📘 এপিটাফ 📄 জিন্দেগী কা কিমাত ক্যায়া হ্যায়? —লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ

📄 জিন্দেগী কা কিমাত ক্যায়া হ্যায়? —লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ


মুসলিমদের আজ এই অবস্থা তা যে কারো জন্যই বেদনাদায়ক, হতাশাব্যঞ্জক। এ যেন ইতিহাসে সবচেয়ে নিকৃষ্ট অবস্থা। চোখের সামনে এতকিছু দেখেও আমাদের হৃদয়ে কোনো দোলা লাগে না। শত শত মানুষের মৃত্যু যেন আজ বড্ড স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এমনকি নিউজে এখন আর এগুলো আসেও না। যদি আসেও, এসব ভয়ঙ্কর নিউজের পরে শেষের দিকে গিয়ে খুব কিউট কিছু নিউজ দেখিয়ে ইতি টানে। যেমন চিড়িয়াখানার কোনো প্রাণী বা খেলার খবর। যাতে আপনি আগে যা দেখেছেন, তা ভুলে যান। আপনার মনে যেন ঐসব ভয়াবহ খবরগুলো স্থান নিতে না পারে। যুবকদের মাঝে এ নিয়ে অনেক আবেগ দেখা যায়, ইয়া আল্লাহ্! কখন আপনার সাহায্য আসবে? কখন নুসরাহ আসবে? আর কত মানুষের মরতে হবে? কখন ইসলাম আবার মাথা উঁচু করে সম্মানের সাথে বিশ্বের দরবারে দাঁড়াবে? এই বিষয়ে কথা উঠলে সবাই আলিম হয়ে যায়। যেন সবারই একটি মত দিতেই হবে। এর পক্ষে আবার সবার হাজার হাজার দলিল। আলিমদের নানারকম মত। খিলাফাহ নেই, দাওয়াহ ঠিকমতো হচ্ছে না, ইত্যাদি। আবার সাধারণ জনগণেরও আলাদা আলাদা মত। আলিমরা ঐক্যবদ্ধ না, আরব নেতারা ঐক্যবদ্ধ না, এই ব্যক্তির এই দোষ, ওই দেশের সেই দোষ।

কিন্তু আমরা সবাই বাস্তবতা এড়িয়ে যেতে চাই। শুনতে খারাপ লাগলেও কঠিন বাস্তবতাটা হলো-উম্মাহর আজকের এই অবস্থা হয়েছে আপনার কারণে। হ্যাঁ, আপনার কারণে। হয়তো ভাবছেন তা কীভাবে? উম্মাহর এই অবস্থা হওয়ার কারণ হলো আমরা অন্য সবকিছুকে আল্লাহর আগে স্থান দিয়েছি। আমাদের কাজগুলোর দিকে তাকান। আমাদের যুবকরা আজকে বস্তুবাদী এই দুনিয়ার মধ্যে পুরোপুরি ঢুকে গেছে। আপনি ভাবছেন ভালোমতো পড়াশোনা করব, ভালো চাকরি করব, অনেক টাকা বানাব, বাড়ি বানাব, হজ্জ করব, আমার স্ত্রী খুব সুন্দর সুন্দর বোরকা পরবে, আমার বাচ্চারা স্কুলে গিয়ে কুরআন শিখবে, আর হঠাৎ করেই আমরা হয়ে যাব আদর্শ মুসলিম। এমন মানুষদেরই সিরিয়া-ফিলিস্তিনের ভয়াবহ অবস্থা দেখলে বলে, ভাই দেখেন! আমি আমার দায়িত্ব পুরা করছি। কিন্তু না, এভাবে কোনো পরিবর্তন আসবে না। আপনারও না, এই উম্মাহরও না। আপনাদের বুঝতে হবে যে, উম্মাহর সংশোধনের দায়িত্ব আমাদের উপর। আমাদের পিতার উপর না, অমুক আলিমের উপর না, অমুক দেশের নেতার উপরও না। এটা আপনার আমার দায়িত্ব। পৃথিবীতে যা হচ্ছে, তা আপনার আমার কৃতকর্মের একেবারে সরাসরি ফলাফল। আমাদের কৃতকর্মের কারণেই আল্লাহর সাহায্য আসছে না। আমাদের প্রত্যেকে যতক্ষণ না আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বানাচ্ছে, ততদিন আল্লাহর সাহায্য আমরা আশা করতে পারি না।

আমরা দুনিয়ার জন্য যেভাবে কষ্ট করি, আখিরাতের জন্য সেভাবে কষ্ট করা শুরু করতে হবে। দুনিয়ার জন্য আপনি যত চেষ্টা-মেহনত করেন, দ্বীনের জন্য তার দশ পার্সেন্ট দিয়ে দেখুন উম্মাহর অবস্থা কোথা থেকে কোথায় চলে যায়। সাহাবিরা আমাদের পূর্বপুরুষ। পৃথিবী আজকে তাঁদের ব্যাপারে জানে না, এটা রীতিমতো আমাদের অপরাধ। আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের চিনি না। সাহাবিদের আল্লাহ কেন সাহায্য করেছিলেন? কেন দুনিয়া তাদের পায়ের নিচে এসে লুটিয়ে পড়েছিল? কারণ তাঁরা আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সবকিছু দিয়েছিলেন। এটাই তাঁদের সাথে আমাদের পার্থক্য। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর নির্দেশ আসলে কোনোকিছুই তাঁদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারত না। বদরের যুদ্ধের সময় আবু বকর (রা.) ছিলেন মুসলিম বাহিনীতে, আর তাঁর ছেলে ছিলেন অমুসলিম, মুশরিকদের বাহিনীতে। পরে তাঁর ছেলেও অবশ্য মুসলিম হন। একদিন দুজন একসাথে বসে আছেন। এমন সময় তাঁর ছেলে বললেন, আপনার বদরের যুদ্ধের কথা মনে আছে? - হ্যাঁ, অবশ্যই। -সেদিন আমি আপনাকে বেশ কয়েকবার দেখেছিলাম। কিন্তু ইচ্ছা করেই আপনাকে হত্যা না করে সরে এসেছি। কারণ আপনি আমার পিতা। আবু বকর (রা.) বললেন, —আল্লাহর কসম! আমি যদি তোমাকে দেখতে পেতাম, তাহলে আমার তরবারি দিয়ে তোমাকে হত্যা করতাম। সাহাবাদের পথে কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াত না। এই অনুভূতি আজ মুসলিমদের অন্তর থেকে মরে গেছে। দ্বীনের জায়গা দুনিয়া এসে দখলে নিয়ে নিয়েছে।

ভাই, আমি ব্যস্ত। আরে কীসের ব্যস্ত? এই বৌ-বাচ্চা, চাকরি-ব্যবসা। চাইলেও দ্বীনের জন্য সময় দিতে পারি না। কিন্তু কিছু একটা হলেই আলিমদের দোষ, তাদের কারণেই আজকে আমাদের এই অবস্থা! আচ্ছা আলিমরা যদি কিছু না করে ভুল করেই থাকেন, তাহলে আপনি করেন! আমি? না, মানে, ইয়ে...! দোষ সবাই সবার ধরতে পারি, কিন্তু প্রচলিত নিয়ম ভাঙার কথা উঠলে আমরা ভয় পেয়ে যাই। বদর যুদ্ধ মাত্র শেষ হয়েছে। ইসলামের প্রথম যুদ্ধ। বেশ কয়েকজন বন্দী পাওয়া গেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ভাবছেন এদের নিয়ে কী করা যায়। তিনি সাহাবাদের মতামত জানতে চাইলেন। আবু বকর (রা.) মত দিলেন, দেখুন, ইসলাম এখনও মানুষের কাছে নতুন। আমাদের সেনাবাহিনী দুর্বল। আমরা এই বন্দীদের মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দেই। তার উপর তারা আমাদের আত্মীয়-স্বজন। তাদেরকে ছেড়ে দিয়ে মুক্তিপণের টাকা দিয়ে আমরা ইসলামকে শক্তিশালী করি, আমাদের সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করি। উমর (রা.) বললেন, না, আমি কঠিনভাবে দ্বিমত করছি। আপনি আলির আত্মীয়কে আলির হাতে দিন, আমার আত্মীয়কে আমার হাতে দিন। প্রতিটি মুসলিমের হাতে তার কাফির আত্মীয়কে দিন। প্রত্যেকে প্রত্যেকের কাফির আত্মীয়দের হত্যা করুক। যাতে কুফফারদের কাছে, মুসলিমদের কাছে এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে আমরা দেখিয়ে দিতে পারি যে আমাদের ও ইসলামের মাঝে কোনোকিছুই এসে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। কিচ্ছু না! আলি (রা.) বললেন, না, না। এভাবে না। বড় একটা গর্ত করে তাদের সেখানে ফেলে দিন।

এরাই সেসকল মানুষ, যারা পরিবর্তন সাধন করেছিলেন। তাঁদের অন্তরে দ্বীনের পথে বাধা হওয়া কোনো জিনিসের জন্য চুল পরিমাণ জায়গা ছিল না। সব কুরবানি করে দিতে রাজি। আজ আমরা যে পরিমাণ আরামে ইসলাম পালন করি, এই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর দ্বীন আমাদের কাছে মুফতে আসেনি। এটি সাহাবাদের রক্তের দামে এসেছে। আর আমাদের লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা কত অসার! মানুষ তাদের জীবন কুরবান করে দিয়েছে। এটাই আমাদের সুন্নাহ, এটাই আমাদের ঐতিহ্য, এটাই মুসলিমদের আকিদা। পরিবর্তন আসবে না, যদি না আমরা সেই জীবন ফিরিয়ে আনতে পারি। পরিবর্তন আসবে না, যদি আমরা ভরাপেটে ঘুমোতে যাই। পরিবর্তন আসবে না, ততদিন আমরা দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা রাখছি। রাসূল (সা.) একদিন আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা)-এর সামনে মেঝেতে পড়ে থাকা একটি পঁচা খেজুর তুলে নিলেন। তিনি সেটার পঁচা অংশগুলো ছাড়ালেন। তারপর আব্দুল্লাহকে বললেন, তুমি একটু খাবে? এটা আব্দুল্লাহর চোখের সামনে পঁচা অবস্থায় পড়ে ছিল। এমন না যে রাসূল (সা.) পকেট থেকে বের করে সেটা দেখাচ্ছেন। আব্দুল্লাহ (রা.) বললেন, না। এটা তো পঁচে গেছে। রাসূল (সা.) বললেন, তুমি এটা পঁচা বলে খাচ্ছো না। আর আজকে চারদিন হয়ে গেল তোমার নবির পেটে কোনো খাবার পড়েনি।

আজকে আমরা সবাই পরিবর্তনের কথা বলি। কিন্তু কীভাবে? আমরা চিন্তা করি আমাদের জীবনটা খুব সুন্দরভাবে চলবে, বউ-বাচ্চা-পরিবার নিয়ে নিরাপদে আর সুখে শান্তিতে থাকব, সেইসাথে ইসলামও দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়বে, বিশ্ব জয় করে ফেলবে, মানুষ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে এসে যাবে। এসব তো মুভিতে হয়। আপনি তো রূপকথায় বাস করছেন না। সাহাবাদের জান্নাতের গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট, তাঁরাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। আর তাঁরা থাকতেন পৃথিবীর সেরা দুটি জায়গায়-মক্কা ও মদিনায়। বিদায় হজ্জের সময় সেখানে থাকা এক লাখ সাহাবার মধ্য থেকে মাত্র দশ হাজার জনের কবর সে অঞ্চলে পাওয়া যায়। বাকি সব কোথায় গেলেন? কোথায়? ফিশিং ট্রিপে? হানিমুনে? তাঁরা সারা দুনিয়ায় ইসলাম নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। রাসূল (সা.)-এর মৃত্যুর সময় কোনো বই রেখে যাননি। কোনো কারুকার্য সমেত অট্টালিকা রেখে যাননি, যেখানে আমরা অবসর সময়ে ঘুরতে যেতে পারি। তিনি এই উম্মাহর জন্য নিবেদিতপ্রাণ কিছু পুরুষ রেখে গিয়েছিলেন। আল্লাহ কুরআনে পুরুষের সংজ্ঞা দিয়েছেন, যাদেরকে কোনোকিছুই আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করতে পারে না এবং আল্লাহর পথে সংগ্রাম করা থেকে বাধা দিতে পারে না—তারা হচ্ছেন পুরুষ। আল্লাহ এসব পুরুষদের অপেক্ষায় আছেন। আল্লাহ আপনার টাকার দিকে তাকিয়ে নেই—এসব তো তাঁরই টাকা। তিনি চান পুরুষরা উঠে দাঁড়াক। আমাদের মধ্যে এই ভুল ধারণা আছে যে আমরা পাঁচটা ফরয ইবাদাত করলেই সবকিছু ঠিক আছে। না! পাঁচটি খুঁটিই পুরো বিল্ডিং নয়। এগুলো কেবল পিলার। আল্লাহ সেসব পুরুষের অপেক্ষায় আছেন যারা এই ভিত্তির উপর ইসলামের দালান তৈরি করবে।

সাহাবাগণ শহীদ হয়েছিলেন। নারীরা বিধবা, শিশুরা ইয়াতীম হয়েছিলেন। রাসূল (সা.)-কে এসব দৃশ্য দিনের পর দিন দেখতে হয়েছে। কিন্তু তিনি এসব সহ্য করে গেছেন। কারণ তিনি জানতেন যে পৃথিবীর কোণায় কোণায় দ্বীন পৌঁছানোর জন্য এটাই আল্লাহর রীতি। সাহাবাগণ যদি দ্বীনকে এভাবে বুঝে থাকেন, তাহলে আমরা অন্যভাবে বুঝি কেন? আমরা বলি, ভাই, দেখেন, আমি তো নামাজ-রোজা করিই, যাকাত দিই, কঠোর পরিশ্রম করি। এগুলোকেই সাহাবাগণ দ্বীন মনে করলে তাঁরা কখনও মক্কা-মদিনার সীমানা ছেড়ে বের হতেন না। ইসলামও এর বাইরে ছড়াত না। তখন আমরা কেবল কিছু মূর্তপূজারীর সন্তান হতাম। কিন্তু তাঁদের কুরবানির কারণে আজকে আমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতে পারি। এটা এমনে এমনে আসেনি। রাসূল (সা.)- উহুদের যুদ্ধে নিজের চাচাকে শহীদ হতে দেখেছেন। শুধু শহীদ না, তাঁকে চিড়ে ফেলা হয়েছিল। যেই মহিলা তাঁকে হত্যা করিয়েছিল, সে তাঁর দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চিবিয়েছে। এত রাগ ছিল তাঁর উপর। রাসূল (সা.) সেই দৃশ্য দেখে এত কষ্ট পেয়েছিলেন যে, এক বর্ণনায় আছে তিনি সত্তরবার তাঁর জানাযা পড়েছেন। যখন আল্লাহর কাছ থেকে ওহীর মাধ্যমে জানানো হলো যে নিশ্চয় হামযা হলেন আল্লাহর সিংহ ও রাসূলের সিংহ, তখনই কেবল তিনি শান্ত হলেন। সাহাবাগণের কেউ যদি আজকে আমাদের ইসলামের অবস্থা দেখতেন তাহলে আফসোস করে বলতেন, আমি কি এগুলো দেখার জন্য প্রাণ দিলাম? আজ যদি বলা হয় কে কে জান্নাতে যেতে চান হাত তুলুন। কারো হাত তোলা বাকি থাকবে না। যদি বলা হয় কে কে মরতে চান? সব হাত নেমে যাবে। অথচ না মরলে আপনি জান্নাতে যাবেন কী করে? পরিবর্তনের কথা ভাবলে আমরা ভাবি বেঁচে থেকেই জান্নাতে যাওয়ার কথা। আমরা দুনিয়াতেও থাকতে চাই, আবার জান্নাতেও থাকতে চাই।

এর মানে এই না যে সবাই মিলে যুদ্ধ বাঁধাতে হবে। কিন্তু বাস্তবতাটা বোঝার চেষ্টা করুন। মানুষ খুশি খুশি মুখে এসে আমাকে বলে, ভাই, এই বছর দশ জন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছে। তাই? আর আপনি খুব খুশি? আর হাজারে হাজারে যে মুরতাদ হয়ে যাচ্ছে, সেটার কী হবে? দ্বীনের বিজয় বলতে আপনি কী বোঝেন? ইউটিউবে বসে ইসলামি ভিডিও ক্লিপ দেখতে পারা? রাসূল (সা.)-এর মৃত্যুর পর আবু বকর (রা.) এর শাসনামলে অল্পকিছু মানুষ যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল। তারা বলল, আমরা তো রাসূল (সা.)-এর হাতে যাকাত দিতাম। এখন সেখানে আবু বকর। নাহ! এর কাছে আমরা যাকাত দেব না। আবু বকর (রা.) সাহাবাদের জড়ো করলেন। সাহাবারা বললেন, দেখেন আবু বকর, ইসলাম এখনও দুর্বল, রাসূল (সা.) আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। এখন আমরা বিশ্রাম নিয়ে শক্তি সঞ্চার করি। আবু বকর (রা.) তখন ফুফুঁসছেন। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে দেখে তিনি আশ্বস্ত হলেন। যাক, অবশেষে একজন মানুষ পাওয়া গেল যে কাজের কথা বলতে জানে। উমর, তোমার কী মত? উমর (রা.) বললেন, দেখেন, আমাদের এখন দুর্বল অবস্থা। এখন খুব স্পর্শকাতর সময়। আমরা আপাতত শক্তি সঞ্চয় করি। তারপর না হয় আমরা তাদের ব্যাপারে ফয়সালা করব। আবু বকর (রা.) খুব হতাশ হলেন। তিনি উমরকে শক্ত করে ধরলেন, দেখো অন্যদের কথা বুঝলাম। কিন্তু তুমি জাহিলি যুগে জাব্বার ছিলে, কঠোর ছিলে। আর এখন ইসলামে এসে তুমি ভেড়া হয়ে গেলে? তুমি, উমর? আমি আবু বকর বেঁচে থাকতে আল্লাহর দ্বীন ক্ষতিগ্রস্ত হবে? তিনি বললেন, আমি তাদের শেষ লোকটা পর্যন্ত তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকব।

বাদ দেন সিরিয়া, ফিলিস্তিন, ঘরের বাইরে গিয়ে দেখুন যুবকদের কী অবস্থা। আমরা মদ, গাঁজা, ইয়াবার কাছে আমাদের হাজার হাজার মুসলিম ভাইকে হারাচ্ছি। আমাদের বোনদেরকে হারাচ্ছি। আপনি কোনো পার্লার ওয়ালাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন। প্রতিদিন সকাল থেকে শত শত মুসলিম নারী যায়। নিজেদের শরীরে ট্যাটু করায়। বয়ফ্রেন্ডের নাম লিখিয়ে আনে। অথচ আবু বকর (রা.) বলেছিলেন, আমি বেঁচে থাকতে দ্বীন ক্ষতিগ্রস্ত হবে? এসব এই সমাজের বাস্তবতা। কে এসব পাল্টাবে? আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) যতদিন আমাদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় না হচ্ছেন, ততদিন বিজয় আসবে না। এক সাহাবি (রা.) এসে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনাকে ভালোবাসি। রাসূল (সা) বললেন, বুঝেশুনে বলছ তো? সাহাবি বললেন, আল্লাহর কসম আমি আপনাকে ভালোবাসি। রাসূল (সা.) বললেন, ভালো। তাহলে শোনো। আমাকে যে ভালোবাসবে, তার কাছে বন্যার চেয়েও দ্রুতবেগে দারিদ্র্য আসবে।

সুতরাং লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ কোনো সহজ বিষয় নয়। এর মূল্য চুকাতে হয়। আর এর বিনিময় হলো জান্নাত। জান্নাতু আদনিন তাজরিমিন তাহতিহাল আনহার—চিরকাল বসবাসের জান্নাত, যার তলদেশে নির্ঝরিণী প্রবাহিত।

📘 এপিটাফ 📄 একদিন ঠিক বেচে দেব

📄 একদিন ঠিক বেচে দেব


দিনগুলো বড্ড বদলে গেছে আসমানের রঙের মতো মোবাইলের ইনকামিং কলগুলোও। খেয়াল করে দেখলাম পেশাগত কারণ, নয়তো নিজের প্রয়োজন এছাড়াও কেউ আর খবর নেয় না। অথচ এই কয়দিন আগেও আমাদের আলোচনাজুড়ে থাকত জান্নাত, আখিরাত, দ্বীন আল্লাহর পথে যাত্রা, কিংবা বিপ্লবের শিহরণ!

সেই অনেক দিন হয়ে গেল কাউকে দেখে জান্নাতের কথা মনে পড়ে না। কারো সাথে কিছু সময় কাটিয়ে খুউউব ভালো হয়ে যাওয়ার ইচ্ছেটা হয়না অনেকদিন। টাকা, ব্যবসা, সামাজিকতা, স্ট্যাটাস আমাদের আত্মাগুলো চুষে খেয়ে নিয়েছে মুখের সেই নিষ্পাপ অভিব্যক্তিগুলো পর্যন্ত বিবর্ণ, ফ্যাঁকাসে খুব...

আমার তো ইচ্ছে হয় ঝুম বৃষ্টিতে সবার সাথে ফুটবল খেলি বাসার বেলকনিতে চায়ের আড্ডাটা আবারও হোক খোলা মাঠে শুয়ে তারা গুণি মোড়ের ঐ টং দোকানে আসরের পর এক কাপ চা! আমার আম্মা বলে, আমাকে ঢাকা নিয়ে যাবি কবে? আমি মুচকি হেসে বলি, সেখানে মানুষ থাকে না মা! আমি বরং তোমাকে নিয়ে একদিন সবুজ ঘাসে হাঁটব মা আমার অবাক হয়ে তাকায়...

একদিন আমি ঠিক দেখিয়ে দেব সুটেড বুটেড সাহেব বাবু না হয়েও দিব্যি বেঁচে থাকা যায় একদিন আমি ঠিক দেখিয়ে দেব বকরির দুধ আর খেজুরের ঐ জীবনটাতেই সুখ। যে জীবন তোমাদের সুন্দর হৃদয়গুলো বিবর্ণ করে ছেড়েছে সেই জীবনটা... পুকুর ঘাটে পা ভিজিয়ে বসে নীল আকাশ দেখার স্বাধীনতার কাছে একদিন ঠিক বেচে দেব...

মূল লেখা: আদিল উমর
কবিতা: সাজিদ ইসলাম

📘 এপিটাফ 📄 আহারে আহারে...

📄 আহারে আহারে...


একটা মায়ার বাঁধনে আটকা পড়েছিলাম একদা দুনিয়া নামের লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে একগাদা মানুষের ভিড়ে ব্যস্ততা, দায়িত্ব আর সামাজিকতার পোশাকে। বিদায় বেলায় কেঁদেছিলে প্রিয়, তুমি, তোমরা, অনেকেই কিন্তু যেই না ছোট্ট মাটির কুটিরে ঢুকে গেলাম তোমাদের জীবনগুলো তো থেমে থাকেনি থেকেছে কি?

আমার প্লেটে এখনো কেউ চেটেপুটে ভাত খেয়ে উঠে চায়ের কাপটাতে রোজ চুমুক দেয় কেউ না কেউ আমার ঐ আরামের তোশকে পিঠ রেখে ঘুমোয় অন্যরা ক্লাসের ঐ পেছনের বেঞ্চটা তো ফাঁকা নেই। প্রিয়তমার আঙুলে ঠিকই আংটি পরিয়েছে অন্য কেউ। আমি তিলে তিলে গড়া জীবনটা দিয়ে এলাম কত আশা, মায়া আর দরদ খরচ করেছি, অকারে, অপাত্রে। ভুল করেছি। আজ অন্ধকার ঘরের জন্য যদি একটা মোমবাতি খরিদ করে রাখতাম। যদি এই সাড়ে তিন হাত মাটির ঘরে একটা জানালার বন্দোবস্ত করে যেতে পারতাম, যদি কিছু মায়া, দয়া, ভালোবাসা এমন পাত্রে রেখে যেতাম যারা আমার এই দম বন্ধ হয়ে আসা ঘরে কিছু সামান পাঠাত। আমার হয়ে রবের বিচারালয়ে ওকালতি করত। জান্নাতে যাওয়ার আগে আমার আস্তিন ধরে রাখত সজোরে। আহারে আহারে আহারে...

সাজিদ ইসলাম
৩ মার্চ, ২০১৯

গতকাল এই পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ মারা গেছে। পৃথিবীর কোনো কিছুই থেমে থাকেনি। কারো জীবন এতে থমকে যায়নি। একদিন আপনিও মারা যাবেন, পৃথিবীর কিচ্ছু আসে যাবে না। আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাও, কষ্ট পাবে হয়তো, কিন্তু ঠিকই জীবনটা গুছিয়ে নেবে, এগিয়ে যাবে। অথচ এই পৃথিবী ঘিরে আমাদের কত স্বপ্ন, কত পরিকল্পনা আর পাওয়া না পাওয়ার হিসেব! একদিন মৃত্যু এসে মনে করিয়ে দেবে এই পৃথিবী আসলে আমাদের নয়। আমাদের গন্তব্যস্থল আর চূড়ান্ত আবাস অন্য কোথাও। দিনশেষে শুধু পৃথিবীতে থেকে যাবে আমাদের ফেলে যাওয়া কিছু কর্ম, হঠাৎ হঠাৎ প্রিয়জনদের মজলিসে দু'লাইন আবেগঘন স্মৃতিচারণ, কিংবা কবরের পাশে একটি ধুলোমাখা 'এপিটাফ'।

ফন্ট সাইজ
15px
17px