📄 ভূমিকা
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকেই সীরাতে মুসতাকিম প্রদর্শন করেন। তিনি কতই-না উত্তম পথপ্রদর্শনকারী। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। এই সাক্ষ্য বান্দাকে কুফরের কলুষতা থেকে মুক্ত করে। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল এবং বান্দাদের মধ্যে সর্বোচ্চ সম্মানিত।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে পাঠিয়েছেন হিদায়াত ও সত্য দ্বীন দিয়ে, যেন তিনি এই দ্বীনকে সকল দ্বীনের ওপর বিজয়ী করতে পারেন—যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে।
তাঁর জন্যই সুনির্ধারিত রয়েছে সুমহান মর্যাদা, ওসিলা (জান্নাতের বিশেষ একটি স্তর), মাকামে মাহমুদ ও প্রশংসা-পতাকা—কিয়ামত-দিবসে যে পতাকাতলে সমবেত হবেন সকল প্রশংসাকারী বান্দাগণ। আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন, যা পবিত্র থেকে পবিত্রতম, সুন্দর থেকে সুন্দরতম এবং বিশুদ্ধ থেকে বিশুদ্ধতম; কিয়ামত পর্যন্ত অবিরাম বর্ষিত হোক এই সালাত ও সালাম।
আল্লাহ তাআলা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঠিয়েছেন, তার মাধ্যমে আমাদেরকে হিদায়াত দিয়েছেন এবং ঘোর অন্ধকার থেকে বের করে আলোর ফোয়ারায় উপনীত করেছেন। তার রিসালাতের কল্যাণে আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের মহাকল্যাণ দান করেছেন। আর যে অভিশপ্ত তাঁর মানহানি করবে, তার বিধান প্রকাশ করা এবং তার শাস্তি কত ভয়াবহ হবে তা বর্ণনা করা আমাদের জন্য অপরিহার্য করেছেন।
এখানে আমাদের উদ্দেশ্য হলো শরয়ি হুকুম উল্লেখ করা, যার ওপর ভিত্তি করে একজন ফকিহ ফাতওয়া দিবেন এবং বিচারক ফয়সালা করবেন। প্রত্যেকের জন্য জরুরি হলো এই কাজটিকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা। আল্লাহ তাআলাই হিদায়াতদাতা, সর্বোত্তম পথপ্রদর্শক।
এই বিধানটি চারটি মাসআলায় বিভক্ত।
১) গালিদাতা, বিদ্রুপকারী, কটূক্তিকারীকে হত্যা করা ওয়াজিব, চাই সে মুসলিম হোক কিংবা কাফের।
২) যদি যিম্মিও হয় তবুও তাকে হত্যা করা ওয়াজিব।
৩) যদি তাওবা করে নেয় তা হলে এর হুকুম কী?
৪) গালি বলতে কী বোঝায় ও কোন ধরনের শব্দকে গালি হিসেবে ধরা হবে?
📄 কটুক্তিকারীকে হত্যা করতে হবে
রাসূলের কটূক্তিকারীকে হত্যা করতে হবে। তাকে বন্দি করে গোলাম বানিয়ে রাখা যাবে না বা বিনিময় নিয়ে ছেড়ে দেওয়া যাবে না, অথবা দয়া করে মুক্ত করে দেওয়াও যাবে না। এ সবই নাজায়েয। কটূক্তিকারী যদি মুসলিম হয়, তা হলে সর্বসম্মতভাবে তাকে হত্যা করতে হবে। কারণ সে হয় মুরতাদ, নয়তো যিন্দিক। আর মুরতাদকে তো হত্যাই করতে হয়। তার জন্য অন্য কোনো শাস্তি নেই। একইভাবে যিন্দিকেরও শাস্তি হত্যা। নারী কিংবা পুরুষ—উভয় মুরতাদ ও যিন্দিকের শাস্তি একই। আর কটূক্তিকারী যদি চুক্তিবদ্ধ কোনো কাফের হয়, তা হলে তার জন্যও হত্যা নির্ধারিত থাকবে। নারী-পুরুষের শাস্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এটিই সালাফদের অধিকাংশ ফকিহ ও তাদের অনুসারীদের অভিমত।
ইমাম ইবনুল মুনযিরের বক্তব্য আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, আহলুল ইলমগণের সম্মিলিত মতামত হলো—যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালাগালি করবে, তার শাস্তি হলো হত্যা। ইমাম মালিক, লাইস, আহমাদ, ইসহাক-সহ শাফেঈ রাহিমাহুমুল্লাহরও অভিমত এটি। তবে ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করা হয় যে, যিম্মিকে হত্যা করা যাবে না। কিন্তু ইমাম ইবনুল মুনযিরের বক্তব্য প্রমাণ করে যে, বেশিরভাগ ফকিহের মতামত হলো—যিম্মিকেও হত্যা করা ওয়াজিব। দুটি দিক লক্ষ রেখে কটূক্তিকারী যিম্মিকে হত্যা করা হবে :
১. গালমন্দের মাধ্যমে চুক্তি ভঙ্গ করার কারণে তার নিরাপত্তা-বিধান রহিত হয়ে যাওয়া, ২. কটূক্তির হদ্দ বা শরিয়ত নির্ধারিত সাজা হলো হত্যা। এটা মুহাদ্দিস ফকিহগণের অভিমত।
ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, নিরাপত্তা-চুক্তিতে আবদ্ধ কাফেররা যদি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালামন্দ করে, তা হলে তাদেরকে হত্যা করা হবে। যারা বলে যে, গালি দেওয়ার কারণে তাদেরকে হত্যা করা যাবে না, তাদের যুক্তি হলো-যে শিরক-কুফরে তারা লিপ্ত আছে, সেইটা নবীজিকে গালাগাল দেওয়ার চেয়ে আরও জঘন্য অপরাধ (অথচ এ অপরাধের কারণেও তাদেরকে হত্যা করা হয় না। তা হলে এরচেয়ে লঘু অপরাধে কী করে হত্যার বিধান জারি হতে পারে?)-যারা এ মত দিয়েছেন, তারা ভুলের মাঝে আছেন।
ইসহাক বলেন, তাদেরকে এ জন্য হত্যা করা হবে যে, গালি দেওয়ার মাধ্যমে তারা তাদের নিরাপত্তা-চুক্তি ভঙ্গ করেছে। উমর ইবনে আব্দুল আযিয রাহিমাহুল্লাহ বাস্তবে এমনটাই প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন। আর এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এক পাদরিকে হত্যা করেছিলেন (এ অপরাধের কারণে যে), সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালি দিয়েছিল। ইবনে উমর তখন বলেছিলেন, 'এ ব্যাপারে আমরা তাদের সাথে কোনো ধরনের আপস বা চুক্তি করি না।'
ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, এমন ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে এবং তার নিরাপত্তা-চুক্তি ভেঙে যাবে। পূর্বেই এ-জাতীয় কিছু বক্তব্য আলোচিত হয়েছে। এমনকি ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ-এর প্রায় সমস্ত অনুসারীও এই মতটিই উল্লেখ করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জায়গায় তারা বিষয়টা আলোচনা করেছেন। তারা নবীজিকে গালমন্দকারী যিম্মিদেরকে অন্যান্য চুক্তি ও অঙ্গীকার ভঙ্গকারীদের মধ্যে উল্লেখ করেছেন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী হাম্বলী আলেমদের একাংশ বলেন যে, গালিদাতা-সহ অন্যান্য অঙ্গীকার-ভঙ্গকারীদের নির্ধারিত শাস্তিই হলো হত্যা। আর ইমাম আহমাদের বক্তব্যও এটা প্রমাণ করে। তবে পরবর্তী আলেমদের একটা অংশ বলেন, যিম্মিদের মধ্য থেকে যারা চুক্তি ভঙ্গ করবে, খলিফাকে ওই সকল লোকদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা দেওয়া হবে। যেমন যুদ্ধ-বন্দিদের ক্ষেত্রে খলিফার সিদ্ধান্ত-গ্রহণের স্বাধীনতা থাকে।
হাম্বলী মাজহাবের পরবর্তী আলেমদের এই বক্তব্যের ব্যাপক অর্থ গ্রহণ করলে (সমস্ত ধরনের) চুক্তি-ভঙ্গকারীদের মাঝে গালিদাতাও অন্তর্ভুক্ত। তবে কাযি আবু ইয়া'লা-সহ অন্যান্য মুহাক্কিক ইমামগণ উক্ত বক্তব্যকে 'গালিদাতা' ছাড়া অন্যান্য চুক্তি-ভঙ্গকারীদের জন্য প্রযোজ্য বলে মন্তব্য করেছেন। আর গালিদাতার জন্য তো হত্যা নির্ধারিত।
তাই গালিদাতার জন্য নির্ধারিত শাস্তি হলো হত্যা। এর বিপরীত কোনো বর্ণনা নেই।
কেননা যারা কোথাও চুক্তি-ভঙ্গকারী যিম্মির বিধান সাধারণভাবে বর্ণনা করেছেন, তারাই আবার অন্য কোথাও গালিদাতা যিম্মির বিধান আলাদাভাবে স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন। তাই সাধারণ বর্ণনায় উল্লেখিত বিধানের মধ্যে সে অন্তর্ভুক্ত হবে না। অথবা এ সম্ভাবনাও আছে যে, গালিদাতার নির্ধারিত শাস্তি যে হত্যা, এ ব্যাপারে বিরোধপূর্ণ বর্ণনা আছে। কিন্তু বাস্তবে সেই বর্ণনা দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য। কেননা যারা এই মতকে সমর্থন করেছেন, তারাই আবার অন্য জায়গায় এর বিপরীত অভিমত উল্লেখ করেছেন।
ইমাম শাফেঈ রাহিমাহুল্লাহ-এর অনুসারীদের মধ্যেও ইখতিলাফ দেখা দিয়েছে। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, কটূক্তিকারী-যিম্মির শাস্তি হত্যা। এটি নির্ধারিত। আবার কেউ কেউ বিপরীত মতও উল্লেখ করেছেন। তবে তাদের কাছে বিশুদ্ধ মত হলো- গালিদাতাকে হত্যা করা জায়েয (শাস্তি নির্ধারিত নয়)। তারা বলেন, কটূক্তিকারী- যিম্মি বন্দি (কাফেরের) মতোই। ফলে তার ব্যাপারে কল্যাণকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার এখতিয়ার খলিফার আছে।
কিন্তু ইমাম শাফেঈ রাহিমাহুল্লাহ-এর বক্তব্যের মর্ম হলো, অঙ্গীকার-ভঙ্গকারীর বিধান ইসলামের বিরুদ্ধে চক্রান্তকারী (নির্দ্বিধায় হত্যার উপযুক্ত) কাফেরের বিধানের মতোই। অবশ্য আরেক জায়গায় তিনি বলেছেন, চুক্তি-ভঙ্গকারীকে নির্ধারিতভাবে হত্যা করতে হবে। এক্ষেত্রে খলিফার জন্য কোনো প্রকারের এখতিয়ার বা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ নেই। তবে ইমাম আবু হানিফার মূলনীতি অনুযায়ী যিম্মিদের কটূক্তির কারণে তাদের চুক্তি বাতিল হয়েছে বলা যাবে না। কেননা তার মূলনীতি হলো- যিম্মি কাফেরদের ততক্ষণ পর্যন্ত চুক্তিভঙ্গ ধরা হবে না, যতক্ষণ-না তারা প্রভাব ও প্রতিপত্তিশালী হয়। যুক্তি হলো, সেক্ষেত্রে তারা খলিফার বিরুদ্ধে বেকে বসতে পারে, তখন তাদের ওপর আর আমাদের শাসন চলবে না।
ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ-এর মাজহাব হলো, যিম্মিদের নিরাপত্তা-চুক্তি ততক্ষণ ভঙ্গ হয় না, যতক্ষণ-না তারা আমাদের থেকে আলাদা হয়ে বের হয়ে যায় এবং আমাদের পক্ষ থেকে জুলুম করা ছাড়াই তারা জিযিয়া আদায় করা বন্ধ করে দেয়, কিংবা তারা কাফেরদের রাজ্যের সাথে গিয়ে মিলিত হয়। কিন্তু ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ গালিদাতার একমাত্র শাস্তি হত্যা বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, যিম্মি যদি কোনো স্বাধীন মুসলিম নারীকে ধর্ষণ করে, তা হলে তার শাস্তি হলো হত্যা। আর যদি মুসলিম দাসীকে ধর্ষণ করে, তা হলে ওকে ভয়াবহ ও কঠিনতম শাস্তি দিতে হবে।
সুতরাং রাসূলের কটূক্তিকারীদের শাস্তি কেবলই হত্যা, অন্যকিছু নয়। এটাই ইমামগণের অভিমত। ইমামগণের কেউ কেউ বলেন-চুক্তি-ভঙ্গকারীরা যতক্ষণ আমাদের কবজায় থাকবে তখন তাদের একমাত্র শাস্তি হত্যা। কেউ কেউ বলেন-যে-সকল চুক্তি- ভঙ্গকারীর দ্বারা মুসলমানদের ক্ষতি হবে তাদের একমাত্র শাস্তি হলো হত্যা। যেমনটা ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ মতামত ব্যক্ত করেছেন এবং ইমাম শাফেঈ রাহিমাহুল্লাহ- এর বক্তব্যও যা প্রমাণ করে। কেউ কেউ বলেন-যে ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালি দিয়ে নিরাপত্তা-চুক্তি ভঙ্গ করবে তার শাস্তি হত্যা হবে অন্যকিছু নয়। যেমনটা কাযি আবু ইয়া'লা ও ইমাম শাফেঈর একদল অনুসারী উল্লেখ করেছেন।
যে-সমস্ত ইমামগণ নবীজিকে গালমন্দ করার বিধান (আলাদা করে উল্লেখ না করে) সাধারণভাবে অন্যন্য নিরাপত্তা-চুক্তি ভঙ্গ করার সাথে আলোচনা করে বলেছেন- নিরাপত্তা-চুক্তি ভঙ্গ করার সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে খলিফার অধিকার আছে যে, তিনি অপরাধীকে হত্যা করতে পারেন আবার অন্য কোনো সাজাও দিতে পারেন; তাঁরাও কিন্তু আবার অন্য জায়গায় স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলকে কটূক্তি করে চুক্তি ভঙ্গ করা হলে ইমামের কোনো স্বাধীনতা থাকবে না বরং এমন ব্যক্তির জন্য শাস্তিস্বরূপ হত্যাই নির্ধারিত থাকবে।
তবে যাঁরা বলেন যে, সর্বপ্রকার চুক্তি-ভঙ্গকারীর ক্ষেত্রে ইমামের স্বাধীনতা থাকবে, ইমামের ইচ্ছামতো শাস্তি প্রদান করার অধিকার থাকবে-তাদের এই কথার ব্যাখ্যায় আমরা বলেছি যে, মূলত তাদের বক্তব্যের উদ্দেশ্য হলো, খলিফা তাদের থেকে পরিপূর্ণ হক আদায় করে নিবেন। হত্যার উপযুক্ত হলে হত্যা করতে হবে। হদ্দ বা দণ্ডবিধির উপযুক্ত হলে দণ্ডবিধি লাগানো হবে। আর তাযির বা অন্যান্য শাস্তির উপযুক্ত হলে তাযির করবে। কেননা তাদের সাথে আমাদের নিরাপত্তা-চুক্তি হয়েছে এই শর্তের ভিত্তিতে যে, তাদের ওপর আমাদের শাসন প্রযোজ্য হবে। চুক্তি-ভঙ্গকারীর সাজাও আমাদের শাসনের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু আমাদের পূর্ণভাবে শাসনের অধিকার দেওয়া হয়েছে, সেহেতু ইমামকে (যথাযথ শাস্তি প্রদানের) অধিকার দেওয়া হবে। যেমনটা যুদ্ধ-বন্দির (ক্ষেত্রে দেওয়া হয়)।
তাঁদের এ বক্তব্যের ভিত্তিতে বলা যায় যে, কটূক্তিকারী-যিম্মিকে যে-কোনো প্রকারের দণ্ডবিধিই দেওয়া যাবে। যেমন: যিম্মিদের কেউ ব্যভিচার করল বা ডাকাতি করল, এক্ষেত্রে এই অপরাধের সাজা হিসেবে তাকে হত্যা করা ওয়াজিব হলে, তাকে হত্যাই করতে হয়। বরং যিম্মিকে চুক্তি-ভঙ্গ না করলেও (তার অন্য কোনো অন্যায়ের সাজা- স্বরূপ) হদ্দ বা দণ্ডবিধি দেওয়া যেতে পারে। যেমন: কোনো যিম্মি অন্য কোনো যিম্মিকে হত্যা করল। এক্ষেত্রে এক যিম্মি-কর্তৃক আরেক যিম্মিকে হত্যার দ্বারা নিরাপত্তা-চুক্তি ভঙ্গ না হলেও খুনি যিম্মিকে হত্যা করতে হবে।
ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ-এর অনুসারীদের মধ্যে থেকে কেউ যদি এ কথা বলে— কটূক্তির দ্বারা অঙ্গীকার ভঙ্গ হয় না, তা হলে তার বক্তব্যকে উল্লিখিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করলে আর কোনো বিরোধ থাকবে না। (অর্থাৎ চুক্তি ভঙ্গ না হলেও হত্যা করা যেতে পারে)।
মোটকথা : খলিফা সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা রাখেন—বক্তব্যটি কিছু কিছু ফকিহগণের কথার ব্যাপক অর্থ থেকে অথবা শর্তহীন কথার মর্ম থেকে বোঝা যায়। এমনিভাবে খলিফাকে শাসনের পূর্ণাধিকার দেওয়া হবে—কথাটি তাদের এ কথা থেকেও বোঝা যায়—‘নিরাপত্তা-চুক্তি ভঙ্গ করলে তাকে দারুল হরবে পাঠিয়ে দেওয়া হবে’।
সুতরাং ফকিহগণের ব্যাখ্যামুক্ত বক্তব্যকে গ্রহণ করলে তা মারাত্মক ভ্রান্তির দিকে ঠেলে দিবে। বরং তারা যে-সকল ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করে মত ব্যক্ত করেছেন, সেগুলো গ্রহণ করতে হবে। তারপরও যদি এ বিধানের বিষয়ে কোনো মতবিরোধ থেকে থাকে, তবে সেগুলোর বর্ণনাসূত্র দুর্বল ও কথার মর্মও সুনির্ধারিত নয়। আর রাসূলের কটূক্তিকারীর শাস্তি যে কতল বা হত্যা, সে দলিল তো আমরা ইতিমধ্যেই কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবিগণের ইজমার মাধ্যমে প্রমাণ করে দেখিয়েছি।
📄 আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে পরোক্ষভাবে কটুক্তিকারীর বিধান
কেউ কোনো গুণ বা নাম ধরে কারও কটূক্তি করল, আর সেই কটূক্তি আল্লাহ ও তাঁর কোনো রাসূলের ওপর বর্তালো, কিন্তু বাহ্যিকভাবে বোঝা গেল, সে আল্লাহ বা তাঁর রাসূলকে বোঝাতে কথাটি বলেনি। এ ধরনের কথাও মূলত হারাম। হারাম হওয়ার বিষয়টি যদি ব্যক্তির অজানা থাকে, তবে তার তাওবা গ্রহণ করা হবে। আর যদি সে হারাম জেনেই বলে, তা হলে তাকে প্রচণ্ডভাবে 'তাযীর' করা হবে। কিন্তু তাকে কাফের বলা হবে না এবং তাকে হত্যা করা হবে না।
উদাহরণ: একব্যক্তি কাল বা সময়কে গালি দিল। তার বিশ্বাস—তার ও তার প্রিয়তমদের মাঝে বিচ্ছেদের পিছনে সময়ই দায়ী; সময়ই তাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। অথচ বাস্তবিক অর্থে প্রকৃত কারক তো আল্লাহ। ফলে সে আল্লাহকে উদ্দেশ্য না করলেও, গালি আল্লাহরই ওপর গিয়ে গড়ল। এ দিকেই ইঙ্গিত করে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَا تَسُبُّوا الدَّهْرَ فَإِنَّ اللهَ هُوَ الدَّهْرُ তোমরা সময়কে গালি দিয়ো না। কারণ তিনিই সময়। [১৩৫]
তেমনি একব্যক্তি কাউকে গালি দিয়ে বলল, 'ওই আমুকের পুত...।' এভাবে সে আদম আলাইহিস সালাম পর্যন্ত সবাইকে নিয়েই তাচ্ছিল্যপূর্ণ কথা বলল। নিঃসন্দেহে এতে সে গুরুতর অন্যায় করেছে। কারণ আদম আলাইহিস সালাম-এর পুত্রদের মাঝে তো নূহ, ইদরীস ও শীস আলাইহিমুস সালাম-সহ অন্যন্য নবীগণও আছেন। অথচ এ ধরনের ক্ষেত্রে ব্যাপক অর্থের মাঝে কটূক্তিকারীর উদ্দেশ্য নবীগণ হন না।
অনুরূপভাবে (জুলুমের শিকার) কেউ (বদদুআ করে) বলল, 'আল্লাহ আরবদেরকে বা বনী ইসরাঈলকে অথবা আদম-সন্তানদেরকে অভিশাপ দিন।' ইবনে আবি যায়দ বলেন, এ ব্যক্তির উদ্দেশ্য নবীগণ নয় বরং তার অভিশাপের লক্ষবস্তু জালেমরা। তবুও (যেহেতু তার কথার মাঝে নবীগণও অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান, তাই) তাকে শাসকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শায়েস্তা করা হবে। তবে কেউ কেউ তাকে হত্যা করার কথাও বলেন।
আবার কেউ বলল, 'আল্লাহ আমাকে যত আদেশ করেছেন, সবকিছুতে আমি তাঁর অবাধ্যতা করলাম।'
এ ব্যক্তির বিধানের ক্ষেত্রে আমাদের সাথিদের দুটি মত। একপক্ষ উল্লিখিত মাসআলা অনুযায়ী কিয়াস করেন।
টিকাঃ
[১৩৫] মুসলিম, আস-সহীহ: ২২৪৬
📄 অন্যান্য নবী, উম্মুল মুমিনীন ও সাহাবিদের কটুক্তিকারীর বিধান
অন্যন্য নবীগণকে গালি দেওয়া
অন্যন্য নবীগণকে কটুকথা বলা মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলার মতোই। কেউ এ দুই কটূক্তির মাঝে পার্থক্য করেছেন বলে জানা নেই। তবে কোনো সন্দেহ নেই যে, মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কটুকথা বলা অন্য নবীগণকে বলার চেয়ে গুরুতর।
উম্মুল মুমিনীনদেরকে কটূক্তি
আল্লাহ তাআলা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে যেই অপবাদ থেকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন, যদি কেউ সেই অপবাদ আবার আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে দেয়, সে কুফরি করবে। একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন যে, এ বিষয়ে ফকিহগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন।
অন্যন্য উম্মুল মুমিনীনদেরকে কটূক্তির বিষয়ে দুটি বক্তব্য:
১. উম্মুল মুমিনীনদেরকে গালি দেওয়া আর সাহাবায়ে কেরামকে গালি দেওয়া একই বিধান। (সাহাবায়ে কেরামকে গালি দেওয়ার বিধান সামনে আলোচিত হবে ইন-শা-আল্লাহ)
২. যে-কোনো উম্মুল মুমিনীনকে অপবাদ দেওয়া আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে অপবাদ দেওয়ার মতোই (কুফরি)।
সাহাবিগণকে কটূক্তি
যে-ব্যক্তি কোনো সাহাবি রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে কটূক্তি করবে, তার সম্পর্কে ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে। তবে তিনি 'তাকে কাফের বলা ও তাকে কতল করার' ফতওয়া দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। বরং তিনি বলেন, তাকে শাস্তি দেওয়া হবে, বেত্রাঘাত করা হবে এবং অমৃত্যু তাকে বন্দি রাখা হবে, যতক্ষণ-না সে তাওবা করে ফিরে আসে। এটি ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ-এর মাজহাবেরও প্রসিদ্ধ মত।
ইবনুল মুনযির বলেন, সাহাবিগণের কটূক্তিকারীর কতল করাকে কেউ আবশ্যক বলেছেন বলে আমার জানা নাই।
কাযি আবু ইয়া'লা বলেন, যে ব্যক্তি সাহাবাগণকে কটূক্তি করে এবং বিশ্বাস করে যে, তাদেরকে কটূক্তি করা জায়েয-সে কাফের। আর যে তাদেরকে কটূক্তি করা জায়েজ ভেবে নয়, বরং এমনি এমনি কটূক্তি করে, সে ফাসেক। চাই সে সাহাবাগণকে কাফের বলুক কিংবা তাদের ধর্ম নিয়ে আক্রমণাত্মক কথা বলুক। ফকিহগণ এ মতের ওপর আছেন।
যে ব্যক্তি সাহাবাগণকে গালি দেয়, কতিপয় ফকিহ তাকে সুনিশ্চিতভাবে কতলের কথা বলেছেন। তাঁরা রাফেযিকে কাফের বলেন। আমাদের অনেক মুফতি কথাটি স্পষ্ট করে বলেছেন।
আবু বকর আব্দুল আযিয মুকনি নামক গ্রন্থে রাফেযিদের বিষয়ে বলেন, রাফেযি যদি কোনো সাহাবিকে গালি দেয়, তা হলে তার কাছে মেয়ে বিয়ে দেওয়া যাবে না।
কোনো কোনো ফকিহ বলেন, যদি কেউ সাহাবিদের দ্বীন বা ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে, বা কটূক্তি করে তা হলে সে কাফের। আর কটূক্তি যদি সাহাবির দ্বীন ও ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে বা হয়ে (অন্য কোনো বিষয়ে হয়), যেমন কেউ কোনো সাহাবির পিতাকে কটূক্তি করল কিংবা তাঁকে কটূক্তি করে তাঁর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করল, তা হলে তাকে কাফের বলা হবে না।
ইমাম আহমাদ শুনলেন, এক ব্যক্তি উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে গালি দিচ্ছে। তিনি বললেন, এ ব্যক্তি যিন্দিক। আমার মনে হয় না, সে ইসলামের ওপর আছে।
কাযি আবূ ইয়া'লা (এ কথার ওপর) মন্তব্য করে বলেন, আহমাদ তার কথা 'নিঃশর্ত' রেখেছেন-যে ব্যক্তি রাসূলের কোনো সাহাবিকে গালি দিবে, সে কুফরি করবে।
তবে আব্দুল্লাহ ও আবু তালেবের বর্ণনায় আছে, ইমাম আহমাদ এই ধরনের কটূক্তিকারীকে হত্যার হুকুম দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন।
(ইমাম আহ্মদের মত অনুযায়ী) 'হদ্দ সাব্যস্ত না হওয়া বরং তাযীর আবশ্যক হওয়া'র দাবি হলো-ইমাম আহমাদ সাহাবির কটূক্তিকারীকে কাফের হওয়ার হুকুম দেননি। [১৩৬]
তা হলে ইমাম আহমাদ যে বলেছেন- 'আমি মনে করি না, সে ইসলামের ওপর আছে' কথাটি এ অর্থে যে-ইমাম আহমাদ মনে করেন, সেই কটূক্তিকারী সাহাবাগণের কটূক্তিকে জায়েয মনে করছে। কেননা সেক্ষেত্রে কোনো মতবিরোধ ছাড়াই তাকে কতল করা হবে। ইমাম আহমাদ-এর কথার এই অর্থ হওয়ারও সম্ভাবনা আছে- যে ব্যক্তি সাহাবিগণকে তাঁদের সত্যবাদিতা ও তাঁদের ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে কটুকথা বলবে, তাকে হত্যা করা হবে। আর যে ব্যক্তি সাহাবিগণকে কটূক্তি করবে, তবে তা তাঁদের সত্যবাদিতা নিয়ে আক্রমণাত্মক কথা বলে নয় বরং অন্য কোনোভাবে, তাকে হত্যা করা হবে না। যেমন কেউ বলল-
* সাহাবাদের মাঝে ইলমের ঘাটতি ছিল,
* তাঁদের মাঝে রাজনীতির জ্ঞান কম ছিল,
* সাহাবাদের মাঝে সাহসিকতা কম ছিল;
* তাঁদের মাঝে লোভ, দুনিয়ার ভালোবাসা ছিল। ইত্যাদি কথা।
আবার ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ-এর কথাকে এর বাহ্যিক অর্থের ওপরও বহাল রাখা যেতে পারে, সেক্ষেত্রে সাহাবিদের কটূক্তিকারীদের বিষয়ে ইমাম আহমাদের দুটি রেওয়ায়াত সাব্যস্ত হবে,
১. কটূক্তিকারী কাফের
২. কটূক্তিকারী ফাসেক
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা বলেন, কাযি আবু ইয়া'লার মতটি মূলত এ দুই রেওয়ায়াতের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। কাযি আবু ইয়া'লা ছাড়া অন্যন্যরা তার তাকফিরের বিষয়ে দুটি রেওয়ায়াত বর্ণনা করেন।
কাযি আবূ ইয়া'লা বলেন, আল্লাহ তাআলা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে যেই অপবাদ থেকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন, যে ব্যক্তি আবার সেই অপবাদ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে দিবে, সে কুফরি করবে। এ বিষয়ে কোনো মতবিরোধ নেই।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা বলেন, আমরা এ আলোচনা দুটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করতে পারি—
১. সামগ্রিকভাবে সাহাবাগণকে কটূক্তি করার বিধান
২. কটূক্তিকারীর হুকুম বিষয়ে আলোচনা
প্রথমটি তথা সাহাবাগণকে কটূক্তি করা কুরআন ও হাদীস দ্বারা হারাম।
কুরআনের দলিল : وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا
'তোমাদের কেউ যেন কারও গীবত না করে।' [১৩৭]
নিঃসন্দেহে সাহাবিণের দোষ বলার অর্থ গীবত করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন, وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا
'যারা মুমিন নর-নারীদেরকে তাদের কৃতকর্মের বাইরে অন্য কিছুর দ্বারা কষ্ট দেয় তারা অবশ্যই (নিজেদের ওপর) অপবাদ ও সুস্পষ্ট পাপের বোঝা চাপিয়ে নিল।'[১৩৮]
আল্লাহ তাআলা বলেন, لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ
'আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে বায়াত করছিল।'[১৩৯]
আর হাদীসে সাব্যস্ত আছে যে, যারা (হুদায়বিয়ায়) গাছের নিচে বায়াত করেছিল, তাঁদের কেউই জাহান্নামে যাবে না। [১৪০]
আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَقَد تَّابَ اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ
'তিনি নবী, মুহাজিরীন ও আনসারদের তাওবা কবুল করেছেন। [১৪১]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَالَّذِينَ جَاءُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
'যারা তাদের পরে এসে বলছে-হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে এবং আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা করুন, যারা ইসলামে আমাদেরকে ছাড়িয়ে গেছেন; আর আপনি আমাদের অন্তরে মুমিনদের জন্য কোনো বিদ্বেষ স্থাপন করবেন না। হে আমাদের রব! নিঃসন্দেহে আপনি পরম মমতাময় ও চিরদয়ালু। [১৪২]
এ-সমস্ত আয়াত থেকে জানা গেল, সাহাবিদের জন্য ইসতিগফার পাঠ করা, বিদ্বেষ থেকে অন্তরকে পবিত্র রাখা আল্লাহর পছন্দনীয় বিষয়। আল্লাহ তাআলা এ কাজের প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং আমলকারীর প্রশংসা করেন।
হাদীস থেকে প্রমাণ
বুখারী ও মুসলিমে আছে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَا تَسُبُّوا أَصْحَابِي، لَا تَSubbuu أَصْحَابِي، فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ أَنَّ أَحَدِكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا أَدْرَكَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيفَه
'তোমরা আমার সাহাবিদেরকে গালি দিয়ো না। সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! যদি তোমরা উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্য দান করো, তবুও তা তাদের এক মুদ্দ সমপরিমাণ ও এর অর্ধেকও হবে না।'[১৪৩]
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, 'আল্লাহ তাআলা আমাকে (নবী হিসাবে) নির্বাচন করেছেন, আর আমার জন্য আমার সাহাবিদেরকে নির্বাচন করেছেন। তিনি আমার জন্য তাদের মধ্য হতে কাউকে পরামর্শদাতা, কাউকে সাহায্যকারী, কাউকে (বৈবাহিক-সূত্রে) আত্মীয় বানিয়েছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি তাদেরকে কটূক্তি করবে তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সমস্ত মানুষের অভিশাপ। আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের ফরয ও নফল কিছুই কবুল করবেন না। [১৪৪]
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন,
الله الله فِي أَصْحَابِي لَا تَتَّخِذُوهُمْ غَرَضًا بَعْدِى فَمَنْ أَحَبَّهُمْ فَبِحُبِّيْ أَحَبَّهُمْ، وَمَنْ أَبْغَضَهُمْ فَبِبُغْضِيْ أَبْغَضَهُمْ، وَمَنْ آذَاهُمْ فَقَدْ آذانِي، وَمَنْ آذَانِي فَقَدْ آذَى اللهَ، وَمَنْ آذَى اللهَ يُوْشِكُ أَنْ يَأْخُذَهُ
'তোমরা আমার সাহাবিদের বিষয়ে আল্লাহ আল্লাহকে ভয় করো। আমার পরে তোমরা তাদেরকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ো না। সুতরাং যে ব্যক্তি তাদেরকে ভালোবাসবে, সে আমাকে ভালোবাসল; আর যে ব্যক্তি তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখল সে আমার প্রতি বিদ্বেষ-পোষণ করল। যে তাদেরকে কষ্ট দিল সে আমাকে কষ্ট দিল। আর যে আমাকে কষ্ট দিল সে আল্লাহকে কষ্ট দিল; আর যে আল্লাহকে কষ্ট দিল, খুব সম্ভব আল্লাহ তাকে পাকড়াও করবেন।' [১৪৫]
অন্য শব্দে : 'যে ব্যক্তি আমার সাহাবিদেরকে গালি দিবে সে আমাকে গালি দিল; আর যে আমাকে গালি দিল সে মূলত আল্লাহকে গালি দিল।[১৪৬]
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, 'যে ব্যক্তি আমার সাহাবিদেরকে কটূক্তি করে আল্লাহ তাকে অভিশাপ দিন।' [১৪৭]
সাহাবাগণের কটূক্তি যখন এত গুরুতর, তখন কটূক্তির ন্যূনতম শাস্তি 'তাযীর'।
আমাদের জানামতে এতটুকু নিয়ে সাহাবি ও তাবেয়ীগণের মাঝে কোনো মতবিরোধ নেই। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের সবাই একমত যে, উম্মাহর জন্য ওয়াজিব হলো সাহাবাগণের প্রশংসা করা, তাদের জন্য ইস্তিগফার পড়া, তাদের প্রতি কোমল ও সন্তুষ্ট থাকা, তাদের সাথে ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের সম্পর্কে বিশ্বাস রাখা, যারা তাদের শানে কটূক্তি করে, তাদেরকে শাস্তি দেওয়া।
তারপর কারও কারও মত হলো, সাহাবাগণকে কটূক্তি করার কারণে কাউকে কতল করা হবে না। তাদের যুক্তি নিম্নোক্ত হাদীস, لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَنِّي رَسُولُ اللَّهِ 'তিনটির কোনো একটি ব্যতিত মুসলিমের রক্ত হালাল হয় না'...এই হাদীসটি।
তা ছাড়া সাহাবাগণের মাঝেও কেউ কেউ অন্য কোনো সাহাবিকে গালি দিয়ে ফেলতেন। কিন্তু এ কারণে কাউকে কখনও কাফের বলা হতো না।
কারও কারও মতে, সাহাবিগণকে যে ব্যক্তি কটূক্তি করবে, তাকে কাফের বলা হবে এবং তাকে কতল করা হবে। তাদের যুক্তি হলো, আল্লাহ তাআলা বলেন, مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ .... يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا 'মুহাম্মাদ হলেন আল্লাহর রাসূল এবং যারা তার সাথে আছে, তারা কাফেরদের ওপর কঠিন এবং পরস্পরের প্রতি দয়ালু। তুমি তাদেরকে দেখবে রুকু ও সিজদারত অবস্থায়-তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি অন্বেষণ করছে, তাদের লক্ষণ হলো চেহারায় তাদের সিজদার চিহ্ন... যেন আল্লাহ তাদের মাধ্যমে কাফেরদেরকে ক্রুদ্ধ করেন।'[১৪৮]
সুতরাং সাহাবাদের দ্বারা যারা ক্রুধান্বিত হয় তারা কাফেরদের কিছু দোষে দুষ্ট-যে দোষগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ ওদেরকে অপদস্থ করেছেন, লাঞ্ছিত করেছেন এবং ক্ষেপিয়েছেন। কাফেরদের কুফরির সাজা হিসাবে যে দোষ দিয়ে তাদেরকে অপমান করেছেন, সে দোষ যার মধ্যে থাকবে সেও অবশ্যই ওদের মতো কাফেরই হবে।
কেননা মুমিনকে কুফরির সাজা দেওয়া হয় না। এখানে বিষয়টি স্পষ্ট যে, আল্লাহ উক্ত আয়াতে সাহাবাদের প্রতি ক্ষোভকে সঙ্গত একটি দোষের সাথে শর্তযুক্ত করেছেন। কেননা সাহাবাদের প্রতি কাফেরকে রাগিয়ে তোলার জন্য তার কুফরিই উপযুক্ত।
সাহাবগণের প্রতি কাফেরকে রাগিয়ে তোলার জন্য কুফর যেহেতু অবশ্যম্ভাবী, সেহেতু কাফেরদের প্রতি আল্লাহ যাদেরকে রাগাবেন, অবশ্যই তাদের মাঝেও সেই অবশ্যম্ভাবী কারণটি থাকবে! আর তা হলো কুফরি। ইমাম আহমাদ-এর কথা 'আমি তাকে ইসলামের ওপর দেখতে পাচ্ছি না' দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য।
আরেকটি দলিল-রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'যে ব্যক্তি তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখবে, তারা আমার প্রতি বিদ্বেষ রাখল; যে তাদেরকে কষ্ট দিল সে আমাকে কষ্ট দিল; আর যে তাদেরকে কটূক্তি করল তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতাগণ ও সমস্ত মানুষের অভিশাপ; আল্লাহ তার ফরজ-নফল কিছুই কবুল করেন না।'[১৪৯]
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া তো কুফরি। সুতরাং সাহাবাগণকে সাহাবি হওয়ার আগে ও পরে কষ্ট দেওয়া এবং অন্যন্য মুসলিমকে কষ্ট দেওয়ার মাঝে পার্থক্য এই হাদীস দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায়। সাহাবি যদি সাহাবি (মুসলিম) থেকেই মারা যান তা হলে তাকে কষ্ট দেওয়া মানে তো তার সঙ্গী (নবীকে) কষ্ট দেওয়া। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তোমরা মানুষকে তাদের বন্ধু দ্বারা বিবেচনা করো।'[১৫০] প্রবাদ আছে-'ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা কোরো না, জিজ্ঞাসা করো তার বন্ধু সম্পর্কে।' কেননা প্রত্যেক ব্যক্তিই তার সঙ্গীকে অনুসরণ করে।
ইমাম মালিক বলেন,' সাহাবিগণের কটূক্তিকারীরা মূলত আল্লাহর রাসূলকে দোষারোপ করতে চায়। কিন্তু তা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তারা সাহাবিদের নামে দোষ বলে, যেন বলা যায়- 'খারাপ মানুষ বলেই তো তাঁর সঙ্গীরাও খারাপ।'
ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, তোমরা মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিগণকে কটূক্তি করো না, তাদের এক একজনের দাঁড়ানোর স্থান তোমাদের সমস্ত আমল থেকেও উত্তম।[১৫১]
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—মুমিন ছাড়া কেউ তোমাকে ভালোবাসবে না, আর মুনাফিক ছাড়া কেউ তোমার প্রতি বিদ্বেষ রাখবে না।
বুখারী ও মুসলিমে আছে: ঈমানের নিদর্শন হলো আনসারদেরকে ভালোবাসা আর নিফাকের লক্ষণ হল আনসারদের প্রতি বিদ্বেষ রাখা। [১৫২]
বুখারী ও মুসলিমে আরও আছে: আনসারকে ভালোবাসে মুমিন ছাড়া কেউ না; আনসারকে যে ঘৃণা করে সে মুনাফিক ছাড়া কিছু না। যে তাদেরকে ভালোবাসবে আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসবেন। আর যে তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখবে, আল্লাহ তার প্রতি বিদ্বেষ রাখবেন।
সুতরাং যে তাদেরকে গালি দিবে, সে তো সাহাবিগণের প্রতি আরও বিদ্বেষ-পোষণ করবে। সুতরাং তার মুনাফিক হওয়া অবধারিত। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উল্লিখিত হাদীসে শুধু আনসারদের কথা বলেছেন, কেননা তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, যাঁরা মুহাজিরদের পূর্ব থেকেই বাড়িতে ছিলেন এবং ঈমান এনেছিলেন...। তাঁরাই আল্লাহর রাসূল ও সাহাবিগণকে থাকার জায়গা দিয়েছেন, সাহায্য করেছেন এবং তাঁদের হয়ে শত্রুদের হামলা প্রতিহত করেছেন; তাঁরা আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় তাদের জান-মাল ব্যয় করেছেন। যখন মুহাজিররা ছিলেন আগন্তুক, অচেনা ও সহায়-সম্বলহীন, তখন তাঁরা তাঁদের সম্পদ মুহাজিরদের সাথে সমানভাবে ভাগ করে নিয়েছেন। তখন তিনি মানুষকে আনসারদের মর্যাদা বোঝাতে চাইলেন। কারণ তিনি জানেন, মানুষ তো অনেক কিন্তু আনসারের সংখ্যা কম। ভালোবাসা ও বিদ্বেষের বিষয়টি শুধু আনসার নন, মুহাজিরদের জন্যও প্রযোজ্য। কেননা যাঁরা আনসারদের সাথে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাধ্যমতো সাহায্য করেছে তাঁরা সকলেই বাস্তবিক অর্থে আনসার সমগোত্রীয়। সুতরাং যাঁরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করেছে তাঁদের সাথে বিদ্বেষ-পোষণ করা নিফাকি। যে-সমস্ত সাহাবি আল্লাহর রাসূলকে সাহায্য করেছেন তাঁরা সবাই এ মর্যাদার অন্তর্ভুক্ত আর তাঁদের সাথে বিদ্বেষ-পোষণকারীরা মুনাফিক-কাফের, যেমন পূর্বে উল্লেখ করেছি।
তালহা বিন মুসাররিফ বলেন, বলা হয়-বনু হাশেমের সাথে বিদ্বেষ-পোষণ করা নিফাকি, আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের সাথে বিদ্বেষ-পোষণ করা নিফাকি; আর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়ে সংশয়কারী যেন খোদ সুন্নাহ নিয়ে সংশয়কারী।
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, শেষ জামানায় আমার উম্মতের মাঝে কিছু লোকের প্রকাশ ঘটবে, তাদেরকে ‘রাফেদাহ’ বলা হবে। তারা ইসলামকে ছেড়ে দিবে।[১৫৩]
আবু ইয়াহইয়া আল-হিম্মানী আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন-নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেন, হে আলী! তুমি ও তোমার দল জান্নাতে (যাবে) আর একটা সম্প্রদায়-তাদের পদবি থাকবে, তাদেরকে রাফেদা বলা হবে। যদি তুমি তাদেরকে পাও, হত্যা করবে। কারণ তারা মুশরিক। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তারা আহলুল বাইয়েত (নবীর পরিবার ও বংশধরদের)-এর প্রতি ভালোবাসা দেখাবে অথচ তারা ওমন নয়। তাদের লক্ষণ হলো তারা আবু বকর ও উমরকে গালিগালাজ করে।[১৫৪]
অন্য শব্দে: আমাদের পরে একটি সম্প্রদায় আসবে, তারা আমাদেরকে ভালোবাসার দাবি করবে আমাদের নামে মিথ্যা বলবে। তারা হবে দ্বীন থেকে খারিজ। তাদের একটি লক্ষণ হলো তারা আবু বকর ও উমরকে গালিগালাজ করবে।[১৫৫]
বাগাওয়ী হাদীসটি বর্ণনা করেন। তার বর্ণনায় আরও আছে, তোমরা যেখানেই তাদেরকে পাও, হত্যা করো; কেননা তারা মুশরিক।
হাদীসটি আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে মাওকূফ[১৫৬] ও মারফু[১৫৭] দুভাবেই বর্ণিত হয়েছে।
ইবনে বাত্তাহ আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ আমাকে নির্বাচন করেছেন এবং তিনি আমার জন্য আমার সাহাবিদেরকে নির্বাচন করেছেন। তিনি তাদেরকে আমার সাহায্যকারী বানিয়েছেন এবং তাদেরকে আমার আত্মীয়ও বানিয়েছেন (কাউকে কাউকে)। শেষ জামানায় কিছু মানুষ আসবে, তারা (মানুষের সামনে) সাহাবিদেরকে খাটো করবে। তোমরা তাদেরকে বন্ধু বানিয়ো না, তাদের সাথে ওঠাবসা কোরো না। তাদের সাথে তোমাদের মেয়ে বিয়ে দিয়ো না। সাবধান! তাদের সাথে জামাতে সালাত পড়ো না, তাদের জানাযাও পড়ো না। তাদের ওপর আল্লাহর লানত নামুক। [১৫৮]
রেওয়ায়াতটিতে আপত্তি আছে।
এ বিষয়ে এর চেয়ে দুর্বল হাদীস বর্ণিত হয়েছে আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে। কিন্তু এটি সাহাবিদের বাণী। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তার কাছে খবর পৌঁছল, আব্দুল্লাহ বিন সাওদা আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমকে গালিগালাজ করে। তখন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এটি আবুল আহওয়াস থেকে সংরক্ষিত। নাজ্জাদ, ইবনে বাত্তাহ, লালকাঈ-সহ অন্যরাও এটি বর্ণনা করেছেন।
ইবরাহীমের মুরসাল হাদীস ভালো। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হত্যা করার ইচ্ছা-প্রকাশ করেছেন মানেই হলো, তাঁর কাছে ওই ব্যক্তির রক্ত হালাল। তবে তিনি তাকে ফেতনার আশংকা থাকায় ছেড়ে দিয়েছেন। যেমন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছু কিছু মুনাফিককে হত্যা করা থেকে বিরত থেকেছেন।
আব্দুর রহমান বিন আবযা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, যদি আমি কাউকে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কটূক্তি করতে শুনি, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিব। [১৫৯]
আব্দুর রহমান রাদিয়াল্লাহু আনহু হলেন বিখ্যাত সাহাবি। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সময় তিনি পবিত্র মক্কার গভর্ণর ছিলেন। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে খুরাসানের গভর্ণর নিযুক্ত করেন।
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, কেউ যদি আমাকে আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুম-এর ওপর প্রাধান্য দেয়, আমি তাকে মিথ্যা অপবাদের শাস্তিস্বরূপ বেত্রাঘাত করব। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পর শ্রেষ্ঠ মানুষ আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু, তারপর উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু। [১৬০]
হাদীসটি আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ, ইবনে বাত্তাহ ও অন্যন্যরা বর্ণনা করেন। এ বিষয়ে আরও প্রচুর 'আসার' বা সাহাবিদের বাণী' রয়েছে।
ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ সহীহ সনদে ইবনে আবি লাইলা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, দুই ব্যক্তি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়ে বিতর্ক করছিল। একজন বলল, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে শ্রেষ্ঠ। জারুদ বললেন, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বরং উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে শ্রেষ্ঠ। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এ খবর পৌঁছল। যে তাকে শ্রেষ্ঠ বলেছিল, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে ডেকে এমনভাবে বেত্রাঘাত করলেন যে, তার পা পর্যন্ত নড়ে উঠল। তারপর তিনি জারুদের দিকে ফিরে বললেন, সাবধান হয়ে যাও। এরপর উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এই এই ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ ছিলেন; যে এর ব্যতিক্রম কথা বলবে, তাকে মিথ্যা অপবাদের হদ্দ প্রদান করা হবে।।[১৬১]
স্বয়ং খুলাফায়ে রাশিদার দুইজন ব্যক্তি-উমর ও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম এমন ব্যক্তিকে শাস্তি দিতেন, যে ব্যক্তি তাঁদেরকে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে শ্রেষ্ঠ বলত। অথচ সেগুলো ছিল নিছক শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া, গালি দেওয়া নয়। বোঝা গেল, তাদের কাছে তবে সাহাবাদেরকে গালি দেওয়া আরও কত গুরুতর ছিল!
উপসংহার যে ব্যক্তি আবু বকর বা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমকে গালি দেওয়ার সাথে সাথে দাবি করে যে, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হলেন প্রভু বা নবী, অথবা জিবরীল আলাহিস সালাম ওহি (আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে নেওয়ার পরিবর্তে) ভুলে মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে নিয়ে গেছেন-কোনো সন্দেহ নেই যে, সে ব্যক্তি কাফের; বরং যে তার কাফের হওয়া নিয়ে সংশয়ে পড়বে, তার কুফরি নিয়েও কোনো সংশয় নেই।
তেমনি ওই ব্যক্তিও কাফের- যে দাবি করবে যে, কুরআনে কোনো অংশ কম আছে, কুরআনের কোনো কিছু গায়েব আছে, কিংবা কুরআনের বতেনি কোনো অর্থ শারঈ আমলকে রহিত করে, ইত্যাদি ইত্যাদি কথা। এ-জাতীয় কথা বলে 'কারামাতিয়া' ও 'বাতিনিয়্যারা'। এদের মধ্যে তানাসুখিরাও আছে। এদের কাফের হওয়া নিয়ে কোনো মতবিরোধ নেই।
সাহাবিগণের সত্যবাদিতা বা দ্বীন নিয়ে নয়, (বরং অন্য কোনো বিষয়ে) কেউ যদি তাঁদের কটূক্তি করে, যেমন কেউ কোনো সাহাবিকে কটূক্তি করে কৃপণ-ভীরু- দুনিয়ালোভী-স্বল্পজ্ঞানী ইত্যাদি বলে, তা হলে সে বিচার ও ‘তাযীরে’র উপযুক্ত; তবে তাকে কাফের বলা যাবে না। যে-সমস্ত আলেম সাহাবার শানে কটূক্তি করাকে কুফরি বলেননি, সম্ভবত তারা এ ধরনের কটূক্তির কথাই বলেছেন।
আর যে সাহাবিগণের ওপর লানাত করবে ও (ব্যক্তিগত কোনো বিষয়ে) তাদের কুৎসা বলবে, তার বিধান কী হবে—এটা মতবিরোধের বিষয়। কারণ এ বিষয়ে দ্বিধা থেকে যায় যে, অভিশাপ কি তাদের প্রতি অবিশ্বাস থেকে নাকি রাগবশত।
আর যে ব্যক্তি আরও সীমা ছাড়িয়ে দাবি করবে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মৃত্যুর পর দশ-পনেরো জন সাহাবি ব্যতিত সবাই মুরতাদ হয়ে গেছে কিংবা ফাসেক হয়ে গেছে, তারাও কাফের—কোনো সন্দেহ নেই। বরং এতেও কোনো সন্দেহ নেই যে, তার কাফের হওয়া নিয়ে যারা সন্দেহ করবে তারাও কাফের।
এসব কটূক্তিকারীদের ওপর মহান আল্লাহর অনেক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আরোপিত হয়েছে; আর বহু রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে এদের চেহারা বিকৃত করেন।
মূলকথা, কিছু কিছু কটূক্তিকারীর কাফের হওয়া নিয়ে কোনো সংশয় নেই। আর কিছু কটূক্তিকারীকে কাফের বলা যাবে না। আর কোনো কোনো কটূক্তিকারী কাফের কি না, দ্বিধা-সংশয় রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জায়গা এটা নয়। বিস্তারিত আলোচনা করলে বইয়ের কলেবর অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। সময়ের দাবি অনুযায়ী এতটুকুই। আল্লাহু আলামু।
টিকাঃ
[১৩৬] কেননা ক্যাফের হওয়ার অর্থ হলো সে মরতাদ: আর মুরতাদের শাস্তি কতল
[১৩৭] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১২
[১৩৮] সূরা আহযাব, ৩৩: ৫৮
[১৩৯] সূরা ফাতহ, ৪৮: ১৮
[১৪০] মুসলিম, আস-সহীহ: ২৪৯৬
[১৪১] সূরা তাওবা, ৯: ১১৭
[১৪২] সূরা হাশর, ৫৯ : ১০
[১৪৩] বুখারী, আস-সহীহ : ৩৬৭৩; মুসলিম, আস-সহীহ: ২৫৪০
[১৪৪] হাকিম, আল-মুস্তাদরাক: ৩/৬৩২; তাবরানি, আল-কাবীর: ১৭/১৪০
[১৪৫] তিরমিযি, আস-সুনান: ৩৮৬২
[১৪৬] ইবনে আদী, আল-কামিল
[১৪৭] তিরমিযি, আস-সুনান: ৩৯৫৮
[১৪৮] সূরা ফাতহ, ৪৮: ২৯
[১৪৯] তাবরানী, কাবীর: ১৭/১৪০
[১৫০] ইবনে বাত্তা, আল-ইবানাহ: ৪৩৯
[১৫১] ইবনে মাজাহ, মুকাদ্দামাতুস সুনান: ১৬২
[১৫২] বুখারী, আস-সহীহ: ১৭; মুসলিম আস-সহীহ: ৭৪
[১৫৩] আহমাদ, আল-মুসনাদ: ১/১৩০, যয়ীফ。
[১৫৪] আহমাদ, আস-সুন্নাহ: ২/৫৮৭-৫৮৮
[১৫৫] লালকাঈ: ৮/১৪৫৪
[১৫৬] মাওকুফ হলো সেই হাদীসে, যেখানে সাহাবি বলেন না যে, এটি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন। ফলে সেটি সাহাবির কথা হওয়ারও সম্ভাবনা থাকে。
[১৫৭] যে হাদীসে সাহাবি বলে দেন, এটি রাসূল ওয়া সাল্লাম বলেছেন。
[১৫৮] খালা, আস-সুন্নাহ: ২/৪৮৩; ইবনে হিব্বান এটিকে ভিত্তিহীন বলেছেন。
[১৫৯] আল-খিলাল, আস-সুন্নাহ: ১/২৫৫
[১৬০] আহমাদ, আল-ফাযায়েল: ১/৮৩
[১৬১] কিছু ক্ষেত্র উল্লেখ করে তিনি মূলত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর শ্রেষ্ঠত্বের দৃষ্টান্ত দিলেন。