেন, তা হলেও ব্যাপারটা একই হবে, যতক্ষণ-না রহমত-সংক্রান্ত আয়াতকে আযাব-সংক্রান্ত আয়াত দিয়ে শেষ করেন অথবা আযাব-সংক্রান্ত আয়াতকে রহমত- সংক্রান্ত আয়াত দিয়ে পাঠ শেষ করেন।
সুতরাং এমন অনেক হাদীস রয়েছে যেগুলো প্রমাণ করে যে, সাত পাঠপদ্ধতিতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে এবং আল্লাহ তাআলার নামসমূহের মধ্য হতে ‘বদল’ হিসেবে কোনো একটা নাম দিয়ে পাঠ শেষ করার বৈধতা দেওয়া হয়েছে সেখানে পাঠক যে-কোনো একটি রীতিশৈলীর কিরায়াত দিয়ে পাঠ শুরু করতে পারে। অতএব নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সেই সাতরীতির কোনো এক রীতিতে লেখার অনুমতি দিয়েছিলেন। দেখা যায় কখনও কখনও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি আয়াত কোনো এক রীতিতে পাঠ করতেন কিন্তু সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলত, ‘আমি কি এই রীতিতে অথবা ওই রীতিতে লিখতে পারি?’ আর সে এটা বলতে পেরেছিল এ জন্যই যে, সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষ থেকে একাধিকবার বিভিন্ন পদ্ধতিতে লিপিবদ্ধ করার অনুমতি পেয়েছিল। ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ভিন্ন কোনো রীতিতে লেখার অনুমোদন দিয়ে বলতেন, ‘হ্যাঁ! এ দুটো তো একই।’
কেননা কুরআন একাধিক রীতিশৈলীতে নাযিল হয়েছিল, তাই তার পক্ষ থেকে ভিন্ন রীতিশৈলীতে লিপিবদ্ধ করাকে সমর্থন করেছিলেন। এরপর যখন জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে প্রতি রমাদানে কুরআন দাওর করতেন অর্থাৎ একে অপরকে শুনাতেন, তখন আল্লাহ তাআলা কয়েকটি রীতিশৈলীকে মানসুখ (রহিত) করে দেন। সর্বশেষ দাওর হয়েছিল যায়িদ ইবনে সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহুর রীতিশৈলীতে। বর্তমানে মানুষ তাঁর পঠনশৈলীতেই কুরআন পাঠ করে। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু-সহ অন্যান্য সাহাবগণ মুসলমানদেরকে এই পঠনরীতির ওপরই ঐক্যবদ্ধ করেন।
এ নিয়ে আরেকটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায় যে-সে নবীজিকে বলত, আমি تعملون লিখব, নাকি تفعلون লিখব? নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতেন, ‘ যেটা ইচ্ছা সেটা লিখো।’ তো আল্লাহ তাআলা তাকে সঠিকটিই লেখার তাওফিক দিতেন। আর উভয়টাই যদি নাযিলকৃত হত, তা হলে আল্লাহ তাআলার নিকট যেটা উত্তম তাকে সেটাই লেখার তাওফিক দিতেন। অথবা একমাত্র যেটা নাযিল হয়েছে সেটাই লেখার সুমতি দান করতেন।
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই সুযোগটা তাকে দিতেন, কারণ একাধিক রীতিশৈলীতে কুরআন নাযিল হওয়ার কারণে সেটা বৈধ ছিল। তাই যত রীতিতে নাযিল হয়েছে সেগুলোর যে-কোনো এক প্রকারে লেখলেই হয়ে যেত। তা ছাড়া নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সুদৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, অবশ্যই আল্লাহ তাআলা কুরআনকে যে-কোনো ধরনের বিকৃতি থেকে হিফাযত করবেন। তিনি এটাও বিশ্বাস করতেন যে, সে ওইটাই লিখতে পারবে, যেটা আল্লাহ তাআলা নাযিল করেছেন। এর বাইরে সে কলম চালনা করতে পারবে না। আর এটা আমাদের এই পবিত্র গ্রন্থ- কিতাবুল্লাহর ব্যাপারে অজানা কোনো বিষয়ই নয়। কেননা আল্লাহ তাআলা গোটা কুরআনকে সব ধরনের বিকৃতি থেকে সুরক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন এবং তিনি এই সুরক্ষানীতিমালা ঘোষণা করেছেন যে, এই কিতাবের অগ্র-পশ্চাৎ কোনো দিক থেকেই ভ্রান্তি অনুপ্রবেশ করতে পারবে না।
আবার কেউ কেউ তৃতীয় আরেকটা মত বর্ণনা করেছেন যে, সে কখনও কখনও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জবান থেকে কোনো একটি আয়াতের তিলাওয়াত শুনত, এভাবে শুনতে শুনতে পরিশেষে সেই আয়াতের কোনো এক বা ততোধিক শব্দ অবশিষ্ট থাকতেই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা তিলাওয়াত করেছিলেন তার মর্মবাণী থেকে সে বুঝে নিত বাকিটুকু কী হতে পারে-যেমনটা অনেক বুদ্ধিমান বুঝতে পারেন। তখন সে নিজ থেকেই সেটা লিখে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শোনাত, নবীজি শুনে বলতেন, 'হ্যাঁ! এভাবেই নাযিল হয়েছে।'
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুরও ঘটনাক্রমে এমন হয়েছিল। সদ্য-নাযিল- হওয়া আয়াতের কিছু অংশ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঠ করেন। উমর ইবনুল খাত্তাব আয়াতের মর্ম অনুধাবনপূর্বক বলে ওঠলেন- فَتَبَارَكَ اللهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ। আর ঘটনাক্রমে সেটা আয়াতের অবশিষ্ট অংশের সাথে মিলে যায়। [৭৯]
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এই ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে প্রথম ব্যাখ্যাটিই অধিক সঠিক ও যৌক্তিক।
• দশম হাদীস
দুই গায়িকার ঘটনার বিবরণ-সম্বলিত বর্ণনা, যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে অশালীন গান গাইত। এদের সাথে বনু হাশিমের এক দাসির কথাও উল্লেখ আছে। ঘটনাটি ঐতিহাসিকদের নিকট প্রসিদ্ধ। [৮০] ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনে খাতালের এই দুই দাসীকে হত্যাদেশ জারি করেন। কেননা এরা নবীজির ব্যাপারে নিন্দামূলক গান গাইত। একটাকে হত্যা করা হয়, আর অন্যটা কোথাও লুকিয়ে থাকে তাকে আমান বা নিরাপত্তা-প্রদানের আগপর্যন্ত। মুহাম্মাদ ইবনে আয়িয, ইবনে ইসহাক ও আব্দুল্লাহ ইবনে হাযম ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন।
বলা হয়ে থাকে, গায়িকা দুজন ইবনে খাতালের ছিল। ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে তার দুই গায়িকা দাসীকেও হত্যা করার নির্দেশ জারি করেন। এ বর্ণনার ব্যাপারে সিয়ার (ইসলামি যুদ্ধ-ইতিহাস) বিদ্বানগণ একমত পোষণ করেন এবং ঘটনাটি তাদের নিকট প্রসিদ্ধ।
এই ঘটনাটা দলিল হলো কীভাবে?
হ্যাঁ, আমরা বলছি যে, আসলি কুফর বা জন্মগতভাবে কাফের হওয়ার কারণেই কোনো নারীকে হত্যা করা বা হত্যা করার পরিকল্পনা করা বৈধ নয়—এটি সর্বসম্মত মাসআলা। এ ব্যাপারে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ ব্যাপক প্রসিদ্ধ। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফের নারী ও শিশুদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। [৮১]
সুতরাং আমরা বুঝতে পারলাম যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে এই দুই গায়িকা নারীকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন সেটা মূলত (আসলি কুফর বা জন্মগত কুফরের কারণে নয়, বরং) নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করা এবং তাকে নিয়ে নোংরা-ভাষায় গান করার কারণে। অতএব যে বা যারাই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তি করবে বা গালমন্দ করবে সর্ব অবস্থায় তাকে হত্যা করা ওয়াজিব।
* একাদশতম হাদীস
মক্কা-বিজয়ের সময় নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিরস্ত্রাণ মাথায় মক্কায় প্রবেশ করলেন। যখন তিনি মাথা থেকে শিরস্ত্রাণ খুললেন, তখন এক লোক এসে বলল, ইবনে খাতাল কাবার গিলাফ ধরে ঝুলে আছে (নিরাপত্তা প্রাপ্তির জন্য)। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাকে হত্যা করো। [৮২]
বর্ণনাটি খুবই প্রসিদ্ধ। বুখারী-মুসলিমে উল্লেখ আছে। তাকে হত্যার কারণ হলো, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে যাকাত উত্তোলনের জন্য নিয়োগ করেন। সঙ্গে আরেকজনকে নিয়োগ দেন তার সহযোগিতার জন্য। কিন্তু সঙ্গীটি তার জন্য খাবার প্রস্তুত না করায় সে বেজায় ক্ষেপে গিয়ে তাকে হত্যা করে ফেলে! পরে সে ভয় পেয়ে যায় যে, এ জন্য তো তাকেও হত্যা করা হতে পারে। ফলে সে মুরতাদ হয়ে সাদাকার মাল নিয়ে পালিয়ে যায়। সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে কটূক্তিমূলক-কবিতা রচনা করত এবং তার দুই দাসীকেও আদেশ করত, তারা যেন সুর করে সেই কবিতাগুলো গায়। ফলে তার রক্ত হালাল হওয়ার জন্য একই সাথে তিনটি কারণ ছিল-
১. মুসলিম হত্যা করা
২. রিদ্দাহ বা ইসলাম ত্যাগ
৩. নবীজিকে কটূক্তি করা
তবে তাকে মুসলিম হত্যার দায়ে হত্যা করা হয়নি। কেননা যদি তাকে হত্যার বদলে হত্যা করা হত, তা হলে তাকে বনু খুযায়ার ওই লোকের ওলীদের কাছে তাকে অর্পণ করা হত, যাকে সে হত্যা করেছিল। তখন ওই লোকেরা তাকে হত্যা করত কিংবা তার কাছ থেকে মুক্তিপণ নিয়ে তাকে ক্ষমা করে দিত।
তাকে ধর্মত্যাগের কারণেও হত্যা করা হয়নি। কেননা মুরতাদ ব্যক্তির তাওবা গ্রহণ করা হয় এবং যদি সে অবকাশ চায় চিন্তা-ভাবনার জন্য, তা হলে তাকে অবকাশ দেওয়া হয়।
অথচ এই ইবনে খাতাল! সে নিরাপত্তার খোঁজে, যুদ্ধ ছেড়ে এবং অস্ত্র ফেলে গোপনে বাইতুল্লায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু এতকিছু জেনেও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কোনো মুরতাদকে তো কেবল ইরতিদাদের কারণে এভাবে হত্যা করা হয় না। তাই আমরা বলব, তাকে হত্যা করা হয়েছিল নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তির কারণে।
• দ্বাদশতম হাদীস
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মক্কা-বিজয়ের পর) একদল লোককে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁকে গালমন্দ করার কারণে। কটূক্তির অপরাধে একদল লোককে তিনি হত্যা করেছেন, অথচ তিনি ওই সকল লোকদেরকেও ছেড়ে দিয়েছেন যারা তখনও কাফের ছিল এবং (মুসলিমদের বিরুদ্ধে) যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। এ বিষয়ে পূর্বে সাঈদ বিন মুসাইয়াবের রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা-বিজয়ের দিন ইবনে জিবারাকে হত্যার আদেশ দেন। ইবনে ইসহাক ঘটনাটি উল্লেখ করে বলেন, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তায়িফ থেকে যুদ্ধ করে ফিরেন তখন বুজির ইবনে জুহাইর তার ভাই কাব ইবনে জুহাইরকে এই সংবাদ দিয়ে পত্র লিখেন যে, মক্কায় যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করেছে এবং কষ্ট দিয়েছে, তিনি তাদের অনেককেই হত্যা করেছেন। কুরাইশ-কবিদের মধ্যে এখনও বাকি আছে ইবনে জিবারা ও হুবাইরা ইবনে আবি ওয়াহাব, এরা কোনো কোনো দিকে পালিয়ে গেছে। ইবনে জিবারা নাজরানে পালিয়ে যায়। পরবর্তীকালে সে যখন ইসলাম গ্রহণ করে এবং নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত হয়। সে কিছু সুন্দর কবিতার মাধ্যমে তার তাওবা ও ওযর পেশ করে। এরপরও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রক্তকে মূল্যহীন ঘোষণা করেন। অথচ তিনি মক্কার অন্যান্য সবাইকে নিরাপত্তা প্রদান করেছিলেন, কিন্তু তার মতো অপরাধ যাদের, তাদেরকে তিনি ক্ষমা করেননি।
রাসূলুল্লাহ যাদেরকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন তাদের মধ্যে ছিল—
• আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়াহ ইবনে মুগিরাহ
• আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে আবু সুফিয়ানের কটূক্তির ঘটনা খুবই প্রসিদ্ধ।[৮৩] আবু সুফিয়ান নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুধভাই। নবীজির দুধ-মা হালিমাতুস সাদিয়াহ তাকেও দুধ পান করিয়ে ছিলেন। কিন্তু নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রক্তকেও মূল্যহীন ঘোষণা করেন। কেননা সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবাগণকে কষ্ট দিয়েছে এবং কটূক্তি করেছে।
(মক্কা-বিজয়ের দিন) তিনি এসে নিজের ব্যর্থতা ও ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেন। তিনি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চাচা আব্বাস, চাচাতো ভাই আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম-সহ অনেকের দোহাই দিয়ে সুপারিশ গ্রহণের আকুতি জানাতে থাকেন। তিনি নবীজির কাছে এসে কবিতা আবৃত্তি করে নিজের ইসলাম গ্রহণ ও ওযর পেশ করতে থাকেন। একপর্যায়ে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রতি নরম হয়ে পড়েন। তখন সে আবৃত্তি করে বলে—
আপনার জীবনের শপথ! যেদিন আমি পতাকা উত্তোলন করি,
যেন লাতের বাহিনি আপনার বাহিনীকে পরাজিত করে!
সেদিনের আমি ছিলাম আধারচ্ছন্ন রাতে দিশেহারা পথিক। আজই সবে আমাকে হিদায়াত দেওয়া হচ্ছে এবং আমি হচ্ছি সুপথ-প্রাপ্ত।
একজন পথপ্রদর্শক আমাকে পথ দেখিয়েছেন, আমি নিজে পথ পাইনি। আমি যাকে একেবারেই তাড়িয়ে দিয়েছিলাম, সেই তিনিই আমাকে দেখিয়েছেন আল্লাহর পথ।
এভাবে সে বাকি কবিতাটুকু আবৃত্তি করে।
আরেক বর্ণনায় [৮৪] আছে-সে বলে, আমরা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করি। কিন্তু তিনি অনুমতি দেন না। নবীজির স্ত্রী উম্মু সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা তখন নবীজির সাথে আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়াহ ও আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিসের ব্যাপারে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জামাতা এবং আপনার ফুফুর ছেলে (আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়াহ), আপনার চাচার ছেলে এবং আপনার ভাই (আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস)। আল্লাহ তাআলা উভয়কেই মুসলমান বানিয়েছেন। তারা যেন আপনার কারণে দুনিয়ার সবচেয়ে হতভাগা না হয়। আপনি তো এদের চেয়েও জঘন্য অপরাধীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। তা হলে এদের অপরাধ তো আপনি ক্ষমা করতেই পারেন। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'সে আমার মানহানি করেছে, তাকে আমার প্রয়োজন নেই।'
আবু সুফিয়ানের কাছে যখন এই সংবাদ পৌঁছল, তার সাথে তখন তার ছেলে ছিল। সে বলতে লাগল, আল্লাহর শপথ! হয়তো তিনি আমাদের ওযর গ্রহণ করবেন, নয়তো আমি আর আমার ছেলে কোনো প্রান্তরে চলে গিয়ে পিপাসার যন্ত্রণায় মৃত্যুর আগপর্যন্ত ওখানেই থাকব। (তিনি এটা কীভাবে সহ্য করবেন?), তিনি তো সবচেয়ে মহান ও সবচেয়ে উদার। এতে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দয়াপ্রবণ হলেন। তখন তিনি তাদেরকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেন। তারা প্রবেশ করে এবং দুজনই ইসলাম গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে তারা অনেক উত্তম মুসলমান হয়েছিলেন। পরবর্তিতে আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়াহ তায়েফের যুদ্ধে শহীদ হন আর আবু সুফিয়ান উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর খিলাফাতের সময় মদীনায় ইন্তেকাল করেন।
এই ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু সুফিয়ান ইবনে হারিসের রক্তকে মূল্যহীন ঘোষণা করেন। অথচ অন্যদিকে কুরাইশদের বড় বড় সরদার-যারা যুদ্ধের জন্য শক্তি জোগান দেওয়া, অর্থ সম্পদ জোগান দেওয়ায় আরও বেশি সক্রিয় ও তৎপর ছিল-তাদেরকে হত্যা করেননি। আসলে তাকে হত্যা করার কারণ হলো, সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালাগাল করত। সে মুসলমান হয়ে আসার পরও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্যতম মহৎ চরিত্র ছিল তিনি দূরের মানুষকেও কাছে টেনে নিতেন, তা হলে আত্মীয়-স্বজনের বেলায় তিনি হৃদয়ে কতটুকু ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য লালন করতেন, চিন্তার বিষয়। তারপরও আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রতি এমন আচরণ করেছিলেন মূলত তার পক্ষ থেকে প্রকাশ-পাওয়া ঘৃণ্য আচরণের কারণে, যেমনটা হাদীসে তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
এমনিভাবে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা-বিজয়ের দিন ছয়জনকে তাদের নাম উল্লেখ করে কতলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারা হলেন-ইবনে আবি সারহ, ইবনে খাতাল, হুওয়াইরিস, মিকইয়াস, ইকরামাহ ও হাব্বার।
এ ছয়জন সম্পর্কে বর্ণনা বেশ প্রসিদ্ধ। রাসূলের সীরাত ও মাগাযীর বর্ণনাকারীগণ এ ধরনের রেওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন। তবে এগুলোর অধিকাংশ মুরসাল। মুরসাল রেওয়ায়াতও যখন বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়, বিশেষত ওই সমস্ত ব্যক্তি থেকে বর্ণিত হয়, যাদের মুরসাল গ্রহণযোগ্য, তবে এগুলো মুসনাদ হাদীসের মতোই, বরং কখনও কখনও আহলুল-মাগাযির মাঝে প্রসিদ্ধ একটি মুরসাল রেওয়ায়াতও একটিমাত্র সনদে বর্ণিত হাদীস থেকেও শক্তিশালী।
এমনিভাবে উকবাহ ইবনে আবি মুআইতকে বেঁধে রেখে হত্যা করা হয়, তখন সে বলছিল, হে কুরাইশরা! আমাকে কেন এভাবে বন্দি করে হত্যা করা হচ্ছে? তখন রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আল্লাহর সাথে কুফরি ও আল্লাহর রাসূলের ওপর মিথ্যা অপবাদের কারণে। [৮৫]
এমনিভাবে নযর ইবনে হারিসকেও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বন্দি করে হত্যা করেন, কেননা সেও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করেছিল।
সুতরাং স্পষ্ট হয়ে গেল যে, বদরের যুদ্ধবন্দিদের মধ্য থেকে দুজনকে বিশেষভাবে হত্যার কারণ হলো কটূক্তি। কুরাইশ ও সমগ্র আরবের যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে বিদ্রূপাত্মক কথা বলত, মক্কা-বিজয়ের পর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দেন।
তেমনি এক জিন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি ও বিদ্রুপ করেছিল। ফলে একজন শক্তিশালী মুসলিম জিন ওই জিনটাকে হত্যা করে ফেলে। পরবর্তীকালে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষজনকে এই ঘটনা শোনান।
এমনিভাবে ইহুদি আবু রাফি ইবনে আবিল হাকিকের ঘটনাও সহীহ বুখারীর প্রসিদ্ধ রেওয়ায়াত।
সুতরাং এই সকল হাদীস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, যে লোক নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করবে, তাকে হত্যা করা হবে এবং জনসমাজকে উৎসাহিত করা হবে তাকে হত্যা করার জন্য।
• ত্রয়োদশতম হাদীস হাদীসটি ইমাম আবুল কাসিম আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ আলবাগাঈ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন এবং আবু আহমাদ ইবনে আদি রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন আল-কামিল গ্রন্থে। [৮৬]
মদীনা থেকে দুই মাইল অদূরে বনু লাইসের একটা গ্রাম ছিল। একলোক তাদেরকে একটি বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় কিন্তু তারা প্রস্তাবটি নাকচ করে দেয়। তখন সে একটি বিশেষ পোশাক পরে তাদের কাছে আসে। সে এসে বলল, আল্লাহর রাসূল এই পোশাক পড়িয়েছেন এবং তোমাদের জান ও মাল-সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে ফয়সালা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তারপর সে ওই নারীর কাছে যায়, যাকে সে ভালোবেসেছিল। তখন তারা (সত্যতা যাচাইয়ের জন্য) রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে লোক পাঠান। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আল্লাহর শত্রু মিথ্যা বলেছে।' তারপর তিনি একজন লোক পাঠিয়ে বলেন, 'যদি তুমি তাকে (জীবিত) খুঁজে পাও তা হলে তার গর্দান উড়িয়ে দেবে। আর যদি দেখো, সে মরে গেছে তা হলে তার দেহ আগুনে জ্বালিয়ে দিবে।'
তারপর তিনি এই হাদীসটি বলেন, مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ 'যে ব্যক্তি আমার নামে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলবে, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।'[৮৭]
হাদীসটির সনদ সহীহ। দুর্বলতার কোনো কারণ জানা যায় না। এ হাদীসের একটি শাহিদ হাদীস রয়েছে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দূতকে বলেছিলেন, وَلا تُحَرِّقْهُ بِالنَّارِ، فَإِن لَا يُعَذِّبُ بِالنَّارِ إِلَّا رَبُّ النَّارِ
তাকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ো না, কেননা আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার একমাত্র আগুনের রবের। [৮৮]
এই হাদীসটির ব্যাখ্যায় দুটি অভিমত :
✓ প্রথম অভিমত
হাদীসের বাহ্যিক দিক গ্রহণ করে বলতে হবে, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা-কথা ছড়াবে তাকে হত্যা করতে হবে। যে-সমস্ত ইমামগণ এ মত গ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন, 'নবীর নামে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলার দ্বারা ব্যক্তি কাফের হয়ে যায়।' এ মত গ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছেন ইমামুল হারামাইন আবু মুহাম্মাদ আল-জুওয়াইনি রাহিমাহুল্লাহ।
তাদের যুক্তি হলো, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা বলার অর্থ হলো আল্লাহ তাআলার নামে মিথ্যা বলা। তাই তো নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমার নামে মিথ্যা বলা আর তোমাদের কারও নামে মিথ্যা বলা একই কথা নয়।'[৮৯] কেননা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ মূলত আল্লাহ তাআলারই আদেশ। তাই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করা ওয়াজিব, যেভাবে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করা ওয়াজিব। সুতরাং রাসূলুল্লাহর নামে মিথ্যাবাদী মূলত তাকে মিথ্যা-প্রতিপন্নকারীর মতোই।
বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা যেতে পারে এভাবে:
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করাও একপ্রকার মিথ্যা বলা। কেননা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করার অর্থ হলো, তিনি যে সকল সংবাদ নিয়ে এসেছেন সেগুলো সত্য নয় বলে ঘোষণা করা। আর এটা স্পষ্টভাবে আল্লাহর দ্বীনকে বাতিল বলার নামান্তর। তা ছাড়া নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে যে মিথ্যা বলবে, সে ইচ্ছাকৃতভাবে দ্বীনের মধ্যে এমন বিষয় ঢুকাল, যা দ্বীনের অংশ নয় এবং সে দাবি করে, তার কথা বিশ্বাস করা উম্মতের জন্য ওয়াজিব। এটা দ্বীনকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করারই নামান্তর। কেননা সে দাবি করছে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে বিষয়ে আদেশ করেছেন সেটা মূলত আদেশ করার মতো বিষয় না। এমনকি এ ব্যাপারে আদেশ করা কখনও কখনও বৈধ নয়। এ ধরনের কথা দ্বারা আল্লাহর সাথে নির্বুদ্ধিতাকে সম্পৃক্ত করা হয়, কিংবা এ দিকে ইঙ্গিত করা হয় যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাতিল বিষয়ে সংবাদ দিয়েছেন, এটা তো স্পষ্ট কুফরি।
মোটকথা, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নামে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলবে, সে যেন ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ তাআলাকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করল, বরং তার অবস্থা আরও জঘন্য। তেমনিভাবে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা কথা বলা তাকে অস্বীকারের নামন্তর।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, জেনে রাখুন, 'এই অভিমতটি অত্যন্ত শক্তিশালী।'
তিনি এর পক্ষে এমন সব দলিল ও প্রমাণ পেশ করেছেন যেগুলো এতটাই মজবুত ও সংখ্যায় বিপুল যে, কোনোভাবেই খণ্ডন করা সম্ভব নয়।
এরপর ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এ দিকে লক্ষ করা জরুরি যে, সরাসরি মিথ্যা-প্রতিপন্ন করা আর ভিন্নভাবে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করার মাঝে পার্থক্য আছে।
যেমন কোনো ব্যক্তি বলল, অমুকের ছেলে অমুক এই হাদীস নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আমাকে বর্ণনা করেছে। যদি সে এভাবে বর্ণনা করে তা হলে সেই 'অমুক' ব্যক্তির নামে মিথ্যা বলল, সরাসরি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে নয়। অর্থাৎ সে মাধ্যমের সাহায্যে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা বলল। আর যদি সে বলে, 'এটা সহীহ হাদীস' অথবা 'এটা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত' এবং বর্ণনাকারী ভালো করে জানে, সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা প্রচার করছে, তা হলে ধরা হবে সে সরাসরি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা-কথা প্রচার করল।
তবে যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা প্রচার করতে অপ্রচলিত বর্ণনা বলে বেড়ায় তার ব্যাপারে মতানৈক্য আছে।
সুতরাং কেউ যদি তার শাইখের কাছ থেকে জেনেশুনে জাল হাদীস বর্ণনা করে, তা হলে কাজটা হারাম হবে। কিন্তু তাকে কাফের বলা যাবে না। তবে সে বর্ণনার মধ্যে যদি এমন কিছু অনুপ্রবেশ করায় যার দ্বারা তাকে কাফের বলা অপরিহার্য হয়ে ওঠে তবে ভিন্ন কথা। (তাকে কাফের বলা যাবে না), কেননা সে এ বিষয়ে সত্যবাদী যে, তার শাইখ তাকে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
আলোচ্য-হাদীসের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, যে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করবে, সে ওই ব্যক্তির চেয়ে বেশি হত্যাযোগ্য যে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা কথা বলে। আর যে ব্যক্তি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ায়াসাল্লাম-এর নামে মিথ্যা বলেছে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কোনো প্রকার তাওবার সুযোগ দেওয়া ছাড়াই হত্যার আদেশ করেছেন। অতএব যে ব্যক্তি গালি দিবে সে তো আরও আগেই এই শাস্তির উপযুক্ত হবে।
✓ দ্বিতীয় অভিমত নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে যে মিথ্যা বলবে, তাকে কঠিনতর শাস্তি দিতে হবে, তবে কাফের বলা যাবে না এবং তাকে হত্যা করাও বৈধ হবে না।
কেননা কুফরি ও হত্যার কারণগুলো সুনির্ধারিত। রাসূলের নামে মিথ্যা বলা সেসব কারণের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই যার কোনো ভিত্তি নেই সেটা সাব্যস্ত করা জায়েয হবে না। দ্বিতীয় মতটি যারা ব্যক্ত করেন, তাদের উচিত কথাকে অবশ্যই শর্তযুক্ত করা। অর্থাৎ তার এহেন মিথ্যা বর্ণনা দ্বারা যেন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাহ্যত কোনো ত্রুটি বোঝানো না হয়, এই শর্তটুকু সংযুক্ত করা।
তবে ঘোড়ার-ঘাম-সংক্রান্ত জাল হাদীস[৯০] ও এ-জাতীয় কুসংস্কারপূর্ণ যে কথাগুলো নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে ত্রুটি হিসাবে চিহ্নিত হয়, সেগুলো যদি কেউ বর্ণনা করে বলে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তবে সে তো রাসূলকে নিয়ে উপহাস করল। আর কোনো সন্দেহ নেই যে, এমন ব্যক্তি কাফের ও তার রক্ত প্রবাহ বৈধ। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ এমনটাই উল্লেখ করেছেন।
সুতরাং ত্রয়োদশ হাদীসে উল্লিখিত ব্যক্তিটি মূলত আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে এমন মিথ্যা-কথ্যা বলেছে যার দ্বারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কলঙ্কিত হন। কেননা এই লোক দাবি করেছে, আল্লাহর রাসূলই তাকে মানুষের জান-মালের বিচারক ও ফয়সাল বানিয়ে পাঠিয়েছেন এবং তাদের যার ঘরে ইচ্ছা রাতযাপনের অনুমতি দিয়েছেন, যেন সে তার কাঙ্ক্ষিত নারীর সাথে রাত কাটিয়ে তার সাথে পাপাচার করতে পারে।
আর যে ব্যক্তি দাবি করবে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হারামকে হালাল করেছেন সে মূলত নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কলঙ্কিত করল। সুতরাং এ কথা প্রমাণিত যে, উভয় অভিমত অনুযায়ী যে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কলঙ্কিত করবে তাকে হত্যা করা হবে। এটাই এখানে মুখ্য আলোচ্য বিষয়।
তবে প্রথম ব্যাখ্যানুযায়ী লোকটা কাফের হবে, আর দ্বিতীয় ব্যাখ্যানুযায়ী কটূক্তিকারী হিসাবে গণ্য হবে। তবে দ্বিতীয় মতটি প্রথম অভিমতটিকে সমর্থন করে যে, যখন সাহাবাগণের সামনে কেউ নবীজির ব্যাপারে কোনো প্রকার মানহানি কিংবা কটূক্তি করত, তৎক্ষণাৎ সাহাবাগণ তা প্রতিহত করতেন।
• চতুর্দশ হাদীস
একজন বেদুইনের ঘটনা। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কিছু দান করেছিলেন, তখন সে নবীজিকে বলল, 'আপনি বণ্টন ঠিককরে ও সুন্দরভাবে করেননি।' তখন মুসলিমগণ তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা যদি তাকে হত্যা করতে তা হলে তো সে জাহান্নামে চলে যেত। [৯১]
হাদীসটি প্রমাণ করে যে, যে ব্যক্তি নবীজিকে কষ্ট দেওয়ার দায়ে নিহত হবে সে জাহান্নামে যাবে। কারণ সে কুফরি করেছে এবং তাকে হত্যা করাও বৈধ। যদি তাকে হত্যা করা বৈধ না হতো তা হলে তো সে শহীদ হয়ে যেত!
এই হাদীসে দেখা যায়, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেদুইনকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কেননা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে কষ্ট দেয় তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার অধিকার নবীর রয়েছে।
এ ধরনের আরেকটি কথা আছে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হুনাইনের গনিমত বণ্টন করেন, তখন এক ব্যক্তি বলল, এ বণ্টনে আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রত্যাশা করা হয়নি।' তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আমাকে ছাড়ুন, আমি এই মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিই!'
হাদীসটি সহীহ মুসলিমে আছে। তবে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকেও হত্যা করেননি। কেননা লোকজন বলাবলি করবে, মুহাম্মাদ নিজের অনুসারীদেরকে হত্যা করে! নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটাই বলেছিলেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এ-জাতীয় কথা বলেছিল। (কুরআনে আছে, সে বলেছিল-) لَئِن رَّجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ যদি আমরা মদীনায় ফিরি, তা হলে অবশ্যই অধিক মর্যাদাশীলগণ অপদস্থদেরকে মদীনা থেকে বের করে দিবে।[৯২]
তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আমাকে অনুমতি দিন, তার গর্দান উড়িয়ে দিই। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তা হলে তো তার পক্ষে অনেকে দাঁড়িয়ে যাবে।'
এটা ওই সময়ের ঘটনা যখন ইসলাম ছিল দুর্বল। ফলে আশঙ্কা ছিল, মানুষ ইসলামের প্রতি বৈরি হয়ে উঠতে পারে।
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, 'কে আছ, ওই ব্যক্তির ব্যাপারে সাহায্য করবে, যে আমার পরিবারকে পর্যন্ত কষ্ট দেয়?' তখন সাদ ইবনে মুআয রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি আপনাকে সাহায্য করব, সে যদি আওস গোত্রের হয় তা হলে আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিব।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদ বিন মুআযের এই কথা প্রত্যাখ্যান করেননি।[৯৩]
• পঞ্চদশ হাদীস
সাইদ ইবনে ইয়াহইয়া আল-উমাবি তার আল-মাগাযি গ্রন্থে ইমাম শাবি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, যখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা বিজয় করেন তখন 'উযযা'র সম্পত্তিগুলোকে আনিয়ে নিজের সামনে ঢেলে দেন তারপর নাম ধরে একজনকে ডেকে তাকে কিছু দেন। তারপর আবু সুফিয়ান ইবনে হারবকে ডেকে সেখান থেকে কিছু দান করেন। তারপর সাঈদ ইবনুল হারিসকে ডেকে কিছু দান করেন। এরপর কুরাইশের কিছু লোককে ডেকে তাদের মধ্যে কিছু বণ্টন করে দেন। কুরাইশের একেকজনকে একেকটা স্বর্ণের বার দান করেন যার প্রত্যেকটার ওজন ছিল পঞ্চাশ থেকে সত্তর মিসকাল[৯৪] পর্যন্ত। তখন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, 'আপনি ভালোকরেই জানেন, আপনি সোনার বারগুলো কাদেরকে দিচ্ছেন!' দ্বিতীয়বার দাঁড়িয়ে সে একই কথা বলল। নবী সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবারও তার দিকে মনযোগ দিলেন না। সে তৃতীয়বার দাঁড়িয়ে বলল, 'আপনি তো ফয়সালা করছেন, কিন্তু ইনসাফ দেখতে পাচ্ছি না। তখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'দুর্ভাগ্য তোমার! তা হলে তো আমার পরে আর কেউই ইনসাফ করতে পারবে না।'
এরপর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকরকে ডেকে বললেন, 'যাও! তাকে হত্যা কর।' কিন্তু তিনি গিয়ে তাকে আর পাননি। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'তুমি যদি তাকে হত্যা করতে, আমি আশা করি-সেই হত 'তাদের' প্রথম ও শেষ।[৯৫]
এই হাদীসটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, এ ধরনের যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অভিযোগ করবে তাদেরকে তাওবার সুযোগ না দিয়েই হত্যা করা হবে। এটি হুনাইনের গনিমত-বণ্টন-সংক্রান্ত ঘটনা নয়, বরং ভিন্ন আরেকটি ঘটনা। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পাঠানো স্বর্ণমুদ্রা-সংক্রান্ত ঘটনাটাও এটি নয়। 'উযযা' মূর্তিকে ভেঙে ফেলার ঘটনা ঘটেছিল মক্কা-বিজয়ের সময়, অষ্টম হিজরিতে। আর হুনাইনের ঘটনা ঘটেছিল মক্কা বিজয়ের পর যিলকদ মাসে। আর আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর স্বর্ণমুদ্রা পাঠানোর ঘটনা ঘটেছিল দশম হিজরিতে।
আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি যে, এক ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফয়সালা মেনে না নেওয়ায় উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে হত্যা করেছিলেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সমর্থনে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছিল। অথচ সেই ব্যক্তির অপরাধ ছিল এই ঘটনায় উল্লেখিত ব্যক্তির অপরাধের চেয়ে অনেক লঘু।
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পাঠানো স্বর্ণমুদ্রা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বণ্টন করেছিলেন। আর সেই বণ্টন নিয়ে এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অভিযুক্ত করেছিল। এই ঘটনা বুখারী-মুসলিমে বিবৃত হয়েছে।
তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, 'এর ঔরসে এমন একদল লোক জন্মাবে, যারা কিতাবুল্লাহ পাঠ করবে তৃপ্তিভরে কিন্তু সেই তিলাওয়াত তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেভাবে তির ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়। তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে আবার মূর্তিপূজারিদেরকেও ছেড়ে দিবে। আমি যদি তাদেরকে পেতাম তা হলে আদ সম্প্রদায়ের মতো হত্যা করতাম।[৯৬]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, 'শেষ জামানায় এমন কিছু লোকের আবির্ভাব হবে, যারা বয়সে হবে নবীন, জ্ঞান-বুদ্ধিতে হবে অপরিপক্ক, দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের মতো কথা বলবে, কিন্তু তাদের ইমান তাদের কণ্ঠনালি পর্যন্ত পৌঁছবে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেভাবে তির ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়। তাদেরকে যেখানেই পাও হত্যা করো। কেননা যে তাদেরকে হত্যা করবে কিয়ামত-দিবসে সে তাদেরকে হত্যা করার প্রতিদান পাবে।[৯৭]
এই সকল হাদীস প্রমাণ করে যে, রাসূলকে কটূক্তিকারী এই লোকটির দলবলকে রাসূল হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন, এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানিয়েছেন, তাদেরকে হত্যা করার মধ্যে রয়েছে হত্যাকারীর জন্য প্রতিদান। তিনি আরও বলেছেন, 'এরা হবে আকাশের নিচে সবচেয়ে জঘন্য নিহত-ব্যক্তি।[৯৮]
তাদের দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিধান আরোপের পরেই তিনি হত্যার-বিধান আরোপ করেছেন। বোঝা গেল, তাদেরকে হত্যা করা আবশ্যক এ জন্যই যে তারা 'দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে করতে দ্বীন থেকে বের হয়ে যায়।' এরা বিভিন্ন প্রকারের। আর এই লোকটাই হলো এদের 'প্রথম পুরুষ, যে নবীর যুগেই আত্মপ্রকাশ করে নবীজির বণ্টন নিয়ে আপত্তি তুলেছে।
সুতরাং যে ব্যক্তি নবীজির কোনো সুন্নাহকে কলঙ্কিত করবে তার বিধান উপরিউক্ত ব্যক্তিদের বিধানের মতোই হবে। অতএব যে দাবি করবে যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বণ্টন করতে গিয়ে জুলুম করেন, সে নবীজিকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করল। তার মতে তা হলে নবীর অনুসরণ আবশ্যক নয়। মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রাসূল হওয়ার মাঝে যে অন্তর্নিহিত গুণগুলো রয়েছে, যেমন আমানতদারিতা এবং তাঁকে মান্য করা আবশ্যক হওয়া, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাজ ও কথা দিয়ে যত ফয়সালা করেন, কোনো ফয়সালায় নিয়ে অন্তরে দ্বিধা-সংশয় না রাখা ইত্যাদি, এ গুণগুলোর সাথে মিথ্যা-প্রতিপন্নকারীর বিশ্বাস সাংঘর্ষিক। কেননা আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করা আল্লাহ ফরয করেছেন আর তিনি কারও ওপর জুলুম করতে পারেন না। সুতরাং যে এ বিষয়ে আপত্তি তুলবে, সে যেন রাসূলের রিসালাতের দায়িত্ব পালন নিয়েই আপত্তি তুলল। রাসূলের রিসালাত নিয়ে আপত্তি নিঃসন্দেহে নিকৃষ্ট ও জঘন্যতম কুফরি।
টিকাঃ
[৫৯] আবু দাউদ, আস-সুনান: ৪৩৬৪
[৬০] খাল্লাল, আল-জামি: ২/৩৪১
[৬১] 'উম্মু ওয়ালাদ' অর্থ যে দাসীর সাথে মনিবের শারীরিক সম্পর্ক হওয়া এবং তার গর্ভে মনিবের সন্তানও জন্ম লাভ করে।
[৬২] আবু দাউদ, আস-সুনান: ৪৩৬৩
[৬৩] খাত্তাবি, মায়ালিমুস সুনান: ৩/২৯৬
[৬৪] বুখারী, আস-সহীহ ৩৮১১; আরও বিস্তারিত রই ডাউনলোড করুন ৪৭৬৫।
[৬৫] তাবারানি, মুজামুস সাগির: ৬৫৯
[৬৬] নাসাঈ, সুনানুল কুবরা: ৩৫৩৪
[৬৭] আবু দাউদ, আস-সুনান: ৪৩৬৫
[৬৮] ওয়াকিদি, আল-মাগাযি: ১/১৭২-১৭৩ সনদ মনকাতি; ইবনে আদি, আল-কামিল: ৬/১৪৫।
[৬৯] ইবনে সাদ, আত-তাবাকাত: ২/২৮
[৭০] খুযাআ ছিল নবিজির মিত্র। আর বনু বকর ছিল কুরাইশদের মিত্র।
[৭১] আবু দাউদ, আস-সুনান: ২৬৮৫; নাসাঈ, আস-সুনান: ৪০৬৭; সনদ সহীহ।
[৭২] ইবনে হিশাম, আস-সিরাত: ২/৪০৯
[৭৩] তাবারি, জামিউল বায়ান: ৫/২৬৮; ওয়াহিদি, আসবাবুন নুযুল: ২৪৫ পৃ.।
[৭৪] সূরা আনয়াম, ৬: ৯৩
[৭৫] বিস্তারিত-বুখারী, আস-সহীহ, কিতাবুল মানাকিব: ৩৬১৭।
[৭৬] শাইখুল ইসলাম এ ঘটনার বিশুদ্ধতা দাবি করেননি। তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, 'ইকরিমাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে।' মূলত এটি ইমাম বা'লির দাবি। (অনুবাদক)
[৭৭] তায়ালিসি, আল-মুসনাদ: ২০২০; আবু আওয়ানা, আল-মুসনাদ: ৩১১১।
[৭৮] আহমাদ, আল-মুসনাদ: ৮৩৭২; এ ব্যাপারে অসংখ্য হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এমনকি এটি মুতাওয়াতির পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কুরআন সাত পাঠ-পদ্ধতিতে অবতীর্ণের ব্যাপারটি সর্বসম্মত। (অনুবাদক)
[৭৯] তায়ালিসি, আল-মুসনাদ: ৪১
[৮০] ওয়াকিদি, আল-মাগাযি: ২/৮৫৯; ইবনে হিশাম, সিরাতুন নবী: ২/৪০৯-৪১০
[৮১] বুখারী, আস-সহীহ : ৩০১৪; মুসলিম, আস-সহীহ : ১৭৪৪
[৮২] বুখারী, আস-সহীহ: ১৮৪৬; মুসলিম, ৩৯৮৮
[৮৩] ওয়াকিদি, আল-মাগাযি: ২/৮০৬-৮০
[৮৪] ওয়াকিদি, আল-মাগাযি: ২/৮১০
[৮৫] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়ািদ
[৮৬] ইবনে আদি, আল-কামিল: ৪/৫৩-৫৪
[৮৭] তাহাবি, মুশকিলুল আসার: ৩৩২
[৮৮] ইবনে যাকারিয়্যা, আল-জালিসুস সালিহ: ১৪
[৮৯] বুখারী, আস-সহীহ: ১২৯১; মুসলিম আস-সহীহ : ৪
[৯০] এটি প্রসিদ্ধ একটি বানোয়াট, ভিত্তিহীন বর্ণনা। ইমাম ইবনুল জাওযি তার প্রসিদ্ধ জাল হাদীস সংকলন আল-মাওযুয়াত গ্রন্থে (১/১০৫) সংকলন করেছেন। মুহাদ্দিসগণ বলেছেন যে, 'এটি বানোয়াট হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আর কোনো মুসলিমও এটি বানায়নি।'
[৯১] আবুশ শাইখ, আখলাকুন নবী: ১৭৭; সনদে ইবরাহীম ইবনুল হাকাম দুর্বল রাবী।
[৯২] সূরা মুনাফিকুন, ৬৩:৮
[৯৩] বুখারী, আস-সহীহ : ৪১৪১; মুসলিম, আস-সহীহ : ২৭৭০।
[৯৪] মিসকাল-আরবের বিশেষ একধরনের ওজন-পদ্ধতি। ১ মিসকাল = ৪.৩৭৪ গ্রাম।
[৯৫] শাইখুল ইসলাম বলেন, 'হাদীসটি মুরসাল। মুজালিদ ইবনে সাইদ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তিনি লাইয়িনুল হাদীস (দুর্বল)। তবে অর্থগত দিক থেকে এর সমর্থনে আরও বহু হাদীস আছে।'
[৯৬] বুখারী, আস-সহীহ: ৩৩৪৪; মুসলিম, আস-সহীহ: ১০৬৪。
[৯৭] বুখারী, আস-সহীহ: ৩৬১১; মুসলিম, আস-সহীহ: ১০৬৬。
[৯৮] আহমাদ, আল-মুসনাদ: আস-সুনান: ৩০০০。
• প্রথম হাদীস ইমাম শাবি রাহিমাহুল্লাহ আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে,
أَنَّ يَهُودِيَّة كَانَتْ تَشْتِمُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَتَقَعُ فِيهِ فَخَنَقَهَا رَجُلٌ حَتَّى مَاتَتْ فَأَبْطَلَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم دَمَهَا
'এক ইহুদি মহিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করত। ফলে একলোক তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মুক্তিপণের পরিবর্তে) ওই মহিলার রক্ত মূল্যহীন ঘোষণা করেন। [৫৯]
হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আবু দাউদ ও ইবনে বাত্তাহ রাহিমাহুমুল্লাহ। ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। [৬০]
আরেক বর্ণনায় এসেছে, সেই হত্যাকারী লোকটি অন্ধ ছিলেন। হাদীসটির সনদ জাইয়িদ ও মুত্তাসিল। কেননা ইমাম শাবি রাহিমাহুল্লাহ আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। আর যদি মুরসালও হয়, তবুও হাদীসটি সর্বসম্মতিক্রমে প্রমাণযোগ্য। কেননা ইমাম শাবি রাহিমাহুল্লাহ বর্ণিত মুরসাল বর্ণনাগুলোও মুহাদ্দিসগণের নিকটে সহীহ। কারণ তার যত মুরসাল বর্ণনা আছে, সবই সহীহ হিসেবে প্রমাণিত।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করার কারণে অভিশপ্ত ইহুদি নারীকে হত্যা করার ব্যাপারে হাদীসটি একেবারেই দ্ব্যর্থহীন। আর এই হাদীসটি আরও স্পষ্টভাবে ওই সকল যিম্মি ও মুসলিম নারী-পুরুষের রক্ত হালাল বানানোর দলিল, যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করে।
• দ্বিতীয় হাদীস ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত, 'এক অন্ধ লোকের একটি 'উম্মু ওয়ালাদ। [৬১] দাসী ছিল। সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করত, তাকে নিয়ে কটূক্তি করত। ফলে অন্ধ লোকটি ধারালো একটি ছুরি নিয়ে দাসীর পেটে বিঁধিয়ে দিয়ে চেপে ধরে রাখলেন। এই ঘটনা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শুনানো হলে তিনি ওই দাসীর রক্ত মূল্যহীন ঘোষণা করেন। [৬২]
আবু দাউদ ও নাসাঈ রাহিমাহুমাল্লাহ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমাদ হাদীসটিকে দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। হতে পারে এই ঘটনাটা হুবহু প্রথম ঘটনা। সেক্ষেত্রে এই ঘটনার বাদিও ইহুদি হবে। কাযি আবু ইয়া'লা রাহিমাহুমুল্লাহ-সহ অন্যান্য আলেমদের অভিমত এটাই। তারা উভয় হাদীসের ঘটনাকে একই ঘটনা মনে করেন। অথবা হতে পারে এটা ভিন্ন আরেকটা ঘটনা।
ইমাম খাত্তাবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
وفيه بيان ان ساب النبي مقتول وذلك أن السب منها لرسول الله ارتداد عن الدين
'এ হাদীস থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গালমন্দকারীকে হত্যা করা হবে। কারণ, গালমন্দ বা অমার্জিত ভাষা ব্যবহার করা মানে মুরতাদ হয়ে যাওয়া বা ইসলাম ত্যাগ করা। [৬৩]
ইমাম খাত্তাবি রাহিমাহুল্লাহ-এর কথা এ দিকে ইঙ্গিত করে যে, তিনি কিটূক্তিকারী নারীটিকে মুসলিম ছিল বলে মনে করেন। কেননা ইমাম খাত্তাবির কথায় ব্যবহৃত 'ইরতিদাদ' মানে ইসলাম ত্যাগ করা। কটূক্তিকারী নারীটির মুসলিম হওয়ার কোনো দলিল হাদীসের মধ্যে নেই, বরং হাদীস থেকে বাহ্যত বোঝা যায়, মহিলাটি কাফের ছিল। কেননা হাদীসে উল্লেখ আছে যে, কটূক্তিকারী দাসীর মনিব তাকে এহেন কাজ থেকে কয়েকবার নিষেধ করেছিলেন। সুতরাং দাসীটি যদি মুরতাদ হতো তা হলে তার সাথে সহবাস করা ও দীর্ঘ সময় ধরে নিজের অধীনে রাখা কোনোভাবেই মুসলিম মনিবের জন্য বৈধ হতো না।
• তৃতীয় হাদীস এটি সেই হাদীস, যে হাদীস দিয়ে ইমাম শাফেঈ রাহিমাহুল্লাহ দলিল দেন যে, কোনো যিম্মিও যদি রাসূলকে কটূক্তি করে, তা হলে তাকে হত্যা করা হবে। হাদীসটি ইহুদি কবি ও গোত্রনেতা কাব ইবনে আশরাফের ঘটনা-সম্বলিত বর্ণনা। ঘটনাটি প্রসিদ্ধ ও স্বতঃসিদ্ধ। একবার নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
مَنْ لِكَعْبِ بْنِ الْأَشْرَفِ فَإِنَّهُ قَدْ آذَى اللهَ وَرَسُولَهُ 'কে আছো কাব ইবনে আশরাফের জন্য? সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে।'
তখন মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রাদিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি চান আমি তাকে হত্যার দায়িত্ব নিই?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' তখন সাহাবি বললেন, 'তা হলে আমাকে কিছু কৌশলী কথা বলার অনুমতি দিন।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুমতি দিলেন। মুহাম্মাদ বিন মাসলামা কাবের কাছে এসে বললেন, এই লোকটা (মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তো এখন আমাদের কাছে সাদাকা চাচ্ছে। লোকটা আমাদেরকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।' কাব এ কথা শুনে বলল, তোমরা তার ব্যাপারে আরও অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে।' (এভাবে তিনি কাবের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।) পরিশেষে তিনি তাকে হত্যা করেন। [৬৪]
হাদীসটি বুখারী ও মুসলিমে আছে। কাব ইবনে আশরাফ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিন্দা করত। ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে হত্যা করার আহ্বান জানান। কাবের জনবল নবীজির কাছে এসে বলল, 'আমাদের সরদার কাবকে গুপ্তহত্যা করা হয়েছে।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'অন্যদের মতো সেও যদি সংযত থাকত তা হলে সে ক্ষতির মুখোমুখি হত না। আমরা তার থেকে কষ্ট পেয়েছি, সে আমাদের নামে নিন্দা-কাব্য রচনা করেছে। তোমাদের কেউ যদি এমন জঘন্য কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, তা হলে তরবারিই তার ফয়সালা করবে।'
এ পর্যায়ে ইহুদিরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। কাব ইবনুল আশরাফের হত্যার পর থেক তারা পুরোপুরি সাবধান হয়ে যায়।
কাব ইবনুল আশরাফ তো নিরাপত্তা-চুক্তিতে আবদ্ধ যিম্মি ছিল। যখন সে কটূক্তি করল, তখন তার নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে গেল। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ব্যাপারে বলেন,
فَإِنَّهُ قَدْ آذَى اللهَ وَرَسُولَهُ
'কেননা সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে।'
সুতরাং যে-কেউই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিবে তাকে হত্যা করা হবে। আর মুসলমানদের সর্বসম্মতিক্রমে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কটূক্তি করার দ্বারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া হয়। সুতরাং কটূক্তির কারণে হত্যার বিধান অবধারিত।
• চতুর্থ হাদীস
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ سَبَّ نَبِيًّا قُتِلَ، وَمَنْ سَبَّ أَصْحَابِي جُلِدَ
'যে ব্যক্তি কোনো নবীকে গালি দিবে তাকে হত্যা করা হবে, আর যে ব্যক্তি আমার কোনো সাহাবিকে গালি দিবে তাকে বেত্রাঘাত করা হবে।[৬৫]
হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আবু মুহাম্মাদ আল-খাল্লাল, আল-আযাজিয়্যি ও আল-হারাওয়ি। হাদীসের থেকে বোঝা যায় যে, এমন ব্যক্তিকে হত্যা করতে হবে, তাওবার সুযোগ দেওয়া হবে না।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী হলো আব্দুল আযিয ইবনে হাসান ইবনে যাবালাহ, তিনি হাদীস বর্ণনায় দুর্বল।
• পঞ্চম হাদীস
আব্দুল্লাহ ইবনে কুদামা রাহিমাহুল্লাহ আবু বারযাহ আসলামি থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এক লোক আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতি কঠিন-ভাষা ব্যবহার করেন। আমি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললাম, আমি কি তাকে হত্যা করব?
তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, 'এমন হুকুম তো নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দকারী ছাড়া অন্য কারও জন্য নয়।'[৬৬]
আরেক বর্ণনায় আছে, এক লোক আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে গালি দিয়েছিল। তখন তিনি উক্ত কথাটি বলেন। আবু দাউদ রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি তার সুনানে সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন।[৬৭]
অনেক আলেম এ হাদীস দ্বারা দলিল পেশ করেছেন যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দকারীর শাস্তি হত্যা। এই অভিমত-পোষণকারীদের মধ্যে আছেন ইমাম আবু দাউদ, ইসমাইল ইবনে ইসহাক, আবু বকর আব্দুল আযিয এবং কাযি আবু ইয়া'লা প্রমুখ। এই হাদীসটি থেকে বোঝা গেল, যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করবে তাকে হত্যা করা বৈধ। হাদীসটি কাফের-মুসলিম উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
• ষষ্ঠ হাদীস
আসমা বিনতু মারওয়ানের ঘটনা। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, খাতমা গোত্রের এক নারী কবিতায় রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অপমান করে। তখন নবীজি বললেন— 'এই মহিলার ব্যাপারে আমার পক্ষে কে আছ?' অখন তার গোত্রের এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি।'
এরপর লোকটা উঠে গিয়ে সেই মহিলাকে হত্যা করল। হত্যা করে ফিরে এসে সংবাদটা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানালে তিনি বললেন, 'মাদি ছাগল দুটো তাকে নিয়ে আর গুঁতোগুঁতি করবে না।[৬৮]
বিভিন্ন মাগাযি-বিশেষজ্ঞদের কাছে ঘটনাটা প্রচলিত। এই মহিলাকে হত্যা করা হয় রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদর থেকে ফিরে আসার পর, পঁচিশে রমাদান। ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন ইতিহাস-বিশেষজ্ঞগণ। যেমন ইবনে সাদ, আল-আসকারি, আবু উবাইদ তার আল-আমওয়াল গ্রন্থে এবং ওয়াকিদি-সহ এবং অন্যান্যরা। এটি একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা। আর এই অভিশপ্ত মহিলাকে হত্যা করার কারণ ছিল সে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করত।
• সপ্তম হাদীস ইহুদি আবু আফাকের ঘটনা। মাগাযি-বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসবিদগণ এটি উল্লেখ করেছেন। তার কাজই ছিল রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে কটূক্তিমূলক কবিতা আবৃত্তি করা।
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বদরের যুদ্ধে বেরিয়ে পড়লেন এবং আল্লাহর সাহায্যে বিজয় লাভ করে ফিরলেন, তখন সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরও হিংসা করতে লাগল। সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিন্দা করে কবিতা আবৃত্তি করল এবং নবীজির অনুসারীদেরকেও কটূক্তি করল। তার কবিতার জঘন্যতম একটি অংশ ছিল-
'এক আরোহী তাদের তাদের বৈধ-অবৈধ সবকিছুই ছিনিয়ে নেয়।'
সালিম ইবনে উমাইর বলেন, 'আমি নযর করেছি, তাকে আমি হত্যা করব।' ইবনে সাদ উল্লেখ করেছেন যে, 'সে ইহুদি ছিল।' তবে এ বর্ণনাটি ইতিহাসবিদদের। তারপরও নিশ্চিতভাবে এটি এ-সংক্রান্ত অন্যন্য হাদীসকে সমর্থন ও জোড়ালো করতে পারে।
• অষ্টম হাদীস আনাস ইবনে যুনাইম আদদিলির ঘটানাটি। সীরাত-বিশারদদের কাছে হাদীসটি প্রসিদ্ধ। ইবনে ইসহাক, ওয়াকিদি-সহ অন্যান্য আলেমগণ এটি বর্ণনা করেছেন। এই লোকটা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করে কবিতা রচনা করেছিল। খুযায়াহ গোত্রের এক মুসলিম তরুণ বিষয়টা শুনতে পেয়ে তার মাথা ফাটিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রক্তকে মূল্যহীন ঘোষণা করেন। অর্থাৎ এই অপরাধের কারণে আঘাতকারীকে কোনো শাস্তিই দেননি।
আনাস ইবনে যুনাইম যখন নবীজির পক্ষ থেকে তার রক্তমূল্যহীনতার ফরমান সম্পর্কে অবহিত হয় তখন সে নবীজির কাছে নিজের অপরাগতার কথা প্রকাশ করে এবং নবীজির ভূয়সী প্রশংসা করে একটি কবিতা আবৃত্তি করে। কবিতার প্রথমাংশ নিম্নরূপ-
আপনি কি সেই মহান ব্যক্তি নন, [৬৯]
যার আদেশে 'মায়াদ' গোত্রকে হিদায়াত দেওয়া হয়? বরং হিদায়াত আল্লাহ দেন, আর আপনাকে বলেন, তুমি সাক্ষী থেকো। কোনো উটনী বহন করেনি নিজের পরে মুহাম্মদের চেয়ে সৎ, মহৎ ও আমানতদারকে।
হে রাসূল! আপনি আমাকে পাকড়াও করতে সক্ষম। আপনার পক্ষ থেকে একটি হুঁশিয়ারিই তো পাকড়াও সমতুল্য। হে রাসূল! তিহামাহ ও নজদের সমস্ত অধিবাসীর ওপর আপনি তো কর্তৃত্ব প্রয়োগের অধিকার রাখেন।
রাসূলকে বলা হয়েছে, আমি নাকি তার মানহানি করেছি। (রটনাকারীরা জেনে নিক) আমার চাবুক নিজের ওপরে চাবুক মারেনি। আমি না কারও মানহানি করেছি, আর না কারও খুন ঝরিয়েছি। একটু ভেবে দেখুন, হে সত্যের প্রসারী! এরপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।
যখন তার এই কবিতা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে পৌঁছে এবং তিনি তার পক্ষ থেকে অপরাগতা স্বীকারের কথা জানতে পারেন, তখন তিনি নওফাল ইবনে মুয়াবিয়ার সাথে তার ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করেন। তখন নাওফালও তার জন্য সুপারিশ করেন, অন্যদিকে বনু খুযায়ার এক বালক তো তার মাথা আগেই ফাটিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'ঠিক আছে, আমি তাকে মাফ করে দিলাম।'
তখন নাওফাল বলেন, 'আমার মা-বাবা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক।' এরপর আনাস ইবনে যুনাইম রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে আবার ওযর পেশ করে বলেন, তারা আমার নামে মিথ্যা বলেছে।
এখানে দলিল হলো, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশদের সাথে দশ বছরের জন্য সন্ধিচুক্তি করেন। এই চুক্তির আওতায় বনু খুযায়াহ ও বনু বকরও অন্তর্ভুক্ত ছিল [৭০]।। এ চুক্তির অধীনে আনাস ইবনে যুনাইমও ছিল। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিন্দা করে কবিতা আবৃত্তি করেছিল, যার ফলে চুক্তিবদ্ধ থাকা সত্বেও অন্য আরেকজন তার মাথা ফাটিয়ে দেয়।
তারা যদি না জানতেন যে, চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তিও যদি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যাপারে কটূক্তি করে তা হলে তাকেও শায়েস্তা করা অপরিহার্য, তা হলে তারা তো তার মাথা ফাটিয়ে দিতেন না।
তাই তো প্রথমে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রক্তকে মূল্যহীন ঘোষণা করেছিলেন। আর এই হুকুমই বোঝায় যে, কটূক্তিকারী চুক্তিবদ্ধ হলেও তার রক্ত বৈধ। এরপর সে যখন নিজের কবিতার মধ্য দিয়ে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেয়, তখন থেকে সবাই তাকে সাহাবাদের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন।
তার কবিতার এই অংশের প্রতি লক্ষ্য করুন, 'জেনে নিন হে আল্লাহর রাসূল!' এই বাক্যটি তার ইসলাম প্রমাণ করে। সাথে সাথে সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমালোচনার বিষয়টিও অস্বীকার করে। এমনকি তার বিরুদ্ধে যারা সাক্ষ্য প্রদান করেছিল সে তাদের সাক্ষ্যকে এই বলে প্রত্যাখ্যান করেছে যে, এরা তো আমার শত্রুগোত্র, আমাদের মধ্যে অনেক যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছে।
আমাদের বক্তব্য হলো, রাসূলকে কটূক্তি করার কারণে যদি রক্ত বৈধ বা মূল্যহীন না হত তা হলে তো এসব কোনো কিছুরই প্রয়োজন হতো না।
তারপরও, সে ইসলাম এনে, ওযর পেশ করে, বিরোধীদের বক্তব্য খণ্ডন ও মিথ্যা-প্রতিপন্ন করে এবং নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রশংসা করেও, রাসূলের কাছে ক্ষমা চাচ্ছে, যেন তিনি তার হত্যা ও রক্ত-বৈধতার ফরমান উঠিয়ে নেন। অপরাধীকে যখন শাস্তি দেওয়া বৈধ, ক্ষমা তো তখনই যথার্থ হয়ে থাকে।
তাই বোঝা যায়, সে মুসলিম হয়ে, ওযর পেশ করেও শাস্তি পাওয়ার যোগ্য ছিল এবং নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাইলে তাকে শাস্তি দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজের মহানুভবতা ও দায়ার কারণে তাকে ক্ষমা করে দেন। তা ছাড়া তার সাথে যে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল সেটা ছিল যুদ্ধবিরতিমূলক চুক্তি, জিযিয়াভিত্তিক কোনো চুক্তি ছিল না। যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে আবদ্ধ ব্যক্তি নিজের দেশে যা ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারে। যতক্ষণ-না সে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উস্কানি বা ঘোষণা দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সে চুক্তি ভঙ্গ হয় না।
তা হলে জানা গেল, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তি করা একপ্রকার যুদ্ধে-নামার মতো, বরং আরও গুরুতর। আর যে কটূক্তিকারী, তার জন্য কোনো ধরনের নিরাপত্তা-বিধান থাকবে না।
• নবম হাদীস
ঘটনাটা ইবনে আবি সারহের। এই ঘটনার ব্যাপারে আহলুল ইলমগণ একমত। বিষয়টা তাদের কাছে এতটাই প্রসিদ্ধ যে, এটি এক ব্যক্তির বর্ণনা হওয়ার সুযোগই নেই। ঘটনাটা হলো—
মক্কা বিজয়ের দিন আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট লুকিয়ে থাকেন। কোনোমতে তাকে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত করেন তিনি এবং বলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আব্দুল্লাহকে (ইসলামের ওপর) বাইয়াত করান।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথা উঠিয়ে তার দিকে তাকান। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তিনবার একই কথা পুনরাবৃত্তি করেন। আর প্রত্যেকবারই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বাইয়াত করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনবারের পর তাকে বাইয়াত করে নেন। তারপর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের বললেন,
أَمَا كَانَ فِيكُمْ رَجُلٌ رَشِيدٌ يَقُومُ إِلَى هَذَا حَيْثُ رَآنِي كَفَفْتُ يَدِي عَنْ بَيْعَتِهِ فَيَقْتُلُهُ
'কী ব্যাপার! তোমাদের মধ্যে কি এমন কোনো চৌকস লোক নেই, যে আমাকে যখন দেখল আমি তার দিকে হাত বাড়াইনি, তখনই তার গর্দান উড়িয়ে দিত?'
সাহাবায়ে কেরাম জবাব দিলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তো জানি না আপনার মনের চাওয়া কী ছিল। আপনি আমাদেরকে কেন চোখ দিয়ে ইঙ্গিত করলেন না?' তখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা কী জানো না যে, কোনো নবীর জন্য চোখের খেয়ানত সমীচীন নয়?'[৭১]
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো তার রক্ত মূল্যহীন করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর দুধভাই ছিল। তাই উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটে তার জন্য সুপারিশ করেছিলেন, ফলে তিনি তাকে মাফ করে দেন।
কিন্তু সে ইসলাম গ্রহণের পর ফের মুরতাদ হয়ে মুশরিকদের দল ভারি করে। অথচ সে ইসলাম গ্রহণের পর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওহি-লেখকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরপর সে মুশরিকদের দলে ভিড়ে প্রচার করতে থাকে, 'আমি যেভাবে চাইতাম সেভাবেই কুরআনকে পরিবর্তন করতাম, কেননা তিনি আমাকে কিছু (ওহি) লিখার আদেশ দিতেন। আমি তাকে বলতাম, 'এমন অথবা এমন লিখলে হবে?' তিনি বলতেন, 'হাঁ, হবে।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতেন 'আলেমুন হাকিম' লেখো। সে বলত, 'আযিযুন হাকিম' লিখলে হবে কি? তিনি বলতেন, হ্যাঁ! দুটো তো একই।[৭২]
বলা হয় যে, এই আয়াতটি তার ব্যাপারে নাযিল হয়েছিল।[৭৩]
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللهِ كَذِبًا أَوْ قَالَ أُوحِيَ إِلَيَّ وَلَمْ يُوحَ إِلَيْهِ شَيْءٌ وَمَنْ قَالَ سَأُنْزِلُ مِثْلَ مَا أَنْزَلَ اللهُ ...
ওই ব্যক্তির চেয়ে বড় জালিম কে হতে পারে, যে আল্লাহর নামে মিথ্যা বলে কিংবা বলে-আমার প্রতি ওহি অবতীর্ণ হয়েছে, অথচ তার প্রতি কিছুই অবতীর্ণ হয়নি অথবা বলে আল্লাহ যেমন নাযিল করেছেন, ওমন আমিও অচিরেই ওহি নাযিল করব।[৭৪]
এই হাদীস থেকে জানা যায়, সে নবীর ওপর মিথ্যা আরোপ করে এবং মানুষের মাঝে বানোয়াট কথা ছড়াতে থাকে যে, তিনি তাকে ওহি লেখতে বলতেন, তার যা ইচ্ছা হত, তাই লিখত আর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেটাকেই বহাল রাখতেন। নিশ্চয় এ মিথ্যাচারও নবীর নামে একপ্রকারের কটূক্তি। ওহি বিকৃতকরণের দাবি সে ছাড়াও আরেকজন করেছিল। আল্লাহ তাআলা তাকে পাকড়াও করেন। তার মৃত্যুর পর লোকেরা তাকে যেখানেই দাফন করে মাটি তাকে উগড়ে দেয়।[৭৫] আর এটাই হচ্ছে সুস্পষ্ট দলিল যে, যে বা যারাই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যাপারে অশালীন মন্তব্য করবে আল্লাহ তাআলা তার থেকে প্রতিশোধ নিবেন, তাকে শায়েস্তা করবেন। সুতরাং তাওবা করে ইসলাম গ্রহণের পরও আব্দুল্লাহ ইবনে আবি সারহের রক্ত বৈধ হওয়া, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে 'কেন তোমরা তাকে হত্যা করোনি?'-এ কথা বলা, এরপর তাকে ক্ষমা করে দেওয়া এসব প্রক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাইলে তাকে হত্যা করতে পারেন, চাইলে ক্ষমাও করতে পারেন।
আবার এটাও প্রমাণ হয় যে, যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করবে তিনি তাকে হত্যা করার পূর্ণ অধিকার রাখেন, যদিও সে তাওবা করে ইসলামের দিকে ফিরে আসে।
বিশুদ্ধ বর্ণনায় [৭৬] আছে, ইবনে আবি সারহ মক্কা-বিজয়ের আগেই ইসলামে ফিরে আসে। সে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলে, 'আমি সত্যিই অনেক বড় অপরাধ করেছি। এখন আমি তাওবা করে আবার ফিরে এসেছি।' তারপর লোকজন যখন একটু স্থিমিত ও প্রশান্ত হয় তখন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে নিয়ে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে হাজির হন। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মনে মনে চাইছিলেন যেন মুসলমানরা তাকে হত্যা করে ফেলে। এ জন্য তিনি বেশ কিছুক্ষণ সময় অপেক্ষা করেন, এরই মধ্যে কেউ তাকে স্বেচ্ছায় হত্যা করে কি না এ জন্যে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভাবছিলেন, হয়তো কেউ তাকে শীঘ্র হত্যা করে ফেলবে। ... এই যে এতকিছু ঘটল, এগুলো স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, ইসলাম গ্রহণের পরও তাকে হত্যা করা বৈধ ছিল।
আব্দুল্লাহ ইবনে আবি সারহ এবং আরেকজন খ্রিষ্টান ওহি-লেখক নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর যে মিথ্যা অভিযোগ করে বলে, তাদের ওহি-বিকৃতির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি জানতেন (কিন্তু কিছুই বলতেন না, বরং সমর্থন করতেন)- এটা ডাহা মিথ্যা কথা। কেননা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওইটাই লেখাতেন যেটা আল্লাহ তাআলা নাযিল করতেন, ওইটাকেই ঠিক রাখতে বলতেন যেটাকে আল্লাহ তাআলা ঠিক রাখতে বলেছেন। নিজের ইচ্ছামাফিক কোনো রদবদল করতেন না। বরং আল্লাহ তাআলা যেভাবে চাইতেন সেভাবেই তিনি লিপিবদ্ধ করাতেন। তবে আহলুল ইলমগণ এতটুকু মতবিরোধ করেন যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে যেটা লেখার নির্দেশ দিতেন তার বিপরীত লিখলেও কি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমর্থন করতেন এবং তাকে এ ব্যাপারে কিছুই বলতেন না? এ ব্যাপারে আলেমগণ দুটো মত পেশ করেছেন-
✓ প্রথম মত এই খ্রিষ্টান ও ইবনে আবি সারহ আগাগোড়োই মিথ্যাচার করেছে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা লিখতে দিয়েছিলেন তার বিপরীত কোনো কিছু স্বীকৃতি দেওয়ার মতো কোনো ঘটনাই ঘটেনি। বরং তারা উভয়ে মনগড়াভাবে বানিয়ে-বুনিয়ে মানুষের সামনে ছড়িয়ে দেয় লোকদেরকে ইসলামের ব্যাপারে সন্দিহান করে তোলার জন্য।
✓ দ্বিতীয় মত হ্যাঁ, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে লিখতে বলতেন। অর্থাৎ তিনি তার সামনে পাঠ করে, তাকে লিখতে বলতেন, سَمِيعًا بَصِيرًا কিন্তু সে লিখত سَمِيعًا عَلِيمًا। ফলে তাকে বলতেন ঠিক আছে, যেভাবে আছে সেভাবেই রেখে দাও-এ- জাতীয় কিছু কথাবার্তা হত। [৭৭]
হতে পারে দুভাবেই নাযিল হয়েছিল, ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতেন, 'এভাবে লিখো, চাইলে ওভাবেও লিখতে পারো। কেননা উভয়টাই সঠিক।' কেননা আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে স্পষ্টভাবে হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন-
أُنْزِلَ الْقُرْآنُ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ 'কুরআন সাত রীতি বা পাঠ-পদ্ধতিতে অবতীর্ণ হয়েছে। [৭৮]
সকল পদ্ধতিই তৃপ্তিদায়ক ও গ্রহণযোগ্য। আপনি যদি عزیز حكيم এর পরিবর্তে غفور رحيم বলেন, তা হলেও ব্যাপারটা একই হবে, যতক্ষণ-না রহমত-সংক্রান্ত আয়াতকে আযাব-সংক্রান্ত আয়াত দিয়ে শেষ করেন অথবা আযাব-সংক্রান্ত আয়াতকে রহমত- সংক্রান্ত আয়াত দিয়ে পাঠ শেষ করেন।
সুতরাং এমন অনেক হাদীস রয়েছে যেগুলো প্রমাণ করে যে, সাত পাঠপদ্ধতিতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে এবং আল্লাহ তাআলার নামসমূহের মধ্য হতে ‘বদল’ হিসেবে কোনো একটা নাম দিয়ে পাঠ শেষ করার বৈধতা দেওয়া হয়েছে সেখানে পাঠক যে-কোনো একটি রীতিশৈলীর কিরায়াত দিয়ে পাঠ শুরু করতে পারে। অতএব নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সেই সাতরীতির কোনো এক রীতিতে লেখার অনুমতি দিয়েছিলেন। দেখা যায় কখনও কখনও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি আয়াত কোনো এক রীতিতে পাঠ করতেন কিন্তু সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলত, ‘আমি কি এই রীতিতে অথবা ওই রীতিতে লিখতে পারি?’ আর সে এটা বলতে পেরেছিল এ জন্যই যে, সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষ থেকে একাধিকবার বিভিন্ন পদ্ধতিতে লিপিবদ্ধ করার অনুমতি পেয়েছিল। ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ভিন্ন কোনো রীতিতে লেখার অনুমোদন দিয়ে বলতেন, ‘হ্যাঁ! এ দুটো তো একই।’
কেননা কুরআন একাধিক রীতিশৈলীতে নাযিল হয়েছিল, তাই তার পক্ষ থেকে ভিন্ন রীতিশৈলীতে লিপিবদ্ধ করাকে সমর্থন করেছিলেন। এরপর যখন জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে প্রতি রমাদানে কুরআন দাওর করতেন অর্থাৎ একে অপরকে শুনাতেন, তখন আল্লাহ তাআলা কয়েকটি রীতিশৈলীকে মানসুখ (রহিত) করে দেন। সর্বশেষ দাওর হয়েছিল যায়িদ ইবনে সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহুর রীতিশৈলীতে। বর্তমানে মানুষ তাঁর পঠনশৈলীতেই কুরআন পাঠ করে। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু-সহ অন্যান্য সাহাবগণ মুসলমানদেরকে এই পঠনরীতির ওপরই ঐক্যবদ্ধ করেন।
এ নিয়ে আরেকটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায় যে-সে নবীজিকে বলত, আমি تعملون লিখব, নাকি تفعلون লিখব? নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতেন, ‘ যেটা ইচ্ছা সেটা লিখো।’ তো আল্লাহ তাআলা তাকে সঠিকটিই লেখার তাওফিক দিতেন। আর উভয়টাই যদি নাযিলকৃত হত, তা হলে আল্লাহ তাআলার নিকট যেটা উত্তম তাকে সেটাই লেখার তাওফিক দিতেন। অথবা একমাত্র যেটা নাযিল হয়েছে সেটাই লেখার সুমতি দান করতেন।
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই সুযোগটা তাকে দিতেন, কারণ একাধিক রীতিশৈলীতে কুরআন নাযিল হওয়ার কারণে সেটা বৈধ ছিল। তাই যত রীতিতে নাযিল হয়েছে সেগুলোর যে-কোনো এক প্রকারে লেখলেই হয়ে যেত। তা ছাড়া নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সুদৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, অবশ্যই আল্লাহ তাআলা কুরআনকে যে-কোনো ধরনের বিকৃতি থেকে হিফাযত করবেন। তিনি এটাও বিশ্বাস করতেন যে, সে ওইটাই লিখতে পারবে, যেটা আল্লাহ তাআলা নাযিল করেছেন। এর বাইরে সে কলম চালনা করতে পারবে না। আর এটা আমাদের এই পবিত্র গ্রন্থ- কিতাবুল্লাহর ব্যাপারে অজানা কোনো বিষয়ই নয়। কেননা আল্লাহ তাআলা গোটা কুরআনকে সব ধরনের বিকৃতি থেকে সুরক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন এবং তিনি এই সুরক্ষানীতিমালা ঘোষণা করেছেন যে, এই কিতাবের অগ্র-পশ্চাৎ কোনো দিক থেকেই ভ্রান্তি অনুপ্রবেশ করতে পারবে না।
আবার কেউ কেউ তৃতীয় আরেকটা মত বর্ণনা করেছেন যে, সে কখনও কখনও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জবান থেকে কোনো একটি আয়াতের তিলাওয়াত শুনত, এভাবে শুনতে শুনতে পরিশেষে সেই আয়াতের কোনো এক বা ততোধিক শব্দ অবশিষ্ট থাকতেই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা তিলাওয়াত করেছিলেন তার মর্মবাণী থেকে সে বুঝে নিত বাকিটুকু কী হতে পারে-যেমনটা অনেক বুদ্ধিমান বুঝতে পারেন। তখন সে নিজ থেকেই সেটা লিখে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শোনাত, নবীজি শুনে বলতেন, 'হ্যাঁ! এভাবেই নাযিল হয়েছে।'
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুরও ঘটনাক্রমে এমন হয়েছিল। সদ্য-নাযিল- হওয়া আয়াতের কিছু অংশ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঠ করেন। উমর ইবনুল খাত্তাব আয়াতের মর্ম অনুধাবনপূর্বক বলে ওঠলেন- فَتَبَارَكَ اللهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ। আর ঘটনাক্রমে সেটা আয়াতের অবশিষ্ট অংশের সাথে মিলে যায়। [৭৯]
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এই ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে প্রথম ব্যাখ্যাটিই অধিক সঠিক ও যৌক্তিক।
• দশম হাদীস
দুই গায়িকার ঘটনার বিবরণ-সম্বলিত বর্ণনা, যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে অশালীন গান গাইত। এদের সাথে বনু হাশিমের এক দাসির কথাও উল্লেখ আছে। ঘটনাটি ঐতিহাসিকদের নিকট প্রসিদ্ধ। [৮০] ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনে খাতালের এই দুই দাসীকে হত্যাদেশ জারি করেন। কেননা এরা নবীজির ব্যাপারে নিন্দামূলক গান গাইত। একটাকে হত্যা করা হয়, আর অন্যটা কোথাও লুকিয়ে থাকে তাকে আমান বা নিরাপত্তা-প্রদানের আগপর্যন্ত। মুহাম্মাদ ইবনে আয়িয, ইবনে ইসহাক ও আব্দুল্লাহ ইবনে হাযম ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন।
বলা হয়ে থাকে, গায়িকা দুজন ইবনে খাতালের ছিল। ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে তার দুই গায়িকা দাসীকেও হত্যা করার নির্দেশ জারি করেন। এ বর্ণনার ব্যাপারে সিয়ার (ইসলামি যুদ্ধ-ইতিহাস) বিদ্বানগণ একমত পোষণ করেন এবং ঘটনাটি তাদের নিকট প্রসিদ্ধ।
এই ঘটনাটা দলিল হলো কীভাবে?
হ্যাঁ, আমরা বলছি যে, আসলি কুফর বা জন্মগতভাবে কাফের হওয়ার কারণেই কোনো নারীকে হত্যা করা বা হত্যা করার পরিকল্পনা করা বৈধ নয়—এটি সর্বসম্মত মাসআলা। এ ব্যাপারে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ ব্যাপক প্রসিদ্ধ। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফের নারী ও শিশুদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। [৮১]
সুতরাং আমরা বুঝতে পারলাম যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে এই দুই গায়িকা নারীকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন সেটা মূলত (আসলি কুফর বা জন্মগত কুফরের কারণে নয়, বরং) নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করা এবং তাকে নিয়ে নোংরা-ভাষায় গান করার কারণে। অতএব যে বা যারাই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তি করবে বা গালমন্দ করবে সর্ব অবস্থায় তাকে হত্যা করা ওয়াজিব।
* একাদশতম হাদীস
মক্কা-বিজয়ের সময় নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিরস্ত্রাণ মাথায় মক্কায় প্রবেশ করলেন। যখন তিনি মাথা থেকে শিরস্ত্রাণ খুললেন, তখন এক লোক এসে বলল, ইবনে খাতাল কাবার গিলাফ ধরে ঝুলে আছে (নিরাপত্তা প্রাপ্তির জন্য)। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাকে হত্যা করো। [৮২]
বর্ণনাটি খুবই প্রসিদ্ধ। বুখারী-মুসলিমে উল্লেখ আছে। তাকে হত্যার কারণ হলো, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে যাকাত উত্তোলনের জন্য নিয়োগ করেন। সঙ্গে আরেকজনকে নিয়োগ দেন তার সহযোগিতার জন্য। কিন্তু সঙ্গীটি তার জন্য খাবার প্রস্তুত না করায় সে বেজায় ক্ষেপে গিয়ে তাকে হত্যা করে ফেলে! পরে সে ভয় পেয়ে যায় যে, এ জন্য তো তাকেও হত্যা করা হতে পারে। ফলে সে মুরতাদ হয়ে সাদাকার মাল নিয়ে পালিয়ে যায়। সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে কটূক্তিমূলক-কবিতা রচনা করত এবং তার দুই দাসীকেও আদেশ করত, তারা যেন সুর করে সেই কবিতাগুলো গায়। ফলে তার রক্ত হালাল হওয়ার জন্য একই সাথে তিনটি কারণ ছিল-
১. মুসলিম হত্যা করা
২. রিদ্দাহ বা ইসলাম ত্যাগ
৩. নবীজিকে কটূক্তি করা
তবে তাকে মুসলিম হত্যার দায়ে হত্যা করা হয়নি। কেননা যদি তাকে হত্যার বদলে হত্যা করা হত, তা হলে তাকে বনু খুযায়ার ওই লোকের ওলীদের কাছে তাকে অর্পণ করা হত, যাকে সে হত্যা করেছিল। তখন ওই লোকেরা তাকে হত্যা করত কিংবা তার কাছ থেকে মুক্তিপণ নিয়ে তাকে ক্ষমা করে দিত।
তাকে ধর্মত্যাগের কারণেও হত্যা করা হয়নি। কেননা মুরতাদ ব্যক্তির তাওবা গ্রহণ করা হয় এবং যদি সে অবকাশ চায় চিন্তা-ভাবনার জন্য, তা হলে তাকে অবকাশ দেওয়া হয়।
অথচ এই ইবনে খাতাল! সে নিরাপত্তার খোঁজে, যুদ্ধ ছেড়ে এবং অস্ত্র ফেলে গোপনে বাইতুল্লায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু এতকিছু জেনেও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কোনো মুরতাদকে তো কেবল ইরতিদাদের কারণে এভাবে হত্যা করা হয় না। তাই আমরা বলব, তাকে হত্যা করা হয়েছিল নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তির কারণে।
• দ্বাদশতম হাদীস
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মক্কা-বিজয়ের পর) একদল লোককে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁকে গালমন্দ করার কারণে। কটূক্তির অপরাধে একদল লোককে তিনি হত্যা করেছেন, অথচ তিনি ওই সকল লোকদেরকেও ছেড়ে দিয়েছেন যারা তখনও কাফের ছিল এবং (মুসলিমদের বিরুদ্ধে) যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। এ বিষয়ে পূর্বে সাঈদ বিন মুসাইয়াবের রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা-বিজয়ের দিন ইবনে জিবারাকে হত্যার আদেশ দেন। ইবনে ইসহাক ঘটনাটি উল্লেখ করে বলেন, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তায়িফ থেকে যুদ্ধ করে ফিরেন তখন বুজির ইবনে জুহাইর তার ভাই কাব ইবনে জুহাইরকে এই সংবাদ দিয়ে পত্র লিখেন যে, মক্কায় যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করেছে এবং কষ্ট দিয়েছে, তিনি তাদের অনেককেই হত্যা করেছেন। কুরাইশ-কবিদের মধ্যে এখনও বাকি আছে ইবনে জিবারা ও হুবাইরা ইবনে আবি ওয়াহাব, এরা কোনো কোনো দিকে পালিয়ে গেছে। ইবনে জিবারা নাজরানে পালিয়ে যায়। পরবর্তীকালে সে যখন ইসলাম গ্রহণ করে এবং নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত হয়। সে কিছু সুন্দর কবিতার মাধ্যমে তার তাওবা ও ওযর পেশ করে। এরপরও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রক্তকে মূল্যহীন ঘোষণা করেন। অথচ তিনি মক্কার অন্যান্য সবাইকে নিরাপত্তা প্রদান করেছিলেন, কিন্তু তার মতো অপরাধ যাদের, তাদেরকে তিনি ক্ষমা করেননি।
রাসূলুল্লাহ যাদেরকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন তাদের মধ্যে ছিল—
• আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়াহ ইবনে মুগিরাহ
• আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে আবু সুফিয়ানের কটূক্তির ঘটনা খুবই প্রসিদ্ধ।[৮৩] আবু সুফিয়ান নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুধভাই। নবীজির দুধ-মা হালিমাতুস সাদিয়াহ তাকেও দুধ পান করিয়ে ছিলেন। কিন্তু নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রক্তকেও মূল্যহীন ঘোষণা করেন। কেননা সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবাগণকে কষ্ট দিয়েছে এবং কটূক্তি করেছে।
(মক্কা-বিজয়ের দিন) তিনি এসে নিজের ব্যর্থতা ও ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেন। তিনি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চাচা আব্বাস, চাচাতো ভাই আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম-সহ অনেকের দোহাই দিয়ে সুপারিশ গ্রহণের আকুতি জানাতে থাকেন। তিনি নবীজির কাছে এসে কবিতা আবৃত্তি করে নিজের ইসলাম গ্রহণ ও ওযর পেশ করতে থাকেন। একপর্যায়ে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রতি নরম হয়ে পড়েন। তখন সে আবৃত্তি করে বলে—
আপনার জীবনের শপথ! যেদিন আমি পতাকা উত্তোলন করি,
যেন লাতের বাহিনি আপনার বাহিনীকে পরাজিত করে!
সেদিনের আমি ছিলাম আধারচ্ছন্ন রাতে দিশেহারা পথিক। আজই সবে আমাকে হিদায়াত দেওয়া হচ্ছে এবং আমি হচ্ছি সুপথ-প্রাপ্ত।
একজন পথপ্রদর্শক আমাকে পথ দেখিয়েছেন, আমি নিজে পথ পাইনি। আমি যাকে একেবারেই তাড়িয়ে দিয়েছিলাম, সেই তিনিই আমাকে দেখিয়েছেন আল্লাহর পথ।
এভাবে সে বাকি কবিতাটুকু আবৃত্তি করে।
আরেক বর্ণনায় [৮৪] আছে-সে বলে, আমরা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করি। কিন্তু তিনি অনুমতি দেন না। নবীজির স্ত্রী উম্মু সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা তখন নবীজির সাথে আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়াহ ও আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিসের ব্যাপারে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জামাতা এবং আপনার ফুফুর ছেলে (আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়াহ), আপনার চাচার ছেলে এবং আপনার ভাই (আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস)। আল্লাহ তাআলা উভয়কেই মুসলমান বানিয়েছেন। তারা যেন আপনার কারণে দুনিয়ার সবচেয়ে হতভাগা না হয়। আপনি তো এদের চেয়েও জঘন্য অপরাধীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। তা হলে এদের অপরাধ তো আপনি ক্ষমা করতেই পারেন। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'সে আমার মানহানি করেছে, তাকে আমার প্রয়োজন নেই।'
আবু সুফিয়ানের কাছে যখন এই সংবাদ পৌঁছল, তার সাথে তখন তার ছেলে ছিল। সে বলতে লাগল, আল্লাহর শপথ! হয়তো তিনি আমাদের ওযর গ্রহণ করবেন, নয়তো আমি আর আমার ছেলে কোনো প্রান্তরে চলে গিয়ে পিপাসার যন্ত্রণায় মৃত্যুর আগপর্যন্ত ওখানেই থাকব। (তিনি এটা কীভাবে সহ্য করবেন?), তিনি তো সবচেয়ে মহান ও সবচেয়ে উদার। এতে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দয়াপ্রবণ হলেন। তখন তিনি তাদেরকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেন। তারা প্রবেশ করে এবং দুজনই ইসলাম গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে তারা অনেক উত্তম মুসলমান হয়েছিলেন। পরবর্তিতে আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়াহ তায়েফের যুদ্ধে শহীদ হন আর আবু সুফিয়ান উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর খিলাফাতের সময় মদীনায় ইন্তেকাল করেন।
এই ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু সুফিয়ান ইবনে হারিসের রক্তকে মূল্যহীন ঘোষণা করেন। অথচ অন্যদিকে কুরাইশদের বড় বড় সরদার-যারা যুদ্ধের জন্য শক্তি জোগান দেওয়া, অর্থ সম্পদ জোগান দেওয়ায় আরও বেশি সক্রিয় ও তৎপর ছিল-তাদেরকে হত্যা করেননি। আসলে তাকে হত্যা করার কারণ হলো, সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালাগাল করত। সে মুসলমান হয়ে আসার পরও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্যতম মহৎ চরিত্র ছিল তিনি দূরের মানুষকেও কাছে টেনে নিতেন, তা হলে আত্মীয়-স্বজনের বেলায় তিনি হৃদয়ে কতটুকু ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য লালন করতেন, চিন্তার বিষয়। তারপরও আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রতি এমন আচরণ করেছিলেন মূলত তার পক্ষ থেকে প্রকাশ-পাওয়া ঘৃণ্য আচরণের কারণে, যেমনটা হাদীসে তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
এমনিভাবে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা-বিজয়ের দিন ছয়জনকে তাদের নাম উল্লেখ করে কতলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারা হলেন-ইবনে আবি সারহ, ইবনে খাতাল, হুওয়াইরিস, মিকইয়াস, ইকরামাহ ও হাব্বার।
এ ছয়জন সম্পর্কে বর্ণনা বেশ প্রসিদ্ধ। রাসূলের সীরাত ও মাগাযীর বর্ণনাকারীগণ এ ধরনের রেওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন। তবে এগুলোর অধিকাংশ মুরসাল। মুরসাল রেওয়ায়াতও যখন বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়, বিশেষত ওই সমস্ত ব্যক্তি থেকে বর্ণিত হয়, যাদের মুরসাল গ্রহণযোগ্য, তবে এগুলো মুসনাদ হাদীসের মতোই, বরং কখনও কখনও আহলুল-মাগাযির মাঝে প্রসিদ্ধ একটি মুরসাল রেওয়ায়াতও একটিমাত্র সনদে বর্ণিত হাদীস থেকেও শক্তিশালী।
এমনিভাবে উকবাহ ইবনে আবি মুআইতকে বেঁধে রেখে হত্যা করা হয়, তখন সে বলছিল, হে কুরাইশরা! আমাকে কেন এভাবে বন্দি করে হত্যা করা হচ্ছে? তখন রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আল্লাহর সাথে কুফরি ও আল্লাহর রাসূলের ওপর মিথ্যা অপবাদের কারণে। [৮৫]
এমনিভাবে নযর ইবনে হারিসকেও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বন্দি করে হত্যা করেন, কেননা সেও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করেছিল।
সুতরাং স্পষ্ট হয়ে গেল যে, বদরের যুদ্ধবন্দিদের মধ্য থেকে দুজনকে বিশেষভাবে হত্যার কারণ হলো কটূক্তি। কুরাইশ ও সমগ্র আরবের যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে বিদ্রূপাত্মক কথা বলত, মক্কা-বিজয়ের পর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দেন।
তেমনি এক জিন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি ও বিদ্রুপ করেছিল। ফলে একজন শক্তিশালী মুসলিম জিন ওই জিনটাকে হত্যা করে ফেলে। পরবর্তীকালে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষজনকে এই ঘটনা শোনান।
এমনিভাবে ইহুদি আবু রাফি ইবনে আবিল হাকিকের ঘটনাও সহীহ বুখারীর প্রসিদ্ধ রেওয়ায়াত।
সুতরাং এই সকল হাদীস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, যে লোক নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করবে, তাকে হত্যা করা হবে এবং জনসমাজকে উৎসাহিত করা হবে তাকে হত্যা করার জন্য।
• ত্রয়োদশতম হাদীস হাদীসটি ইমাম আবুল কাসিম আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ আলবাগাঈ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন এবং আবু আহমাদ ইবনে আদি রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন আল-কামিল গ্রন্থে। [৮৬]
মদীনা থেকে দুই মাইল অদূরে বনু লাইসের একটা গ্রাম ছিল। একলোক তাদেরকে একটি বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় কিন্তু তারা প্রস্তাবটি নাকচ করে দেয়। তখন সে একটি বিশেষ পোশাক পরে তাদের কাছে আসে। সে এসে বলল, আল্লাহর রাসূল এই পোশাক পড়িয়েছেন এবং তোমাদের জান ও মাল-সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে ফয়সালা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তারপর সে ওই নারীর কাছে যায়, যাকে সে ভালোবেসেছিল। তখন তারা (সত্যতা যাচাইয়ের জন্য) রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে লোক পাঠান। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আল্লাহর শত্রু মিথ্যা বলেছে।' তারপর তিনি একজন লোক পাঠিয়ে বলেন, 'যদি তুমি তাকে (জীবিত) খুঁজে পাও তা হলে তার গর্দান উড়িয়ে দেবে। আর যদি দেখো, সে মরে গেছে তা হলে তার দেহ আগুনে জ্বালিয়ে দিবে।'
তারপর তিনি এই হাদীসটি বলেন, مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ 'যে ব্যক্তি আমার নামে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলবে, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।'[৮৭]
হাদীসটির সনদ সহীহ। দুর্বলতার কোনো কারণ জানা যায় না। এ হাদীসের একটি শাহিদ হাদীস রয়েছে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দূতকে বলেছিলেন, وَلا تُحَرِّقْهُ بِالنَّارِ، فَإِن لَا يُعَذِّبُ بِالنَّارِ إِلَّا رَبُّ النَّارِ
তাকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ো না, কেননা আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার একমাত্র আগুনের রবের। [৮৮]
এই হাদীসটির ব্যাখ্যায় দুটি অভিমত :
✓ প্রথম অভিমত
হাদীসের বাহ্যিক দিক গ্রহণ করে বলতে হবে, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা-কথা ছড়াবে তাকে হত্যা করতে হবে। যে-সমস্ত ইমামগণ এ মত গ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন, 'নবীর নামে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলার দ্বারা ব্যক্তি কাফের হয়ে যায়।' এ মত গ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছেন ইমামুল হারামাইন আবু মুহাম্মাদ আল-জুওয়াইনি রাহিমাহুল্লাহ।
তাদের যুক্তি হলো, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা বলার অর্থ হলো আল্লাহ তাআলার নামে মিথ্যা বলা। তাই তো নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমার নামে মিথ্যা বলা আর তোমাদের কারও নামে মিথ্যা বলা একই কথা নয়।'[৮৯] কেননা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ মূলত আল্লাহ তাআলারই আদেশ। তাই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করা ওয়াজিব, যেভাবে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করা ওয়াজিব। সুতরাং রাসূলুল্লাহর নামে মিথ্যাবাদী মূলত তাকে মিথ্যা-প্রতিপন্নকারীর মতোই।
বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা যেতে পারে এভাবে:
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করাও একপ্রকার মিথ্যা বলা। কেননা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করার অর্থ হলো, তিনি যে সকল সংবাদ নিয়ে এসেছেন সেগুলো সত্য নয় বলে ঘোষণা করা। আর এটা স্পষ্টভাবে আল্লাহর দ্বীনকে বাতিল বলার নামান্তর। তা ছাড়া নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে যে মিথ্যা বলবে, সে ইচ্ছাকৃতভাবে দ্বীনের মধ্যে এমন বিষয় ঢুকাল, যা দ্বীনের অংশ নয় এবং সে দাবি করে, তার কথা বিশ্বাস করা উম্মতের জন্য ওয়াজিব। এটা দ্বীনকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করারই নামান্তর। কেননা সে দাবি করছে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে বিষয়ে আদেশ করেছেন সেটা মূলত আদেশ করার মতো বিষয় না। এমনকি এ ব্যাপারে আদেশ করা কখনও কখনও বৈধ নয়। এ ধরনের কথা দ্বারা আল্লাহর সাথে নির্বুদ্ধিতাকে সম্পৃক্ত করা হয়, কিংবা এ দিকে ইঙ্গিত করা হয় যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাতিল বিষয়ে সংবাদ দিয়েছেন, এটা তো স্পষ্ট কুফরি।
মোটকথা, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নামে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলবে, সে যেন ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ তাআলাকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করল, বরং তার অবস্থা আরও জঘন্য। তেমনিভাবে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা কথা বলা তাকে অস্বীকারের নামন্তর।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, জেনে রাখুন, 'এই অভিমতটি অত্যন্ত শক্তিশালী।'
তিনি এর পক্ষে এমন সব দলিল ও প্রমাণ পেশ করেছেন যেগুলো এতটাই মজবুত ও সংখ্যায় বিপুল যে, কোনোভাবেই খণ্ডন করা সম্ভব নয়।
এরপর ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এ দিকে লক্ষ করা জরুরি যে, সরাসরি মিথ্যা-প্রতিপন্ন করা আর ভিন্নভাবে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করার মাঝে পার্থক্য আছে।
যেমন কোনো ব্যক্তি বলল, অমুকের ছেলে অমুক এই হাদীস নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আমাকে বর্ণনা করেছে। যদি সে এভাবে বর্ণনা করে তা হলে সেই 'অমুক' ব্যক্তির নামে মিথ্যা বলল, সরাসরি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে নয়। অর্থাৎ সে মাধ্যমের সাহায্যে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা বলল। আর যদি সে বলে, 'এটা সহীহ হাদীস' অথবা 'এটা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত' এবং বর্ণনাকারী ভালো করে জানে, সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা প্রচার করছে, তা হলে ধরা হবে সে সরাসরি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা-কথা প্রচার করল।
তবে যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা প্রচার করতে অপ্রচলিত বর্ণনা বলে বেড়ায় তার ব্যাপারে মতানৈক্য আছে।
সুতরাং কেউ যদি তার শাইখের কাছ থেকে জেনেশুনে জাল হাদীস বর্ণনা করে, তা হলে কাজটা হারাম হবে। কিন্তু তাকে কাফের বলা যাবে না। তবে সে বর্ণনার মধ্যে যদি এমন কিছু অনুপ্রবেশ করায় যার দ্বারা তাকে কাফের বলা অপরিহার্য হয়ে ওঠে তবে ভিন্ন কথা। (তাকে কাফের বলা যাবে না), কেননা সে এ বিষয়ে সত্যবাদী যে, তার শাইখ তাকে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
আলোচ্য-হাদীসের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, যে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করবে, সে ওই ব্যক্তির চেয়ে বেশি হত্যাযোগ্য যে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা কথা বলে। আর যে ব্যক্তি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ায়াসাল্লাম-এর নামে মিথ্যা বলেছে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কোনো প্রকার তাওবার সুযোগ দেওয়া ছাড়াই হত্যার আদেশ করেছেন। অতএব যে ব্যক্তি গালি দিবে সে তো আরও আগেই এই শাস্তির উপযুক্ত হবে।
✓ দ্বিতীয় অভিমত নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে যে মিথ্যা বলবে, তাকে কঠিনতর শাস্তি দিতে হবে, তবে কাফের বলা যাবে না এবং তাকে হত্যা করাও বৈধ হবে না।
কেননা কুফরি ও হত্যার কারণগুলো সুনির্ধারিত। রাসূলের নামে মিথ্যা বলা সেসব কারণের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই যার কোনো ভিত্তি নেই সেটা সাব্যস্ত করা জায়েয হবে না। দ্বিতীয় মতটি যারা ব্যক্ত করেন, তাদের উচিত কথাকে অবশ্যই শর্তযুক্ত করা। অর্থাৎ তার এহেন মিথ্যা বর্ণনা দ্বারা যেন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাহ্যত কোনো ত্রুটি বোঝানো না হয়, এই শর্তটুকু সংযুক্ত করা।
তবে ঘোড়ার-ঘাম-সংক্রান্ত জাল হাদীস[৯০] ও এ-জাতীয় কুসংস্কারপূর্ণ যে কথাগুলো নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে ত্রুটি হিসাবে চিহ্নিত হয়, সেগুলো যদি কেউ বর্ণনা করে বলে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তবে সে তো রাসূলকে নিয়ে উপহাস করল। আর কোনো সন্দেহ নেই যে, এমন ব্যক্তি কাফের ও তার রক্ত প্রবাহ বৈধ। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ এমনটাই উল্লেখ করেছেন।
সুতরাং ত্রয়োদশ হাদীসে উল্লিখিত ব্যক্তিটি মূলত আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে এমন মিথ্যা-কথ্যা বলেছে যার দ্বারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কলঙ্কিত হন। কেননা এই লোক দাবি করেছে, আল্লাহর রাসূলই তাকে মানুষের জান-মালের বিচারক ও ফয়সাল বানিয়ে পাঠিয়েছেন এবং তাদের যার ঘরে ইচ্ছা রাতযাপনের অনুমতি দিয়েছেন, যেন সে তার কাঙ্ক্ষিত নারীর সাথে রাত কাটিয়ে তার সাথে পাপাচার করতে পারে।
আর যে ব্যক্তি দাবি করবে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হারামকে হালাল করেছেন সে মূলত নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কলঙ্কিত করল। সুতরাং এ কথা প্রমাণিত যে, উভয় অভিমত অনুযায়ী যে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কলঙ্কিত করবে তাকে হত্যা করা হবে। এটাই এখানে মুখ্য আলোচ্য বিষয়।
তবে প্রথম ব্যাখ্যানুযায়ী লোকটা কাফের হবে, আর দ্বিতীয় ব্যাখ্যানুযায়ী কটূক্তিকারী হিসাবে গণ্য হবে। তবে দ্বিতীয় মতটি প্রথম অভিমতটিকে সমর্থন করে যে, যখন সাহাবাগণের সামনে কেউ নবীজির ব্যাপারে কোনো প্রকার মানহানি কিংবা কটূক্তি করত, তৎক্ষণাৎ সাহাবাগণ তা প্রতিহত করতেন।
• চতুর্দশ হাদীস
একজন বেদুইনের ঘটনা। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কিছু দান করেছিলেন, তখন সে নবীজিকে বলল, 'আপনি বণ্টন ঠিককরে ও সুন্দরভাবে করেননি।' তখন মুসলিমগণ তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা যদি তাকে হত্যা করতে তা হলে তো সে জাহান্নামে চলে যেত। [৯১]
হাদীসটি প্রমাণ করে যে, যে ব্যক্তি নবীজিকে কষ্ট দেওয়ার দায়ে নিহত হবে সে জাহান্নামে যাবে। কারণ সে কুফরি করেছে এবং তাকে হত্যা করাও বৈধ। যদি তাকে হত্যা করা বৈধ না হতো তা হলে তো সে শহীদ হয়ে যেত!
এই হাদীসে দেখা যায়, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেদুইনকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কেননা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে কষ্ট দেয় তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার অধিকার নবীর রয়েছে।
এ ধরনের আরেকটি কথা আছে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হুনাইনের গনিমত বণ্টন করেন, তখন এক ব্যক্তি বলল, এ বণ্টনে আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রত্যাশা করা হয়নি।' তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আমাকে ছাড়ুন, আমি এই মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিই!'
হাদীসটি সহীহ মুসলিমে আছে। তবে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকেও হত্যা করেননি। কেননা লোকজন বলাবলি করবে, মুহাম্মাদ নিজের অনুসারীদেরকে হত্যা করে! নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটাই বলেছিলেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এ-জাতীয় কথা বলেছিল। (কুরআনে আছে, সে বলেছিল-) لَئِن رَّجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ যদি আমরা মদীনায় ফিরি, তা হলে অবশ্যই অধিক মর্যাদাশীলগণ অপদস্থদেরকে মদীনা থেকে বের করে দিবে।[৯২]
তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আমাকে অনুমতি দিন, তার গর্দান উড়িয়ে দিই। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তা হলে তো তার পক্ষে অনেকে দাঁড়িয়ে যাবে।'
এটা ওই সময়ের ঘটনা যখন ইসলাম ছিল দুর্বল। ফলে আশঙ্কা ছিল, মানুষ ইসলামের প্রতি বৈরি হয়ে উঠতে পারে।
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, 'কে আছ, ওই ব্যক্তির ব্যাপারে সাহায্য করবে, যে আমার পরিবারকে পর্যন্ত কষ্ট দেয়?' তখন সাদ ইবনে মুআয রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি আপনাকে সাহায্য করব, সে যদি আওস গোত্রের হয় তা হলে আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিব।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদ বিন মুআযের এই কথা প্রত্যাখ্যান করেননি।[৯৩]
• পঞ্চদশ হাদীস
সাইদ ইবনে ইয়াহইয়া আল-উমাবি তার আল-মাগাযি গ্রন্থে ইমাম শাবি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, যখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা বিজয় করেন তখন 'উযযা'র সম্পত্তিগুলোকে আনিয়ে নিজের সামনে ঢেলে দেন তারপর নাম ধরে একজনকে ডেকে তাকে কিছু দেন। তারপর আবু সুফিয়ান ইবনে হারবকে ডেকে সেখান থেকে কিছু দান করেন। তারপর সাঈদ ইবনুল হারিসকে ডেকে কিছু দান করেন। এরপর কুরাইশের কিছু লোককে ডেকে তাদের মধ্যে কিছু বণ্টন করে দেন। কুরাইশের একেকজনকে একেকটা স্বর্ণের বার দান করেন যার প্রত্যেকটার ওজন ছিল পঞ্চাশ থেকে সত্তর মিসকাল[৯৪] পর্যন্ত। তখন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, 'আপনি ভালোকরেই জানেন, আপনি সোনার বারগুলো কাদেরকে দিচ্ছেন!' দ্বিতীয়বার দাঁড়িয়ে সে একই কথা বলল। নবী সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবারও তার দিকে মনযোগ দিলেন না। সে তৃতীয়বার দাঁড়িয়ে বলল, 'আপনি তো ফয়সালা করছেন, কিন্তু ইনসাফ দেখতে পাচ্ছি না। তখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'দুর্ভাগ্য তোমার! তা হলে তো আমার পরে আর কেউই ইনসাফ করতে পারবে না।'
এরপর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকরকে ডেকে বললেন, 'যাও! তাকে হত্যা কর।' কিন্তু তিনি গিয়ে তাকে আর পাননি। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'তুমি যদি তাকে হত্যা করতে, আমি আশা করি-সেই হত 'তাদের' প্রথম ও শেষ।[৯৫]
এই হাদীসটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, এ ধরনের যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অভিযোগ করবে তাদেরকে তাওবার সুযোগ না দিয়েই হত্যা করা হবে। এটি হুনাইনের গনিমত-বণ্টন-সংক্রান্ত ঘটনা নয়, বরং ভিন্ন আরেকটি ঘটনা। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পাঠানো স্বর্ণমুদ্রা-সংক্রান্ত ঘটনাটাও এটি নয়। 'উযযা' মূর্তিকে ভেঙে ফেলার ঘটনা ঘটেছিল মক্কা-বিজয়ের সময়, অষ্টম হিজরিতে। আর হুনাইনের ঘটনা ঘটেছিল মক্কা বিজয়ের পর যিলকদ মাসে। আর আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর স্বর্ণমুদ্রা পাঠানোর ঘটনা ঘটেছিল দশম হিজরিতে।
আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি যে, এক ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফয়সালা মেনে না নেওয়ায় উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে হত্যা করেছিলেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সমর্থনে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছিল। অথচ সেই ব্যক্তির অপরাধ ছিল এই ঘটনায় উল্লেখিত ব্যক্তির অপরাধের চেয়ে অনেক লঘু।
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পাঠানো স্বর্ণমুদ্রা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বণ্টন করেছিলেন। আর সেই বণ্টন নিয়ে এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অভিযুক্ত করেছিল। এই ঘটনা বুখারী-মুসলিমে বিবৃত হয়েছে।
তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, 'এর ঔরসে এমন একদল লোক জন্মাবে, যারা কিতাবুল্লাহ পাঠ করবে তৃপ্তিভরে কিন্তু সেই তিলাওয়াত তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেভাবে তির ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়। তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে আবার মূর্তিপূজারিদেরকেও ছেড়ে দিবে। আমি যদি তাদেরকে পেতাম তা হলে আদ সম্প্রদায়ের মতো হত্যা করতাম।[৯৬]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, 'শেষ জামানায় এমন কিছু লোকের আবির্ভাব হবে, যারা বয়সে হবে নবীন, জ্ঞান-বুদ্ধিতে হবে অপরিপক্ক, দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের মতো কথা বলবে, কিন্তু তাদের ইমান তাদের কণ্ঠনালি পর্যন্ত পৌঁছবে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেভাবে তির ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়। তাদেরকে যেখানেই পাও হত্যা করো। কেননা যে তাদেরকে হত্যা করবে কিয়ামত-দিবসে সে তাদেরকে হত্যা করার প্রতিদান পাবে।[৯৭]
এই সকল হাদীস প্রমাণ করে যে, রাসূলকে কটূক্তিকারী এই লোকটির দলবলকে রাসূল হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন, এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানিয়েছেন, তাদেরকে হত্যা করার মধ্যে রয়েছে হত্যাকারীর জন্য প্রতিদান। তিনি আরও বলেছেন, 'এরা হবে আকাশের নিচে সবচেয়ে জঘন্য নিহত-ব্যক্তি।[৯৮]
তাদের দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিধান আরোপের পরেই তিনি হত্যার-বিধান আরোপ করেছেন। বোঝা গেল, তাদেরকে হত্যা করা আবশ্যক এ জন্যই যে তারা 'দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে করতে দ্বীন থেকে বের হয়ে যায়।' এরা বিভিন্ন প্রকারের। আর এই লোকটাই হলো এদের 'প্রথম পুরুষ, যে নবীর যুগেই আত্মপ্রকাশ করে নবীজির বণ্টন নিয়ে আপত্তি তুলেছে।
সুতরাং যে ব্যক্তি নবীজির কোনো সুন্নাহকে কলঙ্কিত করবে তার বিধান উপরিউক্ত ব্যক্তিদের বিধানের মতোই হবে। অতএব যে দাবি করবে যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বণ্টন করতে গিয়ে জুলুম করেন, সে নবীজিকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করল। তার মতে তা হলে নবীর অনুসরণ আবশ্যক নয়। মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রাসূল হওয়ার মাঝে যে অন্তর্নিহিত গুণগুলো রয়েছে, যেমন আমানতদারিতা এবং তাঁকে মান্য করা আবশ্যক হওয়া, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাজ ও কথা দিয়ে যত ফয়সালা করেন, কোনো ফয়সালায় নিয়ে অন্তরে দ্বিধা-সংশয় না রাখা ইত্যাদি, এ গুণগুলোর সাথে মিথ্যা-প্রতিপন্নকারীর বিশ্বাস সাংঘর্ষিক। কেননা আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করা আল্লাহ ফরয করেছেন আর তিনি কারও ওপর জুলুম করতে পারেন না। সুতরাং যে এ বিষয়ে আপত্তি তুলবে, সে যেন রাসূলের রিসালাতের দায়িত্ব পালন নিয়েই আপত্তি তুলল। রাসূলের রিসালাত নিয়ে আপত্তি নিঃসন্দেহে নিকৃষ্ট ও জঘন্যতম কুফরি।
টিকাঃ
[৫৯] আবু দাউদ, আস-সুনান: ৪৩৬৪
[৬০] খাল্লাল, আল-জামি: ২/৩৪১
[৬১] 'উম্মু ওয়ালাদ' অর্থ যে দাসীর সাথে মনিবের শারীরিক সম্পর্ক হওয়া এবং তার গর্ভে মনিবের সন্তানও জন্ম লাভ করে।
[৬২] আবু দাউদ, আস-সুনান: ৪৩৬৩
[৬৩] খাত্তাবি, মায়ালিমুস সুনান: ৩/২৯৬
[৬৪] বুখারী, আস-সহীহ ৩৮১১; আরও বিস্তারিত রই ডাউনলোড করুন ৪৭৬৫।
[৬৫] তাবারানি, মুজামুস সাগির: ৬৫৯
[৬৬] নাসাঈ, সুনানুল কুবরা: ৩৫৩৪
[৬৭] আবু দাউদ, আস-সুনান: ৪৩৬৫
[৬৮] ওয়াকিদি, আল-মাগাযি: ১/১৭২-১৭৩ সনদ মনকাতি; ইবনে আদি, আল-কামিল: ৬/১৪৫।
[৬৯] ইবনে সাদ, আত-তাবাকাত: ২/২৮
[৭০] খুযাআ ছিল নবিজির মিত্র। আর বনু বকর ছিল কুরাইশদের মিত্র।
[৭১] আবু দাউদ, আস-সুনান: ২৬৮৫; নাসাঈ, আস-সুনান: ৪০৬৭; সনদ সহীহ।
[৭২] ইবনে হিশাম, আস-সিরাত: ২/৪০৯
[৭৩] তাবারি, জামিউল বায়ান: ৫/২৬৮; ওয়াহিদি, আসবাবুন নুযুল: ২৪৫ পৃ.।
[৭৪] সূরা আনয়াম, ৬: ৯৩
[৭৫] বিস্তারিত-বুখারী, আস-সহীহ, কিতাবুল মানাকিব: ৩৬১৭।
[৭৬] শাইখুল ইসলাম এ ঘটনার বিশুদ্ধতা দাবি করেননি। তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, 'ইকরিমাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে।' মূলত এটি ইমাম বা'লির দাবি। (অনুবাদক)
[৭৭] তায়ালিসি, আল-মুসনাদ: ২০২০; আবু আওয়ানা, আল-মুসনাদ: ৩১১১।
[৭৮] আহমাদ, আল-মুসনাদ: ৮৩৭২; এ ব্যাপারে অসংখ্য হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এমনকি এটি মুতাওয়াতির পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কুরআন সাত পাঠ-পদ্ধতিতে অবতীর্ণের ব্যাপারটি সর্বসম্মত। (অনুবাদক)
[৭৯] তায়ালিসি, আল-মুসনাদ: ৪১
[৮০] ওয়াকিদি, আল-মাগাযি: ২/৮৫৯; ইবনে হিশাম, সিরাতুন নবী: ২/৪০৯-৪১০
[৮১] বুখারী, আস-সহীহ : ৩০১৪; মুসলিম, আস-সহীহ : ১৭৪৪
[৮২] বুখারী, আস-সহীহ: ১৮৪৬; মুসলিম, ৩৯৮৮
[৮৩] ওয়াকিদি, আল-মাগাযি: ২/৮০৬-৮০
[৮৪] ওয়াকিদি, আল-মাগাযি: ২/৮১০
[৮৫] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়ািদ
[৮৬] ইবনে আদি, আল-কামিল: ৪/৫৩-৫৪
[৮৭] তাহাবি, মুশকিলুল আসার: ৩৩২
[৮৮] ইবনে যাকারিয়্যা, আল-জালিসুস সালিহ: ১৪
[৮৯] বুখারী, আস-সহীহ: ১২৯১; মুসলিম আস-সহীহ : ৪
[৯০] এটি প্রসিদ্ধ একটি বানোয়াট, ভিত্তিহীন বর্ণনা। ইমাম ইবনুল জাওযি তার প্রসিদ্ধ জাল হাদীস সংকলন আল-মাওযুয়াত গ্রন্থে (১/১০৫) সংকলন করেছেন। মুহাদ্দিসগণ বলেছেন যে, 'এটি বানোয়াট হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আর কোনো মুসলিমও এটি বানায়নি।'
[৯১] আবুশ শাইখ, আখলাকুন নবী: ১৭৭; সনদে ইবরাহীম ইবনুল হাকাম দুর্বল রাবী।
[৯২] সূরা মুনাফিকুন, ৬৩:৮
[৯৩] বুখারী, আস-সহীহ : ৪১৪১; মুসলিম, আস-সহীহ : ২৭৭০।
[৯৪] মিসকাল-আরবের বিশেষ একধরনের ওজন-পদ্ধতি। ১ মিসকাল = ৪.৩৭৪ গ্রাম।
[৯৫] শাইখুল ইসলাম বলেন, 'হাদীসটি মুরসাল। মুজালিদ ইবনে সাইদ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তিনি লাইয়িনুল হাদীস (দুর্বল)। তবে অর্থগত দিক থেকে এর সমর্থনে আরও বহু হাদীস আছে।'
[৯৬] বুখারী, আস-সহীহ: ৩৩৪৪; মুসলিম, আস-সহীহ: ১০৬৪。
[৯৭] বুখারী, আস-সহীহ: ৩৬১১; মুসলিম, আস-সহীহ: ১০৬৬。
[৯৮] আহমাদ, আল-মুসনাদ: আস-সুনান: ৩০০০。
📄 ইজমা থেকে প্রমাণ
সাহাবাগণ এই মাসআলায় ইজমা বা ঐকমত্য পোষণ করেছেন। কেননা এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনায় সাহাবাগণ থেকে একই রকম কথা ও মতামত বর্ণিত হয়েছে, কারও থেকেই ভিন্ন কোনো মত বা কথা সাব্যস্ত নেই। তাই বলা যায়, এ বিষয়ে সাহাবিগণের ইজমা সাব্যস্ত হয়ে যায়।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, জানা জরুরি যে, কোনো শাখাগত মাসআলায় সাহাবাগণের ইজমা আছে—প্রমাণ করার যত পদ্ধতি আছে সবগুলোর মধ্যে ওপরে বর্ণিত পদ্ধতিই উত্তম।[৯৯] এ-জাতীয় ঘটনায় সাহাবিগণের কিছু কর্মপদ্ধতি তুলে ধরা হলো।
১/
সাইফ ইবনে উমর আত-তামিমি বর্ণনা করেন। মুহাজির আল-মাখযুমি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সামনে দুজন গায়িকাকে আনা হলো। তাদের একজন নবীজিকে কটূক্তি করে গান গেয়েছিল। মুহাজির আল-মাখযুমি রাদিয়াল্লাহু আনহু তার এক হাত কেঁটে ফেললেন এবং তার সামনের দাঁতগুলো উপড়ে ফেললেন। আরেকজন মুসলমানদেরকে বিষদাগার করে গান গেয়েছিল। তিনি তার এক হাত কেঁটে ফেললেন এবং তারও সামনের দাঁতগুলো উপড়ে ফেললেন।
পরে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মুহাজির আল-মাখযুমির নিকট পত্র লিখেন: 'যে নারী নবীজিকে কটূক্তি করে গান গেয়েছিল, তার বিষয়ে আপনার ফয়সালার সংবাদ আমার কাছে পৌঁছেছে। যদি আপনি আমাকে আগে জানাতেন, আমি আপনার প্রতি তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিতাম। কেননা নবীদেরকে কটূক্তি করার শাস্তি অন্যন্য শাস্তির মতো নয়। এহেন কাজ কোনো মুসলিম করলে সে মুরতাদ, আর কোনো যিম্মি করলে সে বিশ্বাসঘাতক ও কতলের উপযুক্ত।
আর যে নারী মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ-পোষণ করে গান গেয়েছিল, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু পত্রে তার ব্যাপারে লিখেন: 'আমার নিকট এও সংবাদ এসেছে যে, মুসলিমদেরকে নিন্দা করে গান গাওয়ার অপরাধে আপনি এক নারীর হাত কেটে দিয়েছেন ও সামনের একটা দাঁত উপড়ে ফেলেছেন। সে যদি মুসলিম নারী হয়ে থাকে, তা হলে তাকে আদব শিক্ষা দেওয়া দরকার ছিল, তবে আদব শিখাতে গিয়ে শারীরিক বিকৃতি করা যাবে না। আর সে যদি যিম্মি হয়, তা হলে তো আপনি যে শিরক ক্ষমা করেছেন, তা আরও গুরুতর ছিল। এমন কোনো অপরাধ করে যদি আমি আপনার কাছে উপস্থিত হতাম তা হলে আমি আপনার নিন্দার উপযুক্ত হতাম। সহজতার নীতি অবলম্বন করুন, মানুষের দেহ বিকৃতকরণ থেকে বিরত থাকুন। অন্য কোনো অপরাধের কারণে অঙ্গবিকৃতি করা যাবে না। কেননা তা মানুষের মনে বৈরিতা সৃষ্টির উপকরণ, তবে কিসাসের বিধানের কথা ভিন্ন।'
সাইফ আত-তামিমি ছাড়াও অন্যরা ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। উপরিউক্ত বর্ণনার সাথে তাদের বর্ণনার মিল রয়েছে। তবে তাদের বর্ণনায় এ কথাটুকুও আছে-'যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কটূক্তি করবে, তাকে হত্যা করা হবে তবে নবীজি ছাড়া অন্য কাউকে কটূক্তি করলে হত্যা করা যাবে না।'
হাদীসের ভাষ্য এই ব্যাপারে স্পষ্ট যে, যে-ই নবীজিকে গালি দিবে তাকেই হত্যা করতে হবে। মুসলিম গালি দিক কিংবা যিম্মি, কিংবা নারী—যেই হোক না কেন, তাকে তাওবা সুযোগ না দিয়েই হত্যা করা হবে। তবে অন্যান্যদেরকে গালি দিলে হত্যা করা হবে না। অন্যদেরকে গালি দেওয়ার শাস্তি যেমন বেত্রাঘাত, তেমনি নবীগণকে গালি দেওয়ার শাস্তি কতল।
তবে (উল্লেখিত) হাদীসে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মুহাজির আল-মাখযুমি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে এমন কোনো আদেশ করেননি যে, ওই মহিলাকে হত্যা করে ফেলতে হবে। কেননা মুহাজির আল-মাখযুমি রাদিয়াল্লাহু আনহু ইজতিহাদ করে ইতিমধ্যেই তাকে একটি শাস্তি দিয়েছেন। তাই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু একই সাথে দুই ধরনের শাস্তি দেওয়াটা অপছন্দ করেছেন।
এও হতে পারে, কটূক্তিকারী ইসলাম গ্রহণ করেছিল কিংবা পূর্ব থেকেই মুসলিম হলে তাওবা করেছিল, আর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পত্র তাঁর হাতে পৌঁছার পূর্বেই মুহাজির রাদিয়াল্লাহু আনহু তার ইসলাম বা তাওবাকে গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নিয়েছিলেন। ইজতিহাদ করে আগেই একপ্রকারের ফয়সালা হয়ে গেছে, তাই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুও ইজতিহাদি ফয়সালাকে আর পরিবর্তন করেননি। কারণ মূলনীতি হলো যে, একজনের ইজতিহাদকে অন্যজনের ইজতিহাদ দিয়ে প্রত্যাখ্যান করা যায় না।
২/
হারব আল-কিরমানি রাহিমাহুল্লাহ তাঁর মাসায়িলু হারব লিল ইমাম আহমাদ গ্রন্থে ইমাম লাইস থেকে বর্ণনা করেন, মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এক লোককে নিয়ে আসা হলো। সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করেছিল। উমর তাকে হত্যা করেন। তারপর তিনি বলেন, ‘কেউ যদি আল্লাহ, তাঁর রাসূল অথবা কোনো নবীকে কটূক্তি করে, তা হলে তাকে হত্যা করো।’
মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন- ‘যদি কোনো মুসলিম আল্লাহ, তাঁর রাসূল অথবা অন্যকোনো নবীকে গালি দেয়, তা হলে সে অবশ্যই আল্লাহর রাসূলকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করল। আর আল্লাহর রাসূলকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করার অর্থ দ্বীন পরিত্যাগ। তাকে তাওবার সুযোগ দেওয়া হবে। যদি সে তাওবা করে তা হলে তার তাওবা গ্রহণ করা হবে, অন্যথায় তাকে হত্যা করা হবে। আর কোনো যিম্মি যদি কোনো নবীকে গালি দেয়, তা হলে সে তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করল, তোমরা তাকে হত্যা করো।’
হারব আল-কিরমানি রাহিমাহুল্লাহ আরও বর্ণনা করেন যে, আন-নাবাতি নামক এক ব্যক্তি নবীজিকে গালমন্দ করেছিল। যখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু শামে প্রবেশ করেন তখন সে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট পত্র লিখেছিল। প্রত্যুত্তরে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেন, ‘আমরা তো তোমাকে এ জন্য নিরাপত্তা দিইনি যে, তুমি আমাদের বিরুদ্ধে গিয়ে আমাদেরই দ্বীনে নাক-গলাবে। তুমি যদি এ রকম কাজ আবার করো, তা হলে আমি তোমার গর্দান উড়িয়ে দিব!’
এই হলেন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু! তিনি যাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন, তাকে তিনি আনসার ও মুহাজির সাহাবিগণের উপস্থিতিতে বলছেন, ‘আমরা দ্বীনে নাক-গলানোর জন্য তোমাকে নিরাপত্তা দিইনি।’ (সাহাবিগণের উপস্থিতিতে) উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কসম করে বলেছিলেন, ‘সে যদি এ কাজ পুনরায় করে তা হলে তার গর্দান উড়িয়ে দিব।’
এখান থেকে বোঝা গেল, এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের ইজমা হয়ে গিয়েছিল যে, আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে আপত্তি করার অধিকার কোনো যিম্মির নেই এবং দ্বীন নিয়ে আপত্তি করলে যিম্মির রক্ত হালাল হয়ে যায়। আর সবচেয়ে বড় আপত্তি হলো নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করা। এটা পরিষ্কার কথা, কোনো অস্পষ্টতা নেই।
ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সম্পর্কে বর্ণিত যে, তিনি এক পাদরির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তাকে বলা হলো, এই পাদরি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করে। ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, 'আমি যদি শুনতাম, তা হলে তাকে কতল করতাম।'
একাধিক বর্ণনাকারী এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে সাবিগের ঘটনা-সম্বলিত হাদীসটি ইতিপূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-সহ অন্যন্য উম্মুল মুমিনীনদের ব্যাপারে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর হাদীসও পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে।
এ ছাড়াও খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি এক নারীকে হত্যা করেছিলেন, কারণ সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করেছিল। হাদীসটি ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন।[১০০]
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ সনদ-সহ বর্ণনা করেন যে, এক নাসারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করেছিল, আর গারাফা ইবনে হারিস আল-কিন্দি রাদিয়াল্লাহু আনহু-নামক জনৈক সাহাবি তা শুনেছিলেন। তখন তিনি আঘাত করে তার নাকের হাড্ডি গুড়ো করে ফেলেন। ফলে বিষয়টি আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে উত্থাপিত হয়। তিনি গারাফা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, 'আমরা তো এদেরকে নিরাপত্তা দিয়েছি।' গারাফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহর পানাহ! রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালি দেওয়ার পরও আমরা তাকে নিরাপত্তা দিব?' তখন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'না! তুমি ঠিক বলেছ!'[১০১]
এই হলো সাহাবা ও তাঁদের একনিষ্ঠ তাবেয়ীগণের কিছু বক্তব্য। আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর সন্তুষ্ট থাকুন।
টিকাঃ
[৯৯] অর্থাৎ এ-জাতীয় ঘটনায় সকল থেকে একই ধরনের কথা বর্ণিত হয়েছে, কারো থেকে ব্যতিক্রম কথা আসেনি।
[১০০] খাল্লাল, আল-জামি: ২/৩৪২。
[১০১] মূলত ঘটনাটি ঘটেছিল উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে। যথাসম্ভব এখানে ভুলক্রমে আমর ইবনুল আসের নাম এসেছে। (অনুবাদক)
সাহাবাগণ এই মাসআলায় ইজমা বা ঐকমত্য পোষণ করেছেন। কেননা এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনায় সাহাবাগণ থেকে একই রকম কথা ও মতামত বর্ণিত হয়েছে, কারও থেকেই ভিন্ন কোনো মত বা কথা সাব্যস্ত নেই। তাই বলা যায়, এ বিষয়ে সাহাবিগণের ইজমা সাব্যস্ত হয়ে যায়।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, জানা জরুরি যে, কোনো শাখাগত মাসআলায় সাহাবাগণের ইজমা আছে—প্রমাণ করার যত পদ্ধতি আছে সবগুলোর মধ্যে ওপরে বর্ণিত পদ্ধতিই উত্তম।[৯৯] এ-জাতীয় ঘটনায় সাহাবিগণের কিছু কর্মপদ্ধতি তুলে ধরা হলো।
১/
সাইফ ইবনে উমর আত-তামিমি বর্ণনা করেন। মুহাজির আল-মাখযুমি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সামনে দুজন গায়িকাকে আনা হলো। তাদের একজন নবীজিকে কটূক্তি করে গান গেয়েছিল। মুহাজির আল-মাখযুমি রাদিয়াল্লাহু আনহু তার এক হাত কেঁটে ফেললেন এবং তার সামনের দাঁতগুলো উপড়ে ফেললেন। আরেকজন মুসলমানদেরকে বিষদাগার করে গান গেয়েছিল। তিনি তার এক হাত কেঁটে ফেললেন এবং তারও সামনের দাঁতগুলো উপড়ে ফেললেন।
পরে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মুহাজির আল-মাখযুমির নিকট পত্র লিখেন: 'যে নারী নবীজিকে কটূক্তি করে গান গেয়েছিল, তার বিষয়ে আপনার ফয়সালার সংবাদ আমার কাছে পৌঁছেছে। যদি আপনি আমাকে আগে জানাতেন, আমি আপনার প্রতি তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিতাম। কেননা নবীদেরকে কটূক্তি করার শাস্তি অন্যন্য শাস্তির মতো নয়। এহেন কাজ কোনো মুসলিম করলে সে মুরতাদ, আর কোনো যিম্মি করলে সে বিশ্বাসঘাতক ও কতলের উপযুক্ত।
আর যে নারী মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ-পোষণ করে গান গেয়েছিল, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু পত্রে তার ব্যাপারে লিখেন: 'আমার নিকট এও সংবাদ এসেছে যে, মুসলিমদেরকে নিন্দা করে গান গাওয়ার অপরাধে আপনি এক নারীর হাত কেটে দিয়েছেন ও সামনের একটা দাঁত উপড়ে ফেলেছেন। সে যদি মুসলিম নারী হয়ে থাকে, তা হলে তাকে আদব শিক্ষা দেওয়া দরকার ছিল, তবে আদব শিখাতে গিয়ে শারীরিক বিকৃতি করা যাবে না। আর সে যদি যিম্মি হয়, তা হলে তো আপনি যে শিরক ক্ষমা করেছেন, তা আরও গুরুতর ছিল। এমন কোনো অপরাধ করে যদি আমি আপনার কাছে উপস্থিত হতাম তা হলে আমি আপনার নিন্দার উপযুক্ত হতাম। সহজতার নীতি অবলম্বন করুন, মানুষের দেহ বিকৃতকরণ থেকে বিরত থাকুন। অন্য কোনো অপরাধের কারণে অঙ্গবিকৃতি করা যাবে না। কেননা তা মানুষের মনে বৈরিতা সৃষ্টির উপকরণ, তবে কিসাসের বিধানের কথা ভিন্ন।'
সাইফ আত-তামিমি ছাড়াও অন্যরা ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। উপরিউক্ত বর্ণনার সাথে তাদের বর্ণনার মিল রয়েছে। তবে তাদের বর্ণনায় এ কথাটুকুও আছে-'যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কটূক্তি করবে, তাকে হত্যা করা হবে তবে নবীজি ছাড়া অন্য কাউকে কটূক্তি করলে হত্যা করা যাবে না।'
হাদীসের ভাষ্য এই ব্যাপারে স্পষ্ট যে, যে-ই নবীজিকে গালি দিবে তাকেই হত্যা করতে হবে। মুসলিম গালি দিক কিংবা যিম্মি, কিংবা নারী—যেই হোক না কেন, তাকে তাওবা সুযোগ না দিয়েই হত্যা করা হবে। তবে অন্যান্যদেরকে গালি দিলে হত্যা করা হবে না। অন্যদেরকে গালি দেওয়ার শাস্তি যেমন বেত্রাঘাত, তেমনি নবীগণকে গালি দেওয়ার শাস্তি কতল।
তবে (উল্লেখিত) হাদীসে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মুহাজির আল-মাখযুমি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে এমন কোনো আদেশ করেননি যে, ওই মহিলাকে হত্যা করে ফেলতে হবে। কেননা মুহাজির আল-মাখযুমি রাদিয়াল্লাহু আনহু ইজতিহাদ করে ইতিমধ্যেই তাকে একটি শাস্তি দিয়েছেন। তাই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু একই সাথে দুই ধরনের শাস্তি দেওয়াটা অপছন্দ করেছেন।
এও হতে পারে, কটূক্তিকারী ইসলাম গ্রহণ করেছিল কিংবা পূর্ব থেকেই মুসলিম হলে তাওবা করেছিল, আর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পত্র তাঁর হাতে পৌঁছার পূর্বেই মুহাজির রাদিয়াল্লাহু আনহু তার ইসলাম বা তাওবাকে গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নিয়েছিলেন। ইজতিহাদ করে আগেই একপ্রকারের ফয়সালা হয়ে গেছে, তাই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুও ইজতিহাদি ফয়সালাকে আর পরিবর্তন করেননি। কারণ মূলনীতি হলো যে, একজনের ইজতিহাদকে অন্যজনের ইজতিহাদ দিয়ে প্রত্যাখ্যান করা যায় না।
২/
হারব আল-কিরমানি রাহিমাহুল্লাহ তাঁর মাসায়িলু হারব লিল ইমাম আহমাদ গ্রন্থে ইমাম লাইস থেকে বর্ণনা করেন, মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এক লোককে নিয়ে আসা হলো। সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করেছিল। উমর তাকে হত্যা করেন। তারপর তিনি বলেন, ‘কেউ যদি আল্লাহ, তাঁর রাসূল অথবা কোনো নবীকে কটূক্তি করে, তা হলে তাকে হত্যা করো।’
মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন- ‘যদি কোনো মুসলিম আল্লাহ, তাঁর রাসূল অথবা অন্যকোনো নবীকে গালি দেয়, তা হলে সে অবশ্যই আল্লাহর রাসূলকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করল। আর আল্লাহর রাসূলকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করার অর্থ দ্বীন পরিত্যাগ। তাকে তাওবার সুযোগ দেওয়া হবে। যদি সে তাওবা করে তা হলে তার তাওবা গ্রহণ করা হবে, অন্যথায় তাকে হত্যা করা হবে। আর কোনো যিম্মি যদি কোনো নবীকে গালি দেয়, তা হলে সে তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করল, তোমরা তাকে হত্যা করো।’
হারব আল-কিরমানি রাহিমাহুল্লাহ আরও বর্ণনা করেন যে, আন-নাবাতি নামক এক ব্যক্তি নবীজিকে গালমন্দ করেছিল। যখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু শামে প্রবেশ করেন তখন সে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট পত্র লিখেছিল। প্রত্যুত্তরে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেন, ‘আমরা তো তোমাকে এ জন্য নিরাপত্তা দিইনি যে, তুমি আমাদের বিরুদ্ধে গিয়ে আমাদেরই দ্বীনে নাক-গলাবে। তুমি যদি এ রকম কাজ আবার করো, তা হলে আমি তোমার গর্দান উড়িয়ে দিব!’
এই হলেন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু! তিনি যাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন, তাকে তিনি আনসার ও মুহাজির সাহাবিগণের উপস্থিতিতে বলছেন, ‘আমরা দ্বীনে নাক-গলানোর জন্য তোমাকে নিরাপত্তা দিইনি।’ (সাহাবিগণের উপস্থিতিতে) উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কসম করে বলেছিলেন, ‘সে যদি এ কাজ পুনরায় করে তা হলে তার গর্দান উড়িয়ে দিব।’
এখান থেকে বোঝা গেল, এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের ইজমা হয়ে গিয়েছিল যে, আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে আপত্তি করার অধিকার কোনো যিম্মির নেই এবং দ্বীন নিয়ে আপত্তি করলে যিম্মির রক্ত হালাল হয়ে যায়। আর সবচেয়ে বড় আপত্তি হলো নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করা। এটা পরিষ্কার কথা, কোনো অস্পষ্টতা নেই।
ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সম্পর্কে বর্ণিত যে, তিনি এক পাদরির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তাকে বলা হলো, এই পাদরি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করে। ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, 'আমি যদি শুনতাম, তা হলে তাকে কতল করতাম।'
একাধিক বর্ণনাকারী এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে সাবিগের ঘটনা-সম্বলিত হাদীসটি ইতিপূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-সহ অন্যন্য উম্মুল মুমিনীনদের ব্যাপারে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর হাদীসও পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে।
এ ছাড়াও খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি এক নারীকে হত্যা করেছিলেন, কারণ সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করেছিল। হাদীসটি ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন।[১০০]
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ সনদ-সহ বর্ণনা করেন যে, এক নাসারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করেছিল, আর গারাফা ইবনে হারিস আল-কিন্দি রাদিয়াল্লাহু আনহু-নামক জনৈক সাহাবি তা শুনেছিলেন। তখন তিনি আঘাত করে তার নাকের হাড্ডি গুড়ো করে ফেলেন। ফলে বিষয়টি আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে উত্থাপিত হয়। তিনি গারাফা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, 'আমরা তো এদেরকে নিরাপত্তা দিয়েছি।' গারাফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহর পানাহ! রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালি দেওয়ার পরও আমরা তাকে নিরাপত্তা দিব?' তখন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'না! তুমি ঠিক বলেছ!'[১০১]
এই হলো সাহাবা ও তাঁদের একনিষ্ঠ তাবেয়ীগণের কিছু বক্তব্য। আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর সন্তুষ্ট থাকুন।
টিকাঃ
[৯৯] অর্থাৎ এ-জাতীয় ঘটনায় সকল থেকে একই ধরনের কথা বর্ণিত হয়েছে, কারো থেকে ব্যতিক্রম কথা আসেনি।
[১০০] খাল্লাল, আল-জামি: ২/৩৪২。
[১০১] মূলত ঘটনাটি ঘটেছিল উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে। যথাসম্ভব এখানে ভুলক্রমে আমর ইবনুল আসের নাম এসেছে। (অনুবাদক)
📄 কিয়াস থেকে প্রমাণ
কুরআন, হাদীস ও সাহাবি-তাবেয়ীদের বক্তব্য থেকে বিভিন্নভাবেই শিক্ষা নেওয়া যায়-
১/ আমাদের দ্বীনের দোষ-ধরা ও আমাদের নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তি করার অর্থ আমাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও যুদ্ধ ঘোষণা করা। হাত দ্বারা যুদ্ধ করলে যেমন নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যায়, মুখ দ্বারা আঘাতের দ্বারাও নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যাবে, বরং আরও আগেই ভাঙবে। আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণী আমাদের কথাকে আরও সুস্পষ্ট করে-
وَجَاهِدُوا بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ 'আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তোমাদের জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করো।[১০২]
জীবন দিয়ে জিহাদ দুভাবে হতে পারে—জিহ্বা দিয়ে ও হাত দিয়ে।
২/ আমরা যিম্মিদেরকে তাদের কুফরি বিশ্বাসসমূহের ওপর বহাল থাকার স্বীকৃতি দিয়েছি এ কথা মেনেই যে, তারা গোপনে আমাদের সাথে শত্রুতা রাখে। তবে তারা যদি প্রকাশ্যে আল্লাহ, রাসূল ও দ্বীনকে কটূক্তি প্রকাশ করে, তবে এটা যুদ্ধ ঘোষণার নামান্তর। এর ফলে নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যায়।
৩/ আমাদের মাঝে আর কাফেরদের মাঝে যদি কোনো সাধারণ নিরাপত্তা-চুক্তি সম্পাদিত হয় তা হলে এর অনিবার্য দাবি হলো— তারা যেভাবে চুক্তিবদ্ধ অবস্থায় রক্তপাত থেকে বিরত থাকে, সেভাবে তারা অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শানে কটূক্তি করা থেকেও বিরত থাকবে। বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কটূক্তি করা আমাদের কাছে রক্তপাতের চেয়েও জঘন্য অপরাধ। কেননা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মান ও দ্বীনের বিজয়ের জন্য আমরা আমাদের জান-মাল বিলিয়ে দিই। আর আমাদের দ্বীনের এ বিষয়গুলো তারাও জানে। এরপরও যখন তারা এর অন্যথা করবে, তখন তাদের নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যাবে।
৮/
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কাফেরদের সাথে যে নিরাপত্তা-চুক্তি করেছিলেন সেখানেও তিনি এ শর্ত স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছিলেন। এমনটাই বর্ণনা করেছেন হারব রাহিমাহুল্লাহ আব্দুর রহমান ইবনে গানম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে সহীহ সনদে।
৫/
যিম্মিদের সাথে আমাদের চুক্তি হয় এই শর্তে যে, ভূখণ্ড আমাদের, এখানে ইসলামের বিধি-বিধান জারি থাকবে। যিম্মিরা অনুগত ও নমনীয় হয়ে। এসব শর্তেই তাদের সাথে চুক্তি ও সন্ধি হয়। এরপর তারা যদি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করে ও দ্বীনকে আঘাত করে কথা বলে, তা হলে এ আচরণ তাদের 'অনুগত ও নমনীয় হয়ে থাকা'র শর্ত পরিপন্থী।
৬/
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমর্থন করা, শক্তি জোগানো, সম্মান করা, সাহায্য করা, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা, তাঁর প্রতি সম্মান প্রকাশ করা আমাদের জন্য ফরয। আল্লাহ (এসব দায়িত্ব) ফরয করেছেন। এ দায়িত্বের অপরিহার্য্য দাবি হলো সর্ব দিক থেকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা।
৭/
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহায্য করা আমাদের জন্য ফরয। কেননা তা আল্লাহর রাসূলকে শক্তি জোগানোর অন্তর্ভুক্ত। আর তা সর্বোত্তম জিহাদ। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ 'যদি তোমরা রাসূলকে সাহায্য না করো, তবে আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছিলেন...।' [১০৩]
বরং প্রতিটি মুসলিমকে সাহায্য করা ওয়াজিব, তা হলে শ্রেষ্ঠ আদম-সন্তান রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহায্য করার বিষয়টি কেমন হতে পারে।
৮/ কাফেরদের সাথে এ শর্তেই চুক্তি করা হয় যে, তাদের ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত যে অন্যায় আছে, সেগুলো তারা প্রকাশ্যে করবে না। যদি তারা এগুলো প্রকাশ করে, তা হলে তাদেরকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। তেমনিভাবে যদি তাদের থেকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি কটূক্তি প্রকাশ পায়, তা হলে তাদেরকে সাঁজা দেওয়া হবে।
৯/ মুসলিমদের মধ্যে এ ব্যাপারে কোনো মতবিরোধ নেই যে, যে-কোনো ধরনের কটূক্তি কাফেরদের জন্য নিষিদ্ধ। কেউ যদি নিষিদ্ধ কোনো কাজ করে তা হলে তাকে শাস্তি পেতে হয়। যেহেতু তাদেরকে কটূক্তির অধিকার দেওয়া হয়নি, তাই তারা যদি এমন অন্যায় করে যার আধিকার তাদেরকে দেওয়া হয়নি তা হলে তারা তো সর্বসম্মতিক্রমে শাস্তির উপযুক্ত হবে।
যিম্মিরা যদি কোনো সাধারণ মুসলিমকেও গালি দেয় তা হলে তাদেরকে বেত্রাঘাত করা হয়, সেখানে কেউ যদি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করে তা হলে তাকে হত্যা করা হবে।
১০/ স্পষ্ট কিয়াস ও যুক্তির দাবি হলো, যে বিষয়ে যিম্মি কাফেরদের সাথে চুক্তি হয়েছে, তার কোনো কিছু যদি তারা ভঙ্গ করে তা হলে তাদের চুক্তিও ভেঙে যাবে, যেমনটা কতিপয় ফকিহ বলেছেন।
যে বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে, তা যদি তারা পূর্ণ না করে তা হলে তো তাদের চুক্তি ভেঙে যাবে, যেমন বিক্রি-জাতীয় চুক্তিও ভেঙে যায় যদি দুই পক্ষের কোনো এক পক্ষ শর্ত পূরণ না করে। কারণটা স্পষ্ট। কেননা উভয় পক্ষের জন্য চুক্তি পূরণ করা আবশ্যক এ শর্তেই যে, তারা উভয়েই শর্ত পূরণ করবে। যখন একজন সে শর্ত পূরণ না করে, তখন অপরের জন্য সেই চুক্তি পূরণ করা অপরিহার্য থাকে না। কেননা সকল বুদ্ধিমানের মতেই, শর্তযুক্ত কোনো কিছু তখনই অপরিহার্য হয় যখন শর্ত পূরণ হয়।
উপরিউক্ত মূলনীতিটি যদি স্পষ্ট হয়ে থাকে তা হলে আমরা বলব, চুক্তিকৃত বিষয়টা যদি কোনো একজন চুক্তিকারীর ব্যক্তিগত অধিকার হয় তা হলে তার অধিকার রয়েছে যে, সে অপর পক্ষ থেকে শর্ত পূরণ ছাড়াই চুক্তি পূরণ করবে। আর এ ধরনের ক্ষেত্রে শর্ত লঙ্ঘন হওয়ার দ্বারা চুক্তি ভেঙে যায় না, তবে তার ভাঙ্গার অধিকার থাকে। যেমন কেউ বাকিতে বিক্রি করার সময় ক্রেতাকে বন্ধক রাখার শর্ত জুড়ে দিল। (পরে ক্রেতা সেই শর্ত পূরণ না করলেও বিক্রেতার বিক্রির চুক্তি বহাল রাখার অধিকার আছে)
আর চুক্তিতে শর্তকৃত বিষয়টি যদি কারও ব্যক্তিগত অধিকার না হয়ে বরং আল্লাহর হক হয় বা কোনো বান্দার হক হয়, আর চুক্তিকারী কেবল তত্ত্বাবধানের অধিকার-বলে তাতে হস্তক্ষেপ করে, তা হলে চুক্তির শর্ত পাওয়া না গেলে চুক্তি ভেঙে যাবে কিংবা এই চুক্তি ভেঙে দেওয়া আবশ্যক হয়ে পড়বে।
উদাহরণ: কেউ কোনো নারীকে স্বাধীন ও মুসলিম হওয়ার শর্তে বিয়ে করল, কিন্তু পরে দেখা গেল, নারীটি মুর্তিপূজারি। (সেক্ষেত্রে বিয়ে ভেঙে যাবে, আলাদা করে বিয়ে ভাঙ্গার প্রয়োজন হবে না)
তেমনি (ইসলামি রাষ্ট্রে) কাফেরদের সাথে যিম্মি বা নিরাপত্তা-দানের চুক্তি করা মুসলিম নেতা বা খলিফার হক নয়, বরং এটা আল্লাহ তাআলা ও সমগ্র মুসলিম জনগণের হক। সুতরাং তারা যদি চুক্তির কোনো শর্ত লঙ্ঘন করে, তা হলে কেউ কেউ বলেন, ইমামের ওপর ওয়াজিব হবে সেই চুক্তি রহিত করা। আর রহিতকরণের স্বরূপ হলো, তাকে নিরাপত্তার সাথে ইসলামি রাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়া হবে। তবে এ মতটা দুর্বল। কেননা যিম্মিদের সাথে করা শর্তগুলো মূলত আল্লাহর হক। তাই খলিফা রহিত না করলেও তা রহিত হয়ে যাবে। আমাদের মূল আলচনা এটিই-যিম্মিদের সাথে শর্তকৃত বিষয়গুলো মূলত আল্লাহর হক। যদি মেনে নেওয়া হয়, তাদেরকে কোনো ধরনের শর্ত ছাড়াই ইসলামী ভূখন্ডে থাকতে দেওয়া হয়েছে, তবুও সে অধিকার ততটুকুই যতটুকু অধিকার মুসলিমদের ক্ষতি না করে দেওয়া সম্ভব। যখন তাদের দ্বারা মুসলিমদের ক্ষতি হবে, তখন কোনো অবস্থাতেই তাদেরকে আর থাকতে দেওয়া হবে না। আর যদি মেনেও নেওয়া হয় যে, মুসলিমদের ক্ষতি হলেও তাদেরকে থাকার অনুমতি দেওয়া হবে, তবুও কোনোভাবেই জায়েজ হতে পারে না এবং মেনে নেওয়া যেতে পারে না যে, আল্লাহর হক লঙ্ঘন হলেও এবং দ্বীনের ক্ষতি হলেও আর তারা ইসলামকে আঘাত করলেও তাদেরকে থাকতে দেওয়া হবে। যিম্মির সাথে করা চুক্তির অপরিহার্য দাবি হলো তারা আল্লাহর রাসূলকে কটূক্তি করবে না। নিঃশর্ত বিক্রির চুক্তিতে যেমন- পণ্য দোষমুক্ত থাকা ও মূল্য নগদ হওয়া শর্ত তেমনিভাবে নিঃশর্ত বিয়ের চুক্তিতে সাধারণ কিছু বিষয় থেকে স্বামী-স্ত্রীকে মুক্ত থাকতে হয়, যেমন স্বাধীন হওয়া, মুসলিম হওয়া ইত্যাদি। কেননা এ-জাতীয় শর্ত স্পষ্ট করে করার প্রয়োজন হয় না, রীতিগতভাবেই বোঝা যায়। একইভাবে কাফেরদের সাথে চুক্তি করার সময় যদিও আল্লাহর রাসূলকে কটূক্তি করা বা দ্বীনকে আঘাত-করা-সংক্রান্ত কোনো শর্ত না থাকে, তবুও জানা কথা, যিম্মিদের সাথে চুক্তির সময় মুসলিমদের উদ্দেশ্য এটাই থাকে যে, তারা কোনোভাবেই নবীকে কটূক্তি করতে পারবে না। যেমন: ধরে নেওয়া হয় যে, তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবে না। রাসূলকে কষ্ট না-দেওয়ার বিষয়টি আরও বেশি কাম্য। কেননা তা অধিক কষ্টদায়ক। তবে কেউ যদি আপত্তি করে বলে যে, 'আমরা তো আবদ্ধ কাফেরদেরকে নিরাপত্তা দিয়েছি এ শর্ত মেনেই যে, তারা তাদের ধর্ম পালন করবে। আর (তাদের ধর্মের বিরোধী হওয়ায়) নবীজিকে গালমন্দ করা (হয়তো) তাদের ধর্মের অংশ!' আমরা তাদের উত্তরে বলব, মুসলিমদের সাথে লড়াই করা, যে-কোনো পন্থায় তাদের ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া এবং মুসলিমদের সাথে শত্রুতা করাও তো তাদের ধর্মের অংশ। তাদের ধর্মের অংশ হলেও মুসলিমদের সাথে চুক্তি রেখে তারা এগুলো করতে পারে না। যখন তারা এ ধরনের কাজ করবে তখন তাদের চুক্তি ভেঙে যাবে। কেননা যদিও আমরা তাদেরকে থাকতে দিয়েছি এ কথা মেনে যে, তারা তাদের যা বিশ্বাস করার করবে এবং যা গোপন রাখার রাখবে, তাই বলে তাদের সেগুলো প্রকাশ করার এবং সেগুলো মুসলিমদের মাঝে বলার অধিকার আমরা দিইনি। তবে আমরা কারও নিরাপত্তা-চুক্তি ভাঙ্গার কথা বলি না যতক্ষণ-না আমরা তাদেরকে সেগুলো বলতে শুনব বা মুসলিমরা শুনে এর সাক্ষ্য দিবে। যখন আমরা শুনব বা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য সাব্যস্ত হবে তখন ফয়সালা দেওয়া হবে, তারা কটূক্তি করেছে। যদি আমরা তাদেরকে (শর্ত ছাড়াই) তাদের ধর্ম মানার অধিকার দিই, তা হলে তো তাদেরকে মসজিদ ধ্বংস করার, কুরআন পুড়ানোর, আলেম ও সৎ-ব্যক্তিদেরকে হত্যা করার অধিকার দিতে হবে। কেননা তারা এগুলোকেও ধর্ম হিসাবে বিশ্বাস করে। কোনো বিরোধ নেই যে, তাদেরকে এসব অধিকার দেওয়া হবে না।
টিকাঃ
[১০২] সূরা তাওবা, ৯:৪১
[১০৩] সূরা তাওবা, ৯: ৪০
কুরআন, হাদীস ও সাহাবি-তাবেয়ীদের বক্তব্য থেকে বিভিন্নভাবেই শিক্ষা নেওয়া যায়-
১/ আমাদের দ্বীনের দোষ-ধরা ও আমাদের নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তি করার অর্থ আমাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও যুদ্ধ ঘোষণা করা। হাত দ্বারা যুদ্ধ করলে যেমন নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যায়, মুখ দ্বারা আঘাতের দ্বারাও নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যাবে, বরং আরও আগেই ভাঙবে। আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণী আমাদের কথাকে আরও সুস্পষ্ট করে-
وَجَاهِدُوا بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ 'আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তোমাদের জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করো।[১০২]
জীবন দিয়ে জিহাদ দুভাবে হতে পারে—জিহ্বা দিয়ে ও হাত দিয়ে।
২/ আমরা যিম্মিদেরকে তাদের কুফরি বিশ্বাসসমূহের ওপর বহাল থাকার স্বীকৃতি দিয়েছি এ কথা মেনেই যে, তারা গোপনে আমাদের সাথে শত্রুতা রাখে। তবে তারা যদি প্রকাশ্যে আল্লাহ, রাসূল ও দ্বীনকে কটূক্তি প্রকাশ করে, তবে এটা যুদ্ধ ঘোষণার নামান্তর। এর ফলে নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যায়।
৩/ আমাদের মাঝে আর কাফেরদের মাঝে যদি কোনো সাধারণ নিরাপত্তা-চুক্তি সম্পাদিত হয় তা হলে এর অনিবার্য দাবি হলো— তারা যেভাবে চুক্তিবদ্ধ অবস্থায় রক্তপাত থেকে বিরত থাকে, সেভাবে তারা অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শানে কটূক্তি করা থেকেও বিরত থাকবে। বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কটূক্তি করা আমাদের কাছে রক্তপাতের চেয়েও জঘন্য অপরাধ। কেননা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মান ও দ্বীনের বিজয়ের জন্য আমরা আমাদের জান-মাল বিলিয়ে দিই। আর আমাদের দ্বীনের এ বিষয়গুলো তারাও জানে। এরপরও যখন তারা এর অন্যথা করবে, তখন তাদের নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যাবে।
৮/
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কাফেরদের সাথে যে নিরাপত্তা-চুক্তি করেছিলেন সেখানেও তিনি এ শর্ত স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছিলেন। এমনটাই বর্ণনা করেছেন হারব রাহিমাহুল্লাহ আব্দুর রহমান ইবনে গানম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে সহীহ সনদে।
৫/
যিম্মিদের সাথে আমাদের চুক্তি হয় এই শর্তে যে, ভূখণ্ড আমাদের, এখানে ইসলামের বিধি-বিধান জারি থাকবে। যিম্মিরা অনুগত ও নমনীয় হয়ে। এসব শর্তেই তাদের সাথে চুক্তি ও সন্ধি হয়। এরপর তারা যদি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করে ও দ্বীনকে আঘাত করে কথা বলে, তা হলে এ আচরণ তাদের 'অনুগত ও নমনীয় হয়ে থাকা'র শর্ত পরিপন্থী।
৬/
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমর্থন করা, শক্তি জোগানো, সম্মান করা, সাহায্য করা, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা, তাঁর প্রতি সম্মান প্রকাশ করা আমাদের জন্য ফরয। আল্লাহ (এসব দায়িত্ব) ফরয করেছেন। এ দায়িত্বের অপরিহার্য্য দাবি হলো সর্ব দিক থেকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা।
৭/
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহায্য করা আমাদের জন্য ফরয। কেননা তা আল্লাহর রাসূলকে শক্তি জোগানোর অন্তর্ভুক্ত। আর তা সর্বোত্তম জিহাদ। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ 'যদি তোমরা রাসূলকে সাহায্য না করো, তবে আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছিলেন...।' [১০৩]
বরং প্রতিটি মুসলিমকে সাহায্য করা ওয়াজিব, তা হলে শ্রেষ্ঠ আদম-সন্তান রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহায্য করার বিষয়টি কেমন হতে পারে।
৮/ কাফেরদের সাথে এ শর্তেই চুক্তি করা হয় যে, তাদের ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত যে অন্যায় আছে, সেগুলো তারা প্রকাশ্যে করবে না। যদি তারা এগুলো প্রকাশ করে, তা হলে তাদেরকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। তেমনিভাবে যদি তাদের থেকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি কটূক্তি প্রকাশ পায়, তা হলে তাদেরকে সাঁজা দেওয়া হবে।
৯/ মুসলিমদের মধ্যে এ ব্যাপারে কোনো মতবিরোধ নেই যে, যে-কোনো ধরনের কটূক্তি কাফেরদের জন্য নিষিদ্ধ। কেউ যদি নিষিদ্ধ কোনো কাজ করে তা হলে তাকে শাস্তি পেতে হয়। যেহেতু তাদেরকে কটূক্তির অধিকার দেওয়া হয়নি, তাই তারা যদি এমন অন্যায় করে যার আধিকার তাদেরকে দেওয়া হয়নি তা হলে তারা তো সর্বসম্মতিক্রমে শাস্তির উপযুক্ত হবে।
যিম্মিরা যদি কোনো সাধারণ মুসলিমকেও গালি দেয় তা হলে তাদেরকে বেত্রাঘাত করা হয়, সেখানে কেউ যদি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করে তা হলে তাকে হত্যা করা হবে।
১০/ স্পষ্ট কিয়াস ও যুক্তির দাবি হলো, যে বিষয়ে যিম্মি কাফেরদের সাথে চুক্তি হয়েছে, তার কোনো কিছু যদি তারা ভঙ্গ করে তা হলে তাদের চুক্তিও ভেঙে যাবে, যেমনটা কতিপয় ফকিহ বলেছেন।
যে বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে, তা যদি তারা পূর্ণ না করে তা হলে তো তাদের চুক্তি ভেঙে যাবে, যেমন বিক্রি-জাতীয় চুক্তিও ভেঙে যায় যদি দুই পক্ষের কোনো এক পক্ষ শর্ত পূরণ না করে। কারণটা স্পষ্ট। কেননা উভয় পক্ষের জন্য চুক্তি পূরণ করা আবশ্যক এ শর্তেই যে, তারা উভয়েই শর্ত পূরণ করবে। যখন একজন সে শর্ত পূরণ না করে, তখন অপরের জন্য সেই চুক্তি পূরণ করা অপরিহার্য থাকে না। কেননা সকল বুদ্ধিমানের মতেই, শর্তযুক্ত কোনো কিছু তখনই অপরিহার্য হয় যখন শর্ত পূরণ হয়।
উপরিউক্ত মূলনীতিটি যদি স্পষ্ট হয়ে থাকে তা হলে আমরা বলব, চুক্তিকৃত বিষয়টা যদি কোনো একজন চুক্তিকারীর ব্যক্তিগত অধিকার হয় তা হলে তার অধিকার রয়েছে যে, সে অপর পক্ষ থেকে শর্ত পূরণ ছাড়াই চুক্তি পূরণ করবে। আর এ ধরনের ক্ষেত্রে শর্ত লঙ্ঘন হওয়ার দ্বারা চুক্তি ভেঙে যায় না, তবে তার ভাঙ্গার অধিকার থাকে। যেমন কেউ বাকিতে বিক্রি করার সময় ক্রেতাকে বন্ধক রাখার শর্ত জুড়ে দিল। (পরে ক্রেতা সেই শর্ত পূরণ না করলেও বিক্রেতার বিক্রির চুক্তি বহাল রাখার অধিকার আছে)
আর চুক্তিতে শর্তকৃত বিষয়টি যদি কারও ব্যক্তিগত অধিকার না হয়ে বরং আল্লাহর হক হয় বা কোনো বান্দার হক হয়, আর চুক্তিকারী কেবল তত্ত্বাবধানের অধিকার-বলে তাতে হস্তক্ষেপ করে, তা হলে চুক্তির শর্ত পাওয়া না গেলে চুক্তি ভেঙে যাবে কিংবা এই চুক্তি ভেঙে দেওয়া আবশ্যক হয়ে পড়বে।
উদাহরণ: কেউ কোনো নারীকে স্বাধীন ও মুসলিম হওয়ার শর্তে বিয়ে করল, কিন্তু পরে দেখা গেল, নারীটি মুর্তিপূজারি। (সেক্ষেত্রে বিয়ে ভেঙে যাবে, আলাদা করে বিয়ে ভাঙ্গার প্রয়োজন হবে না)
তেমনি (ইসলামি রাষ্ট্রে) কাফেরদের সাথে যিম্মি বা নিরাপত্তা-দানের চুক্তি করা মুসলিম নেতা বা খলিফার হক নয়, বরং এটা আল্লাহ তাআলা ও সমগ্র মুসলিম জনগণের হক। সুতরাং তারা যদি চুক্তির কোনো শর্ত লঙ্ঘন করে, তা হলে কেউ কেউ বলেন, ইমামের ওপর ওয়াজিব হবে সেই চুক্তি রহিত করা। আর রহিতকরণের স্বরূপ হলো, তাকে নিরাপত্তার সাথে ইসলামি রাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়া হবে। তবে এ মতটা দুর্বল। কেননা যিম্মিদের সাথে করা শর্তগুলো মূলত আল্লাহর হক। তাই খলিফা রহিত না করলেও তা রহিত হয়ে যাবে। আমাদের মূল আলচনা এটিই-যিম্মিদের সাথে শর্তকৃত বিষয়গুলো মূলত আল্লাহর হক। যদি মেনে নেওয়া হয়, তাদেরকে কোনো ধরনের শর্ত ছাড়াই ইসলামী ভূখন্ডে থাকতে দেওয়া হয়েছে, তবুও সে অধিকার ততটুকুই যতটুকু অধিকার মুসলিমদের ক্ষতি না করে দেওয়া সম্ভব। যখন তাদের দ্বারা মুসলিমদের ক্ষতি হবে, তখন কোনো অবস্থাতেই তাদেরকে আর থাকতে দেওয়া হবে না। আর যদি মেনেও নেওয়া হয় যে, মুসলিমদের ক্ষতি হলেও তাদেরকে থাকার অনুমতি দেওয়া হবে, তবুও কোনোভাবেই জায়েজ হতে পারে না এবং মেনে নেওয়া যেতে পারে না যে, আল্লাহর হক লঙ্ঘন হলেও এবং দ্বীনের ক্ষতি হলেও আর তারা ইসলামকে আঘাত করলেও তাদেরকে থাকতে দেওয়া হবে। যিম্মির সাথে করা চুক্তির অপরিহার্য দাবি হলো তারা আল্লাহর রাসূলকে কটূক্তি করবে না। নিঃশর্ত বিক্রির চুক্তিতে যেমন- পণ্য দোষমুক্ত থাকা ও মূল্য নগদ হওয়া শর্ত তেমনিভাবে নিঃশর্ত বিয়ের চুক্তিতে সাধারণ কিছু বিষয় থেকে স্বামী-স্ত্রীকে মুক্ত থাকতে হয়, যেমন স্বাধীন হওয়া, মুসলিম হওয়া ইত্যাদি। কেননা এ-জাতীয় শর্ত স্পষ্ট করে করার প্রয়োজন হয় না, রীতিগতভাবেই বোঝা যায়। একইভাবে কাফেরদের সাথে চুক্তি করার সময় যদিও আল্লাহর রাসূলকে কটূক্তি করা বা দ্বীনকে আঘাত-করা-সংক্রান্ত কোনো শর্ত না থাকে, তবুও জানা কথা, যিম্মিদের সাথে চুক্তির সময় মুসলিমদের উদ্দেশ্য এটাই থাকে যে, তারা কোনোভাবেই নবীকে কটূক্তি করতে পারবে না। যেমন: ধরে নেওয়া হয় যে, তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবে না। রাসূলকে কষ্ট না-দেওয়ার বিষয়টি আরও বেশি কাম্য। কেননা তা অধিক কষ্টদায়ক। তবে কেউ যদি আপত্তি করে বলে যে, 'আমরা তো আবদ্ধ কাফেরদেরকে নিরাপত্তা দিয়েছি এ শর্ত মেনেই যে, তারা তাদের ধর্ম পালন করবে। আর (তাদের ধর্মের বিরোধী হওয়ায়) নবীজিকে গালমন্দ করা (হয়তো) তাদের ধর্মের অংশ!' আমরা তাদের উত্তরে বলব, মুসলিমদের সাথে লড়াই করা, যে-কোনো পন্থায় তাদের ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া এবং মুসলিমদের সাথে শত্রুতা করাও তো তাদের ধর্মের অংশ। তাদের ধর্মের অংশ হলেও মুসলিমদের সাথে চুক্তি রেখে তারা এগুলো করতে পারে না। যখন তারা এ ধরনের কাজ করবে তখন তাদের চুক্তি ভেঙে যাবে। কেননা যদিও আমরা তাদেরকে থাকতে দিয়েছি এ কথা মেনে যে, তারা তাদের যা বিশ্বাস করার করবে এবং যা গোপন রাখার রাখবে, তাই বলে তাদের সেগুলো প্রকাশ করার এবং সেগুলো মুসলিমদের মাঝে বলার অধিকার আমরা দিইনি। তবে আমরা কারও নিরাপত্তা-চুক্তি ভাঙ্গার কথা বলি না যতক্ষণ-না আমরা তাদেরকে সেগুলো বলতে শুনব বা মুসলিমরা শুনে এর সাক্ষ্য দিবে। যখন আমরা শুনব বা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য সাব্যস্ত হবে তখন ফয়সালা দেওয়া হবে, তারা কটূক্তি করেছে। যদি আমরা তাদেরকে (শর্ত ছাড়াই) তাদের ধর্ম মানার অধিকার দিই, তা হলে তো তাদেরকে মসজিদ ধ্বংস করার, কুরআন পুড়ানোর, আলেম ও সৎ-ব্যক্তিদেরকে হত্যা করার অধিকার দিতে হবে। কেননা তারা এগুলোকেও ধর্ম হিসাবে বিশ্বাস করে। কোনো বিরোধ নেই যে, তাদেরকে এসব অধিকার দেওয়া হবে না।
টিকাঃ
[১০২] সূরা তাওবা, ৯:৪১
[১০৩] সূরা তাওবা, ৯: ৪০