📄 আযান শয়তানকে তাড়িয়ে দেয়
[১২৭] আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, ‘নবি ﷺ বলেন, “মুআযয্যিন যখন আযান দেয়, শয়তান তখন বায়ু ত্যাগ করতে করতে পালিয়ে যায়। আযান শেষ হলে, সে এগিয়ে আসে; কিন্তু সালাতের জন্য ইকামাত দেওয়া হলে, (আবার) পালিয়ে যায়। ইকামাত শেষ হলে সে ফিরে আসে।”’(১)
[১২৮] সুহাইল ইবনু আবী সালিহ বলেন, ‘আমার পিতা আমাকে বানু হারিসার কাছে পাঠান। আমার সঙ্গে ছিল আমাদের এক ভৃত্য বা বন্ধু। দেয়ালের ওপার থেকে কেউ একজন তাকে নাম ধরে ডাক দেয়। আমার সঙ্গে-থাকা লোকটি দেয়ালের কাছে গিয়ে কিছুই দেখতে পায়নি। বিষয়টি আমার পিতাকে জানালে, তিনি বলেন, “আমি যদি আঁচ করতে পারতাম, তুমি এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে, তাহলে আমি তোমাকে পাঠাতাম না। তবে (ভবিষ্যতে) যদি কোনও আওয়াজ শুন (এবং কিছু দেখতে না পাও), তাহলে সালাতের আযান দেবে; কারণ, আবূ হুরায়রা নবী ﷺ এর বরাতে বলেছেন, “সালাতের আযান দিলে শয়তান পালিয়ে যায়।”’(২)
[১২৯] যাইদ ইবনু আসলাম থেকে বর্ণিত, ‘তাকে কয়েকটি খনি দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়। লোকজন (তাকে) জানায় যে, ওখানে প্রচুর জিন আছে। ফলে তিনি তাদের সব সময় বেশি বেশি আযান দেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর তারা আর কিছু দেখতে পায়নি।’
[১৩০] আবুদ দারদা থেকে বর্ণিত, ‘নবী ﷺ সালাতে দাঁড়ান। তখন আমরা শুনতে পাই, তিনি বলছেন, “أَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنْكَ আমি তোমার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।” এরপর তিনি তিন বার বলেন, “أَلْعَنُكَ بِلَعْنَةِ اللهِ আমি তোমাকে আল্লাহর অভিশাপ দিচ্ছি।” সালাত শেষ হলে, আমরা তাঁকে বলি, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনাকের সালাতের মধ্যে এমন কিছু বলতে শুনলাম, যা এর আগে আপনাকে বলতে শুনিনি! আর দেখলাম, আপনি আপনার হাত (সামনের দিকে) বাড়িয়ে দিয়েছেন!’ নবী ﷺ বলেন, “আল্লাহর দুশমন ইবলীস আগুনের একটি স্ফুলিঙ্গ নিয়ে এসেছিল, আমার চেহারায় লাগিয়ে দেওয়ার জন্য। তখন আমি তিন বার বলি, أَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنْكَ আমি তোমার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।” চাই।’ এরপর তিন বার বলি, ‘أَلْعَنُكَ بِلَعْنَةِ اللهِ التَّامَّةِ আমি তোমাকে আল্লাহর পূর্ণ অভিশাপ দিচ্ছি।’ এরপর সে আর দেরি করতে চায়নি। আমি তাকে ধরতে চেয়েছিলাম। আমাদের ভাই সুলাইমান عَلَيْهِ ٱلسَّلَامُ-এর দুআ না থাকলে, সে বন্দি হয়ে যেত, আর মদীনাবাসীদের শিশুরা তাকে নিয়ে খেল-তামাশা করত।”’ (৩)
[১৩১] উসমান ইবনু আবিল আস থেকে বর্ণিত, ‘আমি বলি, “হে আল্লাহর রাসূল! শয়তান আমার, আমার সালাত ও আমার কিরাআতের মধ্যে বাধা সৃষ্টি করে এবং (কতটুকু পড়লাম) সে ব্যাপারে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেয়।” তখন নবি ﷺ বলেন, “এ হলো খান্যাব নামক শয়তানের কাজ। তার উপস্থিতি টের পেলে, তার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ো এবং তোমার বাম দিকে তিন বার থুতু ফেলো।” আমি তা-ই করি। এর ফলে আল্লাহ তাকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে দেন।’ (৪)
[১৩২] আবূ যুমাইল বলেন, ‘আমি ইবনু আব্বাসকে বলি, “ব্যাপার কী? আমার মনে (মাঝে মধ্যে আল্লাহ সম্পর্কে) সন্দেহ সৃষ্টি হয়!” তখন তিনি আমাকে বলেন, “তোমার মনে এরূপ কিছু সৃষ্টি হলে, তুমি পাঠ কোরো—
هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
“তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ; তিনিই প্রকাশিত তিনিই গোপন। তিনি সব বিষয়ে অবহিত।” (সূরা আল-হাদীদ ৫৭:৩)”’ (৫)
টিকা:
(১) বুখারি, ৬০৮, ১২৩১, ৩২৮৫।
(২) মুসলিম, ৩৮৯।
(৩) মুসলিম, ৫৪২।
(৪) মুসলিম, ২২০৩।
(৫) আবূ দাউদ, ৫১১০, হাসান।
📄 আল্লাহর ফায়সালার সামনে আত্মসমর্পণ করুন
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوْا لَا تَكُوْنُوْا كَالَّذِينَ كَفَرُوا وَقَالُوا لِإِخْوَانِهِمْ إِذَا ضَرَبُوا فِي الْأَرْضِ أَوْ كَانُوْا غُزًّى لَّوْ كَانُوْا عِنْدَنَا مَا مَاتُوْا وَمَا قُتِلُوْا لِيَجْعَلَ اللَّهُ ذَلِكَ حَسْرَةً فِي قُلُوْبِهِمْ وَاللَّهُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِيرٌ (١٥٦)
“হে ঈমানদারগণ! কাফিরদের মতো হয়ো না। তাদের আত্মীয়স্বজনরা কখনও সফরে গেলে অথবা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলে (এবং সেখানে কোনও দুর্ঘটনায় পতিত হলে) তারা বলে, যদি তারা আমাদের কাছে থাকত, তাহলে মারা যেত না এবং নিহত হত না। এ ধরনের কথাকে আল্লাহ তাদের মানসিক খেদ ও আক্ষেপের কারণ বানিয়ে দেন। নয়তো জীবন-মৃত্যু তো একমাত্র আল্লাহই দিয়ে থাকেন এবং তোমাদের সমস্ত কার্যকলাপের উপর তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।” (সূরা আল ইমরান ৩:১৫৬)
[১৩৩] আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, ‘আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন, “দুর্বল মুমিনের চেয়ে শক্তিশালী মুমিন উত্তম এবং আল্লাহ তাআলার কাছে বেশি প্রিয়; অবশ্য প্রত্যেকের মধ্যেই কল্যাণ আছে। ওই কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হও, যা তোমার উপকারে আসবে। আর আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও; নিজেকে (কখনও) অসহায় মনে কোরো না। তোমার জীবনে কোনও কিছু ঘটে গেলে এ কথা বোলো না, ‘ইশ্! আমি যদি এ কাজ করতাম, তাহলে এটি এটি হত!’ বরং বোলো, ‘এ হলো আল্লাহর ফায়সালা। তিনি যা চান, তা-ই করেন।’ কারণ, ‘যদি’ কথাটি শয়তানের কাজের জন্য রাস্তা খুলে দেয়।”’ (১)
[১৩৪] আউফ ইবনু মালিক থেকে বর্ণিত, ‘নবি ﷺ দু’ ব্যক্তির মধ্যে ফায়সালা করে দেন। ফায়সালা যার বিরুদ্ধে গিয়েছিল, সে চলে যাওয়ার সময় বলে, “আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, আর তিনিই সর্বোত্তম অভিভাবক।” এর পরিপ্রেক্ষিতে নবি ﷺ বলেন, “আল্লাহ অলসতা ও গাফিলতিকে তিরস্কার করেন; তোমার উচিত চৌকশ হওয়া; তারপর পরাজিত হলে বলবে—‘আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, আর তিনিই সর্বোত্তম অভিভাবক।’”’ (২)
টিকা:
(১) মুসলিম, ২৬৬৪।
(২) আবূ দাউদ, ৩৬২৭, বর্ণনাসূত্রটি দুর্বল।
📄 আল্লাহর অনুগ্রহ পেলে
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ قُلْتَ مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
“আর যখন তুমি নিজের বাগানে প্রবেশ করছিলে, তখন কেন বললে না, ‘আল্লাহ যা চান তাই হয়, তাঁর প্রদত্ত শক্তি ছাড়া আর কোনও শক্তি নেই?’” (সূরা আল-কাহফ ১৮:৩৯)
[১৩৫] আনাস থেকে বর্ণিত, ‘আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন, “আল্লাহ কোনও বান্দাকে পরিবার, ধন-সম্পদ ও সন্তানাদির অনুগ্রহ দান করলে, সে যদি বলে—
مَا شَاءَ اللهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
আল্লাহ যা চান (তা-ই হয়); আল্লাহ ছাড়া কোনও শক্তি নেই।
তাহলে সে তাদের মধ্যে মৃত্যু ছাড়া আর কোনও আপদ দেখবে না।”’ (১)
[১৩৬] আয়িশা থেকে বর্ণিত, ‘নবি ﷺ কোনও পছন্দনীয় জিনিস দেখলে বলতেন—
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي تَتِمُّ بِنِعْمَتِهِ الصَّالِحَاتُ
সকল প্রশংসা আল্লাহর, যাঁর অনুগ্রহে সকল ভালো কাজ সম্পন্ন হয়।
আর কোনও অপছন্দনীয় জিনিস দেখলে বলতেন—
الْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى كُلِّ حَالٍ
সর্বাবস্থায় সকল প্রশংসা আল্লাহর।’ (২)
টিকা:
(১) ইবনুস সুন্নি, ৩৫০, বর্ণনাসূত্রটি দুর্বল।
(২) ইবনু মাজাহ, ৩৮০৩, বর্ণনাসূত্রটি দুর্বল।
📄 বিপদ-মুসিবতে পড়লে
আল্লাহ তাআলা বলেন,
الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوْا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُوْنَ (١٥٧)
“যারা কোনও বিপদের মুখোমুখি হলে বলে, ‘আমরা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর দিকে আমাদের ফিরে যেতে হবে’—তাদেরকে সুসংবাদ দিয়ে দাও। তাদের রবের পক্ষ থেকে তাদের উপর বিপুল অনুগ্রহ বর্ষিত হবে, তাঁর রহমত তাদেরকে ছায়াদান করবে এবং এই ধরনের লোকেরাই সঠিক পথের দিশা পেয়ে থাকে।” (সূরা আল-বাকারাহ ২:১৫৬-১৫৭)
[১৩৭] আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, ‘আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন, “(কষ্টদায়ক) সব কিছুতেই তোমাদের বলা উচিত—
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ
আমরা আল্লাহর জন্য, আর আমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।
এমনকি জুতার ফিতা (নষ্ট হয়ে যাওয়ার) ক্ষেত্রেও; কারণ, এটিও বিপদ-মুসিবতের অংশ।”’ (১)
[১৩৮] উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত, ‘আমি আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছি, “কোনও বান্দা যদি বিপদ-মুসিবতের মুখোমুখি হয়ে বলে—
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ
আমরা আল্লাহর জন্য, আর আমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে。
اللَّهُمَّ أَجِرْنِي فِي مُصِيبَتِي وَأَخْلِفْ لِي خَيْراً مِّنْهَا
হে আল্লাহ! আমার মুসিবতে তুমি আমাকে আশ্রয় দাও! এবং তা থেকে উত্তম কিছু আমাকে দাও!
আল্লাহ অবশ্যই তাকে তার জন্য মুসিবতের জন্য প্রতিদান দেবেন এবং এর বদলে তাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দেবেন।”
আবূ সালামা’র মৃত্যুর পর, আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর নির্দেশ অনুযায়ী আমি এ দুআ পাঠ করি, এরপর আল্লাহ তাআলা আমাকে তার চেয়ে উত্তম অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে দিয়েছেন।’ (২)
[১৩৯] উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত, ‘(আবূ সালামা’র মৃত্যুর পর) আল্লাহর রাসূল ﷺ আবূ সালামার কাছে আসেন। তখন তার চোখ ছিল স্থির। নবি ﷺ তার চোখ বন্ধ করে দিয়ে বলেন, “রূহ বা আত্মা নিয়ে যাওয়া হলে, চোখ তার পেছনে পেছনে যায়।” তখন তার পরিবারের কিছু লোক চিৎকার করে উঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নবি ﷺ বলেন, “তোমরা তোমাদের ব্যাপারে ভালো ছাড়া অন্য কিছুর দুআ করো না; কারণ, তোমাদের দুআর সাথে সাথে ফেরেশতারা ‘আমীন/ আল্লাহ! কবুল করো’ বলতে থাকে।” এরপর তিনি বলেন—
ٱللَّهُمَّ ٱغْفِرْ لِأَبِي سَلَمَةَ
হে আল্লাহ! তুমি আবূ সালামা-কে মাফ করে দাও!
وَارْفَعْ دَرَجَتَهُ فِي ٱلْمَهْدِيِّينَ
সঠিক পথের দিশাপ্রাপ্ত লোকদের মধ্যে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দাও!
وَٱخْلُفْهُ فِي عَقِبِهِ فِي ٱلْغَابِرِينَ
তুমি তার পেছনে রেখে যাওয়া পরিবারের দেখভাল করো!
وَٱغْفِرْ لَنَا وَلَهُ يَا رَبَّ ٱلْعَالَمِينَ
জগতসমূহের অধিপতি! তুমি আমাদেরকে ও তাকে মাফ করে দাও!
وَٱفْسَحْ لَهُ قَبْرَهُ
তার কবরকে প্রশস্ত করে দাও
وَنَوِّرْ لَهُ فِيهِ
এবং তার জন্য সেখানে আলোর ব্যবস্থা করে দাও! (৩)
টিকা:
(১) ইবনুস সুন্নি, ৩৫৪, হাসান।
(২) মুসলিম, ৯১৮।
(৩) মুসলিম, ৯২০।