📘 এপিটাফ 📄 জীবনের রঙ্গশালায়

📄 জীবনের রঙ্গশালায়


মাঝে মাঝে অবাক হয়ে চারপাশের মানুষগুলোকে দেখি। এদের দেখে মনে হয় জীবনের কোনো লক্ষ্য উদ্দেশ্য নেই। এরা এমনিই ফুর্তি করতে দুনিয়াতে এসেছে। যেন এই জীবন শুধুই একটি খেলা! আসলেই কি তাই? আমরা এখানে কেন এলাম? কেন আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করলেন? কেন আমরা সকালে ঘুম থেকে উঠি? ঘুম থেকে ওঠার পরের দুআটির অর্থ জানেন তো? “সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদে মৃত্যু দান করার পর জীবিত করলেন। আর তাঁর দিকেই আমাদের প্রত্যাবর্তন।” অর্থাৎ গত রাতেও আপনারা সবাই মৃত ছিলেন। কে জীবন দিল আপনাকে? কেন দিল? আপনাকে মৃত্যু দেওয়ার পর আল্লাহ আবার জীবিত করলেন কেন? আর কেনইবা আমরা বলছি “আল্লাহর দিকেই আমরা সবাই ফিরে যাব?” আল্লাহ কি আপনাকে এজন্যই আজকে সকালে জীবন দিয়েছেন যে, আপনি অফিসে গিয়ে টাকা কামাই করে আল্লাহকে খাওয়াবেন? আল্লাহ কি আজ সকালে আপনাকে জীবন দিয়েছেন আপনার সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাবার জন্যই? নাকি পরিবারের জন্য বাজার করে আনার জন্য? নাকি টাকা কামাই করে বাড়ি কেনার জন্য, আরো বড় বাড়ি কেনার জন্য বা নতুন মডেলের গাড়ি কেনার জন্য? বলছি না এসব হারাম, করাই যাবে না, কিন্তু শুধু এটাই কি আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য? এজন্যই কি আমরা বেঁচে আছি?

কয়বার আমরা একনিষ্ঠভাবে নিজেকে প্রশ্ন করেছি যে, কেন আমরা বেঁচে আছি? উদ্দেশ্য কী? কারণটা কী? হে আল্লাহ্! আপনি আমার কাছে কী চান? কেন আপনি আমাকে এই জীবন দিচ্ছেন, এই আবার মৃত্যু দিচ্ছেন, আবার জীবন, আবার মৃত্যু? বলা হয়ে থাকে, ঘুম হলো ছোট মৃত্যু আর মৃত্যু হলো বড় ঘুম। অবশ্যই আল্লাহ আমাদেরকে কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই সৃষ্টি করেননি। কোনো কারণ ছাড়াই আমাদের জীবন দেননি, পৃথিবীতে পাঠাননি। আল্লাহ কুরআনে স্পষ্ট আয়াতে বলেছেন, "আমি জিন ও মানবজাতিকে আমার একমাত্র ইবাদাত ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করিনি।” (সুরাহ আয যারিয়াত, আয়াত ৫৬)

আল্লাহ আপনাকে তাঁর দাসত্ব করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। এর অর্থ শুধু সালাত আদায় করা নয়। আল্লাহকে জানা, আল্লাহ্কে মানা, আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করা, অন্যদেরকে তাঁর পথে ডাকা-এই হলো আমাদের চাকরি। এজন্য আল্লাহ আজকে সকালে আমাদেরকে জীবন দিয়েছেন, গত রাতে মৃত্যু দেওয়ার পর। কনসেপ্টটা মাঝেমাঝে বেশি চরম মনে হয়। তাহলে কি এখন আমরা গাড়ি, বাড়ি, টাকা-পয়সা সব ছেড়েছুড়ে দেব। না, আপনাকে কেউ এটা করতে বলছে না, কিন্তু আল্লাহ কোনো পরোয়াই করেন না আপনার ঘর কত বড়, আপনার কত টাকা আছে, সমাজে আপনার মর্যাদা কেমন। হোন আপনি রাজা, হোন আপনি সুইপার, আল্লাহ এর কোনো তোয়াক্কাই করেন না। আপনার যা-ই আছে, তা তিনিই আপনাকে দিয়েছেন। আপনার-আমার কী আছে গর্ব করার মতো? অনেকেই “মুই কী হনু রে” ভাব নিয়ে ঘোরাফেরা করে। কে আপনি? শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ (রহ.) বলেছেন, মানুষ দুইবার প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে বের হয়েছে (একবার তার বাবার, আরেকবার তার মায়ের)।

এক ধার্মিক লোক ছিলেন। একবার তিনি বসা ছিলেন এক মজলিসে। পাশ দিয়ে যারাই যাচ্ছিল তাকে সম্মান দেখাচ্ছিল, সমীহ করছিল। কিছু সময় পর এক লোক তাকে পাত্তাই না দিয়ে তার পাশ দিয়ে চলে গেলে। বসা লোকটি ধার্মিক, কিন্তু মানুষ তো! তার মনে কিছু একটা খচখচানি শুরু হলো। সবাই আমাকে সম্মান করছে, হাতে চুমু দিচ্ছে, আর এ কিনা এমনিই চলে গেল? তিনি সে লোকের কাছে গিয়ে বললেন, “ভাই, আপনি কি জানেন না আমি কে?” তিনি জবাব দিলেন, “ভাই, আমি আপনাকে আপনার নিজের চেয়ে বেশি ভালোমতো চিনি। আপনার শুরুটা ছিল একটা নুতফা, আর আপনার শেষটা হলো এক মৃত দেহ। আর এর মধ্যবর্তী সময়ে আপনি মল-মূত্রের একটি পাত্র।” ধার্মিক লোকটি বললেন, “আসলেই তুমি আমাকে আমার চেয়ে ভালোমতো চেনো।”

অহংকার শুধু আল্লাহর অধিকার। আপনার-আমার না। কখনও আল্লাহ আপনাকে চাকরি-ব্যবসা দেন। আপনি টাকা কামাই করেন। কৃতজ্ঞতা জানানোর বদলে আপনি কী করেন? “আরে এটা তো আমার কৃতিত্বের ফসল!” আপনার চিন্তাভাবনা যদি এমনই হয়, আর ভাবেন যে আখিরাতে খুব সুখে থাকবেন, আল্লাহর কসম, তাহলে আপনি বড় বিপদে আছেন।

কাকে বোকা বানাচ্ছেন? চাকরি পাওয়ার পর আপনি আবার তার দরজায় কড়া নেড়ে দেখেন, কী ভাই? মসজিদে আসছেন তো? জবাব আসলো, ভাইরে! বিরাট ফিতনার যুগ। বিয়ে করতে হবে। আমি তো রাতে ঘুমাতেই পারি না ফিতনায়। আচ্ছা কবে বিয়ে? এই তো... পছন্দের এক মেয়ে আছে। কিন্তু সমস্যা হয়ে গেছে আরেক জায়গায়! পারিবারিক মর্যাদা যদি সমান না হয়, তাহলে তো প্রস্তাব মানবে না। এই তো আমার বড় ভাই বিয়ে করল কয়দিন আগে, খুব জাঁকজমক করে। আমারও তো ওরকম কিছু করতে হবে। তাই টাকা পয়সা একটু জমাই, তারপর না হয়...!

শয়তানের সেই একই কৌশল, একই চাল, একই বিষ—বারবার আমরা এসবের শিকার হই। বারবার শয়তানের ধোঁকায় পরাস্ত হই। আমাদের বামা-মায়েরাও আজ হারাম ব্যভিচারকে সন্তানদের জন্য সহজ বানিয়ে দিয়েছে, আর হালাল বিয়ে কে বানিয়েছে 'মিশন ইম্পসিবল'। একজন পুরুষের ত্রিশ-বত্রিশ বছর বয়স হয়ে যায়, তারপরও তারা সিঙ্গেল থাকে। আচ্ছা একটা পুরুষের বয়স বত্রিশ বছর কিন্তু অবিবাহিত, সে রাতে কী করে বলে আপনি মনে করেন? কাকে বোকা বানাচ্ছেন? মনে হয় যেন কিছুই বোঝেন না! আপনার মেয়ের বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ পার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসা প্রতিটা লোককে আপনি সরিয়ে দিচ্ছেন। কারণ তারা আপনার একই ফ্যামিলি স্ট্যাটাসের না। বিয়ে কে সহজ করার রাসূল (সা.) এর সেই সুন্নাহ কোথায়? আমি বলছি না ইন্টারনেট ব্যবহার করা খারাপ বা আপনার ছেলে মেয়ে খারাপ? কিন্তু সারারাত একাকী রেখে ইন্টারনেট হাতে তুলে দিয়ে আপনার ছেলেমেয়ের জন্য আপনি শয়তানের দরজা খুলে দিচ্ছেন। একটা না একটা সময় তার এমন জিনিসের দিকে চোখ পড়বেই, যেদিকে চোখ তোলা তার জন্য হারাম। একসময় এমন কাউকে টেক্সট করা হবে, যাকে টেক্সট করা উচিৎ না!

তাও শেষ পর্যন্ত যদি বিয়ে হয়ও, তাদের আকাঙ্ক্ষিত সেই বিরাট জাঁকজমক করে। বিশাল নিকাহ অনুষ্ঠান। কী হয় সেই অনুষ্ঠানে? ভাইরে আমি আসলেই নারী-পুরুষের পর্দা ঠিক রেখে বিয়ের অনুষ্ঠান করতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু সমাজের অবস্থা তো বোঝেনই...তাই একটু এমন করা লাগল আরকি! আল্লাহ জানেন আমার অন্তরে কী আছে। আমার মন পরিষ্কার! সমাজের চাপে পড়ে আমরা বৈবাহিক জীবন শুরুই করলাম হারাম দিয়ে। আর আশা করছি যে তা হালাল পথে শেষ হবে। ভাই, আমি স্বীকার করছি আপনার টাকাপয়সা আছে, আপনি তা খরচ করতেই পারেন। কিন্তু অন্যদের উপর দয়া করুন। আপনার দেখাদেখি অন্যরাও এমন অপচয় করাকে আদর্শ ধরে নেয়। তাদেরও এমন খরচ না করলে চলবেই না বলে ধরে নেয়। তাদের উপর একটু রহম করুন। তাদেরকে অন্তত বাঁচান। আপনি বলতে পারেন, আরে এইটুকু খরচ করা তো হালাল। হ্যাঁ বুঝলাম হালাল। আপনার সে সামর্থ্য আছে। কিন্তু আপনি তো সমাজকে পঙ্গু করে দিচ্ছেন। অন্য অনেকে বাসা ভাড়ার টাকাটা দিতে পারে না, কিন্তু আপনাকে দেখে ভাবছে এত টাকা খরচ না করে বিয়ে করলে সমাজে মুখ দেখানো যাবে না। তাই বাবা-মায়েদের বলছি, উম্মাতের প্রতি দয়া করুন। আপনাদের সন্তানদের প্রতি দয়া করুন। আল্লাহ হলেন রাযযাক। আমরা খরচ কম করলে আল্লাহ আমাদের শাস্তি দেবেন না।

আবার সেই ভাইয়ের কাছে ফিরে যাই। তো বিশাল বিয়ে হলো। বিশাল খরচ। প্রচুর মিউজিক। প্রচুর হারাম। তো ভাই, এখন আপনি মসজিদে যেতে প্রস্তুত? ও আচ্ছা, হ্যাঁ শোনেন ভাই, এখনও হানিমুন বাকি আছে। সে নতুন ঘরে এসেছে, এখনও মানিয়ে উঠতে একটু সময় তো লাগবে। একটু সেন্সিটিভ না এখন বিষয়টা? একটু সময় দিন। আচ্ছা, কত সময় লাগবে আপনার? এই তো ছয় মাস-এক বছর। আচ্ছা এক বছর পরে আসছি!

এক বছর পর... ঠক ঠক ঠক...কে? ও! আরে ভাই, আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন। ওয়ালাইকুম আসসালাম। তো মসজিদে চলেন। মসজিদ? ও আচ্ছা...ভাই আপনি সুসংবাদটা শোনেননি? না শুনিনি তো। কোন সুসংবাদ? আরে সে তো প্রেগনেন্ট! বোঝেনই তো। সে শারীরিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সমস্যা, ওই সমস্যা। বমি হয়। ভাই, আমার একটু তার সাথে থাকা লাগে। এই ঝামেলাটা সেরে যাক, ইনশাআল্লাহ আমি আপনার সাথে আছি। আসব মসজিদে। শয়তানের কৌশলের চক্র চলছেই। ষাট-সত্তর বছর বয়স হয়ে গেল। আপনি এখন বুড়ো। আর আপনার সন্তানেরা আপনাকে ধরে ধরে মসজিদে নিতে হয়। এখন আপনার ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজা সুর হয়তো একটু ভিন্ন হতে পারে। ভাই, অমুক কোম্পানির সাথে একটা চুক্তির কাজ চলছে—এটা একটু শেষ হতে দেন—তারপর ইনশাআল্লাহ্! আমার এত টাকা হবে যে, আমি শুধু মসজিদে আসবই না, আমি নতুন মসজিদ তৈরি করে দেব ইনশাআল্লাহ।

আজ বড় কন্ট্রাক্ট-কাল জরুরি মিটিং-মিটিং এ আবার নারী কলিগ। আপনি সেখানে আল্লাহকে খুশি করার জন্য নারীর সাথে হাত মেলালেন। দেখেন ভাই, আমাদের তো অমুসলিম ভাইবোনদের প্রতি সদয় থাকতে হবে, তাই না? যাতে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া সহজ হয়। তাই সে যাতে অস্বস্তিতে না পড়ে, এজন্যই একটু হ্যান্ডশেক করতে হলো। আপনি গায়রে মাহরামের সাথে হাত মেলালেন আর ভাবছেন তা আল্লাহকে খুশি করে? অথচ রাসূল (সা.) বলেছেন, গায়রে মাহরামকে স্পর্শ করার চেয়ে নিজের মাথায় লৌহ শলাকা গেঁথে দেওয়া বরং ভালো। আর আপনি ভাবছেন এসব করে ইনকাম করা টাকায় বরকত থাকবে? আরে ভাই আমি ইনশাআল্লাহ তাওবা করে নেব—আল্লাহ গাফুরুর রাহীম। আপনি এত কট্টর কেন? এই দাড়িওয়ালা মোল্লাগুলোর সমস্যাটা কোথায়? দ্বীনকে সহজ করুন। এত জটিল বানাচ্ছেন কেন? এটা তো আমাদের বাপ-দাদার দ্বীন, তাই না? ইচ্ছেমতো এতে বাড়ানো কমানো যাবে। আপনার ব্যবসায়িক চুক্তির সুবিধার জন্য কি এখন কুরআনে সংশোধনী আনতে হবে?

তো কন্ট্র্যাক্ট হয়ে গেছে? হ্যাঁ, তবে একটু সময় লাগবে। আচ্ছা কত? এই তো ছয় মাস-এক বছর। আচ্ছা গেল—এখন কী অবস্থা? ভাই, আপনি তো জানেনই না অবস্থা। তারা এখন এত খুশি, তারা আরেকটা কন্ট্র্যাক্ট করতে চাচ্ছে। বিরাট লাভ হবে। এটা হয়ে গেলে আমি দুইটা মসজিদ বানিয়ে দেব, যেখানেই হোক। দেখুন আমাদের অবস্থা। এমন সব হারাম কাজ করে সফল হওয়া মুসলিমের সংখ্যা কত? অনেক ক্লীন শেইভড মুসলিম আছে মিলিয়নেয়ার। বছরে বছরে হজ্ব, ওমরাহ, মাশাআল্লাহ। এটাই শয়তানের চক্র! আমাদের জীবনের মুভির মতো স্ক্রিপ্টের শেষ কোথায়? কী অবস্থা আমাদের? কী হবে আমাদের পরিণতি? ষাট- সত্তর বছর কাটালাম আল্লাহকে ভুলে। আর এখন শেষ সময়ে শয়তান তার পূর্ণ সামর্থ্য নিয়ে আসবে, আর আমরা ভাবছি আমরা বেঁচে যাব। আমি এই ধোঁকাগুলো টের পাচ্ছি কারণ আমিও একসময় এরকম বোকা ছিলাম। এই ধোঁকার চক্রের ভেতর দিয়ে আমিও গিয়েছি।

আমাদের এখন গড় বয়স কত হবে? ত্রিশ? চল্লিশ? বা এর কিছু বেশি? আপনি আপনাকে জিজ্ঞেস করব না এতগুলো বছর কী করেছেন। আপনি নিজেই নিজের এই ত্রিশ-চল্লিশ বছরের জীবনটার দিকে তাকান। উমর (রা.) বলেছেন, তোমাকে বিচার করার আগে নিজেই নিজেকে বিচার কর। নিজের জীবনের দিকে তাকান আর যাচাই করুন জীবনটা কীভাবে কেটেছে। কী অর্জন করেছেন? কী আমল? যেটা দিয়ে আপনি এতই আত্মবিশ্বাসী যে আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হয়ে সেটা পেশ করে বলতে পারবেন, হে আল্লাহ্! আমাকে এই আমলের দ্বারা বিচার করুন?

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) জীবনের শেষ প্রান্তে কুরআন তিলাওয়াত করতেন আর বলতেন, আল্লাহর কসম! যেই জিনিস আমাকে তোমায় হিফয করা হতে বাধা দিয়েছে তা হলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। সালাহউদ্দীন আইউবি (রহ.) কখনও হজ্ব করেননি। জেরুজালেম জয় করেছেন, কিন্তু হজ্ব করা হয়নি। তিনি শেষ জীবনে বলতেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা ছাড়া আর কোনোকিছুই আমাকে হজ্ব করা থেকে বাধা দেয়নি। এখন নিজেদের প্রশ্ন করে দেখি আপনি-আমি কী বলব? কীসে আমাদের সালাত থেকে, কুরআন থেকে, সুন্নাহ থেকে বাধা দিল? চাকরি? ব্যবসা? নারী? গাড়ি? সন্তান? মদ? কীসে বাধা দিল? আপনি আমাকে বোকা বানাতে পারেন, আমি আপনাকে বোকা বানাতে পারি। কিন্তু নিজেকে নিজে অন্তত বোকা বানাবেন না। আমাদের সবাই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, একদিন হুট করে সেই সময়টা চলেও আসবে। আমাদের প্রত্যেকে আল্লাহর সামনে একাকী দাঁড়াব। সেদিন আপনার ছেলে-মেয়ে, পিতা-মাতা, শাইখ কেউ আপনার সাথে থাকবে না। আপনি একা দাঁড়াবেন। রাসূল (সা.) বলেছেন, কবরে মুনকার নাকির যখন আসবেন, তাঁদের কণ্ঠ হবে বজ্রের মতো, চোখ হবে বিদ্যুতের মতো। অপ্রত্যাশিতভাবে কখনো বাজ পড়ার আওয়াজ শুনেছেন? বুড়োরা কেঁপে ওঠে, বাচ্চারা কান্নাকাটি জুড়ে দেয়। চিন্তা করুন আপনি কবরে, মাটির ছয় ফীট নিচে, একা, কেউ নেই, অন্ধকার। এমন সময় দুই ফেরেশতা এলেন বিশাল বিশাল হাতুড়ি নিয়ে। আর তাঁরা কথা বলতে শুরু করলেন বাজ পড়ার মতো শব্দে। তাঁরা আপনাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার রব্ব কে? তোমার নবি কে? তোমার দ্বীন কী? কীভাবে উত্তর দেবেন সেদিন? সাহস আছে? ঈমান, আমলের জোর আছে?

একটি কাহিনী আছে। আমি জানি না এটা সহিহ কি না। রাসূল (সা.) যখন মুনকার নাকিরের কথা বললেন, উমর (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাঁরা যখন আমাকে প্রশ্ন করবে, তখন কি আমি সজ্ঞান থাকব? রাসূল (সা.) বললেন, হ্যাঁ। উমর (রা.) মাথা নাড়লেন, তারপর চলে যেতে লাগলেন। যেন বোঝাতে চাইলেন, আমি যদি সজ্ঞান থাকি তাহলে সমস্যা নেই। তারপর জিবরিল (আ.) ওই সময় উমরের কী অবস্থা হবে তা বর্ণনা করা শুরু করলেন। তিনি (সা.) উমরকে ডাকিয়ে এনে বললেন, আমাকে এই মাত্র জানানো হলো, যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হবে তোমার রব কে, তখন তুমি বলবে আমার রব আল্লাহ্, তোমাদের রব কে? এরপর তুমি বলবে আমার নবি মুহাম্মাদ (সা.), তোমাদের নবি কে? আমার দ্বীন ইসলাম, তোমাদের দ্বীন কী? ফেরেশতারা চলে যাওয়ার সময় ভাববেন আমাদেরকে পাঠানো হলো একে প্রশ্ন করতে, নাকি একে পাঠানো হলো আমাদেরকে প্রশ্ন করতে? এই সেই পুরুষ, তিনি ইসলামকে এমনভাবে মেনেছেন, নবিকে এমনভাবে মেনেছেন, আল্লাহর আনুগত্য এমনভাবে করেছেন, সেই ভয়ঙ্কর সময়েও তাই তাঁর ঈমানের জোর এমনই হবে।

আমি যখন ছোট ছিলাম, এই ফেরেশতাদের কথা শুনে এত ভয় পেতাম যে উত্তরগুলো কাগজে লিখে বারবার মুখস্থ করতে থাকতাম। একজন আমাকে জিজ্ঞেস করল, কী করছ? আমি বললাম, আমি কবরের তিনটা প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করছি। সে বলল, তুমি কি জানো না মৃত মানুষ কথা বলে না? তাহলে কোন অঙ্গ এসব প্রশ্নের উত্তর দেবে? হৃদয়—আর হৃদয় কখনও মিথ্যা বলে না। হৃদয় যদি জানে আপনি টাকার চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভালোবাসেন, হৃদয় এ কথা জানবে আপনার কাজ দেখে। আর যদি টাকাকে বেশি ভালোবাসেন, ফেরেশতারা প্রশ্ন করতে আসলে সে উত্তর দেবে, আমার রব টাকা। আল্লাহ বলেছেন, আমি জিন ও মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছি আমার ইবাদাত করার জন্য? ইবাদাত কী? দাসত্ব। আল্লাহর যেদিকে হাঁটতে বলেন, আমরা সেদিকে হাঁটি; আল্লাহ যেদিকে দৌড়াতে বলেন, আমরা সেদিকে দৌড়াই—এটাই ইবাদাত। কোনো মুসলিমকে গিয়ে যদি জিজ্ঞেস করেন, আচ্ছা ভাই, আপনি কার ইবাদাত করেন? আল্লাহর, নাকি টাকার? সে বলবে, আস্তাগফিরুল্লাহ! আল্লাহরই তো ইবাদাত করব।

ফজরের সালাতের সময় মুয়াযযিন আযান দেন। আমরা আযানকে শুধু সালাতের ওয়াক্তের ঘোষণা মনে করি। আচ্ছা মুয়াযযিন কি বলেন, দাখালা ওয়াক্তিল ফাজর? নাকি হাইয়া আলাস সালাহ, হাইয়া আলাল ফালাহ? তিনি আপনাকে মসজিদে গিয়ে সালাত পড়ার আহ্বান করছেন। কোনো মুয়াযযিন কি এভাবে ঘোষণা দেয়, সম্মানিত এলাকাবাসী! সকলের অবগতির জন্য জানানো যাইতেছে যে অমুক সালাতের ওয়াক্ত হইয়াছে। কাজেই যখনই সময় পান, বস যদি ছুটি দেয়, স্ত্রী যদি পারমিশন দেয়, দয়া করে সালাতটা পড়ে নিয়েন। ঘোষণাটি শেষ হলো। ধন্যবাদ! এমন কি? না! আল্লাহ আপনাকে ফালাহ-সাফল্যের দিকে ডাকছেন। আমরা ফজরের সময় কোথায় থাকি? নাক ডাকি। অথচ সাতটা-আটটায় উঠে কাজকর্মে তো ঠিকই যান। তো কার ইবাদাত করছেন? তাহলে কবরে এই হৃদয় কি নিজের রব হিসেবে আল্লাহ্র নাম বলবে, না টাকার নাম বলবে?

এভাবে কাকে ধোঁকা দিচ্ছেন? আল্লাহকে? না, ধোঁকা দিচ্ছেন নিজেকে। ষাট-সত্তর বছরের জীবন মাত্র। এখানে এই গান-বাজনা-হারাম টাকায় সময় নষ্ট করাটা দুঃখজনক। রাসূল (সা.) বলেছেন, দুনিয়ার জীবনে আমি এক মুসাফিরের মতো। যে পথ চলতে গিয়ে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল। তারপর আবার পথ চলতে শুরু করল। আমরা যে গাছাড়া ভাব নিয়ে জীবনযাপন করছি সেখান থেকে জেগে উঠতে হবে। আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। দুনিয়ার কাজে সাড়া দেওয়ার আগে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিতে হবে। আমি বলছি না আপনাকে রাতারাতি বিরাট মাওলানা হয়ে যাতে হবে। কিন্তু আমাদের অনেক ছোট ছোট পরিবর্তন করার সুযোগ রয়েছে।

এখন অনেকেই হয়তো ভাবছেন কী দিয়ে শুরু করা যায়। আপনার দিন শুরু করুন ফজরের সালাত দিয়ে। রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জামাতের সাথে ফজরের সালাত আদায় করল, সে যেন অর্ধ রাত্রি ইবাদাত করল। অতএব, আমি মসজিদে গিয়ে দিন শুরু করব। ইশার সালাতে মসজিদে গিয়ে দিন শেষ করব। আমার দিন যদি ঠিকভাবে শুরু হয়, ঠিকভাবে শেষ হয়, তাহলে এর মাঝে যা আছে, তা অবশ্যই ঠিক হবে। আপনি যদি ফজর দিয়ে দিন শুরু করেন, ইশা দিয়ে শেষ করেন, তাহলে আপনার জীবনটাই আবর্তিত হচ্ছে সালাতকে ঘিরে। মনে করুন রাতে একটি বিয়ের দাওয়াত আছে। ইশার সালাতের ঠিক আধাঘণ্টা আগে। আপনি কী করবেন? আধা ঘণ্টা দেরি করে যাবেন! এভাবে যদি চলতে থাকে সেখা যাবে সমাজে একদিন বিয়ের দাওয়াতের সময়ই ঠিক করা হবে ইশার সালাতের পর। কারণ ইশার আগে তো কেউ আসেই না! এভাবেই সমাজ পরিবর্তন হয়। একজন মানুষ দিয়েই তা শুরু হয়। অতএব, মসজিদে ফজর, মসজিদে ইশা। মগরিবও হলে তো কথাই নেই। রাসূল (সা.) এর এক সহিহ হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি ফজরের সালাত জামাতের সাথে আদায় করে তারপর সূর্যোদয় পর্যন্ত অবস্থান করে আল্লাহর যিকির করে, তারপর দুই রাকআত ইশরাকের সালাত আদায় করে, সে একটি কবুল হজ্ব ও ওমরার সাওয়াব পাবে।

ফজরের পর কতক্ষণ বসা লাগে তাহলে? এক ঘণ্টা? এখানে তো বেশিরভাগই হানাফি মাযহাবের মসজিদ, এমনিতেই ফজর একটু দেরি করে পড়া হবে। বড়জোর ২০-৩০ মিনিট বসতে হবে। অনেকে নাকি কুরআন পড়ার সময় পায় না। এই ২০-৩০ মিনিট কুরআন পড়ুন। চিন্তা করুন প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিট কুরআন পড়লে এক বছর পর আপনার কুরআনের জ্ঞান কত বেড়ে যাবে! রামাদানে কয় খতম দিতে পারবেন! হজ্ব আর ওমরার সাওয়াব আমাদের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে প্রত্যেক সকালে। আর আমরা নাক ডাকছি। আর মুনাজাতে কান্নাকাটি করি, হে আল্লাহ্! উম্মাতের জন্য নুসরাহ আসে না কেন? ভাবুন তো আপনি ফজর পড়ে, ইশরাক পড়ে দিন শুরু করলেন। আর সেদিন আপনি যদি মারা যান, তাহলে আপনার হৃদয় কি সাক্ষ্য দেবে না যে আল্লাহ্তার রব? সেই সাথে নফল ইবাদাত বৃদ্ধি করুন। যেমন প্রত্যেক ফরয সালাতের পর আয়াতুল কুরসি পড়া। রাসূল (সা.) বলেছেন, যে এই আমল করবে, তার ও জান্নাতের মাঝে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা থাকবে না। এছাড়া যে প্রতি ফরয সালাতের পর ৩৩ বার সুবহানআল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৩ বার আল্লাহু আকবার পড়ে, তারপর 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহ লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির' বলে শেষ করে, তার গুনাহ সাগরের ফেনা পরিমাণ হলেও তা ক্ষমা করে দেওয়া হবে। আজকাল তো আমরা ঠাসঠাস সালাম ফিরিয়েই শেষ করে ফেলি। এরকম ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো আনলেই অনেক পরিবর্তন হয়ে যায়।

📘 এপিটাফ 📄 কবরের তিন শত্রু, তিন বন্ধু

📄 কবরের তিন শত্রু, তিন বন্ধু


আমাদের প্রত্যেকের জীবনে যে বিষয়টা সুনিশ্চিত সেটা হলো মৃত্যু। ধনী-গরীব, কালো-সাদা, রাজা-প্রজা সবাইকেই মরতে হবে। এই দুনিয়াতে মৃত্যুকে কেউ কখনো চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেনি। আমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, আগামীকাল সেটা মূল্যহীন হয়ে যেতে পারে। পরিবার, সন্তান, স্ত্রী, পিতা-মাতা-আগামীকাল সকালে তাদের দেখতে পাব এর কোনো গ্যারান্টি নেই। মোটা বেতনের চাকরী, আলিশান বাড়ি, সুন্দর স্বাস্থ্য-হঠাৎ করে অর্থহীন হয়ে যেতে পারে। এর কোনোকিছুই চিরস্থায়ী নয়, কোনো গ্যারান্টি নেই। দিনশেষে আমাদের সবাইকেই আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে, আর সেদিনের জন্য আমরা কি সঞ্চয় করেছি এটাই গুরুত্বপূর্ণ।

একবার এক ব্যক্তি রাসূল (সা.) কে জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিয়ামত কখন হবে? রাসূল (সা.) সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে লোকটিকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, সেদিনের জন্য তুমি কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছ? অর্থাৎ পরোক্ষভাবে এখানে যে শিক্ষাটা দেওয়া হয়েছে সেটা হলো, কিয়ামত তো নিশ্চিত, এটা হবেই, তাই এটা কবে হবে সেটা জেনে ফায়দা নেই, বরং তুমি সেদিনের জন্য কী সঞ্চয় করেছ, আল্লাহর সামনে কী নিয়ে উপস্থিত হবে সেদিকে মন দাও।

মৃত্যুর ব্যাপারটাও এমনই। এটা নিশ্চিত, কিন্তু আমরা জানি না ঠিক কখন হবে, যেকোনো মুহূর্তে হতে পারে। তাই এক্ষেত্রেও মূল প্রশ্ন মৃত্যু কখন হবে সেটা নয়, বরং মৃত্যুর জন্য আমার প্রস্তুতি কী, মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমার সঞ্চয় কী-এটাই মূল প্রশ্ন। মৃত্যুর পর মানুষের প্রথম পরীক্ষাটা শুরু হয় কবরে। এখানেই মূলত নির্ধারিত হয়ে যায়, কার ভাগ্যে কি আছে। কবরে যাওয়ার পর তিনটা দুশ্চিন্তা এসে মানুষকে গ্রাস করে নেয়, সেই সাথে এই দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করতে তিনটা প্রশান্তি এসে হাজির হয়ে যায়।

১। কবরের সংকীর্ণতা।
কবর থাকে একেবারে সংকীর্ণ। বাইরে থেকে যখন আমরা দেখি তখনই আমরা বুঝি, এই জায়গায় কেউ থাকার মতো না। কোনোমতে লাশের শরীরটা রাখা যায়। পাপাচারীর জন্য এই সংকীর্ণ কবর আরও সংকীর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু মুমিনের জন্য কবরে রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। তাঁর জন্য কবরকে প্রশস্ত করে দেওয়া হয়। রাসূল (সা.) বলেছেন, মুমিন ব্যক্তির জন্য কবরকে এভাবে প্রশস্ত করে দেওয়া হয়, যার দূরত্ব আমার চোখ যতদূর দেখা যায় তার সমান। একজন ব্যক্তি তাঁর চোখে যতদূর দেখতে পায়, এই ছোট্ট কবরটি মুমিনের জন্য ঠিক ততটা প্রশস্ত হয়ে যায়।

২। কবরের অন্ধকার।
কবরে যাওয়ার পর আরেকটি দুশ্চিন্তা হলো এর অন্ধকার। দুনিয়ায় সামন্য কিছুক্ষণ যদি কাউকে ঘোর অন্ধকারে ফেলে রাখা হয়, সে হয়তো ভয়েই মারা যাবে। তাহলে চিন্তা করুন কবরের অন্ধকার কতটা ভয়াবহ। কিন্তু মুমিন বান্দার জন্য এখানেও বিশেষ সুবিধা আছে। কবর সেদিন তাঁর জন্য নূরে নূরান্বিত হয়ে যাবে। কি সেই নূর, কি সেই বিশেষ আলো? এই নূর হলো দুনিয়াতে তাঁর সালাত। সালাত সেদিন অন্ধকার কবরকে আলোকিত করে রাখবে। আর যারা দুনিয়াতে সালাতকে অবহেলা করেছে, ত্যাগ করেছে, তাদের জন্য কবর সেদিন ভয়াবহ অন্ধকারে ছেয়ে যাবে। এবং সেখানে থাকবে কঠিন আযাব। সহিহ বুখারিতে এসেছে, রাসূল (সা.) একবার স্বপ্নে দেখলেন, এক ব্যক্তি চিৎ হয়ে শুয়ে আছে, আরেক ব্যক্তি একটি পাথর নিয়ে সেই ব্যক্তির মাথায় আঘাত করছে, পাথরের আঘাতে মাথা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, সেই চুরমার হওয়া মাথা আবার জোড়া লাগছে, ঐ ব্যক্তি পাথরটি কুড়িয়ে এনে আবার মাথা ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। এবং এভাবেই চলতে থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত। রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, এই ব্যক্তির এমন পরিণতি কী কারণে? সঙ্গী ফেরেশতা জবাব দিল, এই ব্যক্তি কুরআন পড়ত, কিন্তু তার উপর আমল করত না, এবং ফরয সালাত ছেড়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত।

কত মানুষ আজ এভাবে নিশ্চন্তে সালাত ছেড়ে দিয়ে, বে-নামাজী তকমা নিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। কবরে কি অবস্থা হবে এই নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই। কে সেদিন তাদের অন্ধকার কবরে আলো জ্বালাবে? ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেছেন, বান্দা দুইবার আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়। একবার সালাতে, দ্বিতীয়বার হাশরের মাঠে। দুনিয়ার সালাতে যে ঠিকঠাক আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়েছে, তার জন্য হাশরের মাঠে দাঁড়ানোটা সহজ করে দেওয়া হবে। আর দুনিয়ার জীবনে যারা সালাত ঠিক করেনি, অবহেলা করেছে, ছেড়ে দিয়েছে, হাশরের মাঠে দাঁড়ানোটা সেদিন তাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে।

শুধু তাই নয় সর্বপ্রথম হাশরের মাঠে হিসেব নেওয়া হবে সালাতের। এই হিসেবে যে পার পেয়ে যাবে, তার জন্য বাকি হিসেব সহজ হয়ে যাবে। আর দুনিয়ার জীবনে যারা সালাত ত্যাগ করেছে, তাদের হাশর হবে ফিরআউন, হামান ও উবাই ইবনু খালফের সাথে। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি সালাতের হিফাজত করল, সালাত কিয়ামতের দিন তার জন্য জ্যোতি, প্রমাণ ও নাজাতের উসিলা হবে। আর যে সালাতের হিফাজত করল না, সালাত তার জন্য জ্যোতি, প্রমাণ ও নাজাতের উসিলা হবে না এবং ফিরআউন, হামান ও উবাই ইবনু খালফের সাথে তার হাশর হবে।" (মুসনাদে আহমাদ) আর জাহান্নামীদের মধ্যেও এমন লোক থাকবে যারা সালাত ত্যাগ করার কারণে জাহান্নামী হয়েছে। আল্লাহ কুরআনে এসব জাহান্নামীদের সাথে জান্নাতিদের একটি কথোপকথন উল্লেখ করেছেন, “তোমাদেরকে কিসে জাহান্নামে নিক্ষেপ করেছে? তারা বলবে, আমরা নামাজ পড়তাম না।” (সূরাহ মুদ্দাসির, ৪২-৪৩) সুতরাং সালাতই সেই মহান বন্ধু, যে কবর থেকে শুরু করে, হাশরের ময়দান সব জায়গায় আমাদেরকে রক্ষা করবে এবং জান্নাতে নিয়ে যাবে।

৩। কবরের একাকীত্ব।
তৃতীয় যে শত্রু কবরে এসে আমাদেরকে আক্রমণ করবে সেটা হলো একাকীত্ব। পরিবার পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কেউ নেই সেখানে। কিন্তু মুমিন বান্দারের জন্য সেখানে সঙ্গীর ব্যবস্থা থাকবে। সুন্দর চেহারা, উত্তম পোশাক, মনভুলানো সুগন্ধি নিয়ে একজন মুমিন বান্দাকে সঙ্গ দিতে কবরে হাজির হবে। যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কে তুমি? সে জাবাবে বলবে, আমি হলাম দুনিয়াতে আপনার ভালো আমল, আজ আমি আপনাকে সঙ্গ দিতে চলে এসেছি এবং পুনরুস্থানের দিন পর্যন্ত আমি আপনার সাথে থাকব।

এভাবেই কবর কারো জন্য আযাবের কারণ হবে, আর কারো জন্য প্রশান্তি। কারো জন্য কবর হবে এক খণ্ড জাহান্নাম, আর কারো জন্য এক টুকরো জান্নাত। আমরা দুনিয়াতে যে জীবন কাটাচ্ছি, এর প্রেক্ষিতে এবার নিজেকেই প্রশ্ন করি, আমাদের সাথে কবর কেমন আচরণ করতে যাচ্ছে? উত্তরটা আমাদের সবার জানা, তাই না?

📘 এপিটাফ 📄 এয়ারপোর্ট ট্রানজিট

📄 এয়ারপোর্ট ট্রানজিট


রাসূলুল্লাহ (সা.) একবার আব্দুল্লাহ ইবনু উমর (রা)-এর সাথে ছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনু উমরের ডাকনাম ছিল মাজনুনুস সুন্নাহ-সুন্নাতের পাগল। তিনি এতই কঠিনভাবে সুন্নাহ মানতেন যে, একদিন তিনি একদল লোকের সাথে হেঁটে যাচ্ছিলেন। একটা জায়গায় এসে মাথাটা একটু নিচু করে আবার সোজা হলেন। সাথের লোকেরা ভাবল, হয়েছে কী এই লোকের? তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আমার মনে পড়ছে অনেক বছর আগে রাসূল (সা.) এই পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এখানে একটা গাছ ছিল, তার একটা শাখা এত নিচু হয়ে ছিল যে, রাসূল (সা.) মাথা ঝুঁকিয়ে সেটা পার হলেন। আমি এই জায়গা পার করার সময় রাসূল (সা.)-এর সেই কাজটি অনুকরণ না করে পার হতে চাইনি, যদিও গাছটা এখন আর নেই। তিনি পদে পদে রাসূলকে অনুসরণ করেছিলেন।

আব্দুল্লাহ ইবনু উমরের যখন অল্প বয়স, রাসূল (সা.) একবার তাঁর কাঁধ শক্ত করে ধরলেন। আরবদের সংস্কৃতিতে এভাবে কাঁধ ধরার অর্থ, আমি এখন তোমাকে যেটা বলছে চলেছি, সেটা মহা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তো রাসূল (সা.) আব্দুল্লাহ ইবনু উমরের কাঁধ ধরে বলছেন, আব্দুল্লাহ! এই দুনিয়ায় একজন অপরিচিত মুসাফিরের মতো বাস করো। আব্দুল্লাহ বলেন, আল্লাহর কসম, সেইদিন থেকে আমি যখনই সকালে উপনীত হতাম, তখন আর সন্ধ্যায় উপনীত হওয়ার আশা করতাম না। আল্লাহ যদি আমাকে সন্ধ্যায় উপনীত করতেন, তাহলে আল্লাহর কসম, আমি সকাল দেখতে পাওয়ার আশা করতাম না। রাসূল (সা.) মুসাফিরের উপমা দিয়েছেন। সফরে যাওয়ার সময় আপনি আপনার সাথে করে কী নিয়ে যান? আপনি আপনার ঘরবাড়ি মাথায় করে নেন? কেবল একটা ব্যাগ নিয়ে যান। ছোট ব্যাগে না হলে হয়তো বড় কোনো ব্যাগ নেন। অথবা হয়তো আপনার আন্টি আপনাকে কোনো পুঁটলি গছিয়ে দিয়েছেন সেখানে গিয়ে আপনার আঙ্কেলের কাছে পৌঁছে দিতে। ব্যস-এছাড়া আপনি তেমন কিছু নেন না। খালি দরকারি জিনিসগুলো। কোনো ঠাণ্ডা জায়গায় যেতে হলে বড়জোর একটা সোয়েটার নেন। আপনি নিশ্চয় পুরো ওয়ার্ডোব তুলে নিয়ে যান না। রাসূল (সা.) বলেছেন, দুনিয়াতেও আপনার এভাবেই বাস করা উচিৎ। শুধু দরকারি জিনিসগুলো সাথে নেবেন, আর কিচ্ছু না। রাসূল (সা.) নিজের ব্যাপারে বলছেন, এই দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক। এখানে আমি এক মুসাফিরের মতো। যে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল, তারপর উঠে আবার পথ চলতে শুরু করল। এই যে বিশ্রাম নেওয়ার সময়টুকু, এটুকুই দুনিয়া।

আপনি বিদেশে যেতে হলে এয়ারপোর্টে ট্রানজিটে কতক্ষণ অপেক্ষা করেন? বড়জোর তিন-চার ঘণ্টা? রাসূল (সা.) এটাকেই দুনিয়া বলেছেন। ভাবুন এই পৃথিবীটা শাহজালাল বিমানবন্দর। আপনার গন্তব্য কোনো একটা দেশ। মাঝে কিছুক্ষণ বিমান বন্দরে থাকতে হয়েছে। এটাই দুনিয়া। আমাদের সবার গন্তব্য কোথায়? জান্নাত। আচ্ছা চিন্তা করুন শাহজালাল বিমানবন্দরে বসে আপনি আর আমি প্লেনের জন্য অপেক্ষা করছি। আপনি ঘড়ি দেখে বললেন, ফ্লাইটের সময় প্রায় হয়ে এসেছে। আমাদেরকে অত নাম্বার গেটে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। আমি বললাম, আরে এখনই যাবেন? এই এয়ারপোর্টটা দেখেন, কত সুন্দর! কী সুন্দর দোকান-পাট। উফ! আমার ইচ্ছে করছে এখানে একটা বাড়ি করি। তারপর বিয়েশাদি করে এখানেই সেটল হয়ে যাই। আপনি নিশ্চয় আমাকে বলবেন, ভাই, পাগল হয়েছেন? আমাদের ফ্লাইট আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আর আপনি এসব বলছেন। এসব শুনে হয়তো হাসি পাচ্ছে। কিন্তু দুনিয়াতে আমরা এই জিনিসই করছি। অথচ ট্রানজিটে তিন-চার ঘণ্টা সময় আপনার কী করা উচিৎ? বড়জোর হালকা খাবারদাবার খাবেন, টয়লেটে যাবেন, তারপর সময়মতো গিয়ে ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করবেন। এর চেয়ে বেশি কিছু না। ওয়াল্লাহি, চার ঘণ্টা অনেক লম্বা সময়। আমাদের কারো চার মিনিট বাঁচার গ্যারান্টি নেই। অথচ এই দুনিয়াকে আমরা ঘর বানিয়ে ফেলছি। আল্লাহ দুনিয়াকে বানিয়েছেনই এমনভাবে যে, এটা আপনাকে সন্তুষ্ট করতে পারবে না। আল্লাহর কসম, আপনার যত সম্পত্তিই থাকুক না কেন, আপনি কখনই তৃপ্ত হবেন না। আল্লাহ একে বানিয়েছেনই এভাবে। জান্নাত ছাড়া আর কোথাও সন্তুষ্ট হবেন না।

আমরা বিয়ে করি, কাজ করি, ঘর করি, গাড়ি কিনি, পরিবারকে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিই। এগুলো সবই হালাল। জীবনে এগুলোর প্রয়োজন আছে। কিন্তু দ্বীনকে জবাই করার বিনিময়ে নয়। কক্ষণো দুনিয়াকে দ্বীনের আগে স্থান দেওয়া যাবে না। আমাদের কত মুসলিম ভাই কাজের কারণে সালাত মিস করে? কারণ বস যেতে দেন না। অথবা ইউনিভার্সিটি ক্লাসের জন্য। তারা ক্লাসের জন্য সালাত মিস করে। কারণ টিচার যেতে দেন না। মুসলিম, অথচ এমন চাকরিতে ঢুকছে যেখানে দাড়ি রাখতে দেয় না। মনে মনে সে ঠিকই চায় দাড়ি রাখতে। যারা রাখতে চায় না, তাদের কথা আলাদা। কিন্তু যারা রাখতে চায়, তাদের অনেকেই চাকরির দোহাই দেয়। ভাই দেখেন, আমি এমন অমন চাকরি করি। এখানে এটা ঠিক মানায় না। আমরা কি সত্যিই আল্লাহর ইবাদাত করি, না চাকরির? আমরা যখন বলি কেউ টাকার ইবাদাত করে, তখন মানুষ ভাবে সে মনে হয় মেঝেতে একটা একশ টাকার নোট রেখে তাতে সিজদা দেয়। নাহ! ইবাদাত করা মানে আনুগত্য করা। বস আপনাকে বলেছেন সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠতে, আল্লাহ বলেছেন সাড়ে পাঁচটায় উঠতে। আপনি সাতটায় উঠলেন। কার আনুগত্য করলেন? আল্লাহ বলেছেন সালাত পড়ো, টিচার বললেন সালাত পড়ো না। আপনি পড়লেন না। কার আনুগত্য করলেন? আল্লাহর, না দুনিয়ার? এটাই আজ আমাদের বাস্তবতা।

এই দুনিয়ার কিছুই আপনি নেবেন না। আপনে যে-ই হোন না কেন, আপনার যত বাড়িই থাকুক না কেন। যত কিছু ইচ্ছা ভোগ করে নিন, কিন্তু একদিন আপনি মারাই যাবেন। যাকে ইচ্ছা ভালোবাসুন, কিন্তু একদিন আপনি পৃথক হবেনই। যা ইচ্ছা জমা করুন, কিন্তু একদিন আপনি আল্লাহর কাছে এর হিসাব দিতেই হবে। দুনিয়াকে এর বাস্তবতা স্বীকার করে নিন। আজ আপনি যুবক শক্তিশালী, কাল হাঁটুতে ব্যথা, পাকা চুল। পরশু আপনি নেই। আলিমগণ একটি চমৎকার উপমা দিয়ে থাকেন। তাঁরা বলেন, দ্বীনকে মনে করুন একটি সূর্য। আর আপনার ছায়া হলো দুনিয়া। আপনি সূর্যকে পেছনে রাখলে, মানে দ্বীনকে পেছনে ফেললে, ছায়া আপনার সামনে থাকবে। এরপর আপনি ছায়ার পিছে যতই দৌড়ান, একে আপনি ধরতে পারবেন না। কিন্তু দ্বীনকে যদি সামনে রাখেন, তাহলে ছায়া থাকবে আপনার পেছনে, মানে দুনিয়া থাকবে আপনার পেছনে। কিন্তু এটা আপনার থেকে পৃথক হতে পারবে না। আপনার সাথেই সেঁটে থাকবে। এটা আপনার পেছন পেছন দৌড়াবে। আর এভাবেই আল্লাহকে উদ্দেশ্য বানালে দুনিয়া আপনার পেছনে দৌড়াবে, আপনাকে দুনিয়ার পেছনে ছুটতে হবে না।

আমাদের উচিত দুনিয়ার এসব বাস্তবতা নিয়ে বেশি বেশি কথা বলা। দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসাকে অন্তরে শেকড় গাড়তে না দেওয়া। যখনই কিছু একটা আকর্ষণ করতে শুরু করবে, তখনই তার শেকড় কেটে দেবেন। জিহাদ শেষে সাহাবাগণ গনীমতের মাল সংগ্রহ করতেন। সাহাবাগণ সেই গনিমত সংগ্রহের পর একজন আরেকজনের সাথে বিনিময় বা বেচাকেনাও করতেন। এমন এক যুদ্ধের পর এক সাহাবি প্রচুর টাকাপয়সা কামাই করলেন। তিনি এসে রাসূল (সা.)-কে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ আমার চেয়ে সফল কেউ নেই। রাসূল (সা.) টের পেলেন যে ওই সাহাবির দুনিয়াবি সম্পদের প্রতি আকর্ষণ চলে আসছে। তিনি বললেন, না! তোমার চেয়েও সফল মানুষ আছে। সাহাবি বললেন, না, না। আমি উকায বাজারে গিয়েছি। দেখেছি আমার চেয়ে বেশি টাকা কেউ কামায়নি। রাসূল (সা.) বললেন, ফজরের আগের দুই রাকআত সালাত দুনিয়া ও এর ভেতর যা আছে, সে সবকিছু থেকে উত্তম। আজকে আপনি আপনার দামি গাড়িটা কোথাও পার্ক করে রাখলেন। সকালে এসে দেখলেন কেউ গাড়িটার বডিতে একটা আঁচড় দিয়ে গেছে। আপনার মনটা জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাবে! অথচ ফজরের সালাত চলে যাচ্ছে ঘুমের ঘোরে, আমাদের কোনো ভাবলেশ নেই। ফরয তো পরে, যেখানে ফজরের সুন্নাতেরই এত মর্যাদা, সেই ফজর ফেলে আমরা কাকে ধোঁকা দিচ্ছি? এই ফজর মিস গেলে কয়জনের মন কাঁদে? এটাই দুনিয়ার বাস্তবতা। দুনিয়া আমাদের অন্তর থেকে এভাবেই দ্বীনকে নিংড়ে বের করে দিয়েছে।

📘 এপিটাফ 📄 একদিন তারা একত্রিত হবে

📄 একদিন তারা একত্রিত হবে


মুসলিমদের আজ এই করুণ দশা কেন, এমন প্রশ্ন যদি জিজ্ঞেস করা হয় তাহলে কেউ কেউ বলবে, আমাদের ইলমের অভাব! কিন্তু না, আজকের যুগে ইলম অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে সবচেয়ে সহজলভ্য। লক্ষ্য লক্ষ্য কিতাব, মাদ্রাসা, হাফিয, তালিবুল ইলম, আলিম ওলামা-কোনো কিছুর অভাব নেই। মানুষের হাতে হাতে মোবাইলে, ল্যাপটপে ইলম ঘুরছে। আমাদের আজকের এই অবস্থার কারণ, আমাদের মাঝে আজ রিজাল-সত্যিকারের পুরুষরা নেই। উম্মাহর পুরুষরা তাদের 'পৌরুষ' হারিয়ে ফেলেছে। আর উম্মাহ যখন পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে, এতে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয় এর নারী আর শিশুদের। আজকে আমাদের অবস্থাও ঠিক তাই। সারাবিশ্বে তাকিয়ে দেখুন, উম্মাহর নারী আর শিশুরা আজ অসহায়, নির্যাতিত। কারণ পুরুষরা তাদের দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা সমাজের মানদণ্ডে 'পুরুষ' হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, "while the cat's away, the mice will play". আজকে এটাই উম্মাহর অবস্থা। পুরুষরা হারিয়ে গেছে, আর কাফিররা এই উম্মাহকে নিয়ে খেলতে শুরু করেছে। ভাগ ভাটোয়ারা করে নিচ্ছে নিজেদের মধ্যে। যার যেখানে খুশি সেখানে জুলুমের বুট ধাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, - 'শীঘ্রই মানুষ তোমাদেরকে আক্রমন করার জন্য আহবান করতে থাকবে, যেভাবে মানুষ তাদের সাথে খাবার খাওয়ার জন্য একে-অন্যকে আহবান করে'। সাহাবিরা এটা শুনে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। কারণ সেসময় মুসলিমরা সংখ্যায় অল্প, তারপরও তাঁরা চারদিক জয় করছে, অমুসলিমরা তাদেরকে সমীহ করছে। তাই সাহাবিরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! 'তখন কি আমরা সংখ্যায় কম হবো?” আমরা কি সংখ্যায় তখন এতটাই নগণ্য হবো যে নিজেদের রক্ষাই করতে পারব না? রাসূল (সা.) বললেন, -'না, বরং তোমরা সংখ্যায় হবে অগণিত কিন্তু তোমরা সমুদ্রের ফেনার মতো হবে, যাকে সহজেই সামুদ্রিক স্রোত বয়ে নিয়ে যায় এবং আল্লাহ তোমাদের শত্রুর অন্তর থেকে তোমাদের ভয় দূর করে দিবেন”

বিস্মিত সাহাবিরা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। সমুদ্রের ফেনার মতো মুসলিমদের সংখ্যা, এত অগণিত, অথচ এত করুণ অবস্থা হবে তাদের? তাঁরা জিজ্ঞেস করল, কেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! কেন আমাদের এই করুণ অবস্থা হবে? রাসূল (সা.) জবাব দিলেন, –আল্লাহ তোমাদের অন্তরে আল-ওয়াহহান ঢুকিয়ে দেবেন'। 'ওয়াহহান' শব্দটা আরবদের কাছে পরিচিত ছিল না। তাই তাঁরা আবার জিজ্ঞেস করল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল ওয়াহহন কী?' রাসূল (সা.) বললেন, -'দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা এবং কিতালকে (আল্লাহর পথে যুদ্ধ) অপছন্দ করা'।⁶

আবু দাউদে সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য একটি সহিহ হাদিসে 'ওয়াহহান' শব্দের অর্থ বলা হয়েছে- “দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করা"⁷

এই হাদিস আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এতটাই বাস্তব, এতটাই প্রাসঙ্গিক, মনে হয় যেন ১৪০০ বছর আগে নয়, মাত্রই গত সপ্তাহে হাদিসটা নাযিল হয়েছে। সাহাবিরা এই হাদিস শুনে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন, কারণ তাঁরা তাদের চারপাশের বাস্তবতার সাথে এর প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। কিন্তু আজ আমরা এটা শুনে, নিজেদের সাথে মিলিয়ে দেখে, সহজেই বুঝে ফেলতে পারি, ১৪০০ বছর আগে এই হাদিস দিয়ে রাসূল (সা.) কী বুঝিয়েছিলেন। রাসূল (সা.) দুনিয়ার উপমা দিয়েছিলেন কান কাটা মরা ছাগলের সাথে—যেটা পচে গিয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। উম্মাহর পুরুষরা আজ সেই কান কাটা মরা ছাগলের পেছনে হাঁপানো কুকুরের মতো ছুটছে। ওয়াল্লাহি! ওয়াহহান—দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা—আমাদের 'পৌরুষ' কেড়ে নিয়েছে। এই উম্মাহকে বিকলাঙ্গ করে ছেড়েছে।

টিকাঃ
৬. মুসনাদে আহমদ, খন্ড-১৪, হাদিস-৮৭১৩
৭. আবু দাউদ: ৪২৯৭ (শাইখ আলবানি সহিহ বলেছেন)

ফন্ট সাইজ
15px
17px