📄 একটি সেলফি রিমাইন্ডার!
আজকের পৃথিবীতে বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের বানানো এক মিথ্যা জগতে বসবাস করে। নিজেকে জাহির করা, নিজের সম্পদ, অর্থ-বিত্ত, শানশওকত মানুষকে দেখানোর মধ্যে আমরা এক ধরনের আনন্দ অনুভব করি। প্রযুক্তির একটার পর একটা প্ল্যাটফর্ম আমাদের এই জাহির করার কাজটাকে আরো সহজ করে দিচ্ছে। ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম—এসব ছাড়া আজ মানুষের জীবন কল্পনাও করা যায় না। প্রতিটি সময় মানুষ কি করছে না করছে তার আপডেট না জানালে যেন তাদের পেটের ভাত হজমই হচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে তার বিস্ময়কর এক ধাপ হলো—সেলফি।
আপনি যদি নিজের জীবন মানুষের সাথে শেয়ার করার ব্যাপারে এত আন্তরিকই হন, তাহলে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠা মাত্রই কেন সেলফি তুলে আপলোড করেন না? যখন আপনার চোখের কোণায় ময়লা লেগে থাকে, তখন থেকেই ছবি তোলা শুরু করেন না কেন? কিন্তু না! কখন কোন অবস্থায়, কোন ভঙ্গিমায়, কোন এঙ্গেলে ছবি তোলা হবে তা অনেক যাচাই বাছাইয়ের পর ঠিক করা হয়। আমরা শুধু এমন সময়ই ছবি তুলি যখন আমরা কোথাও ঘুরতে গিয়েছি কিংবা যখন নতুন পোশাক পরেছি, কিংবা যখন মজাদার কিছু খাচ্ছি। আর আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করি যেন পৃথিবীকে দেখাতে পারি আমরা জীবনকে উপভোগ করছি। আমরা পৃথিবীকে দেখাতে চাই আমাদের জীবনটা অনেক অসাধারণ, একদম ফাটাফাটি। কিন্তু সত্য হলো এটা আপনার জীবনের বাস্তব চিত্র না—আপনি কোনো রুপকথার জীবনযাপন করেন না। আপনিও মানুষ। আপনার দুঃখ আছে, অভাব আছে, ত্রুটি আছে, সীমাবদ্ধতা আছে। হাজারটা ছবি থেকে বাছাই করে, এডিট করে, নানান এফেক্ট দিয়ে আকর্ষনীয় করে আপলোড করা ফেসবুকের ঐ প্রফাইক পিকচারের মানুষটি আসল আপনি নন। এটা দেখে যারা মুগ্ধ হচ্ছে তারা আসলে আপনাকে দেখে মুগ্ধ হচ্ছে না—আপনি উপরে যে মুখোশ দিয়ে রেখেছেন সেটা দেখে মুগ্ধ হচ্ছে।
আপনিও অন্য সব মানুষের মতই, আপনার জীবনও অন্য সবার মতই। আচ্ছা ধরলাম আসলেই আপনি খুব সুখী, তবুও তা দুনিয়ার সবাইকে প্রচার করে বেড়ানোর দরকার কী? কেননা, মানুষ যখন আপনাকে হিংসা করতে শুরু করবে, আপনার যা আছে তারা সেগুলো কামনা করা শুরু করবে, এবং তারা চাইবে আপনার যা আছে আল্লাহ যেন সেগুলো আপনার কাছ থেকে নিয়ে নেন ও তাদেরকে দান করেন। বিবাহিত দম্পতিদের মধ্যেও এসব কারণে সমস্যার সৃষ্টি হয়। কেন? কারণ আমরা প্রতিনিয়ত এমন এক জীবন যাপনের চেষ্টা করি, এমন এক জীবনের স্বপ্ন দেখি যে জীবন আমাদের না। যদি আল্লাহ আপনাকে মাসে দশ হাজার টাকা রোজগারের সামর্থ্য দেন, তাহলে এমন একজন মানুষের মতো জীবনযাপন করুন যার রোজগার মাসে দশ হাজার টাকা।
কিন্তু না! যে লোক মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা রোজগার করে আমি চাই তার মতো করে জীবন যাপন করতে। কিন্তু আল্লাহ আপনাকে তা দেননি। আল্লাহ আপনাকে এমন কিছু নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন না যা তিনি আপনাকে দেননি। কাজে কেন নিজের জীবনকে জটিল করে তুলছেন? যেসব ভাই কাজের জন্য সারাদিন বাইরে থাকেন, আর কাজের ফাঁকে তাদের সামনে পড়ে যাওয়া প্রতিটি মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন, প্রশংসার দৃষ্টিতে, কামনার দৃষ্টিতে! আবার সেই ভাই বাসায় ফিরে বলেন, ধুর! আমার স্ত্রীকে আমার কাছে বিরক্তিকর মনে হয়! অবশ্যই! আপনার কাছে আপনার স্ত্রীকে বিরক্তিকর মনে হবারই কথা! পরস্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আপনার জীবনের যতখানি সময় আপনি নষ্ট করেছেন, তার ১০% সময়ও যদি আল্লাহ আপনাকে যাকে দিয়েছেন, সেই মানুষটির দিকে তাকিয়ে ব্যয় করতেন, তবে হয়তো আপনি তারও প্রশংসা করতেন। কিন্তু আপনি তা করেন না। কারণ আপনি এমন জিনিসের প্রতি নজর দিচ্ছেন যা পাওনার না। আপনি এমন কিছু নিয়ে মেতে আছেন যা আপনার না। এমন একটি জীবন যাপন করতে চাইছেন যা আপনার জন্য না! আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি নিজের জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে শিখুন, এটাই যথেষ্ট।
অনেকে আছে যারা দীর্ঘসময় ফেসবুকে নষ্ট করে। কিন্তু কেন? আপনার বাস্তব জীবন কি এতই বিরক্তিকর? আপনার জীবনে আর কোনো কাজ নেই, কোনো উদ্দেশ্য নেই? মানুষজন লিখছে, 'আমি অনুক জায়গায় খেতে এসেছি, অমুক জায়গায় ঘুরতে এসেছি।' আপনি কোথায় আছেন, কী করছেন, কী খাচ্ছেন তা দিয়ে আমার কী? এগুলো নিয়ে কার মাথাব্যথা আছে?
অনেক বোন আছেন যারা আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখেন, এবং হীনমন্যতায় ভোগেন, দুঃখবোধ করেন। কিন্তু সত্যটা হলো আপনাকে যেমন দেখায়, যদি আপনি দেখতে তার চেয়ে অন্যরকম হতেন, তবে আপনাকে একটুও ভাল লাগত না। কেন জানেন? কারণ আপনাকে দুনিয়ার কেউ বানায়নি, আপনাকে বানিয়েছেন মহান আল্লাহ। আল্লাহ আপনাকে আপনার মতো করে এভাবেই সৃষ্টি করেছেন। যদি অন্যদের এটা পছন্দ না হয়, এটা তাদের সমস্যা। আপনি যেমন, আল্লাহ চান সে অবস্থাতেই আপনি তার আনুগত্য করুন। আল্লাহ যেভাবে চেয়েছেন সেভাবেই তিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ চান আপনি যেন নিজেকে ঢেকে রাখেন। আল্লাহ চান যে সৌন্দর্য তিনি আপনাকে দিয়েছেন আপনি তার গোপনীয়তা বজায় রাখবেন। আপনার সৌন্দর্য শুধুমাত্র আল্লাহ, আপনার স্বামী এবং যাদের সামনে পর্দা ছাড়া আল্লাহ আপনার জন্য হালাল করেছেন তাদের দেখার জন্য। তাহলে যিনি আপনাকে বানিয়েছেন, যিনি আপনার মালিক, সেই তিনিই বলে দিচ্ছেন, তিনি আপনার কাছে কী চান! তাই মানুষ কী বলল, মানুষ আপনাকে কীভাবে বিচার করল সেটা নিয়ে কেন এত দুশ্চিন্তা করছেন? কারণ সোশ্যাল মিডিয়ার যে জগৎ দেখে আমরা অভ্যস্ত, সেই জগৎ আমাদেরকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। সেই চোখ ধাঁধানো আলোর জগৎ আয়নার সামনে নিজেকে ছোট করে দিচ্ছে, সত্যিকারের 'আমি'কেই আর ভালো লাগছে না মিথ্যের জগতে বসবাস করা অন্যদের দেখে।
📄 যে ঘুম আর কোনোদিন ভাঙেনি
মুহাম্মাদ ইয়াকুব জেনেল, ১৮ বছরের যুবক। প্রতিদিনের মতো রাতে ঘুমিয়েছিল, সকালে তার সেই ঘুম আর ভাঙেনি। মাত্র ১৮ বছর। কোনো অসুখ নেই, স্বাস্থ্যবান এক যুবক। কোনো মানসিক চাপ বা অন্য কিছুই ছিল না, সামনে পড়ে ছিল পুরো জীবনটাই। কারো ধারণাতেও ছিল না, একটা ছেলে এভাবে ঘুমের ভেতর মারা যাবে।
আমার এখনো মনে আছে গতবছর একটা প্রোগ্রামে যখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কখন তুমি নিজেকে আল্লাহর কাছাকাছি অনুভব করো? জবাবে সে বলেছিল,
“এটা ব্যাখ্যাতীত এক ভালোবাসা। আল্লাহর প্রতি এই ভালোবাসা আপনি অনুভব করতে পারবেন যখন তাঁর কাছে কিছু চেয়ে দুআ করবেন। অধিকাংশ সময়েই আপনি অনুভব করতে পারবেন, আপনার মধ্যে এই ইয়াকীন তৈরি হবে যে—আপনার দুআ আল্লাহর দরবারে কবুল হবেই!”
এই অসাধারণ ছেলেটার সাথে আমার দেখা হয়েছিল যখন তার বয়স ১২ বছর। আমরা একটা ফান্ড কালেকশনের প্রোগ্রামে একত্রিত হয়েছিলাম। ডিনার টেবিলে খেতে বসে এই বালক ঘোষণা দিয়েছিল সে আমাদের ফান্ডে ৫০০০ ডলার দেবে। আমি মজা করে বলেছিলাম, ওহে বালক! তুমি ৫০০০ হাজার ডলার পাবে কোথায় শুনি! এই কথা শুনে সে আমার দিকে তাকাল। আমি অবাক হয়ে এই নিষ্পাপ ছেলেটার চেহারায় সেদিন ঈমানের এক নূর দেখতে পেলাম। দৃঢ়টার সাথে মুহাম্মাদ সেদিন আমাকে বলেছিল, আমি এত ডলার কোথা থেকে পাব সেটা নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না। আমার মনে আছে সে ৫০০০ ডলার দেওয়ার ওয়াদা করেছিল, এবং এই ডলার সে জোগাড় করেও দিয়েছিল।
তার মৃত্যুর সংবাদ যখন শুনি তখন আমি হজ্জে, মিনায় অবস্থান করছিলাম। মুহাম্মাদের মৃত্যু সংবাদটা আমার জন্য প্রচণ্ড কষ্টের ছিল। সেই সাথে এই সত্যটুকু আরও একবার উপলব্ধি করলাম। আপনি কখনোই এই দুনিয়াকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে পারবেন না, কারণ মৃত্যুর বাস্তবতা সবসময় আমাদের পিছন পিছন তাড়া করে যাচ্ছে। রাসূল (সা.) বলেছেন, “আনন্দ ধ্বংসকারী মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো।” (ইবনু মাজাহ)
আমাদের এই জীবনে কোনোকিছুর গ্যারান্টি নেই, শুধু মৃত্যু ছাড়া। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বয়স, সুস্থ হোক আর অসুস্থ-সবার জন্য মৃত্যুর গ্যারান্টি আল্লাহ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন,
“প্রত্যেক প্রাণীকে আস্বাদন করতে হবে মৃত্যু। আর তোমরা কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। তারপর যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, তার কার্যসিদ্ধি ঘটবে। আর পার্থিব জীবন ধোঁকা ছাড়া অন্য কোন সম্পদ নয়।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩: ১৮৫)
মৃত্যু আপনাকে খুঁজে নিবেই। আপনি মাটি ফুঁড়ে অন্ধকার গর্তে ঢুকে পড়ুন কিংবা উঁচু পর্বতশৃঙ্গে-মৃত্যু আসবেই। আলি ইবনু আবি তালিব (রা.) বলেছিলেন, “মানুষ ঘুমিয়ে আছে, তারা তখনই জেগে উঠবে—যখন তারা মৃত্যুবরণ করবে।”
দুনিয়াকে ঘিরে আমরা স্বপ্নের জাল বুনে যাচ্ছি। নিজেদের কামনা বাসনা আর উচ্চাশার মোহাবিষ্ট হয়ে দুনিয়ার সত্যিকারের বাস্তবতা ভুলে বসে আছি। কিন্তু যখন মৃত্যু এসে হাজির হয়ে যায় ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কারণ এরপর আর ভুল শোধরানোর জন্য ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। এমন না যে আমরা সবাই মারা যাব—এই বিষয়টা আমাদের কাছে অজানা। কিন্তু আমরা একটা ফ্যান্টাসি জগতে বসবাস করি। জীবনে অনেক বড় হবো, ক্যারিয়ার গড়ব, গাড়ি-বাড়ি, স্ত্রী-সন্তান—ছবির ফ্রেমে সাজিয়ে রাখা সুন্দর একটা জীবন। এভাবে একটা সুখ-শান্তি-দুনিয়াময় জীবন কাটিয়ে অবশেষে মৃত্যু এসে আমাদেরকে একটা “হ্যাপি এন্ডিং” দিয়ে যাবে! কিন্তু বাস্তবতা হলো আল্লাহ আমার আর আপনার প্ল্যান মতো চলে না। তিনিই সেই মহান সত্তা, যার প্ল্যানমতো আমরা চলি। তিনিই সবকিছুর মালিক, পরিকল্পনাকারী, তাঁর নির্দেশ ব্যতীত গাছের একটা পাতাও নড়ে না।
শাদ্দাদ ইবনু আওস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “সেই ব্যক্তি বুদ্ধিমান যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুর পরবর্তী সময়ের জন্য কাজ করে। আর সেই ব্যক্তি নির্বোধ ও অক্ষম যে তার নফসের দাবির অনুসরণ করে আর আল্লাহ তাআলার নিকটে বৃথা আশা পোষণ করে। (ইবনু মাজাহ: ৪২৬০)
তাই নিজের সাথে নিজে সৎ হোন। কেননা, দিনশেষে আপনার কাজের থেকে কেউ যদি লাভবান হয়—সে আপনি নিজেই। আর আপনার গাফিলতি, দুনিয়ার মোহে জীবনটা বরবাদ করার থেকে যদি কারো ক্ষতি হয়-সেও আপনি নিজেই। তাই মৃত্যু আসার আগেই সেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিন। আজ, এখন, এই মুহূর্ত থেকেই...
📄 কেন দুআ ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে
মুসলিমদের উপর আপতিত অত্যাচার, নির্যাতনের সময় একটি রেডিমেইড সমাধান থাকে তাদের জন্য দুআ করা। সেই সাহাবিদের সময় থেকে পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত দুআকে একটি শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এবং মুমিনের এই দুআর বদৌলতে কত বড় বড় জালিম ধরাশায়ী হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। নবিজি (সা.) বদরের প্রান্তরে আবেগতাড়িত হয়ে যে দুআ করেছিলেন, আসমান থেকে ফেরশতারা নেমে এসেছিল। এমনকি খোদ জালিমরাও মুমিনের দুআকে ভয় করত। খলিফা মু'তাসিমের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বাগদাদবাসীর পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি যখন গিয়ে বলল, তোমার অত্যাচার বন্ধ করো নইলে আমরা তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। খলিফা মু'তাসিম নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের মুখে যুদ্ধের কথা শুনে হেসে বলেছিল, তোমরা করবে আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ, অথচ আমার কাছে আশি হাজার সশস্ত্র সৈন্য আছে। তখন প্রতিনিধি বলল, আমরা আপনার বিরুদ্ধে 'রাত্রি বেলার তীর' (তাহাজ্জুদ সালাতে আল্লাহর কাছে করা দুআ) দিয়ে যুদ্ধ করব। এই শুনে খলিফা মু'তাসিম বলেছিল, আমি এই ভয়ঙ্কর তীরের মুখোমুখি হতে পারব না।
এখন তো আমরা সব জানি, কোন দুআ পড়লে কি হবে, কোন সময় কি দুআ পড়বে হবে তা এখন মোবাইল এপের মাধ্যমে সবার হাতে হাতে। একটা আঙুলের টিপ দিলেই যখন যে দুআ চাই সেটা চোখের সামনে চলে আসে। প্রতি বছর হজ্জে গিয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ আল্লাহর কাছে কাঁদে। ফিলিস্তিনের জন্য কাঁদে, সিরিয়ার জন্য কাঁদে, মুসলিম উম্মাহর জন্য দুআ করে। আল্লাহ কি আমাদের দুআ শোনেন না? তিনি দেখেন না, এতগুলো মানুষ চোখের পানি ফেলছে? হ্যাঁ, তিনি শোনেন, দেখেন! তাহলে এই দুআ কোথায় যায়? এর কোনো প্রভাব নেই কেন?
এই দুআ বিফলে যাওয়ার প্রধান কারণ আমাদের মধ্য থেকে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করার আমল হারিয়ে যাওয়া। অন্যায়, অবিচার, ফাহিশা কাজে চোখ সয়ে যাওয়া। হাদিসটা এসেছে জামে আত তিরমিযিতে, শাইখ আলবানি এটাকে সহিহ বলেছেন। নবিজি (সা.) বলেছেন, 'তোমরা অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে। অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের প্রতি শাস্তি নাযিল করবেন।'
কি সেই শাস্তি? নবিজি (সা.) বলেন, 'তোমরা আল্লাহর কাছে হাত তুলে দুআ করবে কিন্তু তিনি তা কবুল করবেন না।' আর রহমান যদি কারো দুআ কবুল না করেন, তার জন্য এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কি হতে পারে! সমস্ত মুসলিম উম্মাহ আজ এই শাস্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে দুআ থাকার পরও আমরা কেন বিপদে পড়ে যাই, এর সুন্দর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন শাইখ উমর আল আশকার (রহ.)। তিনি বলেন, 'আল্লাহর সাহায্য চাওয়াটা যোদ্ধার হাতের তরবারির মতো। তার বাহু শক্তিশালী হলে এই তরবারি দিয়ে সে শত্রুকে হত্যা করতে পারবে। আর বাহু দুর্বল হলে ধারালো তরবারি দিয়েও শত্রুর গায়ে আঁচড় দেওয়া যায় না।' তাই আমাদের উচিত নিজেদের পাপের ব্যাপারে ভীত হওয়া, নিজেদের নিষ্ক্রিয়তা, নীরবতা নিয়ে ভীত হওয়া। সেই অবস্থার কথা চিন্তা করে ভীত হওয়া, যখন আমরা আর রহমানের কাছে হাত তুলে দুআ করব, কিন্তু সেই দুআ কবুল করা হবে না। আমাদের উচিত আমাদের ঈমানকে মজবুত করা, যাতে আমাদের দুআ এতটা শক্তিশালী হয় যে তা আরশ মহলে গিয়ে পৌঁছায়। যে দুআর শক্তিতে আসমান থেকে আবাবিল পাখি নেমে আসবে। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফিক দান করুন। আমীন।
📄 বলিউড— মুখোশের আড়ালে
“আজকের সব কিশোরী মেয়েরাই রুমের আয়নায় নিজেকে দেখে হয়তো ভাবে কেন সে দেখতে সিলেব্রেটিদের মতো নয়। শোনো হে মেয়ে, এটা আমাদের কারো আসল চেহারা নয়, আমরা কেউ এভাবেই ঘুম থেকে উঠি না, কোনো অভিনেত্রীই এমন না। প্রতিটি পাবলিক এপেয়ারেন্সের আগে আমাকে ৯০ মিনিট মেকআপ চেয়ারে বসে থাকতে হয়। আমার চুল ঠিক করা আর মেকাপ ঠিক করার পেছনে ৩-৬ জন মানুষ কাজ করে। একজন পেশাদার বিউটিশিয়ান আমার নখ নিয়ে কাজ করে। প্রতি সপ্তাহে আমার আইব্রো প্লাগ করতে হয়, থ্রেডিং করতে হয়। মুখের দাগ আর ডার্ক স্পটগুলো আড়াল করার জন্য আমার শরীরে বিশেষ কসমেটিকের ব্যবহার হয়।
প্রতিদিন সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠে সাড়ে সাতটায় আমি জিমে চলে যাই। সেখানে ৯০ মিনিট ধরে এক্সারসাইজ করি, কখনও সন্ধ্যায় আবার কখনও ঘুমানোর আগেও এভাবে চলে। আমি কি খাব আর কি খাব না এটা ঠিক করার জন্য একজন ফুল টাইম লোক নিয়োগ করা আছে। যতটুকু আমি খাই, তার চেয়ে বেশি আইটেমের মেকআপ আমার মুখে লাগাতে হয়। আমার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ও আকর্ষনীয় পোশাকটি বাছাই করার জন্য একটি টীম সবসময় নিযুক্ত থাকে।
এতকিছুর পরও আমি যথেষ্ট নিখুঁত হতে পারি না। এরপর আছে ফটোশপের দারুণ সব কারসাজি। একথা আমি আগেও বলেছি, আবারও বলছি, যে অভিনেত্রীকে পর্দায় দেখে তুমি ঈর্ষায় ভাজা ভাজা হয়ে যাচ্ছ, তাকে এরকম বানাতে একটা বিশাল টীম, কাড়ি কাড়ি টাকা, প্রচুর সময় দরকার হয়। এর কোনোকিছুই বাস্তব নয়, এটা এমন কিছু নয় যা তোমাকেও অর্জন করতে হবে। এটা এক আর্টিফিশিয়াল জগৎ।”
উপরের এই কথাগুলো এক বলিউড অভিনেত্রীর— যাদেরকে দেখে আজকালকার মেয়েরা ভাবে, ইশ! যদি তাদের মতো হতে পারতাম! রংচঙা সেলুলয়েডের পর্দায় শরীর দেখিয়ে বেড়ানো এই অভিনেত্রীরা যে মুখোশ পরে আছে, সেটা আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। মরীচিকার মতো আমরা কেবল তার পেছনে ছুটে মরি। অথচ মুখোশটা খুলে রাখলে আয়নায় দাঁড়িয়ে তাদের চেয়ে তোমার নিজেকে আরও বেশি সুন্দর মনে হবে, বিশ্বাস করো! তুমি নিজেকে দেখে আঁতকে উঠবে না।
চোখ ধাঁধানো আলোর সেই কৃত্রিম গ্ল্যামার তোমাদের সুখ কেড়ে নিচ্ছে! হীনমন্যতায়, ঈর্ষায়, তাদের মতো হতে চাওয়ার চেষ্টায়— নিজেদের সত্তাটাই ভুলে যাচ্ছ। আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে ছোট করছ। অথচ চোখ ধাঁধানো আলোতে থাকা ঐ মুখোশওয়ালীদের নিজেদের বলতে কিছুই নেই। আর যাদের নিজের কোনো সত্তা নেই, মুখের উপর পরে থাকা মুখোশটা ছাড়া কোনো অস্তিত্ব নেই, তাদের জন্য কিনা তোমরা নিজেদের জীবনটাকে ছোট করে দেখছ?
টিকাঃ
৫. এটা এক বলিউড অভিনেত্রীর লেখা অবলম্বনে লেখা হয়েছে। সাজিদ ইসলাম