📘 এপিটাফ 📄 আমিই দায়ী—চাই এমন সরল স্বীকারোক্তি

📄 আমিই দায়ী—চাই এমন সরল স্বীকারোক্তি


একসময় কিছু বিষয় ছিল যা আমরা সবাই জানতাম, ব্যাপারগুলো আমাদের কাছে পরিষ্কার ছিল। মানুষ সেগুলো নিয়ে তর্কাতর্কি করত না। যেমন- একটা সময় কোনো লোক মোটা হলে সে কেন মোটা সেটা সবাই জানত। এ নিয়ে কারো কোনো সংশয় ছিল না, কেউ সেটা নিয়ে তর্কও করত না। লোকটা কেন মোটা? খুব সিম্পল, হয় সে বেশি খায়, হয় শরীর চর্চা করে না, হয়তো ভুল সময়ে খায়। এটা সবাই জানে, সাধারণ জ্ঞানের মতো। মানুষ আলোচনা সভা করে বসে তাত্ত্বিক আলোচনা জুড়ে দিত না কেন লোকটা মোটা হলো। কিন্তু এখন যুগ পাল্টেছে। একজন মানুষ কেন মোটা, এর কারণ সে নয়, বাকি সবাই, বাকি সবকিছু। এক ব্যক্তির বিয়ের সময় ওজন ছিল ৯০ কেজি, বিয়ের পর তার ওজন গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৩০ কেজিতে। এখন এজন্য কি সে নিজেকে দায়ী না করে অন্য সবার দিকে আঙুল তুলবে? স্ত্রী, আমার শ্বশুর-শাশুড়ি, অমুক তমুক জায়গায় ভ্রমণ, এটা ওটা করতে হয় ইত্যাদি। কিন্তু যত অজুহাতই দাঁড় করান না কেন, বাস্তবতা হলো, সত্য হলো—আপনি মোটা হয়েছেন আপনার নিজের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ। অন্য কারো কারণে নয়। এক মোটা লোক ডাক্তারের কাছে গেল। ডাক্তার চেকআপ করে রিপোর্ট দিল। কিন্তু মোটা লোকটা বলল,
-“আরে ডাক্তার সাহেব, মুটিয়ে যাওয়া আমাদের বংশগত রোগ।
-ডাক্তার বলল, হ্যাঁ, এটা বংশগত রোগ! আর আপনার বংশের সবার রোগ হলো এই যে—আপনারা কেউ দৌড়াদৌড়িই করেন না।

আজকাল আমাদের মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে কোনো কিছুর দায় না নেওয়া। যা কিছুই হবে হোক, সব অন্যের দোষ, নিজের কোনো দোষ নেই। এমন কোনো মানুষ নেই, যে হাত তুলে বলতে পারে—আমি এর দায় নিচ্ছি। আজ আমরা দ্বীনের কাছে যাই না, দ্বীনকে আমাদের কাছে আনতে হয়। মসজিদে গিয়ে পাঁচ মিনিট বসে থাকলে মানুষ হাঁসফাঁস করতে থাকে। কোনো আলিমের লেকচার শুনবেন, আরে ধুর এত টাইম কোথায়! আজকালকার ট্রেন্ড হলো সাত মিনিটের বেশি ভিডিও ক্লিপ কেউ দেখে না। এর চেয়ে লম্বা হলেই, ধুর! বেশি লম্বা! খুব বোরিং! আমি কুরআন শিখতে চাই, কিন্তু এর জন্য সময় দিতে চাই না। শর্টকাট খুঁজি, অনলাইনে দ্রুত শেখার মতো জিনিস খুঁজি। একটা সময় সবাই জানত যে স্বাস্থ্যবান হতে হলে ভালো খাওয়া দাওয়া করতে হবে, জিমে যেতে হবে, ডাম্বল তুলতে হবে, বেঞ্চপ্রেস মারতে হবে, নিয়ম মেনে জীবনে চলতে হবে। জনৈক ব্যক্তিকে দেখতাম কাঠির মতো শুকনো। যেন বাতাস আসলে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। সে দুই-তিন সপ্তাহের জন্য উধাও। ফিরে আসার পর দেখি সে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে এসেছে। কী ব্যাপার? এত স্বাস্থ্যবান হলে কীভাবে? এই তো, টুনামাছ আর আলু খেয়ে। অথচ তার শরীরে, মুখে স্টেরয়েডের ছাপ স্পষ্ট। সে ভাব ধরছে যে টুনা মাছ আর আলু খেয়ে তার এই অবস্থা।

আমাদের দ্বীনেরও এই অবস্থা, আমরাও এই লোকটির মত শর্টকার্ট খুঁজি। আপনি যখন দ্বীনের মধ্যে শর্টকাট খুঁজবেন, তখন স্টেরয়েডের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করবে। আমরা যারা এ যুগে বাস করি, উম্মাহর অবস্থা সম্পর্কে জানি, আমরা কি উম্মাহর আজকের এই অবস্থার উপর সন্তুষ্ট? কে দায়ী এ অবস্থার জন্য? এ কথা জিজ্ঞেস করলে প্রত্যেকে দাঁড়িয়ে একশ-দেড়শ দায়ী ব্যক্তির নাম বলবে, যারা উম্মাহর দুরবস্থার জন্য দায়ী। কিন্তু একজনও এর মধ্যে নিজের নামটা রাখবে না। আলিমদের এই দোষ, মসজিদ কমিটির এই দোষ, সমাজের ওই সমস্যা, এরা বেশি সেকেলে, আমাদেরকে এটা করতে দেয় না, ওটা করতে দেয় না! কিন্তু কারো এইটুকু ঈমান নেই যে সাহস করে বলতে পারে উম্মাহর আজকের দুর্দশার জন্য দায়ী আমার মতো মানুষেরা। দায়িত্ববোধ আজকে আমাদের কারো মধ্যে নেই। আমরা নপুংসক হয়ে গেছি। অথচ এই উম্মাহর মানুষগুলোর মধ্যে একসময় পৌরুষ ছিল। সত্যের মুখোমুখি হওয়ার মতো যথেষ্ট সাহসী ছিলাম আমরা।

এক ব্যক্তি আলি ইবনু আবি তালিব (রা.)-এর কাছে এলো। তার উদ্দেশ্য হলো আলিকে বিদ্রূপ করা। সে আলি (রা.)-কে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা এমনটা কেন হচ্ছে বলুন তো! উমরের যুগ ছিল স্বর্ণযুগ। ইসলাম চারদিকে প্রসারিত হচ্ছিল, মুসলিমরা ধনে-মালে ভরপুর হয়ে উঠছিল। আপনার সময় কেন চারিদিকে এত ফিতনা? আলি (রা.) জবাবে বললেন, “কারণ উমর ইবনুল খাত্তাবের সময় তার সাথে আমার মতো লোকেরা ছিল। আর আজকে আমার শাসনামলে আমার সাথে আছে তোমার মতো লোকেরা।”

রাসূল (সা.) বলেছিলেন, উম্মাতের উপমা হলো একটি দেহের মতো। এই উম্মাহ একটি দেহ। এই দেহের একটি অঙ্গ যদি ব্যথা পায়, তাহলে সারা দেহ তা অনুভব করে। সারাদেহ নির্ঘুম থাকে। কেন? এই ব্যথাকে, এই ইনফেকশানকে মোকাবেলা করার জন্য। আজ কি আমরা সত্যিই অনুভব করি যে আমরা এক দেহ? আমরা কি উম্মাহর এই দুর্দশা নিয়ে চিন্তিত? আপনি কি আসলেই এই দেহের একটি অংশ হিসেবে কোনো দায়িত্ববোধ রাখেন? উম্মাহর কী হচ্ছে তা বাদ দিন, আমাদের নিজেদেরই বা কী অবস্থা? ঈমান ও তাওহিদওয়ালা প্রতিটা মানুষের উপর আপনার প্রতিটা গুনাহের সরাসরি প্রভাব পড়ে। সিরিয়ায় যে বোনটি ধর্ষিত হচ্ছে, এইখানে বসে করা আপনার প্রতিটা গুনাহের সরাসরি প্রভাব তার উপর পড়ছে। যেইদিন আপনি পড়েছেন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, সেদিন আপনি ইসলামে প্রবেশ করেছেন। সেদিন থেকে আপনি উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত। সেদিন থেকে আপনি এই দেহের অংশ হয়ে গেছেন। তাই আপনি যা করেন, দেহের উপর তার প্রভাব পড়ে।

আজকে এইসব বাস্তবতার মুখোমুখি আমরা হতে চাই না। বাসায় গিয়ে টিভিটা অন করে তাতে হারিয়ে যেতে পারলেই হলো। আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে এই রোগটা আছে। আরে আমার সালাত হয়তো সুন্দর না, কুরআন পড়ায় হয়তো ত্রুটি আছে, এই ওই গুনাহ আমার দ্বারা হয়, তাতে কী! আমি তো আর কারো ক্ষতি করছি না। এমন কথা অনেককে বলতে শোনা যায়! আবার কেউবা বলে, ভাই, আমি নামাজ পড়ি না, এতে আপনার ব্যস্ত হওয়ার দরকার নেই। এটা আমার আর আল্লাহর মধ্যকার ব্যাপার। ডোন্ট জাজ মি, অনলি আল্লাহ ক্যান জাজ মি!

হ্যাঁ, সত্য কথা। শুধু আল্লাহই আপনার বিচার করবেন। কিন্তু সমস্যা হলো আপনার গুনাহর প্রভাব আমার ওপর পড়ে, আমার স্ত্রীর উপর পড়ে, আমার বাচ্চাদের উপর পড়ে, পুরো উম্মাহর উপর পড়ে। তাই আপনাকে গুনাহ করতে দেখলে, হারামে লিপ্ত হতে দেখলে আমার এতে বাধা না দিয়ে উপায় থাকে না। রাসূল (সা.) এর সহিহ হাদিসে আছে, সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে থাকো। এটা এই উম্মাহর দায়িত্ব। এটা শুধু আলিম ওলামার একার দায়িত্ব না। ঈমান ও তাওহিদওয়ালা প্রতিটা মানুষের দায়িত্ব হলো সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ। এখন আপনি যদি বলেন, আমি না করলে সমস্যা কোথায়? আমি আমার কাজ নিয়ে থাকলাম, অন্যেরা অন্যদেরটা নিয়ে থাকল। রাসূল (সা.) বলেন, তোমরা যদি তা না করো, তাহলে আল্লাহর কসম, আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি আযাব পাঠাবেন। তোমরা আল্লাহর কাছে হাত তুলে দুআ করবে, অথচ আল্লাহ্ তোমাদের দুআ কবুল করবেন না।

আমি যখন এখানে আসার জন্য সিডনী থেকে রওনা হলাম, আমি চার ঘণ্টা আগে এয়ারপোর্টে পৌঁছলাম। কারণ আমি মানসিকভাবে ইন্টারোগেশানের জন্য প্রস্তুত। আমাকে হাজারো প্রশ্ন করা হচ্ছে কেন আমি আমার দেশ ছেড়ে যাচ্ছি। আমি আমার নিজের ঘরে অপরাধীতে পরিণত হয়েছি। আমি জানি যখন আমি লন্ডন এয়ারপোর্টে পৌঁছাব, তখন আমাকে তিন-চার ঘণ্টা ইন্টারোগেশানের মুখে পড়তে হবে। কেন? কারণ আমাকে মুসলিমদের মতো দেখা যায়। আমাদের অত বিলাসিতা করা সাজে না যে, গুনাহ করব আর বলব অনলি আল্লাহ ক্যান জাজ মি। কারণ আমার গুনাহ আপনাকে প্রভাবিত করে, আপনার গুনাহ আমাকে প্রভাবিত করে।

যে কেউ খালেসভাবে কালিমা পড়েছে, আপনি মানুন আর না মানুন, সে মুসলিম। সে মসজিদে আসলো কী আসলো না, সে আপনার মাযহাব অনুসরণ করে কি করে না, সে রোজা রাখল কি রাখলো না, আপনার পীর-মাশায়েখরা তাকে স্বীকার করে কি করে না, এসবের দ্বারা এই বাস্তবতা পরিবর্তন হয়ে যায় না যে, সে একজন মুসলিম। তার পক্ষ থেকে একেবারে স্পষ্ট বড় কুফর প্রকাশ পাওয়ার আগ পর্যন্ত সে এই উম্মাহর অংশ। অনেকে এসব শুনে মাঝেমাঝে ক্ষেপে যায়—কে আপনাকে এসব বলার অধিকার দিয়েছে? কিন্তু তার আগে আপনি বলুন, আপনাকে কে অধিকার দিয়েছে তাকে মুসলিমের খাতা থেকে কেটে দেওয়ার? এমনকি সাহাবারা যে কাজ করেননি। এমনকি রাসূল (সা.) মুনাফিকদেরকে একদম সমাজের ভেতরে রেখে চলতেন, তাদেরকে চিনতেন, তাদের তালিকা করে রেখেছিলেন, কিন্তু সবচেয়ে কাছের সাহাবারাও তাদের নাম জানতে পারেননি। আর আজকে আমি-আপনি কীভাবে ঠিক করে দিচ্ছি কে মুসলিম, আর কে মুসলিম না? কে মুনাফিক, কে সহিহ দ্বীনদার? মানুষ বলে ইসলাম মানেই নাকি ভালোবাসা আর সম্প্রীতি! কীসের সম্প্রীতি! আমরা তো আমাদের নিজেদের সমাজেই ঐক্যবদ্ধ না, নিজেদের মসজিদেই ঐক্যবদ্ধ না। আমাদের নিজেদের পরিবারে ভালোবাসা নেই, সহনশীলতা ও গ্রহণযোগ্যতা নেই। হাসাহাসি, বিদ্রূপ, ঠাট্টা মশকরা করাটাই নিয়ম হয়ে গেছে। যেকোনো এক চ্যাঙড়া ছেলে মাইক তুলে নিয়ে এই আলিম ওই আলিমকে গালাগালি করতে থাকে। যেন তার কাঁধে পুরো উম্মাহর দায়িত্ব এসে পড়েছে। আর আমরা ভাবি আমাদের সাথে এসব কেন হচ্ছে! কেন আজ মুসলিমদের এই অবস্থা? কেন উম্মাহর এই অবস্থা? কেন আল্লাহর সাহায্য আসছে না? উত্তরটা সহজ, এর জন্য আপনি-আমিই দায়ী।

আমাদের কাজের প্রভাব উম্মাহর উপর পড়ে। তারপরও যেখানেই যাই, শুনি, ভাই জানেন? অমুক আলিম না এইরকম, তমুক আলিম এইটা বলে। ভালো কথা! তো আপনি কী করছেন? আমি! আমি তো কিছুই না। আমার কথা কে শুনবে? কিন্তু কেন আপনি “কিচ্ছু না”? কেন আপনার কোনো প্রভাব নেই? কেন আপনি সেই যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি, কিংবা পারছেন না? আপনি যখন বিশ্বাস করতে শুরু করবেন আপনি কিছু না, তখন থেকেই আপনি 'কিছু না' হয়ে যাবেন। আপনি যখন বিশ্বাস করতে শুরু করবেন আপনি কেউ না, তখন থেকেই আপনি 'কেউ না' হয়ে যাবেন। আমাদের উদ্যম আজ এভাবেই ভেঙে পড়েছে। দ্বীনের সাথে সংস্পর্শ নষ্ট হয়ে গেছে। মুহাম্মাদ আল-ফাতিহর যখন চার বছর বয়স, তখন তার মা তাকে সাগরের পাড়ে নিয়ে যেতেন। বলতেন, ওই পাড়ের ওই অঞ্চলটা দেখছ? একদিন তুমি তা বিজয় করবে। আজকে চার বছরের বাচ্চাকে আমরা মসজিদ থেকেই তাড়িয়ে দিই, নোটিশ টাঙিয়ে দিই—'এখানে ৭ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের আসা নিষেধ।' কাকে দোষ দেব আমরা? সব দোষ কাফিরদের, সব পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র? পশ্চিমা সরকাররা কি আপনাকে শিখিয়েছে বাচ্চার সাথে এমন আচরণ করতে? কোন সরকার আপনার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বলেছে তোমার বউয়ের সাথে খারাপ আচরণ করো?

আবার এখন কিছু একটা হলেই কালো জাদু, জিন, রুকইয়া—এটা যেন সবাইকে আছর করে রেখেছে! এর সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেছে, ওর হাত কাঁপতে শুরু করেছে, আর অমনি ধরে নিচ্ছে কেউ তাকে কালো জাদু করেছে। আর শুরু হলো এই শাইখের কাছে ধরনা, ওই শাইখের কাছে দৌড়াদৌড়ি। কিন্তু নিজের চারিত্রিক সমস্যার কারণেও ঝামেলা হতে পারে, এই বাস্তবতার মুখোমুখি আমরা কেউ হতে চাই না। আপনার বিয়ে টিকছে না কারণ হয়তো আপনি ব্যর্থ পিতা, স্বামী হিসেবে আপনি ভালো না। মানুষ ফোন করে বলে, ভাই! যুবসমাজের আজকে এই সমস্যা, ওই সমস্যা। এটা নিয়ে কথা বলেন, ওটা নিয়ে কথা বলেন। যেই যুবসমাজ নিয়ে আপনি নালিশ করেন, এটা ওই যুবসমাজের সমস্যা না। এগুলো আপনার নিজের কাজকর্মের ফলাফল, আপনার নিজের প্রতিবিম্ব। আপনার অবাধ্য সন্তান আপনারই প্রতিচ্ছবি। আপনার সন্তান ব্যর্থ কারণ আপনি পিতা হিসেবে ব্যর্থ। কিন্তু আমরা কেউ দোষ নিজের ঘাড়ে নিতে চাই না। আমার ছেলে খারাপ, কারণ সে খারাপ ছেলেদের সাথে মিশে। তো আপনি তখন কোথায় ছিলেন? চাকরি, ব্যবসা, নিজের কাজে ব্যস্ত! তো আপনার ছেলেকে বড় করছে কে? আমি জানি আপনার রুটি-রুজি কামাতে হয়। কিন্তু আপনিই তো বেছে নিয়েছেন প্রতি সপ্তাহে সপ্তাহে রেস্টুরেন্টে যাওয়ার খরচ। আপনিই তো বেছে নিয়েছেন দামী দামী জায়গায় বাড়ি করা, কারণ কম দামী জায়গায় থাকলে খারাপ দেখায়। আপনার গাড়ির মডেল আপডেট না হলে চলেই না। সন্তানকে অন্যদের হাতে বড় হতে দিয়ে আপনিই এ জীবন বেছে নিয়েছেন।

আমাদের এসব সমস্যার সমাধান হলো দ্বীন। মানুষ সবসময় অলৌকিক কিছুর অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু সেই আলৌকিক সমাধান আছে সেই প্রেসক্রিপশনে, যা স্বয়ং আল্লাহ মানবজাতির জন্য নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ বলেছেন, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিআমত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে।” (সূরাহ মায়েদা, ৫:৩) আপনি যেই সমস্যার মুখোমুখিই হোন না কেন, আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহয় অবশ্যই এর সমাধান আছে। সমস্যার সমাধান চান? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দ্বীনের দিকে আসুন। আপনি এই সংশয়, ওই দ্বিধায় পড়ছেন কারণ আমাদের জীবন থেকে দ্বীন হারিয়ে গেছে। আজকে যদি বলা হয় এটা রাসূলের সুন্নাহ, তখন আমাদের প্রতিক্রিয়া হয়, ও আচ্ছা, সুন্নাহ? আমি আরো ভাবলাম ফরয, করতেই হবে বুঝি! যাক, বাঁচা গেল! আমরা খুব আবেগ দিয়ে বলি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পথ হলো সর্বোত্তম পথ। কারো এতে দ্বিমত নেই। কিন্তু এই কথাটা সত্য নয়। কথাটা শুনলে মনে হয় এটা ছাড়াও আরো অনেক বিকল্প বৈধ পথ আছে, যেগুলোর চেয়ে রাসূলের সুন্নাহ বেশি ভালো। যেন good, better, best এর সেই ছেলেবেলার ইংরেজি শেখার মতো। কিন্তু না, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহ-ই একমাত্র পথ, আর কোনো বিকল্প নেই। এক শাইখকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সাহাবাদের সাথে আমাদের পার্থক্য কোথায়? তিনি বললেন, আমরা রাসূলের সব সুন্নাহ ছেড়ে দেই, কারণ এগুলো স্রেফ সুন্নাহ! আর সাহাবাগণ সব সুন্নাহ পালন করতেন, কারণ এগুলো রাসূলের সুন্নাহ।

সাহাবাগণের জীবদ্দশায় ফরয-সুন্নাহর পার্থক্য নিয়ে কোনো আলোচনাই ছিল না। পরে যখন ফিকহ শাস্ত্র গড়ে ওঠে, তখন তাত্ত্বিক আলোচনার সুবিধার্থে, একটার চেয়ে আরেকটার গুরুত্বের পার্থক্য অনুধাবনের জন্য ফুকাহায়ে কিরাম বাধ্য হয়েছেন এই আলোচনাগুলো সামনে আনতে। দুঃখজনকভাবে আমরা সেটা থেকে এমন অর্থ বের করেছি যেন ফরযটা বাধ্য হয়ে করা লাগে। আর কেউ সুন্নাহ পালন করলে, ওহ! মাশাআল্লাহ! ঠিক আছে, কিন্তু আমাকেও করতে হবে এমন তো না! আপনি এই দ্বীন ছেড়ে কিসের পেছনে ছুটছেন? সত্যিই পূর্ণ সুখ-শান্তি চান? সে জিনিস কখনওই আসবে না, যতক্ষণ না আপনি রাসূল (সা.) কে পূর্ণাঙ্গভাবে নিজের মধ্যে নিয়ে আসছেন। তাই ভুলে যান পাশের মসজিদে কী হচ্ছে। ভুলে যান অমুক ইমামের কী ভুল। আমরা নিজেরা দোষ স্বীকার করার মতো সাহসী হই। নিজেদের দোষ স্বীকার করতে শিখি। তাওবা করতে শিখি। আল্লাহর দিকে আরো এক কদম অগ্রসর হতে শিখি। নিজের জন্য যদি না-ও হয়, অন্তত আমাদের পরিবার, সমাজ, এই উম্মাহর কথা চিন্তা করে হলেও!

📘 এপিটাফ 📄 দুনিয়াতে যেভাবে জীবন যাপন করবেন, মৃত্যুও সেভাবেই হবে

📄 দুনিয়াতে যেভাবে জীবন যাপন করবেন, মৃত্যুও সেভাবেই হবে


মুহাম্মাদ নাগি। একজন অস্ট্রেলিয়ান মুসলিম কিছুদিন আগে ক্যান্সারে মারা যান। ক্যান্সার ধরা পড়ার আগে এই ভাইটি ছিল একেবারেই সুস্থ। চ্যারিটি, দাওয়া, মুসলিম কমিউনিটির যেকোনো প্রয়োজনে সে সবসময় একটিভ ছিল। ক্যান্সার ধরা পড়ার পর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার মধ্যে তার রবের জন্য, দ্বীনের জন্য, আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের জন্য যে প্রস্তুতি দেখা গেছে, তাতে আমরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, আল্লাহ তাকে একটি উত্তম মৃত্যু দিয়েছেন। যখনই কেউ তার সাথে দেখা করতে যেত, সবসময় তার মুখে আল্লাহর প্রশংসা, সুন্দর হাসি, এমনকি মুসলিমদের জন্য সেই কঠিন সময়েও তার কত প্ল্যান, কত স্বপ্ন। রাসূল (সা.) বলেছেন, যে দ্বীনের উপর তুমি জীবন যাপন করবে, তোমার মৃত্যুও সেভাবেই হবে। আমরা ইয়াক্কিনের সাথে বিশ্বাস করি মুহাম্মাদ নাগি এমন এক সুন্দর দ্বীনের উপর জীবন যাপন করেছেন, আর আল্লাহ তাকে সেই দ্বীনের উপরই মৃত্যু দিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কোন দ্বীনের উপর জীবন যাপন করছি? আমরা কীভাবে মৃত্যুবরণ করতে চাই? কোন অবস্থায় আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে চাই? কখনো এটা ভাববেন না যে, যারা ক্যান্সার বা এমন পরীক্ষার সম্মুখীন হয় এটা তাদের জন্য একটা সৌভাগ্য—ভালো কিছু। না, মাঝে মাঝে এটা ঠিক তার বিপরীতও হতে পারে। ক্যান্সার মুহাম্মাদ নাগির জন্য ভালো হয়েছে কারণ সে এমন একটি জীবন অতিবাহিত করেছে যাতে আল্লাহ সন্তুষ্ট ছিলেন। সে সুখের সময় আল্লাহকে স্মরণ রেখেছে তাই আল্লাহ তার কঠিন সময়ে তাকে স্মরণ করেছেন—সুন্দর একটি মৃত্যু দিয়েছেন। আল্লাহ এজন্য তাকে সাহায্য করেননি যে, সে বিশেষ কেউ একজন, না। সে সহজ সময়ে কঠোর পরিশ্রম করেছে, যখন সাধারণত মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায়, যখন সাধারণত মানুষের দ্বীনের জন্য, মসজিদের জন্য সময় থাকে না। সে আল্লাহকে সেই সময় স্মরণ করত, তাই আল্লাহ তাকে তার প্রয়োজনে মনে রেখেছেন। সঠিক সময়ে উত্তম মৃত্যু দিয়েছেন।

আমরা ভাবি, আমি তো মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ আমি নামাজ পড়ি, অবশ্যই আমি তাওহিদের উপর মৃত্যুবরণ করব। আপনি কীভাবে জানেন? কী প্রমাণ আছে যে তাওহিদের উপর মৃত্যুবরণ করবেন? আপনার চারপাশে এমন অনেকেই আছে, জন্মগতভাবেই মুসলিম, মুসলিম হিসেবেই বেড়ে উঠেছে, যাদের আল্লাহ ক্যান্সার দিয়েছিলেন, তবুও তারা আল্লাহর পথে ফিরে আসেনি। এক ভাই একদিন আমাকে ফোন করে জানাল পঞ্চাশোর্ধ এক বৃদ্ধ মুসলিম যিনি কখনোই নামাজ পড়েনি, কখনো সিজদা পর্যন্ত দেয়নি, বৃদ্ধ লোকটি মৃত্যুশয্যায় শায়িত, হয়তোবা এটাই তার জীবনের শেষ মুহুর্ত—দয়া করে আপনি একটু আসুন। এমনকি সেই পরিবারের কেউ নামাজ পড়ত না। লোকটি বলল হয়তো আপনি গেলে ভালো হয়, কিছু উপদেশ দিতে পারেন। যাই হোক, আমি বললাম, ঠিকাছে আপনি বলে দিন আমি আগামীকাল আসব। কিন্তু কয়েক ঘন্টা পর সে লোকটি আমাকে ফোন দিয়ে জানাল আমি যেন না যাই। আমি বললাম, কেন নয়? কারণ, বৃদ্ধ লোকটি যখনই শুনল ধার্মিক কেউ আসবে তার সাথে দেখা করতে, সাথে সাথে নিষেধ করে দিল। এমনকি হাসপাতালে জানিয়ে দিল তার পরিবারের সদস্য ছাড়া কেউ যেন তার কাছে আসতে না পারে। তার দুদিন পর বৃদ্ধটি মারা গেল। আমি বলছি না সে কুফরি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে, তার যা হয়েছে সেটা তার আর আল্লাহর ব্যাপার। কিন্তু আপনি সেভাবেই মারা যাবেন, যেভাবে আপনি দুনিয়াতে বেঁচে ছিলেন। যে জীবন আপনি অতিবাহিত করেছেন, সেই জীবন নিয়েই আপনি মারা যাবেন। আপনারা আপনাদের জীবন নিয়ে এভাবে ভাবুন।

আমরা সবাই মুখে বুলি ছড়াই, আমি আল্লাহকে ভালোবাসি, আল্লাহর রাসূলের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। আল্লাহর আপনার মুখের জবাবের দিকে খেয়াল করবেন না, আল্লাহ আপনার কাজ দেখতে চান। নিজের জীবনের দিকে তাকান। সত্যিই আল্লাহকে ভালোবাসেন? নামাজকে, মসজিদকে ভালোবাসেন? তাহলে দেখুন এগুলোর সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন! মুখে মুখে আপনি আল্লাহর ওলি! আপনি মনে করেন খুব ভালোভাবেই আল্লাহর পথে আছেন, অথচ আপনি শুধু জুম'আর নামাজে আসেন। এতটুকুই আপনার দ্বীন। এক ভাই ফোন করে বললেন, আপনি কি জানেন জুম'আর খুতবা কখন? আমি বললাম, জি ভাই খুতবা শুরু সাড়ে বারোটায়। সে বলল, না ভাই, আমি জানতে চাচ্ছি আপনারা যে খুতবার পর নামাজ পড়েন তা কয়টায় শুরু হয়। আমি বললাম, খুতবা শুরু হয় সাড়ে বারোটায়, আপনাকে নামাজের জন্য সাড়ে বারোটায় পৌঁছাতে হবে। সে বলল, আমার খুতবা শোনার ইচ্ছা নাই, আমাকে শুধু নামাজের সময়টা বলুন। আমি এসে যেন দু'রাকাত নামাজ পড়েই চলে যেতে পারি। এরকম দ্বীনের উপর আপনি থাকবেন, এই দ্বীনের উপরই আপনার মৃত্যু হবে।

আল্লাহকে ভালোবাসার কথা, কুরআনকে ভালোবাসার কথা আমরা সবাই দাবি করি। সত্যিই কুরআন ভালোবাসেন? কতটুকু কুরআন মুখস্ত করেছেন আপনি? কুরআনের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত, আসলেই? আসলেই কি আপনি কুরআনের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত? এখনও আমাদের বেশিরভাগ মানুষ সেই কয়টা সূরাই জানি যেগুলো ছোটবেলায় মুখস্ত করেছিলাম, আল্লাহই ভালো জানেন তাও পুরোপুরি পড়তে পারি কি না। ২০ বছর, ৩০ বছর, এভাবে আপনার জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, আপনি একটা আয়াতও মুখস্ত করতে পারলেন না, অথচ আপনি সিনা টান করে বলতে থাকেন কুরআনকে কতটা ভালোবাসেন! আপনাকে, আমাকে, আমাদের সবাইকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। এই অবস্থায়ই দাঁড়াতে হবে।

এটা ভাববেন না যারা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়, তারা একে ভালো পথে ব্যবহার করে। আমরা ভাবি, হ্যাঁ ভাই ক্যান্সার ভালো, এটা আপনাকে তাওবা করতে সময়, সুযোগ দেয়, যদি আমার ক্যান্সার হতো! আল্লাহু আকবর! কত বড় স্পর্ধা আমাদের। যখন কেউ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় সবাই আশ্চার্যান্বিত হয়, ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ কি আপনাকে বলেন নি যে, আপনি যেকোনো সময় মারা যেতে পারেন? আমাদের মাঝে অনেকের কোট-টাই পরিহিত আর সার্টিফিকেট পাওয়া ডাক্তারের কথায় যতটুকু বিশ্বাস আছে, ততটুকু বিশ্বাস রাসূল (সাঃ) এর হাদিসেও নেই। আপনি যখন হাদিস বা আয়াত পড়েন, মৃত্যু যেকোনো সময় আসবে, আপনি তখন আতঙ্কিত হন না, কিন্তু ডাক্তার যখন বলে, ভাই আপনাকে পরীক্ষা করে দেখলাম আপনি হয়তো আর সপ্তাহ দুএক বাঁচবেন, আপনার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে, দুই সপ্তাহ! এই কয়দিন আছে মাত্র? কিন্তু আপনি এরকম রিএকশান দেখাননি, যখন আল্লাহ বললেন যেকোনো সময় মৃত্যু আসবে!

আমাদের নিজেদের জিজ্ঞেস করা উচিত, আমরা কেমন দ্বীন পালন করছি, কারণ সেই দ্বীনের উপরই আমাদের মৃত্যু হবে। এবং আল্লাহ যেই অবস্থায় আপনার মৃত্যু দেবেন, আপনি মৃত্যুর সময় যে দ্বীন নিয়ে মারা যাবেন, আপনাকে যদি আরও এক মিলিয়ন বছর বাঁচতে দেওয়া হত, আপনি সেই আগের অবস্থায়ই থাকতেন, পরিবর্তন হতেন না। আমরা যখন দেখি কোনো বেনামাজী মারা গেছে, সত্যি তার হয়তো নামাজ পড়ার ইচ্ছে ছিল, সে হয়তো নামাজ পড়তে চেয়েছিল। কিন্তু তার মৃত্যু হয়েছে বেনামাজি অবস্থায়, কারণ বেঁচে থাকা অবস্থায় সে কখনো নামাজী ছিল না। এভাবেই আমাদের সবার মৃত্যু হবে, যেভাবে আমরা দুনিয়াতে বাঁচব, যে পথে চলব।

এই শাইখ বলেন, এক পরিবার তাকে ডেকেছে মৃত্যুশয্যায় এক বৃদ্ধ ব্যক্তিকে দেখার জন্য। শাইখ বললেন, আমি তাঁদের বাড়ি গেলাম, গাড়ি পার্কিং করে যাওয়ার সময় শুনলাম পুরো বাড়িতে উচ্চস্বরে গান বাজছে। তিনি বললেন, আমি আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তারা অন্তত কুরআন তিলাওয়াত বা অন্যকিছু ছেড়ে দিতে পারত। তাঁদের পিতা মারা যাচ্ছে অথচ সেখানে উচ্চস্বরে গান বাজছে। আমি যখন গেলাম তখন অস্বস্তি দূর করার জন্য তারা গান বন্ধ করে কুরআন তিলাওয়াত ছেড়ে দিল। কিন্তু জানেন এরপর কি হলো? তাঁদের পিতা বিছানায় মৃত্যুশয্যা থেকে বলে উঠল, বন্ধ করো এটা, গান ছেড়ে দাও, তা আমার হৃদয়ে প্রশান্তি দেয়। এভাবেই মৃত্যু হবে, যেভাবে আপনি বেঁচে থাকবেন, সেভাবেই আপনি মারা যাবেন।

অন্যদের না দেখে নিজেকে দেখুন। আর কত সময় আপনাকে এসব শুনতে হবে? কত জানাযায় উপস্থিত হতে হবে? আমরা সবাই-ই মুসলিম, কিন্তু কেমন মুসলিম? কোন পর্যায়ের মুসলিম? আজকে আপনার সন্তান যদি অসুস্থ হয়ে যায়, আপনি মুখে না বললেও ভেতরে ঠিকই ভাবেন যে, আল্লাহ কেন আমার সাথে এমন করল, আমি তো নামাজ পড়ি, দান করি, যাকাত দেই! কিন্তু ঐ লোক নামাজ পড়ে না, অথচ তার সন্তানেরা সুখে আছে। আপনি কি এরকম হৃদয় নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে চান?

মুহাম্মাদ নাগির জন্য আমার হিংসা হচ্ছে, কারণ এরকম খুব কমই আছে যারা উত্তমভাবে মৃত্যুবরণ করে। আমার হিংসা হচ্ছে, কারণ আমি জানি না কীভাবে আমি মারা যাবো। আমরা আল্লাহকে একের পর এক কথা দেই। রামাদান আসে রামাদান যায়, হজ্জ আসে হজ্জ যায়, কত মানুষ মারা যায়, কত চুক্তি শেষ হয়, অথচ প্রত্যেকবার আমরা অজুহাত দেখাই আল্লাহর কাছে। তিনি আমাদের রব, যিনি প্রতিটা সময় আমাদের অপেক্ষায় থাকেন, কবে আমরা তাঁর কাছে তাওবা করব, কবে আমরা ইয়া রব বলে ডাক দিব। আর আমরা অপেক্ষায় থাকি, সবকিছু একটু গুছিয়ে উঠেই আল্লাহকে সময় দেব, পরিবার, সন্তান, ব্যবসা সব সেটেল হয়ে গেলে ভালো হয়ে যাব। কিন্তু তার আগেই হয়তো আল্লাহর কাছে আমাদের হাজিরা দেওয়ার সময় চলে আসে। তাই নিজেকে প্রশ্ন করুন আল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন? আপনার নামাজ কেমন? কুরআনের সাথে সম্পর্ক কেমন? আপনার দ্বীন কেমন? কারণ, যে দ্বীনের উপর আপনি জীবন যাপন করবেন, সেই দ্বীনের উপরই আপনার মৃত্যু হবে।

📘 এপিটাফ 📄 জাইরা ওয়াসিম—এক বলিউড তারকার আবেগঘন প্রত্যাবর্তন

📄 জাইরা ওয়াসিম—এক বলিউড তারকার আবেগঘন প্রত্যাবর্তন


(জাইরা ওয়াসিম। সাম্প্রতিক সময়ের একজন জনপ্রিয় বলিউড অভনেত্রী। অভিনয় করেছেন তুমুল জনপ্রিয় কিছু ছবিতে। একদিন হঠাৎ ফেসবুকে একটা পোস্ট দিয়ে তিনি বলিউড জগতের সাথে তাঁর সম্পর্কচ্ছেদ করার ঘোষণা দেন। আবেগঘন, অনুপ্রেরণাদায়ী সেই লেখাটার অনুবাদ এটি। আল্লাহ যেন এই কথাগুলো, হৃদয়ের এই উপলব্ধিগুলো আরো হাজারো মানুষের হিদায়াতের উছিলা বানিয়ে দেন। আমীন।)

“আজ থেকে পাঁচ বছর আগে আমি এমন একটি সিদ্ধান্ত নিই, যাতে আমার জীবনটাই পাল্টে যায়। বলিউডে তখন পা রাখামাত্রই বিপুল খ্যাতি আমাকে ঘিরে ধরে। আমাকে ঘিরেই যেন সবার আগ্রহ। মিডিয়া আমাকে উপস্থাপন করতে শুরু করে তরুণ সমাজের সাফল্যের চূড়ান্ত উদাহরণ হিসেবে। এটা আসলে কখনওই আমার লক্ষ্য ছিল না। বিশেষ করে সাফল্য-ব্যর্থতার যে নতুন ধারণা আমি আত্মস্থ করেছি, তা একেবারেই আলাদা।

পাঁচ বছর পাড়ি দিয়ে আজ বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, আমার এই পেশাগত পরিচয় নিয়ে আমি একদমই খুশি নই। আমি যেন খুব লম্বা সময় ধরে এমন এক মানুষ হতে চাইছি, যা আসলে আমি নই। আমার সারাটা সময়, শ্রম আর আবেগ ব্যয় হচ্ছে যে দুনিয়ায়, সেখানে আমি চাইলেই খাপে খাপে বসতে পারি। কিন্তু আসলে এই জগৎ আমার নয়, আমিও এ জগতের কেউ নই। এই জগৎ আমাকে প্রচুর ভালোবাসা, খ্যাতি আর জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে বটে; কিন্তু তার সাথে দিয়ে গেছে অজ্ঞতার অন্ধকার। নীরবে এবং নিজের অজান্তে আমি একটু একটু করে ঈমানের পথ থেকে সরে যেতে থাকি। যে ধরনের পরিবেশে আমাকে কাজ করতে হতো, তা ক্রমাগত আমার ঈমানের ক্ষতি করতে থাকে। নিজের ধর্মের সাথে আমার সম্পর্ক হুমকির মুখে পড়ে যায়। আমি জোর করে নিজেকে বুঝ দিতাম যে, এগুলো করলে ধর্মের কোনো ক্ষতি হয় না। অথচ আমার জীবন থেকে বারাকাহ হারিয়ে যেতে থাকে। 'বারাকাহ' কথাটার অর্থ কেবল সুখ বা আনন্দ না, প্রশান্তি আর স্থিতিশীলতাও এর অন্তর্ভুক্ত। আমি এগুলোর খুবই অভাব বোধ করতে শুরু করি।

চিন্তা আর প্রবৃত্তির মাঝে বোঝাপড়া করিয়ে নিজের ঈমানের একটি স্থিতিশীল চিত্র তৈরি করার চেষ্টা করতাম। একবার না, দুইবার না; বারবার, হাজারবার। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হই। একদিন বদলে যাব—এই চিন্তায় আটকে থেকে দিনের পর দিন আমি ওই একই মানুষটিই রয়ে গেলাম। সবসময় নিজেকে বুঝ দিতাম যে, সময়মতো সব ঠিকঠাক করে নেব, তার আগ পর্যন্ত একটু সময় নিই। সেইসাথে প্রতিনিয়ত নিজেকে ঈমান ও প্রশান্তি বিনষ্টকারী পরিবেশে ছুঁড়ে ফেলার ব্যাপারটা তো ছিলই। সবকিছুকে আমি সোজাসুজি না নিয়ে বাঁকাভাবে দেখতাম। বাস্তবতা থেকে আমি সারাক্ষণই পালাতে চাইতাম। তবুও বুঝতাম কীসের যেন একটা অভাব আমাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আমি যেন পথের শেষে পথ হারিয়ে এক অবোধ্য যন্ত্রণায় মাথা কুটে মরছি। অবশেষে আমি যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করে নিজের অজ্ঞতা ও দুর্বলতার মুখোমুখি হলাম। শুরু করলাম আল্লাহর বাণীর সাথে অন্তরকে সংযুক্ত করে নিজের অজ্ঞতার চিকিৎসা। কুরআনের মহান ঐশী জ্ঞানে খুঁজে পেলাম পূর্ণতা ও প্রশান্তি। হৃদয় তো আসলে তখনই প্রশান্ত হয়, যখন সে তার স্রষ্টার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে। তাঁর দয়া ও আদেশ-নিষেধগুলো জানতে পারে।

আমি অতি-আত্মবিশ্বাস ছেড়ে দিয়ে একদমই আল্লাহর রহমত ও হিদায়াতের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ি। ধর্মের একদম মৌলিক বিষয়গুলোতে নিজের অজ্ঞতা আমার কাছে ধরা পড়ে। বুঝতে পারি যে, নিজের পার্থিব কামনা-বাসনাকে প্রশ্রয় দেওয়ার ফল হলো অন্তরের এই প্রশান্তির অভাব। অন্তরের রোগ প্রধানত দুই প্রকার। একটি হলো সংশয় ও ভ্রান্তি, আরেকটি হলো খেয়াল-খুশি ও কামনা-বাসনা। কুরআনে দুই ধরনের রোগের কথাই আছে। আল্লাহ বলেন,

“তাদের অন্তরে রয়েছে (সংশয় ও কপটতার) রোগ এবং আল্লাহ তাদের রোগ বাড়িয়ে দিয়েছেন।” (সূরাহ আল-বাকারা ২:১০)

আমার বোধোদয় হলো যে, এই রোগের চিকিৎসা কেবল আল্লাহর দেওয়া হিদায়াতের মাধ্যমেই হতে পারে। আর সত্যিই তিনি আমাকে হিদায়াত করতে শুরু করেন। কুরআন এবং রাসূল (সা.) এর সুন্নাহ হয়ে ওঠে আমার মানদণ্ড। এগুলোর ভিত্তিতেই আমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও জীবনের অর্থের সন্ধান করতে থাকি। মানুষের চাহিদা হলো তার নৈতিক বিশ্বাসের প্রতিফলন; বাহ্যিক আচরণ হলো অন্তরের পূর্ণতার নির্দেশক। তেমনি কুরআন-সুন্নাহর সাথে সম্পর্কের উপরই নির্ভর করে আল্লাহ ও দ্বীন ইসলামের সাথে আমাদের সম্পর্ক কেমন। জীবনের আকাঙ্ক্ষা, উদ্দেশ্য ও অর্থও নির্ধারিত হয় এগুলোর মাধ্যমে। সাফল্য এবং জীবনের অর্থ-উদ্দেশ্যকে আমি যেভাবে বুঝতাম, সেগুলোকে ধীরে ধীরে প্রশ্ন করতে শুরু করলাম। আমার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ন্ত্রক নীতিমালা এক নতুন মাত্রা পেল। জীবনকে আমরা যে একচোখা, সংকীর্ণ ও গতানুগতিক দৃষ্টি দিয়ে দেখি, সেগুলো দিয়ে আসলে সাফল্য নির্ধারিত হয় না। আসল সাফল্য হলো আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূর্ণ করা। অন্ধভাবে জীবনের পথ চলতে চলতে আমরা ভুলেই যাই কেন আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছিল।

“যারা পরকালের প্রতি ঈমান রাখে না, তাদের অন্তরকে ওই দিকে অনুরক্ত হতে দাও; এবং তারা যেন তাতে সন্তুষ্ট থাকে, আর তারা যেসব কাজ করে তা যেন তারা আরও করতে থাকে।” (সূরাহ আল-আন'আম ৬:১১৩)

ভালো-মন্দ কখনও ব্যক্তিস্বার্থ বা পার্থিব মানদণ্ডে নির্ধারিত হয় না। আল্লাহ বলেন, “(ক্ষয়িষ্ণু) সময়ের শপথ। নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিতে নিমজ্জিত। শুধু তারা ছাড়া, যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে, সত্যের দিকে আহ্বান করে এবং ধৈর্যের আহ্বান করে।” (সূরাহ আল-আসর ১০৩: ১-৩)

আত্মার সাথে এই দীর্ঘ যুদ্ধ আমার জন্য বড় ক্লান্তিকর ছিল। জীবনটা ছোট, আবার নিজের সাথে যুদ্ধ করে যাওয়াটা বড় দীর্ঘ। অবশেষে আজই সেই দিন, যেদিন আমি জেনেবুঝেই এই পেশার সাথে সম্পর্কচ্ছেদের খোলাখুলি ঘোষণা দিচ্ছি। এই যাত্রার সফলতা নির্ভর করে প্রথম পদক্ষেপটি কীভাবে নিচ্ছেন, তার উপর। নিজেকে খুব পূত-পবিত্র হিসেবে তুলে ধরাটা আমার এই প্রকাশ্য ঘোষণার উদ্দেশ্য নয়। বরং আমার এই নতুন জীবন সূচনার প্রাক্কালে এইটুকু আমার করাই উচিত। এটা কেবলই আমার প্রথম পদক্ষেপ। এই পথে চলতে শুরু করা আমার স্বচ্ছ উপলব্ধির ফল। আমি এই পথেই থাকতে চাই, এর জন্যেই সংগ্রাম করে যেতে চাই। অতীতে আমি জেনে বা না জেনে অনেক মানুষের মনে উচ্চাশার বীজ বপন করে থাকতে পারি। কিন্তু সকলের প্রতি আমার একটি আন্তরিক পরামর্শ। কারো সাফল্য, খ্যাতি, প্রতিপত্তি বা সম্পদ যত বেশিই হোক না কেন, আপনার অন্তরের প্রশান্তি এবং ঈমানের নূরের তুলনায় এগুলো একদমই মূল্যহীন। কুপ্রবৃত্তির কাছে যেন আত্মসমর্পণ করতে না হয়, সে জন্য জোর প্রচেষ্টা চালান। কারণ কামনা-বাসনার আসলে কোনো শেষ নেই। এইমাত্র যা পেলেন, একটু পরই এরচেয়ে বেশি কিছু একটা পেতে মনে চাইবে। দ্বীন ইসলামের পূর্ণাঙ্গ সত্যকে গোপন করে কেবল নিজের ইচ্ছে-বাসনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অংশের অনুসরণ করা মানে নিজের সাথে প্রতারণা করা। নিজেদের ঈমানের গুরুতর ত্রুটিকে আমরা কখনও কখনও দার্শনিক কথাবার্তা দিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করি। আমাদের মুখ যা বলে, অন্তরে তা থাকে না। তারপরও আমরা একে আঁকড়ে ধরার অজুহাত খুঁজি। আল্লাহ কিন্তু আমাদের এই স্ববিরোধিতার কথা ঠিকই জানেন। তিনি সব না-বলা কথা জানেন। তিনি সর্বশ্রোতা (আস-সামি'), সর্বদ্রষ্টা (আল-বাসীর) এবং সর্বজ্ঞানী (আল-'আলীম)। "আর আল্লাহ জানেন, যা তোমরা গোপন করো এবং যা তোমরা প্রকাশ করো।” (সূরাহ আন-নাহল ১৬:১৯)

নিজের ভ্রান্ত মতবাদকে প্রশ্রয় না দিয়ে সত্যিকারের চেষ্টা করুন। ঈমান ও ইখলাসে ভরা একটি অন্তর দিয়ে তখন সত্যকে উদঘাটন করতে পারবেন। “হে মু'মিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করো, তাহলে তিনি তোমাদেরকে ন্যায়-অন্যায় পার্থক্য করার একটি মান-নির্ণায়ক শক্তি দান করবেন।” (সূরাহ আল-আন'আম ৮:২৯)

আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও সীমালঙ্ঘনের মাঝে কখনও সাফল্যের রোল মডেল খুঁজতে যাবেন না। এ ধরনের মানুষগুলো যেন আপনার পছন্দ-অপছন্দ বা লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের নিয়ামক না হয়ে ওঠে। নবি (সা.) বলেন, “মানুষ যাকে ভালোবাসে, তার সাথেই (হাশরের ময়দানে) থাকবে।” জ্ঞানীদের কাছ থেকে অজানা বিষয়গুলো জেনে নিন। অহংকার ঝেড়ে ফেলুন। আল্লাহর দেওয়া হিদায়াতের মুখাপেক্ষী হোন। তিনিই অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী। তিনি যাকে পথ দেখান, তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না। কোন জিনিসটা জানতে হবে বা পরিবর্তন করতে হবে, তা বুঝতে পারার মতো জ্ঞানবুদ্ধি সবার থাকে না। কাজেই এ ধরনের মানুষগুলোকে নিয়ে খারাপ মন্তব্য করা, গালমন্দ করা, ছোট করা বা উপহাস করাও অনুচিত। বরং আমাদেরই দায়িত্ব হলো পরস্পরকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে সঠিক উপলব্ধি অর্জনে সাহায্য করা। ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা। “আর স্মরণ করিয়ে দাও, নিশ্চয় স্মরণ করিয়ে দিলে মুমিনরা উপকৃত হয়।” (সূরাহ আয-যারিয়াত ৫১:৫৫)

শত্রু শত্রু ভাব নিয়ে মানুষের উপর 'হক কথা' ছুঁড়ে মারলে বা জোর করে গলা দিয়ে ঢুকিয়ে দিলেই কাজ হবে না। বরং নম্রতা ও দয়ার মাধ্যমে আশপাশের মানুষদের মন জয় করতে হবে। “যদি কাউকে ভুল করতে দেখো, তাকে সংশোধন করে দেবে। তার জন্য দুআ করবে। তাকে অপমান করার মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে শয়তানকে সাহায্য করবে না।”—উমার বিন আল-খাত্তাব (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)

কিন্তু সেটা করার আগে নিজের হৃদয়, কাজ, নিয়ত ও আচরণে ইসলামের সঠিক উপলব্ধির প্রতিফলন ঘটাতে হবে। তারপর অন্যের উপকারে এগুলো ব্যবহার করতে হবে। উপলব্ধি, বিশ্বাস ও আচরণ সংক্রান্ত দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো যাদের কাছে অস্পষ্ট, তাদের এগুলো বুঝতে সাহায্য করতে হবে। আর মনে রাখবেন, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার এই পথে যাত্রা শুরু করলে বাধা, বিপত্তি, ঠাট্টা, নিন্দার মুখোমুখি হওয়া লাগবেই। এমনকি আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোর কাছ থেকেই এ ধরনের আচরণ পেতে পারেন সবচেয়ে বেশি। আপনার অতীত জীবনের কথা তুলে মানুষ খোঁটা মারতে পারে। কিন্তু এতে আশা হারাবেন না। আল্লাহর দয়া ও হিদায়াত থেকে নিরাশ হবেন না। আল্লাহ হলেন আল-হাদি (পথপ্রদর্শনকারী)। অতীতের কথা ভেবে তাওবাহ করা থামিয়ে দেবেন না। কারণ আল্লাহ আল-গাফফার (বারবার ক্ষমাকারী)। “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদেরকে ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরকেও ভালোবাসেন।” (সূরাহ আল-বাকারা ২:২২২)

অন্যের মন্তব্য, বিদ্রূপ, গালাগালি, কথাবার্তা বা মানুষের প্রতি ভয় যেন আপনাকে এ পথ থেকে সরিয়ে না দেয়। আপনার বিশ্বাসকে পুরোপুরি প্রকাশ করুন। আল্লাহই আপনার আল-ওয়ালি (অভিভাবক, সাহায্যকারী)। ভবিষ্যতে কী বিপদ হবে বা হবে না, এগুলো নিয়ে ভয়ে মূর্ছা যাবেন না। কারণ আল্লাহ হলেন আর- রাযযাক (রিযিকদাতা)। এ এক দুর্গম, জটিল ও সঙ্গীবিহীন যাত্রা হতে পারে। বিশেষত এখনকার যুগে তো বটেই। কিন্তু মনে রাখবেন আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, “এমন এক সময় আসবে, যখন দ্বীন আঁকড়ে ধরে রাখা জ্বলন্ত অঙ্গার ধরে রাখার মতো কষ্টকর হবে।”

আল্লাহ যেন আমাদের তরীগুলোকে পথ দেখিয়ে তীরে নিয়ে ভেড়ান, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করেন। আল্লাহ যেন আমাদের ঈমান মজবুত করে দেন, তাঁর যিকিরকারীদের অন্তর্ভুক্ত করেন, অন্তরের অবিচলতা ও সংকল্পের দৃঢ়তা দান করেন। আল্লাহ যেন তাঁর প্রজ্ঞার গভীর বুঝ আমাদের দান করেন, নিজেদের সংশয় ও ভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়ে অপরের হিদায়াতের উসিলা হতে সাহায্য করেন। তিনি যেন আমাদের অন্তরকে কপটতা, অহংকার ও অজ্ঞতা থেকে পবিত্র করে দেন। নিয়ত, কথা ও কাজে পরিশুদ্ধি দান করেন। আমীন।”

📘 এপিটাফ 📄 ধন্যবাদ মা!

📄 ধন্যবাদ মা!


আমার এক বন্ধুর মা অনেক দিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন। কিছুদিন আগে খবর পেলাম তিনি মৃত্যুশয্যায়, শেষ অবস্থা চলছে। খবর পেয়ে আমি আমার বন্ধুর সাথে দেখা করতে গেলাম। বন্ধু তার মায়ের অসুস্থতার হালচাল বলতে বলতে হঠাৎ কাঁদতে লাগল। আমি ভাবলাম তার মা এভাবে কষ্ট পাচ্ছে, চোখের সামনে মারা যাচ্ছে, সেজন্যই হয়তো কাঁদছে, খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। আমি যথাসম্ভব তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম, বোঝালাম মৃত্যু খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার, সবাইকেই তো একদিন না একদিন মৃতুবরণ করতে হবে। বন্ধু বলল,

“আমার মা মারা যাচ্ছে এতে আমি কষ্ট পাচ্ছি সত্য, কিন্তু আমার কান্নার কারণ এটা নয়। আমি কাঁদছি কারণ এই পুরো জীবনে আমার মা আমার জন্য যা করেছে, সেজন্য আমি কোনোদিন তাকে ধন্যবাদ দেইনি। একবারও না। একবারও কোনোদিন বলিনি, 'মা তোমাকে ধন্যবাদ!' আর আজ আমার মা পাশের রুমেই আছে, সাকারাতুল মাউত চলছে, আমি গিয়ে যদি ধন্যবাদ জানাইও, সে বুঝতেও পারবে না আমি তাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি।”

ব্যাপারটা নিয়ে কী আমরা কখনো এভাবে ভেবেছি? শেষ কবে আপনি আপনার মা'কে গিয়ে বলেছেন, তুমি আমার জন্য যা করেছ তার জন্য ধন্যবাদ মা! মনে করার চেষ্টা করুন তো? ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য বিশেষ আয়োজন করতে হবে, হাতে ফুল কিংবা উপহার নিয়ে হাজির হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। ধন্যবাদ জানানো মানে কারো কাজকে এপ্রেসিয়েট করা, তার অবদানকে স্বীকার করা, উত্তম আচরণ, দয়া আর ভালোবাসায় তার প্রতিদান দেওয়া।

আপনার মা, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আপনাকে আগলে রেখেছে, কখনো আপনাকে এতটুকু কষ্ট পেতে দেয়নি, কখনো আপনাকে ছেড়ে চলে যায়নি, আপনার সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ঘিরেই তার একটা জীবন কেটে গেছে। সেই মা আপনার জন্য যা করেছে তার জন্য অন্তর থেকে আসা কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার মিশেলে জড়িয়ে ধরে কখনো বলেছেন—'ধন্যবাদ মা'। আমাদের মধ্যে যাদের মা এখনো বেঁচে আছে, তারা এই ব্যাপারটা অনুভব করতে পারে না। একদিন যখন আপনার মা দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে, আপনি বসে বসে কাঁদবেন আর বেঁচে থাকা অবস্থায় জড়িয়ে ধরে একটা ধন্যবাদ না জানানোর জন্য আফসোস করবেন। তখন খুব করে ইচ্ছে হবে মায়ের সেবা করি, মায়ের জন্য এটা করি ওটা করি, কিন্তু মা যখন পাশেই থাকে, পাশের রুমেই, তখন আমরা এর গুরুত্ব বুঝতে পারি না।

আজকে আমরা খুব ঘটা করে বিশ্ব মা দিবস পালন করি। কিন্তু ইসলামে তো প্রতিটা দিনই মা দিবস। সেই হাদিসটার কথা কে না জানে, রাসূল (সা.) কে জিজ্ঞেস করা হলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার উত্তম আচরণ পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে? রাসূল (সা.) বললেন, তোমার মা। এরপর? তিনি বললেন, তোমার মা। এরপর? তিনি বললেন, তোমার মা। এরপর? তিনি বললেন, এরপর তোমার বাবা।

আমরা হাদিসটাকে খুব সাধারণভাবে ব্যাখ্যা করি। আমরা মনে করি এখানে শুধু ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য বোঝানো হয়েছে। আমার মা বেশি ভালোবাসা পাবে আমার বাবার চেয়ে। আসলে ব্যাপারটা এরকম নয়। এর অর্থ হলো আপনার অর্থ সম্পদ, সময়, স্বাস্থ্য, আপনার যা কিছু আছে সবকিছু—সবকিছুর উপর সবচেয়ে বেশি হকদার আপনার মা, আপনার মা, আপনার মা, এবং এরপর আপনার বাবা।

সুতরাং ভাই ও বোনেরা, যাদের মা এখনো বেঁচে আছে তারা মায়ের মৃত্যুর পর আফসোস করার জন্য অপেক্ষা না করে এখনোই সময়ের સদ্ব্যবহার করে নিন। আপনার মা'কে একবার বলুন, বারবার বলুন, প্রতিদিন বলুন—'ধন্যবাদ মা'!

ফন্ট সাইজ
15px
17px