📘 এপিটাফ 📄 এমন জান্নাত—যার তলদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত

📄 এমন জান্নাত—যার তলদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত


দুনিয়ায় আপনি যেসব কাজ করেন, সেসব কাজের উৎসাহ যোগায় কিসে? কেন আপনি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কর্মস্থলে যান? কাজের প্রতি ভালোবাসা? না, টাকার প্রতি ভালোবাসা। আপনার জীবন চলতে টাকার দরকার। কাজ করলে টাকা পাবেন—এজন্যই আপনি কাজে যান। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন যান? জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসার কারণে? উঁহু। আপনি জানেন পড়াশোনা করলে ভালো চাকরি পাবেন। চাকরি পেলে কী হবে? হ্যাঁ, টাকা হবে। সব ঘুরেফিরে ওই টাকাতেই ফিরে আসে। আচ্ছা তাহলে আমরা সালাত পড়ি কেন? সিয়াম পালন করি কেন? এই ইসলামি বইপত্র পড়ি কেন? মুসলিম হিসেবে আমরা যা করি, তা আসলে কেন করি? এগুলোও টাকার জন্যই। তবে এই টাকা দুনিয়ার টাকা নয়—আখিরাতের টাকা। সেখানকার প্রাইজ হলো জান্নাত। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন যারা আখিরাতে সফল, তাদের তিনি পুরস্কৃত করবেন। কী দিয়ে পুরস্কৃত করবেন? জান্নাত দিয়ে।

এই যে ইসলামি বই, ওয়াজ মাহফিল এসব করে আমরা আমাদের আত্মিক উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করি, ভালো মুসলিম হওয়ার চেষ্টা করি, এসব আসলে কেন? এগুলোর পুরস্কারটা কী? কী হবে যদি আপনি পৃথিবীর সেরা মুসলিম হয়ে যান? দ্বীনের বড় দাঈ হয়ে যান? লাভটা কী তাহলে? আল্লাহ্ বলেছেন, “আমি আমার বান্দাদের জন্য এমন জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছি, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি, কোনো হৃদয় কল্পনাও করেনি।” সফলকাম মুমিনদের জন্য আল্লাহ এই পুরস্কার প্রস্তুত করেছেন। জান্নাত! জান্নাতুন তাজরি মিন তাহতিহাল আনহার—এমন জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হতে থাকে।

সিডনীতে বাড়ির মূল্য নির্ধারিত হয় বিচ থেকে দূরত্বের ভিত্তিতে। বিচের যত কাছে বাড়ি হবে, এর দাম তত বেশি হবে। বাসা থেকে যদি সমুদ্র দেখা যায়, তাহলে তাকে বলা হয় 'ওয়াটারভিউ হাউজ'। ধুপ করে দাম বেড়ে তখন দ্বিগুণ হয়ে যাবে। আর যদি সমুদ্রের একবারে কাছে বাড়ি হয়, মানে বাড়ি আর সমুদ্রের মাঝখানে কেবল সৈকত—সেটাকে সিডনীবাসীরা বলে 'প্রাইম রিয়েল এস্টেট'। আল্লাহ বলেননি যে আপনাকে নদীর কাছাকাছি বাড়িঘর দেবেন। বলেছেন যে আপনার পায়ের নিচে, আপনার বাড়ির নিচ দিয়ে, প্রাসাদের নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত হতে থাকবে। মুমিন বান্দাদের জন্য আল্লাহ এমন পুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন।

সেই জান্নাতে আবার একাধিক স্তর রয়েছে। এক স্তরের বাসিন্দারা অপর স্তরের বাসিন্দাদের মতো নয়। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন আপনি এমিরেটস ফ্লাইটে করে অসলো থেকে সিডনী যাচ্ছেন। আপনি আর আমি একই ফ্লাইটে উঠে সিডনী চলেছি। টেকনিল্যালি, আমি আর আপনি একই বিমানে আছি। কিন্তু ফার্স্ট ক্লাসে বসা যাত্রী আর পেছনে বসা যাত্রী কি একইরকম? ইকোনমি ক্লাস, একদম টয়লেটের সাথে। এরকম যাত্রী এয়ারপোর্টে আসলে কী হয়? “হ্যাঁ, কোন ক্লাসে যাচ্ছেন আপনি? বিজনেস, না ইকোনমি?” ইকোনমি শোনার পর তারা বলবে, “ও আচ্ছা, যান ওই বামদিকে গিয়ে লাইনে দাঁড়ান।” সেই লাইনে দাঁড়িয়ে মনে হবে, "ইয়া আল্লাহ্! এই প্লেন ছেড়ে চলে যাবে কিন্তু এই লম্বা লাইন মনে হয় শেষ হবে না। এখানেই দাঁড়িয়ে থাকা লাগবে।” আর যারা জবাব দেয় বিজনেস ক্লাস, তাদেরকে বলা হয়, “স্যার/ম্যাডাম, আসুন। এইদিকে আসুন প্লিজ।” আপনার সাথে দুই-তিন কেজি মালামাল থাকলেই ঝামেলা। কিন্তু ফার্স্ট ক্লাস বা বিজনেসের ওরা সর্বনিম্ন পঞ্চাশ কেজি সাথে করে নিয়ে যেতে পারে। এরা কি সমান? তারপর বিমানে ঢোকার পর কী হয়? তারা আপনাকে ফার্স্ট ক্লাস আর বিজনেস ক্লাসের মধ্য দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাবে। তারপর বলবে, “ওই টয়লেট পর্যন্ত হাঁটতে থাকেন।” সীটের অবস্থা দেখেন, সামনে টিভি স্ক্রীনের সাইজ দেখেন। অন্তর জ্বলেপুড়ে যাবে। চৌদ্দ ঘণ্টার জার্নি আপনাকে টয়লেটের গন্ধ শুঁকে পার করতে হবে। আর ওই ব্যাটা ফার্স্ট ক্লাসের সীটে আরাম করে শুয়ে ঘুমাবে। অথচ আপনি-আমি কি বড়াই করে বলতে পারি না, “আরে ওই লোকের সাথে একই এমিরেটস ফ্লাইটেই তো যাচ্ছি না”? কিন্তু তুলনা হয়? খাবার আলাদা, সীট আলাদা, আপ্যায়ন আলাদা। দুনিয়াতেই এই অবস্থা, আর আল্লাহ আখিরাতে যাদের আপ্যায়ন করাবেন, তাদের অবস্থা কী? আপনার কি মনে হয় তারা সমান হবে? আল্লাহর কসম, তারা সমান নয়।

জান্নাতে সময়ের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না! আল্লাহ বলেছেন খালিদীনা ফীহা আবাদা—সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, অনন্তকাল ধরে। একশ বছর না, এক হাজার বছর না, এক মিলিয়ন বছর না—আপনি সেখানে থাকবেন অনন্তকাল! সেখানে আপনি কখনও মরবেন না। ভাবা যায়? বোঝানোর জন্য আলিমগণ একটি উদাহরণ দিয়ে থাকেন। ধরুন এই পুরো আসমান জমিন সরিষা দানা দিয়ে ভর্তি করে ফেলা হলো। তারপর এক হাজার বছর পর পর একটি করে পাখি এসে সেখান থেকে একটি করে দানা নিয়ে যেতে লাগল। পাখিগুলো দানা নিয়ে শেষ করে ফেলবে, তারপরও আপনি জান্নাতে জীবিত অবস্থায়ই থাকবেন। এটাই হলো খালিদীনা ফীহা আবাদা-অনন্তকালের জীবন। যেখানে মৃত্যুর ভয় নেই, বার্ধক্য নেই।

এক বুড়ি মহিলা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! জান্নাতে কি আমার মতো বুড়িদের জন্য জায়গা আছে? রাসূল (সা.) বললেন, “না। জান্নাতে তো বৃদ্ধাদের জন্য কোনো জায়গা নেই।" বুড়ি কাঁদতে শুরু করল। রাসূল (সা.) হেসে দিলেন। হৃদয়কাড়া এক হাসি। তারপর বললেন, “আল্লাহ্ আপনাকে যৌবন অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং চিরকাল আপনি সে অবস্থায়ই থাকবেন।” জান্নাতীদের বয়স হবে তেত্রিশের কাছাকাছি। আপনি, আপনার বাবা, আপনার মা, সবার একই বয়স! জান্নাতে আপনি হবেন আপনার পিতা আদম (আ.) এর সমান-প্রায় ত্রিশ মিটার। সেখানে আপনাকে কখনো টয়লেটে যেতে হবে না। বোনেদের জান্নাতে কখনওই আর ঋতুঃস্রাব হবে না। এই প্রাকৃতিক ঘটনার সময় যেসব মানসিক অস্থিরতা আসত, সেসব আর কখনও আসবে না। সে এমন এক জান্নাত, দুনিয়ার কোনো দুঃখকষ্ট, পেরেশানি কাউকে স্পর্শ করবে না-শেষ, সবকিছুর সমাপ্তি। জান্নাতে কখনও অসুস্থ হবেন না, ক্লান্ত হবেন না, ঘুম আসবে না। জান্নাতে আপনি সত্যিকারের সুখের সন্ধান পাবেন। এটিই মুমিনদের জন্য আল্লাহর তৈরিকৃত পুরস্কার। জান্নাতে কোনো সিয়াম রাখা লাগবে না, সালাত পড়া লাগবে না, ওযু করা লাগবে না, কিচ্ছু লাগবে না। জান্নাতে আপনি ক্লীন শেইভড থাকবেন।

জান্নাতে আপনি আয়নার দিকে তাকাবেন আর মনে হবে আপনি দুনিয়ার সুন্দরতম সৃষ্টি। দুনিয়ায় সবচেয়ে শ্বাসরুদ্ধকর সুন্দর মানুষটাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন, “আচ্ছা, নিজের মধ্যে কোন দুটি জিনিস আপনি আরেকটু সুন্দর করতে চান বলুন তো!” সে আপনাকে বিশাল একটা লিস্ট ধরিয়ে দেবে। কিন্তু জান্নাতে আপনি আয়নার দিকে তাকাবেন আর আপনার একবারও মনে হবে না কোনো কমতি আছে, কোনো ত্রুটি আছে, এর চেয়ে আর ভালো হওয়া সম্ভব না। সবদিক দিয়ে পারফেক্ট। হ্যাঁ, এটা শুধু জান্নাতেই ঘটবে। জান্নাতে আপনার আশপাশের কিছুই পুরনো হবে না। দুনিয়ায় সবই পুরনো হয়।

নিন্টেন্ডো ভিডিও গেইমের কথা মনে আছে? একদম প্রথমটা। আজকের ছেলেপিলেরা ভাববে, “এটা আবার কোন ডাইনোসরের নাম?” আমাদের সময় এটাই ছিল সেরা। তখনকার গেইমাররা এটাকে মনে করত দুনিয়ার বুকে জান্নাত। আমি যখন এটার খবর পেলাম, আমার তো অবস্থা খারাপ। আমার বাবা-মায়ের অত টাকা ছিল না। তাদের ধরে খুব করে বলতে হয়েছিল, “প্লীজ, এটা কিনে দাও। প্লীজ! প্লীজ!” অনেকদিন টাকা জমিয়ে জমিয়ে যখন তারা আমাকে সেটা কিনে দিলেন, তখন তো মনে হলো, "আহ! দুনিয়া আমার হাতের মুঠোয়!” সেই সুখ কয়দিন টিকেছিল জানেন? সুপার নিন্টেন্ডো বের হওয়ার আগ পর্যন্ত। টাকা যোগাড় করতেই যেহেতু অনেক সময় লেগে গিয়েছিল, তাই সুপার নিন্টেন্ডো বের হওয়ার আগে খুব কম সময় পেয়েছিলাম। যেটা আমার মহাসুখের কারণ ছিল, সেটাই আমার দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে এলো। ভাবতে লাগলাম, কী রে, ভাই! আমি এদিকে ডাকান কমপ্লিট করলাম মাত্র। আর ওইদিকে আরেকজন মারিও খেলছে। আল্লাহ্ কসম! আমার জীবন এভাবেই কাটতে লাগল। মা যখন আমাকে সুপার নিন্টেন্ডো কিনে দিলেন, ততদিনে নিন্টেন্ডো সিক্সটি ফোর বেরিয়ে গেল।

এটাই দুনিয়া। সুখপাখি কখনওই ধরা দেয় না। আপনার কেনা প্রথম গাড়িটার কথা মনে আছে? আমি প্রথম যেই গাড়িটা কিনেছিলাম, সেটা ছিল পৃথিবীর বুকে জঞ্জালের মতো, এই গাড়ি তখন কেউ কেনে না। কিন্তু সেসময় আমি ওটাকে ল্যাম্বরগিনির মতো ভাব নিয়ে চালাতাম। নিজেকে নায়ক ভাবতাম। তখন থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত আপনি আমি আমাদের গাড়ি আপগ্রেড করেই চলেছি, করেই চলেছি। সুখ খুঁজে পেয়েছেন? আপনার প্রথম ফোনের কথা মনে আছে? কতদিন ধরে আপনি ফোন আপগ্রেড করে চলেছেন? এমনকি প্রথম আইফোনটার কথাও কি মনে আছে? আইফোন থ্রি, আইফোন ফোর, আইফোন ফোর এস? আমার কাছে মনে হতো এটার অর্থ মনে হয় 'আইফোন ফোর স্টুপিড'। একই জিনিস, খালি নামের সাথে একটা এস লাগিয়ে দিয়ে বের করেছে। কিন্তু ওই একটা এস থাকার কারণেই আপনার মন দুঃখে ভরে যাবে, “হায় হায়! এটা বাদ দিয়ে এখনও আইফোন ফোর কেন চালাচ্ছি?”

কিন্তু জান্নাতে ঠিক বিপরীত। জান্নাতে ফল খেতে ইচ্ছে হলে ফলই আপনার কাছে চলে আসবে। ফলে প্রথম কামড়টা বসানোর সাথে সাথে মনে হবে আপনার জীবনে পাওয়া সেরা স্বাদ। দিতীয় কামড় বসাবেন, সেটা প্রথম কামড়ের চেয়ে ভালো মনে হবে। অনন্তকাল ধরে আপনি সেই প্রথম কামড়ের স্বাদ আর পাবেন না। প্রতিটা কামড়ের সাথে এটি আগের চেয়ে ভালো হতেই থাকবে, হতেই থাকবে, হতেই থাকবে। জান্নাতে যখন আপনি প্রথমবার আপনার স্ত্রীকে দেখবেন, আপনি এত অভিভূত হয়ে যাবেন যে ওখানেই চল্লিশ বছর কেটে যাবে। হা করে চল্লিশ বছর তাকিয়ে থাকার পর একটু অন্যদিকে ফিরে আবার তার দিকে তাকাবেন। সে এতক্ষণে আগের চেয়েও সুন্দরী হয়ে গেছে। দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দরী নারীর দিকেও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর কোনো না কোনো ত্রুটি চোখে পড়বে, মনে হবে, "আচ্ছা, এর নাকটা কি একটু বাঁকা?” কিন্তু জান্নাতে এরকম হবে না, সেখানে যতই দেখবেন সৌন্দর্য বাড়তেই থাকবে।

দুনিয়ার স্ত্রী যদি জান্নাতেও আপনার সঙ্গী হয়, রাসূল (সা) বলেছেন যে, হুরদের তুলনায় তার সৌন্দর্য হবে মোমবাতির তুলনায় সূর্যের আলোর মতো-অতুলনীয়। এইসব আল্লাহ আপনার জন্য তৈরি করে রেখেছেন। সেখানে আপনার তাঁবু তৈরি হবে একটি মুক্তা থেকে, ষাট মাইল লম্বা, ষাট মাইল প্রশস্ত। জান্নাতে আপনার প্রাসাদের ইটগুলো হবে সোনা আর রূপার। সেগুলোর গাঁথুনির মসলা হবে কস্তুরীর তৈরি। এসব জান্নাতে থাকবে আপনার জন্য। যদি আপনি এই দুনিয়ায় অল্প সময়ের জন্য ধৈর্য ধরতে পারেন। কিন্তু জান্নাতের সবচেয় আকর্ষণীয় ব্যাপারটি কী জানেন? আল্লাহ আমাদের সবাইকে জড়ো করবেন এবং আমাদের সাথে কথা বলবেন। সহিহ হাদিসে এসেছে, আল্লাহ্ আমাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন, “তোমরা কি আর কিছু চাও আমার কাছে?” আমরা বলব, “হে আল্লাহ! আপনি তো আমাদের জাহান্নাম থেকে বাঁচিয়েছেন। আমাদেরকে আপনার জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন। এসব নিয়ামত আমাদেরকে দিয়েছেন। আমরা আর কী চাইতে পারি?” আল্লাহ বলবেন, “তোমরা কি সন্তুষ্ট?” আমর বলব, “হে আল্লাহ! অবশ্যই আমরা সন্তুষ্ট।” আল্লাহ বলবেন, “তাহলে এখন থেকে নিয়ে আর কখনওই আমি তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হবো না।” আল্লাহ বলবেন, আমি আমার ও তোমাদের মধ্য থেকে পর্দা সরিয়ে দিচ্ছি যাতে তোমরা আমাকে দেখতে পাও। আর আপনি স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখতে শুরু করবেন। আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছেন! ভাবা যায়? সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! সত্যিই আমরা আল্লাহ্কে দেখতে পাব? রাসূল (সা.) পূর্ণিমার চাঁদের দিকে দেখিয়ে বললেন, তোমরা কি এই চাঁদটি দেখতে পাচ্ছ? সাহাবাগণ বললেন, হ্যাঁ। রাসূল (সা.) বললেন, চাঁদকে যেমন কোনো বাধাবিঘ্ন ছাড়াই দেখতে পাচ্ছ, আল্লাহকেও সেভাবেই দেখতে পাবে। এটি হলো জান্নাতের চূড়ান্ত পুরস্কার।

দুনিয়ার এই পঞ্চাশ-ষাট বছর কিচ্ছু নয়। ধৈর্য ধরে যদি দ্বীন আঁকড়ে ধরে রাখতে পারেন, আল্লাহ আপনার জন্য এরচেয়ে ভালো কিছু রেখেছেন। কিন্তু এর জন্য আপনাদেরকে সেই জান্নাতের মূল্য চুকাতে হবে। দুনিয়াতে যে ফেরারি গাড়িতে চড়ে, সে কি এটার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেনি? যে বিরাট ম্যানশনে থাকে, সে কি কঠোর পরিশ্রম করেনি? তেমনি জান্নাত পেতে হলেও আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। কেউ কেউ বলে, “ভাই, আমার সেই পরিমাণ পরিশ্রমের স্ট্যামিনা নেই।” আমি বলি, এমন মনে হলে তখন স্মরণ করবেন আপনার লক্ষ্য কী। আপনি সেই মানুষদের মধ্যে থাকতে চান, যারা জান্নাতে চিরকাল থাকবেন।

আল্লাহর ওয়াস্তে জীবনটাকে হেলায় হারাবেন না। আখিরাতে আল্লাহ বান্দাদের বলবেন, কুরআন তিলাওয়াত করতে থাকো আর জান্নাতের এক স্তর থেকে আরেক স্তরে উঠতে থাকো। শেষ যে আয়াত তিলাওয়াত করবে, সেটাই হবে জান্নাতে তোমার স্থান। তাই কুরআন শিক্ষা করা কখনওই ছেড়ে দেবেন না। প্রতিটা আয়াত মুখস্থ করার সাথে সাথে আপনি জান্নাতে নিজের মর্যাদা উন্নীত করছেন। আখিরাতে মনে হবে, ইশ! আর একটা আয়াত জানলেই আমি আজকে ওই অবস্থায় থাকতাম! এতশত ইসলামি বই পড়ে আর ওয়াজ শুনে আপনার অ্যাকশান প্ল্যান এখন কী হবে? এগুলোকে জাস্ট বিনোদন হিসেবে নিয়ে যেমন-তেমন চলাফেরা করতে থাকবেন? নাকি অন্তরে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে নেবেন জান্নাতে রাসূলুল্লাহর সাথে ফার্স্ট ক্লাস চেয়ারের যাত্রী হওয়ার? সিদ্ধান্ত আপনার।

📘 এপিটাফ 📄 মূসা (আ.) ও এক গুনাহগার

📄 মূসা (আ.) ও এক গুনাহগার


আল্লাহ যখন আমাদের প্রতি কোনো আচরণ করেন, উম্মাহ হিসেবে আচরণ করেন, আলাদা আলাদা ব্যক্তি হিসেবে না। আল্লাহর বরকত যখন আসে, কার উপর আসে? সবার উপর। আল্লাহর আযাব যখন আসে, সেটাও আসে সবার উপর! এটাই আল্লাহর সিস্টেম। আল্লাহর রহমত নাযিল হলে সবাই সেখান থেকে উপকৃত হতে পারে। তেমনি, আল্লাহর গযব নাযিল হলে সবাইকেই তা ভোগ করতে হয়।

মূসা (আ.) এর জাতির উপর একবার দুর্ভিক্ষ প্রেরণ করা হলো। মূসা (আ), যিনি আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলার সৌভাগ্য অর্জন করেন, তাঁর জাতির উপর নেমে এলো ভয়াবহ এক দুর্ভিক্ষ! জাতির প্রত্যেকে কষ্ট ভোগ করছে। পানি নেই, খাবার নেই, ফসল নেই, পশু মরছে, মানুষ মরছে। অথচ তাদের মাঝে একজন নবি রয়েছেন। মানুষ তাঁর কাছে এসে জানতে চাইল, হে মূসা! এসব কী হচ্ছে? মূসা (আ.) তাঁর জাতির লোকদের নিয়ে খোলা ময়দানে গেলেন। দুআ করলেন, হে আল্লাহ্! আপনি দেখতে পাচ্ছেন আমার জাতির কী অবস্থা। আমরা বৃষ্টির জন্য অনুনয় করছি। একজন নবি দুআ করলে স্বভাবতই আল্লাহর উত্তর কী হয়? তিনি তা কবুল করেন। সবাই অপেক্ষা করছে এই বুঝি বৃষ্টি আসলো, কিন্তু কিছুই হচ্ছে না! আল্লাহর একজন নবি, অনুনয় বিনয় করে সবাইকে নিয়ে দু'আ করছেন, কিন্তু দুআর কোনো উত্তর নেই! ভাবতে পারেন!

মূসা (আ.) ভাবছেন, ইয়া আল্লাহ! এ কী হলো? আমি বৃষ্টির জন্য দুআ করলাম, অথচ কোনো বৃষ্টি নেই! আল্লাহর পক্ষ থেকে জবাব এলো, হে মূসা! তোমার জাতির মধ্যে একজন গুনাহগার আছে। মূসা (আ.) লোকেদের দিকে ঘুরে বললেন, তোমাদের মধ্যে একজন গুনাহগার আছে। সে সামনে বেরিয়ে এসো। ওই ব্যক্তি মনে মনে অনুতপ্ত হলো, তাওবা করল। কিন্তু মূসা (আ.) এর সামনে বেরিয়ে এসে পরিচয় দিল না। মূসা (আ.) অপেক্ষা করছেন, কেউ আসে না। তিনি ফিরে গিয়ে আবার আল্লাহর কাছে বৃষ্টির জন্য দু'আ করলেন। এবার তাঁকে অবাক করে দিয়ে বৃষ্টি নেমে এলো! মূসা (আ.) খুশি, কিন্তু সেই সাথে অবাক। ইয়া আল্লাহ্! এটার ব্যাখ্যা কী? প্রথমবার বৃষ্টি চাইলাম, বলা হলো একজন গুনাহগার আছে। গুনাহগারকে ডাকলাম, কেউ এলো না। আবার দুআ করলাম, বৃষ্টি চলে এলো! ব্যাপারটা কী? আল্লাহ জানালেন, ওই এক ব্যক্তির কারণে আমি বৃষ্টি আটকে রেখেছিলাম। কিন্তু সে তাওবা করেছে, আমার কাছে মাফ চেয়েছে। আমি তার তাওবা কবুল করেছি। এবং সেই একজন ব্যক্তির তাওবার কারণেই এখন আমি বৃষ্টি দান করলাম। মূসা (আ.) এর খুব আগ্রহবোধ হলো। হে আল্লাহ্! এই লোকটি কে? আমাকে তার পরিচয় জানান। আল্লাহ বললেন, হে মূসা! সে যখন গুনাহগার ছিল, তখনই আমি তাকে প্রকাশ করে দেইনি। আর এখন যখন সে আমার কাছে খালেসভাবে তাওবা করেছে, এখন কী করে আমি তাকে প্রকাশ করে দেই?

আমরা এই কাহিনী পড়ার পর ভাবি, আরে কী অসাধারণ কাহিনী! বৃষ্টি চলে এলো। তারপর তারা সবাই সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগল। কিন্তু বৃষ্টি আসাটা এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, সেই লোকটি নিজের গুনাহ স্বীকার করার মতো যথেষ্ট সাহসী ছিল, তাওবা করার মতো যথেষ্ট হিম্মত তার ছিল। যেই গুণ আজ আমাদের বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে নেই। আমাদের শহরে আজ কত গুনাহগার, কত মুসলিম বেনামাজি, আমাদের কত বোন বেপর্দা, আমাদের কত মুরুব্বি সূরাহ ফাতিহা পড়তে জানে না! শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির পাপের কারণে আল্লাহ একজন নবির উপর, নবির পুরো একটি জাতির উপর, মৃত্যুপথযাত্রী, নিরীহ নারী, শিশু, পশু, ফসলের উপর বৃষ্টি দেননি! শুধু এক ব্যক্তির গুনাহের কারণে! তাহলে আজ আমাদের অবস্থা কেমন হওয়া উচিত?

কয়জন আমরা আজ সাহস করে উম্মাহর দুর্দশার জন্য নিজেকে দায়ী করতে পারব? বলতে পারব যে এইসব আমার গোপনে করা গুনাহের ফল। আমার জিহ্বার ফল-যাকে আমি চুপ রাখতে পারিনি, আমার দৃষ্টির ফল—যাকে আমি অবনত রাখতে পারিনি? কিন্তু না! আমরা নিজেকে ছাড়া বাকি সবার দিকে আঙুল তুলি। আল্লাহ তাঁর কিতাবে বলেছেন, “আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” (সূরাহ রা'দ, ১৩:১১)

এখনও আপনি এই কথাগুলো পড়ে নিজের পাশে বসা লোকটির কী কী পরিবর্তন হওয়া দরকার, তা ভাবছেন। এখনও আপনি নিজের কথা ভাবছেন না। আপনি যত গুনাহ করেন, তার সরাসরি প্রভাব খালি উম্মাহর উপরেই পড়ে না, আপনার উপরও পড়ে। আপনার দ্বীনের অভাব, আপনার বুঝের অভাব, আপনার সালাত ত্যাগ, আপনার করা প্রতিটা হারামের প্রভাব আপনার সন্তানের উপর পড়ে, আপনার বাবা-মায়ের উপর পড়ে, পুরো উম্মাতের উপর পড়ে।

এটা উল্টোদিক থেকেও সত্য। আপনি যখন কোনো নেক আমল করেন, এতে একা আপনারই উপকার হয় না। পুরো উম্মাতের উপকার হয়। আমাদের যাদের অন্তরে তাওহিদ আছে, আমরা সবাই ইসলামের ব্যানারের অধীনে পড়ি, মুসলিম পরিচয়ের ভেতরে পড়ি। রাসূল (সা.) উম্মাত বোঝাতে বলেননি যে, তারা একটি পরিবারের মতো। কেননা, এমনকি পরিবারের মধ্যেও আপনি ভাইয়ের সাথে বা মায়ের সাথে কথা না বলে থাকতে পারেন। যদিও এসব হারাম, কিন্তু আপনার সেটা করার ক্ষমতা তো আছে। আপনি সন্তানের দেখাশোনা না করতে পারেন, তাদের ত্যাজ্য করতে পারেন। কিন্তু আপনি কি আপনার হাতের দিকে তাকিয়ে বলতে পারবেন, এই জিনিসটা ভালো দেখাচ্ছে না, কেটে ফেলি এটা? না, পারবেন না। কারণ এটা আপনার অংশ, আপনাকে এটা নিয়ে বাঁচতে হবে। তাই নবিজি উম্মাতের উদাহরণ দেওয়ার সময় একে একটা দেহের সাথে তুলনা করেছেন, আপনি যার কাছ থেকে নিজেকে কখনো আলাদা করতে পারবেন না!

📘 এপিটাফ 📄 মাতাইল গুরর

📄 মাতাইল গুরর


পশ্চিমের দেশগুলোতে অনেক মেরুদণ্ডহীন মানুষ আছে যারা নিজের স্ত্রীকে বিধবা ভাতা নিতে পাঠায়! পাঠানোর সময়ও তাকে হয়তো বোরকা, হিজাব, এমনকি নিকাব পরিয়ে পাঠাচ্ছে। তার কোলে এক বাচ্চা, কাঁধে এক বাচ্চা। কেন তাকে এসব করতে পাঠাই? সপ্তাহ শেষে দুটো টাকা পাওয়া যায় বলে। গাড়ি কিনে সেটার দাম কমিয়ে বলছি ট্যাক্স কম দেওয়ার জন্য। আপনি হয়তো ভাবছেন আপনি এত নীচে নামতেই পারেননা, এসব আপনি কোনোদিনও করবেন না, কিন্তু শয়তান নানা রূপে আসে। দাড়িওয়ালা মুসলিম! মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে কাগজে সই করছে! দুইটা টাকা বাঁচানোর জন্য। দুনিয়া কখন যে কাকে পাল্টে দেয়, বদলে দেয়, নীচে নামিয়ে দেয়—তার কোনো ঠিক নেই।

আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত, যিনি দুনিয়ার স্রষ্টা, তিনি যে কারো চেয়ে এই দুনিয়াতে বেশি ভালোমতো চেনেন। সেই আল্লাহ এই দুনিয়াকে বলেছেন—দুনিয়ার হায়াত হলো মাতাউল গুরুর। وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ “দুনিয়ার জীবন প্রতারণার উপকরণ বৈ কিছু নয়।” (সূরাহ হাদীদ, ৫৭: ২০) মাতাউল গুরুরের (مَتَاعُ الْغُرُورِ) একটি অর্থ হলো নারীরা ঋতুস্রাবের সময় যেই ত্যানাটা ট্র্যাম্পন হিসেবে ব্যবহার করে, সেটি। শুধু তা-ই না, একেবারে ব্যবহৃত হওয়া ত্যানা। মানে তাতে মাসিকের রক্ত লেগে আছে, ফেলে দেওয়া হবে, কারো কোনো কাজে লাগবে না সেই জিনিস। আল্লাহ বলেছেন এটাই হলো দুনিয়া। স্বয়ং আল্লাহ দুনিয়াকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। অথচ আমরা সেই দুনিয়ার পেছনে দৌড়ে মরছি। রাতদিন খাটছি। দিনে তের-চৌদ্দ ঘণ্টা ডিউটি করছি এই ব্যবহৃত ট্র্যাম্পনের জন্য। আমরা এর জন্য পাগল হয়ে গেছি। প্রকাশ্য দিবালোকে এক মুসলিম আরেক মুসলিমের রক্ত ঝরাচ্ছে। কেন? ব্যবহৃত ট্র্যাম্পনের জন্য। আমরা আমাদের দ্বীন বিক্রি করে দিয়েছি।

যে কোনো মসজিদে ফজরের সময় গিয়ে দেখুন, কয়জন মানুষ দুনিয়ার উপর আল্লাহকে প্রাধান্য দিয়েছে। একদিন জুমু'আর সময় যান, তার পরদিন ফজরের সময় যান। সেই একই জনগোষ্ঠীকে আপনি জিজ্ঞেস করেন, ভাই, দ্বীন নাকি দুনিয়া? উত্তর দেবে, আস্তাগফিরুল্লাহ! ভাই আপনি কি আমাকে কাফির মনে করেন? অবশ্যই দ্বীন! আল্লাহ আমার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মাশাআল্লাহ, ভালো। কিন্তু আল্লাহ কথা চান না, কাজ চান। কথাই যদি হিসাব করা হতো, তাহলে সবাইই আমরা আউলিয়া, জান্নাতে চলে যেতাম। কিন্তু আল্লাহ চান আমল। কারণ কথার চেয়ে কাজের স্বর অনেক উঁচু। এই যে মানুষগুলো বলছে তারা আল্লাহকে আর-রাযযাক বলে মানে, আল্লাহই দেন, আল্লাহই কেড়ে নেন—তারাই ফজরের সময় নাক ডেকে ঘুমায়। কিন্তু যেই না বাজল ৬টা, অমনি সে কাজে যাওয়ার জন্য উঠে পড়ল। বলছি না এটা হারাম। কিন্তু আপনি কোনটি বেছে নিলেন? দ্বীন, না দুনিয়া? ফজরের সময় নেই, কিন্তু বস যদি বলে রাত তিনটায় অফিসে হাজিরা দেবেন, একজনেরও মিস হবে না। কী বেছে নিলাম তাহলে? আপনিই নিজেকে জিজ্ঞেস করুন আসলেই আপনি দ্বীন নিলেন, না দুনিয়া।

রাসূল (সা.) এই দুনিয়ার বাস্তবতা জানতেন। তিনি দুনিয়াকে ঘৃণা করতে শেখাননি। তিনি এর বাস্তবতা খোলাসা করে দেখিয়ে গেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে দুনিয়ার কাছ থেকে যথেষ্ট উপকার গ্রহণ করে বাকিটা ত্যাগ করতে হয়। তিনি হাদিসে বলেছেন, এই দুনিয়া অভিশপ্ত। এতে কোনো কল্যাণ নেই। তিনি আরো বলেছেন, এর মধ্যে যা আছে তাও অভিশপ্ত। শুধু আল্লাহর স্মরণ, ইলম অর্জন ও ইলম শিক্ষাদান ছাড়া। আর এর সাথে জড়িত সবকিছু ছাড়া। এই দুনিয়া আসলে কী! আপনি এখান থেকে কিচ্ছু নিয়ে যেতে পারবেন না। এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। আজ আপনি এখানে, কাল আপনি নেই। এটাই সত্যি।

অতীতের এক রাজা তার পারিষদকে বলেছিলেন, আমি মরার পর আমাকে উলঙ্গ অবস্থায় কবর দেবে আর আমার হাত দুটো কবর থেকে বের করে রাখবে। সবাই শুনে অবাক হলো। আচ্ছা উলঙ্গ কবর দেওয়ার বিষয়টা বুঝলাম। কিন্তু হাত বের করে রাখাটা কেন? তিনি বললেন, যাতে মানুষ বুঝতে পারে যে এই রাজা দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার সময় একেবারে খালি হাতে যেতে বাধ্য হয়েছে। হারুনুর রশীদ ছিলেন এই উম্মাহর একজন মহান শাসক। তিনি পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ জয় করেছিলেন। একদিন তিনি এক আলিমের সাথে বসা ছিলেন। তখন বললেন, এই দেখুন, আমরা কত কী করে ফেলেছি। সেই আলিম বললেন, আপনার অধীনে যা কিছু আছে, সেগুলোর বাস্তবতা কী জানেন? খলিফা বললেন, না তো! আলিম বললেন, ধরুন আপনাকে আমি বাসায় দাওয়াত দিলাম। তারপর এক গাদা লবণাক্ত খাবার খেতে দিলাম। আপনার প্রচণ্ড তেষ্টা পেল। আমার কাছে থাকা এক কাপ পানি ছাড়া আর কোথাও কোনো পানি নেই। আপনি সেই পানি নেওয়ার বিনিময়ে আমাকে কী দিতে পারবেন? খলিফা বললেন, আমি আমার অর্ধেক রাজত্ব দিয়ে দেব। আলিম বললেন, এরপর ধরুন আপনার খুব প্রশ্রাবের বেগ পেল। একেবারে পেট ফেটে যাওয়ার অবস্থা। আমিই একমাত্র আপনাকে টয়লেটে যাওয়ার অনুমতি দিতে পারব। এই পরিস্থিতিতে আপনি কী করবেন? খলিফা বললেন, আমি বাকি অর্ধেক রাজত্বও আপনাকে দিয়ে দেব। আলিম বললেন, এই হলো আপনার ও আপনার সব সম্পদের বাস্তবতা-যা এক কাপ পানি আর কিছু মূত্রের মূল্যের সমান।

এটাই দুনিয়ার বাস্তবতা-মাতাউল গুরুর!

📘 এপিটাফ 📄 আমিই দায়ী—চাই এমন সরল স্বীকারোক্তি

📄 আমিই দায়ী—চাই এমন সরল স্বীকারোক্তি


একসময় কিছু বিষয় ছিল যা আমরা সবাই জানতাম, ব্যাপারগুলো আমাদের কাছে পরিষ্কার ছিল। মানুষ সেগুলো নিয়ে তর্কাতর্কি করত না। যেমন- একটা সময় কোনো লোক মোটা হলে সে কেন মোটা সেটা সবাই জানত। এ নিয়ে কারো কোনো সংশয় ছিল না, কেউ সেটা নিয়ে তর্কও করত না। লোকটা কেন মোটা? খুব সিম্পল, হয় সে বেশি খায়, হয় শরীর চর্চা করে না, হয়তো ভুল সময়ে খায়। এটা সবাই জানে, সাধারণ জ্ঞানের মতো। মানুষ আলোচনা সভা করে বসে তাত্ত্বিক আলোচনা জুড়ে দিত না কেন লোকটা মোটা হলো। কিন্তু এখন যুগ পাল্টেছে। একজন মানুষ কেন মোটা, এর কারণ সে নয়, বাকি সবাই, বাকি সবকিছু। এক ব্যক্তির বিয়ের সময় ওজন ছিল ৯০ কেজি, বিয়ের পর তার ওজন গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৩০ কেজিতে। এখন এজন্য কি সে নিজেকে দায়ী না করে অন্য সবার দিকে আঙুল তুলবে? স্ত্রী, আমার শ্বশুর-শাশুড়ি, অমুক তমুক জায়গায় ভ্রমণ, এটা ওটা করতে হয় ইত্যাদি। কিন্তু যত অজুহাতই দাঁড় করান না কেন, বাস্তবতা হলো, সত্য হলো—আপনি মোটা হয়েছেন আপনার নিজের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ। অন্য কারো কারণে নয়। এক মোটা লোক ডাক্তারের কাছে গেল। ডাক্তার চেকআপ করে রিপোর্ট দিল। কিন্তু মোটা লোকটা বলল,
-“আরে ডাক্তার সাহেব, মুটিয়ে যাওয়া আমাদের বংশগত রোগ।
-ডাক্তার বলল, হ্যাঁ, এটা বংশগত রোগ! আর আপনার বংশের সবার রোগ হলো এই যে—আপনারা কেউ দৌড়াদৌড়িই করেন না।

আজকাল আমাদের মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে কোনো কিছুর দায় না নেওয়া। যা কিছুই হবে হোক, সব অন্যের দোষ, নিজের কোনো দোষ নেই। এমন কোনো মানুষ নেই, যে হাত তুলে বলতে পারে—আমি এর দায় নিচ্ছি। আজ আমরা দ্বীনের কাছে যাই না, দ্বীনকে আমাদের কাছে আনতে হয়। মসজিদে গিয়ে পাঁচ মিনিট বসে থাকলে মানুষ হাঁসফাঁস করতে থাকে। কোনো আলিমের লেকচার শুনবেন, আরে ধুর এত টাইম কোথায়! আজকালকার ট্রেন্ড হলো সাত মিনিটের বেশি ভিডিও ক্লিপ কেউ দেখে না। এর চেয়ে লম্বা হলেই, ধুর! বেশি লম্বা! খুব বোরিং! আমি কুরআন শিখতে চাই, কিন্তু এর জন্য সময় দিতে চাই না। শর্টকাট খুঁজি, অনলাইনে দ্রুত শেখার মতো জিনিস খুঁজি। একটা সময় সবাই জানত যে স্বাস্থ্যবান হতে হলে ভালো খাওয়া দাওয়া করতে হবে, জিমে যেতে হবে, ডাম্বল তুলতে হবে, বেঞ্চপ্রেস মারতে হবে, নিয়ম মেনে জীবনে চলতে হবে। জনৈক ব্যক্তিকে দেখতাম কাঠির মতো শুকনো। যেন বাতাস আসলে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। সে দুই-তিন সপ্তাহের জন্য উধাও। ফিরে আসার পর দেখি সে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে এসেছে। কী ব্যাপার? এত স্বাস্থ্যবান হলে কীভাবে? এই তো, টুনামাছ আর আলু খেয়ে। অথচ তার শরীরে, মুখে স্টেরয়েডের ছাপ স্পষ্ট। সে ভাব ধরছে যে টুনা মাছ আর আলু খেয়ে তার এই অবস্থা।

আমাদের দ্বীনেরও এই অবস্থা, আমরাও এই লোকটির মত শর্টকার্ট খুঁজি। আপনি যখন দ্বীনের মধ্যে শর্টকাট খুঁজবেন, তখন স্টেরয়েডের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করবে। আমরা যারা এ যুগে বাস করি, উম্মাহর অবস্থা সম্পর্কে জানি, আমরা কি উম্মাহর আজকের এই অবস্থার উপর সন্তুষ্ট? কে দায়ী এ অবস্থার জন্য? এ কথা জিজ্ঞেস করলে প্রত্যেকে দাঁড়িয়ে একশ-দেড়শ দায়ী ব্যক্তির নাম বলবে, যারা উম্মাহর দুরবস্থার জন্য দায়ী। কিন্তু একজনও এর মধ্যে নিজের নামটা রাখবে না। আলিমদের এই দোষ, মসজিদ কমিটির এই দোষ, সমাজের ওই সমস্যা, এরা বেশি সেকেলে, আমাদেরকে এটা করতে দেয় না, ওটা করতে দেয় না! কিন্তু কারো এইটুকু ঈমান নেই যে সাহস করে বলতে পারে উম্মাহর আজকের দুর্দশার জন্য দায়ী আমার মতো মানুষেরা। দায়িত্ববোধ আজকে আমাদের কারো মধ্যে নেই। আমরা নপুংসক হয়ে গেছি। অথচ এই উম্মাহর মানুষগুলোর মধ্যে একসময় পৌরুষ ছিল। সত্যের মুখোমুখি হওয়ার মতো যথেষ্ট সাহসী ছিলাম আমরা।

এক ব্যক্তি আলি ইবনু আবি তালিব (রা.)-এর কাছে এলো। তার উদ্দেশ্য হলো আলিকে বিদ্রূপ করা। সে আলি (রা.)-কে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা এমনটা কেন হচ্ছে বলুন তো! উমরের যুগ ছিল স্বর্ণযুগ। ইসলাম চারদিকে প্রসারিত হচ্ছিল, মুসলিমরা ধনে-মালে ভরপুর হয়ে উঠছিল। আপনার সময় কেন চারিদিকে এত ফিতনা? আলি (রা.) জবাবে বললেন, “কারণ উমর ইবনুল খাত্তাবের সময় তার সাথে আমার মতো লোকেরা ছিল। আর আজকে আমার শাসনামলে আমার সাথে আছে তোমার মতো লোকেরা।”

রাসূল (সা.) বলেছিলেন, উম্মাতের উপমা হলো একটি দেহের মতো। এই উম্মাহ একটি দেহ। এই দেহের একটি অঙ্গ যদি ব্যথা পায়, তাহলে সারা দেহ তা অনুভব করে। সারাদেহ নির্ঘুম থাকে। কেন? এই ব্যথাকে, এই ইনফেকশানকে মোকাবেলা করার জন্য। আজ কি আমরা সত্যিই অনুভব করি যে আমরা এক দেহ? আমরা কি উম্মাহর এই দুর্দশা নিয়ে চিন্তিত? আপনি কি আসলেই এই দেহের একটি অংশ হিসেবে কোনো দায়িত্ববোধ রাখেন? উম্মাহর কী হচ্ছে তা বাদ দিন, আমাদের নিজেদেরই বা কী অবস্থা? ঈমান ও তাওহিদওয়ালা প্রতিটা মানুষের উপর আপনার প্রতিটা গুনাহের সরাসরি প্রভাব পড়ে। সিরিয়ায় যে বোনটি ধর্ষিত হচ্ছে, এইখানে বসে করা আপনার প্রতিটা গুনাহের সরাসরি প্রভাব তার উপর পড়ছে। যেইদিন আপনি পড়েছেন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, সেদিন আপনি ইসলামে প্রবেশ করেছেন। সেদিন থেকে আপনি উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত। সেদিন থেকে আপনি এই দেহের অংশ হয়ে গেছেন। তাই আপনি যা করেন, দেহের উপর তার প্রভাব পড়ে।

আজকে এইসব বাস্তবতার মুখোমুখি আমরা হতে চাই না। বাসায় গিয়ে টিভিটা অন করে তাতে হারিয়ে যেতে পারলেই হলো। আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে এই রোগটা আছে। আরে আমার সালাত হয়তো সুন্দর না, কুরআন পড়ায় হয়তো ত্রুটি আছে, এই ওই গুনাহ আমার দ্বারা হয়, তাতে কী! আমি তো আর কারো ক্ষতি করছি না। এমন কথা অনেককে বলতে শোনা যায়! আবার কেউবা বলে, ভাই, আমি নামাজ পড়ি না, এতে আপনার ব্যস্ত হওয়ার দরকার নেই। এটা আমার আর আল্লাহর মধ্যকার ব্যাপার। ডোন্ট জাজ মি, অনলি আল্লাহ ক্যান জাজ মি!

হ্যাঁ, সত্য কথা। শুধু আল্লাহই আপনার বিচার করবেন। কিন্তু সমস্যা হলো আপনার গুনাহর প্রভাব আমার ওপর পড়ে, আমার স্ত্রীর উপর পড়ে, আমার বাচ্চাদের উপর পড়ে, পুরো উম্মাহর উপর পড়ে। তাই আপনাকে গুনাহ করতে দেখলে, হারামে লিপ্ত হতে দেখলে আমার এতে বাধা না দিয়ে উপায় থাকে না। রাসূল (সা.) এর সহিহ হাদিসে আছে, সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে থাকো। এটা এই উম্মাহর দায়িত্ব। এটা শুধু আলিম ওলামার একার দায়িত্ব না। ঈমান ও তাওহিদওয়ালা প্রতিটা মানুষের দায়িত্ব হলো সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ। এখন আপনি যদি বলেন, আমি না করলে সমস্যা কোথায়? আমি আমার কাজ নিয়ে থাকলাম, অন্যেরা অন্যদেরটা নিয়ে থাকল। রাসূল (সা.) বলেন, তোমরা যদি তা না করো, তাহলে আল্লাহর কসম, আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি আযাব পাঠাবেন। তোমরা আল্লাহর কাছে হাত তুলে দুআ করবে, অথচ আল্লাহ্ তোমাদের দুআ কবুল করবেন না।

আমি যখন এখানে আসার জন্য সিডনী থেকে রওনা হলাম, আমি চার ঘণ্টা আগে এয়ারপোর্টে পৌঁছলাম। কারণ আমি মানসিকভাবে ইন্টারোগেশানের জন্য প্রস্তুত। আমাকে হাজারো প্রশ্ন করা হচ্ছে কেন আমি আমার দেশ ছেড়ে যাচ্ছি। আমি আমার নিজের ঘরে অপরাধীতে পরিণত হয়েছি। আমি জানি যখন আমি লন্ডন এয়ারপোর্টে পৌঁছাব, তখন আমাকে তিন-চার ঘণ্টা ইন্টারোগেশানের মুখে পড়তে হবে। কেন? কারণ আমাকে মুসলিমদের মতো দেখা যায়। আমাদের অত বিলাসিতা করা সাজে না যে, গুনাহ করব আর বলব অনলি আল্লাহ ক্যান জাজ মি। কারণ আমার গুনাহ আপনাকে প্রভাবিত করে, আপনার গুনাহ আমাকে প্রভাবিত করে।

যে কেউ খালেসভাবে কালিমা পড়েছে, আপনি মানুন আর না মানুন, সে মুসলিম। সে মসজিদে আসলো কী আসলো না, সে আপনার মাযহাব অনুসরণ করে কি করে না, সে রোজা রাখল কি রাখলো না, আপনার পীর-মাশায়েখরা তাকে স্বীকার করে কি করে না, এসবের দ্বারা এই বাস্তবতা পরিবর্তন হয়ে যায় না যে, সে একজন মুসলিম। তার পক্ষ থেকে একেবারে স্পষ্ট বড় কুফর প্রকাশ পাওয়ার আগ পর্যন্ত সে এই উম্মাহর অংশ। অনেকে এসব শুনে মাঝেমাঝে ক্ষেপে যায়—কে আপনাকে এসব বলার অধিকার দিয়েছে? কিন্তু তার আগে আপনি বলুন, আপনাকে কে অধিকার দিয়েছে তাকে মুসলিমের খাতা থেকে কেটে দেওয়ার? এমনকি সাহাবারা যে কাজ করেননি। এমনকি রাসূল (সা.) মুনাফিকদেরকে একদম সমাজের ভেতরে রেখে চলতেন, তাদেরকে চিনতেন, তাদের তালিকা করে রেখেছিলেন, কিন্তু সবচেয়ে কাছের সাহাবারাও তাদের নাম জানতে পারেননি। আর আজকে আমি-আপনি কীভাবে ঠিক করে দিচ্ছি কে মুসলিম, আর কে মুসলিম না? কে মুনাফিক, কে সহিহ দ্বীনদার? মানুষ বলে ইসলাম মানেই নাকি ভালোবাসা আর সম্প্রীতি! কীসের সম্প্রীতি! আমরা তো আমাদের নিজেদের সমাজেই ঐক্যবদ্ধ না, নিজেদের মসজিদেই ঐক্যবদ্ধ না। আমাদের নিজেদের পরিবারে ভালোবাসা নেই, সহনশীলতা ও গ্রহণযোগ্যতা নেই। হাসাহাসি, বিদ্রূপ, ঠাট্টা মশকরা করাটাই নিয়ম হয়ে গেছে। যেকোনো এক চ্যাঙড়া ছেলে মাইক তুলে নিয়ে এই আলিম ওই আলিমকে গালাগালি করতে থাকে। যেন তার কাঁধে পুরো উম্মাহর দায়িত্ব এসে পড়েছে। আর আমরা ভাবি আমাদের সাথে এসব কেন হচ্ছে! কেন আজ মুসলিমদের এই অবস্থা? কেন উম্মাহর এই অবস্থা? কেন আল্লাহর সাহায্য আসছে না? উত্তরটা সহজ, এর জন্য আপনি-আমিই দায়ী।

আমাদের কাজের প্রভাব উম্মাহর উপর পড়ে। তারপরও যেখানেই যাই, শুনি, ভাই জানেন? অমুক আলিম না এইরকম, তমুক আলিম এইটা বলে। ভালো কথা! তো আপনি কী করছেন? আমি! আমি তো কিছুই না। আমার কথা কে শুনবে? কিন্তু কেন আপনি “কিচ্ছু না”? কেন আপনার কোনো প্রভাব নেই? কেন আপনি সেই যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি, কিংবা পারছেন না? আপনি যখন বিশ্বাস করতে শুরু করবেন আপনি কিছু না, তখন থেকেই আপনি 'কিছু না' হয়ে যাবেন। আপনি যখন বিশ্বাস করতে শুরু করবেন আপনি কেউ না, তখন থেকেই আপনি 'কেউ না' হয়ে যাবেন। আমাদের উদ্যম আজ এভাবেই ভেঙে পড়েছে। দ্বীনের সাথে সংস্পর্শ নষ্ট হয়ে গেছে। মুহাম্মাদ আল-ফাতিহর যখন চার বছর বয়স, তখন তার মা তাকে সাগরের পাড়ে নিয়ে যেতেন। বলতেন, ওই পাড়ের ওই অঞ্চলটা দেখছ? একদিন তুমি তা বিজয় করবে। আজকে চার বছরের বাচ্চাকে আমরা মসজিদ থেকেই তাড়িয়ে দিই, নোটিশ টাঙিয়ে দিই—'এখানে ৭ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের আসা নিষেধ।' কাকে দোষ দেব আমরা? সব দোষ কাফিরদের, সব পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র? পশ্চিমা সরকাররা কি আপনাকে শিখিয়েছে বাচ্চার সাথে এমন আচরণ করতে? কোন সরকার আপনার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বলেছে তোমার বউয়ের সাথে খারাপ আচরণ করো?

আবার এখন কিছু একটা হলেই কালো জাদু, জিন, রুকইয়া—এটা যেন সবাইকে আছর করে রেখেছে! এর সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেছে, ওর হাত কাঁপতে শুরু করেছে, আর অমনি ধরে নিচ্ছে কেউ তাকে কালো জাদু করেছে। আর শুরু হলো এই শাইখের কাছে ধরনা, ওই শাইখের কাছে দৌড়াদৌড়ি। কিন্তু নিজের চারিত্রিক সমস্যার কারণেও ঝামেলা হতে পারে, এই বাস্তবতার মুখোমুখি আমরা কেউ হতে চাই না। আপনার বিয়ে টিকছে না কারণ হয়তো আপনি ব্যর্থ পিতা, স্বামী হিসেবে আপনি ভালো না। মানুষ ফোন করে বলে, ভাই! যুবসমাজের আজকে এই সমস্যা, ওই সমস্যা। এটা নিয়ে কথা বলেন, ওটা নিয়ে কথা বলেন। যেই যুবসমাজ নিয়ে আপনি নালিশ করেন, এটা ওই যুবসমাজের সমস্যা না। এগুলো আপনার নিজের কাজকর্মের ফলাফল, আপনার নিজের প্রতিবিম্ব। আপনার অবাধ্য সন্তান আপনারই প্রতিচ্ছবি। আপনার সন্তান ব্যর্থ কারণ আপনি পিতা হিসেবে ব্যর্থ। কিন্তু আমরা কেউ দোষ নিজের ঘাড়ে নিতে চাই না। আমার ছেলে খারাপ, কারণ সে খারাপ ছেলেদের সাথে মিশে। তো আপনি তখন কোথায় ছিলেন? চাকরি, ব্যবসা, নিজের কাজে ব্যস্ত! তো আপনার ছেলেকে বড় করছে কে? আমি জানি আপনার রুটি-রুজি কামাতে হয়। কিন্তু আপনিই তো বেছে নিয়েছেন প্রতি সপ্তাহে সপ্তাহে রেস্টুরেন্টে যাওয়ার খরচ। আপনিই তো বেছে নিয়েছেন দামী দামী জায়গায় বাড়ি করা, কারণ কম দামী জায়গায় থাকলে খারাপ দেখায়। আপনার গাড়ির মডেল আপডেট না হলে চলেই না। সন্তানকে অন্যদের হাতে বড় হতে দিয়ে আপনিই এ জীবন বেছে নিয়েছেন।

আমাদের এসব সমস্যার সমাধান হলো দ্বীন। মানুষ সবসময় অলৌকিক কিছুর অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু সেই আলৌকিক সমাধান আছে সেই প্রেসক্রিপশনে, যা স্বয়ং আল্লাহ মানবজাতির জন্য নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ বলেছেন, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিআমত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে।” (সূরাহ মায়েদা, ৫:৩) আপনি যেই সমস্যার মুখোমুখিই হোন না কেন, আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহয় অবশ্যই এর সমাধান আছে। সমস্যার সমাধান চান? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দ্বীনের দিকে আসুন। আপনি এই সংশয়, ওই দ্বিধায় পড়ছেন কারণ আমাদের জীবন থেকে দ্বীন হারিয়ে গেছে। আজকে যদি বলা হয় এটা রাসূলের সুন্নাহ, তখন আমাদের প্রতিক্রিয়া হয়, ও আচ্ছা, সুন্নাহ? আমি আরো ভাবলাম ফরয, করতেই হবে বুঝি! যাক, বাঁচা গেল! আমরা খুব আবেগ দিয়ে বলি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পথ হলো সর্বোত্তম পথ। কারো এতে দ্বিমত নেই। কিন্তু এই কথাটা সত্য নয়। কথাটা শুনলে মনে হয় এটা ছাড়াও আরো অনেক বিকল্প বৈধ পথ আছে, যেগুলোর চেয়ে রাসূলের সুন্নাহ বেশি ভালো। যেন good, better, best এর সেই ছেলেবেলার ইংরেজি শেখার মতো। কিন্তু না, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহ-ই একমাত্র পথ, আর কোনো বিকল্প নেই। এক শাইখকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সাহাবাদের সাথে আমাদের পার্থক্য কোথায়? তিনি বললেন, আমরা রাসূলের সব সুন্নাহ ছেড়ে দেই, কারণ এগুলো স্রেফ সুন্নাহ! আর সাহাবাগণ সব সুন্নাহ পালন করতেন, কারণ এগুলো রাসূলের সুন্নাহ।

সাহাবাগণের জীবদ্দশায় ফরয-সুন্নাহর পার্থক্য নিয়ে কোনো আলোচনাই ছিল না। পরে যখন ফিকহ শাস্ত্র গড়ে ওঠে, তখন তাত্ত্বিক আলোচনার সুবিধার্থে, একটার চেয়ে আরেকটার গুরুত্বের পার্থক্য অনুধাবনের জন্য ফুকাহায়ে কিরাম বাধ্য হয়েছেন এই আলোচনাগুলো সামনে আনতে। দুঃখজনকভাবে আমরা সেটা থেকে এমন অর্থ বের করেছি যেন ফরযটা বাধ্য হয়ে করা লাগে। আর কেউ সুন্নাহ পালন করলে, ওহ! মাশাআল্লাহ! ঠিক আছে, কিন্তু আমাকেও করতে হবে এমন তো না! আপনি এই দ্বীন ছেড়ে কিসের পেছনে ছুটছেন? সত্যিই পূর্ণ সুখ-শান্তি চান? সে জিনিস কখনওই আসবে না, যতক্ষণ না আপনি রাসূল (সা.) কে পূর্ণাঙ্গভাবে নিজের মধ্যে নিয়ে আসছেন। তাই ভুলে যান পাশের মসজিদে কী হচ্ছে। ভুলে যান অমুক ইমামের কী ভুল। আমরা নিজেরা দোষ স্বীকার করার মতো সাহসী হই। নিজেদের দোষ স্বীকার করতে শিখি। তাওবা করতে শিখি। আল্লাহর দিকে আরো এক কদম অগ্রসর হতে শিখি। নিজের জন্য যদি না-ও হয়, অন্তত আমাদের পরিবার, সমাজ, এই উম্মাহর কথা চিন্তা করে হলেও!

ফন্ট সাইজ
15px
17px