📘 এপিটাফ 📄 জাইরা ওয়াসিম—এক বলিউড তারকার আবেগঘন প্রত্যাবর্তন

📄 জাইরা ওয়াসিম—এক বলিউড তারকার আবেগঘন প্রত্যাবর্তন


(জাইরা ওয়াসিম। সাম্প্রতিক সময়ের একজন জনপ্রিয় বলিউড অভনেত্রী। অভিনয় করেছেন তুমুল জনপ্রিয় কিছু ছবিতে। একদিন হঠাৎ ফেসবুকে একটা পোস্ট দিয়ে তিনি বলিউড জগতের সাথে তাঁর সম্পর্কচ্ছেদ করার ঘোষণা দেন। আবেগঘন, অনুপ্রেরণাদায়ী সেই লেখাটার অনুবাদ এটি। আল্লাহ যেন এই কথাগুলো, হৃদয়ের এই উপলব্ধিগুলো আরো হাজারো মানুষের হিদায়াতের উছিলা বানিয়ে দেন। আমীন।)

“আজ থেকে পাঁচ বছর আগে আমি এমন একটি সিদ্ধান্ত নিই, যাতে আমার জীবনটাই পাল্টে যায়। বলিউডে তখন পা রাখামাত্রই বিপুল খ্যাতি আমাকে ঘিরে ধরে। আমাকে ঘিরেই যেন সবার আগ্রহ। মিডিয়া আমাকে উপস্থাপন করতে শুরু করে তরুণ সমাজের সাফল্যের চূড়ান্ত উদাহরণ হিসেবে। এটা আসলে কখনওই আমার লক্ষ্য ছিল না। বিশেষ করে সাফল্য-ব্যর্থতার যে নতুন ধারণা আমি আত্মস্থ করেছি, তা একেবারেই আলাদা।

পাঁচ বছর পাড়ি দিয়ে আজ বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, আমার এই পেশাগত পরিচয় নিয়ে আমি একদমই খুশি নই। আমি যেন খুব লম্বা সময় ধরে এমন এক মানুষ হতে চাইছি, যা আসলে আমি নই। আমার সারাটা সময়, শ্রম আর আবেগ ব্যয় হচ্ছে যে দুনিয়ায়, সেখানে আমি চাইলেই খাপে খাপে বসতে পারি। কিন্তু আসলে এই জগৎ আমার নয়, আমিও এ জগতের কেউ নই। এই জগৎ আমাকে প্রচুর ভালোবাসা, খ্যাতি আর জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে বটে; কিন্তু তার সাথে দিয়ে গেছে অজ্ঞতার অন্ধকার। নীরবে এবং নিজের অজান্তে আমি একটু একটু করে ঈমানের পথ থেকে সরে যেতে থাকি। যে ধরনের পরিবেশে আমাকে কাজ করতে হতো, তা ক্রমাগত আমার ঈমানের ক্ষতি করতে থাকে। নিজের ধর্মের সাথে আমার সম্পর্ক হুমকির মুখে পড়ে যায়। আমি জোর করে নিজেকে বুঝ দিতাম যে, এগুলো করলে ধর্মের কোনো ক্ষতি হয় না। অথচ আমার জীবন থেকে বারাকাহ হারিয়ে যেতে থাকে। 'বারাকাহ' কথাটার অর্থ কেবল সুখ বা আনন্দ না, প্রশান্তি আর স্থিতিশীলতাও এর অন্তর্ভুক্ত। আমি এগুলোর খুবই অভাব বোধ করতে শুরু করি।

চিন্তা আর প্রবৃত্তির মাঝে বোঝাপড়া করিয়ে নিজের ঈমানের একটি স্থিতিশীল চিত্র তৈরি করার চেষ্টা করতাম। একবার না, দুইবার না; বারবার, হাজারবার। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হই। একদিন বদলে যাব—এই চিন্তায় আটকে থেকে দিনের পর দিন আমি ওই একই মানুষটিই রয়ে গেলাম। সবসময় নিজেকে বুঝ দিতাম যে, সময়মতো সব ঠিকঠাক করে নেব, তার আগ পর্যন্ত একটু সময় নিই। সেইসাথে প্রতিনিয়ত নিজেকে ঈমান ও প্রশান্তি বিনষ্টকারী পরিবেশে ছুঁড়ে ফেলার ব্যাপারটা তো ছিলই। সবকিছুকে আমি সোজাসুজি না নিয়ে বাঁকাভাবে দেখতাম। বাস্তবতা থেকে আমি সারাক্ষণই পালাতে চাইতাম। তবুও বুঝতাম কীসের যেন একটা অভাব আমাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আমি যেন পথের শেষে পথ হারিয়ে এক অবোধ্য যন্ত্রণায় মাথা কুটে মরছি। অবশেষে আমি যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করে নিজের অজ্ঞতা ও দুর্বলতার মুখোমুখি হলাম। শুরু করলাম আল্লাহর বাণীর সাথে অন্তরকে সংযুক্ত করে নিজের অজ্ঞতার চিকিৎসা। কুরআনের মহান ঐশী জ্ঞানে খুঁজে পেলাম পূর্ণতা ও প্রশান্তি। হৃদয় তো আসলে তখনই প্রশান্ত হয়, যখন সে তার স্রষ্টার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে। তাঁর দয়া ও আদেশ-নিষেধগুলো জানতে পারে।

আমি অতি-আত্মবিশ্বাস ছেড়ে দিয়ে একদমই আল্লাহর রহমত ও হিদায়াতের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ি। ধর্মের একদম মৌলিক বিষয়গুলোতে নিজের অজ্ঞতা আমার কাছে ধরা পড়ে। বুঝতে পারি যে, নিজের পার্থিব কামনা-বাসনাকে প্রশ্রয় দেওয়ার ফল হলো অন্তরের এই প্রশান্তির অভাব। অন্তরের রোগ প্রধানত দুই প্রকার। একটি হলো সংশয় ও ভ্রান্তি, আরেকটি হলো খেয়াল-খুশি ও কামনা-বাসনা। কুরআনে দুই ধরনের রোগের কথাই আছে। আল্লাহ বলেন,

“তাদের অন্তরে রয়েছে (সংশয় ও কপটতার) রোগ এবং আল্লাহ তাদের রোগ বাড়িয়ে দিয়েছেন।” (সূরাহ আল-বাকারা ২:১০)

আমার বোধোদয় হলো যে, এই রোগের চিকিৎসা কেবল আল্লাহর দেওয়া হিদায়াতের মাধ্যমেই হতে পারে। আর সত্যিই তিনি আমাকে হিদায়াত করতে শুরু করেন। কুরআন এবং রাসূল (সা.) এর সুন্নাহ হয়ে ওঠে আমার মানদণ্ড। এগুলোর ভিত্তিতেই আমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও জীবনের অর্থের সন্ধান করতে থাকি। মানুষের চাহিদা হলো তার নৈতিক বিশ্বাসের প্রতিফলন; বাহ্যিক আচরণ হলো অন্তরের পূর্ণতার নির্দেশক। তেমনি কুরআন-সুন্নাহর সাথে সম্পর্কের উপরই নির্ভর করে আল্লাহ ও দ্বীন ইসলামের সাথে আমাদের সম্পর্ক কেমন। জীবনের আকাঙ্ক্ষা, উদ্দেশ্য ও অর্থও নির্ধারিত হয় এগুলোর মাধ্যমে। সাফল্য এবং জীবনের অর্থ-উদ্দেশ্যকে আমি যেভাবে বুঝতাম, সেগুলোকে ধীরে ধীরে প্রশ্ন করতে শুরু করলাম। আমার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ন্ত্রক নীতিমালা এক নতুন মাত্রা পেল। জীবনকে আমরা যে একচোখা, সংকীর্ণ ও গতানুগতিক দৃষ্টি দিয়ে দেখি, সেগুলো দিয়ে আসলে সাফল্য নির্ধারিত হয় না। আসল সাফল্য হলো আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূর্ণ করা। অন্ধভাবে জীবনের পথ চলতে চলতে আমরা ভুলেই যাই কেন আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছিল।

“যারা পরকালের প্রতি ঈমান রাখে না, তাদের অন্তরকে ওই দিকে অনুরক্ত হতে দাও; এবং তারা যেন তাতে সন্তুষ্ট থাকে, আর তারা যেসব কাজ করে তা যেন তারা আরও করতে থাকে।” (সূরাহ আল-আন'আম ৬:১১৩)

ভালো-মন্দ কখনও ব্যক্তিস্বার্থ বা পার্থিব মানদণ্ডে নির্ধারিত হয় না। আল্লাহ বলেন, “(ক্ষয়িষ্ণু) সময়ের শপথ। নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিতে নিমজ্জিত। শুধু তারা ছাড়া, যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে, সত্যের দিকে আহ্বান করে এবং ধৈর্যের আহ্বান করে।” (সূরাহ আল-আসর ১০৩: ১-৩)

আত্মার সাথে এই দীর্ঘ যুদ্ধ আমার জন্য বড় ক্লান্তিকর ছিল। জীবনটা ছোট, আবার নিজের সাথে যুদ্ধ করে যাওয়াটা বড় দীর্ঘ। অবশেষে আজই সেই দিন, যেদিন আমি জেনেবুঝেই এই পেশার সাথে সম্পর্কচ্ছেদের খোলাখুলি ঘোষণা দিচ্ছি। এই যাত্রার সফলতা নির্ভর করে প্রথম পদক্ষেপটি কীভাবে নিচ্ছেন, তার উপর। নিজেকে খুব পূত-পবিত্র হিসেবে তুলে ধরাটা আমার এই প্রকাশ্য ঘোষণার উদ্দেশ্য নয়। বরং আমার এই নতুন জীবন সূচনার প্রাক্কালে এইটুকু আমার করাই উচিত। এটা কেবলই আমার প্রথম পদক্ষেপ। এই পথে চলতে শুরু করা আমার স্বচ্ছ উপলব্ধির ফল। আমি এই পথেই থাকতে চাই, এর জন্যেই সংগ্রাম করে যেতে চাই। অতীতে আমি জেনে বা না জেনে অনেক মানুষের মনে উচ্চাশার বীজ বপন করে থাকতে পারি। কিন্তু সকলের প্রতি আমার একটি আন্তরিক পরামর্শ। কারো সাফল্য, খ্যাতি, প্রতিপত্তি বা সম্পদ যত বেশিই হোক না কেন, আপনার অন্তরের প্রশান্তি এবং ঈমানের নূরের তুলনায় এগুলো একদমই মূল্যহীন। কুপ্রবৃত্তির কাছে যেন আত্মসমর্পণ করতে না হয়, সে জন্য জোর প্রচেষ্টা চালান। কারণ কামনা-বাসনার আসলে কোনো শেষ নেই। এইমাত্র যা পেলেন, একটু পরই এরচেয়ে বেশি কিছু একটা পেতে মনে চাইবে। দ্বীন ইসলামের পূর্ণাঙ্গ সত্যকে গোপন করে কেবল নিজের ইচ্ছে-বাসনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অংশের অনুসরণ করা মানে নিজের সাথে প্রতারণা করা। নিজেদের ঈমানের গুরুতর ত্রুটিকে আমরা কখনও কখনও দার্শনিক কথাবার্তা দিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করি। আমাদের মুখ যা বলে, অন্তরে তা থাকে না। তারপরও আমরা একে আঁকড়ে ধরার অজুহাত খুঁজি। আল্লাহ কিন্তু আমাদের এই স্ববিরোধিতার কথা ঠিকই জানেন। তিনি সব না-বলা কথা জানেন। তিনি সর্বশ্রোতা (আস-সামি'), সর্বদ্রষ্টা (আল-বাসীর) এবং সর্বজ্ঞানী (আল-'আলীম)। "আর আল্লাহ জানেন, যা তোমরা গোপন করো এবং যা তোমরা প্রকাশ করো।” (সূরাহ আন-নাহল ১৬:১৯)

নিজের ভ্রান্ত মতবাদকে প্রশ্রয় না দিয়ে সত্যিকারের চেষ্টা করুন। ঈমান ও ইখলাসে ভরা একটি অন্তর দিয়ে তখন সত্যকে উদঘাটন করতে পারবেন। “হে মু'মিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করো, তাহলে তিনি তোমাদেরকে ন্যায়-অন্যায় পার্থক্য করার একটি মান-নির্ণায়ক শক্তি দান করবেন।” (সূরাহ আল-আন'আম ৮:২৯)

আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও সীমালঙ্ঘনের মাঝে কখনও সাফল্যের রোল মডেল খুঁজতে যাবেন না। এ ধরনের মানুষগুলো যেন আপনার পছন্দ-অপছন্দ বা লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের নিয়ামক না হয়ে ওঠে। নবি (সা.) বলেন, “মানুষ যাকে ভালোবাসে, তার সাথেই (হাশরের ময়দানে) থাকবে।” জ্ঞানীদের কাছ থেকে অজানা বিষয়গুলো জেনে নিন। অহংকার ঝেড়ে ফেলুন। আল্লাহর দেওয়া হিদায়াতের মুখাপেক্ষী হোন। তিনিই অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী। তিনি যাকে পথ দেখান, তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না। কোন জিনিসটা জানতে হবে বা পরিবর্তন করতে হবে, তা বুঝতে পারার মতো জ্ঞানবুদ্ধি সবার থাকে না। কাজেই এ ধরনের মানুষগুলোকে নিয়ে খারাপ মন্তব্য করা, গালমন্দ করা, ছোট করা বা উপহাস করাও অনুচিত। বরং আমাদেরই দায়িত্ব হলো পরস্পরকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে সঠিক উপলব্ধি অর্জনে সাহায্য করা। ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা। “আর স্মরণ করিয়ে দাও, নিশ্চয় স্মরণ করিয়ে দিলে মুমিনরা উপকৃত হয়।” (সূরাহ আয-যারিয়াত ৫১:৫৫)

শত্রু শত্রু ভাব নিয়ে মানুষের উপর 'হক কথা' ছুঁড়ে মারলে বা জোর করে গলা দিয়ে ঢুকিয়ে দিলেই কাজ হবে না। বরং নম্রতা ও দয়ার মাধ্যমে আশপাশের মানুষদের মন জয় করতে হবে। “যদি কাউকে ভুল করতে দেখো, তাকে সংশোধন করে দেবে। তার জন্য দুআ করবে। তাকে অপমান করার মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে শয়তানকে সাহায্য করবে না।”—উমার বিন আল-খাত্তাব (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

কিন্তু সেটা করার আগে নিজের হৃদয়, কাজ, নিয়ত ও আচরণে ইসলামের সঠিক উপলব্ধির প্রতিফলন ঘটাতে হবে। তারপর অন্যের উপকারে এগুলো ব্যবহার করতে হবে। উপলব্ধি, বিশ্বাস ও আচরণ সংক্রান্ত দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো যাদের কাছে অস্পষ্ট, তাদের এগুলো বুঝতে সাহায্য করতে হবে। আর মনে রাখবেন, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার এই পথে যাত্রা শুরু করলে বাধা, বিপত্তি, ঠাট্টা, নিন্দার মুখোমুখি হওয়া লাগবেই। এমনকি আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোর কাছ থেকেই এ ধরনের আচরণ পেতে পারেন সবচেয়ে বেশি। আপনার অতীত জীবনের কথা তুলে মানুষ খোঁটা মারতে পারে। কিন্তু এতে আশা হারাবেন না। আল্লাহর দয়া ও হিদায়াত থেকে নিরাশ হবেন না। আল্লাহ হলেন আল-হাদি (পথপ্রদর্শনকারী)। অতীতের কথা ভেবে তাওবাহ করা থামিয়ে দেবেন না। কারণ আল্লাহ আল-গাফফার (বারবার ক্ষমাকারী)। “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদেরকে ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরকেও ভালোবাসেন।” (সূরাহ আল-বাকারা ২:২২২)

অন্যের মন্তব্য, বিদ্রূপ, গালাগালি, কথাবার্তা বা মানুষের প্রতি ভয় যেন আপনাকে এ পথ থেকে সরিয়ে না দেয়। আপনার বিশ্বাসকে পুরোপুরি প্রকাশ করুন। আল্লাহই আপনার আল-ওয়ালি (অভিভাবক, সাহায্যকারী)। ভবিষ্যতে কী বিপদ হবে বা হবে না, এগুলো নিয়ে ভয়ে মূর্ছা যাবেন না। কারণ আল্লাহ হলেন আর- রাযযাক (রিযিকদাতা)। এ এক দুর্গম, জটিল ও সঙ্গীবিহীন যাত্রা হতে পারে। বিশেষত এখনকার যুগে তো বটেই। কিন্তু মনে রাখবেন আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, “এমন এক সময় আসবে, যখন দ্বীন আঁকড়ে ধরে রাখা জ্বলন্ত অঙ্গার ধরে রাখার মতো কষ্টকর হবে।”

আল্লাহ যেন আমাদের তরীগুলোকে পথ দেখিয়ে তীরে নিয়ে ভেড়ান, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করেন। আল্লাহ যেন আমাদের ঈমান মজবুত করে দেন, তাঁর যিকিরকারীদের অন্তর্ভুক্ত করেন, অন্তরের অবিচলতা ও সংকল্পের দৃঢ়তা দান করেন। আল্লাহ যেন তাঁর প্রজ্ঞার গভীর বুঝ আমাদের দান করেন, নিজেদের সংশয় ও ভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়ে অপরের হিদায়াতের উসিলা হতে সাহায্য করেন। তিনি যেন আমাদের অন্তরকে কপটতা, অহংকার ও অজ্ঞতা থেকে পবিত্র করে দেন। নিয়ত, কথা ও কাজে পরিশুদ্ধি দান করেন। আমীন।”

📘 এপিটাফ 📄 ধন্যবাদ মা!

📄 ধন্যবাদ মা!


আমার এক বন্ধুর মা অনেক দিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন। কিছুদিন আগে খবর পেলাম তিনি মৃত্যুশয্যায়, শেষ অবস্থা চলছে। খবর পেয়ে আমি আমার বন্ধুর সাথে দেখা করতে গেলাম। বন্ধু তার মায়ের অসুস্থতার হালচাল বলতে বলতে হঠাৎ কাঁদতে লাগল। আমি ভাবলাম তার মা এভাবে কষ্ট পাচ্ছে, চোখের সামনে মারা যাচ্ছে, সেজন্যই হয়তো কাঁদছে, খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। আমি যথাসম্ভব তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম, বোঝালাম মৃত্যু খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার, সবাইকেই তো একদিন না একদিন মৃতুবরণ করতে হবে। বন্ধু বলল,

“আমার মা মারা যাচ্ছে এতে আমি কষ্ট পাচ্ছি সত্য, কিন্তু আমার কান্নার কারণ এটা নয়। আমি কাঁদছি কারণ এই পুরো জীবনে আমার মা আমার জন্য যা করেছে, সেজন্য আমি কোনোদিন তাকে ধন্যবাদ দেইনি। একবারও না। একবারও কোনোদিন বলিনি, 'মা তোমাকে ধন্যবাদ!' আর আজ আমার মা পাশের রুমেই আছে, সাকারাতুল মাউত চলছে, আমি গিয়ে যদি ধন্যবাদ জানাইও, সে বুঝতেও পারবে না আমি তাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি।”

ব্যাপারটা নিয়ে কী আমরা কখনো এভাবে ভেবেছি? শেষ কবে আপনি আপনার মা'কে গিয়ে বলেছেন, তুমি আমার জন্য যা করেছ তার জন্য ধন্যবাদ মা! মনে করার চেষ্টা করুন তো? ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য বিশেষ আয়োজন করতে হবে, হাতে ফুল কিংবা উপহার নিয়ে হাজির হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। ধন্যবাদ জানানো মানে কারো কাজকে এপ্রেসিয়েট করা, তার অবদানকে স্বীকার করা, উত্তম আচরণ, দয়া আর ভালোবাসায় তার প্রতিদান দেওয়া।

আপনার মা, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আপনাকে আগলে রেখেছে, কখনো আপনাকে এতটুকু কষ্ট পেতে দেয়নি, কখনো আপনাকে ছেড়ে চলে যায়নি, আপনার সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ঘিরেই তার একটা জীবন কেটে গেছে। সেই মা আপনার জন্য যা করেছে তার জন্য অন্তর থেকে আসা কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার মিশেলে জড়িয়ে ধরে কখনো বলেছেন—'ধন্যবাদ মা'। আমাদের মধ্যে যাদের মা এখনো বেঁচে আছে, তারা এই ব্যাপারটা অনুভব করতে পারে না। একদিন যখন আপনার মা দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে, আপনি বসে বসে কাঁদবেন আর বেঁচে থাকা অবস্থায় জড়িয়ে ধরে একটা ধন্যবাদ না জানানোর জন্য আফসোস করবেন। তখন খুব করে ইচ্ছে হবে মায়ের সেবা করি, মায়ের জন্য এটা করি ওটা করি, কিন্তু মা যখন পাশেই থাকে, পাশের রুমেই, তখন আমরা এর গুরুত্ব বুঝতে পারি না।

আজকে আমরা খুব ঘটা করে বিশ্ব মা দিবস পালন করি। কিন্তু ইসলামে তো প্রতিটা দিনই মা দিবস। সেই হাদিসটার কথা কে না জানে, রাসূল (সা.) কে জিজ্ঞেস করা হলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার উত্তম আচরণ পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে? রাসূল (সা.) বললেন, তোমার মা। এরপর? তিনি বললেন, তোমার মা। এরপর? তিনি বললেন, তোমার মা। এরপর? তিনি বললেন, এরপর তোমার বাবা।

আমরা হাদিসটাকে খুব সাধারণভাবে ব্যাখ্যা করি। আমরা মনে করি এখানে শুধু ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য বোঝানো হয়েছে। আমার মা বেশি ভালোবাসা পাবে আমার বাবার চেয়ে। আসলে ব্যাপারটা এরকম নয়। এর অর্থ হলো আপনার অর্থ সম্পদ, সময়, স্বাস্থ্য, আপনার যা কিছু আছে সবকিছু—সবকিছুর উপর সবচেয়ে বেশি হকদার আপনার মা, আপনার মা, আপনার মা, এবং এরপর আপনার বাবা।

সুতরাং ভাই ও বোনেরা, যাদের মা এখনো বেঁচে আছে তারা মায়ের মৃত্যুর পর আফসোস করার জন্য অপেক্ষা না করে এখনোই সময়ের સদ্ব্যবহার করে নিন। আপনার মা'কে একবার বলুন, বারবার বলুন, প্রতিদিন বলুন—'ধন্যবাদ মা'!

📘 এপিটাফ 📄 একটি সেলফি রিমাইন্ডার!

📄 একটি সেলফি রিমাইন্ডার!


আজকের পৃথিবীতে বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের বানানো এক মিথ্যা জগতে বসবাস করে। নিজেকে জাহির করা, নিজের সম্পদ, অর্থ-বিত্ত, শানশওকত মানুষকে দেখানোর মধ্যে আমরা এক ধরনের আনন্দ অনুভব করি। প্রযুক্তির একটার পর একটা প্ল্যাটফর্ম আমাদের এই জাহির করার কাজটাকে আরো সহজ করে দিচ্ছে। ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম—এসব ছাড়া আজ মানুষের জীবন কল্পনাও করা যায় না। প্রতিটি সময় মানুষ কি করছে না করছে তার আপডেট না জানালে যেন তাদের পেটের ভাত হজমই হচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে তার বিস্ময়কর এক ধাপ হলো—সেলফি।

আপনি যদি নিজের জীবন মানুষের সাথে শেয়ার করার ব্যাপারে এত আন্তরিকই হন, তাহলে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠা মাত্রই কেন সেলফি তুলে আপলোড করেন না? যখন আপনার চোখের কোণায় ময়লা লেগে থাকে, তখন থেকেই ছবি তোলা শুরু করেন না কেন? কিন্তু না! কখন কোন অবস্থায়, কোন ভঙ্গিমায়, কোন এঙ্গেলে ছবি তোলা হবে তা অনেক যাচাই বাছাইয়ের পর ঠিক করা হয়। আমরা শুধু এমন সময়ই ছবি তুলি যখন আমরা কোথাও ঘুরতে গিয়েছি কিংবা যখন নতুন পোশাক পরেছি, কিংবা যখন মজাদার কিছু খাচ্ছি। আর আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করি যেন পৃথিবীকে দেখাতে পারি আমরা জীবনকে উপভোগ করছি। আমরা পৃথিবীকে দেখাতে চাই আমাদের জীবনটা অনেক অসাধারণ, একদম ফাটাফাটি। কিন্তু সত্য হলো এটা আপনার জীবনের বাস্তব চিত্র না—আপনি কোনো রুপকথার জীবনযাপন করেন না। আপনিও মানুষ। আপনার দুঃখ আছে, অভাব আছে, ত্রুটি আছে, সীমাবদ্ধতা আছে। হাজারটা ছবি থেকে বাছাই করে, এডিট করে, নানান এফেক্ট দিয়ে আকর্ষনীয় করে আপলোড করা ফেসবুকের ঐ প্রফাইক পিকচারের মানুষটি আসল আপনি নন। এটা দেখে যারা মুগ্ধ হচ্ছে তারা আসলে আপনাকে দেখে মুগ্ধ হচ্ছে না—আপনি উপরে যে মুখোশ দিয়ে রেখেছেন সেটা দেখে মুগ্ধ হচ্ছে।

আপনিও অন্য সব মানুষের মতই, আপনার জীবনও অন্য সবার মতই। আচ্ছা ধরলাম আসলেই আপনি খুব সুখী, তবুও তা দুনিয়ার সবাইকে প্রচার করে বেড়ানোর দরকার কী? কেননা, মানুষ যখন আপনাকে হিংসা করতে শুরু করবে, আপনার যা আছে তারা সেগুলো কামনা করা শুরু করবে, এবং তারা চাইবে আপনার যা আছে আল্লাহ যেন সেগুলো আপনার কাছ থেকে নিয়ে নেন ও তাদেরকে দান করেন। বিবাহিত দম্পতিদের মধ্যেও এসব কারণে সমস্যার সৃষ্টি হয়। কেন? কারণ আমরা প্রতিনিয়ত এমন এক জীবন যাপনের চেষ্টা করি, এমন এক জীবনের স্বপ্ন দেখি যে জীবন আমাদের না। যদি আল্লাহ আপনাকে মাসে দশ হাজার টাকা রোজগারের সামর্থ্য দেন, তাহলে এমন একজন মানুষের মতো জীবনযাপন করুন যার রোজগার মাসে দশ হাজার টাকা।

কিন্তু না! যে লোক মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা রোজগার করে আমি চাই তার মতো করে জীবন যাপন করতে। কিন্তু আল্লাহ আপনাকে তা দেননি। আল্লাহ আপনাকে এমন কিছু নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন না যা তিনি আপনাকে দেননি। কাজে কেন নিজের জীবনকে জটিল করে তুলছেন? যেসব ভাই কাজের জন্য সারাদিন বাইরে থাকেন, আর কাজের ফাঁকে তাদের সামনে পড়ে যাওয়া প্রতিটি মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন, প্রশংসার দৃষ্টিতে, কামনার দৃষ্টিতে! আবার সেই ভাই বাসায় ফিরে বলেন, ধুর! আমার স্ত্রীকে আমার কাছে বিরক্তিকর মনে হয়! অবশ্যই! আপনার কাছে আপনার স্ত্রীকে বিরক্তিকর মনে হবারই কথা! পরস্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আপনার জীবনের যতখানি সময় আপনি নষ্ট করেছেন, তার ১০% সময়ও যদি আল্লাহ আপনাকে যাকে দিয়েছেন, সেই মানুষটির দিকে তাকিয়ে ব্যয় করতেন, তবে হয়তো আপনি তারও প্রশংসা করতেন। কিন্তু আপনি তা করেন না। কারণ আপনি এমন জিনিসের প্রতি নজর দিচ্ছেন যা পাওনার না। আপনি এমন কিছু নিয়ে মেতে আছেন যা আপনার না। এমন একটি জীবন যাপন করতে চাইছেন যা আপনার জন্য না! আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি নিজের জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে শিখুন, এটাই যথেষ্ট।

অনেকে আছে যারা দীর্ঘসময় ফেসবুকে নষ্ট করে। কিন্তু কেন? আপনার বাস্তব জীবন কি এতই বিরক্তিকর? আপনার জীবনে আর কোনো কাজ নেই, কোনো উদ্দেশ্য নেই? মানুষজন লিখছে, 'আমি অনুক জায়গায় খেতে এসেছি, অমুক জায়গায় ঘুরতে এসেছি।' আপনি কোথায় আছেন, কী করছেন, কী খাচ্ছেন তা দিয়ে আমার কী? এগুলো নিয়ে কার মাথাব্যথা আছে?

অনেক বোন আছেন যারা আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখেন, এবং হীনমন্যতায় ভোগেন, দুঃখবোধ করেন। কিন্তু সত্যটা হলো আপনাকে যেমন দেখায়, যদি আপনি দেখতে তার চেয়ে অন্যরকম হতেন, তবে আপনাকে একটুও ভাল লাগত না। কেন জানেন? কারণ আপনাকে দুনিয়ার কেউ বানায়নি, আপনাকে বানিয়েছেন মহান আল্লাহ। আল্লাহ আপনাকে আপনার মতো করে এভাবেই সৃষ্টি করেছেন। যদি অন্যদের এটা পছন্দ না হয়, এটা তাদের সমস্যা। আপনি যেমন, আল্লাহ চান সে অবস্থাতেই আপনি তার আনুগত্য করুন। আল্লাহ যেভাবে চেয়েছেন সেভাবেই তিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ চান আপনি যেন নিজেকে ঢেকে রাখেন। আল্লাহ চান যে সৌন্দর্য তিনি আপনাকে দিয়েছেন আপনি তার গোপনীয়তা বজায় রাখবেন। আপনার সৌন্দর্য শুধুমাত্র আল্লাহ, আপনার স্বামী এবং যাদের সামনে পর্দা ছাড়া আল্লাহ আপনার জন্য হালাল করেছেন তাদের দেখার জন্য। তাহলে যিনি আপনাকে বানিয়েছেন, যিনি আপনার মালিক, সেই তিনিই বলে দিচ্ছেন, তিনি আপনার কাছে কী চান! তাই মানুষ কী বলল, মানুষ আপনাকে কীভাবে বিচার করল সেটা নিয়ে কেন এত দুশ্চিন্তা করছেন? কারণ সোশ্যাল মিডিয়ার যে জগৎ দেখে আমরা অভ্যস্ত, সেই জগৎ আমাদেরকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। সেই চোখ ধাঁধানো আলোর জগৎ আয়নার সামনে নিজেকে ছোট করে দিচ্ছে, সত্যিকারের 'আমি'কেই আর ভালো লাগছে না মিথ্যের জগতে বসবাস করা অন্যদের দেখে।

📘 এপিটাফ 📄 যে ঘুম আর কোনোদিন ভাঙেনি

📄 যে ঘুম আর কোনোদিন ভাঙেনি


মুহাম্মাদ ইয়াকুব জেনেল, ১৮ বছরের যুবক। প্রতিদিনের মতো রাতে ঘুমিয়েছিল, সকালে তার সেই ঘুম আর ভাঙেনি। মাত্র ১৮ বছর। কোনো অসুখ নেই, স্বাস্থ্যবান এক যুবক। কোনো মানসিক চাপ বা অন্য কিছুই ছিল না, সামনে পড়ে ছিল পুরো জীবনটাই। কারো ধারণাতেও ছিল না, একটা ছেলে এভাবে ঘুমের ভেতর মারা যাবে।

আমার এখনো মনে আছে গতবছর একটা প্রোগ্রামে যখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কখন তুমি নিজেকে আল্লাহর কাছাকাছি অনুভব করো? জবাবে সে বলেছিল,

“এটা ব্যাখ্যাতীত এক ভালোবাসা। আল্লাহর প্রতি এই ভালোবাসা আপনি অনুভব করতে পারবেন যখন তাঁর কাছে কিছু চেয়ে দুআ করবেন। অধিকাংশ সময়েই আপনি অনুভব করতে পারবেন, আপনার মধ্যে এই ইয়াকীন তৈরি হবে যে—আপনার দুআ আল্লাহর দরবারে কবুল হবেই!”

এই অসাধারণ ছেলেটার সাথে আমার দেখা হয়েছিল যখন তার বয়স ১২ বছর। আমরা একটা ফান্ড কালেকশনের প্রোগ্রামে একত্রিত হয়েছিলাম। ডিনার টেবিলে খেতে বসে এই বালক ঘোষণা দিয়েছিল সে আমাদের ফান্ডে ৫০০০ ডলার দেবে। আমি মজা করে বলেছিলাম, ওহে বালক! তুমি ৫০০০ হাজার ডলার পাবে কোথায় শুনি! এই কথা শুনে সে আমার দিকে তাকাল। আমি অবাক হয়ে এই নিষ্পাপ ছেলেটার চেহারায় সেদিন ঈমানের এক নূর দেখতে পেলাম। দৃঢ়টার সাথে মুহাম্মাদ সেদিন আমাকে বলেছিল, আমি এত ডলার কোথা থেকে পাব সেটা নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না। আমার মনে আছে সে ৫০০০ ডলার দেওয়ার ওয়াদা করেছিল, এবং এই ডলার সে জোগাড় করেও দিয়েছিল।

তার মৃত্যুর সংবাদ যখন শুনি তখন আমি হজ্জে, মিনায় অবস্থান করছিলাম। মুহাম্মাদের মৃত্যু সংবাদটা আমার জন্য প্রচণ্ড কষ্টের ছিল। সেই সাথে এই সত্যটুকু আরও একবার উপলব্ধি করলাম। আপনি কখনোই এই দুনিয়াকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে পারবেন না, কারণ মৃত্যুর বাস্তবতা সবসময় আমাদের পিছন পিছন তাড়া করে যাচ্ছে। রাসূল (সা.) বলেছেন, “আনন্দ ধ্বংসকারী মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো।” (ইবনু মাজাহ)

আমাদের এই জীবনে কোনোকিছুর গ্যারান্টি নেই, শুধু মৃত্যু ছাড়া। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বয়স, সুস্থ হোক আর অসুস্থ-সবার জন্য মৃত্যুর গ্যারান্টি আল্লাহ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন,

“প্রত্যেক প্রাণীকে আস্বাদন করতে হবে মৃত্যু। আর তোমরা কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। তারপর যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, তার কার্যসিদ্ধি ঘটবে। আর পার্থিব জীবন ধোঁকা ছাড়া অন্য কোন সম্পদ নয়।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩: ১৮৫)

মৃত্যু আপনাকে খুঁজে নিবেই। আপনি মাটি ফুঁড়ে অন্ধকার গর্তে ঢুকে পড়ুন কিংবা উঁচু পর্বতশৃঙ্গে-মৃত্যু আসবেই। আলি ইবনু আবি তালিব (রা.) বলেছিলেন, “মানুষ ঘুমিয়ে আছে, তারা তখনই জেগে উঠবে—যখন তারা মৃত্যুবরণ করবে।”

দুনিয়াকে ঘিরে আমরা স্বপ্নের জাল বুনে যাচ্ছি। নিজেদের কামনা বাসনা আর উচ্চাশার মোহাবিষ্ট হয়ে দুনিয়ার সত্যিকারের বাস্তবতা ভুলে বসে আছি। কিন্তু যখন মৃত্যু এসে হাজির হয়ে যায় ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কারণ এরপর আর ভুল শোধরানোর জন্য ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। এমন না যে আমরা সবাই মারা যাব—এই বিষয়টা আমাদের কাছে অজানা। কিন্তু আমরা একটা ফ্যান্টাসি জগতে বসবাস করি। জীবনে অনেক বড় হবো, ক্যারিয়ার গড়ব, গাড়ি-বাড়ি, স্ত্রী-সন্তান—ছবির ফ্রেমে সাজিয়ে রাখা সুন্দর একটা জীবন। এভাবে একটা সুখ-শান্তি-দুনিয়াময় জীবন কাটিয়ে অবশেষে মৃত্যু এসে আমাদেরকে একটা “হ্যাপি এন্ডিং” দিয়ে যাবে! কিন্তু বাস্তবতা হলো আল্লাহ আমার আর আপনার প্ল্যান মতো চলে না। তিনিই সেই মহান সত্তা, যার প্ল্যানমতো আমরা চলি। তিনিই সবকিছুর মালিক, পরিকল্পনাকারী, তাঁর নির্দেশ ব্যতীত গাছের একটা পাতাও নড়ে না।

শাদ্দাদ ইবনু আওস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “সেই ব্যক্তি বুদ্ধিমান যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুর পরবর্তী সময়ের জন্য কাজ করে। আর সেই ব্যক্তি নির্বোধ ও অক্ষম যে তার নফসের দাবির অনুসরণ করে আর আল্লাহ তাআলার নিকটে বৃথা আশা পোষণ করে। (ইবনু মাজাহ: ৪২৬০)

তাই নিজের সাথে নিজে সৎ হোন। কেননা, দিনশেষে আপনার কাজের থেকে কেউ যদি লাভবান হয়—সে আপনি নিজেই। আর আপনার গাফিলতি, দুনিয়ার মোহে জীবনটা বরবাদ করার থেকে যদি কারো ক্ষতি হয়-সেও আপনি নিজেই। তাই মৃত্যু আসার আগেই সেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিন। আজ, এখন, এই মুহূর্ত থেকেই...

ফন্ট সাইজ
15px
17px