📄 লেখক পরিচিতি
তাক্বীউদ্দীন আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনু আবদুল হালীম ইবনু আবদুস সালাম ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু তাইমিয়্যা। জন্ম: ১০ই রবিউল আউয়াল, ৬৬১ হিজরী মোতাবিক ২২ জানুয়ারি ১২৬৩ ঈসায়ী, তুরস্কের হাররান নামক স্থানে।
তিনি ছিলেন হাম্বালি মাযহাবের একজন আলেম ও মুজতাহিদ। তৎকালীন শ্রেষ্ঠ আলেমদের অধীনে তিনি হাদিস, ফিক্হ, তাফসীর ও ভাষাতত্ত্বের উপর পড়াশোনা করেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর। হাদিসের সনদ ও মতনের উপর তাঁর জ্ঞান ছিল অগাধ। তিনি ছিলেন একাধারে মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফক্বিহ এবং যুগসংস্কারক।
তাঁর উল্লেখযোগ্য ছাত্ররা হলেন: ইবনুল কায়্যিম আল জাওযিয়্যা, ইমাম আয-যাহাবী, ইবনু কাসির, মুহাম্মাদ ইবনুল হাদী, ইবনু কাত্তান এবং ইবনু আবদিল হাদী।
তিনি পাঁচশোরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো—মাজমূউ ফাতাওয়া (৩৭ খণ্ড), আর-রিসালাতুল হা-মাওয়িয়্যাতুল কুবরা, আর-রিসালাতুত তাদমুরিয়্যা, আল-আকীদাতুল ওয়াসিত্বিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ আন-নববিয়্যাহ, আল-জাওয়াবুস সহীহ লিমান বাদ্দালা দ্বীনাল মাসীহ, দারউ তাআরুযিল আক্বলি ওয়ান নাক্বলি, আস-সারিমুল মাসলুল 'আলা শাতিমির রাসূল, ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাক্বীম মুখালিফাতা আসহাবিল জাহিম, আর-রদ্দু আলাল মানতিকিয়্যিন, আল-ইহতিজাজু বিল ক্বদর, আল-ওয়াসিয়্যাতুল কুবরা, আল-ইস্তিগাসা এবং মুখতাসারুল ফাতাওয়া আল-মিসরিয়্যাহ।
বিভিন্ন কারণে তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়। তিনি কারাবন্দি থাকা অবস্থাতেই দামেস্কের এক কেল্লার অভ্যন্তরে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। দিনটি ছিল যুলকা'দা মাসের ২০ তারিখ, ৭২৮ হিজরী সাল।
📄 বহুলব্যবহৃত চিহ্ন
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 ভূমিকা
সকল প্রশংসা আল্লাহর, আর প্রশংসা জ্ঞাপনই (তাঁর মহত্ত্ব প্রকাশের জন্য) যথেষ্ট। শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর সেসব বান্দার উপর, যাদের তিনি বাছাই করে নিয়েছেন।
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ বা সার্বভৌম সত্তা নেই, তিনি একক, তাঁর (সার্বভৌম ক্ষমতায়) কোনও অংশীদার নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি—মুহাম্মাদ তাঁর দাস ও রাসূল।
আল্লাহ তাআলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ
"হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। আল্লাহ তোমাদের কর্মকাণ্ড সংশোধন করে দেবেন এবং তোমাদের অপরাধ মাফ করে দেবেন।" (সূরা আল-আহ্যাব ৩৩:৭০-৭১)
إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ
"তাঁর কাছে শুধু পবিত্র কথাই উঠে, আর সৎকাজ তাকে উপরে ওঠায়।" (সূরা ফাতির ৩৫:১০)
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ
"কাজেই তোমরা আমাকে স্মরণ রাখ, আমিও তোমাদের স্মরণ রাখব, আর আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো এবং আমার অকৃতজ্ঞ হয়ো না।" (সূরা আল-বাকারাহ ২:১৫২)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا
"হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে বেশি করে স্মরণ করো।" (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪১)
وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
"আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণকারী পুরুষ ও নারী; আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপ্রতিদানের ব্যবস্থা করে রেখেছেন।" (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩৫)
الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَىٰ جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
"(আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং দিন-রাতের পরিবর্তনের মধ্যে অসংখ্য নিদর্শন আছে বুদ্ধিমানদের জন্য) যারা উঠতে, বসতে ও শয়নে—সবসময় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে।" (সূরা আল ইমরান ৩:১৯১)
إِذَا لَقِيتُمْ فِئَةً فَاثْبُتُوا وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
"যখন কোনও দলের সাথে তোমাদের মোকাবিলা হয়, তখন দৃঢ়পদ থেকো এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কোরো; আশা করা যায়, এতে তোমরা সফল হবে।" (সূরা আল-আনফাল ৮:৪৫)
فَإِذَا قَضَيْتُم مَّنَاسِكَكُمْ فَاذْكُرُوا اللَّهَ كَذِكْرِكُمْ آبَاءَكُمْ أَوْ أَشَدَّ ذِكْرًا
"এরপর যখন তোমরা নিজেদের হাজ্জের অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করবে, তখন আল্লাহকে এমনভাবে স্মরণ করবে, যেভাবে তোমাদের বাপ-দাদাদের স্মরণ করতে, বরং তার চেয়ে অনেক বেশি করে (আল্লাহকে) স্মরণ করবে।" (সূরা আল-বাকারাহ ২:২০০)
لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ
"ঈমানদারগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তানাদি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল না করে। যারা এরূপ করবে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে।" (সূরা আল-মুনাফিকূন ৬৩:৯)
رِجَالٌ لَّا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعُ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ يَخَافُونَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيهِ الْقُلُوبُ وَالْأَبْصَارُ
"যারা ব্যবসায় ও বেচাকেনার ব্যস্ততার মধ্যেও আল্লাহর স্মরণ, সালাত কায়েম ও যাকাত আদায় করা থেকে গাফিল হয়ে যায় না, তারা সেদিনকে ভয় করতে থাকে, যেদিন হৃদয় বিপর্যস্ত ও দৃষ্টি পাথর হয়ে যাবার উপক্রম হবে।" (সূরা আন-নূর ২৪:৩৭)
وَاذْكُر رَّبَّكَ فِي نَفْسِكَ تَضَرُّعًا وَخِيفَةً وَدُونَ الْجَهْرِ مِنَ الْقَوْلِ بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ وَلَا تَكُن مِّنَ الْغَافِلِينَ
"তোমার রবকে স্মরণ করো; সকাল-সন্ধ্যায়, মনে মনে, কান্নাজড়িত স্বরে, ভীত-বিহ্বল চিত্তে এবং অনুচ্চ কণ্ঠে। তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা গাফিলতির মধ্যে ডুবে আছে।" (সূরা আল-আ'রাফ ৭:২০৫)
📄 যিকর বা আল্লাহর স্মরণের মহত্ত্ব
[১] আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমার প্রতি আমার বান্দার ধারণা অনুযায়ী আমি তার সঙ্গে থাকি। সে যখন আমাকে স্মরণ করে তখন আমি তার সঙ্গেই থাকি। সে যদি আমাকে মনে মনে স্মরণ করে আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি। আর যদি সে আমাকে মজলিসে স্মরণ করে তাহলে আমি তাকে তাদের চেয়ে উত্তম মজলিসে স্মরণ করি। আর সে যদি আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই। সে যদি আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে চার হাত অগ্রসর হই। আর সে যদি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।” (বুখারি, ৭৫৩৬)
[২] আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করে, সে একটি নেকি পায়। আর প্রতিটি নেকি দশ গুণ বৃদ্ধি পায়। আমি এ কথা বলি না যে, ‘আলিফ-লাম-মীম’ একটি অক্ষর। বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর এবং মীম একটি অক্ষর।” (তিরমিযি, ২৯১০)
[৩] আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “আল্লাহর যিকির ছাড়া বেশি কথা বোলো না। কেননা বেশি কথা অন্তরকে কঠিন করে ফেলে। আর কঠিন হৃদয়ের মানুষ আল্লাহ থেকে সবচেয়ে দূরে।” (তিরমিযি, ২৪১১, জয়িফ)
[৪] মুআজ ইবনু জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “জান্নাতবাসীরা অন্য কোনো কিছুর জন্য আফসোস করবে না, কেবল সেই সময়টুকু ছাড়া—যে সময়টুকু তারা আল্লাহর যিকির ছাড়া কাটিয়েছে।” (তাবরানি, ২০/৯৩)
[৫] মুআজ ইবনু জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেন, কোন আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়? তিনি বললেন, “তোমার জিহ্বা যেন আল্লাহর স্মরণে সতেজ থাকে এমতাবস্থায় তোমার মৃত্যু হওয়া।” (মুসনাদে আহমাদ : ৫/২৩৯, হাদিসটি সহিহ)
[৬] আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “আমি কি তোমাদেরকে এমন আমলের কথা জানাব না, যা তোমাদের প্রভুর কাছে খুব উত্তম ও পবিত্র, তোমাদের মর্যাদা অনেক বাড়িয়ে দেয়, সোনা-রূপা দান করার চেয়েও বেশি ভালো এবং তোমাদের জন্য এর চেয়েও উত্তম যে, তোমরা শত্রুর মোকাবিলা করবে আর তোমরা তাদের ঘাড়ে আঘাত হানবে এবং তারাও তোমাদের ঘাড়ে আঘাত হানবে?” সাহাবাগণ বললেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই (জানিয়ে দিন)।” তিনি বললেন, “তা হলো আল্লাহ তাআলার যিকির।” (তিরমিযি, ৩৩৭৭, আহমদ, ৫/১৯৫; ইবনু মাজাহ, ৩৭৯০)
[৭] আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তাঁর (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না; ...এমন ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে আর তার দুচোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে।” (বুখারি, ৬৬০; মুসলিম, ১০৩১)