📄 বিপদ-মুসিবতে পড়লে
আল্লাহ তাআলা বলেন,
الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوْا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُوْنَ (١٥٧)
“যারা কোনও বিপদের মুখোমুখি হলে বলে, ‘আমরা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর দিকে আমাদের ফিরে যেতে হবে’—তাদেরকে সুসংবাদ দিয়ে দাও। তাদের রবের পক্ষ থেকে তাদের উপর বিপুল অনুগ্রহ বর্ষিত হবে, তাঁর রহমত তাদেরকে ছায়াদান করবে এবং এই ধরনের লোকেরাই সঠিক পথের দিশা পেয়ে থাকে।” (সূরা আল-বাকারাহ ২:১৫৬-১৫৭)
[১৩৭] আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, ‘আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন, “(কষ্টদায়ক) সব কিছুতেই তোমাদের বলা উচিত—
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ
আমরা আল্লাহর জন্য, আর আমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।
এমনকি জুতার ফিতা (নষ্ট হয়ে যাওয়ার) ক্ষেত্রেও; কারণ, এটিও বিপদ-মুসিবতের অংশ।”’ (১)
[১৩৮] উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত, ‘আমি আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছি, “কোনও বান্দা যদি বিপদ-মুসিবতের মুখোমুখি হয়ে বলে—
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ
আমরা আল্লাহর জন্য, আর আমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে。
اللَّهُمَّ أَجِرْنِي فِي مُصِيبَتِي وَأَخْلِفْ لِي خَيْراً مِّنْهَا
হে আল্লাহ! আমার মুসিবতে তুমি আমাকে আশ্রয় দাও! এবং তা থেকে উত্তম কিছু আমাকে দাও!
আল্লাহ অবশ্যই তাকে তার জন্য মুসিবতের জন্য প্রতিদান দেবেন এবং এর বদলে তাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দেবেন।”
আবূ সালামা’র মৃত্যুর পর, আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর নির্দেশ অনুযায়ী আমি এ দুআ পাঠ করি, এরপর আল্লাহ তাআলা আমাকে তার চেয়ে উত্তম অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে দিয়েছেন।’ (২)
[১৩৯] উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত, ‘(আবূ সালামা’র মৃত্যুর পর) আল্লাহর রাসূল ﷺ আবূ সালামার কাছে আসেন। তখন তার চোখ ছিল স্থির। নবি ﷺ তার চোখ বন্ধ করে দিয়ে বলেন, “রূহ বা আত্মা নিয়ে যাওয়া হলে, চোখ তার পেছনে পেছনে যায়।” তখন তার পরিবারের কিছু লোক চিৎকার করে উঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নবি ﷺ বলেন, “তোমরা তোমাদের ব্যাপারে ভালো ছাড়া অন্য কিছুর দুআ করো না; কারণ, তোমাদের দুআর সাথে সাথে ফেরেশতারা ‘আমীন/ আল্লাহ! কবুল করো’ বলতে থাকে।” এরপর তিনি বলেন—
ٱللَّهُمَّ ٱغْفِرْ لِأَبِي سَلَمَةَ
হে আল্লাহ! তুমি আবূ সালামা-কে মাফ করে দাও!
وَارْفَعْ دَرَجَتَهُ فِي ٱلْمَهْدِيِّينَ
সঠিক পথের দিশাপ্রাপ্ত লোকদের মধ্যে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দাও!
وَٱخْلُفْهُ فِي عَقِبِهِ فِي ٱلْغَابِرِينَ
তুমি তার পেছনে রেখে যাওয়া পরিবারের দেখভাল করো!
وَٱغْفِرْ لَنَا وَلَهُ يَا رَبَّ ٱلْعَالَمِينَ
জগতসমূহের অধিপতি! তুমি আমাদেরকে ও তাকে মাফ করে দাও!
وَٱفْسَحْ لَهُ قَبْرَهُ
তার কবরকে প্রশস্ত করে দাও
وَنَوِّرْ لَهُ فِيهِ
এবং তার জন্য সেখানে আলোর ব্যবস্থা করে দাও! (৩)
টিকা:
(১) ইবনুস সুন্নি, ৩৫৪, হাসান।
(২) মুসলিম, ৯১৮।
(৩) মুসলিম, ৯২০।
📄 ঋণের বোঝা চাপলে
[১৪০] আলি ইবনু আবী তালিব থেকে বর্ণিত, ‘এক ব্যক্তি যার ঋণ পরিশোধের জন্য একটি চুক্তি করা হয়েছিল, সে তাঁর কাছে এসে বলে, ‘আমি তো আমার চুক্তির অর্থ যোগাড় করতে পারছি না; আমাকে সাহায্য করুন!’ আলি বলেন, ‘আমি কি তোমাকে এমন কিছু বাক্য শেখাব না, যা আল্লাহর রাসূল আমাকে শিখিয়েছেন? তোমার ঋণের বোঝা পাহাড় পরিমাণ হলেও, (সেসব বাক্য পাঠ করলে) আল্লাহ তোমাকে ঋণমুক্ত করে দেবেন! তুমি বোলো—
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
হে আল্লাহ! তুমি যা হারাম করেছ, তা বাদ দিয়ে, তোমার হালালকেই আমার জন্য যথেষ্ট করে দাও! আর তোমার অনুগ্রহ দিয়ে, তোমাকে ছাড়া অন্য সবার কাছ থেকে আমাকে অমুখাপেক্ষী করে দাও! (১)
[১৭১] (এই হাদিসটি বইতে ১৭১ নম্বর দিয়ে শুরু হলেও এটি মূলত ১৪১ নম্বর হাদিস। বইয়ের নাম্বারটি এখানে রাখা হয়েছে।) আবূ সা‘ঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত, ‘একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ মসজিদে প্রবেশ করেন এবং সেখানে আবু উমামা নামক এক আনসারী সাহাবীকে দেখেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “হে আবু উমামা! আমি তোমাকে সালাতের সময় ছাড়াও মসজিদে বসে থাকতে দেখছি কেন?” আবু উমামা উত্তর দিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিছু ঋণ ও দুনিয়াবি চিন্তা আমাকে গ্রাস করে ফেলেছে।” উত্তরে রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “আমি কি তোমাকে এমন কিছু দুআ শিখিয়ে দেবো যা পাঠ করলে আল্লাহ তোমার মনের অস্থিরতা দূর করে দেবেন এবং তোমার ঋণ পরিশোধ করার ব্যবস্থা করে দেবেন?” আবু উমামা বললেন, “হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অবশ্যই।” রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “তুমি সকাল-সন্ধ্যায় এই দুআ পড়বে:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ
হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট চিন্তা ও শোক থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, ভীরুতা ও কার্পণ্য থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং ঋণের বোঝা ও মানুষের জোর-জবরদস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”
আবু উমামা (রা.) বলেন, “আমি তা-ই করলাম এবং আল্লাহ আমার দুশ্চিন্তা দূর করে দিলেন এবং আমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দিলেন।”’ (২)
টিকা:
(১) তিরমিযি, ৩৫৬৩, হাসান।
(২) আবূ দাউদ, ১৫৫৫। আল্লামা আলবানি হাদিসটিকে যঈফ বলেছেন। এর কারণ, বর্ণনাকারী আবূ সা‘ঈদ খুদরী সম্পর্কে কিছু কথা আছে। যদিও হাদিসটি আমলযোগ্য হওয়ার পক্ষেও যথেষ্ট মতামত আছে। আল্লাহ ভালো জানেন।
📄 ঝাড়ফুঁক দেওয়ার সময়
[১৪১] আবূ সাঈদ খুদরি থেকে বর্ণিত, ‘নবি ﷺ-এর একদল সাহাবি এক সফরে বের হন। একপর্যায়ে রাত হয়ে গেলে তারা একটি আরব উপগোত্রের দ্বারস্থ হন এবং তাদের মেহমানদারি করতে বলেন। কিন্তু তারা তাদের মেহমানদারি করতে অসম্মতি জানায়। এরপর ওই উপগোত্রের নেতাকে সাপ কিংবা বিচ্ছু কামড় দেয়। তাকে সুস্থ করে তোলার জন্য তারা সব ধরনের চেষ্টা করে, কিন্তু কোনও কিছুই তার উপকারে আসেনি।
তখন তাদের কেউ একজন বলে, ‘রাতের বেলা যে লোকগুলো এসেছিল, তাদের কাছে গিয়ে দেখো; তাদের কাছেও তো কিছু (প্রতিষেধক) থাকতে পারে!’ এরপর তারা সাহাবিদের কাছে এসে বলে, ‘ওহে লোকসকল! আমাদের নেতাকে সাপ বা বিচ্ছু কামড় দিয়েছে। আমরা তার জন্য সব ধরনের চেষ্টা করেছি, কিন্তু তার কোনও উপকার হয়নি। তোমাদের কারও কাছে কি কোনও (প্রতিষেধক) আছে?’ একজন সাহাবি বলেন, ‘শপথ আল্লাহর! আমি ঝাড়ফুঁক জানি। তবে, শপথ আল্লাহর! আমরা তোমাদের কাছে মেহমানদারি চেয়েছিলাম, কিন্তু তোমরা আমাদের মেহমানদারি করোনি। আমাদেরকে কী দেবে-তা নির্ধারণ করার আগ পর্যন্ত আমি তোমাদের কোনও ঝাড়ফুঁক দেবো না।’ তারা সাহাবিদেরকে এক পাল ভেড়া দেওয়ার ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ হন। এরপর ওই সাহাবি গিয়ে তার গায়ে ফুঁ দেন এবং সূরা আল-ফাতিহা পাঠ করেন। অমনিই লোকটি যেন শিকলমুক্ত হয়ে উঠে! সে উঠে এমনভাবে হাঁটতে থাকে, যেন তার কোনও রোগই নেই! এরপর তারা সাহাবিদেরকে চুক্তি মোতাবেক (ভেড়া) পরিশোধ করেন। তখন তাদের কেউ কেউ বলেন, ‘(এগুলো) বণ্টন করো!’ যিনি ফুঁ দিয়েছিলেন, তিনি বলেন, ‘আমরা বরং আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে গিয়ে তাঁকে ঘটনাটি জানাই।’ তারা এসে নবি ﷺ-এর কাছে ঘটনার বিবরণ তুলে ধরলে, নবি ﷺ বলেন, “সূরা আল-ফাতিহা দিয়ে ফুঁ দেওয়া যায়, সেটি তোমরা কীভাবে জানলে?” এরপর তিনি বলেন, “তোমরা সঠিক কাজ করেছ। এগুলো বণ্টন করো, আর তোমাদের সাথে আমার জন্যও একটি ভাগ রেখো!” এ কথা বলে নবি ﷺ হেসে দেন।’ (১)
টিকা:
(১) বুখারি, ২২৭৬।
📄 যেভাবে আল্লাহর আশ্রয় চাইবেন
[১৪২] আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত, ‘আল্লাহর রাসূল ﷺ হাসান ও হুসাইন-কে আল্লাহর আশ্রয়ে দিয়ে বলতেন—
أُعِيْذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
আমি তোমাদের দু’জনকে আল্লাহর পূর্ণ শব্দ/বাক্যসমূহের আশ্রয়ে দিয়ে দিচ্ছি; প্রত্যেক শয়তান, ক্ষতিকারক প্রাণী ও কীটপতঙ্গ এবং প্রত্যেক হিংসুটে চোখ থেকে (আল্লাহ তোমাদের নিরাপদ রাখুন)!
আর তিনি বলতেন, “তোমাদের পিতা (ইবরাহীম) তাঁর দু’ছেলে) ইসমাঈল ও ইসহাক-কে এভাবে আল্লাহর আশ্রয়ে দিতেন।”’ (১)
[১৪৩] আয়িশা থেকে বর্ণিত, ‘কোনও মানুষ অসুস্থ হলে, কিংবা কোনও ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে, অথবা আহত হলে, নবি ﷺ তাঁর আঙুলটিকে এভাবে করে—বর্ণনাকারীদের একজন সুফইয়ান ইবনু উয়াইনা তার আঙুলটিকে মাটিতে লাগিয়ে তারপর ওঠান—বলতেন:
بِسْمِ اللهِ تُرْبَةُ أَرْضِنَا بِرِيقَةِ بَعْضِنَا يُشْفِي سَقِيمُنَا بِإِذْنِ رَبَّنَا
আল্লাহর নামে, আমাদের এলাকার মাটি ও আমাদের কোনো একজনের লালার ওসীলায় আমাদের অসুস্থ ব্যক্তি আমাদের রবের অনুমতিক্রমে সুস্থ হয়ে উঠবে। (২)
[১৪৪] আয়িশা থেকে বর্ণিত, ‘নবি ﷺ তাঁর পরিবারের কাউকে আল্লাহর আশ্রয়ে দেওয়ার সময় ডান হাত দিয়ে তাকে মুছে দিতেন এবং বলতেন—
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَأْسَ وَاشْفِ أَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
হে আল্লাহ, মানুষের অধিপতি! তুমি (তার) কষ্ট দূর করে দাও! সুস্থতা দাও; তুমিই সুস্থতা দানকারী; তুমি সুস্থ না করলে, কেউ সুস্থ করতে পারবে না; (তাকে) এমন সুস্থতা দাও, যাতে আর কোনও রকম অসুস্থতা না থাকে। (৩)
[১৪৫] উসমান ইবনু আবিল আস থেকে বর্ণিত, ‘তিনি আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে অনুযোগ পেশ করেন যে, ইসলাম গ্রহণের সময় থেকে তিনি তার দেহে ব্যথা অনুভব করছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন, “তোমার দেহের যেখানে ব্যথা করছে, সেখানে হাত রেখে তিন বার বলো—
بِسْمِ اللهِ
আল্লাহর নামে।
এরপর সাত বার বলো-
أَعُوْذُ بِعِزَّةِ اللهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِدُ وأُحَاذِرُ
আমি আল্লাহর অসীম শক্তি-সক্ষমতার কাছে আশ্রয় চাই, এমন প্রত্যেকটি অনিষ্ট থেকে, যা আমি খুঁজে পাই এবং (সেসব অনিষ্ট থেকে) আমি যার আশঙ্কা করি।”’ (৪)
[১৪৬] ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত, ‘নবি ﷺ বলেন, “কেউ যদি এমন কোনও রোগীকে দেখতে যায়, যার মৃত্যুর সময়ক্ষণ এখনও আসেনি, এবং সে যদি তার পাশে সাত বার বলে—
أَسْأَلُ اللَّهَ الْعَظِيمَ رَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ أَنْ يَشْفِيَكَ
আমি মহিমান্বিত আরশের মহান অধিপতি আল্লাহর কাছে চাই, তিনি তোমাকে সুস্থ করে দিন!
তাহলে আল্লাহ তাকে অবশ্যই সুস্থ করে দেবেন।”’ (৫)
টিকা:
(১) বুখারি, ৩৩৭১।
(২) মুসলিম, ২১৯৪।
(৩) মুসলিম, ২১৯১।
(৪) মুসলিম, ২২০২; ইবনু মাজাহ, ৩৫২২।
(৫) আবূ দাউদ, ৩১০৬, সহীহ্।