📄 কেন দুআ ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে
মুসলিমদের উপর আপতিত অত্যাচার, নির্যাতনের সময় একটি রেডিমেইড সমাধান থাকে তাদের জন্য দুআ করা। সেই সাহাবিদের সময় থেকে পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত দুআকে একটি শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এবং মুমিনের এই দুআর বদৌলতে কত বড় বড় জালিম ধরাশায়ী হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। নবিজি (সা.) বদরের প্রান্তরে আবেগতাড়িত হয়ে যে দুআ করেছিলেন, আসমান থেকে ফেরশতারা নেমে এসেছিল। এমনকি খোদ জালিমরাও মুমিনের দুআকে ভয় করত। খলিফা মু'তাসিমের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বাগদাদবাসীর পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি যখন গিয়ে বলল, তোমার অত্যাচার বন্ধ করো নইলে আমরা তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। খলিফা মু'তাসিম নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের মুখে যুদ্ধের কথা শুনে হেসে বলেছিল, তোমরা করবে আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ, অথচ আমার কাছে আশি হাজার সশস্ত্র সৈন্য আছে। তখন প্রতিনিধি বলল, আমরা আপনার বিরুদ্ধে 'রাত্রি বেলার তীর' (তাহাজ্জুদ সালাতে আল্লাহর কাছে করা দুআ) দিয়ে যুদ্ধ করব। এই শুনে খলিফা মু'তাসিম বলেছিল, আমি এই ভয়ঙ্কর তীরের মুখোমুখি হতে পারব না।
এখন তো আমরা সব জানি, কোন দুআ পড়লে কি হবে, কোন সময় কি দুআ পড়বে হবে তা এখন মোবাইল এপের মাধ্যমে সবার হাতে হাতে। একটা আঙুলের টিপ দিলেই যখন যে দুআ চাই সেটা চোখের সামনে চলে আসে। প্রতি বছর হজ্জে গিয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ আল্লাহর কাছে কাঁদে। ফিলিস্তিনের জন্য কাঁদে, সিরিয়ার জন্য কাঁদে, মুসলিম উম্মাহর জন্য দুআ করে। আল্লাহ কি আমাদের দুআ শোনেন না? তিনি দেখেন না, এতগুলো মানুষ চোখের পানি ফেলছে? হ্যাঁ, তিনি শোনেন, দেখেন! তাহলে এই দুআ কোথায় যায়? এর কোনো প্রভাব নেই কেন?
এই দুআ বিফলে যাওয়ার প্রধান কারণ আমাদের মধ্য থেকে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করার আমল হারিয়ে যাওয়া। অন্যায়, অবিচার, ফাহিশা কাজে চোখ সয়ে যাওয়া। হাদিসটা এসেছে জামে আত তিরমিযিতে, শাইখ আলবানি এটাকে সহিহ বলেছেন। নবিজি (সা.) বলেছেন, 'তোমরা অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে। অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের প্রতি শাস্তি নাযিল করবেন।'
কি সেই শাস্তি? নবিজি (সা.) বলেন, 'তোমরা আল্লাহর কাছে হাত তুলে দুআ করবে কিন্তু তিনি তা কবুল করবেন না।' আর রহমান যদি কারো দুআ কবুল না করেন, তার জন্য এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কি হতে পারে! সমস্ত মুসলিম উম্মাহ আজ এই শাস্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে দুআ থাকার পরও আমরা কেন বিপদে পড়ে যাই, এর সুন্দর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন শাইখ উমর আল আশকার (রহ.)। তিনি বলেন, 'আল্লাহর সাহায্য চাওয়াটা যোদ্ধার হাতের তরবারির মতো। তার বাহু শক্তিশালী হলে এই তরবারি দিয়ে সে শত্রুকে হত্যা করতে পারবে। আর বাহু দুর্বল হলে ধারালো তরবারি দিয়েও শত্রুর গায়ে আঁচড় দেওয়া যায় না।' তাই আমাদের উচিত নিজেদের পাপের ব্যাপারে ভীত হওয়া, নিজেদের নিষ্ক্রিয়তা, নীরবতা নিয়ে ভীত হওয়া। সেই অবস্থার কথা চিন্তা করে ভীত হওয়া, যখন আমরা আর রহমানের কাছে হাত তুলে দুআ করব, কিন্তু সেই দুআ কবুল করা হবে না। আমাদের উচিত আমাদের ঈমানকে মজবুত করা, যাতে আমাদের দুআ এতটা শক্তিশালী হয় যে তা আরশ মহলে গিয়ে পৌঁছায়। যে দুআর শক্তিতে আসমান থেকে আবাবিল পাখি নেমে আসবে। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফিক দান করুন। আমীন।
📄 বলিউড— মুখোশের আড়ালে
“আজকের সব কিশোরী মেয়েরাই রুমের আয়নায় নিজেকে দেখে হয়তো ভাবে কেন সে দেখতে সিলেব্রেটিদের মতো নয়। শোনো হে মেয়ে, এটা আমাদের কারো আসল চেহারা নয়, আমরা কেউ এভাবেই ঘুম থেকে উঠি না, কোনো অভিনেত্রীই এমন না। প্রতিটি পাবলিক এপেয়ারেন্সের আগে আমাকে ৯০ মিনিট মেকআপ চেয়ারে বসে থাকতে হয়। আমার চুল ঠিক করা আর মেকাপ ঠিক করার পেছনে ৩-৬ জন মানুষ কাজ করে। একজন পেশাদার বিউটিশিয়ান আমার নখ নিয়ে কাজ করে। প্রতি সপ্তাহে আমার আইব্রো প্লাগ করতে হয়, থ্রেডিং করতে হয়। মুখের দাগ আর ডার্ক স্পটগুলো আড়াল করার জন্য আমার শরীরে বিশেষ কসমেটিকের ব্যবহার হয়।
প্রতিদিন সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠে সাড়ে সাতটায় আমি জিমে চলে যাই। সেখানে ৯০ মিনিট ধরে এক্সারসাইজ করি, কখনও সন্ধ্যায় আবার কখনও ঘুমানোর আগেও এভাবে চলে। আমি কি খাব আর কি খাব না এটা ঠিক করার জন্য একজন ফুল টাইম লোক নিয়োগ করা আছে। যতটুকু আমি খাই, তার চেয়ে বেশি আইটেমের মেকআপ আমার মুখে লাগাতে হয়। আমার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ও আকর্ষনীয় পোশাকটি বাছাই করার জন্য একটি টীম সবসময় নিযুক্ত থাকে।
এতকিছুর পরও আমি যথেষ্ট নিখুঁত হতে পারি না। এরপর আছে ফটোশপের দারুণ সব কারসাজি। একথা আমি আগেও বলেছি, আবারও বলছি, যে অভিনেত্রীকে পর্দায় দেখে তুমি ঈর্ষায় ভাজা ভাজা হয়ে যাচ্ছ, তাকে এরকম বানাতে একটা বিশাল টীম, কাড়ি কাড়ি টাকা, প্রচুর সময় দরকার হয়। এর কোনোকিছুই বাস্তব নয়, এটা এমন কিছু নয় যা তোমাকেও অর্জন করতে হবে। এটা এক আর্টিফিশিয়াল জগৎ।”
উপরের এই কথাগুলো এক বলিউড অভিনেত্রীর— যাদেরকে দেখে আজকালকার মেয়েরা ভাবে, ইশ! যদি তাদের মতো হতে পারতাম! রংচঙা সেলুলয়েডের পর্দায় শরীর দেখিয়ে বেড়ানো এই অভিনেত্রীরা যে মুখোশ পরে আছে, সেটা আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। মরীচিকার মতো আমরা কেবল তার পেছনে ছুটে মরি। অথচ মুখোশটা খুলে রাখলে আয়নায় দাঁড়িয়ে তাদের চেয়ে তোমার নিজেকে আরও বেশি সুন্দর মনে হবে, বিশ্বাস করো! তুমি নিজেকে দেখে আঁতকে উঠবে না।
চোখ ধাঁধানো আলোর সেই কৃত্রিম গ্ল্যামার তোমাদের সুখ কেড়ে নিচ্ছে! হীনমন্যতায়, ঈর্ষায়, তাদের মতো হতে চাওয়ার চেষ্টায়— নিজেদের সত্তাটাই ভুলে যাচ্ছ। আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে ছোট করছ। অথচ চোখ ধাঁধানো আলোতে থাকা ঐ মুখোশওয়ালীদের নিজেদের বলতে কিছুই নেই। আর যাদের নিজের কোনো সত্তা নেই, মুখের উপর পরে থাকা মুখোশটা ছাড়া কোনো অস্তিত্ব নেই, তাদের জন্য কিনা তোমরা নিজেদের জীবনটাকে ছোট করে দেখছ?
টিকাঃ
৫. এটা এক বলিউড অভিনেত্রীর লেখা অবলম্বনে লেখা হয়েছে। সাজিদ ইসলাম
📄 প্রতিটি মানুষই স্পেশাল
আল্লাহ্ আমাদের যা দিলেন, এর বিনিময়ে আমরা কী করেছি? আল্লাহ আপনাকে কী জন্য সৃষ্টি করেছেন? খেল-তামাশার জন্য? আল্লাহ যেকোনো উদাহরণের ঊর্ধ্বে। শুধু বোঝানোর জন্য বলি। আপনার কি মনে হয় আল্লাহর কোনো কাজ করার ছিল না? তাঁর খুব বোরিং লাগছিল, তাই তিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন? বিনোদনের জন্য? ওয়াল্লাহি! এ আপনার ভাগ্য যে আল্লাহ আপনাকে সৃষ্টি করে সম্মানিত করেছেন, আপনাকে মুসলিম বানিয়েছেন। আর আমরা ভুলে বসে আছি আমরা কেন এখানে। আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদাত করার জন্য, তাঁকে জানার জন্য, তাঁকে মানার জন্য, তাঁর কাছে চাওয়ার জন্য, অন্যদেরকে তাঁর দিকে ডাকার জন্য। আপনি কে, আগে কী পাপ করেছেন, দুনিয়া আপনার নামে কী বলে, এসব বিবেচ্য না। আপনি আল্লাহর কাছে স্পেশাল। আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসেন। আপনিই সেই ব্যক্তি যে পৃথিবীকে পাল্টাতে পারেন। আল্লাহর সাহায্যে আপনি একাই পারেন দুনিয়াকে অন্ধকার থেকে বের করে আল্লাহ ও ইসলামের আলোর দিকে নিয়ে যেতে। আপনার নিজের প্রতি আস্থা রাখতে হবে। কেউ যেন আপনাকে পেছন থেকে টেনে ধরতে না পারে, আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিতে না পারে। আপনি স্পেশাল। কারণ স্বয়ং আল্লাহ আপনার স্রষ্টা।
আজ পৃথিবী সুখ খুঁজছে। অধিকার খুঁজছে। নারী অধিকার খুঁজছে। আমি আমার জীবনে এত আবর্জনা শুনিনি। তাদেরকে বলা হচ্ছে তারা যত পুরুষদের মতো হতে পারবে, তারা ততই স্বাধীন, ততই অধিকারসম্পন্ন। আল্লাহ্ বলছেন, না! আমি তোমাদের যেভাবে সৃষ্টি করেছি, যেভাবে আকৃতি দিয়েছি, সেভাবেই তুমি উত্তম। আমি এ অবস্থায়ই আমার বান্দা-বান্দীদের ভালোবাসি। আপনি যা নন, আল্লাহ চান না আপনি সেটা হোন। আপনি এমনিই স্পেশাল, আপনি মুসলিম, আপনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উম্মাত।
চারপাশে দেখুন। উম্মাহর সাথে কী হচ্ছে, মুসলিমদের সাথে কী হচ্ছে। অন্য কোনো ধর্ম, অন্য কোনো দ্বীন, অন্য কোনো ব্যবস্থা, অন্য কোনো পথকে যদি এইভাবে আক্রমণ করা হতো, যেভাবে ইসলামকে আক্রমণ করা হয়, সেগুলো বহু যুগ আগেই ধ্বংস হয়ে যেত। অথচ ইসলাম এখনও মাথা উচু করে আছে, এখনও ছড়াচ্ছে। আল্লাহ আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন, ফেরেশতারা অপেক্ষা করছেন, এই উম্মাহ অপেক্ষা করছে যে, আপনি জেগে উঠে আল্লাহর দিকে ফিরে আসবেন। মন থেকে অহংকার ঝেড়ে ফেলুন। আল্লাহর দিকে ফিরে আসুন। ক্ষমার দিকে ফিরে আসুন। আপনি যদি কেবল বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ্ আপনার জন্য পাহাড়কে চলমান করে দিতেন। সেই একই আল্লাহ, যিনি মূসা (আ.) এর জন্য সাগর দ্বিখণ্ডিত করেছেন, যিনি রাসূল (সা.) এর জন্য চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করেছেন, যিনি উমর (রা.) জমিনে আঘাত করার পর ভূমিকম্প থামিয়ে দিয়েছেন। সেই একই আল্লাহ যিনি ঈসা (আ.) এর জন্য মৃতকে জীবিত করেছেন। যিনি নীল নদকে আবার প্রবাহিত করেছেন। সেই আল্লাহ আপনার পরবর্তী দুআর জন্য অপেক্ষা করছেন। আমাদেরকে সেই ঈসা (আ.), মূসা (আ.), মুহাম্মাদ (সা.), উমরর পদাঙ্ক ধরে চলতে হবে। তারপর দেখুন আল্লাহ তাঁদের জন্য যা করেছেন, আপনার জন্যও তা করে দিচ্ছেন। দেখুন আল্লাহ করেন কি না! আল্লাহর কসম! আল্লাহ্ আমাদেরকে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। খাওয়া, ঘুমানো, যৌনক্রিয়া করা, গাড়ি হাঁকানো, কেবল এসবই আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য না। আমরা পশু নই।
জীবন একটাই। এতে দ্বিতীয়বার ফিরে আসা যায় না। জীবনটা নিয়ে কিছু করুন। ভিড়ের মধ্যে সাধারণ আরেকটি চেহারাই কেবল থাকবেন না। আরেকটি সংখ্যাই কেবল হবেন না। এমন কেউ হোন যে মানবতার জন্য কোনো অবদান রাখে। এমন কেউ হোন, যে পার্থক্য গড়ে দেয়। আপনি কি হাশরের মাঠে নবিজি (সা.) এর সাথে থাকতে চান না? সত্যিই? আপনি কি সাহাবাদের সঙ্গী হতে চান না? যে জীবন আপনি পার করছেন, এর মাধ্যমে কি সত্যিই তা সম্ভব? তাঁরা যা কুরবানি করেছেন আর আপনি যা কুরবানি করেছেন, তারপরও কি তাঁদের সাথে আপনার একই স্তরের জান্নাতে থাকা সমীচীন? ওয়াল্লাহি, না। গা ঝাড়া দিয়ে উঠন। আল্লাহর দিকে ফিরে আসুন। মসজিদের দিকে আসুন। কুরআনের দিকে আসুন। সালাতের দিকে আসুন। শুরু করুন, আজ থেকেই। আল্লাহ আপনার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন।
আপনার কাছে মনে হতে পারে দানের বাক্সে একটা টাকা রেখে কী লাভ হয়। সেই টাকা পরে হয়তো কোনো কম্বল কেনার কাজে লাগে। সেই কম্বল নিয়ে কেউ শীতার্ত অঞ্চলে যায়। এই কম্বল দিয়ে কোনো অভাবী গা ঢাকে। আপনি মানবতার কাজে লাগলেন। চিন্তা করুন এমন মানুষের মর্যাদা কোথায়, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে! তাকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে। যে মানুষের মনে আল্লাহর ভালোবাসা পুনরায় জাগিয়ে দেয়। আপনিও তাদের একজন হোন। ওয়াল্লাহি! এই পৃথিবী আশা হারিয়ে ফেলেছে। মানুষ আশা হারিয়ে ফেলেছে। এমনকি মুসলিমরাও। আর, মাঝেমাঝে মানুষকে কেবল আল্লাহর দিকে আহবান করলেই বিরাট পরিবর্তন আসে। কিন্তু কে করবে এটা? আপনাকেই করতে হবে। আপনার পরিচিত আরো হাজারটা মানুষের কাছে যান। তাদেরকে আল্লাহর দিকে ফেরত আসার জন্য ডাকুন। এই পৃথিবীতে বিজয় পাওয়া যাবে শুধু আল্লাহর দ্বীনের মাধ্যমে। মানুষ বলে, এখন আমরা অনেক কঠিন সময়ে বাস করি। এই সমস্যা, ওই ঝামেলা। আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন, আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। রাসূল (সা.) এর সহিহ হাদিসে আছে, আমি তোমাদের কাছে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতদিন এ দুটি জিনিস আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাহ। সেটা যেই যুগেই হোক না কেন, আপনার নিজের বুঝ অনুযায়ী নয়, যেভাবে রাসূল (সা.) ও সাহাবাগণ কুরআন ও সুন্নাহকে বুঝেছিলেন, সেই বুঝ নিয়ে কুরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরে থাকলে আপনি কখনওই পথভ্রষ্ট হবেন না। আপনার বুঝের কুরআন-সুন্নাহ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। আর আল্লাহর রাসূল যেই কুরআন-সুন্নাহ নিয়ে এসেছেন, তা মানবতার জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। এর মাধ্যমেই পরিবর্তন সম্ভব।
📄 যে মৃত্যু মদিনাতেই লেখা ছিল
আমরা আমাদের ভাই খোদর কেঞ্জকে হারিয়েছি। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। দুই দিন আগেও আমি তার সাথে ছিলাম। একসাথেই আমরা মক্কায় ওমরাহ সম্পন্ন করেছি। এরপর সে মদিনায় চলে যায়। মসজিদে নববিতে জোহরের সালাতে সে ইমানের ঠিক পেছনেই ছিল। এরপরও প্রায় দুই ঘন্টা সেখানে সে কাটিয়েছে মহান রবের ইবাদাতে। দিনের শেষে হঠাৎ করে সে বুকে ব্যথা অনুভব করা শুরু করে। অবস্থা খারাপ হলে সে সেখানেই শুয়ে পড়ে। চারপাশে সে সময় তার পরিবারের সদস্যরা তাঁকে ঘিরে ছিল। সময়টা তখন মাগরিবের সালাতের ঠিক আছে, মুয়াজ্জিনের আযান শুরু হয়েছে। সে কালিমা উচ্চারণ করতে থাকে, এবং সে অবস্থায় আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত মদিনাতেই তাঁর এই বান্দার জন্য মৃত্যুর সময়টা নির্ধারণ করে দেন। মাত্রই ওমরাহ শেষ করে, নবিজির রওজায় দুই ঘন্টা ইবাদাতে কাটিয়ে, মাগরিবের ঠিক আগে, যখন আযান হচ্ছিল, শাহাদা উচ্চারণ করতে করতে আমাদের এই ভাই দুনিয়ার সাথে তাঁর সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে বিদায় নিয়েছেন। বাকী কবস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়েছে—যে বাকীর বাসিন্দাদের জন্য স্বয়ং নবিজি (সা.) দুআ করেছেন। কী সৌভাগ্যময় এক মৃত্যু! যে মৃত্যুকে সত্যিই ঈর্ষা করতে হয়।
তাঁর এই মৃত্যু ভাগ্যক্রমে ঘটে গেছে এমন কিন্তু না। আল্লাহর কসম আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আমি দেখেছি দিনের পর দিন সে এমন এক মৃত্যুর জন্য কী পরিশ্রমটাই না করেছে। আমি দেখেছি এমন এক মৃত্যুর জন্য সে কতটা আন্তরিকতার সাথে কাজ করেছে, এবং তাঁর এই আন্তরিক চাওয়া মহান আল্লাহর কাছে কবুল হয়েছে বিধায় আলাহ তাকে এমন এক মৃত্যু দিয়ে সম্মানিত করেছেন। বছরের পর বছর আমি তাকে দেখেছি মসজিদে জামাতের সাথে ফজরের সালাতে দাঁড়াতে। নামাজ শেষে সকাল ৯টা পর্যন্ত এই মানুষটা মসজিদের এক কোণায় বসে কুরআন মুখস্থ করার চেষ্টা করত। বছর খানেক আগে সে কুরআন মুখস্থ করার মনস্থির করে। কুরআন মুখস্থ করার জন্য তাঁর চেষ্টা, তাঁর মেহনত ছিল দেখার মতো। তাঁর জন্য এটা খুব কঠিন ছিল। কিন্তু সে কখনো হাল ছাড়েনি। আমি দেখেছি পুরো এক সপ্তাহ জুড়ে সে কেবল একটা লাইন মুখস্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। একটা লাইন থেকে একটা আয়াত, এরপর অর্ধেক পৃষ্ঠা... এভাবে সে দিন রাত আল্লাহর কিতাব হিফয করার জন্য মেহনত করেছে। এরপর কুরআন হিফয করার এই ইস্পাত কঠিন স্বপ্ন নিয়ে সে সাউথ আফ্রিকা চলে যায়, সেখানে ফুলটাইম হিফযখানায় ভর্তি হয়ে নিজেকে পুরোপুরি কুরআনের পেছনে নিয়োজিত করে।
কয়েক মাস আগে তাঁর মা মারা গেছে। মায়ের শেষ সময়টুকুতে পুরোটা সময় সে তাঁর মায়ের সেবায় নিয়োজিত ছিল। এমনকি মায়ের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের সময়টাতেও। মানুষের সুন্দর মৃত্যু হঠাৎ ভাগ্যক্রমে হয়ে যায় না। এটার জন্য আপনাকে মেহনত করতে হবে। আন্তরিকভাবে চাইতে হবে মহান আল্লাহর কাছে। যদি আপনি আন্তরিক হোন এবং দুনিয়ার এই জীবনে মহান আল্লাহর আনুগত্যে নিষ্ঠার সাথে দৃঢ় থাকেন, তবে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত আপনাকেও এমন সম্মানের মৃত্যু দান করবেন, যেভাবে তিনি আমাদের ভাই খোদরকে দান করেছেন।
আসুন আমরা এবার নিজেদের প্রশ্ন করি, আমাদের দিনগুলো কীভাবে অতিবাহিত হচ্ছে? কীভাবে কেটে যাচ্ছে আমাদের রাতগুলো? কেমন মৃত্যুই বা আমাদের কপালে লেখা আছে? প্রশ্নগুলো নিজেই নিজেকে করুন। আপনার মৃত্যু কেমন হবে সেটা নির্ভর করছে আজকের দিনগুলো আপনি কীভাবে অতিবাহিত করছেন তার উপর। সুতরাং সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে।