📄 দ্যা গ্যাংস্টার
দাওয়াহ জগতে সীমিত সময়ের বিচরণে আমি দুই ধরনের মানুষের মুখোমুখি হয়েছি। এক ধরনের মানুষের ভাবসাব হলো গ্যাংস্টারের মতো। নিজেদের অন্তরে, এমনকি কখনও মুখেও তারা এই বিশ্বাসটা প্রকাশ করে বসে যে, আল্লাহর জন্য তার কোনো সময় নেই। এই দ্বীন, এই ধর্ম, নবির সুন্নাহ, এটা করো ওটা কোরো না, এটা হারাম, সেটা জায়েয নেই—এসবকে তার পাত্তা দেওয়ার টাইম নেই। মনের ভেতর প্রচণ্ড রকম অহংকার নিয়ে এরা জমিনে দাপিয়ে বেড়ায়। তাকে দাওয়াহ দিতে গেলে বলে, 'আরে যান তো! কয়টা দাড়ি গজিয়েছে, ইউটিউবে দুই-চারটা হাদিস শুনেছেন, আর এখন আমার সামনে বকবক করতে এসেছেন! যান, ভাগেন! আপনার এসব হুজুরগিরির আমার দরকার নেই। আমাকে আমার কাজ করতে দিন।' এমন ভাব করে যেন আল্লাহকে তার দরকার নেই। সে একাই একশো!
আবার আরেক ধরনের মানুষ আছে, যারা হয়তো দুই-এক বছর ধরে দ্বীনের উপর আছে, প্রকাশ্যে না বললেও তাদের অন্তরে এমন একটা বিশ্বাস চলে আসে যে—‘আমি খুব বড় কিছু একটা।' সে অন্যদের দিকে নিচু দৃষ্টিতে তাকাতে শুরু করে। সে ভাবে সে অন্যদের চেয়ে একটু উপরে। আমার কী সুন্দর দাড়ি, আর ওই লোক ক্লীন শেইভড। আমি দশ বছর ধরে সালাত কাযা করি না, আর ওই লোক ঠিকমত ওযু করতেই জানে না। নিশ্চয় আমি তার চেয়ে ভালো! আর সে এটাও বিশ্বাস করতে শুরু করে যে—তাকে আল্লাহর খুব দরকার। তার সালাত, সাদাকা, তাসবীহ—এসবের জন্য আল্লাহ যেন অপেক্ষা করে থাকেন! মসজিদে যাওয়ার পথে সে হয়তো কাউকে পঞ্চাশটা টাকা দান করল, তারপর মনে মনে বিশ্বাস করতে শুরু করল—আরে! আল্লাহ্ আমার কাছে বিরাট ঋণী হয়ে গেলেন! আমি যেহেতু গত দশ বছর ধরে সালাত পড়ছি, আল্লাহ যেন আমার কাছে বিরাট কৃতজ্ঞ!
এই দুই ধরনের মানুষের জন্যই দুঃসংবাদ। আল্লাহ আপনার কাছে মোটেই ঋণী নন। মোটেই না! আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলার আপনাকে দরকার নেই। আপনার সালাত, আপনার সিয়াম, আপনার সময়, আপনার দাওয়াহ, আপনার দাড়ি-কোনোকিছুর জন্য আল্লাহ মুখাপেক্ষী নন। তিনি সকল প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে। তিনি আমাদের রব-রাব্বুল আরশিল আযীম। আমার-আপনার বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাকে দরকার। সুতরাং আপনি কাকে ধোঁকা দিচ্ছেন? ধোঁকার মধ্যে বরং আপনি নিজেই। শয়তানকে তাই আপনার মন নিয়ে খেলতে দেবেন না। “মাশাআল্লাহ! তুমি তো দ্বীনের পথে আছ। তুমি অন্যদের চেয়ে অনেক উপরে।”-এই আত্মতুষ্টির ধোঁকায় পড়বেন না। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের সামনে আপনি কিছুই না, একেবারেই নগণ্য, মূল্যহীন!
আর যে গ্যাংস্টার ভাব নিয়ে আছে আর ভাবছে আল্লাহর জন্য তার সময় নেই, সেও কিছু না, একেবারেই নগণ্য। মানুষ একটা চাদরের ভেতর নিজেকে আড়াল করে রাখে। সেই চাদর সে নয়। আর এর চেয়ে খারাপ হলো এসকল গ্যাংস্টারেরা মুসলিমদেরকে খাটো করে দেখে। সে হয়তো ভালো দেখে একটা গাড়ি কিনেছে, তার চারপাশে হয়তো কিছু চাটুকার ঘোরে-যারা তার শারীরিক আকার দেখে ভয় পায়। তাই সে ভাবে আমি দারুণ কিছু একটা! অথবা হয়তো সে এদিক ওদিক করে দুটা পয়সা কামাই করছে, এতেই সে ভাব ধরছে-আমার কাছে ওসব ধর্মের বাণী নিয়ে আসবেন না। আমি যা ইচ্ছা করব, যেখানে ইচ্ছা যাব, যা খুশি বেচব, যা মনে চায় পান করব, যার সাথে ভালো লাগে শুবো। আপনারা থাকেন আপনাদের ধর্ম নিয়ে। আল্লাহ এত মহান হলে উনি আমার কাছে এত ইবাদাত চায় কেন? আল্লাহর কসম! আপনি যা-ই করেন, যা-ই দেখেন, যা-ই বেচেন, যার সাথেই শোন, এসবে আল্লাহর কোনো ক্ষতি হয় না। সহিহ হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ্ বলেন, হে আমার বান্দারা! তোমরা সকল মানুষ ও জিন যদি একত্র হয়ে আমার ইবাদাত করতে করতে সবচেয়ে নেককার হয়ে যাও, তাতে আমার রাজত্ব থেকে কিছুমাত্র বাড়ে না। হে আমার বান্দারা! যদি তোমরা সকল মানুষ ও জিন একত্র হয়ে অবাধ্যতা করতে করতে সবচেয়ে অবাধ্য ব্যক্তিটির মতোই হয়ে যাও, তাতে আমার কিছুমাত্র ক্ষতি হয় না।
আজকাল কোনো মজলিসে এসব দ্বীনের কথা যখন শুনি, আমাদের মনে হয় ইশ! আমার ভাইয়ের আজকে এখানে থাকা উচিৎ ছিল! আহ! আমার বাবা যদি এই খুতবাটা শুনতে পেতেন! তার এটা শোনা খুব দরকার। খালি অন্যের কথা মাথায় আসে, নিজের কথা কেউ ভাবে না। এটা হলো রোগাক্রান্ত অন্তরের বড় একটা লক্ষণ। কারণ আল্লাহ যদি চাইতেন তারা এটা শুনুক, তিনি তাদের এখানে নিয়ে আসতেন। কিন্তু তিনি আপনাকে এনেছেন, কারণ রোগ আপনার অন্তরে। আপনি যা-ই করেন না কেন, মদ খান, বেশ্যাবৃত্তি করেন, টাকা মারেন, এতে আল্লাহর এক বিন্দু ক্ষতি নেই। আল্লাহ আল-মালিক। আল্লাহ সার্বভৌম। তোমরা আল্লাহর মুখাপেক্ষী ফকির। কেউ হামবড়াই করে হাঁটতে হাঁটতে ভাবে আমার নামাজ-রোজার কোনো দরকার নেই। আরেকদল ভাবে আমি দশ বছর ধরে নামাজ-রোজা করি, আমাকে আল্লাহর বড় দরকার। আপনার ধারণা আল্লাহ আপনার কাছে ঋণী?
রাসূল (সা.) সাহাবাদের নিয়ে বসে আছেন। সেই সাহাবাদের নিয়ে—যারা দুনিয়ার বুকে পদচারণ করা শ্রেষ্ঠতম প্রজন্ম। আল্লাহ তাঁদের ব্যাপারে কুরআনে বলেছেন, আমি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট, তারাও আমার প্রতি সন্তুষ্ট। নবিজি (সা.) এক সহিহ হাদিসে সেই সাহাবাদের বলছেন, আমি যা দেখি, তোমরা তা দেখো না। আমি যা শুনি, তোমরা তা শুনতে পাও না। সাত আসমান চিড়চিড় শব্দ করছে, আর এর শব্দ করাটাই স্বাভাবিক। সাহাবাগণ অবাক হয়ে গেলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এর অর্থ কী? কোনো জিনিস যখন তার উপরে থাকা মালামালের ভার নিতে পারে না, তখন তা চিড়চিড় করতে থাকে।
আজকে তো আমরা বড় বিজ্ঞানী প্রজন্ম হয়ে গেছি। অ্যাস্ট্রোনমির যত কিছু আমরা জানি, তা বাস্তবে থাকা জিনিসগুলোর এক পার্সেন্টও না। আমাদের সৌরজগৎ হলো এমন মিলিয়ন মিলিয়ন সৌরজগতের মধ্যে একটি মাত্র। বিজ্ঞানীরা বলেন এই মিলিয়ন মিলিয়ন গ্যালাক্সির মধ্যে শুধু আমাদের গ্যালাক্সিতেই যত তারকা আছে, প্রতি সেকেন্ডে সেগুলোর একটি করে গুনলে তিনশ ট্রিলিয়ন বছর পরেও সব গোণা শেষ হবে না। আমাদের সূর্য হলো সেই সব নক্ষত্রের মধ্যে সবচেয়ে ছোটগুলোর একটি, যা আমাদের পৃথিবীর চেয়ে লক্ষ গুণ বড়। আর এই সব তারকারাজি আছে শুধু প্রথম আসমানে! আর রাসূল (সা.) বলছেন, সাত আসমানের মধ্যে চার আঙুল পরিমাণ জায়গা খালি নেই যেখানে কোনো না কোনো ফেরেশতা আল্লাহকে সিজদা করছেন না। আর আপনি ভাবেন আল্লাহ আপনার টাকার মুখাপেক্ষী? আপনার ইবাদাতের তাঁর খুব দরকার? আপনার নামাজ-রোজা-দান-সাদাকা না পেলে আল্লাহর খুব ক্ষতি হয়ে যাবে? আল্লাহ কোনো পরোয়াই করেন না আপনি ইবাদাত করলেন কি না করলেন! সাত আসমানের মধ্যে চার আঙুল পরিমাণ জায়গা খালি নেই যেখানে কোনো না কোনো ফেরেশতা আল্লাহকে সিজদা করছেন না। ফেরেশতা! তাদের সৃষ্টির সময় থেকে একটাই সিজদা দিয়ে আছেন—বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে। কিন্তু তাঁরাও যখন উঠবেন, বলবেন, হে আল্লাহ্! আমাদের মাফ করে দিন। আপনার যেভাবে ইবাদাত পাওনা, সেভাবে আমরা তা করতে পারিনি। বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে সিজদাহয় পড়ে থেকেও, নিষ্পাপ ফেরেশতারা বলছে, তারা আল্লাহর ইবাদাতের হক আদায় করতে পারছে না, আর আমরা ভাবি কি না আল্লাহর আমাদেরকে দরকার?
আল্লাহ হাদিসে কুদসিতে⁸ বলেন, হে আমার বান্দারা! তোমাদের প্রত্যেকে ক্ষুধার্ত, শুধু সে ছাড়া যাকে আমি খাওয়াই। আজ কেউ এক বেলার খাবার কিনে ভাবে, আমি এটা কিনে খাচ্ছি! ভুল! আল্লাহ্ আপনাকে খাওয়াচ্ছেন। মানুষ নিজের খাবারের দিকে তাকিয়ে পর্যন্ত অহংকারী হয়ে যায়! মনে করে আমার খাবার আছে। কাজেই আমার এটা দরকার নেই, ওটা দরকার নেই। কিন্তু আল্লাহ আপনাকে না খাওয়ালে আপনার কী সাধ্য আছে খাবার মুখে তোলার? আল্লাহ বলেন, হে আমার বান্দারা! তোমাদের প্রত্যেকে উলঙ্গ, শুধু সে ছাড়া যাকে আমি পরাই। আজ একেকজন গুচি ব্র্যান্ডের জুতা কিনে এমন ভাবে উঠে যায় যে আপনি তাদের সালাম দেওয়ার জন্যও নাগাল পাবেন না। এমন অহংকার! সামান্য এক জোড়া জুতা কিনে সে ভাবে আমি কিছু একটা! অন্যের জুতায় একটা দাগ থাকলে তাকে আর পরোয়া করে না। মুসলিমরা আজকাল গাড়ি, ঘড়ি, জুতা দেখে বিচার করে তার অবস্থান সমাজের কোথায়। অথচ আপনারা সবাই উলঙ্গ, যদি না আল্লাহ আপনাদের কাপড় পরান। আল্লাহ্ বলেন, হে আমার বান্দারা! তোমাদের প্রত্যেকে পথহারা, শুধু সে ছাড়া যাকে আমি পথ দেখাই। আর আজ ভাইয়েরা “দ্বীনে”র উপর এসে এমন ভাব ধরে, আল্লাহু আকবর! এরা কুফফার, ওরা পথভ্রষ্ট, তারা জাহান্নামী। কে আপনাকে নবি বানিয়ে দিয়ে গেছে? নবিজি (সা.) তো এমন কখনও করেননি।
মানুষ হজ্জে যায়। ফিরে আসার পর তাকে আর মুহাম্মাদ ডাকা যায় না, ডাকতে হয় আলহাজ্জ মুহাম্মাদ। 'ভাই কিছু মনে করবেন না, আমি হজ্জ করেছি তো, আমাকে আলহাজ্জ মুহাম্মাদ ডাকুন দয়া করে।' সত্যিই? তাই? আপনি ভাবছেন হজ্জ করে আপনি আল্লাহর চোখে কিছু একটা হয়ে গেছেন? এমনকি মানুষ মাইন্ড করে! বলে, আমি এত লাখ টাকা খরচ করলাম, চারটা সপ্তাহের জন্য পরিবারের সঙ্গকে কুরবানি করলাম! আমাকে আলহাজ্জ ডাকবে না? অথচ রাসূল (সা.) এই হাদিস বলছিলেন সেই সাহাবাগণকে, যারা হাসিমুখে আল্লাহর পথে জীবন দিয়ে দিতেন। আপনার পূর্বসূরি, আপনার আদর্শ। যারা আল্লাহর রাস্তায় কঠিনতম কুরবানিগুলো করতেন, আর ভাবতেন আমি কিছুই করতে পারলাম না। আর আপনি কিছুই করেন না, আর ভাবেন আসমানে চড়ে বসে আছেন।
নবিজি (সা.) এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম সাহাবাদের বলছেন, তোমাদের কেউ নিজ আমলের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। কেউ না! তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনিও না? তিনি বললেন, আমিও না। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এই দুনিয়ার বুকে শ্রেষ্ঠতম মুজাহিদ, শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক, শ্রেষ্ঠতম বাবা, শ্রেষ্ঠতম স্বামী, মানবতার প্রতি সবচেয়ে বড় রহমত, আল্লাহর সবচেয়ে বড় আবিদ, শ্রেষ্ঠতম রাসূল, শ্রেষ্ঠতম নবি, শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি ছিলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি বলছেন আমিও না, যদি না আল্লাহ আমাকে তাঁর রহমত দিয়ে ঢেকে দেন।⁹
এই দুনিয়ার জীবনে একজন ইবাদাতকারীর কাহিনী আছে যে ৫০০ বছর ধরে আল্লাহর ইবাদাত করেছে। আল্লাহ্ বিচার দিবসে ফেরেশতাদের বললেন, যাও একে আমার রহমতের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করাও। লোকটির মনে হলো, এ কী? আমি পাঁচশ বছর ধরে ইবাদাত করলাম। আমি মূল্য চুকিয়ে দিলাম। আর এখন কি না আল্লাহর রহমতের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করতে হবে? তিনি বললেন, না, আমাকে আমার আমলের কারণে জান্নাত প্রবেশ করান। ও আচ্ছা! তুমি তোমার আমলের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করতে চাও? ভালো! আল্লাহ আদেশ দিলেন মীযান নিয়ে আসতে। হুকুম দিলেন এক পাল্লায় তার ৫০০ বছরের আমল রাখতে, আরেক পাল্লায় তাকে আল্লাহর দেওয়া শুধু একটি নিয়ামত রাখতে—দুচোখ দিয়ে দেখার নিয়ামত। ওজন করা হলো। শুধু চোখ দিয়ে দেখতে পারার নিয়ামত তার ৫০০ বছরের আমলের চেয়ে ভারি হয়ে গেল। আল্লাহ হুকুম দিলেন, যাও তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করো। কেবল তখনই লোকটি বলল, হে আল্লাহ! আমি আপনার রহমত পেয়ে সন্তুষ্ট।
আজ আপনি ভাবছেন দেখার জন্য দুটি চোখ থাকলেই যথেষ্ট। ভুল! অসংখ্য মানুষের চোখ আছে, কিন্তু তারা তা দিয়ে দেখতে পায় না। আল্লাহই আপনাকে দেখার ক্ষমতা দিয়েছেন। আজ আপনি ভাবছেন শোনার জন্য দুটি কান থাকলেই যথেষ্ট। ভুল! অসংখ্য মানুষের কান আছে, কিন্তু তারা তা দিয়ে শুনতে পায় না। আল্লাহই আপনাকে শোনার ক্ষমতা দিয়েছেন। আজ আপনি ভাবছেন হাঁটার জন্য দুটি পা থাকলেই যথেষ্ট। ভুল! অসংখ্য মানুষের পা আছে, কিন্তু তারা তা দিয়ে হাঁটতে পায় না। আল্লাহই আপনাকে হাঁটার ক্ষমতা দিয়েছেন। আল্লাহ! আপনি নিজে নন। আপনি ভাবছেন সেই আল্লাহর আপনাকে দরকার? আপনার ইবাদাতের জন্য তিনি মুখাপেক্ষী? না, আল্লাহ আপনাকে দরকার নেই। আমার, আমাদের কাউকে আল্লাহর দরকার নেই। এটা আমাদের আকিদা, এটা জানতেই হবে। যাতে ইবাদাতের সময় আপনি বিনয়ের সাথে দাঁড়াতে পারেন। যাতে জীবনের যেকোনো সময় মাথায় রাখতে পারেন যে আপনি যেখানে আছেন, সেখানে আছেন কেবল আল্লাহর দয়ার কারণে। শুধু তাঁর রহমতের কারণে। ইয়াকীন রাখতে হবে যে আল্লাহ আমাদের রব, আমাদের মালিক, আমাদের ইলাহ কারো মুখাপেক্ষী নন। কাউকে তাঁর দরকার নেই। বরং আমরা সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী। আমাদের সবার তাঁকে দরকার।
টিকাঃ
৮. এটি একটি হাদিসে কুদসির কিছু অংশ। হাদিসটি মুসলিম, তিরমিযি ও ইবনু মাজাহতে বর্ণিত। হাদিসের মান সহিহ
৯. মুসলিম-২৮১৬
📄 ব্যথার কথা
তাবুক যুদ্ধ ছিল মুমিন এবং মুনাফিকদের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করার এক উপলক্ষ্য। সেসময় রাসূল (সা.) রোমানদের বিরুদ্ধে জিহাদের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি বারেবারে সবাইকে জিহাদের জন্য প্রস্তুতি নেবার তাগাদা দিচ্ছিলেন। প্রথমবারের মতো ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) বাহিনী তৈরি করেন। ঘটনাচক্রে রোমানদের সাথে যুদ্ধ হয়নি, তিন সপ্তাহ পর রাসূল (সা.) বাহিনী নিয়ে ফিরে আসেন। আর এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কুরআনের সূরাহ তাওবা নাযিল হয়। কুরআনের সবচেয়ে কর্কশ ভাষায় আল্লাহ মুনাফিকদের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। যে কারণে এই সূরার একটি নাম আল ফাজিহা, অর্থাৎ অপমানকারী, লাঞ্ঞ্ছনাকারী।
সাঈদ ইবনু যুবাইর (রা.) বলেন, আমি আব্বাস (রা.) কে এই সূরাহর বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বললেন, এটি ফাজিহা, কারণ এই সূরাহয় বিভিন্ন আয়াতে মুনাফিকদের স্বরুপ উন্মোচন করা হয়েছে। আল্লাহ এই সূরাহয় নবি (সা.) কে আদেশ করছেন, “বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ কর-আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর রাহে জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হিদায়েত করেন না।” (সূরাহ তাওবা, ৯: ২৪)
কুরআনের সবচেয়ে কঠিন ভাষায় নাযিলকৃত আয়াতগুলোর মধ্যে এটি একটি। আল্লাহ তাঁর নবিকে বলছেন, তাদেরকে বলুন...! কাদেরকে বলুন? সেসময় আল্লাহর রাসূল (সা.) এর আশেপাশে কারা ছিল? আমি? আপনি? না! সেসময় আল্লাহর রাসূলের আশেপাশে ছিল আবু বকর, উমর, উসমান, আলি-উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম। আল্লাহ তাদের সাথে এরকম ভাষায় কথা বলেছেন। আর ভাবলেশহীন, দ্বীনের ব্যাপারে তোড়াই কেয়ার করে চলা এই আমরা যদি সেদিন থাকতাম, তাহলে চিন্তা করুন, আমাদের জন্য এই ভাষা কেমন হতো!
যারা নবির জন্য, দ্বীনের জন্য, সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিল আল্লাহ তাদেরকেও বলেছেন-না, শুধু ভালোবাসা, ইবাদাত বন্দেগী এসবে চলবে না! শুধু এতটুকু দিয়েই আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা যাবে না! নিজেদের পিতামাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী, সন্তান, ধন-সম্পদ, ব্যবসা, বাণিজ্য, সবকিছু থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহর পথে জিহাদ অধিক প্রিয় না হবে, ততক্ষণ তোমরা ঈমানের পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না। আর যদি তোমরা এই পরীক্ষায় ফেল করো, তবে পরিণতি কী? পরিণতি হলো আল্লাহর শাস্তি। সে শান্তির মধ্য দিয়ে আজকের উম্মাহ প্রতিনিয়ত দিন যাপন করছে।
একদিন উমর (রা.) বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমার প্রাণ ছাড়া বাকি সবকিছু থেকে অধিক প্রিয়।' তিনি বললেন, 'যতক্ষণ পর্যন্ত আমি কারো কাছে তাঁর প্রাণের চেয়েও প্রিয় না হয়েছি, ততক্ষণ পর্যন্ত সে মুমিন হতে পারে না।' উমর (রা.) বললেন, 'আল্লাহর কসম! এখন আপনি আমার প্রাণের থেকেও প্রিয়।' তিনি বললেন, 'হে উমর! এখন (তুমি পূর্ণ মুমিন)।' (বুখারি, কসম ও নযর অধ্যায়) আরেকটি হাদিসে নবিজি (সা.) বলেছেন, 'সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারে না, ততক্ষণ পর্যন্ত না আমি তার নিকট তার পিতা, সন্তান-সন্ততি এবং সমস্ত মানুষ থেকে প্রিয়তম হয়েছি।' (বুখারি: ঈমান অধ্যায়, মুসলিম: ঈমান অধ্যায়) সাহাবিরা নিজেদের জানমাল, সহায় সম্পত্তি, প্রিয়জনকে কুরবানি করে সেই ঈমানের পরীক্ষায় পাশ করেছেন।
ছোট্ট বাশীর (রা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করলেন। তিনি এবং তাঁর বাবা। সাথে আর কিচ্ছু নেই। তাঁরা জানতেন যেখানে যাচ্ছেন সেটা তাদের অচেনা, সেখানে আরাম নেই, টাকাপয়সা নেই। দুইটা বছর যায়নি, জিহাদের ডাক এলো, বাশীরের বাবা জিহাদে চলে গেলেন। ছেলেকে কার কাছে রেখে গেলেন? আল্লাহর কাছে! বাশীর (রা.) এর বয়স কত হবে তখন? দশ কি বারো! তিনি সেনাবাহিনীকে ফিরে আসতে দেখলেন। তাদের মাঝে নিজের পিতাকে খোঁজ করলেন। নেই, কোথাও নেই! তিনি রাসূল (সা.)-এর ঘোড়ার পাশ দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা কোথায়? রাসূল (সা.) দুঃখে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তিনি ঘোড়ার আরেক দিক দিয়ে গিয়ে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা কোথায়? রাসূল (সা.) ঘোড়া থেকে নেমে এলেন, তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আজ থেকে আমি তোমার পিতা আর আইশা তোমার মা!
সাহাবিদের সময়ে কেউ যদি জিহাদের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের না হতো, তবে সেটা ছিল অপমানের, লজ্জার। একবার এক জিহাদের সময় এক বৃদ্ধ ব্যক্তি এসে রাসূল (সা.) এর কাছে জিহাদের অনুমতি চাইল। বৃদ্ধ এবং একইসাথে পঙ্গু। তার সন্তানরা বলল, আপনি বৃদ্ধ আর পঙ্গু, আপনার তো ওজর আছে, আপনি বাড়িতেই থাকেন। নবিজি (সা.) ও তাকে ওজরগ্রস্থ হিসেবে মত দিলেন। বৃদ্ধ বাড়িতে যাওয়ার পর তার স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, সবাই জিহাদে যাচ্ছে, আর তুমি এখানে কী করছ? বৃদ্ধ বলল, রাসূল (সা.) আমাকে ওজরগ্রস্থ বলেছেন। বৃদ্ধের স্ত্রী এবার ব্যঙ্গ করে বলল, যুদ্ধে যেতে ভয় পাচ্ছ সেটা বল! স্ত্রীর কথা শুনে বৃদ্ধ নিজের বর্ম নিয়ে তৎক্ষণাৎ নবিজি (সা.) এর কাছে গিয়ে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি দিন। নবিজি বললেন, তোমাকে না বললাম, তোমার যাওয়ার দরকার নেই! বৃদ্ধ জবাবে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আমার এই পঙ্গু পা নিয়েই জান্নাতে হাঁটতে চাই। আমাকে বঞ্চিত করবেন না। বৃদ্ধের শক্তিশালী দৃঢ়টা দেখে নবিজি (সা.) তাকে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি দেন। সে জিহাদে যায় এবং শহীদ হয়।
এক মহিলা সাহাবি, যুদ্ধে তার পিতা, ভাই, স্বামী সকলেই শহীদ হয়েছিল। মুসলিমদের বাহিনী যখন ফিরে আসে তাকে একে একে তার পিতা, ভাই আর স্বামীর শহীদ হওয়ার কথা জানানো হয়। তিনি প্রিয়জন হারানোর বেদনায় নীরবে কাঁদলেন, কিছু বললেন না। পরমুহূর্তেই নিজেকে সামনে নিয়ে প্রচণ্ড এক আবেগ আর ভালোবাসা নিয়ে শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'আমার নবি, আমার নবি কেমন কাছে? তিনি ঠিক আছেন তো?' এরাই সেই মানুষগুলো যারা ঈমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। যাদের কুরবানির কারণে আজ আমি আপনি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর অনুসারী হতে পেরেছি। তাই তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, ওরাদু আন-তারা আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট, আল্লাহও তাদের উপর সন্তুষ্ট।
আর আজ আমি আপনি যে জীবন যাপন করছি, আমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহকে যেভাবে মূল্যায়ন করছি, সেভাবে যদি সাহাবিরাও করত, তবে সেই দ্বীন আমাদের পর্যন্ত কোনোদিনও আসত না। এটাই আমাদের বাস্তবতা। আমাদের দ্বীনের অবস্থা আজ এমনই। ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যখন তোমরা ঈনাহ পদ্ধতিতে ব্যবসা করবে (কোন জিনিসকে কিছু দিনের জন্য ধারে বিক্রয় করে পুনরায় সেই জিনিসকে কম দামে ক্রয় করে নেওয়ার), গরুর লেজ আঁকড়ে ধরবে, কৃষিকাজেই সন্তুষ্ট থাকবে এবং জিহাদ ছেড়ে দেবে তখন আল্লাহ তোমাদের উপর লাঞ্ছনা ও অপমান চাপিয়ে দেবেন। তোমরা তোমাদের দ্বীনে ফিরে না আসা পর্যন্ত আল্লাহ তোমাদেরকে এই অপমান থেকে মুক্তি দিবেন না। (আহমাদ ২/২৮,৪২, ৮৪, আবু দাউদ ৩৪৬২নং, বাইহাকি ৫/৩১৬) এই সেই লাঞ্ছনা আর অপমান, যা আজ আমরা ভোগ করছি প্রতিনিয়ত।
📄 তিনিই আমাদের রব—রাব্বুল আরশীল আযীম
আজ মুসলিমদের মনে কত ভয়! কুফফারদের প্রতি ভয়, পশ্চিমাদের প্রতি ভয়, আইনের ভয়, এটার ভয়, সেটার ভয়। কিন্তু আল্লাহ কোনোকিছুর মুখাপেক্ষী নন? আপনাকে এই দৃঢ় ইয়াকীন মনে প্রোথিত করতেই হবে যে, অতীত হওয়া, বর্তমানে জীবিত, ভবিষ্যতে যারা আসবে, এদের মধ্যে কোনো মানুষ, কোনো জিন, কোনো গাছ, কোনো পাথর, কোনো পাহাড়, কোনো বালুকণা, কোনো দেশ, কোনো দেশের সরকার, আর তাদের মিলিটারি, তাদের কোনো ক্ষমতা, কোনো নবি, কোনো ফেরেশতা, জিবরাইল, মিকাঈল, ইসরাফিল, প্রথম আসমান, দ্বিতীয় আসমান, তৃতীয় আসমান, চতুর্থ আসমান, পঞ্চম আসমান, ষষ্ঠ আসমান, সপ্তম আসমান, আরশ, কুরসি, আরশ ধরে রাখা ফেরেশতা—কোনোকিছুই কিছু দেয় না, কিছু নেয় না, কিছু বানায় না, কিছু ধ্বংস করে না, কিছু উপরে তুলতে পারে না, কিছু নিচে নামাতে পারে না, ক্ষতি করতে পারে না, উপকার করতে পারে না—ইল্লাল্লাহ! আল্লাহ ছাড়া।
আল্লাহ আল-হাইয়্যুল কাইয়্যুম—তিনি চিরঞ্জীব। আপনি বলতে পারেন, আমিও তো জীবিত। কিন্তু আপনার জীবন তাঁর অস্তিত্বের মুখাপেক্ষী। আল্লাহর কোনো শুরু নেই, কোনো শেষ নেই, তিনিই আল্লাহ। আল-মালিক। তিনি রাজা। তিনি বিচার দিবসের মালিক, যেদিন সব শেষ হয়ে যাবে, যেদিন তিনি সকল জীবিত প্রাণীর, সকল মানুষের, সকল জিনের, সকর ফেরেশতার ধ্বংসের হুকুম দেবেন, সেদিন কোনোকিছুর অস্তিত্ব থাকবে না, শুধু আল্লাহ্ ছাড়া! তিনি ঘোষণা দেবেন, আইনাল মুলুক? আইনা আবনাউল মুলুক? কোথায় সেই রাজারা, যারা নিজেদের রাজা ভাবত? কোথায় রাজাদের ছেলেরা? কোথায় স্বৈরাচারীরা? কোথায় সেই গ্যাংস্টাররা? তিনি জিজ্ঞেস করবেন, লিমানুল মুলকুল ইয়াওম? আজ রাজত্ব কার? কেউ সেদিন জবাব দিতে পারবে না। আল্লাহ নিজেই জবাব দেবেন—আজ রাজত্ব এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর।
কোন জিনিসে আপনাদেরকে আল্লাহ থেকে দূরে সরাল? কিসে আল্লাহকে ভুলিয়ে দিল? আল্লাহ কি একবারও আপনাকে ছেড়ে গেছেন? একবারও? কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, হে মানুষ! কিসে তোমাদেরকে আমার থেকে গাফেল করল? বলছেন, হে আমার বান্দারা! এমন একটি সময় কি ছিল না যখন তোমরা বলার মতো, স্মরণ করার মতো কিছুই ছিলে না? তোমাদের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। আল্লাহ বলেছেন, আমি তোমাদেরকে তুচ্ছ পানি থেকে সৃষ্টি করেছি। এক বিন্দু শুক্রাণু। কাজেই এখন নিজের বাড়ি-গাড়ি দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। আপনার শুরু হয়েছিল নূতফা থেকে। যাদের মনে হয় আল্লাহর তাকে দরকার, তার আল্লাহর জন্য সময় নেই, তারা মনে রাখুক, তারা বীর্য থেকে উৎপন্ন হয়েছে। আপনি বীর্য ছিলেন। যদি আপনি মেঝেতে পড়ে থাকতেন, কেউ আপনাকে হাত দিয়ে তুলত না। পছন্দ হোক বা না হোক, আপনি এটাই ছিলেন। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ (রহ.) অসাধারণ একটি কথা বলেছেন-মানুষ দুইবার প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে বের হয়েছে। সেই মানুষের কীসের এত অহংকার?
আল্লাহ মানুষকে মায়ের গর্ভে তিন স্তরের অন্ধকারের ভেতর লালন-পালন করেছেন। আপনার পরিবার তখন কোথায় ছিল? আপনার টাকা, গাড়ি, গার্লফ্রেন্ড, ফেইসবুক কোথায় ছিল? যেইসব জিনিস আজ আপনাকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে, সেগুলো নয় মাস যাবত আপনার মায়ের গর্ভে কোথায় ছিল? আল্লাহ আপনাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন কোনো ফ্যাক্টরি ছাড়া, কোনো বিজ্ঞান ছাড়া, কোনো যন্ত্র ছাড়া। কোনো প্রতিষ্ঠান আপনাকে সেখানে সাঁতার কাটতে শিখিয়েছে? আপনি নয় মাস গর্ভে সাঁতার কেটেছেন-আল্লাহ শিখিয়েছেন। নয় মাস পার হওয়ার পর? আল্লাহ্ আপনার জন্য অসম্ভবকে সম্ভব করে দিয়েছেন। যাতে আপনি এই পৃথিবীতে আসতে পারেন। আমাকে বলুন, কীভাবে এত বড় বাচ্চাটা গর্ভের এতটুকু থলির ভেতরে ছিল? কীভাবেই বা বেরিয়ে আসলো? আপনি খালি গায়ে, খালি পায়ে, খতনা ছাড়া এসেছেন। আপনার হাত ছিল, তা দিয়ে ধরতে জানতেন না। মুখ ছিল, খেতে জানতেন না। পা ছিল, হাঁটতে জানতেন না। কে আপনার দেখাশোনা করেছে তখন? কে প্রতিপালন করেছেন। আল্লাহ আপনার মায়ের বুকে দুধ দিয়েছেন। আজ বিজ্ঞান তার সকল যন্ত্রপাতি আর টাকা পয়সা মিলিয়ে সেই দুধের অর্ধেক মানের গুণাগুণ সম্পন্ন দুধ তৈরি করতে পারল না। আল্লাহ আপনার মায়ের বুকে তা কার জন্য রেখেছেন? টাকা দিয়েছেন? এর জন্য আবেদন করেছেন? গরমকালে তিনি একে ঠান্ডা রেখেছেন, শীতকালে গরম। কে করল? মানুষের মনে আপনার প্রতি এত দয়া কে দিল? আপনি হাঁটতে পারতেন না, আল্লাহ হাঁটার সামর্থ্য দিলেন। আপনি ধরতে পারতেন না, আল্লাহ ধরার শক্তি দিলেন। আপনি খেতে পারতেন না, আল্লাহ্ আপনার দাঁত গজাতে দিলেন। আল্লাহ আপনাকে শিখিয়েছেন।
আপনার হৃদপিণ্ড প্রতিবার স্পন্দিত হওয়ার আগে আল্লাহর অনুমতি চায়। আল্লাহ একবারও না করেছেন? আপনার প্রতিটা শ্বাস গ্রহণের জন্য আপনার ফুসফুস আল্লাহর অনুমতি চায়। আল্লাহ একবারও না করেছেন? এমনকি যখন আপনি যিনা করেন, যখন মদ খান, যখন হারামে লিপ্ত হন, যখন গুনাহ করেন, নফসের উপর জুলুম করেন, তখনও এরা নিজেদের কাজ করার জন্য আল্লাহর অনুমতির মুখাপেক্ষী। তারপরও আল্লাহ আপনার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে অনুমতি দেন। এত জুলুম, এত নাফরমানির পরও! আজ ভাইয়েরা ভাইদের সাথে কথা বলে না, একটা ভুলের কারণে। স্বামী-স্ত্রীতে তালাক হয়ে যায়, তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়ের কারণে। আপনি নিজের পায়ে হাঁটতে পারেন বলে, নিজের হাতে ধরতে পারেন বলে, নিজের জন্য একটা পাউরুটি বানাতে পারেন বলে এখন আর আল্লাহর জন্য আপনার সময় নেই? আপনি ব্যস্ত? এটা আমার দরকার নাই? এ-ই কি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার নমুনা? আমি ক্ষুধার্ত, আপনি আমাকে এক প্লেট গরম খাবার দিলেন। আমি আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য কি প্লেটের উপর থুতু মারব? ওয়াল্লাহি! আমরা যদি জানতাম আল্লাহ আমাদের কত ভালোবাসেন, আমাদের কত যত্ন করেন, এটাই কি যথেষ্ট হতো না?
আল্লাহ বলেন, হে আমার বান্দারা! তোমাদের পাপ যদি আসমান সমানও হয়, কিন্তু তোমরা আমার সাথে কাউকে শরীক না করো, অতঃপর আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, আমি সেই পরিমাণ রহমত নিয়েই হাজির হবো। হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা কিছুতেই তোমাদের প্রতিপালকের রহমতের প্রতি নিরাশ হয়ো না। হে আমার বান্দারা! তোমরা যদি আমাকে অবজ্ঞা করতে, কখনও আমার ইবাদাত না করতে, কখনও আমার হুকুম না মানতে, সবচেয়ে খারাপ মানুষটির মতো হয়ে যেতে, আর জীবনে কেবল একবারই তোমার মনে আমার ভয় প্রকাশ করে আর তুমি বলো, হে আমার প্রতিপালক! আমি বলব, না'আম, ইয়া আবদি? কী লাগবে, হে আমার বান্দা? আপনি বললেন, হে আল্লাহ আমাকে মাফ করে দিন। আল্লাহ আপনাকে ঠিকই মাফ করে দেবেন! হে আমার বান্দা! তুমি যদি আমার কাছে, অমুখাপেক্ষী আল্লাহর কাছে এক বিঘত অগ্রসর হও, আমি তোমার দিকে এক হাত অগ্রসর হই। বান্দা যদি আমার দিকে হেঁটে অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দৌড়ে অগ্রসর হই। হে আমার বান্দারা! তোমরা যখন আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করি।¹⁰ তোমরা যখন আমাকে ভুলে যাও, তখনও আমি তোমাদের স্মরণ করি।
আল্লাহর কসম, তিনিই আমাদের রব, আমাদের মালিক-রাব্বুল আরশীল আযীম। কীভাবে আমরা এই মহান রবকে ভুলে থাকি, অকৃতজ্ঞ হই?
টিকাঃ
১০. বুখারি, মুসলিম, তিরমিযি ও ইবনু মাজাহ। সুপরিচিত হাদিসে কুদসি।
📄 চূড়ান্ত লড়াই
আজকালকার যুবকদের কাছে সিনেমায় দেখা জগতটাই আসল জগৎ। এদের জীবনে হালাল-হারাম বলে কিছু নেই। সব হালাল! তারা কোনো একটা হারাম কাজের জায়গায় যাচ্ছে, ডেকে জিজ্ঞেস করবেন, কোথায় যাচ্ছ? বলবে, ওই তো! যেখানে সবসময় যাই! কিচ্ছু বলতে পারবেন না তাদেরকে। গার্লফ্রেন্ডের সাথে কথা বলতে হলে, বাপের সামনে থেকে সরে যান, ইঁদুরের মতো লুকিয়ে পড়েন। যেন আল্লাহ দেখছেন না! বুড়ো বাপটার থেকে লুকিয়ে গেলাম, আর কোনো সমস্যা নেই। এবার যা খুশি তা করা যায়! তারপর আছে অ্যালকোহল, হারাম উপার্জন। এই সবই যুবসমাজের সমস্যা। কিন্তু এই সমস্যাগুলো আসে কীভাবে? যুদ্ধ তো আমাদের ও শয়তানের মধ্যে। যারই গার্লফ্রেন্ড আছে, যে-ই মদপান করে, সীসা টানে, হাশিশ টানে, কাউকেই শয়তান এসে বলে না, “তোমার অবশ্যই গার্লফ্রেন্ড থাকা উচিৎ।” কীভাবে আসে সে? কেবল একবার তাকাতে বলে, বিড়িতে কেবল একটা টান দিতে বলে।
আপনাদেরকে বারসিসার কাহিনী বলি। সে ছিল বনি ইসরাইলের বড় আবিদ। তার ধার্মিকতা সর্বজনবিদিত। তার আলাদা ইবাদাতখানা আছে, সেখানে সে রাত দিন আল্লাহ-বিল্লাহ করে। সেসময় তিনজন ভাই জিহাদে যেতে চাচ্ছিল। কিন্তু তাদের একটি বোন ছিল। তারা বলল, আমরা জিহাদে গেলে আমাদের বোনের দেখাশোনা কে করবে? প্রস্তাব দেওয়া হলো, আরে বারসিসার চেয়ে ভালো আর কে আছে? এতবড় আল্লাহর ওলি। বারসিসাকে গিয়ে তারা বলল তাদের বোনের দেখাশোনা করতে। ভাইয়েরা বলল, হে বারসিসা! আমরা জিহাদে যাচ্ছি। আপনি কি দয়া করে আমাদের বোনের দেখাশোনা করবেন? বারসিসা সাথেসাথে বলল, আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম। কিছুতেই না! বারসিসার জবাব শুনে ভাইয়েরা হতাশ হয়ে ফিরে গেল। তারপর বারসিসার কাছে শয়তান এলো। শয়তান বারসিসার কাছে এসে বলল, বারসিসা! ভাই আমার! কী করছ তুমি? এই লোকগুলো জিহাদে যাচ্ছে। ভালো কাজে যাচ্ছে। আল্লাহর রাস্তায় যাচ্ছে। তুমি ওদের বোনের দেখাশোনা না করলে কীভাবে কী? তুমি সবচেয়ে মহান। তুমি সবচেয়ে ধার্মিক। তারা যদি তাদের বোনকে অন্য কারো হিফাজতে রেখে যায়, তাহলে কী হবে? বারসিসা বলল, ঠিকই তো! আমার তো উচিৎ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ওই মেয়ের দেখাশোনা করা। যাতে এ ভাইয়েরা নিশ্চিন্তে জিহাদে যেতে পারে।
দেখেন শয়তানের ওয়াসওয়াসা কীভাবে শুরু হয়। শয়তান যখন আপনার দরজায় কড়া নাড়ে, সে এই আশা করে না যে আপনি তার জন্য দরজা খুলে দেবেন। সে কেবল একটা উঁকি মারতে চায়। দরজা একটু ফাঁক করে বলবেন কে? ব্যস! এতটুকুই চায় সে। একটা ফাটল, একটা ছোট্ট ছিদ্র। তার সময়ের অভাব নেই। মোক্ষম সময়ের সুযোগ নিতে সে দিনের পর দিন মেহনত করে যাবে। বারসিসা ওই ভাইদের ডেকে বলল, আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমাদের বোনের দেখাশোনা করব। কিন্তু সে আমার সাথে থাকতে না। তোমাদের বোন ইবাদাতখানার পেছনের বাড়িটাতে থাকবে। আমি থাকব এখানে। ভাইয়েরা রাজি হলো। বোনকে বারসিসার কাছে রেখে তারা জিহাদে চলে গেল।
দিন যেতে থাকল। বারসিসা খাবার রান্না করে দরজায় রেখে দিত। ওই মেয়ে এসে খাবার নিয়ে যেত। কিন্তু সে ইতোমধ্যে শয়তানের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে। কয়দিন ধরে এমনই চলল। তারপর একদিন শয়তান এসে বলল, বারসিসা! তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না তোমার দরজার সামনে খাবার রাখলে তাকে অনেক দূর হেঁটে এসে সেটা নিতে হয়? এটা তো ফিতনা! লোকে তাকে দেখতে পায়। আমার মনে হয় তোমার উচিৎ তার বাড়ির দরজায় গিয়ে খাবার রেখে আসা। যুক্তি আছে কিন্তু! বারসিসা এখন খাবার রান্না করে তার দরজায় রেখে দরজা নক করে চলে আসে। কয়দিন পর শয়তান বলল, তাকে কিন্তু এখনও দরজা খোলা লাগে। খাবারটা তার ঘরের ভেতরে রেখে এসো। এমনটাই কয়দিন ধরে চলল। শয়তান এবার এসে বলল, দেখ বারসিসা! অনেক দিন হয়ে গেছে কিন্তু! এই নারীটির কথা বলার কেউ নেই, সামাজিকতা রক্ষার উপায় নেই। তুমি যদি তার সাথে কথা না বলো, তাহলে আল্লাহ জানে বাইরে গিয়ে সে কোন ফিতনায় পা দেয়। তো বারসিসা তার ঘরে গেল। সে ঘরের বাইরে থেকে তার সাথে কথা বলছে। কিছু সময় পরে শয়তান বলল, বারসিসা! তুমি কেন নিজেকে অপমান করছ? বাইরে থেকে এমন চিল্লাচিল্লি ভালো দেখায়? ভেতরে গিয়ে ওর সাথে কথা বলো! কয়দিন পর বাসার ভেতরে গিয়ে কথা বলা শুরু হলো। ছোট ছোট আলাপ আস্তে আস্তে বড় হয়। বড় আলাপ থেকে তাকে দেখার ইচ্ছা জাগে। দেখার পর ধরতে মন চায়। তারপর? তারপর মহান বারসিসা সেই মেয়ের সাথে যিনায় লিপ্ত হলো।
যিনার ফলে নারীটি গর্ভবতী হয়ে গেল। একটা ছেলে বাচ্চা জন্ম দিল। এবার শয়তান এসে বলল, মেয়েটির ভাইয়েরা যদি ফিরে এসে এই বাচ্চাকে দেখে, আর তুমি ছিলে এই নারীর দেখাশোনার দায়িত্বে, তুমি তাদের কী জবাব দেবে? বারসিসা চিন্তিত। বলল, এখন আমি কী করব? শয়তান বলল, তোমাকে এই বাচ্চাটাকে হত্যা করতে হবে। বারসিসা তা-ই করল। এখন দুইটা গুনাহ। যিনা ও হত্যা। কয়দিন পর শয়তান আবার এলো। বলল, তোমার কি মনে হয় এই মেয়েটি যা ঘটেছে সবকিছু গোপন রাখবে? ভাইদের বলে দেবে না? বারসিসা বলল, তাহলে এখন উপায়? তাকেও মেরে ফেল! যিনা ও দুই হত্যা। ভাইয়েরা ফিরে এসে বলল, বারসিসা! আমাদের বোন কোথায়? বারসিসা বলল, ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তোমাদের বোন প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। আল্লাহ তাকে নিয়ে গেছেন। বারসিসা বড় আবিদ। কখনও মিথ্যে বলে না। ভাইয়েরা বিশ্বাস না করে যাবে কোথায়? সে তাদের একটা নকল কবর দেখিয়ে দিল। ভাইয়েরা দুআ করে চলে গেল।
পরদিন এক ভাই বলল, গত রাতে আমি একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি। আরেকজন বলল, আরে আমিও তো! আচ্ছা তুমি কী দেখেছ বলো তো! সে বলল, আমি দেখলাম আমাদের বোন অসুস্থ হয়নি। সে গর্ভবতী হয়েছিল। তারপর তাকে ও তার সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে। আরো দেখলাম আমাদেরকে যেখানে তার কবর দেখানো হয়েছিল, সেখানে তাকে কবরস্থ করা হয়নি। অন্য কোথাও করা হয়েছে। অন্য ভাইয়েরা বলল, আরে অদ্ভুত! আমিও এই স্বপ্ন দেখেছি। দুইজন একইসাথে একই স্বপ্ন নিশ্চয় স্বাভাবিক কিছু না। তারা ওই জায়গায় গিয়ে মাটি খুঁড়ে তাদের বোন ও সাথে একটি বাচ্চার লাশ পেল। তারা বারসিসার কাছে ফিরে গিয়ে বলল, বারসিসা! তুমি মিথ্যে বলেছ। এই এই আসল ঘটনা। এখন তোমাকে জেলে দেব।
তো এখন ভাইয়েরা বারসিসাকে শাসকের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। পথে বারসিসা নিজের দিকে তাকিয়ে ভাবল আমি কীভাবে এই ফাঁদে পড়লাম। ব্যভিচার, দুইটা হত্যা! এখন আমাকে মৃত্যুদণ্ডের জন্য নেওয়া হচ্ছে! সে বন্দী হওয়ার পর শয়তান তার কাছে মানুষের রূপে আসলো। বলল, বারসিসা! তুমি জানো আমি কে? সে বলল, না। শয়তান বলল, আমি শয়তান। আমি তোমাকে এই সব বিপদে ফেলেছি। আর আমিই তোমাকে আবার এখান থেকে উদ্ধার করতে পারব। শয়তান বলল, বারসিসা! তোমার জন্য একটা লাইফলাইন আছে। বারসিসা বলল, আমি সব করতে রাজি। খালি আমাকে এখান থেকে বের করো। শয়তান বলল, আমাকে সিজদা দাও। তাহলে আমি তোমাকে বের করে নেব। বারসিসা সিজদা করল। এরপরেই শয়তান বিদায় নিল। এর কিছু পরেই বারসিসাকে শূলিতে চড়িয়ে হত্যা করা হলো। বারসিসার জীবনের শেষ কাজ কী ছিল? শির্ক—সবচেয়ে বড় কুফর- যার পরিণতি জাহান্নাম। সে আল্লাহ্কে খুশি করার জন্য দরজা খুলেছিল। শয়তান সেই দরজা দিয়ে তাকে সেটা তাকে জাহান্নামে নিয়ে ছাড়ল!
গুনাহর চক্রটা দেখেছেন? আজকে আপনি ভাবছেন, আরে cigarette-ই তো খাচ্ছি-মদ-গাঁজা-ইয়াবা? আস্তাগফিরুল্লাহ! না না ওসব ছুঁয়েও দেখি না। কিন্তু এভাবেই চক্রটা শুরু হয়। আজ হয়তো একটা সিগারেট, এখন হয়তো কেবল তাকান, এখন হয়তো খালি এসএমএস বিনিময়, ফেইসবুক চ্যাট। কাল কী হবে জানেন না। ধরুন আমি-আপনি একই রাস্তায় চলছি। তারপর আমি এক ডিগ্রী বাঁক নিলাম। মানে খুবই অল্প। কিন্তু এই এক ডিগ্রী সরে গিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর যাওয়ার পর দেখা যাবে আপনার আমার মধ্যে বিশাল দূরত্ব। একটা দৃষ্টি, একটা ম্যাসেজ দিয়েই দরজা খুলে যায়। মাত্র একটা লোন, মনে হয়, ভাই আমি এই একটা লোনই নিচ্ছি। এ ছাড়া আর কোনো সুদের কারবারের সাথে জড়িত নই। আসলে এসব করে আমরা নিজেদের গলা চেপে ধরছি। এভাবে একটা ভুল দিয়েই সবকিছু শুরু হয়। শয়তান এভাবেই এক পার্সেন্ট দুই পার্সেন্ট করে একশ পার্সেন্ট নিয়ে যায়। বারসিসা কি কোনো সাধারণ লোক ছিল? সে বিরাট পরহেজগার। কিন্তু সে শয়তানের জন্য একবার দরজা খুলেছিল। খোলেনি, একটু উঁকি দিয়েছিল। আর আজকে আমাদের দরজা, জানালা, ফ্লাডগেইট সব খোলা শয়তানের জন্য।
আমি আপনাকে হালাল-হারাম নিয়ে খবরদারি করছি না। বলছি দরজাটা না খুলতে। আপনি শয়তানের সাথে চালাকিতে পারবেন না। শয়তান আদম (আ.) আগে থেকে আছে। সে আপনার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী। আপনার, আমার ও সকল আলিম, মাওলানা, মুফতি, শাইখের চেয়ে শয়তান ইসলাম সম্পর্কে বেশি জানে। আমাদের সবার জ্ঞান মিলে শয়তানের জ্ঞানের সমান হবে না। শয়তানের সাথে খেলতে যাবেন না, ঝুঁকি নিয়েন না।
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলের ছেলে আব্দুল্লাহ বলেন, আমার পিতার মৃত্যুর সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমার পিতা মৃত্যু যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। এই জ্ঞান হারান, আবার জ্ঞান আসে। যখন জ্ঞান ফেরে তখন বলেন, “না, এখনও না, এখনও না।” তারপর আবার জ্ঞান হারান। আব্দুল্লাহ চিন্তিত হয়ে গেলেন। বাবা কী বোঝাতে চাইছেন? তিনি ভাবলেন, বাবা হয়তো এই দুনিয়া ত্যাগ করতে চাইছেন না। তিনি বলেন, আমি চিন্তিত মনে বাবার পাশে অপেক্ষা করতে লাগলাম। জ্ঞান ফেরার জন্য দুআ করতে লাগলাম। তাঁর জ্ঞান ফিরলে আমি বললাম, কেন আপনি বলছিলেন 'না, এখনও না, এখনও না'? তিনি বললেন, পুত্র! শয়তান আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সে আফসোসে নিজের নখ কামড়াতে কামড়াতে বলছে, আহমাদ! তুমি আমার হাত ফসকে বেরিয়ে গেলে! আহমাদ! তুমি আমার হাত ফসকে বেরিয়ে গেলে! তাই আমি বললাম, না এখনও না। যতক্ষণ না আমি মারা যাচ্ছি, ততক্ষণ তোমার আমার যুদ্ধ শেষ হচ্ছে না। আমাদের ও শয়তানের মাঝে এই যুদ্ধ মৃত্যু পর্যন্ত চলবে। আলিমগণ বলেন, মৃত্যুর আগের সময়টাতেই মানুষের উপর শয়তানের আক্রমণ প্রবলতম হয়ে যায়। আমরা অনেকে এমন ভাব ধরে থাকি, আরে আমি তো মুসলিম। ইনশাআল্লাহ আমি পাশ করে যাব। এটা কীভাবে সম্ভব যে ইমাম আহমাদের যে আত্মবিশ্বাস ছিল না, তা আপনি-আমি পেয়ে বসে আছি? শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ এই ঘটনার ব্যাপারে মন্তব্য করেন যে, মৃত্যুর সময় শয়তান মানুষের পেছনে তার সামর্থ্যের সবটুকু ঢেলে দেয়। আপনি মৃত্যুর আগে কুফরি করার আগ পর্যন্ত সে আপনাকে ছেড়ে যাবে না। আর আমরা ভাবছি যে আমরা পাশ করে যাব। আমরা এখন যুবক, শক্তিশালী, সামর্থ্যবান। শয়তান তার সামর্থ্যের একটা অংশ দিয়ে শুধু চেষ্টা করে, আর তাতেই আমরা ফেল করি। একজন নারী পাশ দিয়ে হেঁটে যায়, আমরা দৃষ্টির হেফাজত করতে পারি না। মিউজিক বাজতে শুরু করে, আমরা সেখান থেকে সরে যেতে পারি না। ফজরের সালাতের আযান দেয়, আমরা ঘুম থেকেই উঠতে পারি না! শয়তান দিচ্ছে তার সামর্থ্যের ৫%, আর তাতেই আমরা প্রতিদিন ফেল করি। সেখানে ভাবছি যে শয়তান যখন ১০০% দেবে, তখন আমরা পাশ করে যাব? কত বোকা আমরা!