📄 তৃতীয় গুণটি প্রসঙ্গে একটি হাদিস
পূর্বোক্ত হাদিসের তৃতীয় গুণের সমর্থনে এই হাদিসঃ
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بِنْ أَبِي أَوْلَى اللهُ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ : «إِنَّ مِنْ أَحَبَّ عِبَادُ اللَّهُ إِلَى اللَّهِ الَّذِينَ يُرَاعُوْنَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُوْمُ وَالأَظِلَّةِ لِذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ».
হযরত আবদুল্লাহ বিন আবু আওফা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ঐ বান্দা, যে আল্লাহ্ আয্যা ওয়াজাল্লার ইবাদত ও স্মরণের লক্ষ্যে চন্দ্র-সূর্য, নক্ষত্র ও ছায়ার প্রতি তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখে।
عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ الله ..... إِنَّ أَحَبَّ عِبَادَ اللَّهِ إِلَى اللَّهِ لِرَعَاءِ الشَّمْسِ وَالْقَمَرِ».
হযরত সায়্যিদুনা আবুদ দারদা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রিয় বান্দা হলো সূর্য ও চন্দ্রের প্রতি সজাগ দৃষ্টিদানকারী।'
টিকাঃ
১. হিলয়াতুল আউলিয়া, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা: ৩০২, হাদিস: ৪০২৬
📄 দরূদে পাকের আধিক্য
عَنْ أَنَسٍ الله مَرْفُوْعًا قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ ثَلَاثُ تَحْتَ ظِلُّ الْعَرْشِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ مِنْ فَرَّجَ عَنْ مَكْرُوبٍ مِنْ أُمَّتِي وَأَحْيَا سُنَّتِي وَأَكْثَرُ الصَّلَاةِ عَلَيَّ».
হযরত সায়্যিদুনা আনাস বিন মালিক রাদিআল্লাহু আনহু হতে মরফু' সূত্রে বর্ণিত, শাহীন শাহে খোশ খিছাল, সাহিবে জুদ ওয়া নাওয়াল, রাসূলে বে মেছাল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তিন ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার আরশের নীচে অবস্থান করবে, যেদিন এটা ছাড়া কোন ছায়া থাকবে না ১. ঐ ব্যক্তি, যে আমার দুর্দশা গ্রস্থ উম্মতের পেরেশানী দূর করে, ২. ঐ ব্যক্তি, যে আমার সুন্নতকে পুনরুজ্জীবিত করে, ৩. ঐ ব্যক্তি, যে আমার উপর বেশী বেশী দরুদ শরীফ পাঠ করে।'
টিকাঃ
১. আহমদ বিন হাম্বল, কিতাবুয যহুদ, পৃষ্ঠা ১৬৬, হাদিস: ৭৭0
২. শরহুয যুরকানী আলাল মুআত্তা, কিতাবুশ শে' باب ماجاء في المتحابين খন্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৪৬৯, হাদিস: ১৮৪১
📄 সেবা-শ্রুশ্রষা ও সান্তনাদানের ফযিলত
হযরত সায়্যিদুনা ফুজাইল বিন আয়াজ রাদিআল্লাহু আনহু ইরশাদ করেন, আমার নিকট সংবাদ পৌঁছেছে যে, হযরত সায়্যিদুনা মূসা আলাইহিস সালাম মহামহিম রবের দরবারে আরয করলেন, হে আমার রব! ঐ সব লোক কারা, যারা আপনার আরশের ছায়ায় থাকবে, যেদিন এটা ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না? আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করলেন, হে মূসা! ঐ সব লোক তারাই, যারা অসুস্থদের সেবা-শুশ্রুষা করে, জানাযার সাথে গমন করে এবং কারো শিশুর মৃত্যু হলে তাকে সান্ত্বনা দান করে।'
বুঝা গেল যে, এ তিনটি গুণের প্রত্যেকটিই স্বতন্ত্রভাবে আরশের ছায়ায় অবস্থানের যোগ্যতা দানকারী। হযরত আবদুল মজিদ বিন আবদুল আযিয তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমাদের যুগে বলা হয়েছিল যে, তিন ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আরশের ছায়ায় থাকবে ১. অসুস্থদের সেবাকারী, ২. জানাযার সাথে গমনকারী, ৩. যার শিশুর মৃত্যে হয় তাকে সান্ত্বনাদানকারী।
ইমাম ইবনে আবিদ্দুনয়া স্বীয় সনদে 'কিতাবুল ইযা'-তে উক্ত হাদিস শরীফটি উল্লেখ করেছেন এবং তাতে এ কথা বিশ্লেষণ করেছেন যে, উক্ত স্বভাবত্রয়ের প্রত্যেকটিই স্বতন্ত্র ভাবে আরশের ছায়ার অধিকারী হিসেবে গঠনকারী। আর অসুস্থের সেবাকারী প্রসঙ্গে তো মরফু' দলিল বিদ্যমান রয়েছে। যেমন-
عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ ﷺ قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ : ...... وَيَصِبْحُ صَائِحٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَيْنَ الَّذِينَ عَادُوا مَرْضَى الْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِيْنِ فِي الدُّنْيَا ، فَيَجْلِسُونَ عَلَى مَنَابِرٍ مِّنْ نُوْرٍ يُحَدِّثُوْنَ اللَّهَ وَالنَّاسُ فِي شِدَّةِ الْحِسَابِ».
আমীরুল মু'মিনীন হযরত সায়্যিদুনা ওমর ইবনে খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তাজেদারে রিসালত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন জনৈক আহবানকারী আহবান করবে, "কোথায় ঐ সব লোক, যারা পৃথিবীতে অসুস্থ, দরিদ্র ও নিঃস্বদের দেখাশোনা করত।" অতঃপর যখন তারা উপস্থিত হবে, তখন তাদেরকে নূরের মিম্বরে বসানো হবে, যেখানে তারা আল্লাহ আয্যা ওয়াজাল্লার সাথে কথোপকথনের সৌভাগ্য লাভ করবে। এমতাবস্থায় অন্যান্য লোকেরা হিসাবের কঠোরতায় নিমজ্জিত থাকবে।'
এ হাদিসে পাকেও আরশের ছায়া প্রাপ্তদের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
টিকাঃ
১. হিলয়াতুল আউলিয়া, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা: ৪৮, হাদিস: ৪৭০৬
তাফসীর আদ দুররুল মনসূর, সূরা আনআম, খন্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২৪৫
কানযুল উম্মাল, কিতাবুয যাকাত, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা: ১৬৬, হাদিস: ১৬১৮৮
📄 রোজাদারদের উপর আরশের ছায়া
1 - عَنْ مُغِيثِ بْنِ سَمِيٌّ ، قَالَ : تَرْكُدُ الشَّمْسُ فَوْقَ رُؤُوسِهِمْ عَلَى أَذْرُعٍ، وَتُفْتَحُ أَبْوَابَ جَهَنَّمَ فَتَهَبُّ عَلَيْهِمْ لَفْحَهَا وَسُمُوْمَهَا ، وَتَخْرُجُ عَلَيْهِمْ نَفْحَاتُهَا حَتَّى تَجْرِي الأَرْضُ مِنْ عَرْقِهِمْ أَنْتَنُ مِنَ الْجِيفِ، وَالصَّائِمُوْنَ فِي ظِلَّ الْعَرْشِ.
১. হযরত সায়্যিদুনা মুগিছ বিন সুম্মী রাদিআল্লাহু আনহু ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন সূর্য লোকদের মাথার উপর কয়েক গজ দূরত্বে অবস্থান করবে এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হবে। তখন এর উত্তাপ ও প্রচন্ড উষ্ণতা তাদের দিকে চলে আসবে এবং জাহান্নামের উষ্ণ স্ফুলিঙ্গ তাদের দিকে তীব্রভাবে ধেয়ে আসবে। এমনকি জমির উপর তাদের ঘামের বন্যা প্রবাহিত হবে, যা পচা ও বিকৃত লাশের চেয়েও বেশী দুর্গন্ধযুক্ত হবে। আর তখন রোজাদার ব্যক্তি আরশের ছায়ায় থাকবে।' এটা এমন উক্তি, যাকে মনগড়া বলা যায় না অর্থাৎ এটা মরফু হাদিসের অন্তর্ভুক্ত।
- عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ الله قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ : «الصَّائِمُوْنَ تَنْفَخُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ رِيْحُ المِسْكِ، وَتُوْضَعُ هُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَائِدَةٌ تَحْتَ الْعَرْشِ، فَيَأْكُلُونَ مِنْهَا وَالنَّاسُ فِي شِدَّةٍ».
২. হযরত সায়্যিদুনা আনাস বিন মালেক রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত রহমতে আলম, নূরে মুজাস্সাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, রোজাদারদের মুখ থেকে মিশকের সুগন্ধি বের হবে। কিয়ামত দিবসে তাদের জন্য আরশের নীচে দস্তরখানা বিছানো হবে এবং তারা তা থেকে আহার করতে থাকবে, যখন অন্যান্য লোকেরা কঠিন বিপদাপন্ন অবস্থায় থাকবে।'
উক্ত হাদিসে পাঁচটি ফাযায়েল বর্ণনায় ইঙ্গিতসূচক ও সুস্পষ্ট উত্তরের সম্ভাবনপূর্ণ।
৩- عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ : قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ ﷺ: إِنَّ لِلَّهِ مَائِدَةً عَلَيْهَا مَا لَا عَيْنٌ رَأَتْ وَلَا أُذُنْ سَمِعَتْ وَلَا خَطَرَ عَلَىٰ قَلْبِ بَشَرٍ لَا يَقْعُدُ عَلَيْهَا إِلَّا الصَّائِمُونَ.
৫. হযরত সায়্যিদুনা আনাস বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, আল্লাহর মাহবুব, দানায়ে গয়ুব, মুনায়্যাহান আনিল উয়ুব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলার নিকট এমন এক দস্ত রখানা (খাদ্যস্থান) রয়েছে, যা এরূপ নিয়ামত রাজি দ্বারা সজ্জিত, যে গুলো না কোন চক্ষু অবলোকন করেছে, না কোন কর্ণ শ্রবণ করেছে কিংবা কোন লোকের অন্তর ধারণা করেছে। আর এ দস্তরখানায় শুধুমাত্র রোজাদাররাই বসবেন।
৬- عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ : قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ تَخْرُجُ الصَّوْمُ مِنْ فُيُورِهِمْ يَعْرِفُونَ بِرِيَاحِ صِيَامِهِمْ، أَفْوَاهُهُمْ أَطْيَبُ مِنْ رِيحِ الْمِسْكِ، فَيَلْقَوْنَ بِالْمَوَائِدِ وَالْأَبَارِيْقِ مُخَمَّمَةٌ بِالْمِسْكِ، فَيُقَالُ لَهُمْ: كُلُوا فَقدْ جُعْتُمْ، وَاشْرَبُوا فَقَدْ عَطِشْتُمْ، دَعُوا النَّاسَ وَاسْتَرِيْحُوا فِي عَنَاءِ وَطَمَأْ.
৪. সায়্যিদুনা আনাস রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, হুজুর নবীয়ে করীম, রউফুর রহীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন কিয়ামতের দিবস উপস্থিত হবে, তখন রোজাদারগণ তাদের কবর থেকে এরূপ অবস্থায় উঠবে যে, রোজার সুগন্ধি দ্বারা তাদের চেনা যাবে। তাদের মুখ মিশকের সুগন্ধির চেয়েও অধিক পবিত্র হবে, তাদের জন্য মিশকের মোহরযুক্ত দস্তরখানা ও ডোসা (পানির পাত্র) রাখা হবে এবং তাদেরকে বলা হবে, খাও, তোমরা দুনিয়ায় ক্ষুধা সহ্য করেছিলে। পান করো, তোমরা দুনিয়াতে পিপাসিত ছিলে। লোকদেরকে ছেড়ে দাও আর তোমরা বিশ্রাম করো। কারণ তোমরা আমার সন্তুষ্টির জন্য ক্লান্তি সহ্য করেছিলে, যখন অন্য লোকেরা দিবা আরামে ছিল। অতঃপর রোজাদারগণ পানাহার ও বিশ্রামে থাকবে, এমতাবস্থায় লোকেরা কঠোরতা ও প্রচন্ড তৃষ্ণায় থাকবে।
৫- عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ : قَالَ ... ويُوْضَعُ لِلصَّائِمِيْنَ وَالصَّائِمَاتِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تَحْتَ الْعَرْشِ مَائِدَةً مِنْ ذَهَبٍ مُكَلَّلَةٌ بِالدُّرِّ وَالْجَوْهَرِ عَلَى مِقْدَارِ دَائِرَةِ الدُّنْيَا عَلَيْهَا مِنَ أَنْوَاعِ أَطْعِمَةِ الْجَنَّةِ وَثِمَارِهَا فَهُمْ يَأْكُلُونَ وَيَشْرَبُونَ وَيَتَنَعَّمُونَ وَالنَّاسُ فِي شِدَّةِ الْحِسَابِ.
৫. হযরত সায়্যিদুনা আবুদ্দারদা রাদিআল্লাহু আনহু হতে মরফু সূত্রে বর্ণিত যে, রোজাদার নর-নারীদের জন্য কিয়ামতের দিন আরশের নীচে পৃথিবী সমান হীরা ও জহরের খাদ্যসামন ও স্বর্ণচিত দস্তরখানা বিছানো হবে। তাতে জান্নাতের রকমারি খাবার, পানীয় ও ফলসাদি থাকবে। অতঃপর রোজাদরারা পানাহার ও স্বাদ গ্রহণে ব্যাপৃত থাকবে, যখন লোকেরা কঠিন হিসাব-নিকাশে ব্যাস্ত থাকবে।
(লেখক বলেন) উম্মুল মু'মিনীন সায়্যিদুনা আয়িশা রাদিআল্লাহু তা'আলা আন্হার বর্ণনাকৃত গুণ ব্যতীত উল্লেখিত হাদিস সমূহের মাধ্যমে বিশিষ্ট গুণ অর্জিত হলো। অতএব, সব মিলে একুশ হলো। এখন একুশের সাথে পূর্ববর্তী আঠাইש মিলে মোট উনপঞ্চাশটি গুণ হল। আমি এ গুলোকে একটি কবিতাকারে একত্রিত করেছি:
وَرَدْفُ مَعَ ضُعْفٍ مِنْ يُضِيفُ بِعِزَّةٍ يُوَصَّلُ لَإِجْلاَلِهِ وَالْجُوْعُ مَعَ أَهْلٍ حَلِيلُهُ صَلَاةُ عَلَى الْهَادِي وَإِحْيَاءُ فَضْلِهِ لِشَمْسٍ وَحُكْمُ لِلأَناسِ كُمَيْلُهُ وَتَرْكُ رِبَا سُحْبٌ رُبَا وَرَعَايَةً وَصَوْمٌ نُسِيْغُ بِمَا السَّبْعَاتُ يَا زَيْنُ أَهْلِهِ
টিকাঃ
১. তাফসীরে দুররুল মনসুর, সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৪, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪৪২
২. মউসুআতুল ইমাম ইবনে আবিদ দুনিয়া, কিতাবুল জু' খন্ড ৪, পৃষ্ঠা: ১০২, হাদিস: ১৩৯