📄 নবিজি যেখানে প্রতিবেশী
আমার দাওয়াহ ক্যারিয়ারে অনেক রকম মানুষের দেখা পেয়েছি। আখিরাত, জান্নাত, জাহান্নাম নিয়ে অনেকে অনেককিছু ভাবে। কিছু মানুষ বলে, কোনোমতে জান্নাতে যেতে পারলেই হলো, এতেই তারা খুশি। অথচ জান্নাত শুধু একটি স্তর না। জান্নাতের বেশ কিছু স্তর রয়েছে। একটি থেকে আরেকটি স্তরের মর্যাদা বেশি। তাই যখন কেউ বলে, “ভাইরে! জান্নাতে খালি ঢুকতে পারলেই হলো! তাতেই সন্তুষ্ট হয়ে যাব।” – বাস্তবে এ কথা সত্য নয়। দুনিয়ায় কিন্তু আমরা নিজেদের যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট নই। আপনি যে গাড়িতে চড়েন, সেটা নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট নন। আপনার কাছে যে পরিমাণ টাকা আছে, তা নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট নন। আপনি যে বাড়িতে থাকেন, তা নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট নন। দুনিয়ায় আপনি সবসময় আকাঙ্ক্ষা করেন যেটা আছে তার থেকে ভালো ও বেশি কিছু পাওয়ার। কিন্তু যখন দ্বীনের কথা আসে, আখিরাতের কথা আসে, তখনই আমরা অল্পে তুষ্ট হয়ে যাওয়ার ভান করি।
আসহাবে সুফফার একজন খুবই গরীব সাহাবি রাবিআ বিন কাব আল আসলামি (রা.)। তিনি আহলুস সুফফার সদস্য ছিলেন। মসজিদে নববির পেছন দিকে একটা অংশ ছিল, যেখানে বসবাসকারীদের আহলুস সুফফা বলা হতো। আহলুস সুফফার সাহাবাগণ ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই কপর্দকশূন্য। আমরা প্রায়ই বলি না যে “হাতে টাকা-পয়সা নাই,” “অভাবে আছি” ইত্যাদি? আমাদের বলার অর্থ হলো, “আমার পকেটে বেশি টাকা নেই, কিন্তু বাপের টাকা দিয়ে আরামেই চলছি।” কিন্তু এই আহলুস সুফফার মানুষগুলোর কাছে সত্যি সত্যিই কোনোই টাকা-পয়সা ছিল না। মসজিদে থাকছেন, সতর ঢাকার মতো পোশাক কিনবেন, সেইটুকু আর্থিক সামর্থ্যও নেই। আপনি মসজিদে নববিতে সালাত আদায় করছেন, কিন্তু আপনার সতর ঢাকার মতো সামর্থ্য নেই! ভাবতে পারেন?
আল্লাহর রাসূল তাহাজ্জুদ পড়ার জন্য যখন ঘর থেকে বের হতেন, রাবিআ বিন কাব আল-আসলামি নবিজির জন্য ওযুর পানি নিয়ে আসতেন। এমনি একদিন রাবিআ ওযুর পানি নিয়ে এলেন। রাসূল (সা.) রাবিআর দিকে তাকালেন। তাঁর গরিবি হালত দেখে নবিজির মন খারাপ হয়ে গেল। তিনি (সা.) বললেন, “রাবিআ, কিছু একটা চাও।”
- “হে আল্লাহ নবি! আমি জান্নাতে আপনার সাথে থাকতে চাই।”
নবিজি যেন ইঙ্গিতে বোঝাতে চাচ্ছেন, আরে! আমি আখিরাতের কথা বলছি না। এখানে দুনিয়ায় কী চাও? স্ত্রী লাগবে না? অথবা একটা ঘর? বলো, কিছু একটা চাও। রাবিআ নবিজির দিকে তাকিয়ে বললেন, -“ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি জান্নাতে আপনার সাথে থাকতে চাই। আর কিছু না।”
আচ্ছা ভাবুন তো আপনি বিল গেটসের সাথে একটা রুমে বসে কথাবার্তা বলছেন। সে আপনার অবস্থা দেখে দুঃখ পাচ্ছে। তারপর হঠাৎ বলল—“আপনি এই চেকটাতে যেকোনো একটা টাকার পরিমাণ লেখেন তো। আমি সাইন করে দিই।” সেখানে এই তরুণ সাহাবি প্রস্তাব পেলেন স্বয়ং আল্লাহর নবির কাছ থেকে। যে নবি কেবল দুআ করলে, আল্লাহ্ আসমান থেকে স্বর্ণের বৃষ্টি বর্ষণ করিয়ে ছাড়তেন, সেই নবি রাবিআকে বলছেন কিছু একটা চাইতে। কিন্তু গরীব এই সাহাবির জীবনে শুধু একটিই চাওয়া—জান্নাতে যেন নবিজির সাথে থাকতে পারেন। যেখানে আমরা বলি জান্নাতে কোনোরকমে ঢুকতে পারলেই হলো! সেখানে এই মানুষগুলোর চিন্তাভাবনা কেমন ছিল দেখুন। দুনিয়ায় যার কিছুই নেই, একেবারে নিঃস্ব, অসহায়—সেই মানুষটি আপনার আমার মতো শুধু কোনোমতে জান্নাতে যেতে চান না। তিনি চান জান্নাতে যেন নবিজি তাঁর সঙ্গী হয়।
রাবিআর এই চাওয়া শুনে নবিজি (সা.) বললেন, “হে রাবিআ! তুমি বিরাট এক জিনিস চেয়েছ। বেশি বেশি সিজদার মাধ্যমে তোমার এই অনুরোধ পূরণে আমাকে সাহায্য করো।” অর্থাৎ বেশি করে সালাত পড়ো। আরেকজন সাহাবি একবার নবিজি (সা.) এর কাছে এসে বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমি যতক্ষণ আপনার সাথে থাকি, ততক্ষণ আমার মন-মেজাজ খুব ভালো থাকে। আর যখনই ঘরে ফিরে যাই, তখনই আপনাকে মিস করতে শুরু করি। তারপর আমি পরিবারকে ছেড়ে আবার আপনার কাছে ফিরে আসি। আপনার উপর চোখ পড়তেই আমার অন্তরে প্রশান্তি ফিরে আসে। কিন্তু হঠাৎ আমার মাথায় চিন্তা ভর করল যে, একদিন তো আপনি মারা যাবেন, আর আমিও মারা যাব। আর তখন আপনি থাকবেন জান্নাতের উঁচু স্তরে নবিদের সাথে। আর আমি যদি কোনোমতে জান্নাতে যেতে পারিও, আমি তো আর আপনার সমকক্ষ হতে পারব না, জান্নাতে গেলেও হয়তো নিচু কোনো স্তরে থাকব। ইয়া রাসূলাল্লাহ! জান্নাত কী করে আমার কাছে জান্নাত হবে, যদি সেখানে আপনাকে না পাই?”
সাহাবির কথা শুনে কিছু সময়ের জন্য নবিজি নির্বাক হয়ে গেলেন। আসমান থেকে জিবরিল (আ.) নেমে এলেন। তিনি বললেন, “আপনার উম্মাতকে বলে দিন, তারা যাকে ভালোবাসে, জান্নাতে তাদের সাথেই থাকবে।” আনাস (রা.) বললেন, “আল্লাহর কসম! এই হাদিসটি আমাদের সবথেকে প্রিয়। কারণ আল্লাহর কসম! আমরা রাসূল (সা.), আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.) এর চেয়ে বেশি কাউকে ভালোবাসতাম না।”
আকাশের ওপারে, অনিন্দ্য সুন্দর জান্নাতে, আল্লাহ্ যেন আমাদেরকেও একটি করে ঘর বানিয়ে দেন। যে ঘরের পাশেই কোথাও প্রিয় নবিজিও থাকবেন। কোথাও থাকবেন আবু বকর (রা.), কোথাও উমর (রা.)। আমরা সেদিন বলব, দুনিয়াতে আপনাদেরকে আমরা ভালবাসতাম। জান্নাতে এসে একদিন আপনাদের সাথে মিলিত হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। আল্লাহ্ যেন আমাদেরকে কবুল করেন। আমীন।
📄 ২০ পয়সায় ঈমান বিক্রি
এক ইমামের কাহিনী। তাঁকে এক মসজিদে ইমাম হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার বাসা থেকে মসজিদের দূরত্ব ছিল অনেক। তাই তিনি জুব্বা-পাগড়িসহ ইমামের পোশাক পরে প্রতিদিন বাসে আসা-যাওয়া করতেন। তো যথারীতি একদিন তিনি মসজিদে যাচ্ছিলেন। তিনি বাসের ভাড়া দিলেন। তাঁকে ভাঙতি ফেরত দেওয়া হলো। প্রথমে তিনি খেয়াল করেননি, পরে দেখলেন তাঁকে ২০ সেন্টস বেশি দেওয়া হয়েছে। ২০ সেন্টস এমন কিছুই না। আমাদের ২০ পয়সার মতো। কিন্তু ইমামের মাথায় তখন কথোপকথন শুরু হয়ে গেল। এই ২০ সেন্টস কি তিনি ফেরত দেবেন নাকি দেবেন না, দেবেন নাকি দেবেন না। একবার মনে হচ্ছে ফেরত দেওয়া উচিৎ। আরেকবার মনে হচ্ছে, আরে কী দরকার! ২০ সেন্টস জন্য কী আর এমন হবে। আর এরা এমনিতেই কুফফার। মরুক! কী আসে যায়?
এমনভাবে চলতে চলতে গন্তব্য চলে এলো। তিনি নেমে যাচ্ছেন, নামতে নামতে মাথার মধ্যে ওই কথোপকথন চলছে। হঠাৎ তাঁর কী হলো, তিনি ফিরে বাস ড্রাইভারকে বললেন, তুমি আমাকে ভুলে ২০ সেন্টস বেশি দিয়েছ। সে বলল, না। আমি ইচ্ছা করেই দিয়েছি। আপনাকে অনেক দিন ধরে দেখছি। আপনাকে দেখে বুঝতে পারছি আপনি কোনো মুসলিম ইমাম। আমি ঠিক করেছিলাম আপনি যদি এই ২০ সেন্টস ফিরিয়ে দেন, তাহলে আমি ইসলাম গ্রহণ করব। আর যদি ফিরিয়ে না দিতেন তাহলে বুঝতাম আপনারাও অন্য সবার মতোই মিথ্যুক। এ ঘটনা বলে সেই ইমাম কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো কাঁদছেন কেন? সে ইসলাম গ্রহণ করেছে, এজন্য? তিনি বললেন, না। আমি কাঁদছি এ জন্য যে, আমি ২০ সেন্টসের বিনিময়ে আল্লাহর দ্বীনকে প্রায় বিক্রি করে ফেলেছিলাম।
একবার আমি (সাজিদ ইসলাম) এক জায়গায় গিয়েছিলাম, অনেক দূর। এমন এক জায়গা যেখানে আমি কাউকে চিনি না, আমাকেও কেউ চেনে না। রাস্তার ধারে এক দোকানে চা খেতে বসেছি। হঠাৎ দোকানি বলল, হুজুর একটু দেইখেন, আমি একটু আসতেছি। অপরিচিত এক হুজুর ছেলেকে দোকানি তার দোকান দেখার দায়িত্ব দিয়ে চলে গেল। কারণ তার মনের ফিতরাত বলছে, হুজুররা দোকান মেরে চলে যাবে না। ফকির, মিসকিনদের ভিড় লেগে থেকে মসজিদের সামনে। কারণ তাদের অভিজ্ঞতা বলছে, হুজুররাই দান খয়রাত বেশি করে। বিয়ের সময় পাত্র 'নামাজি' এটা আর যাই হোক একটা ভালো ইম্প্রেশন তো তৈরি করেই।
এভাবে ইসলাম, এর লেবাস এবং এর চর্চা-মূল্যবোধ, নৈতিকতার মানদণ্ডে মানুষকে অন্য দশজন থেকে আলাদা করে দেয়। যাদেরকে আল্লাহ এই বিশ্বাস, আকিদার হিদায়াত দান করেছেন, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মূল্যবান আমানতও। আমানত এই যে—আপনি আর দশজনের মতো নয়। আপনি যে চুরি করতে পারেন না, ঘুষ খেতে পারেন না, কোনো অন্যায় করতে পারেন না, আপনি যে বিশ্বস্ত, আপনার মূল্যবোধ, নৈতিকতা যে আর দশজন থেকে আলাদা—এটা আপনাকে দেখেই যেন বোঝা যায়। আল্লাহ আমাদেরকে এই আমানত রক্ষার তাওফিক দান করুন। আমীন।
📄 পুরুষেরা যেদিন ‘পৌরুষ’ হারিয়েছে, নারীরা সেদিন ‘হায়া’ হারিয়েছে
এক আলিমের ঘটনা। একদিন তিনি শুক্রবারের জুম'আর আগে খুতবা তৈরি করছিলেন। সামনে কিতাবপত্র নিয়ে পড়াশোনা করছেন, নোট করছেন। শাইখের ছেলে সেসময় বাবার পাশে খেলাধুলা করছিল। বারবার বাবাকে ডিস্টার্ব করছিল, শাইখও ছেলের দুষ্টুমিতে কাজে মন দিতে পারছিলেন না। এদিকে জুম'আর সময়ও আর বেশি নেই। তাই তিনি একটা ম্যাগাজিন খুলে সেখানে একটা পৃথিবীর মানচিত্রের ছবি দেখলেন। তিনি ম্যাগাজিন থেকে মানচিত্রটি কেটে নিলেন। সেটাকে এলোমেলোভাবে কয়েক টুকরা করে ছেলের হাতে দিয়ে বললেন, যাও এই মানচিত্রের টুকরাগুলো জোড়া লাগিয়ে আনো, দেখি পারো কি না!
শাইখকে অবাক করে দিয়ে তার ছেলে কয়েক মিনিট পরই মানচিত্রের টুকরাগুলো জায়গামতো বসিয়ে নিয়ে এলো। শাইখ তো অবাক। ছেলের প্রতিভায় রীতিমত মুগ্ধ। তিনি মনে করেছিলেন এই কাজ করতে তার অনেক সময় লেগে যাবে, এই ফাঁকে তিনি নিজের কাজ শেষ করে ফেলবেন। কিন্তু ছেলে তো পুরো ফাটিয়ে দিল। তিনি খুবই কৌতূহল নিয়ে ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এটা কীভাবে করলে? ছেলে জবাব দিল, আসলে মানচিত্রের পেছনে একটা মানুষের ছবি ছিল। আমি মানচিত্র জোড়া লাগাইনি, মানুষটাকে জোড়া লাগিয়েছি। হাত, পা, মাথা জায়গামতো বসিয়ে দিয়েছি, এতে করে অপর পাশের পৃথিবীর মানচিত্রটাও অটোম্যাটিক জায়গামতো জোড়া লেগে গেছে।
শাইখ মনে মনে ভাবলেন, তিনি আজকের জুমার খুতবার টপিক পেয়ে গেছেন। "When the men come together, the world also comes together."
সুতরাং এই ভাঙ্গা পৃথিবীটাকে জোড়া লাগানোর জন্য উম্মাহর 'পৌরুষ' ফিরিয়ে আনা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
আজকাল অনেকে নারীদের বিপথে যাওয়া নিয়ে কথা তোলেন। দেখুন ভাই, মেয়েরা কীভাবে বিপথে যাচ্ছে, পর্দা ছেড়ে দিচ্ছে, ফাহেশা কাজে লিপ্ত হচ্ছে! কিন্তু এটা একদিনে হয়নি। যেসব নারীরা বিপথে যাচ্ছে, তাদের আগে তাদের পুরুষরা বিপথে গেছে। বিপথে যাওয়া নারীরা হায়া হারানোর আগে, এসব নারীদের দেখভালের দায়িত্বে থাকা পুরুষেরা তাদের হায়া, গীরাহ, পৌরুষ হারিয়েছে। যেসব ভাইগুলো বলছে নারীরা বিপথে চলে যাচ্ছে, সেই একই ভাইয়েরা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি আপলোড দিচ্ছে। সেই ছবি তার হোয়াটসঅ্যাপের প্রফাইল পিকচার দিচ্ছে। তাই যাদের কাছেই তার ফোন নম্বর আছে, তাদের কাছে এখন তার স্ত্রীর ছবিও আছে। প্রতিদিন তার স্ত্রীর ছবি অন্যরা দেখছে।
এক ভাই একদিন আমার কাছে এলেন তার স্ত্রীকে নিয়ে। হাসতে হাসতে নিজের স্ত্রীকে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। আমি বিব্রত হয়ে কোনোমতে সালাম দিলাম। কিন্তু সেই মহিলা হাসতে হাসতে আমার দিকে হ্যান্ডসেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিল। আর পাশে তার স্বামী নির্লজ্জের মতো তখনো হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কাকে দোষ দেব, পৌরুষহীন এই ভাইকে, নাকি তার স্ত্রীকে?
রাসুল (সা.) বলেছেন, “এমন তিনজন ব্যক্তি আছে, যাদের দিকে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল কিয়ামাতের দিন তাকাবেন না। তারা হচ্ছে (১) যে পিতামাতার অবাধ্য, (২) যে নারী বেশভূষায় পুরুষদের অনুকরণ করে (৩) দাইয়ুস ব্যক্তি।” (নাসাঈ: ২৫৬২) এখানে দাইয়ুস হলো সেই পুরুষ, যে তার অধীনস্ত নারীদের (মা, বোন, স্ত্রী) ব্যভিচার, ফাহেশা কাজে বাধা দেয় না। তারা পর্দা করছে না, এটা তার গায়ে লাগে না। তার স্ত্রী পরপুরুষের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে, এতে তার গা জ্বলে না। সে এমন ব্যক্তি, যে তার পৌরুষ হারিয়েছে।
এই উম্মাহর একজন রিজাল—উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। তখনও পর্দার আয়াত নাযিল হয়নি। তিনি আল্লাহর রাসূল (সা.) এর কাছে গিয়ে বলছেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার কাছে ভালোমন্দ সব ধরনের লোকেরা আসে। আপনি যদি আপনার স্ত্রীদের পর্দা করার আদেশ দিতেন। বাইরের কেউ উম্মুল মুমিনীদের দেখবে, উমর ইবনুল খাত্তাবের কাছে এটা পছন্দ হচ্ছিল না। ওয়াল্লাহি, স্বয়ং আল্লাহ এরপর পর্দার বিধান নাযিল করে আসমান থেকে কুরআন পাঠালেন (সূরাহ আহযাব এর ৫৩ নং আয়াত)। নবি নয়, উম্মাহর একজন সত্যিকারের রিজাল, একটা মতামত দিয়েছেন, যার সমর্থনে স্বয়ং আল্লাহ কুরআন নাযিল করেছেন। এমনই ছিল উম্মাহর পুরুষেরা। তারাই ছিল Real man!
এই উমর ইবনুল খাত্তাব এর মৃত্যুর পর, রাসূল (সা.) এবং আবু বকর (রা.) এর পাশে তাকে দাফন করা হয়। উমরের মৃত্যুর আগে আইশা (রা.) যখন নবিজির কবরের কাছে যেতেন, পর্দা করতেন না, কারণ নবিজি (সা.) এবং পিতা আবু বকর (রা.) দুইজনই তাঁর মাহরাম ছিলেন। কিন্তু উমর (রা.) কে যখন সেখানে দাফন করা হয়, এরপর থেকে আইশা (রা.) পর্দা করে কবরের কাছে যেতেন। উমর ইবনুল খাত্তাবের প্রতি মানুষের সমীহ এই পর্যায়ের ছিল যে, তাঁর মৃত্যুর পর কবরের কাছে গেলেও একজন সতী নারী পর্দা করে যেত। এরাই ছিল উম্মাহর পুরুষ। এরাই উম্মাহর নারীদের আগলে রেখেছিল।
উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রা.) বলেন, আমি একবার রাসূল (সা.) এর নিকট ছিলাম। উম্মুল মুমিনীন মায়মুনা (রা.) ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় আবদুল্লাহ ইবনু উম্মে মাকতুম উপস্থিত হলেন। এটি ছিল পর্দা বিধানের পরের ঘটনা। তখন রাসূল (সা.) বললেন, তোমরা তার সামনে থেকে সরে যাও। আমরা বললাম, তিনি তো অন্ধ, আমাদেরকে দেখছেন না! তখন রাসূল (সা.) বললেন, সে অন্ধ ঠিক আছে, কিন্তু তোমরাও কি অন্ধ? তোমরা কি তাকে দেখছ না?⁴
আরেকবার তো একজন আলিম আমাকে (Mohammad Hoblos) বলছেন, ভাই! আপনার দাওয়া ভিডিওতে নারীদের আনেন না কেন? আপনার উচিত নারীদেরকেও নিয়ে আসা! আমি বিস্মিত, হতবাক হয়ে চেয়ে আছি, এ কী বলছেন আপনি! আচ্ছা, আপনি মেনে নেবেন আপনার স্ত্রী আমার সাথে বসে খোশগল্প করছে, হাসাহাসি করছে, আর সেটা ভিডিও হচ্ছে, সারা দুনিয়ার মানুষ দেখছে? আমাদের নারীরা 'হায়া' হারানোর আগে উম্মাহর পুরুষরা তাদের হায়া হারিয়েছে। হায়া, এটা কোনো সহজ বিষয় নয়। সমস্ত ইংরেজি ভাষায় এমন কোনো শব্দ নেই, যেটা এই 'হায়া' শব্দটার যথার্থ অর্থ প্রকাশ করতে পারে! ওলামারা বলেন, যার অন্তরে হায়া নেই, তার মরে যাওয়াই শ্রেয়।
নবিজি (সা.) একদিন আইশা (রা.) এর সাথে ছিলেন। বিশ্রাম করছিলেন, তাই একটু রিল্যাক্স ভঙ্গিতে বসা ছিলেন। এতে তার পায়ের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছিল। এমন সময় দরজায় কেউ একজন কড়া নাড়ল। আইশা (রা.) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা আবু বকর (রা.) এসেছেন। রাসূল (সা.) যেভাবে ছিলেন, সেভাবেই থাকলেন, বললেন আবু বকরকে ভেতরে আসতে দাও। আবু বকর ভেতরে এলেন। কিছুক্ষণ পর আবার কেউ দরজায় করা নাড়ল। আইশা (রা.) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এসেছেন। এবারও রাসূল (সা.) যেভাবে ছিলেন সেভাবেই বসে থাকলেন, উমর (রা.) কে ভেতরে আসতে বললেন। এর কিছু সময় পর আবার কেউ দরকায় কড়া নাড়ল। আইশা (রা.) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! উসমান ইবনু আফফান এসেছেন। রাসূল (সা.) নড়েচড়ে বসলেন, কাপড় ঠিক করলেন, পরিপাটি হয়ে নিলেন, অতঃপর বললেন, এবার উসমানকে আসতে বল।
রাসূল (সা.) এর এই আচরণ দেখে আইশা (রা.) এর একটু কৌতূহল হলো। তাই তাঁরা তিনজন চলে যাওয়ার পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আবু বকর এলো, উমর এলো, আপনি যেভাবে ছিলেন সেভাবেই বসে থাকলেন, কিন্তু যখন উসমান এলো আপনি এভাবে পরিপাটি হয়ে, গায়ে কাপড় দিয়ে বসলেন কেন? জবাবে রাসূল (সা.) বললেন, আইশা! আমি কি এমন ব্যক্তিকে লজ্জা করব না, যাকে দেখে স্বয়ং ফেরেশতারা পর্যন্ত লজ্জা পায়! এরাই হলো উম্মাহর সেই পুরুষ, যাদের অন্তরে হায়া ছিল, গীরাহ ছিল, পৌরুষ ছিল। তাই তাঁরা তাদের অধীনস্ত নারীদের আগলে রাখতে পেরেছেন। উম্মাহকে জুড়ে রাখতে পেরেছেন। আর আজ উম্মাহ তার পুরুষদের হারিয়েছে, সেই সাথে নারীরাও বিপথে চলেছে। এই উম্মাহকে আবার তার আগের অবস্থায় জুড়ে দিতে হলে, আগে এই উম্মাহর পুরুষদের সত্যিকারের 'পুরুষ' হয়ে উঠতে হবে।
টিকাঃ
৪. সুনানে আবু দাউদ ৪/৩৬১, হাদিস: ৪১১২; তিরমিযি ৫/১০২, হাদীস: ২৭৭৯; মুসনাদে আহমাদ ৬/২৯৬; শরহুল মুসলিম, নববি ১০/৯৭; ফাতহুল বারী ৯/২৪৮
📄 এমন জান্নাত—যার তলদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত
দুনিয়ায় আপনি যেসব কাজ করেন, সেসব কাজের উৎসাহ যোগায় কিসে? কেন আপনি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কর্মস্থলে যান? কাজের প্রতি ভালোবাসা? না, টাকার প্রতি ভালোবাসা। আপনার জীবন চলতে টাকার দরকার। কাজ করলে টাকা পাবেন—এজন্যই আপনি কাজে যান। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন যান? জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসার কারণে? উঁহু। আপনি জানেন পড়াশোনা করলে ভালো চাকরি পাবেন। চাকরি পেলে কী হবে? হ্যাঁ, টাকা হবে। সব ঘুরেফিরে ওই টাকাতেই ফিরে আসে। আচ্ছা তাহলে আমরা সালাত পড়ি কেন? সিয়াম পালন করি কেন? এই ইসলামি বইপত্র পড়ি কেন? মুসলিম হিসেবে আমরা যা করি, তা আসলে কেন করি? এগুলোও টাকার জন্যই। তবে এই টাকা দুনিয়ার টাকা নয়—আখিরাতের টাকা। সেখানকার প্রাইজ হলো জান্নাত। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন যারা আখিরাতে সফল, তাদের তিনি পুরস্কৃত করবেন। কী দিয়ে পুরস্কৃত করবেন? জান্নাত দিয়ে।
এই যে ইসলামি বই, ওয়াজ মাহফিল এসব করে আমরা আমাদের আত্মিক উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করি, ভালো মুসলিম হওয়ার চেষ্টা করি, এসব আসলে কেন? এগুলোর পুরস্কারটা কী? কী হবে যদি আপনি পৃথিবীর সেরা মুসলিম হয়ে যান? দ্বীনের বড় দাঈ হয়ে যান? লাভটা কী তাহলে? আল্লাহ্ বলেছেন, “আমি আমার বান্দাদের জন্য এমন জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছি, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি, কোনো হৃদয় কল্পনাও করেনি।” সফলকাম মুমিনদের জন্য আল্লাহ এই পুরস্কার প্রস্তুত করেছেন। জান্নাত! জান্নাতুন তাজরি মিন তাহতিহাল আনহার—এমন জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হতে থাকে।
সিডনীতে বাড়ির মূল্য নির্ধারিত হয় বিচ থেকে দূরত্বের ভিত্তিতে। বিচের যত কাছে বাড়ি হবে, এর দাম তত বেশি হবে। বাসা থেকে যদি সমুদ্র দেখা যায়, তাহলে তাকে বলা হয় 'ওয়াটারভিউ হাউজ'। ধুপ করে দাম বেড়ে তখন দ্বিগুণ হয়ে যাবে। আর যদি সমুদ্রের একবারে কাছে বাড়ি হয়, মানে বাড়ি আর সমুদ্রের মাঝখানে কেবল সৈকত—সেটাকে সিডনীবাসীরা বলে 'প্রাইম রিয়েল এস্টেট'। আল্লাহ বলেননি যে আপনাকে নদীর কাছাকাছি বাড়িঘর দেবেন। বলেছেন যে আপনার পায়ের নিচে, আপনার বাড়ির নিচ দিয়ে, প্রাসাদের নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত হতে থাকবে। মুমিন বান্দাদের জন্য আল্লাহ এমন পুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন।
সেই জান্নাতে আবার একাধিক স্তর রয়েছে। এক স্তরের বাসিন্দারা অপর স্তরের বাসিন্দাদের মতো নয়। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন আপনি এমিরেটস ফ্লাইটে করে অসলো থেকে সিডনী যাচ্ছেন। আপনি আর আমি একই ফ্লাইটে উঠে সিডনী চলেছি। টেকনিল্যালি, আমি আর আপনি একই বিমানে আছি। কিন্তু ফার্স্ট ক্লাসে বসা যাত্রী আর পেছনে বসা যাত্রী কি একইরকম? ইকোনমি ক্লাস, একদম টয়লেটের সাথে। এরকম যাত্রী এয়ারপোর্টে আসলে কী হয়? “হ্যাঁ, কোন ক্লাসে যাচ্ছেন আপনি? বিজনেস, না ইকোনমি?” ইকোনমি শোনার পর তারা বলবে, “ও আচ্ছা, যান ওই বামদিকে গিয়ে লাইনে দাঁড়ান।” সেই লাইনে দাঁড়িয়ে মনে হবে, "ইয়া আল্লাহ্! এই প্লেন ছেড়ে চলে যাবে কিন্তু এই লম্বা লাইন মনে হয় শেষ হবে না। এখানেই দাঁড়িয়ে থাকা লাগবে।” আর যারা জবাব দেয় বিজনেস ক্লাস, তাদেরকে বলা হয়, “স্যার/ম্যাডাম, আসুন। এইদিকে আসুন প্লিজ।” আপনার সাথে দুই-তিন কেজি মালামাল থাকলেই ঝামেলা। কিন্তু ফার্স্ট ক্লাস বা বিজনেসের ওরা সর্বনিম্ন পঞ্চাশ কেজি সাথে করে নিয়ে যেতে পারে। এরা কি সমান? তারপর বিমানে ঢোকার পর কী হয়? তারা আপনাকে ফার্স্ট ক্লাস আর বিজনেস ক্লাসের মধ্য দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাবে। তারপর বলবে, “ওই টয়লেট পর্যন্ত হাঁটতে থাকেন।” সীটের অবস্থা দেখেন, সামনে টিভি স্ক্রীনের সাইজ দেখেন। অন্তর জ্বলেপুড়ে যাবে। চৌদ্দ ঘণ্টার জার্নি আপনাকে টয়লেটের গন্ধ শুঁকে পার করতে হবে। আর ওই ব্যাটা ফার্স্ট ক্লাসের সীটে আরাম করে শুয়ে ঘুমাবে। অথচ আপনি-আমি কি বড়াই করে বলতে পারি না, “আরে ওই লোকের সাথে একই এমিরেটস ফ্লাইটেই তো যাচ্ছি না”? কিন্তু তুলনা হয়? খাবার আলাদা, সীট আলাদা, আপ্যায়ন আলাদা। দুনিয়াতেই এই অবস্থা, আর আল্লাহ আখিরাতে যাদের আপ্যায়ন করাবেন, তাদের অবস্থা কী? আপনার কি মনে হয় তারা সমান হবে? আল্লাহর কসম, তারা সমান নয়।
জান্নাতে সময়ের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না! আল্লাহ বলেছেন খালিদীনা ফীহা আবাদা—সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, অনন্তকাল ধরে। একশ বছর না, এক হাজার বছর না, এক মিলিয়ন বছর না—আপনি সেখানে থাকবেন অনন্তকাল! সেখানে আপনি কখনও মরবেন না। ভাবা যায়? বোঝানোর জন্য আলিমগণ একটি উদাহরণ দিয়ে থাকেন। ধরুন এই পুরো আসমান জমিন সরিষা দানা দিয়ে ভর্তি করে ফেলা হলো। তারপর এক হাজার বছর পর পর একটি করে পাখি এসে সেখান থেকে একটি করে দানা নিয়ে যেতে লাগল। পাখিগুলো দানা নিয়ে শেষ করে ফেলবে, তারপরও আপনি জান্নাতে জীবিত অবস্থায়ই থাকবেন। এটাই হলো খালিদীনা ফীহা আবাদা-অনন্তকালের জীবন। যেখানে মৃত্যুর ভয় নেই, বার্ধক্য নেই।
এক বুড়ি মহিলা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! জান্নাতে কি আমার মতো বুড়িদের জন্য জায়গা আছে? রাসূল (সা.) বললেন, “না। জান্নাতে তো বৃদ্ধাদের জন্য কোনো জায়গা নেই।" বুড়ি কাঁদতে শুরু করল। রাসূল (সা.) হেসে দিলেন। হৃদয়কাড়া এক হাসি। তারপর বললেন, “আল্লাহ্ আপনাকে যৌবন অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং চিরকাল আপনি সে অবস্থায়ই থাকবেন।” জান্নাতীদের বয়স হবে তেত্রিশের কাছাকাছি। আপনি, আপনার বাবা, আপনার মা, সবার একই বয়স! জান্নাতে আপনি হবেন আপনার পিতা আদম (আ.) এর সমান-প্রায় ত্রিশ মিটার। সেখানে আপনাকে কখনো টয়লেটে যেতে হবে না। বোনেদের জান্নাতে কখনওই আর ঋতুঃস্রাব হবে না। এই প্রাকৃতিক ঘটনার সময় যেসব মানসিক অস্থিরতা আসত, সেসব আর কখনও আসবে না। সে এমন এক জান্নাত, দুনিয়ার কোনো দুঃখকষ্ট, পেরেশানি কাউকে স্পর্শ করবে না-শেষ, সবকিছুর সমাপ্তি। জান্নাতে কখনও অসুস্থ হবেন না, ক্লান্ত হবেন না, ঘুম আসবে না। জান্নাতে আপনি সত্যিকারের সুখের সন্ধান পাবেন। এটিই মুমিনদের জন্য আল্লাহর তৈরিকৃত পুরস্কার। জান্নাতে কোনো সিয়াম রাখা লাগবে না, সালাত পড়া লাগবে না, ওযু করা লাগবে না, কিচ্ছু লাগবে না। জান্নাতে আপনি ক্লীন শেইভড থাকবেন।
জান্নাতে আপনি আয়নার দিকে তাকাবেন আর মনে হবে আপনি দুনিয়ার সুন্দরতম সৃষ্টি। দুনিয়ায় সবচেয়ে শ্বাসরুদ্ধকর সুন্দর মানুষটাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন, “আচ্ছা, নিজের মধ্যে কোন দুটি জিনিস আপনি আরেকটু সুন্দর করতে চান বলুন তো!” সে আপনাকে বিশাল একটা লিস্ট ধরিয়ে দেবে। কিন্তু জান্নাতে আপনি আয়নার দিকে তাকাবেন আর আপনার একবারও মনে হবে না কোনো কমতি আছে, কোনো ত্রুটি আছে, এর চেয়ে আর ভালো হওয়া সম্ভব না। সবদিক দিয়ে পারফেক্ট। হ্যাঁ, এটা শুধু জান্নাতেই ঘটবে। জান্নাতে আপনার আশপাশের কিছুই পুরনো হবে না। দুনিয়ায় সবই পুরনো হয়।
নিন্টেন্ডো ভিডিও গেইমের কথা মনে আছে? একদম প্রথমটা। আজকের ছেলেপিলেরা ভাববে, “এটা আবার কোন ডাইনোসরের নাম?” আমাদের সময় এটাই ছিল সেরা। তখনকার গেইমাররা এটাকে মনে করত দুনিয়ার বুকে জান্নাত। আমি যখন এটার খবর পেলাম, আমার তো অবস্থা খারাপ। আমার বাবা-মায়ের অত টাকা ছিল না। তাদের ধরে খুব করে বলতে হয়েছিল, “প্লীজ, এটা কিনে দাও। প্লীজ! প্লীজ!” অনেকদিন টাকা জমিয়ে জমিয়ে যখন তারা আমাকে সেটা কিনে দিলেন, তখন তো মনে হলো, "আহ! দুনিয়া আমার হাতের মুঠোয়!” সেই সুখ কয়দিন টিকেছিল জানেন? সুপার নিন্টেন্ডো বের হওয়ার আগ পর্যন্ত। টাকা যোগাড় করতেই যেহেতু অনেক সময় লেগে গিয়েছিল, তাই সুপার নিন্টেন্ডো বের হওয়ার আগে খুব কম সময় পেয়েছিলাম। যেটা আমার মহাসুখের কারণ ছিল, সেটাই আমার দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে এলো। ভাবতে লাগলাম, কী রে, ভাই! আমি এদিকে ডাকান কমপ্লিট করলাম মাত্র। আর ওইদিকে আরেকজন মারিও খেলছে। আল্লাহ্ কসম! আমার জীবন এভাবেই কাটতে লাগল। মা যখন আমাকে সুপার নিন্টেন্ডো কিনে দিলেন, ততদিনে নিন্টেন্ডো সিক্সটি ফোর বেরিয়ে গেল।
এটাই দুনিয়া। সুখপাখি কখনওই ধরা দেয় না। আপনার কেনা প্রথম গাড়িটার কথা মনে আছে? আমি প্রথম যেই গাড়িটা কিনেছিলাম, সেটা ছিল পৃথিবীর বুকে জঞ্জালের মতো, এই গাড়ি তখন কেউ কেনে না। কিন্তু সেসময় আমি ওটাকে ল্যাম্বরগিনির মতো ভাব নিয়ে চালাতাম। নিজেকে নায়ক ভাবতাম। তখন থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত আপনি আমি আমাদের গাড়ি আপগ্রেড করেই চলেছি, করেই চলেছি। সুখ খুঁজে পেয়েছেন? আপনার প্রথম ফোনের কথা মনে আছে? কতদিন ধরে আপনি ফোন আপগ্রেড করে চলেছেন? এমনকি প্রথম আইফোনটার কথাও কি মনে আছে? আইফোন থ্রি, আইফোন ফোর, আইফোন ফোর এস? আমার কাছে মনে হতো এটার অর্থ মনে হয় 'আইফোন ফোর স্টুপিড'। একই জিনিস, খালি নামের সাথে একটা এস লাগিয়ে দিয়ে বের করেছে। কিন্তু ওই একটা এস থাকার কারণেই আপনার মন দুঃখে ভরে যাবে, “হায় হায়! এটা বাদ দিয়ে এখনও আইফোন ফোর কেন চালাচ্ছি?”
কিন্তু জান্নাতে ঠিক বিপরীত। জান্নাতে ফল খেতে ইচ্ছে হলে ফলই আপনার কাছে চলে আসবে। ফলে প্রথম কামড়টা বসানোর সাথে সাথে মনে হবে আপনার জীবনে পাওয়া সেরা স্বাদ। দিতীয় কামড় বসাবেন, সেটা প্রথম কামড়ের চেয়ে ভালো মনে হবে। অনন্তকাল ধরে আপনি সেই প্রথম কামড়ের স্বাদ আর পাবেন না। প্রতিটা কামড়ের সাথে এটি আগের চেয়ে ভালো হতেই থাকবে, হতেই থাকবে, হতেই থাকবে। জান্নাতে যখন আপনি প্রথমবার আপনার স্ত্রীকে দেখবেন, আপনি এত অভিভূত হয়ে যাবেন যে ওখানেই চল্লিশ বছর কেটে যাবে। হা করে চল্লিশ বছর তাকিয়ে থাকার পর একটু অন্যদিকে ফিরে আবার তার দিকে তাকাবেন। সে এতক্ষণে আগের চেয়েও সুন্দরী হয়ে গেছে। দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দরী নারীর দিকেও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর কোনো না কোনো ত্রুটি চোখে পড়বে, মনে হবে, "আচ্ছা, এর নাকটা কি একটু বাঁকা?” কিন্তু জান্নাতে এরকম হবে না, সেখানে যতই দেখবেন সৌন্দর্য বাড়তেই থাকবে।
দুনিয়ার স্ত্রী যদি জান্নাতেও আপনার সঙ্গী হয়, রাসূল (সা) বলেছেন যে, হুরদের তুলনায় তার সৌন্দর্য হবে মোমবাতির তুলনায় সূর্যের আলোর মতো-অতুলনীয়। এইসব আল্লাহ আপনার জন্য তৈরি করে রেখেছেন। সেখানে আপনার তাঁবু তৈরি হবে একটি মুক্তা থেকে, ষাট মাইল লম্বা, ষাট মাইল প্রশস্ত। জান্নাতে আপনার প্রাসাদের ইটগুলো হবে সোনা আর রূপার। সেগুলোর গাঁথুনির মসলা হবে কস্তুরীর তৈরি। এসব জান্নাতে থাকবে আপনার জন্য। যদি আপনি এই দুনিয়ায় অল্প সময়ের জন্য ধৈর্য ধরতে পারেন। কিন্তু জান্নাতের সবচেয় আকর্ষণীয় ব্যাপারটি কী জানেন? আল্লাহ আমাদের সবাইকে জড়ো করবেন এবং আমাদের সাথে কথা বলবেন। সহিহ হাদিসে এসেছে, আল্লাহ্ আমাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন, “তোমরা কি আর কিছু চাও আমার কাছে?” আমরা বলব, “হে আল্লাহ! আপনি তো আমাদের জাহান্নাম থেকে বাঁচিয়েছেন। আমাদেরকে আপনার জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন। এসব নিয়ামত আমাদেরকে দিয়েছেন। আমরা আর কী চাইতে পারি?” আল্লাহ বলবেন, “তোমরা কি সন্তুষ্ট?” আমর বলব, “হে আল্লাহ! অবশ্যই আমরা সন্তুষ্ট।” আল্লাহ বলবেন, “তাহলে এখন থেকে নিয়ে আর কখনওই আমি তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হবো না।” আল্লাহ বলবেন, আমি আমার ও তোমাদের মধ্য থেকে পর্দা সরিয়ে দিচ্ছি যাতে তোমরা আমাকে দেখতে পাও। আর আপনি স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখতে শুরু করবেন। আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছেন! ভাবা যায়? সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! সত্যিই আমরা আল্লাহ্কে দেখতে পাব? রাসূল (সা.) পূর্ণিমার চাঁদের দিকে দেখিয়ে বললেন, তোমরা কি এই চাঁদটি দেখতে পাচ্ছ? সাহাবাগণ বললেন, হ্যাঁ। রাসূল (সা.) বললেন, চাঁদকে যেমন কোনো বাধাবিঘ্ন ছাড়াই দেখতে পাচ্ছ, আল্লাহকেও সেভাবেই দেখতে পাবে। এটি হলো জান্নাতের চূড়ান্ত পুরস্কার।
দুনিয়ার এই পঞ্চাশ-ষাট বছর কিচ্ছু নয়। ধৈর্য ধরে যদি দ্বীন আঁকড়ে ধরে রাখতে পারেন, আল্লাহ আপনার জন্য এরচেয়ে ভালো কিছু রেখেছেন। কিন্তু এর জন্য আপনাদেরকে সেই জান্নাতের মূল্য চুকাতে হবে। দুনিয়াতে যে ফেরারি গাড়িতে চড়ে, সে কি এটার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেনি? যে বিরাট ম্যানশনে থাকে, সে কি কঠোর পরিশ্রম করেনি? তেমনি জান্নাত পেতে হলেও আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। কেউ কেউ বলে, “ভাই, আমার সেই পরিমাণ পরিশ্রমের স্ট্যামিনা নেই।” আমি বলি, এমন মনে হলে তখন স্মরণ করবেন আপনার লক্ষ্য কী। আপনি সেই মানুষদের মধ্যে থাকতে চান, যারা জান্নাতে চিরকাল থাকবেন।
আল্লাহর ওয়াস্তে জীবনটাকে হেলায় হারাবেন না। আখিরাতে আল্লাহ বান্দাদের বলবেন, কুরআন তিলাওয়াত করতে থাকো আর জান্নাতের এক স্তর থেকে আরেক স্তরে উঠতে থাকো। শেষ যে আয়াত তিলাওয়াত করবে, সেটাই হবে জান্নাতে তোমার স্থান। তাই কুরআন শিক্ষা করা কখনওই ছেড়ে দেবেন না। প্রতিটা আয়াত মুখস্থ করার সাথে সাথে আপনি জান্নাতে নিজের মর্যাদা উন্নীত করছেন। আখিরাতে মনে হবে, ইশ! আর একটা আয়াত জানলেই আমি আজকে ওই অবস্থায় থাকতাম! এতশত ইসলামি বই পড়ে আর ওয়াজ শুনে আপনার অ্যাকশান প্ল্যান এখন কী হবে? এগুলোকে জাস্ট বিনোদন হিসেবে নিয়ে যেমন-তেমন চলাফেরা করতে থাকবেন? নাকি অন্তরে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে নেবেন জান্নাতে রাসূলুল্লাহর সাথে ফার্স্ট ক্লাস চেয়ারের যাত্রী হওয়ার? সিদ্ধান্ত আপনার।