📄 ঝাড়ফুঁক দেওয়ার সময়
[১৪১] আবূ সাঈদ খুদরি থেকে বর্ণিত, ‘নবি ﷺ-এর একদল সাহাবি এক সফরে বের হন। একপর্যায়ে রাত হয়ে গেলে তারা একটি আরব উপগোত্রের দ্বারস্থ হন এবং তাদের মেহমানদারি করতে বলেন। কিন্তু তারা তাদের মেহমানদারি করতে অসম্মতি জানায়। এরপর ওই উপগোত্রের নেতাকে সাপ কিংবা বিচ্ছু কামড় দেয়। তাকে সুস্থ করে তোলার জন্য তারা সব ধরনের চেষ্টা করে, কিন্তু কোনও কিছুই তার উপকারে আসেনি।
তখন তাদের কেউ একজন বলে, ‘রাতের বেলা যে লোকগুলো এসেছিল, তাদের কাছে গিয়ে দেখো; তাদের কাছেও তো কিছু (প্রতিষেধক) থাকতে পারে!’ এরপর তারা সাহাবিদের কাছে এসে বলে, ‘ওহে লোকসকল! আমাদের নেতাকে সাপ বা বিচ্ছু কামড় দিয়েছে। আমরা তার জন্য সব ধরনের চেষ্টা করেছি, কিন্তু তার কোনও উপকার হয়নি। তোমাদের কারও কাছে কি কোনও (প্রতিষেধক) আছে?’ একজন সাহাবি বলেন, ‘শপথ আল্লাহর! আমি ঝাড়ফুঁক জানি। তবে, শপথ আল্লাহর! আমরা তোমাদের কাছে মেহমানদারি চেয়েছিলাম, কিন্তু তোমরা আমাদের মেহমানদারি করোনি। আমাদেরকে কী দেবে-তা নির্ধারণ করার আগ পর্যন্ত আমি তোমাদের কোনও ঝাড়ফুঁক দেবো না।’ তারা সাহাবিদেরকে এক পাল ভেড়া দেওয়ার ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ হন। এরপর ওই সাহাবি গিয়ে তার গায়ে ফুঁ দেন এবং সূরা আল-ফাতিহা পাঠ করেন। অমনিই লোকটি যেন শিকলমুক্ত হয়ে উঠে! সে উঠে এমনভাবে হাঁটতে থাকে, যেন তার কোনও রোগই নেই! এরপর তারা সাহাবিদেরকে চুক্তি মোতাবেক (ভেড়া) পরিশোধ করেন। তখন তাদের কেউ কেউ বলেন, ‘(এগুলো) বণ্টন করো!’ যিনি ফুঁ দিয়েছিলেন, তিনি বলেন, ‘আমরা বরং আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে গিয়ে তাঁকে ঘটনাটি জানাই।’ তারা এসে নবি ﷺ-এর কাছে ঘটনার বিবরণ তুলে ধরলে, নবি ﷺ বলেন, “সূরা আল-ফাতিহা দিয়ে ফুঁ দেওয়া যায়, সেটি তোমরা কীভাবে জানলে?” এরপর তিনি বলেন, “তোমরা সঠিক কাজ করেছ। এগুলো বণ্টন করো, আর তোমাদের সাথে আমার জন্যও একটি ভাগ রেখো!” এ কথা বলে নবি ﷺ হেসে দেন।’ (১)
টিকা:
(১) বুখারি, ২২৭৬।
📄 যেভাবে আল্লাহর আশ্রয় চাইবেন
[১৪২] আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত, ‘আল্লাহর রাসূল ﷺ হাসান ও হুসাইন-কে আল্লাহর আশ্রয়ে দিয়ে বলতেন—
أُعِيْذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
আমি তোমাদের দু’জনকে আল্লাহর পূর্ণ শব্দ/বাক্যসমূহের আশ্রয়ে দিয়ে দিচ্ছি; প্রত্যেক শয়তান, ক্ষতিকারক প্রাণী ও কীটপতঙ্গ এবং প্রত্যেক হিংসুটে চোখ থেকে (আল্লাহ তোমাদের নিরাপদ রাখুন)!
আর তিনি বলতেন, “তোমাদের পিতা (ইবরাহীম) তাঁর দু’ছেলে) ইসমাঈল ও ইসহাক-কে এভাবে আল্লাহর আশ্রয়ে দিতেন।”’ (১)
[১৪৩] আয়িশা থেকে বর্ণিত, ‘কোনও মানুষ অসুস্থ হলে, কিংবা কোনও ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে, অথবা আহত হলে, নবি ﷺ তাঁর আঙুলটিকে এভাবে করে—বর্ণনাকারীদের একজন সুফইয়ান ইবনু উয়াইনা তার আঙুলটিকে মাটিতে লাগিয়ে তারপর ওঠান—বলতেন:
بِسْمِ اللهِ تُرْبَةُ أَرْضِنَا بِرِيقَةِ بَعْضِنَا يُشْفِي سَقِيمُنَا بِإِذْنِ رَبَّنَا
আল্লাহর নামে, আমাদের এলাকার মাটি ও আমাদের কোনো একজনের লালার ওসীলায় আমাদের অসুস্থ ব্যক্তি আমাদের রবের অনুমতিক্রমে সুস্থ হয়ে উঠবে। (২)
[১৪৪] আয়িশা থেকে বর্ণিত, ‘নবি ﷺ তাঁর পরিবারের কাউকে আল্লাহর আশ্রয়ে দেওয়ার সময় ডান হাত দিয়ে তাকে মুছে দিতেন এবং বলতেন—
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَأْسَ وَاشْفِ أَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
হে আল্লাহ, মানুষের অধিপতি! তুমি (তার) কষ্ট দূর করে দাও! সুস্থতা দাও; তুমিই সুস্থতা দানকারী; তুমি সুস্থ না করলে, কেউ সুস্থ করতে পারবে না; (তাকে) এমন সুস্থতা দাও, যাতে আর কোনও রকম অসুস্থতা না থাকে। (৩)
[১৪৫] উসমান ইবনু আবিল আস থেকে বর্ণিত, ‘তিনি আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে অনুযোগ পেশ করেন যে, ইসলাম গ্রহণের সময় থেকে তিনি তার দেহে ব্যথা অনুভব করছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন, “তোমার দেহের যেখানে ব্যথা করছে, সেখানে হাত রেখে তিন বার বলো—
بِسْمِ اللهِ
আল্লাহর নামে।
এরপর সাত বার বলো-
أَعُوْذُ بِعِزَّةِ اللهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِدُ وأُحَاذِرُ
আমি আল্লাহর অসীম শক্তি-সক্ষমতার কাছে আশ্রয় চাই, এমন প্রত্যেকটি অনিষ্ট থেকে, যা আমি খুঁজে পাই এবং (সেসব অনিষ্ট থেকে) আমি যার আশঙ্কা করি।”’ (৪)
[১৪৬] ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত, ‘নবি ﷺ বলেন, “কেউ যদি এমন কোনও রোগীকে দেখতে যায়, যার মৃত্যুর সময়ক্ষণ এখনও আসেনি, এবং সে যদি তার পাশে সাত বার বলে—
أَسْأَلُ اللَّهَ الْعَظِيمَ رَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ أَنْ يَشْفِيَكَ
আমি মহিমান্বিত আরশের মহান অধিপতি আল্লাহর কাছে চাই, তিনি তোমাকে সুস্থ করে দিন!
তাহলে আল্লাহ তাকে অবশ্যই সুস্থ করে দেবেন।”’ (৫)
টিকা:
(১) বুখারি, ৩৩৭১।
(২) মুসলিম, ২১৯৪।
(৩) মুসলিম, ২১৯১।
(৪) মুসলিম, ২২০২; ইবনু মাজাহ, ৩৫২২।
(৫) আবূ দাউদ, ৩১০৬, সহীহ্।
📄 কবরের সামনে দাঁড়িয়ে
[১৪৭] বুরাইদা থেকে বর্ণিত, ‘আল্লাহর রাসূল ﷺ তাদের এভাবে শিখিয়েছেন যে, তারা যখন কবরস্থানে যাবেন, তখন বলবেন—
السَّلامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَاحِقُوْنَ نَسْأَلُ اللهَ لَنَا وَلَكُمْ الْعَافِيَةَ
তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক! ওহে গৃহবাসী মুমিন ও মুসলিমগণ! আর ইন শা আল্লাহ, আমরা (অচিরেই) তোমাদের সাথে যুক্ত হব। আমরা আল্লাহর কাছে চাই, তিনি যেন আমাদের ও তোমাদের মাফ করে দেন। (১)
টিকা:
(১) মুসলিম, ৯৭৫।
📄 বৃষ্টির পানি প্রয়োজন হলে
[১৪৮] জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ থেকে বর্ণিত, ‘কিছু লোক কাঁদতে কাঁদতে নবি ﷺ-এর কাছে আসেন। তখন নবি ﷺ বলেন-
اللَّهُمَّ اسْقِنَا غَيْثاً مُغِيثاً مَرِيْئاً مَرِيْعاً نَافِعاً غَيْرَ ضَارٌّ عَاجِلاً غَيْرَ آجِلٍ
হে আল্লাহ! আমাদেরকে উপকারী বৃষ্টি দাও! যা বরকতময় ও উপকারী, যা কেবল কল্যাণ নিয়ে আসবে, কোনও ক্ষতি করবে না, এখনই দাও, দেরি করো না!
এরপর তাদের উপরের আকাশ (মেঘে) ঢেকে যায়।’ (১)
[১৪৯] আয়িশা থেকে বর্ণিত, ‘লোকজন এসে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে বৃষ্টি না হওয়ার অনুযোগ পেশ করেন। তখন নবি ﷺ একটি মিম্বার স্থাপনের নির্দেশ দেন। অতঃপর তাঁর জন্য ঈদগাহে একটি মিম্বার স্থাপন করা হয়। সেখানে উপস্থিত হওয়ার জন্য নবি ﷺ লোকদের জন্য একটি দিন নির্ধারণ করে দেন। এরপর সূর্যের রশ্মির দিকে তাকানো যায় এমন সময় আল্লাহর রাসূল ﷺ (ঈদগাহের উদ্দেশে) বের হন। মিম্বারে বসে আল্লাহ তাআলার শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রশংসা বর্ণনা করে তিনি বলেন, “তোমরা আমার কাছে অনুযোগ পেশ করেছ—তোমাদের এলাকায় বৃষ্টি হচ্ছে না এবং স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তোমাদের এখানে বৃষ্টি আসতে দেরি হচ্ছে। আল্লাহ তাআলা তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা যেন তাঁকে ডাকো, আর তিনি তোমাদের ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবেন।” এরপর তিনি বলেন—
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ مَالِكِ يَوْمِ الدِّيْنِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ اللَّهُمَّ أَنْتَ اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ أَنْتَ الْغَنِيُّ وَنَحْنُ الْفُقَرَاءُ أُنْزِلْ عَلَيْنَا الغَيْثَ وَاجْعَلْ مَا أَنْزَلْتَ لَنَا قُوَّةً وَبَلَاغاً إِلَى حِينٍ
সকল প্রশংসা জগৎসমূহের অধিপতি আল্লাহর, যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু, বিচার দিনের মালিক। আল্লাহ ছাড়া কোনও সার্বভৌম সত্তা নেই; তিনি যা চান, তাই করেন। হে আল্লাহ! তুমিই আল্লাহ, তুমি ছাড়া কোনও সার্বভৌম সত্তা নেই; তুমি অমুখাপেক্ষী, আর আমরা নিঃস্ব; আমাদের বৃষ্টি দাও! তুমি যা বর্ষণ করবে, তা দিয়ে আমাদের শক্তি যোগাও এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলার সুযোগ করে দাও!
এরপর তিনি দু’ হাত তুলে ধরে রাখেন; এতে তাঁর দু’ বগলের সাদা অংশ প্রকাশ পড়ে। এরপর লোকদের দিকে পিঠ ফিরিয়ে, হাত তোলা অবস্থায় নিজের চাদর পরিবর্তন বা উল্টিয়ে নেন। এরপর লোকদের দিকে মুখ ফেরান এবং (মিম্বার থেকে) নেমে দু’ রাকআত সালাত আদায় করেন। তখন আল্লাহ তাআলা একটি মেঘমালা সৃষ্টি করে দেন; তা থেকে বিদ্যুৎ চমক ও বজ্রপাত শুরু হয়। এরপর আল্লাহ তাআলার অনুমতিক্রমে বৃষ্টি নামে। (রাস্তাঘাট) সয়লাব হওয়ার আগ পর্যন্ত নবি ﷺ মাসজিদে ফিরে আসেননি। বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ার আশঙ্কায় লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটতে থাকে। এ দৃশ্য দেখে নবি ﷺ হেসে দেন; এতে তাঁর মাঢ়ির দাঁত প্রকাশ হয়ে পড়ে। তখন তিনি বলেন, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান, আর আমি তাঁর দাস ও বার্তাবাহক।”’ (২)
টিকা:
(১) আবূ দাউদ, ১১৬৯, হাসান।
(২) আবূ দাউদ, ১১৭৩, হাসান।