📄 এয়ারপোর্ট ট্রানজিট
রাসূলুল্লাহ (সা.) একবার আব্দুল্লাহ ইবনু উমর (রা)-এর সাথে ছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনু উমরের ডাকনাম ছিল মাজনুনুস সুন্নাহ-সুন্নাতের পাগল। তিনি এতই কঠিনভাবে সুন্নাহ মানতেন যে, একদিন তিনি একদল লোকের সাথে হেঁটে যাচ্ছিলেন। একটা জায়গায় এসে মাথাটা একটু নিচু করে আবার সোজা হলেন। সাথের লোকেরা ভাবল, হয়েছে কী এই লোকের? তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আমার মনে পড়ছে অনেক বছর আগে রাসূল (সা.) এই পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এখানে একটা গাছ ছিল, তার একটা শাখা এত নিচু হয়ে ছিল যে, রাসূল (সা.) মাথা ঝুঁকিয়ে সেটা পার হলেন। আমি এই জায়গা পার করার সময় রাসূল (সা.)-এর সেই কাজটি অনুকরণ না করে পার হতে চাইনি, যদিও গাছটা এখন আর নেই। তিনি পদে পদে রাসূলকে অনুসরণ করেছিলেন।
আব্দুল্লাহ ইবনু উমরের যখন অল্প বয়স, রাসূল (সা.) একবার তাঁর কাঁধ শক্ত করে ধরলেন। আরবদের সংস্কৃতিতে এভাবে কাঁধ ধরার অর্থ, আমি এখন তোমাকে যেটা বলছে চলেছি, সেটা মহা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তো রাসূল (সা.) আব্দুল্লাহ ইবনু উমরের কাঁধ ধরে বলছেন, আব্দুল্লাহ! এই দুনিয়ায় একজন অপরিচিত মুসাফিরের মতো বাস করো। আব্দুল্লাহ বলেন, আল্লাহর কসম, সেইদিন থেকে আমি যখনই সকালে উপনীত হতাম, তখন আর সন্ধ্যায় উপনীত হওয়ার আশা করতাম না। আল্লাহ যদি আমাকে সন্ধ্যায় উপনীত করতেন, তাহলে আল্লাহর কসম, আমি সকাল দেখতে পাওয়ার আশা করতাম না। রাসূল (সা.) মুসাফিরের উপমা দিয়েছেন। সফরে যাওয়ার সময় আপনি আপনার সাথে করে কী নিয়ে যান? আপনি আপনার ঘরবাড়ি মাথায় করে নেন? কেবল একটা ব্যাগ নিয়ে যান। ছোট ব্যাগে না হলে হয়তো বড় কোনো ব্যাগ নেন। অথবা হয়তো আপনার আন্টি আপনাকে কোনো পুঁটলি গছিয়ে দিয়েছেন সেখানে গিয়ে আপনার আঙ্কেলের কাছে পৌঁছে দিতে। ব্যস-এছাড়া আপনি তেমন কিছু নেন না। খালি দরকারি জিনিসগুলো। কোনো ঠাণ্ডা জায়গায় যেতে হলে বড়জোর একটা সোয়েটার নেন। আপনি নিশ্চয় পুরো ওয়ার্ডোব তুলে নিয়ে যান না। রাসূল (সা.) বলেছেন, দুনিয়াতেও আপনার এভাবেই বাস করা উচিৎ। শুধু দরকারি জিনিসগুলো সাথে নেবেন, আর কিচ্ছু না। রাসূল (সা.) নিজের ব্যাপারে বলছেন, এই দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক। এখানে আমি এক মুসাফিরের মতো। যে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল, তারপর উঠে আবার পথ চলতে শুরু করল। এই যে বিশ্রাম নেওয়ার সময়টুকু, এটুকুই দুনিয়া।
আপনি বিদেশে যেতে হলে এয়ারপোর্টে ট্রানজিটে কতক্ষণ অপেক্ষা করেন? বড়জোর তিন-চার ঘণ্টা? রাসূল (সা.) এটাকেই দুনিয়া বলেছেন। ভাবুন এই পৃথিবীটা শাহজালাল বিমানবন্দর। আপনার গন্তব্য কোনো একটা দেশ। মাঝে কিছুক্ষণ বিমান বন্দরে থাকতে হয়েছে। এটাই দুনিয়া। আমাদের সবার গন্তব্য কোথায়? জান্নাত। আচ্ছা চিন্তা করুন শাহজালাল বিমানবন্দরে বসে আপনি আর আমি প্লেনের জন্য অপেক্ষা করছি। আপনি ঘড়ি দেখে বললেন, ফ্লাইটের সময় প্রায় হয়ে এসেছে। আমাদেরকে অত নাম্বার গেটে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। আমি বললাম, আরে এখনই যাবেন? এই এয়ারপোর্টটা দেখেন, কত সুন্দর! কী সুন্দর দোকান-পাট। উফ! আমার ইচ্ছে করছে এখানে একটা বাড়ি করি। তারপর বিয়েশাদি করে এখানেই সেটল হয়ে যাই। আপনি নিশ্চয় আমাকে বলবেন, ভাই, পাগল হয়েছেন? আমাদের ফ্লাইট আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আর আপনি এসব বলছেন। এসব শুনে হয়তো হাসি পাচ্ছে। কিন্তু দুনিয়াতে আমরা এই জিনিসই করছি। অথচ ট্রানজিটে তিন-চার ঘণ্টা সময় আপনার কী করা উচিৎ? বড়জোর হালকা খাবারদাবার খাবেন, টয়লেটে যাবেন, তারপর সময়মতো গিয়ে ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করবেন। এর চেয়ে বেশি কিছু না। ওয়াল্লাহি, চার ঘণ্টা অনেক লম্বা সময়। আমাদের কারো চার মিনিট বাঁচার গ্যারান্টি নেই। অথচ এই দুনিয়াকে আমরা ঘর বানিয়ে ফেলছি। আল্লাহ দুনিয়াকে বানিয়েছেনই এমনভাবে যে, এটা আপনাকে সন্তুষ্ট করতে পারবে না। আল্লাহর কসম, আপনার যত সম্পত্তিই থাকুক না কেন, আপনি কখনই তৃপ্ত হবেন না। আল্লাহ একে বানিয়েছেনই এভাবে। জান্নাত ছাড়া আর কোথাও সন্তুষ্ট হবেন না।
আমরা বিয়ে করি, কাজ করি, ঘর করি, গাড়ি কিনি, পরিবারকে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিই। এগুলো সবই হালাল। জীবনে এগুলোর প্রয়োজন আছে। কিন্তু দ্বীনকে জবাই করার বিনিময়ে নয়। কক্ষণো দুনিয়াকে দ্বীনের আগে স্থান দেওয়া যাবে না। আমাদের কত মুসলিম ভাই কাজের কারণে সালাত মিস করে? কারণ বস যেতে দেন না। অথবা ইউনিভার্সিটি ক্লাসের জন্য। তারা ক্লাসের জন্য সালাত মিস করে। কারণ টিচার যেতে দেন না। মুসলিম, অথচ এমন চাকরিতে ঢুকছে যেখানে দাড়ি রাখতে দেয় না। মনে মনে সে ঠিকই চায় দাড়ি রাখতে। যারা রাখতে চায় না, তাদের কথা আলাদা। কিন্তু যারা রাখতে চায়, তাদের অনেকেই চাকরির দোহাই দেয়। ভাই দেখেন, আমি এমন অমন চাকরি করি। এখানে এটা ঠিক মানায় না। আমরা কি সত্যিই আল্লাহর ইবাদাত করি, না চাকরির? আমরা যখন বলি কেউ টাকার ইবাদাত করে, তখন মানুষ ভাবে সে মনে হয় মেঝেতে একটা একশ টাকার নোট রেখে তাতে সিজদা দেয়। নাহ! ইবাদাত করা মানে আনুগত্য করা। বস আপনাকে বলেছেন সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠতে, আল্লাহ বলেছেন সাড়ে পাঁচটায় উঠতে। আপনি সাতটায় উঠলেন। কার আনুগত্য করলেন? আল্লাহ বলেছেন সালাত পড়ো, টিচার বললেন সালাত পড়ো না। আপনি পড়লেন না। কার আনুগত্য করলেন? আল্লাহর, না দুনিয়ার? এটাই আজ আমাদের বাস্তবতা।
এই দুনিয়ার কিছুই আপনি নেবেন না। আপনে যে-ই হোন না কেন, আপনার যত বাড়িই থাকুক না কেন। যত কিছু ইচ্ছা ভোগ করে নিন, কিন্তু একদিন আপনি মারাই যাবেন। যাকে ইচ্ছা ভালোবাসুন, কিন্তু একদিন আপনি পৃথক হবেনই। যা ইচ্ছা জমা করুন, কিন্তু একদিন আপনি আল্লাহর কাছে এর হিসাব দিতেই হবে। দুনিয়াকে এর বাস্তবতা স্বীকার করে নিন। আজ আপনি যুবক শক্তিশালী, কাল হাঁটুতে ব্যথা, পাকা চুল। পরশু আপনি নেই। আলিমগণ একটি চমৎকার উপমা দিয়ে থাকেন। তাঁরা বলেন, দ্বীনকে মনে করুন একটি সূর্য। আর আপনার ছায়া হলো দুনিয়া। আপনি সূর্যকে পেছনে রাখলে, মানে দ্বীনকে পেছনে ফেললে, ছায়া আপনার সামনে থাকবে। এরপর আপনি ছায়ার পিছে যতই দৌড়ান, একে আপনি ধরতে পারবেন না। কিন্তু দ্বীনকে যদি সামনে রাখেন, তাহলে ছায়া থাকবে আপনার পেছনে, মানে দুনিয়া থাকবে আপনার পেছনে। কিন্তু এটা আপনার থেকে পৃথক হতে পারবে না। আপনার সাথেই সেঁটে থাকবে। এটা আপনার পেছন পেছন দৌড়াবে। আর এভাবেই আল্লাহকে উদ্দেশ্য বানালে দুনিয়া আপনার পেছনে দৌড়াবে, আপনাকে দুনিয়ার পেছনে ছুটতে হবে না।
আমাদের উচিত দুনিয়ার এসব বাস্তবতা নিয়ে বেশি বেশি কথা বলা। দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসাকে অন্তরে শেকড় গাড়তে না দেওয়া। যখনই কিছু একটা আকর্ষণ করতে শুরু করবে, তখনই তার শেকড় কেটে দেবেন। জিহাদ শেষে সাহাবাগণ গনীমতের মাল সংগ্রহ করতেন। সাহাবাগণ সেই গনিমত সংগ্রহের পর একজন আরেকজনের সাথে বিনিময় বা বেচাকেনাও করতেন। এমন এক যুদ্ধের পর এক সাহাবি প্রচুর টাকাপয়সা কামাই করলেন। তিনি এসে রাসূল (সা.)-কে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ আমার চেয়ে সফল কেউ নেই। রাসূল (সা.) টের পেলেন যে ওই সাহাবির দুনিয়াবি সম্পদের প্রতি আকর্ষণ চলে আসছে। তিনি বললেন, না! তোমার চেয়েও সফল মানুষ আছে। সাহাবি বললেন, না, না। আমি উকায বাজারে গিয়েছি। দেখেছি আমার চেয়ে বেশি টাকা কেউ কামায়নি। রাসূল (সা.) বললেন, ফজরের আগের দুই রাকআত সালাত দুনিয়া ও এর ভেতর যা আছে, সে সবকিছু থেকে উত্তম। আজকে আপনি আপনার দামি গাড়িটা কোথাও পার্ক করে রাখলেন। সকালে এসে দেখলেন কেউ গাড়িটার বডিতে একটা আঁচড় দিয়ে গেছে। আপনার মনটা জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাবে! অথচ ফজরের সালাত চলে যাচ্ছে ঘুমের ঘোরে, আমাদের কোনো ভাবলেশ নেই। ফরয তো পরে, যেখানে ফজরের সুন্নাতেরই এত মর্যাদা, সেই ফজর ফেলে আমরা কাকে ধোঁকা দিচ্ছি? এই ফজর মিস গেলে কয়জনের মন কাঁদে? এটাই দুনিয়ার বাস্তবতা। দুনিয়া আমাদের অন্তর থেকে এভাবেই দ্বীনকে নিংড়ে বের করে দিয়েছে।
📄 একদিন তারা একত্রিত হবে
মুসলিমদের আজ এই করুণ দশা কেন, এমন প্রশ্ন যদি জিজ্ঞেস করা হয় তাহলে কেউ কেউ বলবে, আমাদের ইলমের অভাব! কিন্তু না, আজকের যুগে ইলম অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে সবচেয়ে সহজলভ্য। লক্ষ্য লক্ষ্য কিতাব, মাদ্রাসা, হাফিয, তালিবুল ইলম, আলিম ওলামা-কোনো কিছুর অভাব নেই। মানুষের হাতে হাতে মোবাইলে, ল্যাপটপে ইলম ঘুরছে। আমাদের আজকের এই অবস্থার কারণ, আমাদের মাঝে আজ রিজাল-সত্যিকারের পুরুষরা নেই। উম্মাহর পুরুষরা তাদের 'পৌরুষ' হারিয়ে ফেলেছে। আর উম্মাহ যখন পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে, এতে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয় এর নারী আর শিশুদের। আজকে আমাদের অবস্থাও ঠিক তাই। সারাবিশ্বে তাকিয়ে দেখুন, উম্মাহর নারী আর শিশুরা আজ অসহায়, নির্যাতিত। কারণ পুরুষরা তাদের দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা সমাজের মানদণ্ডে 'পুরুষ' হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, "while the cat's away, the mice will play". আজকে এটাই উম্মাহর অবস্থা। পুরুষরা হারিয়ে গেছে, আর কাফিররা এই উম্মাহকে নিয়ে খেলতে শুরু করেছে। ভাগ ভাটোয়ারা করে নিচ্ছে নিজেদের মধ্যে। যার যেখানে খুশি সেখানে জুলুমের বুট ধাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, - 'শীঘ্রই মানুষ তোমাদেরকে আক্রমন করার জন্য আহবান করতে থাকবে, যেভাবে মানুষ তাদের সাথে খাবার খাওয়ার জন্য একে-অন্যকে আহবান করে'। সাহাবিরা এটা শুনে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। কারণ সেসময় মুসলিমরা সংখ্যায় অল্প, তারপরও তাঁরা চারদিক জয় করছে, অমুসলিমরা তাদেরকে সমীহ করছে। তাই সাহাবিরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! 'তখন কি আমরা সংখ্যায় কম হবো?” আমরা কি সংখ্যায় তখন এতটাই নগণ্য হবো যে নিজেদের রক্ষাই করতে পারব না? রাসূল (সা.) বললেন, -'না, বরং তোমরা সংখ্যায় হবে অগণিত কিন্তু তোমরা সমুদ্রের ফেনার মতো হবে, যাকে সহজেই সামুদ্রিক স্রোত বয়ে নিয়ে যায় এবং আল্লাহ তোমাদের শত্রুর অন্তর থেকে তোমাদের ভয় দূর করে দিবেন”
বিস্মিত সাহাবিরা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। সমুদ্রের ফেনার মতো মুসলিমদের সংখ্যা, এত অগণিত, অথচ এত করুণ অবস্থা হবে তাদের? তাঁরা জিজ্ঞেস করল, কেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! কেন আমাদের এই করুণ অবস্থা হবে? রাসূল (সা.) জবাব দিলেন, –আল্লাহ তোমাদের অন্তরে আল-ওয়াহহান ঢুকিয়ে দেবেন'। 'ওয়াহহান' শব্দটা আরবদের কাছে পরিচিত ছিল না। তাই তাঁরা আবার জিজ্ঞেস করল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল ওয়াহহন কী?' রাসূল (সা.) বললেন, -'দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা এবং কিতালকে (আল্লাহর পথে যুদ্ধ) অপছন্দ করা'।⁶
আবু দাউদে সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য একটি সহিহ হাদিসে 'ওয়াহহান' শব্দের অর্থ বলা হয়েছে- “দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করা"⁷
এই হাদিস আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এতটাই বাস্তব, এতটাই প্রাসঙ্গিক, মনে হয় যেন ১৪০০ বছর আগে নয়, মাত্রই গত সপ্তাহে হাদিসটা নাযিল হয়েছে। সাহাবিরা এই হাদিস শুনে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন, কারণ তাঁরা তাদের চারপাশের বাস্তবতার সাথে এর প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। কিন্তু আজ আমরা এটা শুনে, নিজেদের সাথে মিলিয়ে দেখে, সহজেই বুঝে ফেলতে পারি, ১৪০০ বছর আগে এই হাদিস দিয়ে রাসূল (সা.) কী বুঝিয়েছিলেন। রাসূল (সা.) দুনিয়ার উপমা দিয়েছিলেন কান কাটা মরা ছাগলের সাথে—যেটা পচে গিয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। উম্মাহর পুরুষরা আজ সেই কান কাটা মরা ছাগলের পেছনে হাঁপানো কুকুরের মতো ছুটছে। ওয়াল্লাহি! ওয়াহহান—দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা—আমাদের 'পৌরুষ' কেড়ে নিয়েছে। এই উম্মাহকে বিকলাঙ্গ করে ছেড়েছে।
টিকাঃ
৬. মুসনাদে আহমদ, খন্ড-১৪, হাদিস-৮৭১৩
৭. আবু দাউদ: ৪২৯৭ (শাইখ আলবানি সহিহ বলেছেন)
📄 দ্যা গ্যাংস্টার
দাওয়াহ জগতে সীমিত সময়ের বিচরণে আমি দুই ধরনের মানুষের মুখোমুখি হয়েছি। এক ধরনের মানুষের ভাবসাব হলো গ্যাংস্টারের মতো। নিজেদের অন্তরে, এমনকি কখনও মুখেও তারা এই বিশ্বাসটা প্রকাশ করে বসে যে, আল্লাহর জন্য তার কোনো সময় নেই। এই দ্বীন, এই ধর্ম, নবির সুন্নাহ, এটা করো ওটা কোরো না, এটা হারাম, সেটা জায়েয নেই—এসবকে তার পাত্তা দেওয়ার টাইম নেই। মনের ভেতর প্রচণ্ড রকম অহংকার নিয়ে এরা জমিনে দাপিয়ে বেড়ায়। তাকে দাওয়াহ দিতে গেলে বলে, 'আরে যান তো! কয়টা দাড়ি গজিয়েছে, ইউটিউবে দুই-চারটা হাদিস শুনেছেন, আর এখন আমার সামনে বকবক করতে এসেছেন! যান, ভাগেন! আপনার এসব হুজুরগিরির আমার দরকার নেই। আমাকে আমার কাজ করতে দিন।' এমন ভাব করে যেন আল্লাহকে তার দরকার নেই। সে একাই একশো!
আবার আরেক ধরনের মানুষ আছে, যারা হয়তো দুই-এক বছর ধরে দ্বীনের উপর আছে, প্রকাশ্যে না বললেও তাদের অন্তরে এমন একটা বিশ্বাস চলে আসে যে—‘আমি খুব বড় কিছু একটা।' সে অন্যদের দিকে নিচু দৃষ্টিতে তাকাতে শুরু করে। সে ভাবে সে অন্যদের চেয়ে একটু উপরে। আমার কী সুন্দর দাড়ি, আর ওই লোক ক্লীন শেইভড। আমি দশ বছর ধরে সালাত কাযা করি না, আর ওই লোক ঠিকমত ওযু করতেই জানে না। নিশ্চয় আমি তার চেয়ে ভালো! আর সে এটাও বিশ্বাস করতে শুরু করে যে—তাকে আল্লাহর খুব দরকার। তার সালাত, সাদাকা, তাসবীহ—এসবের জন্য আল্লাহ যেন অপেক্ষা করে থাকেন! মসজিদে যাওয়ার পথে সে হয়তো কাউকে পঞ্চাশটা টাকা দান করল, তারপর মনে মনে বিশ্বাস করতে শুরু করল—আরে! আল্লাহ্ আমার কাছে বিরাট ঋণী হয়ে গেলেন! আমি যেহেতু গত দশ বছর ধরে সালাত পড়ছি, আল্লাহ যেন আমার কাছে বিরাট কৃতজ্ঞ!
এই দুই ধরনের মানুষের জন্যই দুঃসংবাদ। আল্লাহ আপনার কাছে মোটেই ঋণী নন। মোটেই না! আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলার আপনাকে দরকার নেই। আপনার সালাত, আপনার সিয়াম, আপনার সময়, আপনার দাওয়াহ, আপনার দাড়ি-কোনোকিছুর জন্য আল্লাহ মুখাপেক্ষী নন। তিনি সকল প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে। তিনি আমাদের রব-রাব্বুল আরশিল আযীম। আমার-আপনার বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাকে দরকার। সুতরাং আপনি কাকে ধোঁকা দিচ্ছেন? ধোঁকার মধ্যে বরং আপনি নিজেই। শয়তানকে তাই আপনার মন নিয়ে খেলতে দেবেন না। “মাশাআল্লাহ! তুমি তো দ্বীনের পথে আছ। তুমি অন্যদের চেয়ে অনেক উপরে।”-এই আত্মতুষ্টির ধোঁকায় পড়বেন না। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের সামনে আপনি কিছুই না, একেবারেই নগণ্য, মূল্যহীন!
আর যে গ্যাংস্টার ভাব নিয়ে আছে আর ভাবছে আল্লাহর জন্য তার সময় নেই, সেও কিছু না, একেবারেই নগণ্য। মানুষ একটা চাদরের ভেতর নিজেকে আড়াল করে রাখে। সেই চাদর সে নয়। আর এর চেয়ে খারাপ হলো এসকল গ্যাংস্টারেরা মুসলিমদেরকে খাটো করে দেখে। সে হয়তো ভালো দেখে একটা গাড়ি কিনেছে, তার চারপাশে হয়তো কিছু চাটুকার ঘোরে-যারা তার শারীরিক আকার দেখে ভয় পায়। তাই সে ভাবে আমি দারুণ কিছু একটা! অথবা হয়তো সে এদিক ওদিক করে দুটা পয়সা কামাই করছে, এতেই সে ভাব ধরছে-আমার কাছে ওসব ধর্মের বাণী নিয়ে আসবেন না। আমি যা ইচ্ছা করব, যেখানে ইচ্ছা যাব, যা খুশি বেচব, যা মনে চায় পান করব, যার সাথে ভালো লাগে শুবো। আপনারা থাকেন আপনাদের ধর্ম নিয়ে। আল্লাহ এত মহান হলে উনি আমার কাছে এত ইবাদাত চায় কেন? আল্লাহর কসম! আপনি যা-ই করেন, যা-ই দেখেন, যা-ই বেচেন, যার সাথেই শোন, এসবে আল্লাহর কোনো ক্ষতি হয় না। সহিহ হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ্ বলেন, হে আমার বান্দারা! তোমরা সকল মানুষ ও জিন যদি একত্র হয়ে আমার ইবাদাত করতে করতে সবচেয়ে নেককার হয়ে যাও, তাতে আমার রাজত্ব থেকে কিছুমাত্র বাড়ে না। হে আমার বান্দারা! যদি তোমরা সকল মানুষ ও জিন একত্র হয়ে অবাধ্যতা করতে করতে সবচেয়ে অবাধ্য ব্যক্তিটির মতোই হয়ে যাও, তাতে আমার কিছুমাত্র ক্ষতি হয় না।
আজকাল কোনো মজলিসে এসব দ্বীনের কথা যখন শুনি, আমাদের মনে হয় ইশ! আমার ভাইয়ের আজকে এখানে থাকা উচিৎ ছিল! আহ! আমার বাবা যদি এই খুতবাটা শুনতে পেতেন! তার এটা শোনা খুব দরকার। খালি অন্যের কথা মাথায় আসে, নিজের কথা কেউ ভাবে না। এটা হলো রোগাক্রান্ত অন্তরের বড় একটা লক্ষণ। কারণ আল্লাহ যদি চাইতেন তারা এটা শুনুক, তিনি তাদের এখানে নিয়ে আসতেন। কিন্তু তিনি আপনাকে এনেছেন, কারণ রোগ আপনার অন্তরে। আপনি যা-ই করেন না কেন, মদ খান, বেশ্যাবৃত্তি করেন, টাকা মারেন, এতে আল্লাহর এক বিন্দু ক্ষতি নেই। আল্লাহ আল-মালিক। আল্লাহ সার্বভৌম। তোমরা আল্লাহর মুখাপেক্ষী ফকির। কেউ হামবড়াই করে হাঁটতে হাঁটতে ভাবে আমার নামাজ-রোজার কোনো দরকার নেই। আরেকদল ভাবে আমি দশ বছর ধরে নামাজ-রোজা করি, আমাকে আল্লাহর বড় দরকার। আপনার ধারণা আল্লাহ আপনার কাছে ঋণী?
রাসূল (সা.) সাহাবাদের নিয়ে বসে আছেন। সেই সাহাবাদের নিয়ে—যারা দুনিয়ার বুকে পদচারণ করা শ্রেষ্ঠতম প্রজন্ম। আল্লাহ তাঁদের ব্যাপারে কুরআনে বলেছেন, আমি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট, তারাও আমার প্রতি সন্তুষ্ট। নবিজি (সা.) এক সহিহ হাদিসে সেই সাহাবাদের বলছেন, আমি যা দেখি, তোমরা তা দেখো না। আমি যা শুনি, তোমরা তা শুনতে পাও না। সাত আসমান চিড়চিড় শব্দ করছে, আর এর শব্দ করাটাই স্বাভাবিক। সাহাবাগণ অবাক হয়ে গেলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এর অর্থ কী? কোনো জিনিস যখন তার উপরে থাকা মালামালের ভার নিতে পারে না, তখন তা চিড়চিড় করতে থাকে।
আজকে তো আমরা বড় বিজ্ঞানী প্রজন্ম হয়ে গেছি। অ্যাস্ট্রোনমির যত কিছু আমরা জানি, তা বাস্তবে থাকা জিনিসগুলোর এক পার্সেন্টও না। আমাদের সৌরজগৎ হলো এমন মিলিয়ন মিলিয়ন সৌরজগতের মধ্যে একটি মাত্র। বিজ্ঞানীরা বলেন এই মিলিয়ন মিলিয়ন গ্যালাক্সির মধ্যে শুধু আমাদের গ্যালাক্সিতেই যত তারকা আছে, প্রতি সেকেন্ডে সেগুলোর একটি করে গুনলে তিনশ ট্রিলিয়ন বছর পরেও সব গোণা শেষ হবে না। আমাদের সূর্য হলো সেই সব নক্ষত্রের মধ্যে সবচেয়ে ছোটগুলোর একটি, যা আমাদের পৃথিবীর চেয়ে লক্ষ গুণ বড়। আর এই সব তারকারাজি আছে শুধু প্রথম আসমানে! আর রাসূল (সা.) বলছেন, সাত আসমানের মধ্যে চার আঙুল পরিমাণ জায়গা খালি নেই যেখানে কোনো না কোনো ফেরেশতা আল্লাহকে সিজদা করছেন না। আর আপনি ভাবেন আল্লাহ আপনার টাকার মুখাপেক্ষী? আপনার ইবাদাতের তাঁর খুব দরকার? আপনার নামাজ-রোজা-দান-সাদাকা না পেলে আল্লাহর খুব ক্ষতি হয়ে যাবে? আল্লাহ কোনো পরোয়াই করেন না আপনি ইবাদাত করলেন কি না করলেন! সাত আসমানের মধ্যে চার আঙুল পরিমাণ জায়গা খালি নেই যেখানে কোনো না কোনো ফেরেশতা আল্লাহকে সিজদা করছেন না। ফেরেশতা! তাদের সৃষ্টির সময় থেকে একটাই সিজদা দিয়ে আছেন—বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে। কিন্তু তাঁরাও যখন উঠবেন, বলবেন, হে আল্লাহ্! আমাদের মাফ করে দিন। আপনার যেভাবে ইবাদাত পাওনা, সেভাবে আমরা তা করতে পারিনি। বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে সিজদাহয় পড়ে থেকেও, নিষ্পাপ ফেরেশতারা বলছে, তারা আল্লাহর ইবাদাতের হক আদায় করতে পারছে না, আর আমরা ভাবি কি না আল্লাহর আমাদেরকে দরকার?
আল্লাহ হাদিসে কুদসিতে⁸ বলেন, হে আমার বান্দারা! তোমাদের প্রত্যেকে ক্ষুধার্ত, শুধু সে ছাড়া যাকে আমি খাওয়াই। আজ কেউ এক বেলার খাবার কিনে ভাবে, আমি এটা কিনে খাচ্ছি! ভুল! আল্লাহ্ আপনাকে খাওয়াচ্ছেন। মানুষ নিজের খাবারের দিকে তাকিয়ে পর্যন্ত অহংকারী হয়ে যায়! মনে করে আমার খাবার আছে। কাজেই আমার এটা দরকার নেই, ওটা দরকার নেই। কিন্তু আল্লাহ আপনাকে না খাওয়ালে আপনার কী সাধ্য আছে খাবার মুখে তোলার? আল্লাহ বলেন, হে আমার বান্দারা! তোমাদের প্রত্যেকে উলঙ্গ, শুধু সে ছাড়া যাকে আমি পরাই। আজ একেকজন গুচি ব্র্যান্ডের জুতা কিনে এমন ভাবে উঠে যায় যে আপনি তাদের সালাম দেওয়ার জন্যও নাগাল পাবেন না। এমন অহংকার! সামান্য এক জোড়া জুতা কিনে সে ভাবে আমি কিছু একটা! অন্যের জুতায় একটা দাগ থাকলে তাকে আর পরোয়া করে না। মুসলিমরা আজকাল গাড়ি, ঘড়ি, জুতা দেখে বিচার করে তার অবস্থান সমাজের কোথায়। অথচ আপনারা সবাই উলঙ্গ, যদি না আল্লাহ আপনাদের কাপড় পরান। আল্লাহ্ বলেন, হে আমার বান্দারা! তোমাদের প্রত্যেকে পথহারা, শুধু সে ছাড়া যাকে আমি পথ দেখাই। আর আজ ভাইয়েরা “দ্বীনে”র উপর এসে এমন ভাব ধরে, আল্লাহু আকবর! এরা কুফফার, ওরা পথভ্রষ্ট, তারা জাহান্নামী। কে আপনাকে নবি বানিয়ে দিয়ে গেছে? নবিজি (সা.) তো এমন কখনও করেননি।
মানুষ হজ্জে যায়। ফিরে আসার পর তাকে আর মুহাম্মাদ ডাকা যায় না, ডাকতে হয় আলহাজ্জ মুহাম্মাদ। 'ভাই কিছু মনে করবেন না, আমি হজ্জ করেছি তো, আমাকে আলহাজ্জ মুহাম্মাদ ডাকুন দয়া করে।' সত্যিই? তাই? আপনি ভাবছেন হজ্জ করে আপনি আল্লাহর চোখে কিছু একটা হয়ে গেছেন? এমনকি মানুষ মাইন্ড করে! বলে, আমি এত লাখ টাকা খরচ করলাম, চারটা সপ্তাহের জন্য পরিবারের সঙ্গকে কুরবানি করলাম! আমাকে আলহাজ্জ ডাকবে না? অথচ রাসূল (সা.) এই হাদিস বলছিলেন সেই সাহাবাগণকে, যারা হাসিমুখে আল্লাহর পথে জীবন দিয়ে দিতেন। আপনার পূর্বসূরি, আপনার আদর্শ। যারা আল্লাহর রাস্তায় কঠিনতম কুরবানিগুলো করতেন, আর ভাবতেন আমি কিছুই করতে পারলাম না। আর আপনি কিছুই করেন না, আর ভাবেন আসমানে চড়ে বসে আছেন।
নবিজি (সা.) এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম সাহাবাদের বলছেন, তোমাদের কেউ নিজ আমলের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। কেউ না! তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনিও না? তিনি বললেন, আমিও না। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এই দুনিয়ার বুকে শ্রেষ্ঠতম মুজাহিদ, শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক, শ্রেষ্ঠতম বাবা, শ্রেষ্ঠতম স্বামী, মানবতার প্রতি সবচেয়ে বড় রহমত, আল্লাহর সবচেয়ে বড় আবিদ, শ্রেষ্ঠতম রাসূল, শ্রেষ্ঠতম নবি, শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি ছিলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি বলছেন আমিও না, যদি না আল্লাহ আমাকে তাঁর রহমত দিয়ে ঢেকে দেন।⁹
এই দুনিয়ার জীবনে একজন ইবাদাতকারীর কাহিনী আছে যে ৫০০ বছর ধরে আল্লাহর ইবাদাত করেছে। আল্লাহ্ বিচার দিবসে ফেরেশতাদের বললেন, যাও একে আমার রহমতের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করাও। লোকটির মনে হলো, এ কী? আমি পাঁচশ বছর ধরে ইবাদাত করলাম। আমি মূল্য চুকিয়ে দিলাম। আর এখন কি না আল্লাহর রহমতের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করতে হবে? তিনি বললেন, না, আমাকে আমার আমলের কারণে জান্নাত প্রবেশ করান। ও আচ্ছা! তুমি তোমার আমলের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করতে চাও? ভালো! আল্লাহ আদেশ দিলেন মীযান নিয়ে আসতে। হুকুম দিলেন এক পাল্লায় তার ৫০০ বছরের আমল রাখতে, আরেক পাল্লায় তাকে আল্লাহর দেওয়া শুধু একটি নিয়ামত রাখতে—দুচোখ দিয়ে দেখার নিয়ামত। ওজন করা হলো। শুধু চোখ দিয়ে দেখতে পারার নিয়ামত তার ৫০০ বছরের আমলের চেয়ে ভারি হয়ে গেল। আল্লাহ হুকুম দিলেন, যাও তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করো। কেবল তখনই লোকটি বলল, হে আল্লাহ! আমি আপনার রহমত পেয়ে সন্তুষ্ট।
আজ আপনি ভাবছেন দেখার জন্য দুটি চোখ থাকলেই যথেষ্ট। ভুল! অসংখ্য মানুষের চোখ আছে, কিন্তু তারা তা দিয়ে দেখতে পায় না। আল্লাহই আপনাকে দেখার ক্ষমতা দিয়েছেন। আজ আপনি ভাবছেন শোনার জন্য দুটি কান থাকলেই যথেষ্ট। ভুল! অসংখ্য মানুষের কান আছে, কিন্তু তারা তা দিয়ে শুনতে পায় না। আল্লাহই আপনাকে শোনার ক্ষমতা দিয়েছেন। আজ আপনি ভাবছেন হাঁটার জন্য দুটি পা থাকলেই যথেষ্ট। ভুল! অসংখ্য মানুষের পা আছে, কিন্তু তারা তা দিয়ে হাঁটতে পায় না। আল্লাহই আপনাকে হাঁটার ক্ষমতা দিয়েছেন। আল্লাহ! আপনি নিজে নন। আপনি ভাবছেন সেই আল্লাহর আপনাকে দরকার? আপনার ইবাদাতের জন্য তিনি মুখাপেক্ষী? না, আল্লাহ আপনাকে দরকার নেই। আমার, আমাদের কাউকে আল্লাহর দরকার নেই। এটা আমাদের আকিদা, এটা জানতেই হবে। যাতে ইবাদাতের সময় আপনি বিনয়ের সাথে দাঁড়াতে পারেন। যাতে জীবনের যেকোনো সময় মাথায় রাখতে পারেন যে আপনি যেখানে আছেন, সেখানে আছেন কেবল আল্লাহর দয়ার কারণে। শুধু তাঁর রহমতের কারণে। ইয়াকীন রাখতে হবে যে আল্লাহ আমাদের রব, আমাদের মালিক, আমাদের ইলাহ কারো মুখাপেক্ষী নন। কাউকে তাঁর দরকার নেই। বরং আমরা সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী। আমাদের সবার তাঁকে দরকার।
টিকাঃ
৮. এটি একটি হাদিসে কুদসির কিছু অংশ। হাদিসটি মুসলিম, তিরমিযি ও ইবনু মাজাহতে বর্ণিত। হাদিসের মান সহিহ
৯. মুসলিম-২৮১৬
📄 ব্যথার কথা
তাবুক যুদ্ধ ছিল মুমিন এবং মুনাফিকদের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করার এক উপলক্ষ্য। সেসময় রাসূল (সা.) রোমানদের বিরুদ্ধে জিহাদের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি বারেবারে সবাইকে জিহাদের জন্য প্রস্তুতি নেবার তাগাদা দিচ্ছিলেন। প্রথমবারের মতো ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) বাহিনী তৈরি করেন। ঘটনাচক্রে রোমানদের সাথে যুদ্ধ হয়নি, তিন সপ্তাহ পর রাসূল (সা.) বাহিনী নিয়ে ফিরে আসেন। আর এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কুরআনের সূরাহ তাওবা নাযিল হয়। কুরআনের সবচেয়ে কর্কশ ভাষায় আল্লাহ মুনাফিকদের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। যে কারণে এই সূরার একটি নাম আল ফাজিহা, অর্থাৎ অপমানকারী, লাঞ্ঞ্ছনাকারী।
সাঈদ ইবনু যুবাইর (রা.) বলেন, আমি আব্বাস (রা.) কে এই সূরাহর বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বললেন, এটি ফাজিহা, কারণ এই সূরাহয় বিভিন্ন আয়াতে মুনাফিকদের স্বরুপ উন্মোচন করা হয়েছে। আল্লাহ এই সূরাহয় নবি (সা.) কে আদেশ করছেন, “বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ কর-আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর রাহে জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হিদায়েত করেন না।” (সূরাহ তাওবা, ৯: ২৪)
কুরআনের সবচেয়ে কঠিন ভাষায় নাযিলকৃত আয়াতগুলোর মধ্যে এটি একটি। আল্লাহ তাঁর নবিকে বলছেন, তাদেরকে বলুন...! কাদেরকে বলুন? সেসময় আল্লাহর রাসূল (সা.) এর আশেপাশে কারা ছিল? আমি? আপনি? না! সেসময় আল্লাহর রাসূলের আশেপাশে ছিল আবু বকর, উমর, উসমান, আলি-উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম। আল্লাহ তাদের সাথে এরকম ভাষায় কথা বলেছেন। আর ভাবলেশহীন, দ্বীনের ব্যাপারে তোড়াই কেয়ার করে চলা এই আমরা যদি সেদিন থাকতাম, তাহলে চিন্তা করুন, আমাদের জন্য এই ভাষা কেমন হতো!
যারা নবির জন্য, দ্বীনের জন্য, সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিল আল্লাহ তাদেরকেও বলেছেন-না, শুধু ভালোবাসা, ইবাদাত বন্দেগী এসবে চলবে না! শুধু এতটুকু দিয়েই আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা যাবে না! নিজেদের পিতামাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী, সন্তান, ধন-সম্পদ, ব্যবসা, বাণিজ্য, সবকিছু থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহর পথে জিহাদ অধিক প্রিয় না হবে, ততক্ষণ তোমরা ঈমানের পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না। আর যদি তোমরা এই পরীক্ষায় ফেল করো, তবে পরিণতি কী? পরিণতি হলো আল্লাহর শাস্তি। সে শান্তির মধ্য দিয়ে আজকের উম্মাহ প্রতিনিয়ত দিন যাপন করছে।
একদিন উমর (রা.) বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমার প্রাণ ছাড়া বাকি সবকিছু থেকে অধিক প্রিয়।' তিনি বললেন, 'যতক্ষণ পর্যন্ত আমি কারো কাছে তাঁর প্রাণের চেয়েও প্রিয় না হয়েছি, ততক্ষণ পর্যন্ত সে মুমিন হতে পারে না।' উমর (রা.) বললেন, 'আল্লাহর কসম! এখন আপনি আমার প্রাণের থেকেও প্রিয়।' তিনি বললেন, 'হে উমর! এখন (তুমি পূর্ণ মুমিন)।' (বুখারি, কসম ও নযর অধ্যায়) আরেকটি হাদিসে নবিজি (সা.) বলেছেন, 'সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারে না, ততক্ষণ পর্যন্ত না আমি তার নিকট তার পিতা, সন্তান-সন্ততি এবং সমস্ত মানুষ থেকে প্রিয়তম হয়েছি।' (বুখারি: ঈমান অধ্যায়, মুসলিম: ঈমান অধ্যায়) সাহাবিরা নিজেদের জানমাল, সহায় সম্পত্তি, প্রিয়জনকে কুরবানি করে সেই ঈমানের পরীক্ষায় পাশ করেছেন।
ছোট্ট বাশীর (রা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করলেন। তিনি এবং তাঁর বাবা। সাথে আর কিচ্ছু নেই। তাঁরা জানতেন যেখানে যাচ্ছেন সেটা তাদের অচেনা, সেখানে আরাম নেই, টাকাপয়সা নেই। দুইটা বছর যায়নি, জিহাদের ডাক এলো, বাশীরের বাবা জিহাদে চলে গেলেন। ছেলেকে কার কাছে রেখে গেলেন? আল্লাহর কাছে! বাশীর (রা.) এর বয়স কত হবে তখন? দশ কি বারো! তিনি সেনাবাহিনীকে ফিরে আসতে দেখলেন। তাদের মাঝে নিজের পিতাকে খোঁজ করলেন। নেই, কোথাও নেই! তিনি রাসূল (সা.)-এর ঘোড়ার পাশ দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা কোথায়? রাসূল (সা.) দুঃখে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তিনি ঘোড়ার আরেক দিক দিয়ে গিয়ে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা কোথায়? রাসূল (সা.) ঘোড়া থেকে নেমে এলেন, তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আজ থেকে আমি তোমার পিতা আর আইশা তোমার মা!
সাহাবিদের সময়ে কেউ যদি জিহাদের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের না হতো, তবে সেটা ছিল অপমানের, লজ্জার। একবার এক জিহাদের সময় এক বৃদ্ধ ব্যক্তি এসে রাসূল (সা.) এর কাছে জিহাদের অনুমতি চাইল। বৃদ্ধ এবং একইসাথে পঙ্গু। তার সন্তানরা বলল, আপনি বৃদ্ধ আর পঙ্গু, আপনার তো ওজর আছে, আপনি বাড়িতেই থাকেন। নবিজি (সা.) ও তাকে ওজরগ্রস্থ হিসেবে মত দিলেন। বৃদ্ধ বাড়িতে যাওয়ার পর তার স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, সবাই জিহাদে যাচ্ছে, আর তুমি এখানে কী করছ? বৃদ্ধ বলল, রাসূল (সা.) আমাকে ওজরগ্রস্থ বলেছেন। বৃদ্ধের স্ত্রী এবার ব্যঙ্গ করে বলল, যুদ্ধে যেতে ভয় পাচ্ছ সেটা বল! স্ত্রীর কথা শুনে বৃদ্ধ নিজের বর্ম নিয়ে তৎক্ষণাৎ নবিজি (সা.) এর কাছে গিয়ে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি দিন। নবিজি বললেন, তোমাকে না বললাম, তোমার যাওয়ার দরকার নেই! বৃদ্ধ জবাবে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আমার এই পঙ্গু পা নিয়েই জান্নাতে হাঁটতে চাই। আমাকে বঞ্চিত করবেন না। বৃদ্ধের শক্তিশালী দৃঢ়টা দেখে নবিজি (সা.) তাকে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি দেন। সে জিহাদে যায় এবং শহীদ হয়।
এক মহিলা সাহাবি, যুদ্ধে তার পিতা, ভাই, স্বামী সকলেই শহীদ হয়েছিল। মুসলিমদের বাহিনী যখন ফিরে আসে তাকে একে একে তার পিতা, ভাই আর স্বামীর শহীদ হওয়ার কথা জানানো হয়। তিনি প্রিয়জন হারানোর বেদনায় নীরবে কাঁদলেন, কিছু বললেন না। পরমুহূর্তেই নিজেকে সামনে নিয়ে প্রচণ্ড এক আবেগ আর ভালোবাসা নিয়ে শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'আমার নবি, আমার নবি কেমন কাছে? তিনি ঠিক আছেন তো?' এরাই সেই মানুষগুলো যারা ঈমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। যাদের কুরবানির কারণে আজ আমি আপনি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর অনুসারী হতে পেরেছি। তাই তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, ওরাদু আন-তারা আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট, আল্লাহও তাদের উপর সন্তুষ্ট।
আর আজ আমি আপনি যে জীবন যাপন করছি, আমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহকে যেভাবে মূল্যায়ন করছি, সেভাবে যদি সাহাবিরাও করত, তবে সেই দ্বীন আমাদের পর্যন্ত কোনোদিনও আসত না। এটাই আমাদের বাস্তবতা। আমাদের দ্বীনের অবস্থা আজ এমনই। ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যখন তোমরা ঈনাহ পদ্ধতিতে ব্যবসা করবে (কোন জিনিসকে কিছু দিনের জন্য ধারে বিক্রয় করে পুনরায় সেই জিনিসকে কম দামে ক্রয় করে নেওয়ার), গরুর লেজ আঁকড়ে ধরবে, কৃষিকাজেই সন্তুষ্ট থাকবে এবং জিহাদ ছেড়ে দেবে তখন আল্লাহ তোমাদের উপর লাঞ্ছনা ও অপমান চাপিয়ে দেবেন। তোমরা তোমাদের দ্বীনে ফিরে না আসা পর্যন্ত আল্লাহ তোমাদেরকে এই অপমান থেকে মুক্তি দিবেন না। (আহমাদ ২/২৮,৪২, ৮৪, আবু দাউদ ৩৪৬২নং, বাইহাকি ৫/৩১৬) এই সেই লাঞ্ছনা আর অপমান, যা আজ আমরা ভোগ করছি প্রতিনিয়ত।