📘 এপিটাফ 📄 ঈসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের কথা

📄 ঈসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের কথা


ঈসা (আ.) একবার তাঁর সঙ্গীদের সাথে পথ চলছিলেন। এমন সময় তাঁদের খিদে পেয়ে গেল। তাঁরা এক জায়গায় বসে টাকাপয়সা বের করে একজনকে দায়িত্ব দিলেন—যাও, শহরে গিয়ে খাবার কিনে নিয়ে এসো। সেই ব্যক্তি শহরে খাবার কিনতে গিয়ে টের পেল যে, সর্বসাকুল্যে যত টাকা আছে, তা দিয়ে কেবল তিনটি রুটি ক্রয় করা যাবে। সে ভাবল, এই খাবার যদি আমি ওখানে নিয়ে যাই, সবাই-ই তো ক্ষুধার্ত, আমি তো তেমন কিছু খেতেই পাব না। সে সেখানেই একটি রুটি খেয়ে ফেলল, আর বাকি দুটি নিয়ে ফিরে এলো। ঈসা (আ.) রুটি দেখে বললেন, তৃতীয় রুটিটা কোথায়? লোকটি অবাক হয়ে ভাবল, কী রে! আমি খাওয়ার সময় তো একাই ছিলাম। সে জবাব দিল, আমি তো দুটিই কিনেছি। ঈসা (আ.) আর তর্ক করলেন না।

তারপর আবার তারা পথ চলতে লাগলেন। আবার খাওয়ার সময় হলো। সঙ্গীরা একটি হরিণ শিকার করতে সমর্থ হলেন। সেটাকে রান্না করলেন, খাওয়াদাওয়া শেষ করলেন। খাওয়া শেষে হাড্ডিগুড্ডি ছাড়া কিছু বাকি থাকল না। ঈসা (আ.) সেই লোকটিকে ডাকলেন। আল্লাহর ইচ্ছায় মুজিযা সংঘটিত হয়ে হরিণটি জীবিত হয়ে গেল। একটি হাড্ডিসার লাশ থেকে একেবারে জলজ্যান্ত প্রাণী। ঈসা (আ.) বললেন, সেই সত্তার কসম যিনি এতে প্রাণ দিলেন, সত্যি করে বলো তৃতীয় রুটিটি কে খেয়েছিল? ওই লোকটি আগে থেকেই চাপে ছিল। সে এবারও বলল, সত্যিই আমি দুটি রুটিই ক্রয় করেছিলাম।

আমরা জীবনে মাঝেমাঝে এমন সব ভুল করি যা প্রথমবারে স্বীকার করে নিলে তেমন কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু আমরা মিথ্যা বলে সেটাকে ঢাকতে চাই, আরো দশটা মিথ্যা বলতে বলতে পরিস্থিতি একেবারে জটিল করে ফেলি। এই ব্যক্তিটি বলে দিতে পারত, দেখেন, আমার খুব খিদে পেয়েছিল। পরে কতটুকু খানা জোটে বা না জোটে ঠিক নেই। তাই আমি ওখানেই একটা খেয়ে ফেলেছি। কিন্তু তা না করে এখন সে কতো গভীর বিপদে পড়ে যাচ্ছে দেখুন। চোখের সামনে আল্লাহর ক্ষমতা দেখেও সে স্বীকার করছে না।

যা-ই হোক, ঈসা (আ.) কথা না বাড়িয়ে আবার সঙ্গীদের সহ পথ চলতে শুরু করলেন। তারা একটি নদীর পাড়ে পৌঁছালেন। ওপারে যাওয়ার মতো কোনো নৌকাও নেই, পানির গভীরতাও বেশি। ঈসা (আ.) তাঁর সব সঙ্গীদের জড়ো করলেন। তারপর আল্লাহর ইচ্ছায় পুরো দলটি পানির পৃষ্ঠের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে একদম অপর পাড়ে গিয়ে পৌঁছলেন। ঈসা (আ.) সেই লোকটিকে আবার ডাকলেন। বললেন, সেই সত্তার কসম যিনি আমাদের পানির উপর দিয়ে হাঁটিয়ে আনলেন, তৃতীয় রুটিটি কে খেয়েছিল? লোকটি এবারও বলল, সত্যিই দুটি রুটি ছিল। তাঁরা আবার চলতে লাগলেন। শেষ গন্তব্যে পৌঁছার পর ঈসা (আ.) সব সঙ্গীদের নিয়ে বসে তিন স্তূপ মাটি জড়ো করলেন। আল্লাহর ইচ্ছায় সেগুলো স্বর্ণ হয়ে গেল। ঈসা (আ.) লোকটিকে বললেন, এক স্তূপ তোমার, এক স্তূপ আমার, আর আরেক স্তূপ সেই ব্যক্তির জন্য যে তৃতীয় রুটিটি খেয়েছিল। লোকটি এবার চিৎকার করে উঠল, আমিই তৃতীয় রুটিটি খেয়েছিলাম।

মানুষটি যখন চোখের সামনে দুনিয়াবি সম্পদের হাতছানি দেখল, তখন সহজেই স্বীকার করে নিল। ঈসা (আ.) বললেন, তিনটি স্তূপই তোমার। কিন্তু তুমি আর আমাদের সাথে থাকতে পারবে না। একথা শুনে লোকটি কী বলল? লোকটি বলল, আরে যান যান! দেখেন আমার নিজের এখন কতো কিছু আছে। ঈসা (আ.) সঙ্গীদের নিয়ে চলে গেলেন। আর এদিকে ওই লোকটির তো মাথাই নষ্ট। এত সম্পদ দিয়ে প্রথমে কী কেনা যায়, কী খাওয়া যায় তা ভাবতে ভাবতে অবস্থা খারাপ। একটু পর তিনটি চোর এলো। তিন স্তূপ স্বর্ণ দেখে তারা লোভে পড়ে গেল, লোকটিকে তারা মেরে ফেলল। তিনজন চোর, তিন স্তূপ স্বর্ণ। কিন্তু তাদেরও খিদে লেগেছে। একজন বলল, আমি শহরে যাই, খাবার কিনে আনি। আগে সবাই খাওয়া-দাওয়া করি। এরপর আমরা যে যার অংশ নিয়ে ঘরে ফিরে যাব। সুন্দর পরিকল্পনা।

যে শহরে যাচ্ছে সে ভাবছে ওই দুইজনের অংশ কীভাবে মেরে দেওয়া যায়। আর ওখানে দুজন ভাবছে তৃতীয়জনের অংশটা কীভাবে মেরে দেওয়া যায়। এরা ঠিক করল তৃতীয়জনকে মেরে ফেলবে, তারপর তার অংশটা নিজেরা আধাআধি ভাগ করে নেবে। ওদিকে খাবার কিনতে যাওয়া চোরটা ভাবছে, ওরা নিশ্চয় আমার কোনো ক্ষতি করবেই। তাই সে খাবারে বিষ মিশিয়ে দিল। সে খাবার নিয়ে ফিরে আসতে না আসতেই বাকিরা তাকে হত্যা করে ফেলল। তারপর নিজেরা বসে উদরপূর্তি করল। একটু পর খাবারের বিষে তারাও মারা গেল। ঈসা (আ.) ফিরে আসছেন। তাঁরা সেই ফেলে যাওয়া সঙ্গীর লাশ দেখলেন, তিনটি চোরের লাশ দেখলেন, আর তিন স্তূপ স্বর্ণ একেবারে অক্ষত অবস্থায় দেখলেন। ঈসা (আ.) তাঁর সঙ্গীদের বললেন, এই হচ্ছে দুনিয়ার জীবন। যে এর পেছনে দৌড়ায়, দুনিয়া তাকে এই অবস্থা করে ছাড়ে।

এটাই দুনিয়া। আল্লাহর কসম, আপনি যত ইচ্ছা এর পেছনে দৌড়াতে পারেন। কিন্তু আপনি সবই পেছনে ফেলে যাবেন। কিচ্ছু সাথে নিতে পারবেন না। অথচ কতবারই না আমরা এই দুনিয়ার তুচ্ছ মুল্যে নিজেদের দ্বীন বিক্রি করে দিয়েছি! আর আমাদের মাঝে কেউ ভাবছে, আরে না! আমি একেবারে সাচ্চা ঈমানদার। আমার এমন দুর্ঘটনা হতেই পারে না। ওয়াল্লাহি, শয়তানের চক্রান্ত আমাদের বুদ্ধির চেয়ে অনেক গভীর। আল্লাহ আমাদেরকে দুনিয়ার ফিতনা থেকে হিফাজত করুন। আমীন।

📘 এপিটাফ 📄 বিলি—দ্যা ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন

📄 বিলি—দ্যা ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন


বক্সিং ছিল বিলির স্বপ্ন। আর ছোটবেলা থেকেই আর সবার মতো তারও স্বপ্ন ছিল একদিন বক্সিং ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন হওয়া। তারপর সত্যি সত্যি যখন সেই স্বপ্ন বাস্তবে ধরা দিল, কেমন ছিল সেই অনুভূতি? বিলির ভাষায়, "আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে, আমি এখন ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন! আমার জন্য এটা ছিল গর্ব করার মতো এক মুহূর্ত। আমি ভাবছিলাম, আমার ছোট ভাই এখন স্কুলে যাবে আর বন্ধুদের গর্ব করে বলবে, জানিস, আমার ভাই এখন ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন। বক্সিং রিঙের এক কোণায় চ্যাম্পিয়ন বেল্ট নিয়ে দাঁড়ানো, আর দর্শকদের উল্লাসধ্বনিতে ফেটে পড়তে দেখা—এ এক অন্যরকম অনুভূতি।”

দুই দুইবার ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন হওয়া সহজ কথা নয়, কিন্তু বিলি সেই অসাধ্য সাধন করেছিল। ছোটবেলা থেকেই বিলি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখত—খ্যাতি কিংবা অর্থকড়ির জন্য নয়, বরং খেলাটাকে সে মনেপ্রাণে ভালোবাসত। বিলির ভাষায়, “যখন আমি বক্সিং শুরু করি, তখন আমার কাছে এই খেলাটার মানেই ছিল শুধু ট্রফি আর বেল্ট জেতা। টাকা পয়সার চিন্তা কখনো মাথায় আসেনি।” কিন্তু বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর পরিস্থিতি পাল্টে গেল। অন্য বক্সিং তারকাদের মতো বিলির চোখ গেল খ্যাতি, বিলাসিতাময় জীবনের দিকে।

“অস্কার দ্যা লা হোয়ে, শ্যান মোসলেহ, প্রিন্স নাসিম, মাইক টাইসন এদের দেখেই আমি বড় হয়েছি। এদের প্রত্যেকেই বক্সিং খেলে মিলিয়নিয়ার হয়েছে। আর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর এখন আমি সেসব লিজেন্ডদের সাথে চলাফেরা করছি। তাদের ফেরারি, ল্যাম্বরগিনি, মেয়ব্যাকস, রোলস রয়েসেস দেখতাম আর ভাবতাম—একদিন আমারও এসব চাই।” —বিলি। “আমেরিকায় ছুটি কাটাতে গিয়ে একবার আমার ফ্লুইড ম্যায়ওয়েদারের সাথে দেখা। আমি তাকে বললাম, হে ফ্লুইড, আমি তো এখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন! জবাবে ফ্লুইড শুধু বলেছিল, তোমার সাথে আমি যোগাযোগ করব।” —বিলি

এর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বিলির কাছে আমেরিকায় TMT প্রমোশনে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব আসে। 50 cent আর ফ্লুইড ম্যায়ওয়েদার মিলে এই TMT প্রমোশন খুলেছিল যার আরেক নাম 'The Money Team'. TMT প্রমোশনে যোগ দিয়ে বিলির মনে হলো এবার তার জীবনের সব শখ আহ্লাদ বুঝি পূরণ হতে চলেছে। বড় বড় তারকাদের সাথে তাদের ফেরারি, ল্যাম্বরগিনিতে ঘুরাফেরা, ফাইভ স্টার হোটেল, দামি রেস্টুরেন্ট—হঠাৎ করে বিলির জীবনটাই পাল্টে যেতে শুরু করল।

“আমি যখন 50 cent এর সাথে চুক্তি সই করি, তখন মনে মনে চিন্তা করছিলাম, এবার তাহলে একটা ফেরারি, একটা ল্যাম্বরগিনি কিনে ফেলব, এরপর এটা কিনব, ওটা কিনব, এটা করব, ওটা করব ইত্যাদি। টাকা এখনো হাতে আসেনি, তার আগেই আমি মনে মনে শপিং করা শুরু করে দিয়েছি। যখন কোনো দামি গাড়ি চোখে পড়ত, ভাবতাম কালকেই এই গাড়িটা কিনে ফেলব।” —বিলি

কিন্তু বাইরে থেকে বিলির এই জীবনটা যতই রংচঙা মনে হোক না কেন, কিছুদিন যেতে না যেতেই বিলির ভেতরের সত্তা এই জীবনটার অসারতা টের পাওয়া শুরু করল। “এ লোকগুলোর সাথে থাকা আমার কাছে গজবের মতো মনে হচ্ছিল। 50 cent যে কিনা পৃথিবী বিখ্যাত র‍্যাপার, এরকম মানুষদের সাথে থাকব—এটা আমার কাছে বিশাল এক ব্যাপার মনে হতো। কিন্তু আমেরিকায় গিয়ে সেখানে তারা আমাকে এমন সব কাজ করতে বলত, এমন সব বিষয়ে যুক্ত হতে বলত, যা আমি কখনো করিনি। এমন সব পার্টিতে আমাকে নিয়ে যেত, যেখানে আমি কখনো যাইনি। ধীরে ধীরে আমি তার প্রতি আকর্ষণ হারাতে থাকতাম, সেও আমার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছিল।” —বিলি

একদিকে যখন বিলি এরকম পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রামে লিপ্ত, সেসময় অন্তকোন্দলের কারণে TMT প্রমোশন ভেঙে যায়। আর এসবকিছু ঘটছে ঠিক তখনই, যখন বিলি ম্যাজর ওয়ার্ল্ড টাইটল জেতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। “একদিন 50 সেন্ট এসে বলল, শোনো বিলি, আমি তোমাকে যে টাকা দেব বলে চুক্তি করেছিলাম, সেটা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। তারা আমার সাথে এসব করছে আমার ওয়ার্ল্ড টাইটল ম্যাচের ঠিক দুই দিন আগে—যখন আমার মাথায় শুধু ম্যাচের চিন্তা! মনে হচ্ছিল যেন তারা আমার বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছে। যাই হোক, ম্যাচের দিন আমি ভেন্যুতে যাচ্ছিলাম। কেন জানি না, আমি আমার মা'কে ফোন দিলাম। ফোন দিয়ে বললাম, মা, আমি চাই তুমি আজকে আমার ম্যাচ দেখবে না।” - বিলি

সেই ম্যাচটা বিলি হেরে গেল। হঠাৎ করে হাওয়ায় ভাসতে থাকা বিলির যেন মাটিতে নেমে আসা। যেন ছবির মতো সুন্দর একটা স্বপ্ন হঠাৎ ভয়ঙ্কর কোনো দুঃস্বপ্ন দেখে ভেঙে গেল। কিন্তু এই দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লাগল যখন বাড়িতে এসে বিলি স্ত্রীর ফোন পেল। “সেই দিনটির কথা আমি কোনোদিনও ভুলব না। আমার এখনো মনে আছে আমি লাউঞ্জরুমে বসে ছিলাম, সামনেই আমার মা দাঁড়িয়ে আছে। সেসময় আমার স্ত্রী সারাহর ফোন এলো। -কী করছ বিলি? -কিছু না, এই তো। -কোথায় তুমি? -এই তো বাসায়। -শোন বিলি! আমি তোমাকে একটা খবর জানাতে চাই। আমার ক্যান্সার ধরা পড়েছে।” কিছু সময়ের জন্য আমার মনে হলো সারাহ আমার সাথে মজা করছে। কিন্তু হঠাৎ সে ফোনে কান্নায় ভেঙে পড়ল। আমার আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।”

দুই মাস দশ দিন পর বিলির স্ত্রী সারাহ তাকে ছেড়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিল। দুঃখ, বেদনা আর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে নাজুক সময়ে বিলি তার প্রিয়তমা স্ত্রীকেও হারাল। “এই পুরো অভিজ্ঞতার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে কষ্টের অনুভূতি হয়েছিল সারাহর বাবাকে দেখে। নিজের মেয়ে অল্প কয়দিনের মধ্যে মারা যাচ্ছে এটা জেনে তিনি পাগলের মতো ডাক্তারকে বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন, কী বলছেন আপনি? কী চাই আপনার? টাকা? কত টাকা চাই আপনাদের? কিন্তু ডাক্তার জানাল, টাকার প্রশ্ন না স্যার। আমরা সারাহর জন্য করণীয় সবকিছু করেছি। কিন্তু আমরা দুঃখিত, সারাহ আমাদের সাথে আর খুব বেশিদিন নেই। আমি দূর থেকে এসব শুনছিলাম আর বারবার শুধু একটা প্রশ্নই মাথায় বাজছিল, ‘এত টাকাপয়সা কী কাজে এলো’?” -বিলি

বিলি কখনো আশা করেনি, তার সাজানো গোছানো জীবনটা এভাবে তছনছ হয়ে যাবে। যে নিয়ামত আল্লাহ তাকে দিয়েছিলেন, মুহূর্তেই আবার আল্লাহ সেগুলো এভাবে ছিনিয়ে নেবেন। কিন্তু এর মাধ্যমেই বিলি জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা পেল। “সারাহর মিত্যুর পর মানসিকভাবে আমি এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম, আমার শুধু মনে হতো যদি সময়ের কাঁটা আবার পেছনে ঘুরিয়ে দিতে পারতাম! কারণ আমি এসব আর সহ্য করতে পারছিলাম না। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, সারাহর মৃত্যুর পর আমি জীবনে প্রথমবার কোনো কবরস্থানে গিয়েছি। নিজ হাতে সারাহকে কবর দিয়েছি। এরপর থেকে আমি কবরস্থানে নিয়মিত যাওয়া শুরু করলাম, কখনো দিনে দুই তিন বার করেও যেতাম। কাউকে জানতে দিতাম না আমি কোথায় যাচ্ছি। আমি শুধু সেখানে যেতাম আর চুপচাপ বসে থাকতাম।”

প্রিয়জন হারানোর এই বেদনার সাথে লড়াই করাটাই ছিল বিলির জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই। আর এর মাধ্যমেই বিলি তার দ্বীন আবার ফিরে পেল। ফিরে পেল আল্লাহর সাথে তার হৃদয়ের সেই সম্পর্ক। “যখন সালাত আদায় করি, আমার মনে হয় জীবনে আর কোথাও এমন প্রশান্তি নেই। এসব আমি শুধু বলার জন্যই বলছি না, এটাই সত্য। যখন আমি পেরেশানিতে থাকি, অস্থির বোধ করি, আমি আল্লাহর কাছে গিয়ে চাই, 'ও আল্লাহ! আমাকে সাহায্য কর। আমার অন্তরের এই দুঃখ বেদনা থেকে আমাকে মুক্তি দাও'।”-বিলি

“আমার বাবা আমাকে সবসময় বলত, মানুষের জীবনের সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছায় সংঘটিত হয়। আর দুনিয়ার এই জীবন হলো একটা পরীক্ষা। সারাহর মৃত্যু, বক্সিং রিঙে ম্যাচ হারা-এসবকিছু আমার জন্য পরীক্ষা ছিল। আর এসব পরীক্ষায় আমি কিছু জিনিস হয়তো হারিয়েছি, কিন্তু সবচেয়ে মূল্যবান, আমার আল্লাহকে খুঁজে পেয়েছি।” –বিলি। যে বিলির কাছে মনে হতো বক্সিং চ্যাম্পিয়ন হওয়া তাকে প্রাচুর্য আর সুখশান্তির একটা জীবন দেবে, সেই মোহ একসময় কঠিন বাস্তব হয়ে তার জীবনটা পাল্টে দিল। সে মনে করত এই ট্রফি, বেল্ট—এগুলোই জীবন। একসময় তাই আল্লাহর কাছে শুধু এসবই সে চাইত। কিন্তু আল্লাহর কাছে এখন তার শুধু একটাই চাওয়া, “ও আল্লাহ আমাকে তোমার দ্বীনের উপর অটল রাখ। আর আমাকে তোমার কাছে কেবল তখনই নিয়ে যেয়ো, যখন তুমি আমার প্রতি সন্তুষ্ট।”

📘 এপিটাফ 📄 নবিজি যেখানে প্রতিবেশী

📄 নবিজি যেখানে প্রতিবেশী


আমার দাওয়াহ ক্যারিয়ারে অনেক রকম মানুষের দেখা পেয়েছি। আখিরাত, জান্নাত, জাহান্নাম নিয়ে অনেকে অনেককিছু ভাবে। কিছু মানুষ বলে, কোনোমতে জান্নাতে যেতে পারলেই হলো, এতেই তারা খুশি। অথচ জান্নাত শুধু একটি স্তর না। জান্নাতের বেশ কিছু স্তর রয়েছে। একটি থেকে আরেকটি স্তরের মর্যাদা বেশি। তাই যখন কেউ বলে, “ভাইরে! জান্নাতে খালি ঢুকতে পারলেই হলো! তাতেই সন্তুষ্ট হয়ে যাব।” – বাস্তবে এ কথা সত্য নয়। দুনিয়ায় কিন্তু আমরা নিজেদের যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট নই। আপনি যে গাড়িতে চড়েন, সেটা নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট নন। আপনার কাছে যে পরিমাণ টাকা আছে, তা নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট নন। আপনি যে বাড়িতে থাকেন, তা নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট নন। দুনিয়ায় আপনি সবসময় আকাঙ্ক্ষা করেন যেটা আছে তার থেকে ভালো ও বেশি কিছু পাওয়ার। কিন্তু যখন দ্বীনের কথা আসে, আখিরাতের কথা আসে, তখনই আমরা অল্পে তুষ্ট হয়ে যাওয়ার ভান করি।

আসহাবে সুফফার একজন খুবই গরীব সাহাবি রাবিআ বিন কাব আল আসলামি (রা.)। তিনি আহলুস সুফফার সদস্য ছিলেন। মসজিদে নববির পেছন দিকে একটা অংশ ছিল, যেখানে বসবাসকারীদের আহলুস সুফফা বলা হতো। আহলুস সুফফার সাহাবাগণ ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই কপর্দকশূন্য। আমরা প্রায়ই বলি না যে “হাতে টাকা-পয়সা নাই,” “অভাবে আছি” ইত্যাদি? আমাদের বলার অর্থ হলো, “আমার পকেটে বেশি টাকা নেই, কিন্তু বাপের টাকা দিয়ে আরামেই চলছি।” কিন্তু এই আহলুস সুফফার মানুষগুলোর কাছে সত্যি সত্যিই কোনোই টাকা-পয়সা ছিল না। মসজিদে থাকছেন, সতর ঢাকার মতো পোশাক কিনবেন, সেইটুকু আর্থিক সামর্থ্যও নেই। আপনি মসজিদে নববিতে সালাত আদায় করছেন, কিন্তু আপনার সতর ঢাকার মতো সামর্থ্য নেই! ভাবতে পারেন?

আল্লাহর রাসূল তাহাজ্জুদ পড়ার জন্য যখন ঘর থেকে বের হতেন, রাবিআ বিন কাব আল-আসলামি নবিজির জন্য ওযুর পানি নিয়ে আসতেন। এমনি একদিন রাবিআ ওযুর পানি নিয়ে এলেন। রাসূল (সা.) রাবিআর দিকে তাকালেন। তাঁর গরিবি হালত দেখে নবিজির মন খারাপ হয়ে গেল। তিনি (সা.) বললেন, “রাবিআ, কিছু একটা চাও।”
- “হে আল্লাহ নবি! আমি জান্নাতে আপনার সাথে থাকতে চাই।”
নবিজি যেন ইঙ্গিতে বোঝাতে চাচ্ছেন, আরে! আমি আখিরাতের কথা বলছি না। এখানে দুনিয়ায় কী চাও? স্ত্রী লাগবে না? অথবা একটা ঘর? বলো, কিছু একটা চাও। রাবিআ নবিজির দিকে তাকিয়ে বললেন, -“ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি জান্নাতে আপনার সাথে থাকতে চাই। আর কিছু না।”

আচ্ছা ভাবুন তো আপনি বিল গেটসের সাথে একটা রুমে বসে কথাবার্তা বলছেন। সে আপনার অবস্থা দেখে দুঃখ পাচ্ছে। তারপর হঠাৎ বলল—“আপনি এই চেকটাতে যেকোনো একটা টাকার পরিমাণ লেখেন তো। আমি সাইন করে দিই।” সেখানে এই তরুণ সাহাবি প্রস্তাব পেলেন স্বয়ং আল্লাহর নবির কাছ থেকে। যে নবি কেবল দুআ করলে, আল্লাহ্ আসমান থেকে স্বর্ণের বৃষ্টি বর্ষণ করিয়ে ছাড়তেন, সেই নবি রাবিআকে বলছেন কিছু একটা চাইতে। কিন্তু গরীব এই সাহাবির জীবনে শুধু একটিই চাওয়া—জান্নাতে যেন নবিজির সাথে থাকতে পারেন। যেখানে আমরা বলি জান্নাতে কোনোরকমে ঢুকতে পারলেই হলো! সেখানে এই মানুষগুলোর চিন্তাভাবনা কেমন ছিল দেখুন। দুনিয়ায় যার কিছুই নেই, একেবারে নিঃস্ব, অসহায়—সেই মানুষটি আপনার আমার মতো শুধু কোনোমতে জান্নাতে যেতে চান না। তিনি চান জান্নাতে যেন নবিজি তাঁর সঙ্গী হয়।

রাবিআর এই চাওয়া শুনে নবিজি (সা.) বললেন, “হে রাবিআ! তুমি বিরাট এক জিনিস চেয়েছ। বেশি বেশি সিজদার মাধ্যমে তোমার এই অনুরোধ পূরণে আমাকে সাহায্য করো।” অর্থাৎ বেশি করে সালাত পড়ো। আরেকজন সাহাবি একবার নবিজি (সা.) এর কাছে এসে বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমি যতক্ষণ আপনার সাথে থাকি, ততক্ষণ আমার মন-মেজাজ খুব ভালো থাকে। আর যখনই ঘরে ফিরে যাই, তখনই আপনাকে মিস করতে শুরু করি। তারপর আমি পরিবারকে ছেড়ে আবার আপনার কাছে ফিরে আসি। আপনার উপর চোখ পড়তেই আমার অন্তরে প্রশান্তি ফিরে আসে। কিন্তু হঠাৎ আমার মাথায় চিন্তা ভর করল যে, একদিন তো আপনি মারা যাবেন, আর আমিও মারা যাব। আর তখন আপনি থাকবেন জান্নাতের উঁচু স্তরে নবিদের সাথে। আর আমি যদি কোনোমতে জান্নাতে যেতে পারিও, আমি তো আর আপনার সমকক্ষ হতে পারব না, জান্নাতে গেলেও হয়তো নিচু কোনো স্তরে থাকব। ইয়া রাসূলাল্লাহ! জান্নাত কী করে আমার কাছে জান্নাত হবে, যদি সেখানে আপনাকে না পাই?”

সাহাবির কথা শুনে কিছু সময়ের জন্য নবিজি নির্বাক হয়ে গেলেন। আসমান থেকে জিবরিল (আ.) নেমে এলেন। তিনি বললেন, “আপনার উম্মাতকে বলে দিন, তারা যাকে ভালোবাসে, জান্নাতে তাদের সাথেই থাকবে।” আনাস (রা.) বললেন, “আল্লাহর কসম! এই হাদিসটি আমাদের সবথেকে প্রিয়। কারণ আল্লাহর কসম! আমরা রাসূল (সা.), আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.) এর চেয়ে বেশি কাউকে ভালোবাসতাম না।”

আকাশের ওপারে, অনিন্দ্য সুন্দর জান্নাতে, আল্লাহ্ যেন আমাদেরকেও একটি করে ঘর বানিয়ে দেন। যে ঘরের পাশেই কোথাও প্রিয় নবিজিও থাকবেন। কোথাও থাকবেন আবু বকর (রা.), কোথাও উমর (রা.)। আমরা সেদিন বলব, দুনিয়াতে আপনাদেরকে আমরা ভালবাসতাম। জান্নাতে এসে একদিন আপনাদের সাথে মিলিত হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। আল্লাহ্ যেন আমাদেরকে কবুল করেন। আমীন।

📘 এপিটাফ 📄 ২০ পয়সায় ঈমান বিক্রি

📄 ২০ পয়সায় ঈমান বিক্রি


এক ইমামের কাহিনী। তাঁকে এক মসজিদে ইমাম হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার বাসা থেকে মসজিদের দূরত্ব ছিল অনেক। তাই তিনি জুব্বা-পাগড়িসহ ইমামের পোশাক পরে প্রতিদিন বাসে আসা-যাওয়া করতেন। তো যথারীতি একদিন তিনি মসজিদে যাচ্ছিলেন। তিনি বাসের ভাড়া দিলেন। তাঁকে ভাঙতি ফেরত দেওয়া হলো। প্রথমে তিনি খেয়াল করেননি, পরে দেখলেন তাঁকে ২০ সেন্টস বেশি দেওয়া হয়েছে। ২০ সেন্টস এমন কিছুই না। আমাদের ২০ পয়সার মতো। কিন্তু ইমামের মাথায় তখন কথোপকথন শুরু হয়ে গেল। এই ২০ সেন্টস কি তিনি ফেরত দেবেন নাকি দেবেন না, দেবেন নাকি দেবেন না। একবার মনে হচ্ছে ফেরত দেওয়া উচিৎ। আরেকবার মনে হচ্ছে, আরে কী দরকার! ২০ সেন্টস জন্য কী আর এমন হবে। আর এরা এমনিতেই কুফফার। মরুক! কী আসে যায়?

এমনভাবে চলতে চলতে গন্তব্য চলে এলো। তিনি নেমে যাচ্ছেন, নামতে নামতে মাথার মধ্যে ওই কথোপকথন চলছে। হঠাৎ তাঁর কী হলো, তিনি ফিরে বাস ড্রাইভারকে বললেন, তুমি আমাকে ভুলে ২০ সেন্টস বেশি দিয়েছ। সে বলল, না। আমি ইচ্ছা করেই দিয়েছি। আপনাকে অনেক দিন ধরে দেখছি। আপনাকে দেখে বুঝতে পারছি আপনি কোনো মুসলিম ইমাম। আমি ঠিক করেছিলাম আপনি যদি এই ২০ সেন্টস ফিরিয়ে দেন, তাহলে আমি ইসলাম গ্রহণ করব। আর যদি ফিরিয়ে না দিতেন তাহলে বুঝতাম আপনারাও অন্য সবার মতোই মিথ্যুক। এ ঘটনা বলে সেই ইমাম কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো কাঁদছেন কেন? সে ইসলাম গ্রহণ করেছে, এজন্য? তিনি বললেন, না। আমি কাঁদছি এ জন্য যে, আমি ২০ সেন্টসের বিনিময়ে আল্লাহর দ্বীনকে প্রায় বিক্রি করে ফেলেছিলাম।

একবার আমি (সাজিদ ইসলাম) এক জায়গায় গিয়েছিলাম, অনেক দূর। এমন এক জায়গা যেখানে আমি কাউকে চিনি না, আমাকেও কেউ চেনে না। রাস্তার ধারে এক দোকানে চা খেতে বসেছি। হঠাৎ দোকানি বলল, হুজুর একটু দেইখেন, আমি একটু আসতেছি। অপরিচিত এক হুজুর ছেলেকে দোকানি তার দোকান দেখার দায়িত্ব দিয়ে চলে গেল। কারণ তার মনের ফিতরাত বলছে, হুজুররা দোকান মেরে চলে যাবে না। ফকির, মিসকিনদের ভিড় লেগে থেকে মসজিদের সামনে। কারণ তাদের অভিজ্ঞতা বলছে, হুজুররাই দান খয়রাত বেশি করে। বিয়ের সময় পাত্র 'নামাজি' এটা আর যাই হোক একটা ভালো ইম্প্রেশন তো তৈরি করেই।

এভাবে ইসলাম, এর লেবাস এবং এর চর্চা-মূল্যবোধ, নৈতিকতার মানদণ্ডে মানুষকে অন্য দশজন থেকে আলাদা করে দেয়। যাদেরকে আল্লাহ এই বিশ্বাস, আকিদার হিদায়াত দান করেছেন, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মূল্যবান আমানতও। আমানত এই যে—আপনি আর দশজনের মতো নয়। আপনি যে চুরি করতে পারেন না, ঘুষ খেতে পারেন না, কোনো অন্যায় করতে পারেন না, আপনি যে বিশ্বস্ত, আপনার মূল্যবোধ, নৈতিকতা যে আর দশজন থেকে আলাদা—এটা আপনাকে দেখেই যেন বোঝা যায়। আল্লাহ আমাদেরকে এই আমানত রক্ষার তাওফিক দান করুন। আমীন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px