📄 আল্লাহর ফায়সালার সামনে আত্মসমর্পণ করুন
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوْا لَا تَكُوْنُوْا كَالَّذِينَ كَفَرُوا وَقَالُوا لِإِخْوَانِهِمْ إِذَا ضَرَبُوا فِي الْأَرْضِ أَوْ كَانُوْا غُزًّى لَّوْ كَانُوْا عِنْدَنَا مَا مَاتُوْا وَمَا قُتِلُوْا لِيَجْعَلَ اللَّهُ ذَلِكَ حَسْرَةً فِي قُلُوْبِهِمْ وَاللَّهُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِيرٌ (١٥٦)
“হে ঈমানদারগণ! কাফিরদের মতো হয়ো না। তাদের আত্মীয়স্বজনরা কখনও সফরে গেলে অথবা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলে (এবং সেখানে কোনও দুর্ঘটনায় পতিত হলে) তারা বলে, যদি তারা আমাদের কাছে থাকত, তাহলে মারা যেত না এবং নিহত হত না। এ ধরনের কথাকে আল্লাহ তাদের মানসিক খেদ ও আক্ষেপের কারণ বানিয়ে দেন। নয়তো জীবন-মৃত্যু তো একমাত্র আল্লাহই দিয়ে থাকেন এবং তোমাদের সমস্ত কার্যকলাপের উপর তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।” (সূরা আল ইমরান ৩:১৫৬)
[১৩৩] আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, ‘আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন, “দুর্বল মুমিনের চেয়ে শক্তিশালী মুমিন উত্তম এবং আল্লাহ তাআলার কাছে বেশি প্রিয়; অবশ্য প্রত্যেকের মধ্যেই কল্যাণ আছে। ওই কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হও, যা তোমার উপকারে আসবে। আর আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও; নিজেকে (কখনও) অসহায় মনে কোরো না। তোমার জীবনে কোনও কিছু ঘটে গেলে এ কথা বোলো না, ‘ইশ্! আমি যদি এ কাজ করতাম, তাহলে এটি এটি হত!’ বরং বোলো, ‘এ হলো আল্লাহর ফায়সালা। তিনি যা চান, তা-ই করেন।’ কারণ, ‘যদি’ কথাটি শয়তানের কাজের জন্য রাস্তা খুলে দেয়।”’ (১)
[১৩৪] আউফ ইবনু মালিক থেকে বর্ণিত, ‘নবি ﷺ দু’ ব্যক্তির মধ্যে ফায়সালা করে দেন। ফায়সালা যার বিরুদ্ধে গিয়েছিল, সে চলে যাওয়ার সময় বলে, “আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, আর তিনিই সর্বোত্তম অভিভাবক।” এর পরিপ্রেক্ষিতে নবি ﷺ বলেন, “আল্লাহ অলসতা ও গাফিলতিকে তিরস্কার করেন; তোমার উচিত চৌকশ হওয়া; তারপর পরাজিত হলে বলবে—‘আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, আর তিনিই সর্বোত্তম অভিভাবক।’”’ (২)
টিকা:
(১) মুসলিম, ২৬৬৪।
(২) আবূ দাউদ, ৩৬২৭, বর্ণনাসূত্রটি দুর্বল।
📄 আল্লাহর অনুগ্রহ পেলে
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ قُلْتَ مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
“আর যখন তুমি নিজের বাগানে প্রবেশ করছিলে, তখন কেন বললে না, ‘আল্লাহ যা চান তাই হয়, তাঁর প্রদত্ত শক্তি ছাড়া আর কোনও শক্তি নেই?’” (সূরা আল-কাহফ ১৮:৩৯)
[১৩৫] আনাস থেকে বর্ণিত, ‘আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন, “আল্লাহ কোনও বান্দাকে পরিবার, ধন-সম্পদ ও সন্তানাদির অনুগ্রহ দান করলে, সে যদি বলে—
مَا شَاءَ اللهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
আল্লাহ যা চান (তা-ই হয়); আল্লাহ ছাড়া কোনও শক্তি নেই।
তাহলে সে তাদের মধ্যে মৃত্যু ছাড়া আর কোনও আপদ দেখবে না।”’ (১)
[১৩৬] আয়িশা থেকে বর্ণিত, ‘নবি ﷺ কোনও পছন্দনীয় জিনিস দেখলে বলতেন—
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي تَتِمُّ بِنِعْمَتِهِ الصَّالِحَاتُ
সকল প্রশংসা আল্লাহর, যাঁর অনুগ্রহে সকল ভালো কাজ সম্পন্ন হয়।
আর কোনও অপছন্দনীয় জিনিস দেখলে বলতেন—
الْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى كُلِّ حَالٍ
সর্বাবস্থায় সকল প্রশংসা আল্লাহর।’ (২)
টিকা:
(১) ইবনুস সুন্নি, ৩৫০, বর্ণনাসূত্রটি দুর্বল।
(২) ইবনু মাজাহ, ৩৮০৩, বর্ণনাসূত্রটি দুর্বল।
📄 বিপদ-মুসিবতে পড়লে
আল্লাহ তাআলা বলেন,
الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوْا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُوْنَ (١٥٧)
“যারা কোনও বিপদের মুখোমুখি হলে বলে, ‘আমরা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর দিকে আমাদের ফিরে যেতে হবে’—তাদেরকে সুসংবাদ দিয়ে দাও। তাদের রবের পক্ষ থেকে তাদের উপর বিপুল অনুগ্রহ বর্ষিত হবে, তাঁর রহমত তাদেরকে ছায়াদান করবে এবং এই ধরনের লোকেরাই সঠিক পথের দিশা পেয়ে থাকে।” (সূরা আল-বাকারাহ ২:১৫৬-১৫৭)
[১৩৭] আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, ‘আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন, “(কষ্টদায়ক) সব কিছুতেই তোমাদের বলা উচিত—
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ
আমরা আল্লাহর জন্য, আর আমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।
এমনকি জুতার ফিতা (নষ্ট হয়ে যাওয়ার) ক্ষেত্রেও; কারণ, এটিও বিপদ-মুসিবতের অংশ।”’ (১)
[১৩৮] উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত, ‘আমি আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছি, “কোনও বান্দা যদি বিপদ-মুসিবতের মুখোমুখি হয়ে বলে—
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ
আমরা আল্লাহর জন্য, আর আমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে。
اللَّهُمَّ أَجِرْنِي فِي مُصِيبَتِي وَأَخْلِفْ لِي خَيْراً مِّنْهَا
হে আল্লাহ! আমার মুসিবতে তুমি আমাকে আশ্রয় দাও! এবং তা থেকে উত্তম কিছু আমাকে দাও!
আল্লাহ অবশ্যই তাকে তার জন্য মুসিবতের জন্য প্রতিদান দেবেন এবং এর বদলে তাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দেবেন।”
আবূ সালামা’র মৃত্যুর পর, আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর নির্দেশ অনুযায়ী আমি এ দুআ পাঠ করি, এরপর আল্লাহ তাআলা আমাকে তার চেয়ে উত্তম অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে দিয়েছেন।’ (২)
[১৩৯] উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত, ‘(আবূ সালামা’র মৃত্যুর পর) আল্লাহর রাসূল ﷺ আবূ সালামার কাছে আসেন। তখন তার চোখ ছিল স্থির। নবি ﷺ তার চোখ বন্ধ করে দিয়ে বলেন, “রূহ বা আত্মা নিয়ে যাওয়া হলে, চোখ তার পেছনে পেছনে যায়।” তখন তার পরিবারের কিছু লোক চিৎকার করে উঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নবি ﷺ বলেন, “তোমরা তোমাদের ব্যাপারে ভালো ছাড়া অন্য কিছুর দুআ করো না; কারণ, তোমাদের দুআর সাথে সাথে ফেরেশতারা ‘আমীন/ আল্লাহ! কবুল করো’ বলতে থাকে।” এরপর তিনি বলেন—
ٱللَّهُمَّ ٱغْفِرْ لِأَبِي سَلَمَةَ
হে আল্লাহ! তুমি আবূ সালামা-কে মাফ করে দাও!
وَارْفَعْ دَرَجَتَهُ فِي ٱلْمَهْدِيِّينَ
সঠিক পথের দিশাপ্রাপ্ত লোকদের মধ্যে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দাও!
وَٱخْلُفْهُ فِي عَقِبِهِ فِي ٱلْغَابِرِينَ
তুমি তার পেছনে রেখে যাওয়া পরিবারের দেখভাল করো!
وَٱغْفِرْ لَنَا وَلَهُ يَا رَبَّ ٱلْعَالَمِينَ
জগতসমূহের অধিপতি! তুমি আমাদেরকে ও তাকে মাফ করে দাও!
وَٱفْسَحْ لَهُ قَبْرَهُ
তার কবরকে প্রশস্ত করে দাও
وَنَوِّرْ لَهُ فِيهِ
এবং তার জন্য সেখানে আলোর ব্যবস্থা করে দাও! (৩)
টিকা:
(১) ইবনুস সুন্নি, ৩৫৪, হাসান।
(২) মুসলিম, ৯১৮।
(৩) মুসলিম, ৯২০।
📄 ঋণের বোঝা চাপলে
[১৪০] আলি ইবনু আবী তালিব থেকে বর্ণিত, ‘এক ব্যক্তি যার ঋণ পরিশোধের জন্য একটি চুক্তি করা হয়েছিল, সে তাঁর কাছে এসে বলে, ‘আমি তো আমার চুক্তির অর্থ যোগাড় করতে পারছি না; আমাকে সাহায্য করুন!’ আলি বলেন, ‘আমি কি তোমাকে এমন কিছু বাক্য শেখাব না, যা আল্লাহর রাসূল আমাকে শিখিয়েছেন? তোমার ঋণের বোঝা পাহাড় পরিমাণ হলেও, (সেসব বাক্য পাঠ করলে) আল্লাহ তোমাকে ঋণমুক্ত করে দেবেন! তুমি বোলো—
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
হে আল্লাহ! তুমি যা হারাম করেছ, তা বাদ দিয়ে, তোমার হালালকেই আমার জন্য যথেষ্ট করে দাও! আর তোমার অনুগ্রহ দিয়ে, তোমাকে ছাড়া অন্য সবার কাছ থেকে আমাকে অমুখাপেক্ষী করে দাও! (১)
[১৭১] (এই হাদিসটি বইতে ১৭১ নম্বর দিয়ে শুরু হলেও এটি মূলত ১৪১ নম্বর হাদিস। বইয়ের নাম্বারটি এখানে রাখা হয়েছে।) আবূ সা‘ঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত, ‘একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ মসজিদে প্রবেশ করেন এবং সেখানে আবু উমামা নামক এক আনসারী সাহাবীকে দেখেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “হে আবু উমামা! আমি তোমাকে সালাতের সময় ছাড়াও মসজিদে বসে থাকতে দেখছি কেন?” আবু উমামা উত্তর দিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিছু ঋণ ও দুনিয়াবি চিন্তা আমাকে গ্রাস করে ফেলেছে।” উত্তরে রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “আমি কি তোমাকে এমন কিছু দুআ শিখিয়ে দেবো যা পাঠ করলে আল্লাহ তোমার মনের অস্থিরতা দূর করে দেবেন এবং তোমার ঋণ পরিশোধ করার ব্যবস্থা করে দেবেন?” আবু উমামা বললেন, “হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অবশ্যই।” রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “তুমি সকাল-সন্ধ্যায় এই দুআ পড়বে:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ
হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট চিন্তা ও শোক থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, ভীরুতা ও কার্পণ্য থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং ঋণের বোঝা ও মানুষের জোর-জবরদস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”
আবু উমামা (রা.) বলেন, “আমি তা-ই করলাম এবং আল্লাহ আমার দুশ্চিন্তা দূর করে দিলেন এবং আমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দিলেন।”’ (২)
টিকা:
(১) তিরমিযি, ৩৫৬৩, হাসান।
(২) আবূ দাউদ, ১৫৫৫। আল্লামা আলবানি হাদিসটিকে যঈফ বলেছেন। এর কারণ, বর্ণনাকারী আবূ সা‘ঈদ খুদরী সম্পর্কে কিছু কথা আছে। যদিও হাদিসটি আমলযোগ্য হওয়ার পক্ষেও যথেষ্ট মতামত আছে। আল্লাহ ভালো জানেন।