📄 হাম্বলী মাজহাবে শাতিমি রাসূলের বিধান
ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'এমন অভিশপ্তকে হত্যা করা হবে, চাই সে মুসলিম হোক কিংবা কাফের।' তখন ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলো, এ ব্যাপারে কি কোনো হাদীস আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ! অনেক হাদীস আছে। তার মধ্যে একটি হলো, অন্ধ-সাহাবি-সম্পর্কিত বর্ণনাটি। যখন তিনি শুনতে পেলেন, এক মহিলা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করে, তখন তিনি ওই মহিলাটিকে হত্যা করেছিলেন।[৭] আরেকটা হলো হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু-কর্তৃক বর্ণিত হাদীস।[৮]
ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে এ মতটি নকল করেছেন হাম্বাল, আবু সাকর, খাল্লাল, আব্দুল্লাহ ও আবু তালিব।
ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ আরও বলেন, 'শাতিমুর রাসূলকে তাওবারও সুযোগ দেওয়া হবে না।' এই বক্তব্যটি ইমাম আবু বকর রাহিমাহুল্লাহ তার আশ-শাফি গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং 'শাতিম'-কে হত্যা করার ব্যাপারে ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে ভিন্ন কোনো মত নেই, আর (শাতিম যদি যিম্মি হয়) তা হলে তার নিরাপত্তা-চুক্তিও অকার্যকর হয়ে পড়বে।
অবশ্য কাযি আবু ইয়া'লা রাহিমাহুল্লাহ যিম্মির ব্যাপারে (ইমাম আহমাদের) ভিন্ন একটি বর্ণনা উল্লেখ করেন-'আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে কটূক্তি করলেও যিম্মির নিরাপত্তা-বিধান বাতিল হবে না'। (হাম্বলী মাজহাবের) একদল আলেম এ মতটি গ্রহণ করেন। যেমন: শরিফ হাশিমি, ইবনে আকিল, আবুল খাত্তাবি, হুলওয়ানি প্রমূখ।
যিম্মি-কর্তৃক নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করার মতো যে যে ক্ষেত্রে সমগ্র মুসলিমকে বা মুসলিমদেরকে তাদের ব্যক্তিসত্তা, অর্থ কিংবা ধর্ম নিয়ে হেয় করা হয়, সে সেমস্ত ক্ষেত্রে হাম্বলী আলেমগণ (ইমাম আহমাদের) দুটি বর্ণনা উল্লেখ করেন, তবে তারা সবাই একমত যে, এ ধরনের কটূক্তি দ্বারা যিম্মির নিরাপত্তা-চুক্তি বাতিল হয়ে যায়।
তাদের প্রত্যেকেই উল্লেখ করেছেন, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি কটূক্তিকারী যদি যিম্মিও হয় তবুও তাকে হত্যা করা হবে। আর তার নিরাপত্তা-বিধানও বাতিল হয়ে যাবে।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'দুটি বর্ণনার মাঝে এটাই (যুক্তি-প্রমাণের) অধিক নিকটবর্তী। তবে অপর বর্ণনাটি-'তাদের নিরাপত্তা-চুক্তি ভঙ্গ হবে না'- কেবল তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন যিম্মিদের সাথে (আক্রমণাত্মক কোনো কথা বলা যাবে না, এই মর্মে) কোনো শর্ত না থাকবে।'
অবশ্য এমন কোনো শর্ত থাকলেও এ ব্যাপারে দুটো বর্ণনা পাওয়া যায়:
১. যিম্মির নিরাপত্তা-বিধান ভেঙে যাবে। এমনটি উদ্ধৃত করেছেন ইমাম আল-খারাকি রাহিমাহুল্লাহ এবং অভিমতটিকে বিশুদ্ধ বলেছেন ইমাম আবুল হাসান আমাদি রাহিমাহুল্লাহ।
২. তার চুক্তি ও নিরাপত্তা-বিধান বাতিল হবে না। এটি কাযি আবু ইয়া'লা রাহিমাহুল্লাহ-এর মত।
তবে আমাদের (হাম্বলী মাজহাবের) পূর্ববর্তী ফকিহগণ ও তাদের পরবর্তী অনুসারীদের সিদ্ধান্ত হলো-এ ব্যাপারে ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত সুস্পষ্ট বক্তব্যগুলোকে স্ব-স্ব অবস্থায় বহাল রাখতে হবে। ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ স্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, নবীজিকে কটূক্তিকারীর বিধান হলো তাকে হত্যা করা হবে এবং (যিম্মি হলে) তার নিরাপত্তা-বিধান বাতিল হয়ে যাবে। তেমনি যে যিম্মি[৯] মুসলিমদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করবে বা কোনো মুসলিম নারীর সাথে ব্যভিচার করবে, কিংবা কোনো মুসলিমকে হত্যা করবে বা ডাকাতি করবে, তার হুকুমও অনুরূপ।
টিকাঃ
[৭] বিস্তারিত বর্ণনা সামনে আসছে।
[৮] বর্ণনাটি হলো— ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমকে একবার এক পাদরির ব্যাপারে বলা হলো যে, সে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করে। তখন ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুম বললেন, 'যদি আমি শুনতে পাই, তো আমি তাকে হত্যা করব।' [ইবনে আব্দুল বার, আত-তামহিদ: ৬/১৬৮; খাল্লাল, আল-জামি: ৭৩২]
[৯] একটি বর্ণনা হলো যিম্মির নিরাপত্তা-চুক্তি বাতিল হবে না, আরেকটা হলো বাতিল হয়ে যাবে।
📄 শাতিমকে হত্যা করা ওয়াজিব
যে ব্যক্তি আল্লাহ, রাসূলুল্লাহ, ইসলাম ও কুরআন নিয়ে কটূক্তি করবে, তাকে হত্যা করা অপরিহার্য হয়ে যাবে আর যদি সে যিম্মি হয় তবে তার নিরাপত্তা-চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবা-তাবেয়ীগণের ইজমা ও কিয়াস হলো এ কথার দলিল।
• প্রথম দলিল: قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ
'আহলে কিতাবদের যারা আল্লাহর প্রতি ও পরকাল-দিবসের প্রতি ঈমান রাখে না, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা কিছু হারাম করেছেন সেগুলোকে যারা হারাম মানে না এবং যারা সত্য দ্বীনকে অবলম্বন করে না, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করো যতক্ষণ-না তারা অবনত হয়ে (নিজ) হাতে জিযিয়া দেয়।' [১১]
দেখুন, আল্লাহ তাআলা তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন যতক্ষণ- না তারা অবনতচিত্তে জিযিয়া আদায় করে। এখান থেকে বোঝা গেল, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ রাখার কোনো সুযোগ নেই যদি না তারা জিযিয়া প্রদানের সময় অবনত হয় এবং যদি না তারা জিযিয়া প্রদানের পুরোটা সময় অবনত হয়ে থাকে।
জ্ঞাতব্য যে, জিযিয়া প্রদান বলতে বোঝায় তাদের জিযিয়া দেওয়া ও আমাদের নেওয়া- সহ জিযিয়ার সম্পূর্ণ মেয়াদকাল। সুতরাং যে যিম্মি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কটূক্তি করে, সে তো ছোট বা অবনত হয়ে থাকা ব্যক্তি নয়। কেননা صاغر অর্থ অবনত বা ছোট এবং حقیر অর্থ তুচ্ছ—তথা লাঞ্ছনা ও হীনম্মন্যতা। অথচ তাদের কীর্তি-কটূক্তি হলো বেপরোয়া শক্তিশালী ব্যক্তির কাজ।
• দ্বিতীয় দলিল:
كَيْفَ وَإِنْ يَظْهَرُوا عَلَيْكُمْ لَا يَرْقُبُوا فِيكُمْ إِلَّا وَلَا ذِمَّةً يُرْضُونَكُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ وَتَأْبَى قُلُوبُهُمْ وَأَكْثَرُهُمْ فَاسِقُونَ * اشْتَرَوْا بِآيَاتِ اللَّهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَصَدُّوا عَنْ سَبِيلِهِ إِنَّهُمْ سَاءَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ * لَا يَرْقُبُونَ فِي مُؤْمِنٍ إِلَّا وَلَا ذِمَّةً وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُعْتَدُونَ * فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ وَنُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ * وَإِنْ نَكَثُوا أَيْمَانَهُمْ مِنْ بَعْدِ عَهْدِهِمْ وَطَعَنُوا فِي دِينِكُمْ فَقَاتِلُوا أَئِمَّةَ الْكُفْرِ إِنَّهُمْ لَا أَيْمَانَ لَهُمْ لَعَلَّهُمْ يَنْتَهُونَ
তবে তাদের ছাড়া অন্য মুশরিকদের জন্য নিরাপত্তা-চুক্তি কেমন করে হতে পারে, যখন তাদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তারা তোমাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করতে পরলে তোমাদের ব্যাপারে কোনো আত্মীয়তার পরোয়া করবে না এবং কোনো অঙ্গীকারের দায়িত্বও নেবে না। তারা মুখের কথায় তোমাদের সন্তুষ্ট করে কিন্তু তাদের মন তা অস্বীকার করে। আর তাদের অধিকাংশই ফাসেক। তারা আল্লাহর আয়াতের বিনিময়ে সামান্যতম মূল্য গ্রহণ করে নিয়েছে। তারপর আল্লাহর পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা যা করতে অভ্যস্ত, তা অত্যন্ত খারাপ কাজ। কোনো মুমিনের ব্যাপারে তারা না আত্মীয়তার মর্যাদা রক্ষা করে, আর না কোনো অঙ্গীকারের ধার ধারে। আগ্রাসন ও বাড়াবাড়ি সব সময় তাদের পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। কাজেই যদি তারা তাওবা করে নেয় এবং সালাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয় তা হলে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই। যারা জানে, তাদের জন্য আমার বিধান স্পষ্ট করে বর্ণনা করি। আর যদি অঙ্গীকার করার পর তারা নিজেদের কসম ভঙ্গ করে এবং তোমাদের দ্বীনের ওপর হামলা চালাতে থাকে তা হলে কুফরির পতাকাবাহীদের সাথে যুদ্ধ করো। কারণ তাদের কসম বিশ্বাসযোগ্য নয়। হয়তো (এরপর তরবারির ভয়েই) তারা নিরস্ত্র হবে।[১২]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের সাথে যে-কোনো চুক্তিকে নাকচ করে দিয়েছেন যতক্ষণ-না তারা আমাদের সামনে একেবারে সোজা হয়ে যায়। এখান থেকে জানা গেল, একজন মুশরিক তখনই কেবল নিরাপত্তা পেতে পারে যখন সে আমাদের সামনে একদম সোজা হয়ে যাবে।
আর এটা স্পষ্ট যে, (যিম্মি যদি কটূক্তি করে, তা হলে) সে আমাদের সামনে আমাদের রব, নবী, কিতাব ও দ্বীন নিয়ে ব্যঙ্গ করে ও স্পর্ধা দেখিয়ে তার যিম্মি হয়ে থাকার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে, যেমন সে যদি আমাদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়, তা হলে তার আনুগত্যের বিষয়টা নিঃশেষ হয়ে যায়।
বরং আমরা যদি প্রকৃত মুমিন হয়ে থাকি, তা হলে (আল্লাহ ও রাসূলের শানে) কটূক্তি আমাদের নিকট আরও কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক হওয়ার কথা। ফলে তখন আমাদের জন্য আবশ্যক, নিজেদের জান ও মাল খরচ করা, যেন আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হয় এবং আমাদের ভূখণ্ডে আল্লাহ ও রাসূলের শানে কষ্টদায়ক কোনো কিছুর প্রকাশ আর না ঘটে।
উপরিউক্ত আয়াতসমূহের নিম্নোক্ত অংশ দ্বারা বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়- “তবে তাদের ছাড়া অন্য মুশরিকদের জন্য নিরাপত্তা-চুক্তি কেমন করে হতে পারে, যখন তাদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তারা তোমাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করতে পরলে তোমাদের ব্যাপারে কোনো আত্মীয়তার পরোয়া করবে না এবং কোনো অঙ্গীকারের দায়িত্বও নেবে না।” [১৩]
অর্থাৎ তাদের জন্য কীভাবে নিরাপত্তা-বিধান জারি থাকতে পারে? যদি তারা তোমাদের ওপর জয় লাভ করত তা হলে তারা না আত্মীয়তার পরোয়া করত, আর না কোনো প্রতিশ্রুতির প্রতি লক্ষ রাখত।
সুতরাং বোঝা গেল, যে ব্যক্তির অবস্থা হলো এই যে-যদি সে আমাদের ওপর বিজয় লাভ করে তা হলে তার মাঝে ও আমাদের মাঝে সম্পাদিত চুক্তির কোনো পরোয়াই সে করবে না, তা হলে সে যখন আমাদের দ্বীনকে নিয়ে কটূক্তি করে আমাদের সামনে স্পর্ধা দেখায়, তখন এটা দলিল হয়ে যায় যে, সে জয়লাভ করলে আমাদের সাথে চুক্তির কোনো পরোয়াই করত না। লাঞ্ছনার সাথে থেকেই যে এতটুকু করতে পারে, ক্ষমতা পেলে তা হলে অবস্থা কেমন হতে পারে? তবে যে যিম্মি এমন স্পর্ধা দেখায় না, তার কথা ভিন্ন।
• তৃতীয় দলিল
وَإِنْ نَكَثُوا أَيْمَانَهُمْ مِنْ بَعْدِ عَهْدِهِمْ وَطَعَنُوا فِي دِينِكُمْ فَقَاتِلُوا أَبِيَّةَ الْكُفْرِ إِنَّهُمْ لَا أَيْمَانَ لَهُمْ لَعَلَّهُمْ يَنْتَهُونَ
আর যদি অঙ্গীকার করার পর তারা নিজেদের কসম ভঙ্গ করে এবং তোমাদের দ্বীনের ওপর হামলা চালাতে থাকে তা হলে কুফরির পতাকাবাহীদের সাথে যুদ্ধ করো। কারণ তাদের কসম বিশ্বাসযোগ্য নয়। হয়তো (এরপর তরবাবির ভয়েই) তারা নিরস্ত্র হবে।' [১৪]
এই আয়াতটি বেশ কয়েকভাবে প্রমাণ পেশ করে-
ক/
আয়াতে উল্লেখিত 'চুক্তিভঙ্গ' করাটাই যুদ্ধ অপরিহার্য করে তুলতে পারে। সাথে সাথে এ আয়াতে আল্লাহ طعن في الدين বা 'দ্বীন নিয়ে কটূক্তির কথাও বলেছেন, কারণ এটি কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অপরিহার্য করে তোলার সবচেয়ে শক্তিশালী দাবি। অথবা আল্লাহ তাআলা যিম্মিদের অবস্থা স্পষ্ট করার জন্য এবং যুদ্ধের কারণ আরও সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরার জন্য طعن في الدين বা 'দ্বীন নিয়ে কটূক্তির' কথা বলেছেন। কিংবা তিনি যুদ্ধ অপরিহার্য করেছেন নিম্নোক্ত আয়াত দুটি দ্বারা,
)فَقَاتِلُوا أَئِمَّةَ الْكُفْرِ ( অর্থাৎ 'তোমরা কাফেরদের নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো।'
فَقَاتِلُوا أَبِيَّةَ الْكُفْرِ 'তা হলে কুফরির পতাকাবাহীদের সাথে যুদ্ধ করো।'
أَلَا تُقَاتِلُونَ قَوْمًا نَكَثُوا أَيْمَانَهُمْ وَهَمُوا بِإِخْرَاجِ الرَّسُولِ
'তোমরা কি লড়াই করবে না এমন লোকদের সাথে যারা নিজেদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে এসেছে এবং যারা রাসূলকে দেশ থেকে বের করে দেবার দুরভিসন্ধি করেছিল আর বাড়াবাড়ি সূচনা তারাই করেছিল? '[১৫]
তবে طعن في الدين বা 'দ্বীন নিয়ে কটূক্তি' অংশটুকু এ কথা বোঝানোর জন্য এনেছেন যে, طعن في الدين বা 'দ্বীন নিয়ে কটূক্তি যুদ্ধকে অপরিহার্য করে। কেননা যারা নিছক অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে তাদেরকেও নিরাপত্তা দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু যারা দ্বীন নিয়ে আঘাত করবে তাদের সাথে যুদ্ধ সুনির্ধারিত। আর এটা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ-তিনি ওই সব ব্যক্তিদের রক্ত মূল্যহীন ঘোষণা করতেন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিত এবং দ্বীন নিয়ে কটূক্তি করত।
কেউ যদি আপত্তি করে, আয়াত থেকে তো বোঝা যায়, যে ব্যক্তি দ্বীনকে নিয়ে কটূক্তি করবে এবং একই সাথে চুক্তি ভঙ্গ করবে তার বিরুদ্ধে কিতাল অপরিহার্য। কিন্তু যে ব্যক্তি শুধু আমাদের দ্বীনকে কটূক্তি করবে, আয়াতের অর্থ মোতাবেক তো তার বিরুদ্ধে কিতাল অপরিহার্য হয় না; কেননা আল্লাহ তাআলা কিতালের হুকুমকে দুটো অবস্থার সাথে সংযুক্ত করেছেন। সুতরাং দুটো অবস্থার মাত্র একটা পাওয়া গেলে তো কิตালের হুকুম আসবে না।
আমরা অভিযোগের জবাবে বলব, কোনো হুকুমকে এমন সব বৈশিষ্ট্যের সাথেই কেবল যুক্ত করা হয়, হুকুম অপরিহার্য হওয়ার ক্ষেত্রে যাদের প্রত্যেকের নিজস্ব একটি প্রভাব রয়েছে। কেননা যদি প্রভাব না-ই থাকে, তা হলে কোনো হুকুমকে সেই বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পৃক্ত করা সংগত হতে পারে না। কখনও কখনও (যে-সমস্ত বৈশিষ্ট্যের সাথে বিধানকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে), সে-সমস্ত বৈশিষ্ট্যের প্রত্যেকটিই হুকুম অবধারিত করার ক্ষেত্রে স্বতন্ত্রভাবে সম্পূর্ণ প্রভাব রাখে। যেমন বলা হলো—'যায়িদকে যিনা ও ইরতিদাদের কারণে হত্যা করা হবে।' (এখানে যায়িদকে হত্যার কারণ দুটো— যিনা এবং ইরতিদাদ। দুটি কারণই স্বতন্ত্রভাবে মৃত্যুদণ্ড অপরিহার্য করে। আবার দুটো কারণের একটিও যদি পাওয়া যায়, তা হলেও কতল অবধারিত হবে।)
কখনও কখনও শাস্তি একত্রে সমগ্র বৈশিষ্ট্যের ওপর আরোপিত হয়। প্রতিটি বৈশিষ্ট্য আলাদাভাবে হুকুমের ওপর আংশিক প্রভাব বিস্তার করে। যেমন কুরআনের আয়াত- وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا 'তারা আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্যকে ডাকে না, আল্লাহ যে প্রাণকে হারাম করেছেন কোনো সংগত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। এসব যে-ই করে সে তার গোনাহের শাস্তি ভোগ করবে।' [১৬]
আবার কখনও কখনও ওই সকল বৈশিষ্ট্য একটার সাথে অপরটা ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত থাকে। (অর্থাৎ উভয় গুণ বা অবস্থার একটা অস্তিত্বে আসলে দ্বিতীয়টা অনিবার্যভাবে অস্তিত্বে আসে, তেমনি দ্বিতীয়টা অস্তিত্বে আসলে প্রথমটাও অনিবার্যভাবে অস্তিত্বে আসে।) যদি এমন দুটো বৈশিষ্ট্য বা অবস্থার প্রত্যেকটাকে আলাদা করা হয় তা হলে প্রত্যেকটাই স্বতন্ত্র অথবা সম্মিলিতভাবে হুকুমের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এ ধরনের ক্ষেত্রে একটা বৈশিষ্ট্যই যেহেতু হুকুমের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম সেহেতু দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য বা অবস্থাকে উল্লেখ করা হয় মূলত বাক্যকে আরও মজবুত ও স্পষ্ট করার জন্য। যেমন বলা হয়- (كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ) (তারা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের সাথে কুফরি করেছে) এবং عصى الله ورسوله (সে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের অবাধ্য হলো) অর্থাৎ কেউ কাফের হওয়ার জন্য যেমন শুধু আল্লাহর সাথে কুফরই যথেষ্ট, তেমনি রাসূলের সাথে কুফরি করাও তার কাফের হওয়ার জন্য যথেষ্ট। আবার উভয়টা একসাথে কেউ করলে সেও (একই রকম) কাফের হয়ে যাবে।
আবার কখনও কখনও দুটো বৈশিষ্ট্যের একটি অপরটিকে অপরিহার্য করলেও দ্বিতীয়টা প্রথমটাকে অপরিহার্য করে না। যেমন আল্লাহ তাআলার বাণী: إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ حَقٍ 'যারা আল্লাহর আয়াতগুলোর সাথে কুফরি করে এবং অন্যায়ভাবে নবীদেরকে হত্যা করে...।[১৭]
সুতরাং উদাহরণে বর্ণিত চার প্রকারের প্রত্যেকটা বৈশিষ্ট্য বা অবস্থার মধ্যেই দলিল আছে যে, প্রত্যেকটা বৈশিষ্ট্যই হুকুমের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। তেমনিভাবে আয়াতে বর্ণিত طعن في الدين অর্থাৎ দ্বীনকে নিয়ে হেয় ও কটূক্তি করা এবং نقض العهد অর্থাৎ চুক্তিভঙ্গ করা প্রত্যেকটাই পরবর্তী হুকুমের মধ্যে সমানভাবে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম।
তবে যাদের অপত্তি করার, তারা সর্বোচ্চ এতটুকু আপত্তি করতে পারে যে, চুক্তি ভঙ্গকরণ মূলত চুক্তি-ভঙ্গকারীর সাথে কিতালকে বৈধ করে আর এর সাথে দ্বীন ও শরিয়তকে হেয়-কটূক্তি করলে এটা জিহাদ-কিতালকে স্বতন্ত্রভাবে ওয়াজিব করে না তবে কিতালের প্রতি গুরুত্ব বৃদ্ধি করে।
জবাবে আমরা বলব-যাদের সাথে আমাদের কোনো মুয়াহাদা বা নিরাপত্তা-চুক্তি নেই তারা যদি দ্বীন ও শরীয়তকে হেয়-কটূক্তি করে, তা হলে তাদের সাথে যুদ্ধ করা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। তা হলে যাদের সাথে আমাদের নিরাপত্তা-চুক্তি আছে এবং তারা শরীয়ত ও ইসলামের প্রতি দুর্বলতা, হীনতা প্রদর্শন করতে সম্মতি প্রকাশ করেছে বরং করতে বাধ্য, তারা যদি শরীয়তকে হেয়-কটূক্তি করে, তা হলে তাদের বিরুদ্ধে কিতাল করা তো আরও বেশি অপরিহার্য।
খ/
কোনো যিম্মি প্রকাশ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করল বা আল্লাহকে কটূক্তি করল অথবা ইসলামের নামে নিন্দা করল, সে মূলত নিজের নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে ফেলল এবং আমাদের দ্বীনকে আঘাত করল। কেননা মুসলিমদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই যে, এমন ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে হবে এবং শায়েস্তা করতে হবে। তা হলে বুঝা গেল, তাকে তো তার কটূক্তিকে মেনে নিয়ে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়নি। কুরআনের সুস্পষ্ট ভাষ্যমতে তাকে হত্যা করা ওয়াজিব। এই দলিলটি বেশ শক্তিশালী ও সুন্দর। কেননা স্পষ্ট হয়েছে যে, সে চুক্তি ভঙ্গ করেছে এবং ইসলামকে কটূক্তি করেছে। আর যে ব্যক্তি চুক্তি ভঙ্গ করল এবং দ্বীনকে আঘাত করল কুরআন তাকে হত্যা করা আবশ্যক বলে।
গ/
দ্বীনকে নিয়ে কটূক্তি করার অপরাধে আল্লাহ তাআলা কটূক্তিকারীদেরকে 'কুফুরির নেতা বা পতকাবাহী' বলে আখ্যায়িত করেছেন। এবং পরবর্তী অংশে নেতা হওয়ার ফলাফল বলেছেন এভাবে,
إِنَّهُمْ لَا أَيْمَانَ لَهُمْ
'নিঃসন্দেহে তাদের জন্য কোনো চুক্তিই অবশিষ্ট থাকবে না।'
অতএব নিরাপত্তা না থাকার বিধানের মাঝে ইসলামের নামে সকল কটূক্তিকারী ও ছিদ্রান্বেষণকারী অন্তর্ভুক্ত।
'ইমামুল কুফর' বা কাফেরের নেতা বলা হয় তাকেই, যে মানুষদেরকে কুফরের দিকে ডাকে। আর সে কুফরির নেতা হয়েছে আমাদের দ্বীনকে কটূক্তি করে ও মানুষকে কুফরের দিকে আহ্বানের মাধ্যমে। আর নেতাদের কাজই তো এটা। সুতরাং যারাই আমাদের দ্বীনকে নিয়ে কটূক্তি করবে তারাই কাফেরদের ইমাম বা নেতা বলে বিবেচিত হবে। ফলে তাদের সাথে যুদ্ধ করাও আবশ্যক হবে। আল্লাহ যেমন বলেন-
فَقَاتِلُوا أَبِمَّةَ الْكُفْرِ 'তোমরা কুফরের নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো।[১৮]
ঘ/ আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَلَا تُقَاتِلُونَ قَوْمًا نَكَثُوا أَيْمَانَهُمْ وَهَمُوا بِإِخْرَاجِ الرَّسُولِ وَهُمْ بَدَءُوكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ
'তোমরা ওই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কেন লড়াই করছ না, যারা তোমাদের সাথে কৃত চুক্তিনামা ভঙ্গ করেছে ও রাসূলকে বের করে দেওয়ার ফন্দি এঁটেছে এবং তারাই তোমাদের সাথে প্রথম যুদ্ধ শুরু করেছে।[১৯]
রাসূলকে বের করে দেওয়ার ফন্দি আটাকে আল্লাহ তাআলা যুদ্ধের উস্কানি হিসেবে দেখিয়েছেন; কেননা এই ফন্দি আঁটাও রাসূলকে এক প্রকার কষ্ট দেওয়া। তা হলে রাসূলকে গালমন্দ করা তো তাঁকে বের করে দেওয়ার চেয়েও বেশি জঘন্য ও কষ্টদায়ক ব্যাপার। কারণ যারা পূর্বে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বের করে দেবার পরিকল্পনা করেছিল, মক্কা বিজয়ের দিন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, কিন্তু যারা তার কটূক্তি করেছিল, তিনি তাদেরকে ক্ষমা করেননি।
৬/ আল্লাহ তাআলা বলেন,
قَاتِلُوهُمْ يُعَذِّبْهُمُ اللَّهُ بِأَيْدِيكُمْ وَيُخْزِهِمْ وَيَنْصُرْكُمْ عَلَيْهِمْ وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ 'তোমরা কি লড়াই করবে না এমন লোকদের সাথে, যারা নিজেদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে এসেছে এবং যারা রাসূলকে দেশ থেকে বের করে দেবার দুরভিসন্ধি করেছিল আর বাড়াবাড়ি সূচনা তারাই করেছিল?'[২০]
আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে সে-সকল লোকদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিচ্ছেন, যারা চুক্তি ভঙ্গ করেছে এবং দ্বীনকে নিয়ে কটূক্তি করেছে। অপরদিকে আল্লাহ মুমিনদেরকে নিশ্চয়তা দিচ্ছেন যে, তারা যদি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে তা হলে আল্লাহ তাআলা তাদের হাত দিয়েই কাফেরদেরকে শাস্তি দিবেন, লাঞ্ছিত করবেন, তাদেরকে কাফেরদের বিরুদ্ধে সাহায্য করবেন; আর কাফেরদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে মুমিনগণ যে ব্যথিত হয়েছে—তাদের অন্তরকে প্রশমিত করবেন, তাদের ক্ষোভ নিবারিত করবেন। উপরিউক্ত আয়াত প্রমাণ করে যে, চুক্তি-ভঙ্গকারী ও দ্বীনকে নিয়ে কটূক্তিকারী এসব শাস্তির উপযুক্ত হবে। আর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দকারীও নিশ্চয়ই চুক্তি-ভঙ্গকারী ও দ্বীনকে নিয়ে কটূক্তিকারী হিসেবে হত্যার উপযুক্ত।
চ/
আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَلَا تُقَاتِلُونَ قَوْمًا نَّكَثُوا أَيْمَانَهُمْ وَهَمُّوا بِإِخْرَاجِ الرَّسُولِ وَهُم بَدَءُوكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ أَتَخْشَوْنَهُمْ فَاللَّهُ أَحَقُّ أَن تَخْشَوْهُ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ قَاتِلُوهُمْ يُعَذِّبْهُمُ اللَّهُ بِأَيْدِيكُمْ وَيُخْزِهِمْ وَيَنصُرُكُمْ عَلَيْهِمْ وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُّؤْمِنِينَ )
'তাদের সাথে লড়াই করো, আল্লাহ তোমাদের হাতে তাদের শাস্তি দেবেন, তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করবেন, তাদের মোকাবিলায় তোমাদের সাহায্য করবেন এবং অনেক মুমিনের অন্তর শীতল করে দেবেন। আর তাদের অন্তরের জ্বালা জুড়িয়ে দেবেন। এবং যাকে ইচ্ছা তাওবা করার তাওফীকও দান করবেন। আল্লাহ সবকিছু জানেন এবং তিনি মহাজ্ঞানী।'[২১]
আল্লাহ তাআলা কেন লড়াইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন, এ আয়াত সেই উদ্দেশ্য যেন বলে দিচ্ছে। আর তা হলো কাফেরদের চুক্তি ভঙ্গ-করা ও দ্বীন নিয়ে কটূক্তি করার ফলে মুমিনদের অন্তর যে কষ্ট পেয়েছে, সে কষ্ট উপশম করা। কারণ যে ব্যক্তি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করল, সে মুমিনদেরকে এ পরিমাণ ক্ষেপিয়ে তুলল এবং এ পরিমাণ কষ্ট দিল, মুসলিমদের রক্ত ঝরালেও এবং তাদের ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নিলেও তারা কখনও এতটা কষ্ট ও ক্ষোভ অনুভব করবে না। কেননা এ রাগ ও ক্ষোভ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসায়। [২২]
• চতুর্থ দলিল
أَلَمْ يَعْلَمُوا أَنَّهُ مَنْ يُحَادِدِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَأَنَّ لَهُ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدًا فِيهَا ذَلِكَ الْخِزْى الْعَظِيمُ
তারা কি জানে না যে, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে শত্রুতা করবে, তার জন্য জাহান্নামের আগুন, যেখানে সে চিরকাল থাকবে আর সেটাই বিরাট লাঞ্ছনা। [২৩]
এ আয়াত প্রমাণ করে যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দেওয়া মানে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে শত্রুতা করা। কেননা আল্লাহ তাআলা আয়াতটিকে এনেছেন এই আয়াতের পরে-
وَمِنْهُمُ الَّذِينَ يُؤْذُونَ النَّبِيَّ
তাদের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা রাসূলকে কষ্ট দেয়।
এই আয়াতের নাযিলকালীন প্রেক্ষাপট ছিল-নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষ থেকে ওই সকল মুনাফিক ও মুশরিকদের প্রতি ভর্ৎসনা করা, যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ, কটূক্তি বা তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্বক কষ্ট দিত।
পঞ্চম দলিল
إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُهِينًا
'যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয় আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তাদেরকে অভিশপ্ত বানিয়েছেন। [২৪]
যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, এ আয়াত অনুযায়ী তাদেরকে হত্যা করা ওয়াজিব। আর আমরা তো তাদের সাথে নিরাপত্তা-চুক্তি এই শর্তে করিনি যে, তারা আল্লাহ ও তার রাসূলকে কষ্ট দিতে পারবে।
বিষয়টি আরও বেশি স্পষ্ট হয় এই হাদীসটির সুস্পষ্ট বর্ণনা দ্বারা—
مَنْ لِكَعْبِ بْنِ الأَشْرَفِ فَإِنَّهُ قَدْ آذَى اللهَ وَرَسُولَهُ
'কে আছ কাব ইবনে আশরাফের (শায়েস্তার) জন্য? কেননা সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে।'[২২]
টিকাঃ
[১১] সূরা তাওবা, ৯: ২৯
[১২] সূরা তাওবা, ৯:৮-১২
[১৩] সূরা তাওবা, ৯:৮
[১৪] সূরা তাওবা, ৯: ১২
[১৫] সূরা তাওবা, ৯: ১৩
[১৬] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৮
[১৭] সূরা আলি ইমরান, ৩: ২১
[১৮] সূরা তাওবা, ৯: ১২
[১৯] সূরা তাওবা, ৯: ১৩
[২০] সূরা তাওবা, ৯ : ১৪
[২১] সূরা তাওবা, ৯ : ১৪-১৫
[২২] কটূক্তিকারীকে হত্যা করা ছাড়া মুমিনের এ রাগ প্রশমিত হয় না।
[২৩] সূরা তাওবা, ৯: ৬৩
[২৪] সূরা আহযাব, ৩৩: ৫৭
[২৫] বুখারী, আস-সহীহ : ৩৮১১, মুসলিম, আস-সহীহ : ৪৭৬৫। সামনে এ হাদীসের বিস্তারিত আলোচনা আসছে, ইন-শা-আল্লাহ।
📄 শাতিম যদি ইসলামের অনুসারী হয়
আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে কটূক্তিকারী যদি মুয়াহিদ বা চুক্তিবদ্ধ না হয়ে ইসলামের অনুসারী হয়, তা হলে তাকে হত্যার অসংখ্য দলিল তো আছেই, সাথে সাথে মুসলিমদের ইজমাও রয়েছে।
• প্রথম দলিল আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمِنْهُمُ الَّذِينَ يُؤْذُونَ النَّبِيَّ وَيَقُولُونَ هُوَ أُذُنٌ ..... وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ رَسُولَ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
'তাদের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে, যারা নবীকে কষ্ট দেয় আর বলে, সে সব শোনে...! যারা আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেয় তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।' তারপর আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَلَمْ يَعْلَمُوا أَنَّهُ مَنْ يُحَادِدِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَأَنَّ لَهُ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدًا فِيهَا ذَلِكَ الْخِزْى الْعَظِيمُ
'তারা কি জানে না, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে বিদ্বেষ-পোষণ করবে, তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম। সেখানে সে অবস্থান করবে চিরকাল। এটা তো মহা লাঞ্ছনা।' [২৬]
উপরিউক্ত আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠল যে, আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেওয়ার মানে হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে বিরুদ্ধাচরণ করা। কেননা إيذاء (কষ্ট দেওয়া)-র পরিণাম বা দাবি হিসাবেই আল্লাহ পরবর্তীকালে ১১২৩ (বিরুদ্ধাচরণ করা) শব্দ এনেছেন। সুতরাং আল্লাহকে কষ্ট দেওয়া অবশ্যই তার বিরুদ্ধাচরণের শামিল। সুতরাং এখান থেকে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া ও তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করা—উভয়টিই কুফরি। কেননা আল্লাহ তাআলা (এখানে) জানিয়েছেন, যে ব্যক্তি রাসূলকে কষ্ট দিবে এবং তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করবে সে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে; বরং রাসূলের বিরুদ্ধাচরণের মাঝে তো তাঁর সাথে শত্রুতা করা ও যুদ্ধ ঘোষণার অর্থও নিহিত রয়েছে। আর রাসূলের সাথে শত্রুতা হলো কুফর এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নামান্তর। তাই রাসূলকে কষ্টদানকারী অভিশপ্ত ব্যক্তি জঘন্য কাফের, আল্লাহর দুশমন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী।
হাদীসে আছে, এক ব্যক্তি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করত, ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, 'কে আছে এমন—আমার হয়ে আমার শত্রুর জন্য যথেষ্ট হবে?'[২৭]
আল্লাহ তাআলা বলেন, لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ
'তোমরা কখনেও এমন দেখতে পাবে না যে, যারা আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান পোষণ করে তারা এমন লোকদের ভালোবাসছে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করেছে।[২৮]
আয়াতের ভাষ্যানুযায়ী, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে বিদ্বেষকারীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনকারী ব্যক্তিই মুমিন নয়। তা হলে স্বয়ং বিরোধী কী করে মুমিন হয়?
বলা হয়, আয়াতটি নাযিলকালীন প্রেক্ষাপট হলো—একবার আবু কুহাফা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালি দিয়েছিল। ফলে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে হত্যা করতে চাইলেন।[২৯]
সুতরাং বুঝা গেল, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি বিদ্বেষ- পোষণকারী হত্যাযোগ্য কাফের।
• দ্বিতীয় দলিল
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَحْذَرُ الْمُنَافِقُونَ أَنْ تُنَزَّلَ عَلَيْهِمْ سُورَةٌ تُنَبِّئُهُمْ بِمَا فِي قُلُوبِهِمْ قُلِ اسْتَهْزِئُوا إِنَّ اللَّهَ مُخْرِجُ مَا تَحْذَرُونَ * وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ * لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ
এ মুনাফিকরা ভয় করেছে, মুসলমানদের ওপর এমন একটি সূরা নাযিল হয়ে যায় কিনা, যা তাদের মনের গোপন কথা প্রকাশ করে দেবে। হে নবী! তাদের বলে দাও, “ঠাট্টা করতেই থাকো, তবে তোমরা যে জিনিসটির প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয় করছে, আল্লাহ তা প্রকাশ করে দেবেন।” যদি তাদের জিজ্ঞেস করো, তোমারা কী কথা বলছিলে? তা হলে তারা ঝটপট বলে দেবে, আমরা তো হাসি-তামাশা ও পরিহাস করছিলাম। তাদের বলো, তোমাদের হাসি-তামাশা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রাসূলের সাথে ছিল? এখন আর ওযর পেশ করো না। তোমরা ঈমান আনার পর কুফরি করেছ।[৩০]
এই আয়াত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আল্লাহ তাআলাকে, তার আয়াতসমূহকে কিংবা তার রাসূলকে নিয়ে বিদ্রুপ করা সুস্পষ্ট কুফরি। এখান থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে বিদ্রুপকারী-চাই সত্যি সত্যি বিদ্রুপ করুক কিংবা কটূক্তির উদ্দেশ্য ছাড়াই বিদ্রুপ করুক-সে সুস্পষ্ট কুফরিতে লিপ্ত।
• তৃতীয় দলিল
আল্লাহ তাআলা বলেন, وَمِنْهُمْ مَنْ يَلْمِرُكَ فِي الصَّدَقَاتِ ‘তাদের মধ্যে কিছু লোক আছে, যারা সাদাকা (বণ্টনের) ব্যাপারে আপনাকে দোষারোপ করে...।’[৩১]
আরবি শব্দের অর্থ হলো দোষারোপ করা ও কলঙ্কলেপন করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন, وَمِنْهُمُ الَّذِينَ يُؤْذُونَ النَّبِيَّ ‘তাদের মধ্যে কিছু লোক রয়েছে, যারা নবীকে কষ্ট দেয়...।’[৩২]
এ আয়াত থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, যারাই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটাক্ষ করবে, কষ্ট দিবে তারা ‘তাদের’ই অন্তর্ভুক্ত হবে। যেহেতু আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিচ্ছেন, যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করে বা কষ্ট দেয় তারা মুনাফিকদের অন্তর্ভুক্ত, সেহেতু প্রমাণ হয়ে গেল যে, এই সব কাজ সত্যিই নিফাক।
• চতুর্থ দলিল
আল্লাহ তাআলা বলেন, فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ‘না, হে মুহাম্মদ! তোমার রবের কসম! এরা কখনও মুমিন হতে পারে না-যতক্ষণ এদের পারস্পরিক মতবিরোধের ক্ষেত্রে এরা তোমাকে ফয়সালাকারী হিসেবে মেনে না নেবে, তারপর তুমি যা ফয়সালা করবে তার ব্যাপারে নিজেদের মনের মধ্যে কোনো প্রকার কুণ্ঠা ও দ্বিধার স্থান দেবে না, বরং সর্বান্তকরণে মেনে নেবে।'০০।
আল্লাহ স্বয়ং নিজের কসম করে বলছেন, তারা মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিচারক না মানে এবং যতক্ষণ না তারা রাসূলের ফয়সালায় নিজেদের মাঝে কোনো সংকীর্ণতা অনুভব না করে বরং যতক্ষণ না তারা বাহিরে ও ভিতরে রাসূলের ফয়সালার সামনে নিজেকে সপে দেয়।
উপরিউক্ত আয়াতটির পূর্বে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنْكَ صُدُودًا
'হে নবী! তুমি কি তাদেরকে দেখোনি, যারা এই মর্মে দাবি করে চলেছে যে, তারা ঈমান এনেছে সেই কিতাবের প্রতি যা তোমার ওপর নাযিল করা হয়েছে এবং সেই সব কিতাবের প্রতি যেগুলো তোমার পূর্বে নাযিল করা হয়েছিল; কিন্তু তারা নিজেদের বিষয়সমূহ ফয়সালা করার জন্য তাগুতের দিকে ফিরতে চায়, অথচ তাদেরকে তাগুত অস্বীকার করার হুকুম দেওয়া হয়েছিল? শয়তান চায় তাদেরকে ভ্রষ্ট করে বহু দূর নিতে চায়। আর যখন তাদেরকে বলা হয়, এসো সেই জিনিসের দিকে, যা আল্লাহ নাযিল করেছেন এবং এসো রাসূলের দিকে, তখন তোমরা দেখতে পাও ওই সব মুনাফিকরা তোমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। [৩৪]
আল্লাহ তাআলা এখানে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যে ব্যক্তিকে কিতাবুল্লাহ ও রাসূলুল্লাহর কাছে বিচার আনার আহ্বান করা হয়, তারপরও সে রাসূলুল্লাহ থেকে ফিরে যায় সে মুনাফিক। এখানে মহামহিম আল্লাহর আরেকটি বাণী উল্লেখ করা যায়- إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا
'মুমিনদের কাজই হচ্ছে, যখন তাদেরকে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ডাকা হয়, যাতে রাসূল তাদের মোকদ্দমার ফয়সালা করেন, তখন তারা বলেন, আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম।' [৩৫]
সুতরাং যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য না করে তার বিচার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়-সে মুমিন নয়, মুনাফিক। কেননা মুমিন তো ওই ব্যক্তি যে বলে আমরা শুনলাম এবং মানলাম।
যদি নিছক রাসূলের হুকুম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণে মুনাফিক হতে হয় তা হলে রাসূলের মানহানি করা এবং তাকে কটূক্তি করার হুকুম কী হতে পারে?
• পঞ্চম দলিল
আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُهِينًا
যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয় আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশাপ দেন আর তাদের জন্য রয়েছে অপমানকর শাস্তি। [৩৬]
(এই আয়াতে) আল্লাহ তাআলা নিজের 'কষ্ট' ও রাসূলের কষ্ট একই সাথে সম্পৃক্ত করেছেন, যেভাবে আল্লাহ (অন্যত্র) রাসূলের আনুগত্যের সাথে নিজের আনুগত্যকে সম্পৃক্ত করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দিল, সে আল্লাহকেই কষ্ট দিল। এ বিষয়ে রাসূলের সুস্পষ্ট বর্ণনাও আছে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলাকে কষ্ট দিল সে কাফের এবং তার রক্ত হালাল।
আল্লাহকে ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য—(এসব দুই দুইকে) আল্লাহ একই জিনিস বলে গণ্য করেছেন। সুতরাং আরও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, রাসূলকে কষ্ট দেওয়া মানে আল্লাহকে কষ্ট দেওয়া। তেমনি আল্লাহ এসবকেও একই বিষয় বলেছেন—
আল্লাহর সাথে বৈরিতা ও রাসূলের সাথে বৈরিতা,
আল্লাহর সাথে বিরোধ ও রাসূলের সাথে বিরোধ,
আল্লাহকে কষ্টদান আর রাসূলকে কষ্টদান,। আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হওয়া আর রাসূলের অবাধ্য হওয়া।
এখানে আল্লাহর হক আর রাসূলের হক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত থাকবার বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কেননা আল্লাহর পক্ষাবলম্বন করা আর রাসূলের পক্ষাবলম্বন করা একই। সুতরাং যে ব্যক্তি রাসূলকে কষ্ট দিল, সে আল্লাহকেই কষ্ট দিল। আর যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল সে আল্লাহ তাআলারই আনুগত্য করল। কেননা রাসূল হলেন আল্লাহ তাআলা ও মাখলুকের মাঝে মেলবন্ধনকারী। কারও জন্য রাসূলের পথ ছাড়া ভিন্ন কোনো পথ নেই। আল্লাহ তাআলা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর আদেশ-নিষেধ, সংবাদ-প্রদান ও বিধান বর্ণনার ক্ষেত্রে নিজের প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছেন। সুতরাং এ-সমস্ত ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের মাঝে পার্থক্য করা ঠিক হবে না।
অথচ কুরআনে আল্লাহ ও রাসূলগণকে কষ্ট দেওয়া আর অন্যান্য মুমিন নারী-পুরুষকে কষ্ট দেওয়া এক কথা নয়। আল্লাহ তাআলা মুমিন নর-নারীকে কষ্ট দেওয়াটাকে বুহতান বা অন্যায় অপবাদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং ভয়াবহ গুনাহের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, তাকে তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং তার জন্য লাঞ্ছনাকর শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।
আমরা তো জানি যে, মুমিনদেরকে কষ্ট দেওয়া কবীরাহ গুনাহ, এর শাস্তি কখনও কখনও বেত্রাঘাত হয়ে থাকে। আর এ কবিরা গুনাহের চেয়ে বড় গুনাহ হলো কুফরি ও হত্যা। (সুতরাং আল্লাহ ও রাসূলকে কষ্ট দেওয়াটা আরও গুরুতর হওয়ায় তা কুফরি হবে।)
তা ছাড়া আল্লাহ তাআলা তাদের ওপরে লানত করেছেন। লানতের অর্থ হলো আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত করা। আর দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর রহমত থেকে কাফের ছাড়া কাউকে বিতাড়িত করা হয় না। সুতরাং এমন অভিশপ্তের রক্তের কোনো মূল্য নেই, বরং তার রক্ত বৈধ। কেননা কোনো ব্যক্তির রক্তকে নিরাপত্তা- প্রদান করা বা হারাম করা আল্লাহর বড় রহমত ও অনুগ্রহের অন্তর্ভুক্ত। এই হুকুমের সমর্থনে আরেকটি আয়াত আছে-
مَلْعُونِينَ أَيْنَمَا ثُقِفُوا أُخِذُوا وَقُتِلُوا تَقْتِيلًا
‘(তারা) অভিশপ্ত। তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে পাকড়াও করা হবে এবং দৃষ্টান্তমূলকভাবে হত্যা করা হবে।[৩৭]
এই আয়াতের ভাষ্য উল্লিখিত হুকুমটিকে আরও স্পষ্ট করে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে যাদেরকেই অভিসম্পাত করেছেন তারা হয়তো কাফের, নয়তো তাদের রক্ত মূল্যহীন। তবে কেউ যদি আপত্তি করে এই আয়াতের মাধ্যমে তা রদ করে দেবার কসরত করে—
إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
যারা সতী-সাধ্বী, সরলমনা মুমিন মহিলাদের প্রতি অপবাদ দেয় তারা দুনিয়ায় ও আখেরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। [৩৮]
এই আয়াতে অপবাদদাতাকে দুনিয়া ও আখিরাতে অভিসম্পাত করা হলেও অপবাদ দেওয়া কুফরি নয়।
এ আপত্তির জবাব কয়েকভাবে হতে পারে।
✓ প্রথম জবাব
এই আয়াতটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। এমনটাই বর্ণনা করেছেন ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-সহ অন্যান্য মুফাসসিরগণ। আর আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে অপবাদ দেওয়ার মানে হলো আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দেওয়া ও কলঙ্কিত করা। কেননা স্ত্রী ব্যভিচার করবে বা স্ত্রীকে ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়া হবে, এটা নিশ্চয় স্বামীর জন্য কষ্টদায়ক।
এ জন্যই ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ মত দিয়েছেন যে, যদি কেউ কোনো ‘গাইরে মুহসিন’ নারী যেমন বাদী বা আহলে কিতাব যিম্মিকে অপবাদ দেয়, আর সেই নারীর মুসলিম বা স্বাধীন স্বামী থাকে অথবা মুসলিম বা স্বাধীন কোনো সন্তান থাকে, তা হলে এমন অপবাদদানকারীর ওপর ‘হদ্দে কযফ' বা মিথ্যা অপবাদের সাজা প্রয়োগ করা হবে। কেননা এমন অপবাদ সেই স্বামী বা সন্তানকেও আঘাত করে।
সুতরাং এই আয়াতটি শুধুমাত্র ওই সব ব্যক্তির জন্যই প্রযোজ্য, যারা উম্মাহাতুল মুমিনিন তথা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্ত্রীদের ওপর মিথ্যা অপবাদ দেয়। কেননা যে ব্যক্তি নবীজির স্ত্রীদেরকে অপবাদ দেয়, সে মূলত নবীজির দোষ বলতে চায়। নিঃসন্দেহে এমন ব্যক্তি মুনাফিক।
এ ছাড়া কেউ যদি কোনো মুসলিম নারীকে অপবাদ দেয়, তা হলে সে হবে ফাসিক। কেননা (এ ব্যক্তির ক্ষেত্রে) আল্লাহ তাআলা বলেন, ( او يتوب )কিংবা যদি সে তাওবা করে) অর্থাৎ তাওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করে দিবেন।
(উপরিউক্ত ব্যাখ্যা অনুযায়ী) আয়াতে ('সতী' নারী বোঝাতে) 'মুহসানাত' শব্দের শুরুতে যে আলিফ-লাম আছে; সেটা নির্দিষ্টতা বোঝানোর জন্য। ফলে নির্দিষ্ট কতিপয় সতী নারীই এখানে উদ্দেশ্য। এ প্রকার আলিফ-লামকে 'আল-লামু লিল আহদিয়া' বলা হয়। আর তাঁরা হলেন নবীজির স্ত্রীগণ। কেননা আয়াতের মধ্যে আলোচনা চলছিল ইফক। [৩৯] এর ঘটনা নিয়ে। অথবা আয়াতের মধ্যে মুহসানাত শব্দটি [৪০] ব্যাপক অর্থবোধক হলেও নাযিলকালীন প্রেক্ষাপটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আয়াতটি প্রেক্ষাপটের সাথে সীমাবদ্ধকরণের শক্তিশালী দলিল আছে। কেননা নবীপত্নীগণের ঈমান স্বীকৃতি-প্রাপ্ত; তারা মুমিনদের মা এবং দুনিয়া ও আখিরাতে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্ত্রী। তা ছাড়া আল্লাহ তাআলা (উক্ত আয়াতের শেষাংশে) বলেন,
وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ
তাদের মধ্যে যে অপবাদ দেওয়ায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে, তার জন্যে রয়েছে বিরাট শাস্তি। [৪১]
আয়াতটি থেকে জানা গেল, যে ব্যক্তি উম্মুল মুমিনীনদেরকে অপবাদ দেয়, সে মূলত নবীজির কটূক্তি করে এবং গুরুতর অপবাদের ভূমিকা পালন করে। এটি ছিল ইবনে উবাইয়ের বৈশিষ্ট। সুতরাং উম্মুল মুমিনীনদেরকে অপবাদ দেওয়ার উদ্দেশ্য যদি হয় নবীজিকে কষ্ট দেওয়া, তবে তা এমন নেফাক যা অপবাদদানকারীর রক্ত প্রবাহকে হালাল করে দেয়। 'উম্মুল মুমিনীনগণ আখিরাতেও নবীজির স্ত্রী হিসেবে থাকবেন'-
এটা জানার পরও যদি কেউ তাদেরকে অপবাদ দিয়ে কষ্ট দেয় তা হলে সে মুনাফিক, তার রক্ত হালাল। কেননা কোনো নবীর স্ত্রী কখনোই ব্যভিচার করেননি।
এ জন্যই বুখারী ও মুসলিমের এক হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ يَعْذِرُنِي مِنْ رَجُلٍ قَدْ بَلَغَ أَذَاهُ فِي أَهْلِ بَيْتِي فَوَاللَّهِ مَا عَلِمْتُ عَلَى أَهْلِي إِلَّا خَيْرًا ...
'কে আছে, যে আমাকে এমন ব্যক্তি থেকে চিন্তামুক্ত করবে, যে কিনা আমার পরিবারকে পর্যন্ত কষ্ট দেয়। আল্লাহর শপথ! আমি আমার পরিবার সম্পর্কে সবকিছু ভালোই জানি।'
এ কথার জবাবে সাদ ইবনে মুআয রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
أَنَا أَعْذِرُكَ مِنْهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنْ كَانَ مِنَ الْأَوْسِ ضَرَبْنَا عُنُقَهُ
'আমি আপনাকে তার বিষয়ে চিন্তামুক্ত করব। যদি সে আউস গোত্রের লোক হয় তা হলে আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিব।'[৪২]
আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদ বিন মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু-কর্তৃক অপরাধীদের গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার অনুমতি-প্রার্থনাকে অস্বীকৃতি জানাননি। আবার এ হত্যার বিধানে মিসতাহ, হাসসান ও হামনাহ কেউই অন্তর্ভুক্ত হবে না, যদিও তারা ইফকের ঘটনায় জড়িত ছিলেন। কেননা তাদের ওপর নিফাকের হুকুম দেওয়া হয়নি, এমনকি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে এ জন্য হত্যাও করেননি, বরং তাদেরকে বেত্রাঘাত করার ঘটনাটাও মতবিরোধপূর্ণ। কেননা তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দিতে চাননি এবং তাদের থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে কষ্ট দেওয়ার আলামতও প্রকাশ পায়নি। তবে মুনাফিক ইবনে উবাইয়ের বিষয়টা ছিল ভিন্ন। তার উদ্দেশই ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দেওয়া।
তা ছাড়া তাদের নিকট বিষয়টা তখনও স্পষ্ট ছিল না যে, দুনিয়াতে যারা নবীজির স্ত্রী, তারাই আখিরাতে তার স্ত্রী হবেন। আর যারা রাসূলের প্রকৃত স্ত্রী তারা ব্যভিচার করবে, এটা তাদের বিবেকের কাছেও ছিল অসম্ভব। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ঘটনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে বিরত থেকেছেন।
✓ দ্বিতীয় জবাব
উল্লিখিত আয়াতের হুকুমটি ব্যাপকও হতে পারে। অর্থাৎ হুকুমটি কেবল নবীপত্নীদের সাথেই সীমাবদ্ধ নয় বরং সকল মুসলিম নারীই উক্ত আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। একাধিক রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, সতী-সাধ্বী নারীদেরকে অপবাদ দেওয়া কবিরাহ গুনাহ।[৪৩]
বলা হয়, আয়াতটি নাজিল হয়েছিল মক্কার মুশরিকদের সম্পর্কে।[৪৪] কোনো মুসলিম নারী যখন হিজরত করে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট আসতেন তখন তারা মুমিন নারীদেরকে অপবাদ দিত এবং (অপবাদ দিয়ে) নারীদেরকেও ঈমান-আনয়ন থেকে বিরত রাখত এবং তারা ইসলামকে মানুষের সামনে ঘৃণিত করার জন্য মুমিনদের নিন্দা করত। যেমনটা ইহুদি কবি কাব ইবনে আশরাফ করত।
উপরিউক্ত আয়াতের এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী বলা যায়, যারা এমন কটূক্তি করবে সেও কাফের। রাসূলকে কটূক্তির যে বিধান, এ ব্যক্তির একই বিধান।
আবার এও বলা হয়ে থাকে যে, আয়াতটি সর্বদিক থেকেই ব্যাপক অর্থবোধক। অর্থাৎ আয়াতটি যেভাবে নবীপত্নীদের সাথে সীমাবদ্ধ না হয়ে সমগ্র মুসলিম নারীদের জন্য প্রযোজ্য, তেমনিভাবে (তখনকার) মক্কার অপবাদদানকারী মুশরিকদের সাথে সীমাবদ্ধ না হয়ে যে-কোনো অপবাদদাতার বেলায়ও প্রযোজ্য হবে। তবে পূর্বে যে আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে—'যারা সতী সরল মুমিন নারীদেরকে অপবাদ দিবে তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশাপ দেওয়া হবে আর তাদের জন্য রয়েছে বিরাট আযাব।'[৪৫]
এখানে 'তাদেরকে অভিশাপ করা হবে' বোঝাতে لُعِنُوا ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়েছে, কে অভিশাপ করবে সেটা বলা হয়নি। তাই সম্ভবনা আছে যে, লানতকারী আল্লাহ নাও হতে পারেন, বরং কোনো মাখলুক হবে। অর্থাৎ লানতকারী ফেরেশতা ও মানুষজাতি হওয়ারও সম্ভাবনা আছে। তেমনি এও হতে পারে, লানতকারী আল্লাহ-ই, তবে তিনি সব সময় অপবাদদানকারীদেরকে লানত করেন না। কখনও কখনও তিনি শুধুমাত্র কিছু অপবাদদাতাকে লানত করেন আবার কখনও কখনও মাখলুকও অভিশাপদাতাদেরকে লানত করে।
আল্লাহ তাআলা শুধু ওই সব লোকদেরকেই লানত করেন, যারা দ্বীনকে আক্রমণ করে কথা বলে। 'মাখলুক লানত করে' কথাটির অর্থ হলো একে অপরের জন্য বদদোয়া করে বা একে অপরের ওপর আল্লাহর লানত নাযিল হওয়ার দুআ করে।
মাখলুকের লানত করা মানে যে লানতের বদ দুআ করা, এ ব্যাখ্যাটি স্বামী-স্ত্রীর লিআনের বিধান দ্বারা জোড়ালো হয়। অর্থাৎ কোনো পুরুষ যদি নিজের স্ত্রীকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয় তখন একজন আরেকজনকে লিআন করে। [৪৬]
লানত দ্বারা লানতের বদদুআ এ আয়াত দ্বারাও বোঝা যায়—
فَنَجْعَلْ لَعْنَتَ اللهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ
'চলো, আমরা মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর লানত করি।' [৪৭]
আর অপবাদদানকারীর ওপর বান্দার লানত দেওয়ার মাঝে এগুলোও অন্তর্ভুক্ত যে, অপবাদদানকারীকে বেত্রাঘাত করা হবে, তার সাক্ষ্য-প্রমাণ সর্বদা অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা হবে এবং তাকে ফাসিক হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। কেননা এটাই তার শাস্তি, এর মাধ্যমে তাকে নিরাপত্তা ও গ্রহণযোগ্যতার জায়গা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। অথচ সেই নিরাপত্তা ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল (তার প্রতি) আল্লাহর রহমত। (সুতরাং লানত মানে যে আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত করা, সে অর্থটি এক্ষেত্রে প্রযোজ্য)।
তবে মানুষের অভিশাপ দেওয়া আর দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর অভিশাপ দেওয়া এক নয়। আল্লাহ যাকে দুনিয়া ও আখিরাতে অভিসম্পাত করার কথা জানিয়েছেন, এমন ব্যক্তির ওপর আল্লাহর লানতের মানে হলো তিনি তাকে তার সাহায্যের সমস্ত দিক বন্ধ করে দিয়েছেন, এবং তার রহমত প্রাপ্তির সমস্ত উপায় শেষ করে দিয়েছেন। আমাদের বক্তব্যের সমর্থনে রয়েছে আল্লাহ তাআলার এই বাণী—
وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُهِينًا
'তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন লাঞ্ছনাকর শাস্তি।' [৪৮]
কুরআনের সব জায়গায় 'লাঞ্ছনাকর শাস্তি' কথাটি কাফেরদের ক্ষেত্রে এসেছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلِلْكَافِرِينَ عَذَابٌ مُهِينٌ 'আর কাফেরদের জন্যই রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি। [৪৯]
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَنْ يَعْصِ اللهَ وَرَسُولَهُ وَيَتَعَدَّ حُدُودَهُ يُدْخِلْهُ نَارًا خَالِدًا فِيهَا وَلَهُ عَذَابٌ مُهِينٌ যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করবে এবং তাঁর সীমাসমূহ লঙ্ঘন করবে, তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি। [৫০]
আয়াতটি ওই সকল লোকের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে, যারা ফরয বিধানসমূহ অস্বীকার করেছে এবং লঘু করে দেখে। তবে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি তার জন্য তৈরি করা হয়েছে এখানে সেটা আলোচনা করা হয়নি বরং আযাব ও লাঞ্ছনাকর শাস্তি কেবল কাফেরদের জন্যই প্রস্তুত করা হয়েছে, কেননা জাহান্নামকে তাদের জন্যই তৈরি করা হয়েছে। সেখানে কাফেররাই প্রবেশ করবে এবং সেখান থেকে তারা আর বের হবে না। তবে মুমিনদের মধ্যে যারা কবিরা গুনাহগার, হতে পারে আল্লাহ তাদেরকে মার্জনা করার কারণে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। অথবা হতে পারে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে, কিন্তু কিছুটা বিলম্ব হলেও সেখান থেকে একসময় মুক্তি পাবে।
• ষষ্ঠ দলিল আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ 'তোমরা নিজেদের আওয়াজকে নবীর আওয়াজের ওপর উঁচু করো না।' [৫১]
এ আয়াত প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তাআলা সাহাবায়ে কিরামকে নিষেধ করেছেন, তারা যেন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আওয়াজের ওপর নিজেদের আওয়াজকে উঁচু না করে এবং নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে যেন এমন জোরে কথা না বলে, যেমনভাবে তারা পরস্পরে কথা বলে। কেননা এর দ্বারা ব্যক্তির অজান্তেই তার আমল বরবাদ হয়ে যায়। আর যেসব কাজ সৎকর্ম বরবাদ করে দেয়, সেগুলো পরিহার করা সর্বোচ্চ পর্যায়ের অপরিহার্য। বস্তুত আমল ধ্বংস হয় কেবল কুফরির মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَنْ يَكْفُرْ بِالْإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
'যে ঈমানের সাথে কুফরি করবে, তার আমল বরবাদ হয়ে যাবে, আর আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।।২।
কুফরি ছাড়া অন্য কিছুর মাধ্যমে আমল বরবাদ হয় না। কেননা যে ব্যক্তি মুমিন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে সে অবশ্যই জান্নাতে যাবে। যদি (ঈমান থাকা সত্ত্বেও) মুমিনের সব আমল বরবাদ হয়ে যেত তা হলে সে জান্নাতে প্রবেশ করত না কখনোই। তবে হ্যাঁ, মুমিনের কিছু কিছু আমল বরবাদ হয়ে যায়, যখন সে আমল বরবাদ করে দেওয়ার মতো কিছু ঘটে (তবে সমগ্র আমল বরবাদ হয় না)। যেমন, কেউ দান করে সেই দান নিয়ে খোটা দেয় বা কষ্টদায়ক কথা বলে। (এই খোটা বা অনুগ্রহ ফলানোর ফলে তার ওই দানটি নষ্ট হয়ে যায়)।
আয়াতের মাধ্যমে এ কথা প্রমাণিত হলো যে, নবীর সামনে জোরে বা উঁচু আওয়াজে কথা বললে ব্য্যক্তির অজান্তেই তার কাফের হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। কেননা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে উঁচু আওয়াজে কথা বলাও এক প্রকার অভদ্রতা ও হেঁয়ালি আচরণ। বিষয়টি কারও বুঝে না এলেও। তা হলে যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে ও উদ্দেশ্য-প্রণোদিত হয়ে রাসূলকে গালি দিবে, উপহাস করবে এবং কষ্ট দিবে, তার কী দশা হতে পারে? সে ব্যক্তি নিশ্চয় আরও আগেই কাফের।
• সপ্তম দলিল আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاء بَعْضِكُمْ بَعْضًا... فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
যেভাবে তোমরা একে অপরকে ডাকো, ওভাবে তোমরা রাসূলকে ডেকো না। যারা তাঁর আদশ লঙ্ঘন করে, তারা যেন সতর্ক থাকে যে, কখন যেন তাদেরকে ফিতনা ঘিরে ধরে কিংবা যন্ত্রণাদায়ক আযাব তাদেরকে আক্রান্ত করে ফেলে। [৫৩]
সুতরাং যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ-নিষেধের বিরোধিতা করবে আল্লাহ তাকে 'ফিতনা' থেকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আর (কুরআন মাজীদেরে) ফিতনা হলো কুফরি ও ধর্ম ত্যাগ করা। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ
'তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করো, যতক্ষণ-না ফিতনা অবশিষ্ট থাকে। [৫৪]
ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ফিতনা মানে হলো শিরক। এমন হতেই পারে, কেউ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কোনো কথা প্রত্যাখ্যান করল, ফলে তার অন্তরে বক্রতা তৈরি হল; আর এই বক্রতাই তাকে ধ্বংস করে ফেলল।' এরপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
না, হে মুহাম্মদ! তোমার রবের কসম! এরা কখনও মুনিন হতে পারে না যতক্ষণ এদের পারস্পারিক মতবিরোধের ক্ষেত্রে এরা তোমাকে ফয়সালাকারী হিসেবে মেনে না নেবে, তারপর তুমি যা ফয়সালা করবে তার ব্যাপারে নিজেদের মনের মধ্য কোনো প্রকার কুণ্ঠা ও দ্বিধার স্থান দেবে না, বরং সর্বান্তকরণে মেনে নেবে। [৫৫]
এরপর ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ আরও বলেন, 'আমি তাদেরকে দেখে অবাক হই, যারা হাদীসের সনদ ও এর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে জেনেও অমুক-তমুকের রায় গ্রহণ করে।' এ কথা বলে ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন,
فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ যারা তাঁর আদশ লঙ্ঘন করে, তারা যেন সতর্ক থাকে যে, কখন যেন তাদেরকে ফিতনা ঘিরে ধরে কিংবা যন্ত্রণাদায়ক আযাব তাদেরকে আক্রান্ত করে ফেলে। [৫৬]
এরপর তিনি বললেন, 'জানো, ফিতনা কী? ফিতনা হলো কুফর। (আয়াতের ব্যাখ্যা হলো) ওরা হাদীসকে ছেড়ে দেয় আর প্রবৃত্তি তাদেরকে তাড়িত করে যুক্তি ও মতের দিকে নিয়ে যায়।'
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ লঙ্গনকারীকে যদি কুফরির ও যন্ত্রণাদায়ক আযাবের বিষয়ে সতর্ক করা হয়, তা হলে ওই ব্যক্তির হুকুম কী হতে পারে, যে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তিমূলক ও মানহানিকর আরও জঘন্য কথা বলে?
উল্লেখ্য, রাসূলের আদেশ অমান্য করা কুফরির দিকে নিয়ে যায়, কেননা আদেশ অমান্য করার মাঝে আদেশদাতার প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ভাব নিহিত রয়েছে, যেমনটা ইবলিস করেছিল।
আসলে আলোচ্য-বিষয় ব্যাপক বিস্তৃত। তবে আলহামদুলিল্লাহ এ বিষয়ে উম্মাহ একমত।
• অষ্টম দলিল আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا كَانَ لَكُمْ أَنْ تُؤْذُوا رَسُولَ اللَّهِ وَلَا أَنْ تَنْكِحُوا أَزْوَاجَهُ مِنْ بَعْدِهِ أَبَدًا তোমাদের জন্য কখনোই বৈধ নয় আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া এবং তাঁর (মৃত্যুর) পরে তার স্ত্রীদেরকে বিয়ে করা। [৫৭]
আল্লাহ তাআলা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওফাতের পরে তার স্ত্রীদেরকে বিবাহ করা উম্মতের জন্য হারাম করে দিয়েছেন। কেননা এটা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ব্যথিত করবে। আল্লাহ তাআলা এ অপরাধকে গুরুতর বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তারপরও যদি কোনো ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর ওফাতের পরে তাঁর স্ত্রীগণকে কিংবা তাঁর দাসীগণকে বিয়ে করে, তা হলে তার শাস্তি হলো হত্যা।
নবীর স্ত্রীগণকে বা দাসীগণকে বিয়ে করার দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর সম্মানহানি করার কারণে তার শাস্তি যদি হয় কতল, তবে রাসূলের কটূক্তিকারীর শাস্তি তো আরও আগেই কতল।
এর প্রমাণ সহীহ মুসলিমে উল্লেখিত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসটি। অনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এক বাদীর ব্যাপারে একলোককে অপবাদ দেওয়া হচ্ছিল। সেই বাদীর গর্ভে রাসূলের সন্তানও হয়েছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ওই ব্যক্তির গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন তার কাছে আসলেন, তখন লোকটা একটা কূপের মাঝে শীতলতা উপভোগ করছিল। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, বের হ! তিনি লোকটাকে হাত ধরে টেনে ওঠালেন। উঠিয়ে দেখেন লোকটা লিঙ্গকর্তিত। ফলে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে আর কিছু বললেন না। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে তো লিঙ্গহীন।' অর্থাৎ তার পক্ষে তো আপনার দাসীর সাথে যিনায় লিপ্ত হওয়া সম্ভবই নয়। এটা স্রেফ অপবাদ।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশয়াসের বোন কাইলাহ বিনতু কাইসকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু তার সাথে মিলন বা তার কাছে গমনের পূর্বেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইন্তেকাল হয়। আবার এমনও বলা হয়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ইচ্ছাধিকার দিয়েছিলেন, হয় (উম্মুল মুমিনীন হিসাবে) তাঁর ওপর বিশেষ হিজাবের বিধান আরোপিত হবে এবং তিনি উম্মুল মুমিনীনদের অন্তর্ভুক্ত হবেন, না হয় রাসূল তাঁকে তালাক দিয়ে দিবেন ফলে তিনি যাকে ইচ্ছা বিয়ে করতে পারবেন। তিনি অন্য কাউকে বিয়ে করার অধিকার বেছে নিলেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওফাতের পরে ইকরিমা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বিয়ে করেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এ খবর শুনে দুজনকেই হত্যা করতে উদ্ধত হন। তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বলেন, তিনি তো উম্মাহাতুল মুমিনীনদের অন্তর্ভুক্ত নন।' ফলে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে ছেড়ে দেন।[২৮]
টিকাঃ
[২৬] সূরা তাওবা, ৯: ৬১-৬৩
[২৭] ইকরিমা বর্ণনা করেন—এক মুশরিক ছিল, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তি করত। তো একদিন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'কে আছ, আমার পক্ষ থেকে আমার শত্রুকে ঘায়েল করবে?' তখন যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি প্রস্তুত ইয়া রাসূলাল্লাহ!' এরপর তিনি বেরিয়ে পড়লেন এবং তাকে হত্যা করে গনিমতের মাল-সহ ফিরে এলেন। [সানয়ানি, আল-মুসান্নাফ: ৯৪৭৭; সুযুতি, জামিউল আহাদীস: ৩৮৬৪২]
[২৮] সূরা মুজাদালাহ, ৫৮: ২২
[২৯] ওয়াহিদি, আসবাবুন নুযুল, পৃ. ৪৭৮
[৩০] সূরা তাওবা, ৯: ৬৪-৬৬
[৩১] সূরা তাওবা, ৯:৫৮
[৩২] সূরা তাওবা, ৯:৬১
[৩৩] সূরা নিসা, ৪:৬৫
[৩৪] সূরা নিসা, ৪: ৬০-৬১
[৩৫] সূরা নূর, ২৪:৫১
[৩৬] সূরা আহযাব, ৩৩: ৫৭
[৩৭] সূরা আহযাব, ৩৩: ৬১
[৩৮] সূরা নূর, ২৪: ২৩
[৩৯] ইফক-আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর ওপর মুনাফিকদের-দেওয়া যিনার মিথ্যা অপবাদের ঘটনা।
[৪০] আলিফ-লাম যদি লিল-জিনস বা সামগ্রিকতা বোঝানোর জন্য। আরবী ভাষায় আলিফ-লাম আরও একাধিক অর্থেও এসে থাকে।
[৪১] সূরা নূর, ২৪: ১১
[৪২] বুখারী, আস-সহীহ : ৩৯১০; মুসলিম, আস-সহীহ: ৭১৯৬
[৪৩] যেমন একদা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা ৭টি ধ্বংসাত্মক বিষয় থেকে বেঁচে থাকো।' সাহাবাগণ প্রশ্ন করলেন, 'সেগুলো কী, ইয়া রাসূলাল্লাহ?' তিনি বললেন, 'সেগুলো হলো- ১. আল্লাহর সাথে শিরক করা, ২. জাদু করা, ৩. অন্যায়ভাবে কোনো মানুষকে হত্যা করা, ৪. সুদ খাওয়া, ৫. এতিমের মাল আত্মসাৎ করা, ৬. যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা, ৭. অবলা সরলা কোনো সতীসাধ্বী মুমিন নারীর ওপর যিনার অপবাদ দেয়া।' [বুখারী, আস-সহীহ: ২৭৬৬; মুসলিম, আস-সহীহ: ২৭২]
[৪৪] এটি বিশিষ্ট তাবেয়ী আবু হামযাহ আস-সুমালি রাহিমাহুল্লাহ-এর মত।
[৪৫] সূরা নূর, ২৪: ২৩
[৪৬] লিয়ান অর্থ স্ত্রী যদি স্বামীর দাবিকে অপবাদ বলে, তখন স্বামীর দায়িত্ব প্রমাণ পেশ করা। যদি প্রমাণ আনতে না পারে তা হলে সে চারবার কসম করে বলবে, 'আমি আমার দাবিতে সত্যবাদী; পঞ্চমবার বলবে, যদি আমি আমার দাবিতে মিথ্যাবাদী হয়ে থাকি, তা হলে আমার ওপর লানত বর্ষিত হোক। তারপর স্ত্রী চারবার কসম করে বলবে, আমার স্বামী যে অপবাদ দিয়েছে, সে দাবিতে সে মিথ্যাবাদী। পঞ্চমবার সে কসম করে বলবে, 'যদি আমার স্বামী সত্যবাদী হয়, তা হলে আমার ওপর লানত বর্ষিত হোক।
[৪৭] সূরা আল ইমরান, ৩: ৬১
[৪৮] সূরা আহযাব, ৩৩:৫৭
[৪৯] সূরা বাকারাহ, ২:৯০
[৫০] সূরা নিসা, ৪:১৪
[৫১] সূরা হুজুরাত, ৪৯:২
[৫২] সূরা মায়িদাহ, ৫:৫
[৫৩] সূরা নূর, ২৪: ৬৩
[৫৪] সূরা বাকারাহ, ২: ১৯৩
[৫৫] সূরা নিসা, ৪: ৬৫
[৫৬] সূরা নূর, ২৪: ৬৩
[৫৭] সূরা আহযাব, ৩৩: ৫৩
[৫৮] হাকিম, আল-মুসতাদরাক: ৬৮১৭
📄 সুন্নাহ থেকে দলিল
• প্রথম হাদীস ইমাম শাবি রাহিমাহুল্লাহ আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে,
أَنَّ يَهُودِيَّة كَانَتْ تَشْتِمُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَتَقَعُ فِيهِ فَخَنَقَهَا رَجُلٌ حَتَّى مَاتَتْ فَأَبْطَلَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم دَمَهَا
'এক ইহুদি মহিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করত। ফলে একলোক তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মুক্তিপণের পরিবর্তে) ওই মহিলার রক্ত মূল্যহীন ঘোষণা করেন। [৫৯]
হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আবু দাউদ ও ইবনে বাত্তাহ রাহিমাহুমুল্লাহ। ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। [৬০]
আরেক বর্ণনায় এসেছে, সেই হত্যাকারী লোকটি অন্ধ ছিলেন। হাদীসটির সনদ জাইয়িদ ও মুত্তাসিল। কেননা ইমাম শাবি রাহিমাহুল্লাহ আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। আর যদি মুরসালও হয়, তবুও হাদীসটি সর্বসম্মতিক্রমে প্রমাণযোগ্য। কেননা ইমাম শাবি রাহিমাহুল্লাহ বর্ণিত মুরসাল বর্ণনাগুলোও মুহাদ্দিসগণের নিকটে সহীহ। কারণ তার যত মুরসাল বর্ণনা আছে, সবই সহীহ হিসেবে প্রমাণিত।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করার কারণে অভিশপ্ত ইহুদি নারীকে হত্যা করার ব্যাপারে হাদীসটি একেবারেই দ্ব্যর্থহীন। আর এই হাদীসটি আরও স্পষ্টভাবে ওই সকল যিম্মি ও মুসলিম নারী-পুরুষের রক্ত হালাল বানানোর দলিল, যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করে।
• দ্বিতীয় হাদীস ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত, 'এক অন্ধ লোকের একটি 'উম্মু ওয়ালাদ। [৬১] দাসী ছিল। সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করত, তাকে নিয়ে কটূক্তি করত। ফলে অন্ধ লোকটি ধারালো একটি ছুরি নিয়ে দাসীর পেটে বিঁধিয়ে দিয়ে চেপে ধরে রাখলেন। এই ঘটনা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শুনানো হলে তিনি ওই দাসীর রক্ত মূল্যহীন ঘোষণা করেন। [৬২]
আবু দাউদ ও নাসাঈ রাহিমাহুমাল্লাহ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমাদ হাদীসটিকে দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। হতে পারে এই ঘটনাটা হুবহু প্রথম ঘটনা। সেক্ষেত্রে এই ঘটনার বাদিও ইহুদি হবে। কাযি আবু ইয়া'লা রাহিমাহুমুল্লাহ-সহ অন্যান্য আলেমদের অভিমত এটাই। তারা উভয় হাদীসের ঘটনাকে একই ঘটনা মনে করেন। অথবা হতে পারে এটা ভিন্ন আরেকটা ঘটনা।
ইমাম খাত্তাবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
وفيه بيان ان ساب النبي مقتول وذلك أن السب منها لرسول الله ارتداد عن الدين
'এ হাদীস থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গালমন্দকারীকে হত্যা করা হবে। কারণ, গালমন্দ বা অমার্জিত ভাষা ব্যবহার করা মানে মুরতাদ হয়ে যাওয়া বা ইসলাম ত্যাগ করা। [৬৩]
ইমাম খাত্তাবি রাহিমাহুল্লাহ-এর কথা এ দিকে ইঙ্গিত করে যে, তিনি কিটূক্তিকারী নারীটিকে মুসলিম ছিল বলে মনে করেন। কেননা ইমাম খাত্তাবির কথায় ব্যবহৃত 'ইরতিদাদ' মানে ইসলাম ত্যাগ করা। কটূক্তিকারী নারীটির মুসলিম হওয়ার কোনো দলিল হাদীসের মধ্যে নেই, বরং হাদীস থেকে বাহ্যত বোঝা যায়, মহিলাটি কাফের ছিল। কেননা হাদীসে উল্লেখ আছে যে, কটূক্তিকারী দাসীর মনিব তাকে এহেন কাজ থেকে কয়েকবার নিষেধ করেছিলেন। সুতরাং দাসীটি যদি মুরতাদ হতো তা হলে তার সাথে সহবাস করা ও দীর্ঘ সময় ধরে নিজের অধীনে রাখা কোনোভাবেই মুসলিম মনিবের জন্য বৈধ হতো না।
• তৃতীয় হাদীস এটি সেই হাদীস, যে হাদীস দিয়ে ইমাম শাফেঈ রাহিমাহুল্লাহ দলিল দেন যে, কোনো যিম্মিও যদি রাসূলকে কটূক্তি করে, তা হলে তাকে হত্যা করা হবে। হাদীসটি ইহুদি কবি ও গোত্রনেতা কাব ইবনে আশরাফের ঘটনা-সম্বলিত বর্ণনা। ঘটনাটি প্রসিদ্ধ ও স্বতঃসিদ্ধ। একবার নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
مَنْ لِكَعْبِ بْنِ الْأَشْرَفِ فَإِنَّهُ قَدْ آذَى اللهَ وَرَسُولَهُ 'কে আছো কাব ইবনে আশরাফের জন্য? সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে।'
তখন মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রাদিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি চান আমি তাকে হত্যার দায়িত্ব নিই?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' তখন সাহাবি বললেন, 'তা হলে আমাকে কিছু কৌশলী কথা বলার অনুমতি দিন।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুমতি দিলেন। মুহাম্মাদ বিন মাসলামা কাবের কাছে এসে বললেন, এই লোকটা (মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তো এখন আমাদের কাছে সাদাকা চাচ্ছে। লোকটা আমাদেরকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।' কাব এ কথা শুনে বলল, তোমরা তার ব্যাপারে আরও অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে।' (এভাবে তিনি কাবের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।) পরিশেষে তিনি তাকে হত্যা করেন। [৬৪]
হাদীসটি বুখারী ও মুসলিমে আছে। কাব ইবনে আশরাফ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিন্দা করত। ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে হত্যা করার আহ্বান জানান। কাবের জনবল নবীজির কাছে এসে বলল, 'আমাদের সরদার কাবকে গুপ্তহত্যা করা হয়েছে।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'অন্যদের মতো সেও যদি সংযত থাকত তা হলে সে ক্ষতির মুখোমুখি হত না। আমরা তার থেকে কষ্ট পেয়েছি, সে আমাদের নামে নিন্দা-কাব্য রচনা করেছে। তোমাদের কেউ যদি এমন জঘন্য কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, তা হলে তরবারিই তার ফয়সালা করবে।'
এ পর্যায়ে ইহুদিরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। কাব ইবনুল আশরাফের হত্যার পর থেক তারা পুরোপুরি সাবধান হয়ে যায়।
কাব ইবনুল আশরাফ তো নিরাপত্তা-চুক্তিতে আবদ্ধ যিম্মি ছিল। যখন সে কটূক্তি করল, তখন তার নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে গেল। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ব্যাপারে বলেন,
فَإِنَّهُ قَدْ آذَى اللهَ وَرَسُولَهُ
'কেননা সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে।'
সুতরাং যে-কেউই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিবে তাকে হত্যা করা হবে। আর মুসলমানদের সর্বসম্মতিক্রমে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কটূক্তি করার দ্বারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া হয়। সুতরাং কটূক্তির কারণে হত্যার বিধান অবধারিত।
• চতুর্থ হাদীস
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ سَبَّ نَبِيًّا قُتِلَ، وَمَنْ سَبَّ أَصْحَابِي جُلِدَ
'যে ব্যক্তি কোনো নবীকে গালি দিবে তাকে হত্যা করা হবে, আর যে ব্যক্তি আমার কোনো সাহাবিকে গালি দিবে তাকে বেত্রাঘাত করা হবে।[৬৫]
হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আবু মুহাম্মাদ আল-খাল্লাল, আল-আযাজিয়্যি ও আল-হারাওয়ি। হাদীসের থেকে বোঝা যায় যে, এমন ব্যক্তিকে হত্যা করতে হবে, তাওবার সুযোগ দেওয়া হবে না।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী হলো আব্দুল আযিয ইবনে হাসান ইবনে যাবালাহ, তিনি হাদীস বর্ণনায় দুর্বল।
• পঞ্চম হাদীস
আব্দুল্লাহ ইবনে কুদামা রাহিমাহুল্লাহ আবু বারযাহ আসলামি থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এক লোক আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতি কঠিন-ভাষা ব্যবহার করেন। আমি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললাম, আমি কি তাকে হত্যা করব?
তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, 'এমন হুকুম তো নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দকারী ছাড়া অন্য কারও জন্য নয়।'[৬৬]
আরেক বর্ণনায় আছে, এক লোক আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে গালি দিয়েছিল। তখন তিনি উক্ত কথাটি বলেন। আবু দাউদ রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি তার সুনানে সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন।[৬৭]
অনেক আলেম এ হাদীস দ্বারা দলিল পেশ করেছেন যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দকারীর শাস্তি হত্যা। এই অভিমত-পোষণকারীদের মধ্যে আছেন ইমাম আবু দাউদ, ইসমাইল ইবনে ইসহাক, আবু বকর আব্দুল আযিয এবং কাযি আবু ইয়া'লা প্রমুখ। এই হাদীসটি থেকে বোঝা গেল, যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করবে তাকে হত্যা করা বৈধ। হাদীসটি কাফের-মুসলিম উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
• ষষ্ঠ হাদীস
আসমা বিনতু মারওয়ানের ঘটনা। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, খাতমা গোত্রের এক নারী কবিতায় রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অপমান করে। তখন নবীজি বললেন— 'এই মহিলার ব্যাপারে আমার পক্ষে কে আছ?' অখন তার গোত্রের এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি।'
এরপর লোকটা উঠে গিয়ে সেই মহিলাকে হত্যা করল। হত্যা করে ফিরে এসে সংবাদটা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানালে তিনি বললেন, 'মাদি ছাগল দুটো তাকে নিয়ে আর গুঁতোগুঁতি করবে না।[৬৮]
বিভিন্ন মাগাযি-বিশেষজ্ঞদের কাছে ঘটনাটা প্রচলিত। এই মহিলাকে হত্যা করা হয় রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদর থেকে ফিরে আসার পর, পঁচিশে রমাদান। ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন ইতিহাস-বিশেষজ্ঞগণ। যেমন ইবনে সাদ, আল-আসকারি, আবু উবাইদ তার আল-আমওয়াল গ্রন্থে এবং ওয়াকিদি-সহ এবং অন্যান্যরা। এটি একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা। আর এই অভিশপ্ত মহিলাকে হত্যা করার কারণ ছিল সে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করত।
• সপ্তম হাদীস ইহুদি আবু আফাকের ঘটনা। মাগাযি-বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসবিদগণ এটি উল্লেখ করেছেন। তার কাজই ছিল রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে কটূক্তিমূলক কবিতা আবৃত্তি করা।
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বদরের যুদ্ধে বেরিয়ে পড়লেন এবং আল্লাহর সাহায্যে বিজয় লাভ করে ফিরলেন, তখন সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরও হিংসা করতে লাগল। সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিন্দা করে কবিতা আবৃত্তি করল এবং নবীজির অনুসারীদেরকেও কটূক্তি করল। তার কবিতার জঘন্যতম একটি অংশ ছিল-
'এক আরোহী তাদের তাদের বৈধ-অবৈধ সবকিছুই ছিনিয়ে নেয়।'
সালিম ইবনে উমাইর বলেন, 'আমি নযর করেছি, তাকে আমি হত্যা করব।' ইবনে সাদ উল্লেখ করেছেন যে, 'সে ইহুদি ছিল।' তবে এ বর্ণনাটি ইতিহাসবিদদের। তারপরও নিশ্চিতভাবে এটি এ-সংক্রান্ত অন্যন্য হাদীসকে সমর্থন ও জোড়ালো করতে পারে।
• অষ্টম হাদীস আনাস ইবনে যুনাইম আদদিলির ঘটানাটি। সীরাত-বিশারদদের কাছে হাদীসটি প্রসিদ্ধ। ইবনে ইসহাক, ওয়াকিদি-সহ অন্যান্য আলেমগণ এটি বর্ণনা করেছেন। এই লোকটা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করে কবিতা রচনা করেছিল। খুযায়াহ গোত্রের এক মুসলিম তরুণ বিষয়টা শুনতে পেয়ে তার মাথা ফাটিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রক্তকে মূল্যহীন ঘোষণা করেন। অর্থাৎ এই অপরাধের কারণে আঘাতকারীকে কোনো শাস্তিই দেননি।
আনাস ইবনে যুনাইম যখন নবীজির পক্ষ থেকে তার রক্তমূল্যহীনতার ফরমান সম্পর্কে অবহিত হয় তখন সে নবীজির কাছে নিজের অপরাগতার কথা প্রকাশ করে এবং নবীজির ভূয়সী প্রশংসা করে একটি কবিতা আবৃত্তি করে। কবিতার প্রথমাংশ নিম্নরূপ-
আপনি কি সেই মহান ব্যক্তি নন, [৬৯]
যার আদেশে 'মায়াদ' গোত্রকে হিদায়াত দেওয়া হয়? বরং হিদায়াত আল্লাহ দেন, আর আপনাকে বলেন, তুমি সাক্ষী থেকো। কোনো উটনী বহন করেনি নিজের পরে মুহাম্মদের চেয়ে সৎ, মহৎ ও আমানতদারকে।
হে রাসূল! আপনি আমাকে পাকড়াও করতে সক্ষম। আপনার পক্ষ থেকে একটি হুঁশিয়ারিই তো পাকড়াও সমতুল্য। হে রাসূল! তিহামাহ ও নজদের সমস্ত অধিবাসীর ওপর আপনি তো কর্তৃত্ব প্রয়োগের অধিকার রাখেন।
রাসূলকে বলা হয়েছে, আমি নাকি তার মানহানি করেছি। (রটনাকারীরা জেনে নিক) আমার চাবুক নিজের ওপরে চাবুক মারেনি। আমি না কারও মানহানি করেছি, আর না কারও খুন ঝরিয়েছি। একটু ভেবে দেখুন, হে সত্যের প্রসারী! এরপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।
যখন তার এই কবিতা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে পৌঁছে এবং তিনি তার পক্ষ থেকে অপরাগতা স্বীকারের কথা জানতে পারেন, তখন তিনি নওফাল ইবনে মুয়াবিয়ার সাথে তার ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করেন। তখন নাওফালও তার জন্য সুপারিশ করেন, অন্যদিকে বনু খুযায়ার এক বালক তো তার মাথা আগেই ফাটিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'ঠিক আছে, আমি তাকে মাফ করে দিলাম।'
তখন নাওফাল বলেন, 'আমার মা-বাবা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক।' এরপর আনাস ইবনে যুনাইম রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে আবার ওযর পেশ করে বলেন, তারা আমার নামে মিথ্যা বলেছে।
এখানে দলিল হলো, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশদের সাথে দশ বছরের জন্য সন্ধিচুক্তি করেন। এই চুক্তির আওতায় বনু খুযায়াহ ও বনু বকরও অন্তর্ভুক্ত ছিল [৭০]।। এ চুক্তির অধীনে আনাস ইবনে যুনাইমও ছিল। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিন্দা করে কবিতা আবৃত্তি করেছিল, যার ফলে চুক্তিবদ্ধ থাকা সত্বেও অন্য আরেকজন তার মাথা ফাটিয়ে দেয়।
তারা যদি না জানতেন যে, চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তিও যদি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যাপারে কটূক্তি করে তা হলে তাকেও শায়েস্তা করা অপরিহার্য, তা হলে তারা তো তার মাথা ফাটিয়ে দিতেন না।
তাই তো প্রথমে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রক্তকে মূল্যহীন ঘোষণা করেছিলেন। আর এই হুকুমই বোঝায় যে, কটূক্তিকারী চুক্তিবদ্ধ হলেও তার রক্ত বৈধ। এরপর সে যখন নিজের কবিতার মধ্য দিয়ে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেয়, তখন থেকে সবাই তাকে সাহাবাদের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন।
তার কবিতার এই অংশের প্রতি লক্ষ্য করুন, 'জেনে নিন হে আল্লাহর রাসূল!' এই বাক্যটি তার ইসলাম প্রমাণ করে। সাথে সাথে সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমালোচনার বিষয়টিও অস্বীকার করে। এমনকি তার বিরুদ্ধে যারা সাক্ষ্য প্রদান করেছিল সে তাদের সাক্ষ্যকে এই বলে প্রত্যাখ্যান করেছে যে, এরা তো আমার শত্রুগোত্র, আমাদের মধ্যে অনেক যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছে।
আমাদের বক্তব্য হলো, রাসূলকে কটূক্তি করার কারণে যদি রক্ত বৈধ বা মূল্যহীন না হত তা হলে তো এসব কোনো কিছুরই প্রয়োজন হতো না।
তারপরও, সে ইসলাম এনে, ওযর পেশ করে, বিরোধীদের বক্তব্য খণ্ডন ও মিথ্যা-প্রতিপন্ন করে এবং নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রশংসা করেও, রাসূলের কাছে ক্ষমা চাচ্ছে, যেন তিনি তার হত্যা ও রক্ত-বৈধতার ফরমান উঠিয়ে নেন। অপরাধীকে যখন শাস্তি দেওয়া বৈধ, ক্ষমা তো তখনই যথার্থ হয়ে থাকে।
তাই বোঝা যায়, সে মুসলিম হয়ে, ওযর পেশ করেও শাস্তি পাওয়ার যোগ্য ছিল এবং নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাইলে তাকে শাস্তি দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজের মহানুভবতা ও দায়ার কারণে তাকে ক্ষমা করে দেন। তা ছাড়া তার সাথে যে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল সেটা ছিল যুদ্ধবিরতিমূলক চুক্তি, জিযিয়াভিত্তিক কোনো চুক্তি ছিল না। যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে আবদ্ধ ব্যক্তি নিজের দেশে যা ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারে। যতক্ষণ-না সে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উস্কানি বা ঘোষণা দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সে চুক্তি ভঙ্গ হয় না।
তা হলে জানা গেল, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তি করা একপ্রকার যুদ্ধে-নামার মতো, বরং আরও গুরুতর। আর যে কটূক্তিকারী, তার জন্য কোনো ধরনের নিরাপত্তা-বিধান থাকবে না।
• নবম হাদীস
ঘটনাটা ইবনে আবি সারহের। এই ঘটনার ব্যাপারে আহলুল ইলমগণ একমত। বিষয়টা তাদের কাছে এতটাই প্রসিদ্ধ যে, এটি এক ব্যক্তির বর্ণনা হওয়ার সুযোগই নেই। ঘটনাটা হলো—
মক্কা বিজয়ের দিন আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট লুকিয়ে থাকেন। কোনোমতে তাকে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত করেন তিনি এবং বলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আব্দুল্লাহকে (ইসলামের ওপর) বাইয়াত করান।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথা উঠিয়ে তার দিকে তাকান। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তিনবার একই কথা পুনরাবৃত্তি করেন। আর প্রত্যেকবারই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বাইয়াত করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনবারের পর তাকে বাইয়াত করে নেন। তারপর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের বললেন,
أَمَا كَانَ فِيكُمْ رَجُلٌ رَشِيدٌ يَقُومُ إِلَى هَذَا حَيْثُ رَآنِي كَفَفْتُ يَدِي عَنْ بَيْعَتِهِ فَيَقْتُلُهُ
'কী ব্যাপার! তোমাদের মধ্যে কি এমন কোনো চৌকস লোক নেই, যে আমাকে যখন দেখল আমি তার দিকে হাত বাড়াইনি, তখনই তার গর্দান উড়িয়ে দিত?'
সাহাবায়ে কেরাম জবাব দিলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তো জানি না আপনার মনের চাওয়া কী ছিল। আপনি আমাদেরকে কেন চোখ দিয়ে ইঙ্গিত করলেন না?' তখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা কী জানো না যে, কোনো নবীর জন্য চোখের খেয়ানত সমীচীন নয়?'[৭১]
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো তার রক্ত মূল্যহীন করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর দুধভাই ছিল। তাই উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটে তার জন্য সুপারিশ করেছিলেন, ফলে তিনি তাকে মাফ করে দেন।
কিন্তু সে ইসলাম গ্রহণের পর ফের মুরতাদ হয়ে মুশরিকদের দল ভারি করে। অথচ সে ইসলাম গ্রহণের পর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওহি-লেখকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরপর সে মুশরিকদের দলে ভিড়ে প্রচার করতে থাকে, 'আমি যেভাবে চাইতাম সেভাবেই কুরআনকে পরিবর্তন করতাম, কেননা তিনি আমাকে কিছু (ওহি) লিখার আদেশ দিতেন। আমি তাকে বলতাম, 'এমন অথবা এমন লিখলে হবে?' তিনি বলতেন, 'হাঁ, হবে।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতেন 'আলেমুন হাকিম' লেখো। সে বলত, 'আযিযুন হাকিম' লিখলে হবে কি? তিনি বলতেন, হ্যাঁ! দুটো তো একই।[৭২]
বলা হয় যে, এই আয়াতটি তার ব্যাপারে নাযিল হয়েছিল।[৭৩]
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللهِ كَذِبًا أَوْ قَالَ أُوحِيَ إِلَيَّ وَلَمْ يُوحَ إِلَيْهِ شَيْءٌ وَمَنْ قَالَ سَأُنْزِلُ مِثْلَ مَا أَنْزَلَ اللهُ ...
ওই ব্যক্তির চেয়ে বড় জালিম কে হতে পারে, যে আল্লাহর নামে মিথ্যা বলে কিংবা বলে-আমার প্রতি ওহি অবতীর্ণ হয়েছে, অথচ তার প্রতি কিছুই অবতীর্ণ হয়নি অথবা বলে আল্লাহ যেমন নাযিল করেছেন, ওমন আমিও অচিরেই ওহি নাযিল করব।[৭৪]
এই হাদীস থেকে জানা যায়, সে নবীর ওপর মিথ্যা আরোপ করে এবং মানুষের মাঝে বানোয়াট কথা ছড়াতে থাকে যে, তিনি তাকে ওহি লেখতে বলতেন, তার যা ইচ্ছা হত, তাই লিখত আর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেটাকেই বহাল রাখতেন। নিশ্চয় এ মিথ্যাচারও নবীর নামে একপ্রকারের কটূক্তি। ওহি বিকৃতকরণের দাবি সে ছাড়াও আরেকজন করেছিল। আল্লাহ তাআলা তাকে পাকড়াও করেন। তার মৃত্যুর পর লোকেরা তাকে যেখানেই দাফন করে মাটি তাকে উগড়ে দেয়।[৭৫] আর এটাই হচ্ছে সুস্পষ্ট দলিল যে, যে বা যারাই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যাপারে অশালীন মন্তব্য করবে আল্লাহ তাআলা তার থেকে প্রতিশোধ নিবেন, তাকে শায়েস্তা করবেন। সুতরাং তাওবা করে ইসলাম গ্রহণের পরও আব্দুল্লাহ ইবনে আবি সারহের রক্ত বৈধ হওয়া, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে 'কেন তোমরা তাকে হত্যা করোনি?'-এ কথা বলা, এরপর তাকে ক্ষমা করে দেওয়া এসব প্রক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাইলে তাকে হত্যা করতে পারেন, চাইলে ক্ষমাও করতে পারেন।
আবার এটাও প্রমাণ হয় যে, যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করবে তিনি তাকে হত্যা করার পূর্ণ অধিকার রাখেন, যদিও সে তাওবা করে ইসলামের দিকে ফিরে আসে।
বিশুদ্ধ বর্ণনায় [৭৬] আছে, ইবনে আবি সারহ মক্কা-বিজয়ের আগেই ইসলামে ফিরে আসে। সে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলে, 'আমি সত্যিই অনেক বড় অপরাধ করেছি। এখন আমি তাওবা করে আবার ফিরে এসেছি।' তারপর লোকজন যখন একটু স্থিমিত ও প্রশান্ত হয় তখন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে নিয়ে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে হাজির হন। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মনে মনে চাইছিলেন যেন মুসলমানরা তাকে হত্যা করে ফেলে। এ জন্য তিনি বেশ কিছুক্ষণ সময় অপেক্ষা করেন, এরই মধ্যে কেউ তাকে স্বেচ্ছায় হত্যা করে কি না এ জন্যে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভাবছিলেন, হয়তো কেউ তাকে শীঘ্র হত্যা করে ফেলবে। ... এই যে এতকিছু ঘটল, এগুলো স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, ইসলাম গ্রহণের পরও তাকে হত্যা করা বৈধ ছিল।
আব্দুল্লাহ ইবনে আবি সারহ এবং আরেকজন খ্রিষ্টান ওহি-লেখক নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর যে মিথ্যা অভিযোগ করে বলে, তাদের ওহি-বিকৃতির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি জানতেন (কিন্তু কিছুই বলতেন না, বরং সমর্থন করতেন)- এটা ডাহা মিথ্যা কথা। কেননা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওইটাই লেখাতেন যেটা আল্লাহ তাআলা নাযিল করতেন, ওইটাকেই ঠিক রাখতে বলতেন যেটাকে আল্লাহ তাআলা ঠিক রাখতে বলেছেন। নিজের ইচ্ছামাফিক কোনো রদবদল করতেন না। বরং আল্লাহ তাআলা যেভাবে চাইতেন সেভাবেই তিনি লিপিবদ্ধ করাতেন। তবে আহলুল ইলমগণ এতটুকু মতবিরোধ করেন যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে যেটা লেখার নির্দেশ দিতেন তার বিপরীত লিখলেও কি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমর্থন করতেন এবং তাকে এ ব্যাপারে কিছুই বলতেন না? এ ব্যাপারে আলেমগণ দুটো মত পেশ করেছেন-
✓ প্রথম মত এই খ্রিষ্টান ও ইবনে আবি সারহ আগাগোড়োই মিথ্যাচার করেছে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা লিখতে দিয়েছিলেন তার বিপরীত কোনো কিছু স্বীকৃতি দেওয়ার মতো কোনো ঘটনাই ঘটেনি। বরং তারা উভয়ে মনগড়াভাবে বানিয়ে-বুনিয়ে মানুষের সামনে ছড়িয়ে দেয় লোকদেরকে ইসলামের ব্যাপারে সন্দিহান করে তোলার জন্য।
✓ দ্বিতীয় মত হ্যাঁ, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে লিখতে বলতেন। অর্থাৎ তিনি তার সামনে পাঠ করে, তাকে লিখতে বলতেন, سَمِيعًا بَصِيرًا কিন্তু সে লিখত سَمِيعًا عَلِيمًا। ফলে তাকে বলতেন ঠিক আছে, যেভাবে আছে সেভাবেই রেখে দাও-এ- জাতীয় কিছু কথাবার্তা হত। [৭৭]
হতে পারে দুভাবেই নাযিল হয়েছিল, ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতেন, 'এভাবে লিখো, চাইলে ওভাবেও লিখতে পারো। কেননা উভয়টাই সঠিক।' কেননা আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে স্পষ্টভাবে হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন-
أُنْزِلَ الْقُرْآنُ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ 'কুরআন সাত রীতি বা পাঠ-পদ্ধতিতে অবতীর্ণ হয়েছে। [৭৮]
সকল পদ্ধতিই তৃপ্তিদায়ক ও গ্রহণযোগ্য। আপনি যদি عزیز حكيم এর পরিবর্তে غفور رحيم বলেন, তা হলেও ব্যাপারটা একই হবে, যতক্ষণ-না রহমত-সংক্রান্ত আয়াতকে আযাব-সংক্রান্ত আয়াত দিয়ে শেষ করেন অথবা আযাব-সংক্রান্ত আয়াতকে রহমত- সংক্রান্ত আয়াত দিয়ে পাঠ শেষ করেন।
সুতরাং এমন অনেক হাদীস রয়েছে যেগুলো প্রমাণ করে যে, সাত পাঠপদ্ধতিতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে এবং আল্লাহ তাআলার নামসমূহের মধ্য হতে ‘বদল’ হিসেবে কোনো একটা নাম দিয়ে পাঠ শেষ করার বৈধতা দেওয়া হয়েছে সেখানে পাঠক যে-কোনো একটি রীতিশৈলীর কিরায়াত দিয়ে পাঠ শুরু করতে পারে। অতএব নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সেই সাতরীতির কোনো এক রীতিতে লেখার অনুমতি দিয়েছিলেন। দেখা যায় কখনও কখনও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি আয়াত কোনো এক রীতিতে পাঠ করতেন কিন্তু সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলত, ‘আমি কি এই রীতিতে অথবা ওই রীতিতে লিখতে পারি?’ আর সে এটা বলতে পেরেছিল এ জন্যই যে, সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষ থেকে একাধিকবার বিভিন্ন পদ্ধতিতে লিপিবদ্ধ করার অনুমতি পেয়েছিল। ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ভিন্ন কোনো রীতিতে লেখার অনুমোদন দিয়ে বলতেন, ‘হ্যাঁ! এ দুটো তো একই।’
কেননা কুরআন একাধিক রীতিশৈলীতে নাযিল হয়েছিল, তাই তার পক্ষ থেকে ভিন্ন রীতিশৈলীতে লিপিবদ্ধ করাকে সমর্থন করেছিলেন। এরপর যখন জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে প্রতি রমাদানে কুরআন দাওর করতেন অর্থাৎ একে অপরকে শুনাতেন, তখন আল্লাহ তাআলা কয়েকটি রীতিশৈলীকে মানসুখ (রহিত) করে দেন। সর্বশেষ দাওর হয়েছিল যায়িদ ইবনে সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহুর রীতিশৈলীতে। বর্তমানে মানুষ তাঁর পঠনশৈলীতেই কুরআন পাঠ করে। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু-সহ অন্যান্য সাহাবগণ মুসলমানদেরকে এই পঠনরীতির ওপরই ঐক্যবদ্ধ করেন।
এ নিয়ে আরেকটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায় যে-সে নবীজিকে বলত, আমি تعملون লিখব, নাকি تفعلون লিখব? নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতেন, ‘ যেটা ইচ্ছা সেটা লিখো।’ তো আল্লাহ তাআলা তাকে সঠিকটিই লেখার তাওফিক দিতেন। আর উভয়টাই যদি নাযিলকৃত হত, তা হলে আল্লাহ তাআলার নিকট যেটা উত্তম তাকে সেটাই লেখার তাওফিক দিতেন। অথবা একমাত্র যেটা নাযিল হয়েছে সেটাই লেখার সুমতি দান করতেন।
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই সুযোগটা তাকে দিতেন, কারণ একাধিক রীতিশৈলীতে কুরআন নাযিল হওয়ার কারণে সেটা বৈধ ছিল। তাই যত রীতিতে নাযিল হয়েছে সেগুলোর যে-কোনো এক প্রকারে লেখলেই হয়ে যেত। তা ছাড়া নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সুদৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, অবশ্যই আল্লাহ তাআলা কুরআনকে যে-কোনো ধরনের বিকৃতি থেকে হিফাযত করবেন। তিনি এটাও বিশ্বাস করতেন যে, সে ওইটাই লিখতে পারবে, যেটা আল্লাহ তাআলা নাযিল করেছেন। এর বাইরে সে কলম চালনা করতে পারবে না। আর এটা আমাদের এই পবিত্র গ্রন্থ- কিতাবুল্লাহর ব্যাপারে অজানা কোনো বিষয়ই নয়। কেননা আল্লাহ তাআলা গোটা কুরআনকে সব ধরনের বিকৃতি থেকে সুরক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন এবং তিনি এই সুরক্ষানীতিমালা ঘোষণা করেছেন যে, এই কিতাবের অগ্র-পশ্চাৎ কোনো দিক থেকেই ভ্রান্তি অনুপ্রবেশ করতে পারবে না।
আবার কেউ কেউ তৃতীয় আরেকটা মত বর্ণনা করেছেন যে, সে কখনও কখনও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জবান থেকে কোনো একটি আয়াতের তিলাওয়াত শুনত, এভাবে শুনতে শুনতে পরিশেষে সেই আয়াতের কোনো এক বা ততোধিক শব্দ অবশিষ্ট থাকতেই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা তিলাওয়াত করেছিলেন তার মর্মবাণী থেকে সে বুঝে নিত বাকিটুকু কী হতে পারে-যেমনটা অনেক বুদ্ধিমান বুঝতে পারেন। তখন সে নিজ থেকেই সেটা লিখে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শোনাত, নবীজি শুনে বলতেন, 'হ্যাঁ! এভাবেই নাযিল হয়েছে।'
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুরও ঘটনাক্রমে এমন হয়েছিল। সদ্য-নাযিল- হওয়া আয়াতের কিছু অংশ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঠ করেন। উমর ইবনুল খাত্তাব আয়াতের মর্ম অনুধাবনপূর্বক বলে ওঠলেন- فَتَبَارَكَ اللهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ। আর ঘটনাক্রমে সেটা আয়াতের অবশিষ্ট অংশের সাথে মিলে যায়। [৭৯]
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এই ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে প্রথম ব্যাখ্যাটিই অধিক সঠিক ও যৌক্তিক।
• দশম হাদীস
দুই গায়িকার ঘটনার বিবরণ-সম্বলিত বর্ণনা, যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে অশালীন গান গাইত। এদের সাথে বনু হাশিমের এক দাসির কথাও উল্লেখ আছে। ঘটনাটি ঐতিহাসিকদের নিকট প্রসিদ্ধ। [৮০] ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনে খাতালের এই দুই দাসীকে হত্যাদেশ জারি করেন। কেননা এরা নবীজির ব্যাপারে নিন্দামূলক গান গাইত। একটাকে হত্যা করা হয়, আর অন্যটা কোথাও লুকিয়ে থাকে তাকে আমান বা নিরাপত্তা-প্রদানের আগপর্যন্ত। মুহাম্মাদ ইবনে আয়িয, ইবনে ইসহাক ও আব্দুল্লাহ ইবনে হাযম ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন।
বলা হয়ে থাকে, গায়িকা দুজন ইবনে খাতালের ছিল। ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে তার দুই গায়িকা দাসীকেও হত্যা করার নির্দেশ জারি করেন। এ বর্ণনার ব্যাপারে সিয়ার (ইসলামি যুদ্ধ-ইতিহাস) বিদ্বানগণ একমত পোষণ করেন এবং ঘটনাটি তাদের নিকট প্রসিদ্ধ।
এই ঘটনাটা দলিল হলো কীভাবে?
হ্যাঁ, আমরা বলছি যে, আসলি কুফর বা জন্মগতভাবে কাফের হওয়ার কারণেই কোনো নারীকে হত্যা করা বা হত্যা করার পরিকল্পনা করা বৈধ নয়—এটি সর্বসম্মত মাসআলা। এ ব্যাপারে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ ব্যাপক প্রসিদ্ধ। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফের নারী ও শিশুদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। [৮১]
সুতরাং আমরা বুঝতে পারলাম যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে এই দুই গায়িকা নারীকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন সেটা মূলত (আসলি কুফর বা জন্মগত কুফরের কারণে নয়, বরং) নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করা এবং তাকে নিয়ে নোংরা-ভাষায় গান করার কারণে। অতএব যে বা যারাই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তি করবে বা গালমন্দ করবে সর্ব অবস্থায় তাকে হত্যা করা ওয়াজিব।
* একাদশতম হাদীস
মক্কা-বিজয়ের সময় নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিরস্ত্রাণ মাথায় মক্কায় প্রবেশ করলেন। যখন তিনি মাথা থেকে শিরস্ত্রাণ খুললেন, তখন এক লোক এসে বলল, ইবনে খাতাল কাবার গিলাফ ধরে ঝুলে আছে (নিরাপত্তা প্রাপ্তির জন্য)। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাকে হত্যা করো। [৮২]
বর্ণনাটি খুবই প্রসিদ্ধ। বুখারী-মুসলিমে উল্লেখ আছে। তাকে হত্যার কারণ হলো, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে যাকাত উত্তোলনের জন্য নিয়োগ করেন। সঙ্গে আরেকজনকে নিয়োগ দেন তার সহযোগিতার জন্য। কিন্তু সঙ্গীটি তার জন্য খাবার প্রস্তুত না করায় সে বেজায় ক্ষেপে গিয়ে তাকে হত্যা করে ফেলে! পরে সে ভয় পেয়ে যায় যে, এ জন্য তো তাকেও হত্যা করা হতে পারে। ফলে সে মুরতাদ হয়ে সাদাকার মাল নিয়ে পালিয়ে যায়। সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে কটূক্তিমূলক-কবিতা রচনা করত এবং তার দুই দাসীকেও আদেশ করত, তারা যেন সুর করে সেই কবিতাগুলো গায়। ফলে তার রক্ত হালাল হওয়ার জন্য একই সাথে তিনটি কারণ ছিল-
১. মুসলিম হত্যা করা
২. রিদ্দাহ বা ইসলাম ত্যাগ
৩. নবীজিকে কটূক্তি করা
তবে তাকে মুসলিম হত্যার দায়ে হত্যা করা হয়নি। কেননা যদি তাকে হত্যার বদলে হত্যা করা হত, তা হলে তাকে বনু খুযায়ার ওই লোকের ওলীদের কাছে তাকে অর্পণ করা হত, যাকে সে হত্যা করেছিল। তখন ওই লোকেরা তাকে হত্যা করত কিংবা তার কাছ থেকে মুক্তিপণ নিয়ে তাকে ক্ষমা করে দিত।
তাকে ধর্মত্যাগের কারণেও হত্যা করা হয়নি। কেননা মুরতাদ ব্যক্তির তাওবা গ্রহণ করা হয় এবং যদি সে অবকাশ চায় চিন্তা-ভাবনার জন্য, তা হলে তাকে অবকাশ দেওয়া হয়।
অথচ এই ইবনে খাতাল! সে নিরাপত্তার খোঁজে, যুদ্ধ ছেড়ে এবং অস্ত্র ফেলে গোপনে বাইতুল্লায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু এতকিছু জেনেও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কোনো মুরতাদকে তো কেবল ইরতিদাদের কারণে এভাবে হত্যা করা হয় না। তাই আমরা বলব, তাকে হত্যা করা হয়েছিল নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তির কারণে।
• দ্বাদশতম হাদীস
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মক্কা-বিজয়ের পর) একদল লোককে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁকে গালমন্দ করার কারণে। কটূক্তির অপরাধে একদল লোককে তিনি হত্যা করেছেন, অথচ তিনি ওই সকল লোকদেরকেও ছেড়ে দিয়েছেন যারা তখনও কাফের ছিল এবং (মুসলিমদের বিরুদ্ধে) যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। এ বিষয়ে পূর্বে সাঈদ বিন মুসাইয়াবের রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা-বিজয়ের দিন ইবনে জিবারাকে হত্যার আদেশ দেন। ইবনে ইসহাক ঘটনাটি উল্লেখ করে বলেন, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তায়িফ থেকে যুদ্ধ করে ফিরেন তখন বুজির ইবনে জুহাইর তার ভাই কাব ইবনে জুহাইরকে এই সংবাদ দিয়ে পত্র লিখেন যে, মক্কায় যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করেছে এবং কষ্ট দিয়েছে, তিনি তাদের অনেককেই হত্যা করেছেন। কুরাইশ-কবিদের মধ্যে এখনও বাকি আছে ইবনে জিবারা ও হুবাইরা ইবনে আবি ওয়াহাব, এরা কোনো কোনো দিকে পালিয়ে গেছে। ইবনে জিবারা নাজরানে পালিয়ে যায়। পরবর্তীকালে সে যখন ইসলাম গ্রহণ করে এবং নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত হয়। সে কিছু সুন্দর কবিতার মাধ্যমে তার তাওবা ও ওযর পেশ করে। এরপরও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রক্তকে মূল্যহীন ঘোষণা করেন। অথচ তিনি মক্কার অন্যান্য সবাইকে নিরাপত্তা প্রদান করেছিলেন, কিন্তু তার মতো অপরাধ যাদের, তাদেরকে তিনি ক্ষমা করেননি।
রাসূলুল্লাহ যাদেরকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন তাদের মধ্যে ছিল—
• আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়াহ ইবনে মুগিরাহ
• আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে আবু সুফিয়ানের কটূক্তির ঘটনা খুবই প্রসিদ্ধ।[৮৩] আবু সুফিয়ান নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুধভাই। নবীজির দুধ-মা হালিমাতুস সাদিয়াহ তাকেও দুধ পান করিয়ে ছিলেন। কিন্তু নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রক্তকেও মূল্যহীন ঘোষণা করেন। কেননা সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবাগণকে কষ্ট দিয়েছে এবং কটূক্তি করেছে।
(মক্কা-বিজয়ের দিন) তিনি এসে নিজের ব্যর্থতা ও ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেন। তিনি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চাচা আব্বাস, চাচাতো ভাই আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম-সহ অনেকের দোহাই দিয়ে সুপারিশ গ্রহণের আকুতি জানাতে থাকেন। তিনি নবীজির কাছে এসে কবিতা আবৃত্তি করে নিজের ইসলাম গ্রহণ ও ওযর পেশ করতে থাকেন। একপর্যায়ে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রতি নরম হয়ে পড়েন। তখন সে আবৃত্তি করে বলে—
আপনার জীবনের শপথ! যেদিন আমি পতাকা উত্তোলন করি,
যেন লাতের বাহিনি আপনার বাহিনীকে পরাজিত করে!
সেদিনের আমি ছিলাম আধারচ্ছন্ন রাতে দিশেহারা পথিক। আজই সবে আমাকে হিদায়াত দেওয়া হচ্ছে এবং আমি হচ্ছি সুপথ-প্রাপ্ত।
একজন পথপ্রদর্শক আমাকে পথ দেখিয়েছেন, আমি নিজে পথ পাইনি। আমি যাকে একেবারেই তাড়িয়ে দিয়েছিলাম, সেই তিনিই আমাকে দেখিয়েছেন আল্লাহর পথ।
এভাবে সে বাকি কবিতাটুকু আবৃত্তি করে।
আরেক বর্ণনায় [৮৪] আছে-সে বলে, আমরা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করি। কিন্তু তিনি অনুমতি দেন না। নবীজির স্ত্রী উম্মু সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা তখন নবীজির সাথে আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়াহ ও আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিসের ব্যাপারে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জামাতা এবং আপনার ফুফুর ছেলে (আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়াহ), আপনার চাচার ছেলে এবং আপনার ভাই (আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস)। আল্লাহ তাআলা উভয়কেই মুসলমান বানিয়েছেন। তারা যেন আপনার কারণে দুনিয়ার সবচেয়ে হতভাগা না হয়। আপনি তো এদের চেয়েও জঘন্য অপরাধীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। তা হলে এদের অপরাধ তো আপনি ক্ষমা করতেই পারেন। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'সে আমার মানহানি করেছে, তাকে আমার প্রয়োজন নেই।'
আবু সুফিয়ানের কাছে যখন এই সংবাদ পৌঁছল, তার সাথে তখন তার ছেলে ছিল। সে বলতে লাগল, আল্লাহর শপথ! হয়তো তিনি আমাদের ওযর গ্রহণ করবেন, নয়তো আমি আর আমার ছেলে কোনো প্রান্তরে চলে গিয়ে পিপাসার যন্ত্রণায় মৃত্যুর আগপর্যন্ত ওখানেই থাকব। (তিনি এটা কীভাবে সহ্য করবেন?), তিনি তো সবচেয়ে মহান ও সবচেয়ে উদার। এতে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দয়াপ্রবণ হলেন। তখন তিনি তাদেরকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেন। তারা প্রবেশ করে এবং দুজনই ইসলাম গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে তারা অনেক উত্তম মুসলমান হয়েছিলেন। পরবর্তিতে আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়াহ তায়েফের যুদ্ধে শহীদ হন আর আবু সুফিয়ান উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর খিলাফাতের সময় মদীনায় ইন্তেকাল করেন।
এই ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু সুফিয়ান ইবনে হারিসের রক্তকে মূল্যহীন ঘোষণা করেন। অথচ অন্যদিকে কুরাইশদের বড় বড় সরদার-যারা যুদ্ধের জন্য শক্তি জোগান দেওয়া, অর্থ সম্পদ জোগান দেওয়ায় আরও বেশি সক্রিয় ও তৎপর ছিল-তাদেরকে হত্যা করেননি। আসলে তাকে হত্যা করার কারণ হলো, সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালাগাল করত। সে মুসলমান হয়ে আসার পরও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্যতম মহৎ চরিত্র ছিল তিনি দূরের মানুষকেও কাছে টেনে নিতেন, তা হলে আত্মীয়-স্বজনের বেলায় তিনি হৃদয়ে কতটুকু ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য লালন করতেন, চিন্তার বিষয়। তারপরও আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রতি এমন আচরণ করেছিলেন মূলত তার পক্ষ থেকে প্রকাশ-পাওয়া ঘৃণ্য আচরণের কারণে, যেমনটা হাদীসে তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
এমনিভাবে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা-বিজয়ের দিন ছয়জনকে তাদের নাম উল্লেখ করে কতলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারা হলেন-ইবনে আবি সারহ, ইবনে খাতাল, হুওয়াইরিস, মিকইয়াস, ইকরামাহ ও হাব্বার।
এ ছয়জন সম্পর্কে বর্ণনা বেশ প্রসিদ্ধ। রাসূলের সীরাত ও মাগাযীর বর্ণনাকারীগণ এ ধরনের রেওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন। তবে এগুলোর অধিকাংশ মুরসাল। মুরসাল রেওয়ায়াতও যখন বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়, বিশেষত ওই সমস্ত ব্যক্তি থেকে বর্ণিত হয়, যাদের মুরসাল গ্রহণযোগ্য, তবে এগুলো মুসনাদ হাদীসের মতোই, বরং কখনও কখনও আহলুল-মাগাযির মাঝে প্রসিদ্ধ একটি মুরসাল রেওয়ায়াতও একটিমাত্র সনদে বর্ণিত হাদীস থেকেও শক্তিশালী।
এমনিভাবে উকবাহ ইবনে আবি মুআইতকে বেঁধে রেখে হত্যা করা হয়, তখন সে বলছিল, হে কুরাইশরা! আমাকে কেন এভাবে বন্দি করে হত্যা করা হচ্ছে? তখন রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আল্লাহর সাথে কুফরি ও আল্লাহর রাসূলের ওপর মিথ্যা অপবাদের কারণে। [৮৫]
এমনিভাবে নযর ইবনে হারিসকেও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বন্দি করে হত্যা করেন, কেননা সেও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করেছিল।
সুতরাং স্পষ্ট হয়ে গেল যে, বদরের যুদ্ধবন্দিদের মধ্য থেকে দুজনকে বিশেষভাবে হত্যার কারণ হলো কটূক্তি। কুরাইশ ও সমগ্র আরবের যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে বিদ্রূপাত্মক কথা বলত, মক্কা-বিজয়ের পর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দেন।
তেমনি এক জিন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি ও বিদ্রুপ করেছিল। ফলে একজন শক্তিশালী মুসলিম জিন ওই জিনটাকে হত্যা করে ফেলে। পরবর্তীকালে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষজনকে এই ঘটনা শোনান।
এমনিভাবে ইহুদি আবু রাফি ইবনে আবিল হাকিকের ঘটনাও সহীহ বুখারীর প্রসিদ্ধ রেওয়ায়াত।
সুতরাং এই সকল হাদীস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, যে লোক নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করবে, তাকে হত্যা করা হবে এবং জনসমাজকে উৎসাহিত করা হবে তাকে হত্যা করার জন্য।
• ত্রয়োদশতম হাদীস হাদীসটি ইমাম আবুল কাসিম আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ আলবাগাঈ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন এবং আবু আহমাদ ইবনে আদি রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন আল-কামিল গ্রন্থে। [৮৬]
মদীনা থেকে দুই মাইল অদূরে বনু লাইসের একটা গ্রাম ছিল। একলোক তাদেরকে একটি বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় কিন্তু তারা প্রস্তাবটি নাকচ করে দেয়। তখন সে একটি বিশেষ পোশাক পরে তাদের কাছে আসে। সে এসে বলল, আল্লাহর রাসূল এই পোশাক পড়িয়েছেন এবং তোমাদের জান ও মাল-সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে ফয়সালা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তারপর সে ওই নারীর কাছে যায়, যাকে সে ভালোবেসেছিল। তখন তারা (সত্যতা যাচাইয়ের জন্য) রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে লোক পাঠান। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আল্লাহর শত্রু মিথ্যা বলেছে।' তারপর তিনি একজন লোক পাঠিয়ে বলেন, 'যদি তুমি তাকে (জীবিত) খুঁজে পাও তা হলে তার গর্দান উড়িয়ে দেবে। আর যদি দেখো, সে মরে গেছে তা হলে তার দেহ আগুনে জ্বালিয়ে দিবে।'
তারপর তিনি এই হাদীসটি বলেন, مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ 'যে ব্যক্তি আমার নামে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলবে, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।'[৮৭]
হাদীসটির সনদ সহীহ। দুর্বলতার কোনো কারণ জানা যায় না। এ হাদীসের একটি শাহিদ হাদীস রয়েছে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দূতকে বলেছিলেন, وَلا تُحَرِّقْهُ بِالنَّارِ، فَإِن لَا يُعَذِّبُ بِالنَّارِ إِلَّا رَبُّ النَّارِ
তাকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ো না, কেননা আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার একমাত্র আগুনের রবের। [৮৮]
এই হাদীসটির ব্যাখ্যায় দুটি অভিমত :
✓ প্রথম অভিমত
হাদীসের বাহ্যিক দিক গ্রহণ করে বলতে হবে, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা-কথা ছড়াবে তাকে হত্যা করতে হবে। যে-সমস্ত ইমামগণ এ মত গ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন, 'নবীর নামে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলার দ্বারা ব্যক্তি কাফের হয়ে যায়।' এ মত গ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছেন ইমামুল হারামাইন আবু মুহাম্মাদ আল-জুওয়াইনি রাহিমাহুল্লাহ।
তাদের যুক্তি হলো, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা বলার অর্থ হলো আল্লাহ তাআলার নামে মিথ্যা বলা। তাই তো নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমার নামে মিথ্যা বলা আর তোমাদের কারও নামে মিথ্যা বলা একই কথা নয়।'[৮৯] কেননা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ মূলত আল্লাহ তাআলারই আদেশ। তাই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করা ওয়াজিব, যেভাবে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করা ওয়াজিব। সুতরাং রাসূলুল্লাহর নামে মিথ্যাবাদী মূলত তাকে মিথ্যা-প্রতিপন্নকারীর মতোই।
বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা যেতে পারে এভাবে:
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করাও একপ্রকার মিথ্যা বলা। কেননা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করার অর্থ হলো, তিনি যে সকল সংবাদ নিয়ে এসেছেন সেগুলো সত্য নয় বলে ঘোষণা করা। আর এটা স্পষ্টভাবে আল্লাহর দ্বীনকে বাতিল বলার নামান্তর। তা ছাড়া নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে যে মিথ্যা বলবে, সে ইচ্ছাকৃতভাবে দ্বীনের মধ্যে এমন বিষয় ঢুকাল, যা দ্বীনের অংশ নয় এবং সে দাবি করে, তার কথা বিশ্বাস করা উম্মতের জন্য ওয়াজিব। এটা দ্বীনকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করারই নামান্তর। কেননা সে দাবি করছে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে বিষয়ে আদেশ করেছেন সেটা মূলত আদেশ করার মতো বিষয় না। এমনকি এ ব্যাপারে আদেশ করা কখনও কখনও বৈধ নয়। এ ধরনের কথা দ্বারা আল্লাহর সাথে নির্বুদ্ধিতাকে সম্পৃক্ত করা হয়, কিংবা এ দিকে ইঙ্গিত করা হয় যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাতিল বিষয়ে সংবাদ দিয়েছেন, এটা তো স্পষ্ট কুফরি।
মোটকথা, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নামে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলবে, সে যেন ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ তাআলাকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করল, বরং তার অবস্থা আরও জঘন্য। তেমনিভাবে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা কথা বলা তাকে অস্বীকারের নামন্তর।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, জেনে রাখুন, 'এই অভিমতটি অত্যন্ত শক্তিশালী।'
তিনি এর পক্ষে এমন সব দলিল ও প্রমাণ পেশ করেছেন যেগুলো এতটাই মজবুত ও সংখ্যায় বিপুল যে, কোনোভাবেই খণ্ডন করা সম্ভব নয়।
এরপর ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এ দিকে লক্ষ করা জরুরি যে, সরাসরি মিথ্যা-প্রতিপন্ন করা আর ভিন্নভাবে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করার মাঝে পার্থক্য আছে।
যেমন কোনো ব্যক্তি বলল, অমুকের ছেলে অমুক এই হাদীস নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আমাকে বর্ণনা করেছে। যদি সে এভাবে বর্ণনা করে তা হলে সেই 'অমুক' ব্যক্তির নামে মিথ্যা বলল, সরাসরি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে নয়। অর্থাৎ সে মাধ্যমের সাহায্যে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা বলল। আর যদি সে বলে, 'এটা সহীহ হাদীস' অথবা 'এটা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত' এবং বর্ণনাকারী ভালো করে জানে, সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা প্রচার করছে, তা হলে ধরা হবে সে সরাসরি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা-কথা প্রচার করল।
তবে যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা প্রচার করতে অপ্রচলিত বর্ণনা বলে বেড়ায় তার ব্যাপারে মতানৈক্য আছে।
সুতরাং কেউ যদি তার শাইখের কাছ থেকে জেনেশুনে জাল হাদীস বর্ণনা করে, তা হলে কাজটা হারাম হবে। কিন্তু তাকে কাফের বলা যাবে না। তবে সে বর্ণনার মধ্যে যদি এমন কিছু অনুপ্রবেশ করায় যার দ্বারা তাকে কাফের বলা অপরিহার্য হয়ে ওঠে তবে ভিন্ন কথা। (তাকে কাফের বলা যাবে না), কেননা সে এ বিষয়ে সত্যবাদী যে, তার শাইখ তাকে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
আলোচ্য-হাদীসের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, যে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করবে, সে ওই ব্যক্তির চেয়ে বেশি হত্যাযোগ্য যে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা কথা বলে। আর যে ব্যক্তি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ায়াসাল্লাম-এর নামে মিথ্যা বলেছে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কোনো প্রকার তাওবার সুযোগ দেওয়া ছাড়াই হত্যার আদেশ করেছেন। অতএব যে ব্যক্তি গালি দিবে সে তো আরও আগেই এই শাস্তির উপযুক্ত হবে।
✓ দ্বিতীয় অভিমত নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে যে মিথ্যা বলবে, তাকে কঠিনতর শাস্তি দিতে হবে, তবে কাফের বলা যাবে না এবং তাকে হত্যা করাও বৈধ হবে না।
কেননা কুফরি ও হত্যার কারণগুলো সুনির্ধারিত। রাসূলের নামে মিথ্যা বলা সেসব কারণের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই যার কোনো ভিত্তি নেই সেটা সাব্যস্ত করা জায়েয হবে না। দ্বিতীয় মতটি যারা ব্যক্ত করেন, তাদের উচিত কথাকে অবশ্যই শর্তযুক্ত করা। অর্থাৎ তার এহেন মিথ্যা বর্ণনা দ্বারা যেন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাহ্যত কোনো ত্রুটি বোঝানো না হয়, এই শর্তটুকু সংযুক্ত করা।
তবে ঘোড়ার-ঘাম-সংক্রান্ত জাল হাদীস[৯০] ও এ-জাতীয় কুসংস্কারপূর্ণ যে কথাগুলো নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে ত্রুটি হিসাবে চিহ্নিত হয়, সেগুলো যদি কেউ বর্ণনা করে বলে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তবে সে তো রাসূলকে নিয়ে উপহাস করল। আর কোনো সন্দেহ নেই যে, এমন ব্যক্তি কাফের ও তার রক্ত প্রবাহ বৈধ। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ এমনটাই উল্লেখ করেছেন।
সুতরাং ত্রয়োদশ হাদীসে উল্লিখিত ব্যক্তিটি মূলত আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে এমন মিথ্যা-কথ্যা বলেছে যার দ্বারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কলঙ্কিত হন। কেননা এই লোক দাবি করেছে, আল্লাহর রাসূলই তাকে মানুষের জান-মালের বিচারক ও ফয়সাল বানিয়ে পাঠিয়েছেন এবং তাদের যার ঘরে ইচ্ছা রাতযাপনের অনুমতি দিয়েছেন, যেন সে তার কাঙ্ক্ষিত নারীর সাথে রাত কাটিয়ে তার সাথে পাপাচার করতে পারে।
আর যে ব্যক্তি দাবি করবে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হারামকে হালাল করেছেন সে মূলত নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কলঙ্কিত করল। সুতরাং এ কথা প্রমাণিত যে, উভয় অভিমত অনুযায়ী যে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কলঙ্কিত করবে তাকে হত্যা করা হবে। এটাই এখানে মুখ্য আলোচ্য বিষয়।
তবে প্রথম ব্যাখ্যানুযায়ী লোকটা কাফের হবে, আর দ্বিতীয় ব্যাখ্যানুযায়ী কটূক্তিকারী হিসাবে গণ্য হবে। তবে দ্বিতীয় মতটি প্রথম অভিমতটিকে সমর্থন করে যে, যখন সাহাবাগণের সামনে কেউ নবীজির ব্যাপারে কোনো প্রকার মানহানি কিংবা কটূক্তি করত, তৎক্ষণাৎ সাহাবাগণ তা প্রতিহত করতেন।
• চতুর্দশ হাদীস
একজন বেদুইনের ঘটনা। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কিছু দান করেছিলেন, তখন সে নবীজিকে বলল, 'আপনি বণ্টন ঠিককরে ও সুন্দরভাবে করেননি।' তখন মুসলিমগণ তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা যদি তাকে হত্যা করতে তা হলে তো সে জাহান্নামে চলে যেত। [৯১]
হাদীসটি প্রমাণ করে যে, যে ব্যক্তি নবীজিকে কষ্ট দেওয়ার দায়ে নিহত হবে সে জাহান্নামে যাবে। কারণ সে কুফরি করেছে এবং তাকে হত্যা করাও বৈধ। যদি তাকে হত্যা করা বৈধ না হতো তা হলে তো সে শহীদ হয়ে যেত!
এই হাদীসে দেখা যায়, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেদুইনকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কেননা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে কষ্ট দেয় তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার অধিকার নবীর রয়েছে।
এ ধরনের আরেকটি কথা আছে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হুনাইনের গনিমত বণ্টন করেন, তখন এক ব্যক্তি বলল, এ বণ্টনে আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রত্যাশা করা হয়নি।' তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আমাকে ছাড়ুন, আমি এই মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিই!'
হাদীসটি সহীহ মুসলিমে আছে। তবে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকেও হত্যা করেননি। কেননা লোকজন বলাবলি করবে, মুহাম্মাদ নিজের অনুসারীদেরকে হত্যা করে! নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটাই বলেছিলেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এ-জাতীয় কথা বলেছিল। (কুরআনে আছে, সে বলেছিল-) لَئِن رَّجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ যদি আমরা মদীনায় ফিরি, তা হলে অবশ্যই অধিক মর্যাদাশীলগণ অপদস্থদেরকে মদীনা থেকে বের করে দিবে।[৯২]
তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আমাকে অনুমতি দিন, তার গর্দান উড়িয়ে দিই। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তা হলে তো তার পক্ষে অনেকে দাঁড়িয়ে যাবে।'
এটা ওই সময়ের ঘটনা যখন ইসলাম ছিল দুর্বল। ফলে আশঙ্কা ছিল, মানুষ ইসলামের প্রতি বৈরি হয়ে উঠতে পারে।
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, 'কে আছ, ওই ব্যক্তির ব্যাপারে সাহায্য করবে, যে আমার পরিবারকে পর্যন্ত কষ্ট দেয়?' তখন সাদ ইবনে মুআয রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি আপনাকে সাহায্য করব, সে যদি আওস গোত্রের হয় তা হলে আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিব।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদ বিন মুআযের এই কথা প্রত্যাখ্যান করেননি।[৯৩]
• পঞ্চদশ হাদীস
সাইদ ইবনে ইয়াহইয়া আল-উমাবি তার আল-মাগাযি গ্রন্থে ইমাম শাবি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, যখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা বিজয় করেন তখন 'উযযা'র সম্পত্তিগুলোকে আনিয়ে নিজের সামনে ঢেলে দেন তারপর নাম ধরে একজনকে ডেকে তাকে কিছু দেন। তারপর আবু সুফিয়ান ইবনে হারবকে ডেকে সেখান থেকে কিছু দান করেন। তারপর সাঈদ ইবনুল হারিসকে ডেকে কিছু দান করেন। এরপর কুরাইশের কিছু লোককে ডেকে তাদের মধ্যে কিছু বণ্টন করে দেন। কুরাইশের একেকজনকে একেকটা স্বর্ণের বার দান করেন যার প্রত্যেকটার ওজন ছিল পঞ্চাশ থেকে সত্তর মিসকাল[৯৪] পর্যন্ত। তখন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, 'আপনি ভালোকরেই জানেন, আপনি সোনার বারগুলো কাদেরকে দিচ্ছেন!' দ্বিতীয়বার দাঁড়িয়ে সে একই কথা বলল। নবী সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবারও তার দিকে মনযোগ দিলেন না। সে তৃতীয়বার দাঁড়িয়ে বলল, 'আপনি তো ফয়সালা করছেন, কিন্তু ইনসাফ দেখতে পাচ্ছি না। তখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'দুর্ভাগ্য তোমার! তা হলে তো আমার পরে আর কেউই ইনসাফ করতে পারবে না।'
এরপর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকরকে ডেকে বললেন, 'যাও! তাকে হত্যা কর।' কিন্তু তিনি গিয়ে তাকে আর পাননি। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'তুমি যদি তাকে হত্যা করতে, আমি আশা করি-সেই হত 'তাদের' প্রথম ও শেষ।[৯৫]
এই হাদীসটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, এ ধরনের যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অভিযোগ করবে তাদেরকে তাওবার সুযোগ না দিয়েই হত্যা করা হবে। এটি হুনাইনের গনিমত-বণ্টন-সংক্রান্ত ঘটনা নয়, বরং ভিন্ন আরেকটি ঘটনা। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পাঠানো স্বর্ণমুদ্রা-সংক্রান্ত ঘটনাটাও এটি নয়। 'উযযা' মূর্তিকে ভেঙে ফেলার ঘটনা ঘটেছিল মক্কা-বিজয়ের সময়, অষ্টম হিজরিতে। আর হুনাইনের ঘটনা ঘটেছিল মক্কা বিজয়ের পর যিলকদ মাসে। আর আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর স্বর্ণমুদ্রা পাঠানোর ঘটনা ঘটেছিল দশম হিজরিতে।
আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি যে, এক ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফয়সালা মেনে না নেওয়ায় উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে হত্যা করেছিলেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সমর্থনে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছিল। অথচ সেই ব্যক্তির অপরাধ ছিল এই ঘটনায় উল্লেখিত ব্যক্তির অপরাধের চেয়ে অনেক লঘু।
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পাঠানো স্বর্ণমুদ্রা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বণ্টন করেছিলেন। আর সেই বণ্টন নিয়ে এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অভিযুক্ত করেছিল। এই ঘটনা বুখারী-মুসলিমে বিবৃত হয়েছে।
তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, 'এর ঔরসে এমন একদল লোক জন্মাবে, যারা কিতাবুল্লাহ পাঠ করবে তৃপ্তিভরে কিন্তু সেই তিলাওয়াত তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেভাবে তির ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়। তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে আবার মূর্তিপূজারিদেরকেও ছেড়ে দিবে। আমি যদি তাদেরকে পেতাম তা হলে আদ সম্প্রদায়ের মতো হত্যা করতাম।[৯৬]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, 'শেষ জামানায় এমন কিছু লোকের আবির্ভাব হবে, যারা বয়সে হবে নবীন, জ্ঞান-বুদ্ধিতে হবে অপরিপক্ক, দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের মতো কথা বলবে, কিন্তু তাদের ইমান তাদের কণ্ঠনালি পর্যন্ত পৌঁছবে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেভাবে তির ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়। তাদেরকে যেখানেই পাও হত্যা করো। কেননা যে তাদেরকে হত্যা করবে কিয়ামত-দিবসে সে তাদেরকে হত্যা করার প্রতিদান পাবে।[৯৭]
এই সকল হাদীস প্রমাণ করে যে, রাসূলকে কটূক্তিকারী এই লোকটির দলবলকে রাসূল হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন, এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানিয়েছেন, তাদেরকে হত্যা করার মধ্যে রয়েছে হত্যাকারীর জন্য প্রতিদান। তিনি আরও বলেছেন, 'এরা হবে আকাশের নিচে সবচেয়ে জঘন্য নিহত-ব্যক্তি।[৯৮]
তাদের দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিধান আরোপের পরেই তিনি হত্যার-বিধান আরোপ করেছেন। বোঝা গেল, তাদেরকে হত্যা করা আবশ্যক এ জন্যই যে তারা 'দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে করতে দ্বীন থেকে বের হয়ে যায়।' এরা বিভিন্ন প্রকারের। আর এই লোকটাই হলো এদের 'প্রথম পুরুষ, যে নবীর যুগেই আত্মপ্রকাশ করে নবীজির বণ্টন নিয়ে আপত্তি তুলেছে।
সুতরাং যে ব্যক্তি নবীজির কোনো সুন্নাহকে কলঙ্কিত করবে তার বিধান উপরিউক্ত ব্যক্তিদের বিধানের মতোই হবে। অতএব যে দাবি করবে যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বণ্টন করতে গিয়ে জুলুম করেন, সে নবীজিকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করল। তার মতে তা হলে নবীর অনুসরণ আবশ্যক নয়। মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রাসূল হওয়ার মাঝে যে অন্তর্নিহিত গুণগুলো রয়েছে, যেমন আমানতদারিতা এবং তাঁকে মান্য করা আবশ্যক হওয়া, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাজ ও কথা দিয়ে যত ফয়সালা করেন, কোনো ফয়সালায় নিয়ে অন্তরে দ্বিধা-সংশয় না রাখা ইত্যাদি, এ গুণগুলোর সাথে মিথ্যা-প্রতিপন্নকারীর বিশ্বাস সাংঘর্ষিক। কেননা আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করা আল্লাহ ফরয করেছেন আর তিনি কারও ওপর জুলুম করতে পারেন না। সুতরাং যে এ বিষয়ে আপত্তি তুলবে, সে যেন রাসূলের রিসালাতের দায়িত্ব পালন নিয়েই আপত্তি তুলল। রাসূলের রিসালাত নিয়ে আপত্তি নিঃসন্দেহে নিকৃষ্ট ও জঘন্যতম কুফরি।
টিকাঃ
[৫৯] আবু দাউদ, আস-সুনান: ৪৩৬৪
[৬০] খাল্লাল, আল-জামি: ২/৩৪১
[৬১] 'উম্মু ওয়ালাদ' অর্থ যে দাসীর সাথে মনিবের শারীরিক সম্পর্ক হওয়া এবং তার গর্ভে মনিবের সন্তানও জন্ম লাভ করে।
[৬২] আবু দাউদ, আস-সুনান: ৪৩৬৩
[৬৩] খাত্তাবি, মায়ালিমুস সুনান: ৩/২৯৬
[৬৪] বুখারী, আস-সহীহ ৩৮১১; আরও বিস্তারিত রই ডাউনলোড করুন ৪৭৬৫।
[৬৫] তাবারানি, মুজামুস সাগির: ৬৫৯
[৬৬] নাসাঈ, সুনানুল কুবরা: ৩৫৩৪
[৬৭] আবু দাউদ, আস-সুনান: ৪৩৬৫
[৬৮] ওয়াকিদি, আল-মাগাযি: ১/১৭২-১৭৩ সনদ মনকাতি; ইবনে আদি, আল-কামিল: ৬/১৪৫।
[৬৯] ইবনে সাদ, আত-তাবাকাত: ২/২৮
[৭০] খুযাআ ছিল নবিজির মিত্র। আর বনু বকর ছিল কুরাইশদের মিত্র।
[৭১] আবু দাউদ, আস-সুনান: ২৬৮৫; নাসাঈ, আস-সুনান: ৪০৬৭; সনদ সহীহ।
[৭২] ইবনে হিশাম, আস-সিরাত: ২/৪০৯
[৭৩] তাবারি, জামিউল বায়ান: ৫/২৬৮; ওয়াহিদি, আসবাবুন নুযুল: ২৪৫ পৃ.।
[৭৪] সূরা আনয়াম, ৬: ৯৩
[৭৫] বিস্তারিত-বুখারী, আস-সহীহ, কিতাবুল মানাকিব: ৩৬১৭।
[৭৬] শাইখুল ইসলাম এ ঘটনার বিশুদ্ধতা দাবি করেননি। তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, 'ইকরিমাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে।' মূলত এটি ইমাম বা'লির দাবি। (অনুবাদক)
[৭৭] তায়ালিসি, আল-মুসনাদ: ২০২০; আবু আওয়ানা, আল-মুসনাদ: ৩১১১।
[৭৮] আহমাদ, আল-মুসনাদ: ৮৩৭২; এ ব্যাপারে অসংখ্য হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এমনকি এটি মুতাওয়াতির পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কুরআন সাত পাঠ-পদ্ধতিতে অবতীর্ণের ব্যাপারটি সর্বসম্মত। (অনুবাদক)
[৭৯] তায়ালিসি, আল-মুসনাদ: ৪১
[৮০] ওয়াকিদি, আল-মাগাযি: ২/৮৫৯; ইবনে হিশাম, সিরাতুন নবী: ২/৪০৯-৪১০
[৮১] বুখারী, আস-সহীহ : ৩০১৪; মুসলিম, আস-সহীহ : ১৭৪৪
[৮২] বুখারী, আস-সহীহ: ১৮৪৬; মুসলিম, ৩৯৮৮
[৮৩] ওয়াকিদি, আল-মাগাযি: ২/৮০৬-৮০
[৮৪] ওয়াকিদি, আল-মাগাযি: ২/৮১০
[৮৫] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়ািদ
[৮৬] ইবনে আদি, আল-কামিল: ৪/৫৩-৫৪
[৮৭] তাহাবি, মুশকিলুল আসার: ৩৩২
[৮৮] ইবনে যাকারিয়্যা, আল-জালিসুস সালিহ: ১৪
[৮৯] বুখারী, আস-সহীহ: ১২৯১; মুসলিম আস-সহীহ : ৪
[৯০] এটি প্রসিদ্ধ একটি বানোয়াট, ভিত্তিহীন বর্ণনা। ইমাম ইবনুল জাওযি তার প্রসিদ্ধ জাল হাদীস সংকলন আল-মাওযুয়াত গ্রন্থে (১/১০৫) সংকলন করেছেন। মুহাদ্দিসগণ বলেছেন যে, 'এটি বানোয়াট হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আর কোনো মুসলিমও এটি বানায়নি।'
[৯১] আবুশ শাইখ, আখলাকুন নবী: ১৭৭; সনদে ইবরাহীম ইবনুল হাকাম দুর্বল রাবী।
[৯২] সূরা মুনাফিকুন, ৬৩:৮
[৯৩] বুখারী, আস-সহীহ : ৪১৪১; মুসলিম, আস-সহীহ : ২৭৭০।
[৯৪] মিসকাল-আরবের বিশেষ একধরনের ওজন-পদ্ধতি। ১ মিসকাল = ৪.৩৭৪ গ্রাম।
[৯৫] শাইখুল ইসলাম বলেন, 'হাদীসটি মুরসাল। মুজালিদ ইবনে সাইদ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তিনি লাইয়িনুল হাদীস (দুর্বল)। তবে অর্থগত দিক থেকে এর সমর্থনে আরও বহু হাদীস আছে।'
[৯৬] বুখারী, আস-সহীহ: ৩৩৪৪; মুসলিম, আস-সহীহ: ১০৬৪。
[৯৭] বুখারী, আস-সহীহ: ৩৬১১; মুসলিম, আস-সহীহ: ১০৬৬。
[৯৮] আহমাদ, আল-মুসনাদ: আস-সুনান: ৩০০০。
• প্রথম হাদীস ইমাম শাবি রাহিমাহুল্লাহ আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে,
أَنَّ يَهُودِيَّة كَانَتْ تَشْتِمُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَتَقَعُ فِيهِ فَخَنَقَهَا رَجُلٌ حَتَّى مَاتَتْ فَأَبْطَلَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم دَمَهَا
'এক ইহুদি মহিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করত। ফলে একলোক তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মুক্তিপণের পরিবর্তে) ওই মহিলার রক্ত মূল্যহীন ঘোষণা করেন। [৫৯]
হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আবু দাউদ ও ইবনে বাত্তাহ রাহিমাহুমুল্লাহ। ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। [৬০]
আরেক বর্ণনায় এসেছে, সেই হত্যাকারী লোকটি অন্ধ ছিলেন। হাদীসটির সনদ জাইয়িদ ও মুত্তাসিল। কেননা ইমাম শাবি রাহিমাহুল্লাহ আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। আর যদি মুরসালও হয়, তবুও হাদীসটি সর্বসম্মতিক্রমে প্রমাণযোগ্য। কেননা ইমাম শাবি রাহিমাহুল্লাহ বর্ণিত মুরসাল বর্ণনাগুলোও মুহাদ্দিসগণের নিকটে সহীহ। কারণ তার যত মুরসাল বর্ণনা আছে, সবই সহীহ হিসেবে প্রমাণিত।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করার কারণে অভিশপ্ত ইহুদি নারীকে হত্যা করার ব্যাপারে হাদীসটি একেবারেই দ্ব্যর্থহীন। আর এই হাদীসটি আরও স্পষ্টভাবে ওই সকল যিম্মি ও মুসলিম নারী-পুরুষের রক্ত হালাল বানানোর দলিল, যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করে।
• দ্বিতীয় হাদীস ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত, 'এক অন্ধ লোকের একটি 'উম্মু ওয়ালাদ। [৬১] দাসী ছিল। সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করত, তাকে নিয়ে কটূক্তি করত। ফলে অন্ধ লোকটি ধারালো একটি ছুরি নিয়ে দাসীর পেটে বিঁধিয়ে দিয়ে চেপে ধরে রাখলেন। এই ঘটনা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শুনানো হলে তিনি ওই দাসীর রক্ত মূল্যহীন ঘোষণা করেন। [৬২]
আবু দাউদ ও নাসাঈ রাহিমাহুমাল্লাহ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমাদ হাদীসটিকে দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। হতে পারে এই ঘটনাটা হুবহু প্রথম ঘটনা। সেক্ষেত্রে এই ঘটনার বাদিও ইহুদি হবে। কাযি আবু ইয়া'লা রাহিমাহুমুল্লাহ-সহ অন্যান্য আলেমদের অভিমত এটাই। তারা উভয় হাদীসের ঘটনাকে একই ঘটনা মনে করেন। অথবা হতে পারে এটা ভিন্ন আরেকটা ঘটনা।
ইমাম খাত্তাবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
وفيه بيان ان ساب النبي مقتول وذلك أن السب منها لرسول الله ارتداد عن الدين
'এ হাদীস থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গালমন্দকারীকে হত্যা করা হবে। কারণ, গালমন্দ বা অমার্জিত ভাষা ব্যবহার করা মানে মুরতাদ হয়ে যাওয়া বা ইসলাম ত্যাগ করা। [৬৩]
ইমাম খাত্তাবি রাহিমাহুল্লাহ-এর কথা এ দিকে ইঙ্গিত করে যে, তিনি কিটূক্তিকারী নারীটিকে মুসলিম ছিল বলে মনে করেন। কেননা ইমাম খাত্তাবির কথায় ব্যবহৃত 'ইরতিদাদ' মানে ইসলাম ত্যাগ করা। কটূক্তিকারী নারীটির মুসলিম হওয়ার কোনো দলিল হাদীসের মধ্যে নেই, বরং হাদীস থেকে বাহ্যত বোঝা যায়, মহিলাটি কাফের ছিল। কেননা হাদীসে উল্লেখ আছে যে, কটূক্তিকারী দাসীর মনিব তাকে এহেন কাজ থেকে কয়েকবার নিষেধ করেছিলেন। সুতরাং দাসীটি যদি মুরতাদ হতো তা হলে তার সাথে সহবাস করা ও দীর্ঘ সময় ধরে নিজের অধীনে রাখা কোনোভাবেই মুসলিম মনিবের জন্য বৈধ হতো না।
• তৃতীয় হাদীস এটি সেই হাদীস, যে হাদীস দিয়ে ইমাম শাফেঈ রাহিমাহুল্লাহ দলিল দেন যে, কোনো যিম্মিও যদি রাসূলকে কটূক্তি করে, তা হলে তাকে হত্যা করা হবে। হাদীসটি ইহুদি কবি ও গোত্রনেতা কাব ইবনে আশরাফের ঘটনা-সম্বলিত বর্ণনা। ঘটনাটি প্রসিদ্ধ ও স্বতঃসিদ্ধ। একবার নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
مَنْ لِكَعْبِ بْنِ الْأَشْرَفِ فَإِنَّهُ قَدْ آذَى اللهَ وَرَسُولَهُ 'কে আছো কাব ইবনে আশরাফের জন্য? সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে।'
তখন মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রাদিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি চান আমি তাকে হত্যার দায়িত্ব নিই?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' তখন সাহাবি বললেন, 'তা হলে আমাকে কিছু কৌশলী কথা বলার অনুমতি দিন।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুমতি দিলেন। মুহাম্মাদ বিন মাসলামা কাবের কাছে এসে বললেন, এই লোকটা (মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তো এখন আমাদের কাছে সাদাকা চাচ্ছে। লোকটা আমাদেরকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।' কাব এ কথা শুনে বলল, তোমরা তার ব্যাপারে আরও অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে।' (এভাবে তিনি কাবের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।) পরিশেষে তিনি তাকে হত্যা করেন। [৬৪]
হাদীসটি বুখারী ও মুসলিমে আছে। কাব ইবনে আশরাফ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিন্দা করত। ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে হত্যা করার আহ্বান জানান। কাবের জনবল নবীজির কাছে এসে বলল, 'আমাদের সরদার কাবকে গুপ্তহত্যা করা হয়েছে।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'অন্যদের মতো সেও যদি সংযত থাকত তা হলে সে ক্ষতির মুখোমুখি হত না। আমরা তার থেকে কষ্ট পেয়েছি, সে আমাদের নামে নিন্দা-কাব্য রচনা করেছে। তোমাদের কেউ যদি এমন জঘন্য কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, তা হলে তরবারিই তার ফয়সালা করবে।'
এ পর্যায়ে ইহুদিরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। কাব ইবনুল আশরাফের হত্যার পর থেক তারা পুরোপুরি সাবধান হয়ে যায়।
কাব ইবনুল আশরাফ তো নিরাপত্তা-চুক্তিতে আবদ্ধ যিম্মি ছিল। যখন সে কটূক্তি করল, তখন তার নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে গেল। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ব্যাপারে বলেন,
فَإِنَّهُ قَدْ آذَى اللهَ وَرَسُولَهُ
'কেননা সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে।'
সুতরাং যে-কেউই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিবে তাকে হত্যা করা হবে। আর মুসলমানদের সর্বসম্মতিক্রমে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কটূক্তি করার দ্বারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া হয়। সুতরাং কটূক্তির কারণে হত্যার বিধান অবধারিত।
• চতুর্থ হাদীস
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ سَبَّ نَبِيًّا قُتِلَ، وَمَنْ سَبَّ أَصْحَابِي جُلِدَ
'যে ব্যক্তি কোনো নবীকে গালি দিবে তাকে হত্যা করা হবে, আর যে ব্যক্তি আমার কোনো সাহাবিকে গালি দিবে তাকে বেত্রাঘাত করা হবে।[৬৫]
হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আবু মুহাম্মাদ আল-খাল্লাল, আল-আযাজিয়্যি ও আল-হারাওয়ি। হাদীসের থেকে বোঝা যায় যে, এমন ব্যক্তিকে হত্যা করতে হবে, তাওবার সুযোগ দেওয়া হবে না।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী হলো আব্দুল আযিয ইবনে হাসান ইবনে যাবালাহ, তিনি হাদীস বর্ণনায় দুর্বল।
• পঞ্চম হাদীস
আব্দুল্লাহ ইবনে কুদামা রাহিমাহুল্লাহ আবু বারযাহ আসলামি থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এক লোক আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতি কঠিন-ভাষা ব্যবহার করেন। আমি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললাম, আমি কি তাকে হত্যা করব?
তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, 'এমন হুকুম তো নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দকারী ছাড়া অন্য কারও জন্য নয়।'[৬৬]
আরেক বর্ণনায় আছে, এক লোক আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে গালি দিয়েছিল। তখন তিনি উক্ত কথাটি বলেন। আবু দাউদ রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি তার সুনানে সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন।[৬৭]
অনেক আলেম এ হাদীস দ্বারা দলিল পেশ করেছেন যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দকারীর শাস্তি হত্যা। এই অভিমত-পোষণকারীদের মধ্যে আছেন ইমাম আবু দাউদ, ইসমাইল ইবনে ইসহাক, আবু বকর আব্দুল আযিয এবং কাযি আবু ইয়া'লা প্রমুখ। এই হাদীসটি থেকে বোঝা গেল, যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করবে তাকে হত্যা করা বৈধ। হাদীসটি কাফের-মুসলিম উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
• ষষ্ঠ হাদীস
আসমা বিনতু মারওয়ানের ঘটনা। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, খাতমা গোত্রের এক নারী কবিতায় রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অপমান করে। তখন নবীজি বললেন— 'এই মহিলার ব্যাপারে আমার পক্ষে কে আছ?' অখন তার গোত্রের এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি।'
এরপর লোকটা উঠে গিয়ে সেই মহিলাকে হত্যা করল। হত্যা করে ফিরে এসে সংবাদটা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানালে তিনি বললেন, 'মাদি ছাগল দুটো তাকে নিয়ে আর গুঁতোগুঁতি করবে না।[৬৮]
বিভিন্ন মাগাযি-বিশেষজ্ঞদের কাছে ঘটনাটা প্রচলিত। এই মহিলাকে হত্যা করা হয় রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদর থেকে ফিরে আসার পর, পঁচিশে রমাদান। ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন ইতিহাস-বিশেষজ্ঞগণ। যেমন ইবনে সাদ, আল-আসকারি, আবু উবাইদ তার আল-আমওয়াল গ্রন্থে এবং ওয়াকিদি-সহ এবং অন্যান্যরা। এটি একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা। আর এই অভিশপ্ত মহিলাকে হত্যা করার কারণ ছিল সে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করত।
• সপ্তম হাদীস ইহুদি আবু আফাকের ঘটনা। মাগাযি-বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসবিদগণ এটি উল্লেখ করেছেন। তার কাজই ছিল রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে কটূক্তিমূলক কবিতা আবৃত্তি করা।
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বদরের যুদ্ধে বেরিয়ে পড়লেন এবং আল্লাহর সাহায্যে বিজয় লাভ করে ফিরলেন, তখন সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরও হিংসা করতে লাগল। সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিন্দা করে কবিতা আবৃত্তি করল এবং নবীজির অনুসারীদেরকেও কটূক্তি করল। তার কবিতার জঘন্যতম একটি অংশ ছিল-
'এক আরোহী তাদের তাদের বৈধ-অবৈধ সবকিছুই ছিনিয়ে নেয়।'
সালিম ইবনে উমাইর বলেন, 'আমি নযর করেছি, তাকে আমি হত্যা করব।' ইবনে সাদ উল্লেখ করেছেন যে, 'সে ইহুদি ছিল।' তবে এ বর্ণনাটি ইতিহাসবিদদের। তারপরও নিশ্চিতভাবে এটি এ-সংক্রান্ত অন্যন্য হাদীসকে সমর্থন ও জোড়ালো করতে পারে।
• অষ্টম হাদীস আনাস ইবনে যুনাইম আদদিলির ঘটানাটি। সীরাত-বিশারদদের কাছে হাদীসটি প্রসিদ্ধ। ইবনে ইসহাক, ওয়াকিদি-সহ অন্যান্য আলেমগণ এটি বর্ণনা করেছেন। এই লোকটা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করে কবিতা রচনা করেছিল। খুযায়াহ গোত্রের এক মুসলিম তরুণ বিষয়টা শুনতে পেয়ে তার মাথা ফাটিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রক্তকে মূল্যহীন ঘোষণা করেন। অর্থাৎ এই অপরাধের কারণে আঘাতকারীকে কোনো শাস্তিই দেননি।
আনাস ইবনে যুনাইম যখন নবীজির পক্ষ থেকে তার রক্তমূল্যহীনতার ফরমান সম্পর্কে অবহিত হয় তখন সে নবীজির কাছে নিজের অপরাগতার কথা প্রকাশ করে এবং নবীজির ভূয়সী প্রশংসা করে একটি কবিতা আবৃত্তি করে। কবিতার প্রথমাংশ নিম্নরূপ-
আপনি কি সেই মহান ব্যক্তি নন, [৬৯]
যার আদেশে 'মায়াদ' গোত্রকে হিদায়াত দেওয়া হয়? বরং হিদায়াত আল্লাহ দেন, আর আপনাকে বলেন, তুমি সাক্ষী থেকো। কোনো উটনী বহন করেনি নিজের পরে মুহাম্মদের চেয়ে সৎ, মহৎ ও আমানতদারকে।
হে রাসূল! আপনি আমাকে পাকড়াও করতে সক্ষম। আপনার পক্ষ থেকে একটি হুঁশিয়ারিই তো পাকড়াও সমতুল্য। হে রাসূল! তিহামাহ ও নজদের সমস্ত অধিবাসীর ওপর আপনি তো কর্তৃত্ব প্রয়োগের অধিকার রাখেন।
রাসূলকে বলা হয়েছে, আমি নাকি তার মানহানি করেছি। (রটনাকারীরা জেনে নিক) আমার চাবুক নিজের ওপরে চাবুক মারেনি। আমি না কারও মানহানি করেছি, আর না কারও খুন ঝরিয়েছি। একটু ভেবে দেখুন, হে সত্যের প্রসারী! এরপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।
যখন তার এই কবিতা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে পৌঁছে এবং তিনি তার পক্ষ থেকে অপরাগতা স্বীকারের কথা জানতে পারেন, তখন তিনি নওফাল ইবনে মুয়াবিয়ার সাথে তার ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করেন। তখন নাওফালও তার জন্য সুপারিশ করেন, অন্যদিকে বনু খুযায়ার এক বালক তো তার মাথা আগেই ফাটিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'ঠিক আছে, আমি তাকে মাফ করে দিলাম।'
তখন নাওফাল বলেন, 'আমার মা-বাবা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক।' এরপর আনাস ইবনে যুনাইম রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে আবার ওযর পেশ করে বলেন, তারা আমার নামে মিথ্যা বলেছে।
এখানে দলিল হলো, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশদের সাথে দশ বছরের জন্য সন্ধিচুক্তি করেন। এই চুক্তির আওতায় বনু খুযায়াহ ও বনু বকরও অন্তর্ভুক্ত ছিল [৭০]।। এ চুক্তির অধীনে আনাস ইবনে যুনাইমও ছিল। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিন্দা করে কবিতা আবৃত্তি করেছিল, যার ফলে চুক্তিবদ্ধ থাকা সত্বেও অন্য আরেকজন তার মাথা ফাটিয়ে দেয়।
তারা যদি না জানতেন যে, চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তিও যদি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যাপারে কটূক্তি করে তা হলে তাকেও শায়েস্তা করা অপরিহার্য, তা হলে তারা তো তার মাথা ফাটিয়ে দিতেন না।
তাই তো প্রথমে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রক্তকে মূল্যহীন ঘোষণা করেছিলেন। আর এই হুকুমই বোঝায় যে, কটূক্তিকারী চুক্তিবদ্ধ হলেও তার রক্ত বৈধ। এরপর সে যখন নিজের কবিতার মধ্য দিয়ে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেয়, তখন থেকে সবাই তাকে সাহাবাদের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন।
তার কবিতার এই অংশের প্রতি লক্ষ্য করুন, 'জেনে নিন হে আল্লাহর রাসূল!' এই বাক্যটি তার ইসলাম প্রমাণ করে। সাথে সাথে সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমালোচনার বিষয়টিও অস্বীকার করে। এমনকি তার বিরুদ্ধে যারা সাক্ষ্য প্রদান করেছিল সে তাদের সাক্ষ্যকে এই বলে প্রত্যাখ্যান করেছে যে, এরা তো আমার শত্রুগোত্র, আমাদের মধ্যে অনেক যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছে।
আমাদের বক্তব্য হলো, রাসূলকে কটূক্তি করার কারণে যদি রক্ত বৈধ বা মূল্যহীন না হত তা হলে তো এসব কোনো কিছুরই প্রয়োজন হতো না।
তারপরও, সে ইসলাম এনে, ওযর পেশ করে, বিরোধীদের বক্তব্য খণ্ডন ও মিথ্যা-প্রতিপন্ন করে এবং নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রশংসা করেও, রাসূলের কাছে ক্ষমা চাচ্ছে, যেন তিনি তার হত্যা ও রক্ত-বৈধতার ফরমান উঠিয়ে নেন। অপরাধীকে যখন শাস্তি দেওয়া বৈধ, ক্ষমা তো তখনই যথার্থ হয়ে থাকে।
তাই বোঝা যায়, সে মুসলিম হয়ে, ওযর পেশ করেও শাস্তি পাওয়ার যোগ্য ছিল এবং নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাইলে তাকে শাস্তি দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজের মহানুভবতা ও দায়ার কারণে তাকে ক্ষমা করে দেন। তা ছাড়া তার সাথে যে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল সেটা ছিল যুদ্ধবিরতিমূলক চুক্তি, জিযিয়াভিত্তিক কোনো চুক্তি ছিল না। যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে আবদ্ধ ব্যক্তি নিজের দেশে যা ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারে। যতক্ষণ-না সে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উস্কানি বা ঘোষণা দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সে চুক্তি ভঙ্গ হয় না।
তা হলে জানা গেল, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তি করা একপ্রকার যুদ্ধে-নামার মতো, বরং আরও গুরুতর। আর যে কটূক্তিকারী, তার জন্য কোনো ধরনের নিরাপত্তা-বিধান থাকবে না।
• নবম হাদীস
ঘটনাটা ইবনে আবি সারহের। এই ঘটনার ব্যাপারে আহলুল ইলমগণ একমত। বিষয়টা তাদের কাছে এতটাই প্রসিদ্ধ যে, এটি এক ব্যক্তির বর্ণনা হওয়ার সুযোগই নেই। ঘটনাটা হলো—
মক্কা বিজয়ের দিন আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট লুকিয়ে থাকেন। কোনোমতে তাকে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত করেন তিনি এবং বলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আব্দুল্লাহকে (ইসলামের ওপর) বাইয়াত করান।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথা উঠিয়ে তার দিকে তাকান। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তিনবার একই কথা পুনরাবৃত্তি করেন। আর প্রত্যেকবারই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বাইয়াত করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনবারের পর তাকে বাইয়াত করে নেন। তারপর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের বললেন,
أَمَا كَانَ فِيكُمْ رَجُلٌ رَشِيدٌ يَقُومُ إِلَى هَذَا حَيْثُ رَآنِي كَفَفْتُ يَدِي عَنْ بَيْعَتِهِ فَيَقْتُلُهُ
'কী ব্যাপার! তোমাদের মধ্যে কি এমন কোনো চৌকস লোক নেই, যে আমাকে যখন দেখল আমি তার দিকে হাত বাড়াইনি, তখনই তার গর্দান উড়িয়ে দিত?'
সাহাবায়ে কেরাম জবাব দিলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তো জানি না আপনার মনের চাওয়া কী ছিল। আপনি আমাদেরকে কেন চোখ দিয়ে ইঙ্গিত করলেন না?' তখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা কী জানো না যে, কোনো নবীর জন্য চোখের খেয়ানত সমীচীন নয়?'[৭১]
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো তার রক্ত মূল্যহীন করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর দুধভাই ছিল। তাই উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটে তার জন্য সুপারিশ করেছিলেন, ফলে তিনি তাকে মাফ করে দেন।
কিন্তু সে ইসলাম গ্রহণের পর ফের মুরতাদ হয়ে মুশরিকদের দল ভারি করে। অথচ সে ইসলাম গ্রহণের পর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওহি-লেখকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরপর সে মুশরিকদের দলে ভিড়ে প্রচার করতে থাকে, 'আমি যেভাবে চাইতাম সেভাবেই কুরআনকে পরিবর্তন করতাম, কেননা তিনি আমাকে কিছু (ওহি) লিখার আদেশ দিতেন। আমি তাকে বলতাম, 'এমন অথবা এমন লিখলে হবে?' তিনি বলতেন, 'হাঁ, হবে।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতেন 'আলেমুন হাকিম' লেখো। সে বলত, 'আযিযুন হাকিম' লিখলে হবে কি? তিনি বলতেন, হ্যাঁ! দুটো তো একই।[৭২]
বলা হয় যে, এই আয়াতটি তার ব্যাপারে নাযিল হয়েছিল।[৭৩]
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللهِ كَذِبًا أَوْ قَالَ أُوحِيَ إِلَيَّ وَلَمْ يُوحَ إِلَيْهِ شَيْءٌ وَمَنْ قَالَ سَأُنْزِلُ مِثْلَ مَا أَنْزَلَ اللهُ ...
ওই ব্যক্তির চেয়ে বড় জালিম কে হতে পারে, যে আল্লাহর নামে মিথ্যা বলে কিংবা বলে-আমার প্রতি ওহি অবতীর্ণ হয়েছে, অথচ তার প্রতি কিছুই অবতীর্ণ হয়নি অথবা বলে আল্লাহ যেমন নাযিল করেছেন, ওমন আমিও অচিরেই ওহি নাযিল করব।[৭৪]
এই হাদীস থেকে জানা যায়, সে নবীর ওপর মিথ্যা আরোপ করে এবং মানুষের মাঝে বানোয়াট কথা ছড়াতে থাকে যে, তিনি তাকে ওহি লেখতে বলতেন, তার যা ইচ্ছা হত, তাই লিখত আর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেটাকেই বহাল রাখতেন। নিশ্চয় এ মিথ্যাচারও নবীর নামে একপ্রকারের কটূক্তি। ওহি বিকৃতকরণের দাবি সে ছাড়াও আরেকজন করেছিল। আল্লাহ তাআলা তাকে পাকড়াও করেন। তার মৃত্যুর পর লোকেরা তাকে যেখানেই দাফন করে মাটি তাকে উগড়ে দেয়।[৭৫] আর এটাই হচ্ছে সুস্পষ্ট দলিল যে, যে বা যারাই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যাপারে অশালীন মন্তব্য করবে আল্লাহ তাআলা তার থেকে প্রতিশোধ নিবেন, তাকে শায়েস্তা করবেন। সুতরাং তাওবা করে ইসলাম গ্রহণের পরও আব্দুল্লাহ ইবনে আবি সারহের রক্ত বৈধ হওয়া, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে 'কেন তোমরা তাকে হত্যা করোনি?'-এ কথা বলা, এরপর তাকে ক্ষমা করে দেওয়া এসব প্রক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাইলে তাকে হত্যা করতে পারেন, চাইলে ক্ষমাও করতে পারেন।
আবার এটাও প্রমাণ হয় যে, যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করবে তিনি তাকে হত্যা করার পূর্ণ অধিকার রাখেন, যদিও সে তাওবা করে ইসলামের দিকে ফিরে আসে।
বিশুদ্ধ বর্ণনায় [৭৬] আছে, ইবনে আবি সারহ মক্কা-বিজয়ের আগেই ইসলামে ফিরে আসে। সে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলে, 'আমি সত্যিই অনেক বড় অপরাধ করেছি। এখন আমি তাওবা করে আবার ফিরে এসেছি।' তারপর লোকজন যখন একটু স্থিমিত ও প্রশান্ত হয় তখন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে নিয়ে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে হাজির হন। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মনে মনে চাইছিলেন যেন মুসলমানরা তাকে হত্যা করে ফেলে। এ জন্য তিনি বেশ কিছুক্ষণ সময় অপেক্ষা করেন, এরই মধ্যে কেউ তাকে স্বেচ্ছায় হত্যা করে কি না এ জন্যে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভাবছিলেন, হয়তো কেউ তাকে শীঘ্র হত্যা করে ফেলবে। ... এই যে এতকিছু ঘটল, এগুলো স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, ইসলাম গ্রহণের পরও তাকে হত্যা করা বৈধ ছিল।
আব্দুল্লাহ ইবনে আবি সারহ এবং আরেকজন খ্রিষ্টান ওহি-লেখক নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর যে মিথ্যা অভিযোগ করে বলে, তাদের ওহি-বিকৃতির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি জানতেন (কিন্তু কিছুই বলতেন না, বরং সমর্থন করতেন)- এটা ডাহা মিথ্যা কথা। কেননা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওইটাই লেখাতেন যেটা আল্লাহ তাআলা নাযিল করতেন, ওইটাকেই ঠিক রাখতে বলতেন যেটাকে আল্লাহ তাআলা ঠিক রাখতে বলেছেন। নিজের ইচ্ছামাফিক কোনো রদবদল করতেন না। বরং আল্লাহ তাআলা যেভাবে চাইতেন সেভাবেই তিনি লিপিবদ্ধ করাতেন। তবে আহলুল ইলমগণ এতটুকু মতবিরোধ করেন যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে যেটা লেখার নির্দেশ দিতেন তার বিপরীত লিখলেও কি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমর্থন করতেন এবং তাকে এ ব্যাপারে কিছুই বলতেন না? এ ব্যাপারে আলেমগণ দুটো মত পেশ করেছেন-
✓ প্রথম মত এই খ্রিষ্টান ও ইবনে আবি সারহ আগাগোড়োই মিথ্যাচার করেছে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা লিখতে দিয়েছিলেন তার বিপরীত কোনো কিছু স্বীকৃতি দেওয়ার মতো কোনো ঘটনাই ঘটেনি। বরং তারা উভয়ে মনগড়াভাবে বানিয়ে-বুনিয়ে মানুষের সামনে ছড়িয়ে দেয় লোকদেরকে ইসলামের ব্যাপারে সন্দিহান করে তোলার জন্য।
✓ দ্বিতীয় মত হ্যাঁ, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে লিখতে বলতেন। অর্থাৎ তিনি তার সামনে পাঠ করে, তাকে লিখতে বলতেন, سَمِيعًا بَصِيرًا কিন্তু সে লিখত سَمِيعًا عَلِيمًا। ফলে তাকে বলতেন ঠিক আছে, যেভাবে আছে সেভাবেই রেখে দাও-এ- জাতীয় কিছু কথাবার্তা হত। [৭৭]
হতে পারে দুভাবেই নাযিল হয়েছিল, ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতেন, 'এভাবে লিখো, চাইলে ওভাবেও লিখতে পারো। কেননা উভয়টাই সঠিক।' কেননা আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে স্পষ্টভাবে হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন-
أُنْزِلَ الْقُرْآنُ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ 'কুরআন সাত রীতি বা পাঠ-পদ্ধতিতে অবতীর্ণ হয়েছে। [৭৮]
সকল পদ্ধতিই তৃপ্তিদায়ক ও গ্রহণযোগ্য। আপনি যদি عزیز حكيم এর পরিবর্তে غفور رحيم বলেন, তা হলেও ব্যাপারটা একই হবে, যতক্ষণ-না রহমত-সংক্রান্ত আয়াতকে আযাব-সংক্রান্ত আয়াত দিয়ে শেষ করেন অথবা আযাব-সংক্রান্ত আয়াতকে রহমত- সংক্রান্ত আয়াত দিয়ে পাঠ শেষ করেন।
সুতরাং এমন অনেক হাদীস রয়েছে যেগুলো প্রমাণ করে যে, সাত পাঠপদ্ধতিতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে এবং আল্লাহ তাআলার নামসমূহের মধ্য হতে ‘বদল’ হিসেবে কোনো একটা নাম দিয়ে পাঠ শেষ করার বৈধতা দেওয়া হয়েছে সেখানে পাঠক যে-কোনো একটি রীতিশৈলীর কিরায়াত দিয়ে পাঠ শুরু করতে পারে। অতএব নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সেই সাতরীতির কোনো এক রীতিতে লেখার অনুমতি দিয়েছিলেন। দেখা যায় কখনও কখনও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি আয়াত কোনো এক রীতিতে পাঠ করতেন কিন্তু সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলত, ‘আমি কি এই রীতিতে অথবা ওই রীতিতে লিখতে পারি?’ আর সে এটা বলতে পেরেছিল এ জন্যই যে, সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষ থেকে একাধিকবার বিভিন্ন পদ্ধতিতে লিপিবদ্ধ করার অনুমতি পেয়েছিল। ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ভিন্ন কোনো রীতিতে লেখার অনুমোদন দিয়ে বলতেন, ‘হ্যাঁ! এ দুটো তো একই।’
কেননা কুরআন একাধিক রীতিশৈলীতে নাযিল হয়েছিল, তাই তার পক্ষ থেকে ভিন্ন রীতিশৈলীতে লিপিবদ্ধ করাকে সমর্থন করেছিলেন। এরপর যখন জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে প্রতি রমাদানে কুরআন দাওর করতেন অর্থাৎ একে অপরকে শুনাতেন, তখন আল্লাহ তাআলা কয়েকটি রীতিশৈলীকে মানসুখ (রহিত) করে দেন। সর্বশেষ দাওর হয়েছিল যায়িদ ইবনে সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহুর রীতিশৈলীতে। বর্তমানে মানুষ তাঁর পঠনশৈলীতেই কুরআন পাঠ করে। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু-সহ অন্যান্য সাহাবগণ মুসলমানদেরকে এই পঠনরীতির ওপরই ঐক্যবদ্ধ করেন।
এ নিয়ে আরেকটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায় যে-সে নবীজিকে বলত, আমি تعملون লিখব, নাকি تفعلون লিখব? নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতেন, ‘ যেটা ইচ্ছা সেটা লিখো।’ তো আল্লাহ তাআলা তাকে সঠিকটিই লেখার তাওফিক দিতেন। আর উভয়টাই যদি নাযিলকৃত হত, তা হলে আল্লাহ তাআলার নিকট যেটা উত্তম তাকে সেটাই লেখার তাওফিক দিতেন। অথবা একমাত্র যেটা নাযিল হয়েছে সেটাই লেখার সুমতি দান করতেন।
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই সুযোগটা তাকে দিতেন, কারণ একাধিক রীতিশৈলীতে কুরআন নাযিল হওয়ার কারণে সেটা বৈধ ছিল। তাই যত রীতিতে নাযিল হয়েছে সেগুলোর যে-কোনো এক প্রকারে লেখলেই হয়ে যেত। তা ছাড়া নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সুদৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, অবশ্যই আল্লাহ তাআলা কুরআনকে যে-কোনো ধরনের বিকৃতি থেকে হিফাযত করবেন। তিনি এটাও বিশ্বাস করতেন যে, সে ওইটাই লিখতে পারবে, যেটা আল্লাহ তাআলা নাযিল করেছেন। এর বাইরে সে কলম চালনা করতে পারবে না। আর এটা আমাদের এই পবিত্র গ্রন্থ- কিতাবুল্লাহর ব্যাপারে অজানা কোনো বিষয়ই নয়। কেননা আল্লাহ তাআলা গোটা কুরআনকে সব ধরনের বিকৃতি থেকে সুরক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন এবং তিনি এই সুরক্ষানীতিমালা ঘোষণা করেছেন যে, এই কিতাবের অগ্র-পশ্চাৎ কোনো দিক থেকেই ভ্রান্তি অনুপ্রবেশ করতে পারবে না।
আবার কেউ কেউ তৃতীয় আরেকটা মত বর্ণনা করেছেন যে, সে কখনও কখনও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জবান থেকে কোনো একটি আয়াতের তিলাওয়াত শুনত, এভাবে শুনতে শুনতে পরিশেষে সেই আয়াতের কোনো এক বা ততোধিক শব্দ অবশিষ্ট থাকতেই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা তিলাওয়াত করেছিলেন তার মর্মবাণী থেকে সে বুঝে নিত বাকিটুকু কী হতে পারে-যেমনটা অনেক বুদ্ধিমান বুঝতে পারেন। তখন সে নিজ থেকেই সেটা লিখে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শোনাত, নবীজি শুনে বলতেন, 'হ্যাঁ! এভাবেই নাযিল হয়েছে।'
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুরও ঘটনাক্রমে এমন হয়েছিল। সদ্য-নাযিল- হওয়া আয়াতের কিছু অংশ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঠ করেন। উমর ইবনুল খাত্তাব আয়াতের মর্ম অনুধাবনপূর্বক বলে ওঠলেন- فَتَبَارَكَ اللهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ। আর ঘটনাক্রমে সেটা আয়াতের অবশিষ্ট অংশের সাথে মিলে যায়। [৭৯]
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এই ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে প্রথম ব্যাখ্যাটিই অধিক সঠিক ও যৌক্তিক।
• দশম হাদীস
দুই গায়িকার ঘটনার বিবরণ-সম্বলিত বর্ণনা, যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে অশালীন গান গাইত। এদের সাথে বনু হাশিমের এক দাসির কথাও উল্লেখ আছে। ঘটনাটি ঐতিহাসিকদের নিকট প্রসিদ্ধ। [৮০] ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনে খাতালের এই দুই দাসীকে হত্যাদেশ জারি করেন। কেননা এরা নবীজির ব্যাপারে নিন্দামূলক গান গাইত। একটাকে হত্যা করা হয়, আর অন্যটা কোথাও লুকিয়ে থাকে তাকে আমান বা নিরাপত্তা-প্রদানের আগপর্যন্ত। মুহাম্মাদ ইবনে আয়িয, ইবনে ইসহাক ও আব্দুল্লাহ ইবনে হাযম ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন।
বলা হয়ে থাকে, গায়িকা দুজন ইবনে খাতালের ছিল। ফলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে তার দুই গায়িকা দাসীকেও হত্যা করার নির্দেশ জারি করেন। এ বর্ণনার ব্যাপারে সিয়ার (ইসলামি যুদ্ধ-ইতিহাস) বিদ্বানগণ একমত পোষণ করেন এবং ঘটনাটি তাদের নিকট প্রসিদ্ধ।
এই ঘটনাটা দলিল হলো কীভাবে?
হ্যাঁ, আমরা বলছি যে, আসলি কুফর বা জন্মগতভাবে কাফের হওয়ার কারণেই কোনো নারীকে হত্যা করা বা হত্যা করার পরিকল্পনা করা বৈধ নয়—এটি সর্বসম্মত মাসআলা। এ ব্যাপারে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ ব্যাপক প্রসিদ্ধ। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফের নারী ও শিশুদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। [৮১]
সুতরাং আমরা বুঝতে পারলাম যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে এই দুই গায়িকা নারীকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন সেটা মূলত (আসলি কুফর বা জন্মগত কুফরের কারণে নয়, বরং) নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করা এবং তাকে নিয়ে নোংরা-ভাষায় গান করার কারণে। অতএব যে বা যারাই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তি করবে বা গালমন্দ করবে সর্ব অবস্থায় তাকে হত্যা করা ওয়াজিব।
* একাদশতম হাদীস
মক্কা-বিজয়ের সময় নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিরস্ত্রাণ মাথায় মক্কায় প্রবেশ করলেন। যখন তিনি মাথা থেকে শিরস্ত্রাণ খুললেন, তখন এক লোক এসে বলল, ইবনে খাতাল কাবার গিলাফ ধরে ঝুলে আছে (নিরাপত্তা প্রাপ্তির জন্য)। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাকে হত্যা করো। [৮২]
বর্ণনাটি খুবই প্রসিদ্ধ। বুখারী-মুসলিমে উল্লেখ আছে। তাকে হত্যার কারণ হলো, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে যাকাত উত্তোলনের জন্য নিয়োগ করেন। সঙ্গে আরেকজনকে নিয়োগ দেন তার সহযোগিতার জন্য। কিন্তু সঙ্গীটি তার জন্য খাবার প্রস্তুত না করায় সে বেজায় ক্ষেপে গিয়ে তাকে হত্যা করে ফেলে! পরে সে ভয় পেয়ে যায় যে, এ জন্য তো তাকেও হত্যা করা হতে পারে। ফলে সে মুরতাদ হয়ে সাদাকার মাল নিয়ে পালিয়ে যায়। সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে কটূক্তিমূলক-কবিতা রচনা করত এবং তার দুই দাসীকেও আদেশ করত, তারা যেন সুর করে সেই কবিতাগুলো গায়। ফলে তার রক্ত হালাল হওয়ার জন্য একই সাথে তিনটি কারণ ছিল-
১. মুসলিম হত্যা করা
২. রিদ্দাহ বা ইসলাম ত্যাগ
৩. নবীজিকে কটূক্তি করা
তবে তাকে মুসলিম হত্যার দায়ে হত্যা করা হয়নি। কেননা যদি তাকে হত্যার বদলে হত্যা করা হত, তা হলে তাকে বনু খুযায়ার ওই লোকের ওলীদের কাছে তাকে অর্পণ করা হত, যাকে সে হত্যা করেছিল। তখন ওই লোকেরা তাকে হত্যা করত কিংবা তার কাছ থেকে মুক্তিপণ নিয়ে তাকে ক্ষমা করে দিত।
তাকে ধর্মত্যাগের কারণেও হত্যা করা হয়নি। কেননা মুরতাদ ব্যক্তির তাওবা গ্রহণ করা হয় এবং যদি সে অবকাশ চায় চিন্তা-ভাবনার জন্য, তা হলে তাকে অবকাশ দেওয়া হয়।
অথচ এই ইবনে খাতাল! সে নিরাপত্তার খোঁজে, যুদ্ধ ছেড়ে এবং অস্ত্র ফেলে গোপনে বাইতুল্লায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু এতকিছু জেনেও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কোনো মুরতাদকে তো কেবল ইরতিদাদের কারণে এভাবে হত্যা করা হয় না। তাই আমরা বলব, তাকে হত্যা করা হয়েছিল নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটূক্তির কারণে।
• দ্বাদশতম হাদীস
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মক্কা-বিজয়ের পর) একদল লোককে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁকে গালমন্দ করার কারণে। কটূক্তির অপরাধে একদল লোককে তিনি হত্যা করেছেন, অথচ তিনি ওই সকল লোকদেরকেও ছেড়ে দিয়েছেন যারা তখনও কাফের ছিল এবং (মুসলিমদের বিরুদ্ধে) যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। এ বিষয়ে পূর্বে সাঈদ বিন মুসাইয়াবের রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা-বিজয়ের দিন ইবনে জিবারাকে হত্যার আদেশ দেন। ইবনে ইসহাক ঘটনাটি উল্লেখ করে বলেন, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তায়িফ থেকে যুদ্ধ করে ফিরেন তখন বুজির ইবনে জুহাইর তার ভাই কাব ইবনে জুহাইরকে এই সংবাদ দিয়ে পত্র লিখেন যে, মক্কায় যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করেছে এবং কষ্ট দিয়েছে, তিনি তাদের অনেককেই হত্যা করেছেন। কুরাইশ-কবিদের মধ্যে এখনও বাকি আছে ইবনে জিবারা ও হুবাইরা ইবনে আবি ওয়াহাব, এরা কোনো কোনো দিকে পালিয়ে গেছে। ইবনে জিবারা নাজরানে পালিয়ে যায়। পরবর্তীকালে সে যখন ইসলাম গ্রহণ করে এবং নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত হয়। সে কিছু সুন্দর কবিতার মাধ্যমে তার তাওবা ও ওযর পেশ করে। এরপরও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রক্তকে মূল্যহীন ঘোষণা করেন। অথচ তিনি মক্কার অন্যান্য সবাইকে নিরাপত্তা প্রদান করেছিলেন, কিন্তু তার মতো অপরাধ যাদের, তাদেরকে তিনি ক্ষমা করেননি।
রাসূলুল্লাহ যাদেরকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন তাদের মধ্যে ছিল—
• আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়াহ ইবনে মুগিরাহ
• আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে আবু সুফিয়ানের কটূক্তির ঘটনা খুবই প্রসিদ্ধ।[৮৩] আবু সুফিয়ান নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুধভাই। নবীজির দুধ-মা হালিমাতুস সাদিয়াহ তাকেও দুধ পান করিয়ে ছিলেন। কিন্তু নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার রক্তকেও মূল্যহীন ঘোষণা করেন। কেননা সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবাগণকে কষ্ট দিয়েছে এবং কটূক্তি করেছে।
(মক্কা-বিজয়ের দিন) তিনি এসে নিজের ব্যর্থতা ও ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেন। তিনি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চাচা আব্বাস, চাচাতো ভাই আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম-সহ অনেকের দোহাই দিয়ে সুপারিশ গ্রহণের আকুতি জানাতে থাকেন। তিনি নবীজির কাছে এসে কবিতা আবৃত্তি করে নিজের ইসলাম গ্রহণ ও ওযর পেশ করতে থাকেন। একপর্যায়ে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রতি নরম হয়ে পড়েন। তখন সে আবৃত্তি করে বলে—
আপনার জীবনের শপথ! যেদিন আমি পতাকা উত্তোলন করি,
যেন লাতের বাহিনি আপনার বাহিনীকে পরাজিত করে!
সেদিনের আমি ছিলাম আধারচ্ছন্ন রাতে দিশেহারা পথিক। আজই সবে আমাকে হিদায়াত দেওয়া হচ্ছে এবং আমি হচ্ছি সুপথ-প্রাপ্ত।
একজন পথপ্রদর্শক আমাকে পথ দেখিয়েছেন, আমি নিজে পথ পাইনি। আমি যাকে একেবারেই তাড়িয়ে দিয়েছিলাম, সেই তিনিই আমাকে দেখিয়েছেন আল্লাহর পথ।
এভাবে সে বাকি কবিতাটুকু আবৃত্তি করে।
আরেক বর্ণনায় [৮৪] আছে-সে বলে, আমরা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করি। কিন্তু তিনি অনুমতি দেন না। নবীজির স্ত্রী উম্মু সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা তখন নবীজির সাথে আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়াহ ও আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিসের ব্যাপারে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জামাতা এবং আপনার ফুফুর ছেলে (আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়াহ), আপনার চাচার ছেলে এবং আপনার ভাই (আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস)। আল্লাহ তাআলা উভয়কেই মুসলমান বানিয়েছেন। তারা যেন আপনার কারণে দুনিয়ার সবচেয়ে হতভাগা না হয়। আপনি তো এদের চেয়েও জঘন্য অপরাধীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। তা হলে এদের অপরাধ তো আপনি ক্ষমা করতেই পারেন। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'সে আমার মানহানি করেছে, তাকে আমার প্রয়োজন নেই।'
আবু সুফিয়ানের কাছে যখন এই সংবাদ পৌঁছল, তার সাথে তখন তার ছেলে ছিল। সে বলতে লাগল, আল্লাহর শপথ! হয়তো তিনি আমাদের ওযর গ্রহণ করবেন, নয়তো আমি আর আমার ছেলে কোনো প্রান্তরে চলে গিয়ে পিপাসার যন্ত্রণায় মৃত্যুর আগপর্যন্ত ওখানেই থাকব। (তিনি এটা কীভাবে সহ্য করবেন?), তিনি তো সবচেয়ে মহান ও সবচেয়ে উদার। এতে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দয়াপ্রবণ হলেন। তখন তিনি তাদেরকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেন। তারা প্রবেশ করে এবং দুজনই ইসলাম গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে তারা অনেক উত্তম মুসলমান হয়েছিলেন। পরবর্তিতে আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়াহ তায়েফের যুদ্ধে শহীদ হন আর আবু সুফিয়ান উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর খিলাফাতের সময় মদীনায় ইন্তেকাল করেন।
এই ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু সুফিয়ান ইবনে হারিসের রক্তকে মূল্যহীন ঘোষণা করেন। অথচ অন্যদিকে কুরাইশদের বড় বড় সরদার-যারা যুদ্ধের জন্য শক্তি জোগান দেওয়া, অর্থ সম্পদ জোগান দেওয়ায় আরও বেশি সক্রিয় ও তৎপর ছিল-তাদেরকে হত্যা করেননি। আসলে তাকে হত্যা করার কারণ হলো, সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালাগাল করত। সে মুসলমান হয়ে আসার পরও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্যতম মহৎ চরিত্র ছিল তিনি দূরের মানুষকেও কাছে টেনে নিতেন, তা হলে আত্মীয়-স্বজনের বেলায় তিনি হৃদয়ে কতটুকু ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য লালন করতেন, চিন্তার বিষয়। তারপরও আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রতি এমন আচরণ করেছিলেন মূলত তার পক্ষ থেকে প্রকাশ-পাওয়া ঘৃণ্য আচরণের কারণে, যেমনটা হাদীসে তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
এমনিভাবে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা-বিজয়ের দিন ছয়জনকে তাদের নাম উল্লেখ করে কতলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারা হলেন-ইবনে আবি সারহ, ইবনে খাতাল, হুওয়াইরিস, মিকইয়াস, ইকরামাহ ও হাব্বার।
এ ছয়জন সম্পর্কে বর্ণনা বেশ প্রসিদ্ধ। রাসূলের সীরাত ও মাগাযীর বর্ণনাকারীগণ এ ধরনের রেওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন। তবে এগুলোর অধিকাংশ মুরসাল। মুরসাল রেওয়ায়াতও যখন বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়, বিশেষত ওই সমস্ত ব্যক্তি থেকে বর্ণিত হয়, যাদের মুরসাল গ্রহণযোগ্য, তবে এগুলো মুসনাদ হাদীসের মতোই, বরং কখনও কখনও আহলুল-মাগাযির মাঝে প্রসিদ্ধ একটি মুরসাল রেওয়ায়াতও একটিমাত্র সনদে বর্ণিত হাদীস থেকেও শক্তিশালী।
এমনিভাবে উকবাহ ইবনে আবি মুআইতকে বেঁধে রেখে হত্যা করা হয়, তখন সে বলছিল, হে কুরাইশরা! আমাকে কেন এভাবে বন্দি করে হত্যা করা হচ্ছে? তখন রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আল্লাহর সাথে কুফরি ও আল্লাহর রাসূলের ওপর মিথ্যা অপবাদের কারণে। [৮৫]
এমনিভাবে নযর ইবনে হারিসকেও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বন্দি করে হত্যা করেন, কেননা সেও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করেছিল।
সুতরাং স্পষ্ট হয়ে গেল যে, বদরের যুদ্ধবন্দিদের মধ্য থেকে দুজনকে বিশেষভাবে হত্যার কারণ হলো কটূক্তি। কুরাইশ ও সমগ্র আরবের যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে বিদ্রূপাত্মক কথা বলত, মক্কা-বিজয়ের পর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দেন।
তেমনি এক জিন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি ও বিদ্রুপ করেছিল। ফলে একজন শক্তিশালী মুসলিম জিন ওই জিনটাকে হত্যা করে ফেলে। পরবর্তীকালে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষজনকে এই ঘটনা শোনান।
এমনিভাবে ইহুদি আবু রাফি ইবনে আবিল হাকিকের ঘটনাও সহীহ বুখারীর প্রসিদ্ধ রেওয়ায়াত।
সুতরাং এই সকল হাদীস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, যে লোক নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটূক্তি করবে, তাকে হত্যা করা হবে এবং জনসমাজকে উৎসাহিত করা হবে তাকে হত্যা করার জন্য।
• ত্রয়োদশতম হাদীস হাদীসটি ইমাম আবুল কাসিম আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ আলবাগাঈ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন এবং আবু আহমাদ ইবনে আদি রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন আল-কামিল গ্রন্থে। [৮৬]
মদীনা থেকে দুই মাইল অদূরে বনু লাইসের একটা গ্রাম ছিল। একলোক তাদেরকে একটি বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় কিন্তু তারা প্রস্তাবটি নাকচ করে দেয়। তখন সে একটি বিশেষ পোশাক পরে তাদের কাছে আসে। সে এসে বলল, আল্লাহর রাসূল এই পোশাক পড়িয়েছেন এবং তোমাদের জান ও মাল-সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে ফয়সালা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তারপর সে ওই নারীর কাছে যায়, যাকে সে ভালোবেসেছিল। তখন তারা (সত্যতা যাচাইয়ের জন্য) রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে লোক পাঠান। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আল্লাহর শত্রু মিথ্যা বলেছে।' তারপর তিনি একজন লোক পাঠিয়ে বলেন, 'যদি তুমি তাকে (জীবিত) খুঁজে পাও তা হলে তার গর্দান উড়িয়ে দেবে। আর যদি দেখো, সে মরে গেছে তা হলে তার দেহ আগুনে জ্বালিয়ে দিবে।'
তারপর তিনি এই হাদীসটি বলেন, مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ 'যে ব্যক্তি আমার নামে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলবে, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।'[৮৭]
হাদীসটির সনদ সহীহ। দুর্বলতার কোনো কারণ জানা যায় না। এ হাদীসের একটি শাহিদ হাদীস রয়েছে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দূতকে বলেছিলেন, وَلا تُحَرِّقْهُ بِالنَّارِ، فَإِن لَا يُعَذِّبُ بِالنَّارِ إِلَّا رَبُّ النَّارِ
তাকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ো না, কেননা আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার একমাত্র আগুনের রবের। [৮৮]
এই হাদীসটির ব্যাখ্যায় দুটি অভিমত :
✓ প্রথম অভিমত
হাদীসের বাহ্যিক দিক গ্রহণ করে বলতে হবে, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা-কথা ছড়াবে তাকে হত্যা করতে হবে। যে-সমস্ত ইমামগণ এ মত গ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন, 'নবীর নামে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলার দ্বারা ব্যক্তি কাফের হয়ে যায়।' এ মত গ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছেন ইমামুল হারামাইন আবু মুহাম্মাদ আল-জুওয়াইনি রাহিমাহুল্লাহ।
তাদের যুক্তি হলো, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা বলার অর্থ হলো আল্লাহ তাআলার নামে মিথ্যা বলা। তাই তো নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমার নামে মিথ্যা বলা আর তোমাদের কারও নামে মিথ্যা বলা একই কথা নয়।'[৮৯] কেননা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ মূলত আল্লাহ তাআলারই আদেশ। তাই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করা ওয়াজিব, যেভাবে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করা ওয়াজিব। সুতরাং রাসূলুল্লাহর নামে মিথ্যাবাদী মূলত তাকে মিথ্যা-প্রতিপন্নকারীর মতোই।
বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা যেতে পারে এভাবে:
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করাও একপ্রকার মিথ্যা বলা। কেননা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করার অর্থ হলো, তিনি যে সকল সংবাদ নিয়ে এসেছেন সেগুলো সত্য নয় বলে ঘোষণা করা। আর এটা স্পষ্টভাবে আল্লাহর দ্বীনকে বাতিল বলার নামান্তর। তা ছাড়া নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে যে মিথ্যা বলবে, সে ইচ্ছাকৃতভাবে দ্বীনের মধ্যে এমন বিষয় ঢুকাল, যা দ্বীনের অংশ নয় এবং সে দাবি করে, তার কথা বিশ্বাস করা উম্মতের জন্য ওয়াজিব। এটা দ্বীনকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করারই নামান্তর। কেননা সে দাবি করছে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে বিষয়ে আদেশ করেছেন সেটা মূলত আদেশ করার মতো বিষয় না। এমনকি এ ব্যাপারে আদেশ করা কখনও কখনও বৈধ নয়। এ ধরনের কথা দ্বারা আল্লাহর সাথে নির্বুদ্ধিতাকে সম্পৃক্ত করা হয়, কিংবা এ দিকে ইঙ্গিত করা হয় যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাতিল বিষয়ে সংবাদ দিয়েছেন, এটা তো স্পষ্ট কুফরি।
মোটকথা, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নামে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলবে, সে যেন ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ তাআলাকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করল, বরং তার অবস্থা আরও জঘন্য। তেমনিভাবে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা কথা বলা তাকে অস্বীকারের নামন্তর।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, জেনে রাখুন, 'এই অভিমতটি অত্যন্ত শক্তিশালী।'
তিনি এর পক্ষে এমন সব দলিল ও প্রমাণ পেশ করেছেন যেগুলো এতটাই মজবুত ও সংখ্যায় বিপুল যে, কোনোভাবেই খণ্ডন করা সম্ভব নয়।
এরপর ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এ দিকে লক্ষ করা জরুরি যে, সরাসরি মিথ্যা-প্রতিপন্ন করা আর ভিন্নভাবে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করার মাঝে পার্থক্য আছে।
যেমন কোনো ব্যক্তি বলল, অমুকের ছেলে অমুক এই হাদীস নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আমাকে বর্ণনা করেছে। যদি সে এভাবে বর্ণনা করে তা হলে সেই 'অমুক' ব্যক্তির নামে মিথ্যা বলল, সরাসরি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে নয়। অর্থাৎ সে মাধ্যমের সাহায্যে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা বলল। আর যদি সে বলে, 'এটা সহীহ হাদীস' অথবা 'এটা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত' এবং বর্ণনাকারী ভালো করে জানে, সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা প্রচার করছে, তা হলে ধরা হবে সে সরাসরি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা-কথা প্রচার করল।
তবে যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা প্রচার করতে অপ্রচলিত বর্ণনা বলে বেড়ায় তার ব্যাপারে মতানৈক্য আছে।
সুতরাং কেউ যদি তার শাইখের কাছ থেকে জেনেশুনে জাল হাদীস বর্ণনা করে, তা হলে কাজটা হারাম হবে। কিন্তু তাকে কাফের বলা যাবে না। তবে সে বর্ণনার মধ্যে যদি এমন কিছু অনুপ্রবেশ করায় যার দ্বারা তাকে কাফের বলা অপরিহার্য হয়ে ওঠে তবে ভিন্ন কথা। (তাকে কাফের বলা যাবে না), কেননা সে এ বিষয়ে সত্যবাদী যে, তার শাইখ তাকে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
আলোচ্য-হাদীসের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, যে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করবে, সে ওই ব্যক্তির চেয়ে বেশি হত্যাযোগ্য যে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যা কথা বলে। আর যে ব্যক্তি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ায়াসাল্লাম-এর নামে মিথ্যা বলেছে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কোনো প্রকার তাওবার সুযোগ দেওয়া ছাড়াই হত্যার আদেশ করেছেন। অতএব যে ব্যক্তি গালি দিবে সে তো আরও আগেই এই শাস্তির উপযুক্ত হবে।
✓ দ্বিতীয় অভিমত নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে যে মিথ্যা বলবে, তাকে কঠিনতর শাস্তি দিতে হবে, তবে কাফের বলা যাবে না এবং তাকে হত্যা করাও বৈধ হবে না।
কেননা কুফরি ও হত্যার কারণগুলো সুনির্ধারিত। রাসূলের নামে মিথ্যা বলা সেসব কারণের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই যার কোনো ভিত্তি নেই সেটা সাব্যস্ত করা জায়েয হবে না। দ্বিতীয় মতটি যারা ব্যক্ত করেন, তাদের উচিত কথাকে অবশ্যই শর্তযুক্ত করা। অর্থাৎ তার এহেন মিথ্যা বর্ণনা দ্বারা যেন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাহ্যত কোনো ত্রুটি বোঝানো না হয়, এই শর্তটুকু সংযুক্ত করা।
তবে ঘোড়ার-ঘাম-সংক্রান্ত জাল হাদীস[৯০] ও এ-জাতীয় কুসংস্কারপূর্ণ যে কথাগুলো নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে ত্রুটি হিসাবে চিহ্নিত হয়, সেগুলো যদি কেউ বর্ণনা করে বলে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তবে সে তো রাসূলকে নিয়ে উপহাস করল। আর কোনো সন্দেহ নেই যে, এমন ব্যক্তি কাফের ও তার রক্ত প্রবাহ বৈধ। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ এমনটাই উল্লেখ করেছেন।
সুতরাং ত্রয়োদশ হাদীসে উল্লিখিত ব্যক্তিটি মূলত আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে এমন মিথ্যা-কথ্যা বলেছে যার দ্বারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কলঙ্কিত হন। কেননা এই লোক দাবি করেছে, আল্লাহর রাসূলই তাকে মানুষের জান-মালের বিচারক ও ফয়সাল বানিয়ে পাঠিয়েছেন এবং তাদের যার ঘরে ইচ্ছা রাতযাপনের অনুমতি দিয়েছেন, যেন সে তার কাঙ্ক্ষিত নারীর সাথে রাত কাটিয়ে তার সাথে পাপাচার করতে পারে।
আর যে ব্যক্তি দাবি করবে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হারামকে হালাল করেছেন সে মূলত নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কলঙ্কিত করল। সুতরাং এ কথা প্রমাণিত যে, উভয় অভিমত অনুযায়ী যে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কলঙ্কিত করবে তাকে হত্যা করা হবে। এটাই এখানে মুখ্য আলোচ্য বিষয়।
তবে প্রথম ব্যাখ্যানুযায়ী লোকটা কাফের হবে, আর দ্বিতীয় ব্যাখ্যানুযায়ী কটূক্তিকারী হিসাবে গণ্য হবে। তবে দ্বিতীয় মতটি প্রথম অভিমতটিকে সমর্থন করে যে, যখন সাহাবাগণের সামনে কেউ নবীজির ব্যাপারে কোনো প্রকার মানহানি কিংবা কটূক্তি করত, তৎক্ষণাৎ সাহাবাগণ তা প্রতিহত করতেন।
• চতুর্দশ হাদীস
একজন বেদুইনের ঘটনা। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কিছু দান করেছিলেন, তখন সে নবীজিকে বলল, 'আপনি বণ্টন ঠিককরে ও সুন্দরভাবে করেননি।' তখন মুসলিমগণ তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা যদি তাকে হত্যা করতে তা হলে তো সে জাহান্নামে চলে যেত। [৯১]
হাদীসটি প্রমাণ করে যে, যে ব্যক্তি নবীজিকে কষ্ট দেওয়ার দায়ে নিহত হবে সে জাহান্নামে যাবে। কারণ সে কুফরি করেছে এবং তাকে হত্যা করাও বৈধ। যদি তাকে হত্যা করা বৈধ না হতো তা হলে তো সে শহীদ হয়ে যেত!
এই হাদীসে দেখা যায়, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেদুইনকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কেননা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে কষ্ট দেয় তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার অধিকার নবীর রয়েছে।
এ ধরনের আরেকটি কথা আছে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হুনাইনের গনিমত বণ্টন করেন, তখন এক ব্যক্তি বলল, এ বণ্টনে আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রত্যাশা করা হয়নি।' তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আমাকে ছাড়ুন, আমি এই মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিই!'
হাদীসটি সহীহ মুসলিমে আছে। তবে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকেও হত্যা করেননি। কেননা লোকজন বলাবলি করবে, মুহাম্মাদ নিজের অনুসারীদেরকে হত্যা করে! নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটাই বলেছিলেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এ-জাতীয় কথা বলেছিল। (কুরআনে আছে, সে বলেছিল-) لَئِن رَّجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ যদি আমরা মদীনায় ফিরি, তা হলে অবশ্যই অধিক মর্যাদাশীলগণ অপদস্থদেরকে মদীনা থেকে বের করে দিবে।[৯২]
তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আমাকে অনুমতি দিন, তার গর্দান উড়িয়ে দিই। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তা হলে তো তার পক্ষে অনেকে দাঁড়িয়ে যাবে।'
এটা ওই সময়ের ঘটনা যখন ইসলাম ছিল দুর্বল। ফলে আশঙ্কা ছিল, মানুষ ইসলামের প্রতি বৈরি হয়ে উঠতে পারে।
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, 'কে আছ, ওই ব্যক্তির ব্যাপারে সাহায্য করবে, যে আমার পরিবারকে পর্যন্ত কষ্ট দেয়?' তখন সাদ ইবনে মুআয রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি আপনাকে সাহায্য করব, সে যদি আওস গোত্রের হয় তা হলে আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিব।' নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদ বিন মুআযের এই কথা প্রত্যাখ্যান করেননি।[৯৩]
• পঞ্চদশ হাদীস
সাইদ ইবনে ইয়াহইয়া আল-উমাবি তার আল-মাগাযি গ্রন্থে ইমাম শাবি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, যখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা বিজয় করেন তখন 'উযযা'র সম্পত্তিগুলোকে আনিয়ে নিজের সামনে ঢেলে দেন তারপর নাম ধরে একজনকে ডেকে তাকে কিছু দেন। তারপর আবু সুফিয়ান ইবনে হারবকে ডেকে সেখান থেকে কিছু দান করেন। তারপর সাঈদ ইবনুল হারিসকে ডেকে কিছু দান করেন। এরপর কুরাইশের কিছু লোককে ডেকে তাদের মধ্যে কিছু বণ্টন করে দেন। কুরাইশের একেকজনকে একেকটা স্বর্ণের বার দান করেন যার প্রত্যেকটার ওজন ছিল পঞ্চাশ থেকে সত্তর মিসকাল[৯৪] পর্যন্ত। তখন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, 'আপনি ভালোকরেই জানেন, আপনি সোনার বারগুলো কাদেরকে দিচ্ছেন!' দ্বিতীয়বার দাঁড়িয়ে সে একই কথা বলল। নবী সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবারও তার দিকে মনযোগ দিলেন না। সে তৃতীয়বার দাঁড়িয়ে বলল, 'আপনি তো ফয়সালা করছেন, কিন্তু ইনসাফ দেখতে পাচ্ছি না। তখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'দুর্ভাগ্য তোমার! তা হলে তো আমার পরে আর কেউই ইনসাফ করতে পারবে না।'
এরপর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকরকে ডেকে বললেন, 'যাও! তাকে হত্যা কর।' কিন্তু তিনি গিয়ে তাকে আর পাননি। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'তুমি যদি তাকে হত্যা করতে, আমি আশা করি-সেই হত 'তাদের' প্রথম ও শেষ।[৯৫]
এই হাদীসটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, এ ধরনের যারা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অভিযোগ করবে তাদেরকে তাওবার সুযোগ না দিয়েই হত্যা করা হবে। এটি হুনাইনের গনিমত-বণ্টন-সংক্রান্ত ঘটনা নয়, বরং ভিন্ন আরেকটি ঘটনা। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পাঠানো স্বর্ণমুদ্রা-সংক্রান্ত ঘটনাটাও এটি নয়। 'উযযা' মূর্তিকে ভেঙে ফেলার ঘটনা ঘটেছিল মক্কা-বিজয়ের সময়, অষ্টম হিজরিতে। আর হুনাইনের ঘটনা ঘটেছিল মক্কা বিজয়ের পর যিলকদ মাসে। আর আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর স্বর্ণমুদ্রা পাঠানোর ঘটনা ঘটেছিল দশম হিজরিতে।
আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি যে, এক ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফয়সালা মেনে না নেওয়ায় উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে হত্যা করেছিলেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সমর্থনে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছিল। অথচ সেই ব্যক্তির অপরাধ ছিল এই ঘটনায় উল্লেখিত ব্যক্তির অপরাধের চেয়ে অনেক লঘু।
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পাঠানো স্বর্ণমুদ্রা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বণ্টন করেছিলেন। আর সেই বণ্টন নিয়ে এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অভিযুক্ত করেছিল। এই ঘটনা বুখারী-মুসলিমে বিবৃত হয়েছে।
তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, 'এর ঔরসে এমন একদল লোক জন্মাবে, যারা কিতাবুল্লাহ পাঠ করবে তৃপ্তিভরে কিন্তু সেই তিলাওয়াত তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেভাবে তির ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়। তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে আবার মূর্তিপূজারিদেরকেও ছেড়ে দিবে। আমি যদি তাদেরকে পেতাম তা হলে আদ সম্প্রদায়ের মতো হত্যা করতাম।[৯৬]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, 'শেষ জামানায় এমন কিছু লোকের আবির্ভাব হবে, যারা বয়সে হবে নবীন, জ্ঞান-বুদ্ধিতে হবে অপরিপক্ক, দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের মতো কথা বলবে, কিন্তু তাদের ইমান তাদের কণ্ঠনালি পর্যন্ত পৌঁছবে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেভাবে তির ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়। তাদেরকে যেখানেই পাও হত্যা করো। কেননা যে তাদেরকে হত্যা করবে কিয়ামত-দিবসে সে তাদেরকে হত্যা করার প্রতিদান পাবে।[৯৭]
এই সকল হাদীস প্রমাণ করে যে, রাসূলকে কটূক্তিকারী এই লোকটির দলবলকে রাসূল হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন, এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানিয়েছেন, তাদেরকে হত্যা করার মধ্যে রয়েছে হত্যাকারীর জন্য প্রতিদান। তিনি আরও বলেছেন, 'এরা হবে আকাশের নিচে সবচেয়ে জঘন্য নিহত-ব্যক্তি।[৯৮]
তাদের দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিধান আরোপের পরেই তিনি হত্যার-বিধান আরোপ করেছেন। বোঝা গেল, তাদেরকে হত্যা করা আবশ্যক এ জন্যই যে তারা 'দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে করতে দ্বীন থেকে বের হয়ে যায়।' এরা বিভিন্ন প্রকারের। আর এই লোকটাই হলো এদের 'প্রথম পুরুষ, যে নবীর যুগেই আত্মপ্রকাশ করে নবীজির বণ্টন নিয়ে আপত্তি তুলেছে।
সুতরাং যে ব্যক্তি নবীজির কোনো সুন্নাহকে কলঙ্কিত করবে তার বিধান উপরিউক্ত ব্যক্তিদের বিধানের মতোই হবে। অতএব যে দাবি করবে যে, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বণ্টন করতে গিয়ে জুলুম করেন, সে নবীজিকে মিথ্যা-প্রতিপন্ন করল। তার মতে তা হলে নবীর অনুসরণ আবশ্যক নয়। মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রাসূল হওয়ার মাঝে যে অন্তর্নিহিত গুণগুলো রয়েছে, যেমন আমানতদারিতা এবং তাঁকে মান্য করা আবশ্যক হওয়া, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাজ ও কথা দিয়ে যত ফয়সালা করেন, কোনো ফয়সালায় নিয়ে অন্তরে দ্বিধা-সংশয় না রাখা ইত্যাদি, এ গুণগুলোর সাথে মিথ্যা-প্রতিপন্নকারীর বিশ্বাস সাংঘর্ষিক। কেননা আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করা আল্লাহ ফরয করেছেন আর তিনি কারও ওপর জুলুম করতে পারেন না। সুতরাং যে এ বিষয়ে আপত্তি তুলবে, সে যেন রাসূলের রিসালাতের দায়িত্ব পালন নিয়েই আপত্তি তুলল। রাসূলের রিসালাত নিয়ে আপত্তি নিঃসন্দেহে নিকৃষ্ট ও জঘন্যতম কুফরি।
টিকাঃ
[৫৯] আবু দাউদ, আস-সুনান: ৪৩৬৪
[৬০] খাল্লাল, আল-জামি: ২/৩৪১
[৬১] 'উম্মু ওয়ালাদ' অর্থ যে দাসীর সাথে মনিবের শারীরিক সম্পর্ক হওয়া এবং তার গর্ভে মনিবের সন্তানও জন্ম লাভ করে।
[৬২] আবু দাউদ, আস-সুনান: ৪৩৬৩
[৬৩] খাত্তাবি, মায়ালিমুস সুনান: ৩/২৯৬
[৬৪] বুখারী, আস-সহীহ ৩৮১১; আরও বিস্তারিত রই ডাউনলোড করুন ৪৭৬৫।
[৬৫] তাবারানি, মুজামুস সাগির: ৬৫৯
[৬৬] নাসাঈ, সুনানুল কুবরা: ৩৫৩৪
[৬৭] আবু দাউদ, আস-সুনান: ৪৩৬৫
[৬৮] ওয়াকিদি, আল-মাগাযি: ১/১৭২-১৭৩ সনদ মনকাতি; ইবনে আদি, আল-কামিল: ৬/১৪৫।
[৬৯] ইবনে সাদ, আত-তাবাকাত: ২/২৮
[৭০] খুযাআ ছিল নবিজির মিত্র। আর বনু বকর ছিল কুরাইশদের মিত্র।
[৭১] আবু দাউদ, আস-সুনান: ২৬৮৫; নাসাঈ, আস-সুনান: ৪০৬৭; সনদ সহীহ।
[৭২] ইবনে হিশাম, আস-সিরাত: ২/৪০৯
[৭৩] তাবারি, জামিউল বায়ান: ৫/২৬৮; ওয়াহিদি, আসবাবুন নুযুল: ২৪৫ পৃ.।
[৭৪] সূরা আনয়াম, ৬: ৯৩
[৭৫] বিস্তারিত-বুখারী, আস-সহীহ, কিতাবুল মানাকিব: ৩৬১৭।
[৭৬] শাইখুল ইসলাম এ ঘটনার বিশুদ্ধতা দাবি করেননি। তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, 'ইকরিমাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে।' মূলত এটি ইমাম বা'লির দাবি। (অনুবাদক)
[৭৭] তায়ালিসি, আল-মুসনাদ: ২০২০; আবু আওয়ানা, আল-মুসনাদ: ৩১১১।
[৭৮] আহমাদ, আল-মুসনাদ: ৮৩৭২; এ ব্যাপারে অসংখ্য হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এমনকি এটি মুতাওয়াতির পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কুরআন সাত পাঠ-পদ্ধতিতে অবতীর্ণের ব্যাপারটি সর্বসম্মত। (অনুবাদক)
[৭৯] তায়ালিসি, আল-মুসনাদ: ৪১
[৮০] ওয়াকিদি, আল-মাগাযি: ২/৮৫৯; ইবনে হিশাম, সিরাতুন নবী: ২/৪০৯-৪১০
[৮১] বুখারী, আস-সহীহ : ৩০১৪; মুসলিম, আস-সহীহ : ১৭৪৪
[৮২] বুখারী, আস-সহীহ: ১৮৪৬; মুসলিম, ৩৯৮৮
[৮৩] ওয়াকিদি, আল-মাগাযি: ২/৮০৬-৮০
[৮৪] ওয়াকিদি, আল-মাগাযি: ২/৮১০
[৮৫] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়ািদ
[৮৬] ইবনে আদি, আল-কামিল: ৪/৫৩-৫৪
[৮৭] তাহাবি, মুশকিলুল আসার: ৩৩২
[৮৮] ইবনে যাকারিয়্যা, আল-জালিসুস সালিহ: ১৪
[৮৯] বুখারী, আস-সহীহ: ১২৯১; মুসলিম আস-সহীহ : ৪
[৯০] এটি প্রসিদ্ধ একটি বানোয়াট, ভিত্তিহীন বর্ণনা। ইমাম ইবনুল জাওযি তার প্রসিদ্ধ জাল হাদীস সংকলন আল-মাওযুয়াত গ্রন্থে (১/১০৫) সংকলন করেছেন। মুহাদ্দিসগণ বলেছেন যে, 'এটি বানোয়াট হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আর কোনো মুসলিমও এটি বানায়নি।'
[৯১] আবুশ শাইখ, আখলাকুন নবী: ১৭৭; সনদে ইবরাহীম ইবনুল হাকাম দুর্বল রাবী।
[৯২] সূরা মুনাফিকুন, ৬৩:৮
[৯৩] বুখারী, আস-সহীহ : ৪১৪১; মুসলিম, আস-সহীহ : ২৭৭০।
[৯৪] মিসকাল-আরবের বিশেষ একধরনের ওজন-পদ্ধতি। ১ মিসকাল = ৪.৩৭৪ গ্রাম।
[৯৫] শাইখুল ইসলাম বলেন, 'হাদীসটি মুরসাল। মুজালিদ ইবনে সাইদ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তিনি লাইয়িনুল হাদীস (দুর্বল)। তবে অর্থগত দিক থেকে এর সমর্থনে আরও বহু হাদীস আছে।'
[৯৬] বুখারী, আস-সহীহ: ৩৩৪৪; মুসলিম, আস-সহীহ: ১০৬৪。
[৯৭] বুখারী, আস-সহীহ: ৩৬১১; মুসলিম, আস-সহীহ: ১০৬৬。
[৯৮] আহমাদ, আল-মুসনাদ: আস-সুনান: ৩০০০。