📄 বাটারফ্লাই বয়
আজকাল কোনো যুবক যদি আয়নায় তাকিয়ে চেহারায় সামান্য একটা পিম্পল কিংবা কোনো দাগও দেখে—সে আঁতকে উঠে। নিমিষেই তার মন খারাপ হয়ে যায়—হতাশ হয়ে পড়ে। অথচ আমার বন্ধু বাসিতের কাছে এটা হয়তো এমন কিছু যা নিয়ে তার ভাবারও সময় নেই। বাসিত EB (Epidermolysis Bullosa) নামের একটা রোগে ভুগছে, যার ফলে তার শরীরজুড়ে ঘা এবং চামড়ায় ফোস্কা তৈরি হয়। এই ঘা সহজে শুকায়ও না, তাই বাসিতকে এই ঘা সবসময় ব্যান্ডেজ দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়। এই রোগের আরেকটি নাম হলো 'Butterfly Baby' কারণ এই রোগের ফলে সারা শরীরে ঘা হতে থাকে, ফলে পুরো শরীর ব্যান্ডেজ দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়—যা অনেকটা রেশমের গুটির মতো দেখায়।
এই অবস্থায় বেঁচে থাকা কতটা কষ্টের এমন প্রশ্নের জবাবে বাসিত বলেছে, 'এটা কঠিন, কারণ আমার শরীরের বেশিরভাগ অংশই মূলত অচল। ফলে সারাদিন আমাকে বিছানাতেই পড়ে থাকতে হয়। আমি সেভাবে কোনো কাজকর্মও করতে পারি না। মানুষ যেভাবে স্বাভাবিক হাঁটাচলা করে, দৌড়ায়—এসবের কিছুই আমি করতে পারি না। আমি শুধু দেখি আর ভাবি—ইশ! যদি আমিও এভাবে হাঁটাচলা করতে পারতাম!'
বাসিতের মুখে এই কথাগুলো খুব কষ্টের। এই রোগের জন্য যে চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্য দিয়ে বাসিতকে যেতে হয় সেটা আরও কষ্টের। এটা তার জন্য আরেকটি পরীক্ষা। ঘন্টার পর ঘন্টা তাকে কাটাতে হয় ব্যান্ডেজ কাটা, শরীরে মোড়ানো, ঘা এর স্থানে মলম লাগানোর কাজে। এ ছাড়া তার কোনো উপায় নেই। এটাই তার নিত্যদিনের রুটিন। বাসিতের ভাষায়, 'আমাকে এভাবেই প্রতিটা দিন কাটাতে হয়। যদি আমি প্রতিদিন এটা না করি তাহলে ঘা পচে পুঁজ বের হয়, দুর্গন্ধ ছড়ায়। যেদিন আমি গোসল করি সেদিন এই কাজে আমার ছয় ঘণ্টার মতো ব্যয় হয়। আর অন্যান্য দিনে সেটা চার ঘণ্টার মতো লাগে।'
বাসিত এভাবে প্রতিটি দিন কেমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায় সেটা সত্যি আমাদের কারো পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। আমি চিন্তাও করতে পারি না একটা মানুষকে প্রতিদিন এভাবে ঘন্টার পর ঘণ্টা বিছানায় পড়ে থাকতে হয়, তার শরীরে পচন ধরছে, তার হাঁটাচলা বন্ধ হয়ে গেছে! অকল্পনীয়! বাসিতের এই দুর্বিষহ জীবন আমাকে নবি আইয়ুব (আ.) এর কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনিও এমন রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন-যার ফলে শরীরে পচন ধরেছিল। তাঁকে এভাবেই বিছানায় পড়ে থাকতে হতো, সমাজ থেকে তিনি আলাদা হয়ে পড়েছিলেন। এতকিছুর পরও তিনি ধৈর্যের উপর অটল ছিলেন, আশা হারাননি। এমন এক ধৈর্যের পরীক্ষায় আমাদের ভাই বাসিতকেও যেতে হয়, প্রতিদিন, প্রতিটি সময়।
এই অবস্থায় বাসিতের কাছে ইসলামে বিশ্বাসের গুরুত্ব কতটুকু? বাসিত বলেন, 'সত্যি বলতে বিশ্বাস ছাড়া এই জীবনের অর্থই বা কী? কী উদ্দেশ্য হতে পারে এই জীবনের? অন্তরে বিশ্বাস না থাকলে হয়তো কবেই আত্মহত্যা করে বসতাম! এভাবে প্রতিনিয়ত কষ্টের মধ্য দিয়ে যাওয়া, নিজের কষ্ট, আমার জন্য পরিবারের অন্যদের কষ্ট—এসবকিছু ভোগ করার পর যদি আখিরাতে আমার জন্য কিছু না-ই থাকে তাহলে তো সবকিছু অর্থহীন। তাই আখিরাতের উপর বিশ্বাসই আমাকে টিকিয়ে রেখেছে। আমার এই সীমাহীন কষ্ট আর দুর্ভোগকেও অর্থবহ করেছে।'
ইসলাম দুনিয়াতে আমাদের এই দুঃখকষ্ট, বিপদাপদের সত্যিকারের উদ্দেশ্য বুঝতে সাহায্য করে, যা অন্য কোনোভাবে বোঝা সম্ভব নয়। দুনিয়াতে আজকের এই পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ করো-আগামীকাল আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার বুঝে নাও। এই বিশ্বাসের উপর দৃঢ় মনোবলই আমাদেরকে দুনিয়ার এই কষ্ট, পরীক্ষার সময় ধৈর্য ধরতে সাহায্য করে। আল্লাহ বান্দারা এই আশাতেই দাঁতে দাঁত চেপে টিকে থাকে। বাসিতের ভাষায়, 'যখন আমি আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে শুনি, আল্লাহর ওয়াদা সম্পর্কে জানি, তখন আল্লাহর সেই ওয়াদার জন্য এই কষ্ট, সংগ্রাম আমার কাছে সহজ হয়ে যায়। আমার বিশ্বাস আমাকে আশাবাদী করে তোলে। আমার এই বিশ্বাস কোনো কল্পনারাজ্য নয় অবশ্যই, আমি ইয়াকিনের সাথে বিশ্বাস করি। কিন্তু আল্লাহর পথে টিকে থাকার এই সংগ্রামে আপনাকে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে। ইনশাআল্লাহ রোজ হাশরের দিনে আমরা দুনিয়াতে আমাদের এই ধৈর্যের ফল পাব। এই বিশ্বাসটুকুই বলে দেয়— আমার এই জীবনের একটি উদ্দেশ্য আছে।'
জীবনের পথে বাসিতের এই অধ্যবসায় সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ী। সে জানে দুনিয়ার এই জীবনটা তার জন্য পরীক্ষা, আর এই পথে তাকে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে হবে। দুই বছর আগে বাসিতের বড় ভাই মিলাদও এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। এবং আল্লাহর ইচ্ছায় জীবনের এই কঠিন পরীক্ষায় পাশ করে সে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। বাসিতের মতো তার ভাই মিলাদও একই রোগে ভুগছিল (EB), কিন্তু মিলাদের রোগের অবস্থা ছিল আরও খারাপ।
নিজের ভাইকে হারানো কতটা কষ্টের, এমন প্রশ্নের জবাবে বাসিত বলেন, 'এটা কঠিন। এ যেন নিজেরই একটা অংশ হারিয়ে ফেলা। আমি তার কাছ থেকে অনেককিছু শিখেছি। আমার চেয়ে তার অবস্থা আরও খারাপ ছিল। সত্যি বলতে আজকে আমার যা কিছু সহ্য ক্ষমতা আর ধৈর্য শক্তি তা আমার ভাইকে দেখেই হয়েছে। যখন আমি আমাদের দুজনের সীমাহীন কষ্ট আর দুর্দশার কথা মনে করি, আমি অনুভব করি যেন আল্লাহ আমাদের দুজনকে তার সমগ্র সৃষ্টি থেকে আলাদাভাবে বেছে নিয়েছেন। এ যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য বোনাস পয়েন্ট। আমার ভাইয়ের যে ধৈর্য আমি দেখেছি, ইনশাআল্লাহ আমি আশা করি আল্লাহ তাআলা এর বিনিময়ে তাকে জান্নাতে উঁচু মর্যাদা দান করবেন। যখন আমি তার কবরের কাছে যাই আমার মনে হয় তার জন্য আমরা কাঁদব কী, সেই যেন আমাদের জন্য কাঁদছে, কারণ এখনও আমরা দুনিয়ার এই পরীক্ষার শিকলে বাঁধা পড়ে আছি!'
এরকম কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়েও বাসিত দৃঢ়তার সাথে টিকে আছে, ভেঙে পড়েনি। শুধুমাত্র মানসিক দৃঢ়তাই নয়, তার প্রতিদিনের জীবনেও। এই অবস্থাতেও সে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছে, বন্ধুবান্ধব তৈরি করেছে, এমনকি ওমরাহ সম্পন্ন করেছে। তবে তার এই কঠিন অধ্যবসায়ের আরও একটি গোপন রহস্য আছে। বাসিত বলেন, 'দ্বীন অবশ্যই আমার এই জীবনের সবচেয়ে মজবুত ভিত্তি, কিন্তু আমার পিতামাতার ভূমিকাও এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আলহামদুলিল্লাহ আমার পিতামাতার জন্য, তাদের জন্য আমি শুধু এতটুকু বলতে পারি। কারণ তারাই আমার জীবনটাকে সহজ করেছে। তারা আছে বলেই আমাকে কোনোকিছু নিয়ে চিন্তিত হতে হয় না। আমাকে শুধু আমার নিজেকে নিয়ে, আমার এই রোগ আর এর আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়েই চিন্তা করতে হয়, এর বাইরে অন্য কোনোকিছু নিয়ে, এমনকি আমার পিতামাতাকে নিয়েও আমাকে ভাবতে হয় না। তারা কখনও অভিযোগ করেন না। যেন সবকিছু খুবই স্বাভাবিক, তারা সবকিছুকে স্বাভাবিক বানিয়ে নিয়েছে। এজন্য আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।'
যদি তুমি তাদেরকে কিছু দিতে চাও, তাহলে কী দেবে? বাসিত বলেন, 'আমি সবসময় আমার পিতামাতার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করি। আমার কারণে যদি আল্লাহ তাদেরকে জান্নাত দেন, যদি জান্নাতে আমরা সবাই একত্রিত হতে পারি, এটাই হবে সবচেয়ে বড় পাওয়া, এটাই আমার পিতামাতার জন্য সবচেয়ে বড় গিফট। আমি জানি এই দুনিয়ার জীবনটা একটি পরীক্ষা। আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ, কারণ তিনি আমাকে এই সত্যটুকু বোঝার ক্ষমতা দিয়েছেন। আর সত্যিকারের জীবন তো শুরু হবে তখনই, যখন আমি আমার পরিবারের সাথে জান্নাতে মিলিত হবো।'
বাসিতের এই জীবনের গল্প আমাদের আধুনিক, যান্ত্রিক জীবনে সত্যিকারের ধৈর্যের উদাহরণ, যেখান থেকে আমাদের অনেককিছু শেখার আছে। আমরা আল্লাহর কাছে দুআ করি, আল্লাহ যেন বাসিতকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত করেন, তাকে এমন দলে শামিল করে যাদেরকে আল্লাহ ভালোবাসেন, এবং তাকে রহমতের চাদরে ঢেকে রাখেন আমৃত্যু। আর দুনিয়ার ওপারে যে জীবনটা আছে, সেই আখিরাতে আল্লাহ যেন তাকে তার পরিবারের সাথে জান্নাতে একত্রিত করেন। আমীন।
'বলুন, হে আমার বিশ্বাসী বান্দাগণ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। যারা এ দুনিয়াতে সৎকাজ করে, তাদের জন্যে রয়েছে পুণ্য। আল্লাহর পৃথিবী প্রশস্ত। যারা সবরকারী, তারাই তাদের পুরস্কার পায় অগণিত।" (সূরাহ আয যুমার ৩৯: ১০)
📄 MAN VS MALE
ছেলে বা পুরুষ পরিচয় বোঝাতে সাধারণত আমরা 'Man বা 'Male' শব্দ ব্যবহার করি। কিন্তু প্রত্যেক 'Man' একজন 'Male' হলেও, প্রত্যেক 'Male' ই 'Man' না! কাউকে যদি প্রশ্ন করেন, ভাই আপনি 'Man' নাকি 'Male'? মুহূর্তেই সে হয়তো রেগে যেতে পারে। কারণ সে ভাববে এই প্রশ্ন করে আপনি তার 'পৌরুষ' নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন!
কিন্তু 'Male' হওয়াটা কাউকে স্পেশাল বানায় না। কারণ আপনি 'Male' হিসেবে জন্মেছেনই। তার উপর আজকের যুগে তো কেউ চাইলে সার্জারি করে নিজেকে 'Male' বানিয়ে নিতে পারে। এমনকি 'Male' হওয়ার জন্য আজকে আপনার শারীরিকভাবে 'Male' হওয়ারও দরকার নেই। আপনি যদি মনে করেন আপনি 'Male', পশ্চিমের অনেক দেশে আপনাকে 'Male' হিসেবে সুরক্ষা দেবে, এমন আইনও আছে। সেখানকার তথাকথিত 'ফ্রিডম' এর কারণে আপনি নিজের পরিচয় নিজেই নির্ধারণ করতে পারবেন, আপনার শারীরিক গঠন যাই হোক না কেন! শুধু চিন্তা করবেন, অনুভব করবেন যে, আপনি 'Male', ব্যস!
তাই 'Male' হওয়ার মাঝে স্পেশাল কিছু নেই। কিন্তু 'Man' হওয়া, এটা সার্জারির মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর কোনো হরমুন নেই। 'Man' হওয়াটা এমন কিছু নয় যা আপনি অন্তরে অনুভব করলেন, কিংবা মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাবি করে বসলেন! কিংবা হাত-গায়ে ট্যাটু লাগিয়ে ঘুরলেই 'Man' হওয়া যায় না!
কুরআনে খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে সম্বোধনের ক্ষেত্রে আল্লাহ বলেছেন— রিজাল—Man! আর এমনিতে সাধারণ সম্বোধনের সময় যে শব্দ ব্যবহার করেছেন সেটা হলো—যাকার—Male! আল্লাহ কুরআনেই Male আর Man এর মধ্যে পার্থক্য করে দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো আমরা আল্লাহর সামনে কী হিসেবে দাঁড়াতে চাই—রিজাল নাকি যাকার? তার আগে প্রশ্ন হলো কিসে নির্ধারণ করবে রিজাল কে? রিজাল হওয়ার মানদণ্ড কী?
দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে যেকোনো কিছুর নির্ধারক হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সোশ্যাল মিডিয়া, মুভি, মিউজিক, বিনোদন দুনিয়া আমাদের সমাজের সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি ইসলাম চর্চা করেন এমন মানুষও জাহিলিয়াতের বিষয়গুলো ধারণ করেন এবং সেগুলোকে ইসলামের সাথে জুড়ে দিতে চান।
এই সমাজে কেউ যদি একটু বডি বানাতে পারে, রাস্তাঘাটে মারামারি করতে পারে, তাদেরকে Man হিসেবে ধরা হয়। যে কারণে MMA, বক্সিং, রেসলিং এসব আমাদের কাছে চরম জনপ্রিয়। তাই আজকের সমাজে আপনি যদি মারামারি, কুস্তিগিরি এসব করতে না জানেন, তাহলে আপনাকে Man হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। মজার ব্যাপার হলো এই ক্রাইটেরিয়া কিন্তু আজকের নয়। এমনকি সাহাবিদের সময়েও মানদণ্ডটা এমন ছিল, যতক্ষণ পর্যন্ত না রাসূল (সা.) সেই ভুল ভেঙে দিয়েছেন।
একদিন কিছু সাহাবি কুস্তি খেলছিলেন। সেসময় রাসূল (সা.) সেখানে উপস্থিত হলেন। রাসূল (সা.) কিন্তু নিজের চোখে দেখছেন সাহাবিরা কী করছে। কিন্তু তিনি সাহাবিদের একটি শিক্ষা দিতে চাইলেন। তাই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, -তোমরা কী করছ? সাহাবিরা জবাব দিলেন-ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কুস্তি লড়ছি। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, -তোমরা কুস্তি লড়ছ কেন? সাহাবিরা উত্তর দিলেন-ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কুস্তি লড়ছি এটা দেখার জন্য যে, আমাদের মধ্যে শক্তিশালী কে? আজ ১৪০০ বছর পরেও এখনো আমাদের সমাজেও এটাই ক্রাইটেরিয়া।
এমন না যে, আল্লাহর রাসূল (সা.) জানতেন না সাহাবিরা কেন কুস্তি লড়ছে। কিন্তু তিনি ছিলেন মানুষের অন্তরের চিকিৎসক। তিনি সত্যিকারের পুরুষ-রিজাল নির্ধারণের এই মানদণ্ডটা ভেঙে দিতে চাইলেন। এর পেছনে অন্তরের যে গভীর ব্যাধি লুকিয়ে আছে, সেটা আরোগ্য করতে চাইলেন। তাই তিনি বললেন, -প্রকৃত বীর সে নয়, যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়। বরং সেই আসল বীর, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। রাসূল (সা.) বোঝাতে চাইলেন, গায়ের জোরে তো কেউ চাইলে যে কাউকে হারাতে পারে। কিন্তু এই পদ্ধতিতে আমরা আমাদের মধ্যে কে শক্তিশালী আর কে শক্তিশালী না-এটা নির্ধারণ করি না।
আমাদের সমাজে 'রিজাল' নির্ধারণের আরেকটি ভুল পদ্ধতি দুর্ভাগ্যজনকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সিক্স প্যাক, বডি বিল্ডার, স্টেরয়েড খেয়ে যারা বডি বানায়, আমরা মনে করছি তারাই সত্যিকারের পুরুষ। কারণ 'small man syndrome' নামের ব্যাধি আমাদের মধ্যে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এটা হলো এমন এক ব্যাধি যেখানে গায়ে-গরতে যারা একটু ছোট তারা মনে করে বাকিরা তাদেরকে খুব একটা সিরিয়াসলি নিচ্ছে না। তাই তারা এমন সব কাজ করে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করে, যা তাদের চরিত্র বা ব্যক্তিত্বের সাথে যায় না। আজ যারা কৃত্রিমভাবে স্টেরয়েড দিয়ে নিজেদের বডি বিল্ডার বানাতে প্রতিযোগিতা করছে, তাদের প্রায় সবাই-ই এই small man syndrome এ আক্রান্ত। এরা প্রতিনিয়ত মানসিক হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে।
অনেক ভাইয়েরা অসাধারণ বেঞ্চ প্রেস করতে পারে। অনেকে তো রেকর্ডও করে ফেলে। সুযোগ পেলেই তারা কয়েকজন মিলে প্রতিযোগিতা শুরু করে দেয়, কে কয়টা দিতে পারে। মোবাইল এপে এসবের হিসেব রাখে, ফেসবুকে, ইন্সটাগ্রামে ভিডিও শেয়ার দেয়! কিন্তু সেই একই ভাইয়েরা ফজরের সময় সামান্য কম্বলটা গায়ের উপর থেকে সরাতে পারে না।
একবার রাসূল (সা.) দেখলেন সাহাবিরা একটি খেজুর গাছের চারপাশে জড়ো হয়েছেন। রাসূল (সা.) সেই জমায়েতে গিয়ে দেখলেন, গাছের উপর আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.), আর নীচে সাহাবিরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে। রাসূল (সা.) বললেন, -তোমরা কী নিয়ে হাসাহাসি করছ? তোমরা কী আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের জীর্ণ-শীর্ণ পা জোড়া দেখে হাসছ? -হ্যাঁ ইয়া রাসূলাল্লাহ! দেখুন তার পা দুটো কেমন জীর্ণশীর্ণ। জবাবে রাসূল (সা.) বললেন, —আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের এই হাড্ডিসার পা জোড়া কিয়ামতের দিন ওজনে উহুদ পাহাড়ের চেয়েও ভারী হবে।
তাই-রিজাল-সতিকারের পুরুষ হওয়ার মানদণ্ড গায়ের জোর নয়। প্রোটিন শেক, স্টেরয়েড খেয়ে সিক্স প্যাক, মাসল বানিয়ে 'রিজাল' হওয়া যায় না। অন্যদের দিকে দুটা তর্জন গর্জন করতে পারলে সেটার ভিত্তিতে 'রিজাল' নির্ধারিত হয় না। 'রিজাল' এর মানদণ্ড হলো-তাকওয়া, ঈমান।
সমাজে 'পুরুষ' নির্ধারণের আরেকটি মানদণ্ড এখন বেশ জনপ্রিয়-টাকা। টাকার গন্ধে আমরা আচ্ছন্দ থাকি। কেউ যদি বলে তার টাকার প্রতি কোনোই আকর্ষণ নেই, টাকার কোনো জরুরত নেই-তাহলে সেটা বিশ্বাস করা কষ্ট। কেননা, আমাদের রব, মহান আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত কুরআনে মানুষের স্বভাব বর্ণনা করেছেন এভাবে, “এবং তোমরা ধন-সম্পদকে প্রাণভরে ভালোবাস।” (সূরাহ ফাজর, ৮৯:২০)
যেখানে স্বয়ং আল্লাহ বলছেন মানুষের স্বভাব হচ্ছে সে ধনসম্পদ ভালোবাসে, সেখানে কীভাবে আমরা সেটা অস্বীকার করি! আজকে যদি আপনার টাকা থাকে তাহলে "শায়খ” ও বনে যেতে পারেন। টাকার জোরে মসজিদ কমিটির চেয়ারম্যান, ওয়াজ মাহফিলের বিশেষ বক্তা, প্রধান অতিথি, সবখানে আপনার শুধু একটা যোগ্যতা থাকা চাই-টাকা! আর আমরাও তাকেই দাম দিই, সেই আমাদের কাছে সত্যিকারের 'পুরুষ'-রিজাল!
কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয় আমরা এই যে রিজাল বা পুরুষ নির্ধারণের দুনিয়াবি মানদণ্ডগুলো সেট করেছি, সেই হিসেবে কি আমাদের নবিজি (সা.) রিজাল ছিলেন? সাহাবিরা? তাবিয়ি, তাবে তাবিয়িন? আমি জানি এই প্রশ্ন আমাদেরকে বিব্রত করে দেবে। থমকে যাব আমরা। কিন্তু এটাই আমাদের বাস্তবতা। নববি আদর্শের সে পথ থেকে আমরা এভাবেই, এততাই বিচ্যুত হয়ে গেছি।
বিয়ের পাত্র নির্বাচনের সময় আমাদের অনেক বোন ফ্যান্টাসিতে থাকেন। নবিজি (সা.) এর মতো, সাহাবিদের মতো কাউকে তারা স্বামী হিসেবে চান। কিন্তু সত্যি সত্যি যদি সেই সাহাবিদের মতো জীর্ণ-শীর্ণ জামা, ধুলোমাখা পা, সহায় সম্বলহীন কেউ এসে সামনে দাঁড়ায়, তখনও কি আমরা এরকম কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ করব? 'আদর্শ স্বামী' নির্বাচনের মানদণ্ড কি তখনো একই থাকবে? আমার মেয়ের, বোনের হাত কি এমন কারো হাতে তুলে দেব? নাকি দুনিয়ার মানদণ্ডে 'পুরুষ' হওয়ার যে ক্রাইটেরিয়া আমরা বানিয়ে নিয়েছি, সেগুলোই বিবেচ্য হবে—বডি বিল্ডার-টাকা?
ধনসম্পদে বড় হতে পারলেই সে পুরুষ, টাকা-পয়সা থাকা মানেই সফলতা—এই ধারণা তৈরি হয় অন্তরের রোগ থেকে। উরওয়াহ (রহ.) থেকে বর্ণিত, আইশা (রা.) বলেন, “মাসের পর মাস চলে যেত, কিন্তু রাসূল (সা.) এর কোনো ঘরেই আগুন জ্বলত না। উরওয়াহ বলেন, 'আমি আমার খালা আইশা (রা.) কে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে আপনারা কী খেয়ে দিন পার করতেন?' আইশা (রা.) বলেন, 'দুই কালো জিনিস। এক—পানি। দুই—খেজুর”
অথচ এই সময় রাসূলের ঘরে একাধিক স্ত্রী ছিলেন। সত্যি সত্যি এমন কাউকে আমাদের বোনেরা বিয়ে করতে চাইবেন আজ? সত্যিই? আমাদের এই ফ্যান্টাসির জগৎ থেকে বের হওয়া উচিত। ফেসবুকে বসে নবিজি (সা.) আর সাহাবিদের মতো 'আদর্শ স্বামী'র অপেক্ষায় থাকার বুলি আওড়ানো সহজ, কিন্তু আসলেই কয়জন এই একবিংশ শতাব্দীতে তাদের মতো কারো স্ত্রী হয়ে জীবন যাপন করার জন্য তৈরি? যখন এই হাদিসগুলো শুনি, আমাদের যে নিশ্চিন্ত, নিরাপদ, ভাবলেশহীন, বিলাসিতাময় জীবন যাপন করছি, তার তুলনায় বিশ্বাস করা কষ্টকর হয়ে যায়। আমরা কল্পনাও করতে পারি না। বস্তুবাদী দর্শনের এই একবিংশ শতাব্দীর জীবনের তুলনায় নবিজির সময়ের সেই জীবনগুলো যেন রুপকথার মতো! কিন্তু বাস্তবতা এমনই ছিল। এই দ্বীনের সত্যিকারের 'পুরুষ'দের জীবন ছিল এমনই সংগ্রামের। আর আজ আমরা দ্বীনের এই অংশটুকুর আলোচনা এড়িয়ে যেতে চাই। আমাদের প্রিয় নবিজি (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয় ইসলাম নিঃসঙ্গ ও অপরিচিত অবস্থায় শুরু হয়েছিল, আবার অচিরেই তা নিঃসঙ্গ ও অপিরিচিত অবস্থায় ফিরে যাবে। সুতরাং গুরাবাদের (নিঃসঙ্গ ও অপিরিচিত) জন্য সুসংবাদ।' যখন রাসূল (সা.) কে জিজ্ঞেস করা হলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই গুরাবা কারা? জবাবে তিনি বললেন, “তারা কিছু ভালো মানুষ। খারাপ মানুষের বৃহৎ সংখ্যা সাপেক্ষে তাদের সংখ্যা হবে খুবই অল্প। তাদের অনুসারীর চেয়ে বিরোধিতাকারীর সংখ্যা হবে বেশি”
সুতরাং এই দ্বীন আবার সেই 'পুরুষ'দের কাছে ফিরে যাবে। বডিবিল্ডার, পয়সাওয়ালা, যাদের আমরা সমাজের 'পুরুষ' বলে স্বীকৃতি দিই, তাদের কাছে নয়। আজকে আমাদের পোশাক কাফিরদের মতো, আমাদের খাবার কাফিরদের মতো, আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা, আমাদের সংস্কৃতি, চালচলন, বেশভূষা সবকিছুতে কাফিরদের অনুসরণ! আমাদের ঘর, আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, স্বপ্ন সবকিছু দুনিয়াকে ঘিরে-আপাদমস্তক কাফিরদের মতো! অথচ আমরা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছি, আলহামদুলিল্লাহ, আমরা মুসলিম! আলহামদুলিল্লাহ, আমরা ৯০% মুসলিমের দেশ! শুক্রবারে জুম'আ পড়ে সেলফি আপলোড দিচ্ছি-জুমা মুবারক! এতটুকুই, বাকি সবকিছু কাফিরদের হাতে তুলে দিয়ে আমাদের দ্বীন এতটুকুতেই আটকে আছে!
তাই আজকে যখন আমরা নবিজির ঘরে দিনের পর দিন খাবার রান্না না হওয়ার হাদিস শুনি, সাহাবিদের কুরবানি আর আত্মত্যাগের 'অবিশ্বাস্য' সব বর্ণনা শুনি, কিছুটা আমতা আমতা করে বলতে চাই, 'দেখুন ভাই, হ্যাঁ এসব ঘটেছে, কিন্তু এসব তো আর উদাহরণ নয়, এসব তো সুন্নাহ নয়! আমাদেরকেও এরকম করতে হবে এমন তো কথা নেই। এখন যুগ পাল্টেছে, আমাদেরকে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে।' এভাবে আমরা সবাই নিজেদের নিফাক থেকে পালিয়ে বেড়াই। কেউ নিজেদের অন্তরের রোগ স্বীকার করতে প্রস্তুত নই। দ্বীন থেকে নিজেদের পছন্দমতো 'সুগার কোট' করে আমরা নিজেদের জন্য সান্ত্বনা তৈরি করি। আমরা যে জীবনটা যাপন করছি তার জন্য জাস্টিফিকেশন আমাদের সবসময় তৈরি থাকে। কিন্তু আপনাকে কেউ পানি আর খেজুর খেয়ে জীবন যাপন করতে বলছে না। শুধু দ্বীন থেকে দুনিয়াকে একটু আলাদা রাখুন। যে জীবনটা যাপন করছেন সেটাই বা কতটুকু 'ইসলামিক', কতটুকু দ্বীন সেখানে চর্চা করা হয় সেটা নিয়ে একবার ভাবুন। হালাল হারামটুকু অন্তত মানুন। বিলাসিতাটুকু অন্তত ছাড়ুন।
রাসূল (সা.) যখন মারা যান তখন আইশা (রা.) কে জিজ্ঞেস করলেন, -আমাদের কী পরিমাণ টাকা পয়সা আছে? আইশা (রা.) জবাব দিলেন -সাতটি স্বর্ণমুদ্রা। রাসূল (সা.) বললেন, -এগুলো সাদাকা করে দাও। এরপর নবিজি (সা.) বেহুঁশ হয়ে গেলেন। যখন জ্ঞান ফিরল, তিনি আবার আইশা (রা.) কে জিজ্ঞেস করলেন, -ইয়া আইশা! সাতটি মুদ্রার কী করলে? আইশা জবাব দিলেন, -ইয়া রাসূলাল্লাহ! এখনো আমার কাছেই আছে। রাসূল (সা.) বললেন, –তুমি কি চাও আমি আল্লাহর কাছে এই অবস্থায় উপস্থিত হই, যখন দুনিয়ার কোনো কিছু এখনো আমার মালিকানায় রয়ে গেছে? আমাদের চারপাশে অধিকাংশ মানুষ এমন, যারা চলার মতো যথেষ্ট সচ্ছল কিন্তু তারপরও তারা রাতদিন খেটে মরছে। এরা সারাদিন ব্যস্ত। তারা আবার হাদিস শুনাবে, নবিজি পরিবারের জন্য সম্পদ রেখে যেতে বলেছেন। সহিহ! কিন্তু কতটুকু? কতক্ষণ পর্যন্ত সম্পদ জমা করতে থাকবেন? মৃত্যু পর্যন্ত? দুনিয়াতে শুধু এজন্যই আমরা বেঁচে আছি?
আল্লাহর নবি (সা.)। যিনি দুআ করলে আল্লাহ আসমান থেকে স্বর্ণের বৃষ্টি বর্ষণ করিয়ে দিতেন, যিনি দুআ করলে আসমান জমিনের সমস্ত সম্পদ আল্লাহ তাঁর অধীনে দিয়ে দিতেন। তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করেছেন, “হে আল্লাহ্! আপনি মুহাম্মাদের পরিবারের জন্য কেবল জীবন ধারণোপযোগী (পরিমাণ) রিযিকের ব্যবস্থা করুন। (ইবনু মাজাহ- ৪১৩৯, সহিহ) কেবল বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু দরকার, কোনোমতে চলতে পারার মতো, কোনোমতে দুনিয়াটা পার হওয়ার মতো। সুবহানআল্লাহ। আজকে কোনো মসজিদে ইমাম যদি এই দুআ করে, না জানি তার কী হয়! মসজিদ কমিটির তোপে পড়ে আবার চাকরিটা না খুইয়ে দিতে হয়। অথচ এটাই ছিল পরিবারের জন্য আমাদের নবিজি (সা.) এর দুআ। এভাবে দুনিয়া আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গেছে। এখানে সবকিছু এখন পয়সা দিয়ে নির্ধারিত হয়।
একদিন জুম'আর খুতবায় নবিজি (সা.) বললেন, আল্লাহ তাঁর এক বান্দাকে এই দুনিয়ার রাজত্ব আর তাঁর সাথে সাক্ষাতের মাঝে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার অপশন দিয়েছেন। আল্লাহর সেই বান্দা আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকে বেছে নিয়েছে। নবিজির কাছে অপশন দেওয়া হয়েছিল, হয় দুনিয়ায় বাদশা এবং নবি হয়ে থাকার, অথবা গোলাম এবং নবি হয়ে থাকার। নবিজি নিজেই গোলাম এবং নবি হওয়াকে বেছে নিয়েছেন। তাই দুনিয়াতে নবিজি (সা.) এর যে দুঃখকষ্ট, কঠিন জীবনের ব্যাপারে জেনে আমরা অবাক হই, ব্যাপারটা এমন না যে, তিনি বাধ্য হয়ে এমন জীবন যাপন করেছেন। এমন না যে, তাঁর কাছে আর কোনো অপশন ছিল না। নবিজি (সা.) এর কাছে সমস্ত সুযোগ ছিল আয়েশী করার, সুখে থাকার, প্রাচুর্যে থাকার। কিন্তু তিনি দুনিয়ার মূল্য জানতেন। তাই তিনি এই দুনিয়ার পেছনে নিজেকে বিকিয়ে দেননি।
সত্যিকারের পুরুষ হলো যার চিন্তা বাস্তবিক এবং যে মাটির সাথে জুড়ে থাকে। আর বোঝে-এই দুনিয়ায় আপনি সবকিছু পাবেন না। সবকিছু পাওয়ার জন্য, সবকিছু ভোগ করার জন্য এই দুনিয়া না, আমরা সেজন্য এখানে আসিওনি। অথচ আমাদের অবস্থা হয়েছে সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা দুনিয়াতেই সবকিছু চাই, এখানেই সবকিছু ভোগ করতে চাই। সত্যিকারের রিজাল-পুরুষ, সে বোঝে জান্নাতের একটি মূল্য আছে, এবং সেই মূল্য ঢুকিয়ে তবেই জান্নাতে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব। আর সেই মূল্য হলো-সেই স্যাকরিফাইস হলো-ইসলামকে 'লাইফস্টাইল' হিসেবে নেওয়া। ইসলামের সাথে বাঁচা, ইসলামকে সাথে নিয়েই মৃত্যুবরণ করা। সত্যিকারের 'পুরুষ' মানে হলো এই বোধটুকু থাকা যে, আমার স্ত্রী, আমার সন্তান, আমার পরিবার আছে—এই দায়িত্ব আমাকে নিতে হবে! আমি যখন ওয়াদা করি, লেনদেন করি, আমাকে ইসলামের প্রিন্সিপলের উপর থাকতে হবে, আমাকে স্যাকরিফাইস করতে হবে, আমাকে দায়িত্বের মূল্য ঢুকাতে হবে-এটাই রিজাল-সত্যিকারের পুরুষ! যা আজ আমাদের মধ্যে থেকে হারিয়ে গেছে। আমাদের কাছে পুরুষ হওয়ার মানদণ্ড আজ অন্যকিছু। আমাদদের চারপাশে যারা পুরুষ সেজে ঘুরে বেড়াছে, সত্যিকারের পুরুষত্বের মানদন্ডে এরা সবাই আসলে এখনো 'বালক'। যাদের পুরুষত্ব সিক্স প্যাক বডি, টাকার কাছে আটকে আছে। আমরা সর্বত্র নিজেদের পুরুষ হিসেবে জাহির করতে চাই, কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) ‘পুরুষ’ হওয়ার যেসব মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন, তার ধারেকাছেও আমরা নেই।
পুরুষ মানুষ মাত্রই নারীদের প্রতি আকর্ষণ রয়েছে। কোনো মেয়ে পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে হৃৎপিণ্ডের ধুপধুপানি শুরু হয়ে যায়। যদিও আমরা নারী সঙ্গ পেতে চাই—যেটা পুরুষের স্বাভাবিক ফিতরাত—কিন্তু আমরা এমন একটা সংস্কৃতি গড়ে তুলেছি যেখানে আমরা কেউ বিয়ে করতে রাজি নই। আমরা গার্লফ্রেন্ড বানাব, হাঁটে-মাঠে-ঘাটে-লিঠনের ফ্ল্যাটে ঘুরে বেড়াব, সব ঠিক আছে! কিন্তু বিয়ে? নো ওয়ে! বিয়ে, সংসার, স্ত্রীর প্রতি দায়বদ্ধতা, স্যাকরিফাইস, জীবনের চ্যালেঞ্জ এবং নানান দুঃখকষ্টের এই যে পথ—সেটা কেবল একজন রিজাল—সত্যিকারের পুরুষই পাড়ি দিতে পারে। এরাই হলো ‘real man’। আর এ পথ যারা পাড়ি দিতে চায় না, যারা দায়িত্ব নিতে চায় না, এরা হলো male! সমাজে আজ চারদিকে শুধু ‘Male’, যার কারণে সহজলভ্য হয়েছে যিনা। কেউ আজ দায়িত্ব নিতে চায় না। তরুণরা লুকিয়ে বিয়ে করে, সবার অগোচরে, অনেক সময় ছেলে-মেয়ে উভয়ের পরিবারের অগোচরে। আবার সবার অগোচরে ছেড়েও দেয়। এরা দ্বীন নিয়ে তামাশা করে। নিজের পরিবারের কাছে, সমাজের কাছে বিয়ের কথা বলার মতো, নিজের বউকে স্বীকৃতি দিয়ে ঘরে তোলার মতো ‘পৌরুষ’ এদের নেই।
যিনা করতে পারার ক্ষমতা কাউকে ‘পুরুষ’ বানায় না। একটার পর একটা গার্লফ্রেন্ড পাল্টানো কারো পুরুষত্বের ক্রাইটেরিয়া নয়। সত্যিকারের পুরুষ হলো যারা দায়িত্ব নিতে জানে। সত্যিকারের পুরুষ যিনার পথ বন্ধ করে। সত্যিকারের পুরুষ বিয়ের পথ বেছে নেয়। সত্যিকারের পুরুষ জানে এই বিয়ে কোনো ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড নয়, এটা চ্যালেঞ্জ, স্যাকরিফাইস—যা সবাই পারে না। এর জন্য শুধু ‘Male’ হলে হয় না, ‘Man’ হতে হয়। সবাই বাচ্চাকাচ্চা ভালোবাসে, আদর করে, কিন্তু ‘বাবা’ হওয়ার দায়িত্ব সবাই নিতে চায় না। কারণ এখানে চ্যালেঞ্জ আছে, স্যাকরিফাইস আছে, দায়িত্ববোধ আছে। কেবল সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা দিয়ে কেউ ‘পুরুষ’ হতে পারে না, বরং সেই সন্তানকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে বড় করার চ্যালেঞ্জ যে নিতে পারে, সত্যিকারের ‘পিতা’ হওয়ার স্যাকরিফাইস যে করতে পারে, সেই রিজাল—পুরুষ—The real man!
আমরা সবাই টাকা পয়সার পাগল। আল্লাহ নিজেই কুরআনে বলেছেন, মানুষ টাকা-পয়সা, অর্থ-সম্পদ ভালোবাসে। কিন্তু সবাই সেটা অর্জনের জন্য পরিশ্রম করতে চায় না। সবাই ঘাম ঝরাতে প্রস্তুত নয়। আর তাই হারাম ইনকাম আজ আমাদের কাছে তেমন কোনো সমস্যা না। শর্টকাটে, হারাম উপায়ে, মানুষের হক্ক মেরে, হারাম জিনিস বেচে, কোনোমতে টাকা কামানটাই আমাদের লক্ষ্য। কেননা, সমাজে 'পুরুষ' হওয়ার মানদণ্ড তো আমরা নির্ধারণ করেচ দিয়েছি-টাকা! কিন্তু যারা সত্যিকারের পুরুষ, তারা এই পথে হাঁটে না।
প্রত্যেক নবি তাঁদের জীবদ্দশায় কোনো না কোনো সময় রাখাল ছিলেন। আমাদের নবিজি (সা.) মালামাল এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করেছেন। সাহাবিরা সবাই এরকম কাজ করে জীবিকা অর্জন করেছেন, আজকে আমাদের সমাজে যে কাজগুলোকে নীচু দৃষ্টিতে দেখা হয়, মানুষ নাক সিটকায়। ইসলামের প্রথম খলিফা ছিলেন আবু বকর (রা.)। একদিন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এবং আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রা.) মদিনার বাজারে গিয়ে দেখেন, খলিফাতুল মুসলিমীন আবু বকর (রা.) বাজারে কাপড় বিক্রি করছে। তারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, -ইয়া আমিরুল মুমিনীন! এ আপনি কী করছেন? আপনি সারা মুসলিম জাহানের খলিফা, আর আপনি কিনা এখানে বসে বেচাবিক্রি করছেন? জবাবে আবু বকর (রা.) বললেন, -কারণ আমার পরিবার আছে। আর আমাকেই তাঁদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে হয়।
এরাই ছিলেন সত্যিকারের 'পুরুষ'। আর আজকে তো কেউ মসনদে বসতে পারা মানে কাড়ি কাড়ি টাকা চেটেপুটে খাওয়া, আয়েষী করে জনগণের টাকা উড়ানো। আজকে আপনি যে কারো কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন, আপনি কি আল্লাহকে ভালোবাসেন? ইসলামকে ভালোবাসেন? আমরা সবাই আল্লাহকে ভালোবাসি, কিন্তু দ্বীনের উপর কেউ চলতে চাই না, ইসলাম মেনে চলাটা আমাদের পছন্দ না, যদিও আমরা সবাই জানি এটাই সত্য দ্বীন। আমরা সবাই রাসূল (সা.) কে ভালোবাসি কিংবা ভালোবাসার দাবি করি। রাসূলকে নিয়ে নাশিদ শুনে আবেগে আপ্লুত হই, মিলাদে টাকা উড়াই। কিন্তু কেউ রাসূল (সা.) সুন্নাহ মেনে জীবন যাপন করতে রাজি নই। নীচে বসে খাওয়া, দাড়ি রাখা, সাদাসিধে জীবনযাপন করা? না, না, না, আমাকে দিয়ে এসব হবে না! আমরা সবাই জান্নাতে যেতে চাই, কিন্তু সেজন্য তো দুনিয়া ছাড়তে হবে, মরতে হবে—এটা কেউ চাই না। এগুলো সত্যিকারের পুরুষের বৈশিষ্ট্য নয়। সত্যিকারের পুরুষ ফ্যান্টাসি নয়, বাস্তবতায় বিশ্বাস করে। তারা যেটা চায়, সেটার জন্য সংগ্রাম করে, সেটা নিয়ে বাঁচে, দায়িত্ব নেয়, স্যাকরিফাইস করে।
টিকাঃ
২. মুসলিম: ৪৫/৩০, হাদিস নং ২৬০৯, আহমাদ ৭২২৩
৩. সালাফদের ক্ষুধা, ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়া (রহ.), পৃ: ২৮, সীরাত পাবলিকেশন
📄 ঈসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের কথা
ঈসা (আ.) একবার তাঁর সঙ্গীদের সাথে পথ চলছিলেন। এমন সময় তাঁদের খিদে পেয়ে গেল। তাঁরা এক জায়গায় বসে টাকাপয়সা বের করে একজনকে দায়িত্ব দিলেন—যাও, শহরে গিয়ে খাবার কিনে নিয়ে এসো। সেই ব্যক্তি শহরে খাবার কিনতে গিয়ে টের পেল যে, সর্বসাকুল্যে যত টাকা আছে, তা দিয়ে কেবল তিনটি রুটি ক্রয় করা যাবে। সে ভাবল, এই খাবার যদি আমি ওখানে নিয়ে যাই, সবাই-ই তো ক্ষুধার্ত, আমি তো তেমন কিছু খেতেই পাব না। সে সেখানেই একটি রুটি খেয়ে ফেলল, আর বাকি দুটি নিয়ে ফিরে এলো। ঈসা (আ.) রুটি দেখে বললেন, তৃতীয় রুটিটা কোথায়? লোকটি অবাক হয়ে ভাবল, কী রে! আমি খাওয়ার সময় তো একাই ছিলাম। সে জবাব দিল, আমি তো দুটিই কিনেছি। ঈসা (আ.) আর তর্ক করলেন না।
তারপর আবার তারা পথ চলতে লাগলেন। আবার খাওয়ার সময় হলো। সঙ্গীরা একটি হরিণ শিকার করতে সমর্থ হলেন। সেটাকে রান্না করলেন, খাওয়াদাওয়া শেষ করলেন। খাওয়া শেষে হাড্ডিগুড্ডি ছাড়া কিছু বাকি থাকল না। ঈসা (আ.) সেই লোকটিকে ডাকলেন। আল্লাহর ইচ্ছায় মুজিযা সংঘটিত হয়ে হরিণটি জীবিত হয়ে গেল। একটি হাড্ডিসার লাশ থেকে একেবারে জলজ্যান্ত প্রাণী। ঈসা (আ.) বললেন, সেই সত্তার কসম যিনি এতে প্রাণ দিলেন, সত্যি করে বলো তৃতীয় রুটিটি কে খেয়েছিল? ওই লোকটি আগে থেকেই চাপে ছিল। সে এবারও বলল, সত্যিই আমি দুটি রুটিই ক্রয় করেছিলাম।
আমরা জীবনে মাঝেমাঝে এমন সব ভুল করি যা প্রথমবারে স্বীকার করে নিলে তেমন কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু আমরা মিথ্যা বলে সেটাকে ঢাকতে চাই, আরো দশটা মিথ্যা বলতে বলতে পরিস্থিতি একেবারে জটিল করে ফেলি। এই ব্যক্তিটি বলে দিতে পারত, দেখেন, আমার খুব খিদে পেয়েছিল। পরে কতটুকু খানা জোটে বা না জোটে ঠিক নেই। তাই আমি ওখানেই একটা খেয়ে ফেলেছি। কিন্তু তা না করে এখন সে কতো গভীর বিপদে পড়ে যাচ্ছে দেখুন। চোখের সামনে আল্লাহর ক্ষমতা দেখেও সে স্বীকার করছে না।
যা-ই হোক, ঈসা (আ.) কথা না বাড়িয়ে আবার সঙ্গীদের সহ পথ চলতে শুরু করলেন। তারা একটি নদীর পাড়ে পৌঁছালেন। ওপারে যাওয়ার মতো কোনো নৌকাও নেই, পানির গভীরতাও বেশি। ঈসা (আ.) তাঁর সব সঙ্গীদের জড়ো করলেন। তারপর আল্লাহর ইচ্ছায় পুরো দলটি পানির পৃষ্ঠের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে একদম অপর পাড়ে গিয়ে পৌঁছলেন। ঈসা (আ.) সেই লোকটিকে আবার ডাকলেন। বললেন, সেই সত্তার কসম যিনি আমাদের পানির উপর দিয়ে হাঁটিয়ে আনলেন, তৃতীয় রুটিটি কে খেয়েছিল? লোকটি এবারও বলল, সত্যিই দুটি রুটি ছিল। তাঁরা আবার চলতে লাগলেন। শেষ গন্তব্যে পৌঁছার পর ঈসা (আ.) সব সঙ্গীদের নিয়ে বসে তিন স্তূপ মাটি জড়ো করলেন। আল্লাহর ইচ্ছায় সেগুলো স্বর্ণ হয়ে গেল। ঈসা (আ.) লোকটিকে বললেন, এক স্তূপ তোমার, এক স্তূপ আমার, আর আরেক স্তূপ সেই ব্যক্তির জন্য যে তৃতীয় রুটিটি খেয়েছিল। লোকটি এবার চিৎকার করে উঠল, আমিই তৃতীয় রুটিটি খেয়েছিলাম।
মানুষটি যখন চোখের সামনে দুনিয়াবি সম্পদের হাতছানি দেখল, তখন সহজেই স্বীকার করে নিল। ঈসা (আ.) বললেন, তিনটি স্তূপই তোমার। কিন্তু তুমি আর আমাদের সাথে থাকতে পারবে না। একথা শুনে লোকটি কী বলল? লোকটি বলল, আরে যান যান! দেখেন আমার নিজের এখন কতো কিছু আছে। ঈসা (আ.) সঙ্গীদের নিয়ে চলে গেলেন। আর এদিকে ওই লোকটির তো মাথাই নষ্ট। এত সম্পদ দিয়ে প্রথমে কী কেনা যায়, কী খাওয়া যায় তা ভাবতে ভাবতে অবস্থা খারাপ। একটু পর তিনটি চোর এলো। তিন স্তূপ স্বর্ণ দেখে তারা লোভে পড়ে গেল, লোকটিকে তারা মেরে ফেলল। তিনজন চোর, তিন স্তূপ স্বর্ণ। কিন্তু তাদেরও খিদে লেগেছে। একজন বলল, আমি শহরে যাই, খাবার কিনে আনি। আগে সবাই খাওয়া-দাওয়া করি। এরপর আমরা যে যার অংশ নিয়ে ঘরে ফিরে যাব। সুন্দর পরিকল্পনা।
যে শহরে যাচ্ছে সে ভাবছে ওই দুইজনের অংশ কীভাবে মেরে দেওয়া যায়। আর ওখানে দুজন ভাবছে তৃতীয়জনের অংশটা কীভাবে মেরে দেওয়া যায়। এরা ঠিক করল তৃতীয়জনকে মেরে ফেলবে, তারপর তার অংশটা নিজেরা আধাআধি ভাগ করে নেবে। ওদিকে খাবার কিনতে যাওয়া চোরটা ভাবছে, ওরা নিশ্চয় আমার কোনো ক্ষতি করবেই। তাই সে খাবারে বিষ মিশিয়ে দিল। সে খাবার নিয়ে ফিরে আসতে না আসতেই বাকিরা তাকে হত্যা করে ফেলল। তারপর নিজেরা বসে উদরপূর্তি করল। একটু পর খাবারের বিষে তারাও মারা গেল। ঈসা (আ.) ফিরে আসছেন। তাঁরা সেই ফেলে যাওয়া সঙ্গীর লাশ দেখলেন, তিনটি চোরের লাশ দেখলেন, আর তিন স্তূপ স্বর্ণ একেবারে অক্ষত অবস্থায় দেখলেন। ঈসা (আ.) তাঁর সঙ্গীদের বললেন, এই হচ্ছে দুনিয়ার জীবন। যে এর পেছনে দৌড়ায়, দুনিয়া তাকে এই অবস্থা করে ছাড়ে।
এটাই দুনিয়া। আল্লাহর কসম, আপনি যত ইচ্ছা এর পেছনে দৌড়াতে পারেন। কিন্তু আপনি সবই পেছনে ফেলে যাবেন। কিচ্ছু সাথে নিতে পারবেন না। অথচ কতবারই না আমরা এই দুনিয়ার তুচ্ছ মুল্যে নিজেদের দ্বীন বিক্রি করে দিয়েছি! আর আমাদের মাঝে কেউ ভাবছে, আরে না! আমি একেবারে সাচ্চা ঈমানদার। আমার এমন দুর্ঘটনা হতেই পারে না। ওয়াল্লাহি, শয়তানের চক্রান্ত আমাদের বুদ্ধির চেয়ে অনেক গভীর। আল্লাহ আমাদেরকে দুনিয়ার ফিতনা থেকে হিফাজত করুন। আমীন।
📄 বিলি—দ্যা ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন
বক্সিং ছিল বিলির স্বপ্ন। আর ছোটবেলা থেকেই আর সবার মতো তারও স্বপ্ন ছিল একদিন বক্সিং ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন হওয়া। তারপর সত্যি সত্যি যখন সেই স্বপ্ন বাস্তবে ধরা দিল, কেমন ছিল সেই অনুভূতি? বিলির ভাষায়, "আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে, আমি এখন ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন! আমার জন্য এটা ছিল গর্ব করার মতো এক মুহূর্ত। আমি ভাবছিলাম, আমার ছোট ভাই এখন স্কুলে যাবে আর বন্ধুদের গর্ব করে বলবে, জানিস, আমার ভাই এখন ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন। বক্সিং রিঙের এক কোণায় চ্যাম্পিয়ন বেল্ট নিয়ে দাঁড়ানো, আর দর্শকদের উল্লাসধ্বনিতে ফেটে পড়তে দেখা—এ এক অন্যরকম অনুভূতি।”
দুই দুইবার ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন হওয়া সহজ কথা নয়, কিন্তু বিলি সেই অসাধ্য সাধন করেছিল। ছোটবেলা থেকেই বিলি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখত—খ্যাতি কিংবা অর্থকড়ির জন্য নয়, বরং খেলাটাকে সে মনেপ্রাণে ভালোবাসত। বিলির ভাষায়, “যখন আমি বক্সিং শুরু করি, তখন আমার কাছে এই খেলাটার মানেই ছিল শুধু ট্রফি আর বেল্ট জেতা। টাকা পয়সার চিন্তা কখনো মাথায় আসেনি।” কিন্তু বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর পরিস্থিতি পাল্টে গেল। অন্য বক্সিং তারকাদের মতো বিলির চোখ গেল খ্যাতি, বিলাসিতাময় জীবনের দিকে।
“অস্কার দ্যা লা হোয়ে, শ্যান মোসলেহ, প্রিন্স নাসিম, মাইক টাইসন এদের দেখেই আমি বড় হয়েছি। এদের প্রত্যেকেই বক্সিং খেলে মিলিয়নিয়ার হয়েছে। আর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর এখন আমি সেসব লিজেন্ডদের সাথে চলাফেরা করছি। তাদের ফেরারি, ল্যাম্বরগিনি, মেয়ব্যাকস, রোলস রয়েসেস দেখতাম আর ভাবতাম—একদিন আমারও এসব চাই।” —বিলি। “আমেরিকায় ছুটি কাটাতে গিয়ে একবার আমার ফ্লুইড ম্যায়ওয়েদারের সাথে দেখা। আমি তাকে বললাম, হে ফ্লুইড, আমি তো এখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন! জবাবে ফ্লুইড শুধু বলেছিল, তোমার সাথে আমি যোগাযোগ করব।” —বিলি
এর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বিলির কাছে আমেরিকায় TMT প্রমোশনে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব আসে। 50 cent আর ফ্লুইড ম্যায়ওয়েদার মিলে এই TMT প্রমোশন খুলেছিল যার আরেক নাম 'The Money Team'. TMT প্রমোশনে যোগ দিয়ে বিলির মনে হলো এবার তার জীবনের সব শখ আহ্লাদ বুঝি পূরণ হতে চলেছে। বড় বড় তারকাদের সাথে তাদের ফেরারি, ল্যাম্বরগিনিতে ঘুরাফেরা, ফাইভ স্টার হোটেল, দামি রেস্টুরেন্ট—হঠাৎ করে বিলির জীবনটাই পাল্টে যেতে শুরু করল।
“আমি যখন 50 cent এর সাথে চুক্তি সই করি, তখন মনে মনে চিন্তা করছিলাম, এবার তাহলে একটা ফেরারি, একটা ল্যাম্বরগিনি কিনে ফেলব, এরপর এটা কিনব, ওটা কিনব, এটা করব, ওটা করব ইত্যাদি। টাকা এখনো হাতে আসেনি, তার আগেই আমি মনে মনে শপিং করা শুরু করে দিয়েছি। যখন কোনো দামি গাড়ি চোখে পড়ত, ভাবতাম কালকেই এই গাড়িটা কিনে ফেলব।” —বিলি
কিন্তু বাইরে থেকে বিলির এই জীবনটা যতই রংচঙা মনে হোক না কেন, কিছুদিন যেতে না যেতেই বিলির ভেতরের সত্তা এই জীবনটার অসারতা টের পাওয়া শুরু করল। “এ লোকগুলোর সাথে থাকা আমার কাছে গজবের মতো মনে হচ্ছিল। 50 cent যে কিনা পৃথিবী বিখ্যাত র্যাপার, এরকম মানুষদের সাথে থাকব—এটা আমার কাছে বিশাল এক ব্যাপার মনে হতো। কিন্তু আমেরিকায় গিয়ে সেখানে তারা আমাকে এমন সব কাজ করতে বলত, এমন সব বিষয়ে যুক্ত হতে বলত, যা আমি কখনো করিনি। এমন সব পার্টিতে আমাকে নিয়ে যেত, যেখানে আমি কখনো যাইনি। ধীরে ধীরে আমি তার প্রতি আকর্ষণ হারাতে থাকতাম, সেও আমার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছিল।” —বিলি
একদিকে যখন বিলি এরকম পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রামে লিপ্ত, সেসময় অন্তকোন্দলের কারণে TMT প্রমোশন ভেঙে যায়। আর এসবকিছু ঘটছে ঠিক তখনই, যখন বিলি ম্যাজর ওয়ার্ল্ড টাইটল জেতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। “একদিন 50 সেন্ট এসে বলল, শোনো বিলি, আমি তোমাকে যে টাকা দেব বলে চুক্তি করেছিলাম, সেটা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। তারা আমার সাথে এসব করছে আমার ওয়ার্ল্ড টাইটল ম্যাচের ঠিক দুই দিন আগে—যখন আমার মাথায় শুধু ম্যাচের চিন্তা! মনে হচ্ছিল যেন তারা আমার বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছে। যাই হোক, ম্যাচের দিন আমি ভেন্যুতে যাচ্ছিলাম। কেন জানি না, আমি আমার মা'কে ফোন দিলাম। ফোন দিয়ে বললাম, মা, আমি চাই তুমি আজকে আমার ম্যাচ দেখবে না।” - বিলি
সেই ম্যাচটা বিলি হেরে গেল। হঠাৎ করে হাওয়ায় ভাসতে থাকা বিলির যেন মাটিতে নেমে আসা। যেন ছবির মতো সুন্দর একটা স্বপ্ন হঠাৎ ভয়ঙ্কর কোনো দুঃস্বপ্ন দেখে ভেঙে গেল। কিন্তু এই দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লাগল যখন বাড়িতে এসে বিলি স্ত্রীর ফোন পেল। “সেই দিনটির কথা আমি কোনোদিনও ভুলব না। আমার এখনো মনে আছে আমি লাউঞ্জরুমে বসে ছিলাম, সামনেই আমার মা দাঁড়িয়ে আছে। সেসময় আমার স্ত্রী সারাহর ফোন এলো। -কী করছ বিলি? -কিছু না, এই তো। -কোথায় তুমি? -এই তো বাসায়। -শোন বিলি! আমি তোমাকে একটা খবর জানাতে চাই। আমার ক্যান্সার ধরা পড়েছে।” কিছু সময়ের জন্য আমার মনে হলো সারাহ আমার সাথে মজা করছে। কিন্তু হঠাৎ সে ফোনে কান্নায় ভেঙে পড়ল। আমার আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।”
দুই মাস দশ দিন পর বিলির স্ত্রী সারাহ তাকে ছেড়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিল। দুঃখ, বেদনা আর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে নাজুক সময়ে বিলি তার প্রিয়তমা স্ত্রীকেও হারাল। “এই পুরো অভিজ্ঞতার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে কষ্টের অনুভূতি হয়েছিল সারাহর বাবাকে দেখে। নিজের মেয়ে অল্প কয়দিনের মধ্যে মারা যাচ্ছে এটা জেনে তিনি পাগলের মতো ডাক্তারকে বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন, কী বলছেন আপনি? কী চাই আপনার? টাকা? কত টাকা চাই আপনাদের? কিন্তু ডাক্তার জানাল, টাকার প্রশ্ন না স্যার। আমরা সারাহর জন্য করণীয় সবকিছু করেছি। কিন্তু আমরা দুঃখিত, সারাহ আমাদের সাথে আর খুব বেশিদিন নেই। আমি দূর থেকে এসব শুনছিলাম আর বারবার শুধু একটা প্রশ্নই মাথায় বাজছিল, ‘এত টাকাপয়সা কী কাজে এলো’?” -বিলি
বিলি কখনো আশা করেনি, তার সাজানো গোছানো জীবনটা এভাবে তছনছ হয়ে যাবে। যে নিয়ামত আল্লাহ তাকে দিয়েছিলেন, মুহূর্তেই আবার আল্লাহ সেগুলো এভাবে ছিনিয়ে নেবেন। কিন্তু এর মাধ্যমেই বিলি জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা পেল। “সারাহর মিত্যুর পর মানসিকভাবে আমি এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম, আমার শুধু মনে হতো যদি সময়ের কাঁটা আবার পেছনে ঘুরিয়ে দিতে পারতাম! কারণ আমি এসব আর সহ্য করতে পারছিলাম না। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, সারাহর মৃত্যুর পর আমি জীবনে প্রথমবার কোনো কবরস্থানে গিয়েছি। নিজ হাতে সারাহকে কবর দিয়েছি। এরপর থেকে আমি কবরস্থানে নিয়মিত যাওয়া শুরু করলাম, কখনো দিনে দুই তিন বার করেও যেতাম। কাউকে জানতে দিতাম না আমি কোথায় যাচ্ছি। আমি শুধু সেখানে যেতাম আর চুপচাপ বসে থাকতাম।”
প্রিয়জন হারানোর এই বেদনার সাথে লড়াই করাটাই ছিল বিলির জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই। আর এর মাধ্যমেই বিলি তার দ্বীন আবার ফিরে পেল। ফিরে পেল আল্লাহর সাথে তার হৃদয়ের সেই সম্পর্ক। “যখন সালাত আদায় করি, আমার মনে হয় জীবনে আর কোথাও এমন প্রশান্তি নেই। এসব আমি শুধু বলার জন্যই বলছি না, এটাই সত্য। যখন আমি পেরেশানিতে থাকি, অস্থির বোধ করি, আমি আল্লাহর কাছে গিয়ে চাই, 'ও আল্লাহ! আমাকে সাহায্য কর। আমার অন্তরের এই দুঃখ বেদনা থেকে আমাকে মুক্তি দাও'।”-বিলি
“আমার বাবা আমাকে সবসময় বলত, মানুষের জীবনের সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছায় সংঘটিত হয়। আর দুনিয়ার এই জীবন হলো একটা পরীক্ষা। সারাহর মৃত্যু, বক্সিং রিঙে ম্যাচ হারা-এসবকিছু আমার জন্য পরীক্ষা ছিল। আর এসব পরীক্ষায় আমি কিছু জিনিস হয়তো হারিয়েছি, কিন্তু সবচেয়ে মূল্যবান, আমার আল্লাহকে খুঁজে পেয়েছি।” –বিলি। যে বিলির কাছে মনে হতো বক্সিং চ্যাম্পিয়ন হওয়া তাকে প্রাচুর্য আর সুখশান্তির একটা জীবন দেবে, সেই মোহ একসময় কঠিন বাস্তব হয়ে তার জীবনটা পাল্টে দিল। সে মনে করত এই ট্রফি, বেল্ট—এগুলোই জীবন। একসময় তাই আল্লাহর কাছে শুধু এসবই সে চাইত। কিন্তু আল্লাহর কাছে এখন তার শুধু একটাই চাওয়া, “ও আল্লাহ আমাকে তোমার দ্বীনের উপর অটল রাখ। আর আমাকে তোমার কাছে কেবল তখনই নিয়ে যেয়ো, যখন তুমি আমার প্রতি সন্তুষ্ট।”