📘 আন্তরিক তাওবা > 📄 তাওবা কবুল হওয়া বা না হওয়ার লক্ষণ

📄 তাওবা কবুল হওয়া বা না হওয়ার লক্ষণ


প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোনেরা, ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রঃ) তাওবা কবুল হওয়া বা না হওয়ার অনেকগুলো লক্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নরুপ:

তাওবা কবুল হওয়ার লক্ষণ:
১। বান্দাকে তাওবার পর আগের চাইতে ভাল হতে হবে। এর মানে হলো, তাওবাকারী ব্যক্তির দেখা উচিত তার নেক আমল বেড়েছে কি না এবং বদ আমল বা গুণাহের পরিমান কমেছে কি না।
২। মনে সবসময় আল্লাহর ভয় থাকা উচিৎ। আল্লাহর রাগ সম্পর্কে সে নিশ্চিন্ত হবে না।
৩। তাকে সব সময় ভয় ও অনুশোচনা সহ সতর্ক থাকতে হবে।
৪। তাকে আরো বেশী বিনয়ী হতে হবে। নিজেকে তুচ্ছ ও অধম মনে করে আল্লাহর কাছে বিনীত ভাবে দোয়া করতে হবে, 'হে আল্লাহ! আপনার ইজ্জতের নামে নিজেকে তুচ্ছ জ্ঞান করে বলছি, আপনি আমার উপর রহমত করুন। আপনার শক্তিমত্তা ও আমার দুর্বলতা, আপনার বিত্ত আর আমার দারিদ্র্য স্মরন করে আপনার কাছে চাইছি। আপনার সামনে এই অপরাধী মাথা নত করছি। আমি ছাড়াও আপনার আরো অনেক বান্দাহ আছে। কিন্তু আমার রব, আমার প্রভুতো কেবলই আপনি। আপনি ছাড়া আমার যাওয়ার কোন জায়গা নেই, নেই কোন আশ্রয়। আমি আপনার কাছে নিঃস্ব ভিক্ষুকের মত হাত পেতেছি। আমি কাকুতি মিনতি করছি যেমন করে একজন দীন-হীন অসহায় মানুষ কাকুতি মিনতি করে। আমি একজন ভয়ার্ত ও দুর্দশাগ্রস্থ বান্দার মত চাইছি। আমি তার মত করে আপনার কাছে কামনা করছি যেভাবে কোন ব্যক্তি নিজেকে আপনার কাছে সঁপে দেয়, যেমন করে কেউ আপনার জন্য নিজের মান মর্যাদা ত্যাগ করে। আমি আপনার কাছে চাই সেই বান্দার মতো যে কান্নাকাটি করে আপনার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে।'

এগুলো হলো তাওবা কবুল হওয়ার লক্ষণ।

তাওবা কবুল না হওয়ার লক্ষণ:
১। তাওবাকারীর সংশোধনে দুর্বলতা। পাপ কাজের আনন্দ তার মনে পড়ে যায় এবং তার মন তাতে ডুবে যায়।
২। তাওবাকারী নিজের তাওবা কবুল হবার বিষয়ে এতোটাই নিশ্চিত হয়ে যায় যে সে মনে করে তার গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছে।
৩। চোখে পানি আসে না, গুণাহের শাস্তির কথা ভুলে যায়, মন শক্ত হয়ে যায়।
৪। তাওবাকারী নিজের নেক আমল বাড়ানোর কোন চেষ্টা করে না।
আমাদের মনে রাখা উচিৎ যে, আমাদের সবসময় ভুল হয়, আমরা নিয়মিত গুনাহ করি। তাই নিয়মিত তাওবার মাধ্যমে আমাদের এ থেকে নিজেদেরকে মুক্ত রাখা উচিৎ, যেমন করে নোংরা কোন গর্তে পড়ে গেলে কোন মানুষ সেখান থেকে উঠে নিজেকে ধুয়ে পরিষ্কার করে নেয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, 'যদি তোমরা অপরাধ না করো তবে আল্লাহ সেই সব মানুষদেরকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন, যারা পাপ করে এবং আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চায়। তখন আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেন।”
ইবনে রজব (রঃ) এই হাদীসের ব্যখ্যায় বলেন, “মাঝে মাঝে মানুষকে ভুলিয়ে দেয়ার পিছনে আল্লাহর কিছু কারণ আছে। সেটি হলো, এতে করে তারা নিজেদের তুচ্ছ, ছোট মনে করে এবং অযাচিত গর্ব অহংকার পরিত্যাগ করে। গর্বভরে ইবাদত করার চাইতে এটা আল্লাহর কাছে বেশী প্রিয়।”
হাসান বসরী (রঃ) বলেন, “মাঝে মাঝে বান্দাহ এমন অপরাধ করে যা সে কখনোই ভোলে না। তখন এর গ্লানি থেকে সে অনেক বেশী ভীত থাকে যতক্ষণ না জান্নাতে প্রবেশ করে।”

গুনাহের অন্তর্নিহিত সুফল:
ইবনুল কাইয়্যিম (রঃ) গুনাহের অন্তর্নিহিত বেশ কিছু সুফলের কথা উল্লেখ করেছেন। তার লিখিত বই 'মাদারিজুল সালিকিন' (১/২৩৫) ও 'মিফতাহু দারি সাদাহ' (২/১৮৪) থেকে কিছু উদ্ধৃতি নিচে দেয়া হলো:
১। বান্দাহ আল্লাহর অপরিসীম শক্তিমত্তার কথা মনে করবে এটা বোঝার জন্য যে, তার পাপ আল্লাহর হুকুমেই হয়েছে।
২। বান্দাহ বুঝতে পারবে যে একমাত্র আল্লাহই নিখুঁত ও ত্রুটিমুক্ত। আর সে নিতান্তই পরমুখাপেক্ষী ও দুর্বল সৃষ্টি।
৩। বান্দাহ আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে যে তিনি তার দোষ গোপন রেখেছেন, প্রকাশ করেননি। অথচ তিনি সর্বদ্রষ্টা ও অসীম শক্তির অধিকারী। এটা তাঁর মহানুভবতা ও উদারতার প্রমাণ।
৪। বান্দাহ তার তাওবা ও ওযর কবুল করায় আল্লাহর মহত্ব ও অসীম ধৈর্যশীলতা অনুধাবন করতে পারবে। তিনি তাঁর ন্যায়বিচারের আলোকে বান্দাহ ও তার গুণাহের বিচার করতে পারতেন। আর সেটা হত অত্যন্ত মর্মান্তিক।
৫। বান্দাহ তার নেক আমলের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাহায্য ও নিরাপত্তা অনুভব করবে। আলেমরা তাওফীকের লাভের (অর্থাৎ কেবলমাত্র আল্লাহই কারো নেক নিয়্যতকে নেক আমলে পরিণত করতে পারেন) উপর খুব বেশী জোর দিয়েছেন। এ জন্য বান্দাহ সকল কাজে আল্লাহর উপর নির্ভর করবে, নিজের শক্তি সামর্থ্যের উপর নয়।
৬। বান্দার জানা উচিৎ আল্লাহ তার বিরুদ্ধে তাঁর প্রমাণ সম্পন্ন করেছেন, বান্দাহ বলতেও পারবে না কেন বা কিভাবে তা হয়েছে। সে যা করে থাকে তা আল্লাহর মাধ্যমেই করে থাকে। আল্লাহ তার বেশীরভাগ গুনাহই উল্লেখ না করে মাফ করে দেন।
৭। যখন বান্দাহ এই বিষয়গুলো বুঝতে পারবে, তখন তার শত্রুদের বিরুদ্ধে সে দ্রুত প্রতিশোধ পরায়ণ হবে না। সে আল্লাহর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে অন্যদের ত্রুটিগুলো মাফ করে দেবে ও তাদের প্রতি দয়ালু হবে, যেমন করে আল্লাহ তার এতসব অপরাধ থাকা সত্বেও তার প্রতি দয়ালু ও ক্ষমাশীল।
৮। যখন বান্দাহ তার নিজের দুর্বলতা ও আল্লাহর মহানুভবতা খেয়াল করবে, তখন তার কাছে আল্লাহর সমস্ত উদারতাই হয়ে উঠবে মহান। শুধুমাত্র এই উপকারিতাই সমস্ত সম্পদের চাইতেও যথেষ্ট হবে।
৯। বান্দাহ অন্যের দোষত্রুটি অন্বেষণের চাইতে নিজের ভুল-ভ্রান্তি, গুনাহ শোধরানো নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকবে।
সুবহানাল্লাহ! এই যদি হয় গুনাহ করার পরে উপকারিতা, তবে নেক আমলের উপকারিতা না জানি কত হবে!

📘 আন্তরিক তাওবা > 📄 তাওবাকারীদের শ্রেণীবিভাগ

📄 তাওবাকারীদের শ্রেণীবিভাগ


তাওবাকারীদের মূলত দুইটি শ্রেণীবিভাগ আছে। এক পক্ষ হলো যারা আন্তরিকতার সাথে তাওবা করে, অন্য পক্ষ হলো যারা আন্তরিকতা নিয়ে করে না। প্রত্যেকেরই বিবেচনা করা উচিৎ তার অবস্থান কোন শ্রেণীতে।
সংকল্পের উপর ভিত্তি করে ইমাম গাযালী (রঃ) তাওবাকারীদের কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন। তার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ:

১ম শ্রেণীঃ
যে ব্যক্তি তার তাওবার উপর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দৃঢ় থাকে, তার গুণাহের স্খলন ঘটায় না এবং যেসব ক্ষেত্রে কোন মানুষের নিয়ন্ত্রণ থাকে না এমন সব ক্ষেত্র ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে সচেতনভাবে ঐ গুনাহ করার ইচ্ছা পোষণ করে না। এটা হলো ধারাবাহিক ও নিয়মিত তাওবা। যারা এটি করতে পারে তারা সেই সব মানুষের অন্তর্ভুক্ত যারা নেক আমলের পিছনে ছোটে। এই তাওবাকে বলে আন্তরিক ও খাঁটি তাওবা আর তাওবাকারীর হৃদয়কে বলে প্রশান্ত আত্মা।
“হে প্রশান্ত আত্মা, তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে ফিরে যাও। অতঃপর আমার নেক বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।” (সুরা আল-ফজর, আয়াত ৩০)

২য় শ্রেণীঃ
এমন তাওবাকারী যে তার তাওবার ক্ষেত্রে আন্তরিক এবং কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে। কিন্তু মাঝে মাঝে অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতির কারণে গুণাহের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। যখনি সে গুনাহ করে, তখনি নিজের মনকে তিরষ্কার করে, ভুলের জন্য দগ্ধ হয়। এটি হলো তিরষ্কারকারী বা সমালোচক আত্মা, কেননা এটি সব সময় নিজেকে ভুলের জন্য তিরষ্কার করে। এই ধরণের তাওবাকারী আল্লাহর কাছ থেকে খুশির খবর পেয়েছে।
“যারা বড় বড় গুনাহ ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে, ছোট খাট অপরাধ করলেও নিশ্চয় আপনার পালনকর্তার ক্ষমা সুদুর বিস্তৃত” (সুরা আন-নাজম, আয়াত ৩২)
অধিকাংশ আলেমের মতে সগীরা গুনাহ হলো হারাম জিনিসের দিকে তাকানোর মত।

৩য় শ্রেণীঃ
এমন বান্দাহ যে তাওবা করে এবং তদানুসারে নিয়মিত কাজ করে, তবে মাঝে মাঝে তীব্র আবেগ বা লালসার বশবর্তী হয়ে গুনাহ করে বসে। কিন্তু সে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে আনুগত্য বজায় রাখে এবং মোটের উপর গুনাহ থেকে দূরে থাকে। সে সার্বক্ষণিক তাওবার মাধ্যমে নিজের আত্মার যত্ন নেয়। এই আত্মা তার কাজের জন্য দায়ী এবং এজন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে। “আশা করা যায় আল্লাহ তাদের উপর ক্ষমাশীল হবেন।” (সুরা আত-তাওবা, আয়াত ১০২)
আশংকা আছে, এই ব্যক্তি হয়তো তাওবা করার আগে মারা যাবে। তাই তার এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিৎ এবং তার তাওবার উপরে অটল থাকা উচিৎ।

৪র্থ শ্রেণীঃ
এমন ব্যক্তি যে একবার তাওবা করে কিন্তু আসক্তির কারণে পুনরায় গুণাহের মাঝে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এরপর তার জন্য অনুশোচনাও বোধ করে না, তাওবাও করে না। এ ব্যক্তি সেই সব লোকের অন্তর্ভুক্ত যারা গুণাহের ভিতরে ডুবে থাকে। তাদের অন্তর নিয়মিত তাদেরকে গুণাহের দিকে টেনে নিয়ে যায়। এভাবে তাদের মৃত্যু কঠিন কোন পরিণতি নিয়ে আসতে পারে।
যদি সে তাওহিদের উপর মারা যায়, তবে হয়তো দোযখের আজাব ভোগ করার পর তাকে মুক্তি দেয়া হতে পারে। এমন কি অজানা কোন কারণে তাকে সম্পূর্ণ মাফও করে দেয়া হতে পারে। কিন্তু এমন ক্ষমার উপর আশা করে বসে থাকা মোটেও যৌক্তিক নয়।
কিছু লোক আছে যারা বলে আল্লাহর ক্ষমা ও দয়া অসীম। যদি কেউ এদের বলে, “আল্লাহ যদি এত মহান ও উদার হয়ে থাকেন তবে কেন তোমরা নিজেদের ঘরে বসে থাকো না এবং আল্লাহর জন্য অপেক্ষা করো না যে তিনি তোমাদের ভরন পোষণের ব্যবস্থা করে দিবেন?” তারা তখন মুখ ফিরিয়ে বলে, “ভরন পোষণ শুধু উপার্জনের মাধ্যমেই পাওয়া যায়”। তাদের দাবির প্রতিউত্তরে একই ভাবে এই কথাই বলা উচিত “মুক্তি মিলতে পারে তাকওয়ার মাধ্যমে, কেবল মাত্র আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা করে থাকার মাধ্যমে নয়।
সুতরাং হে আল্লাহর বান্দারা, ভেবে দেখুন আপনি কোন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ বলেন, “অতঃপর আমি আমার বান্দাদের মাঝে মনোনীতদেরকে কিতাব দান করেছি। তাদের কেউ নিজেদের প্রতি যুলুমকারী, কেউ মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী আবার তাদের কেউ কেউ কল্যাণের পথে অগ্রগামী। এটাই মহান আল্লাহর অনুগ্রহ।” (সুরা আল-ফাতির, আয়াত ৩২)
ইমাম কুরতুবী (রঃ) এই আয়াতের একটি ব্যাখ্যাকে সমর্থন করেছেন, “যারা ছোট গুনাহ করে তারা যালেম। যারা দুনিয়া ও আখেরাতের প্রাপ্য মিটিয়ে দেয় তারা মধ্যপন্থী। আর যারা ভাল কাজের পিছনে দৌঁড়ায় তারা সব চাইতে এগিয়ে।”
তাই আমাদের দিনে রাতে সর্বাবস্থায় তাওবা করা উচিৎ, যাতে আমরা যালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে না পড়ি। “যারা এহেন কাজ থেকে তাওবা করে না তারাই যালেম।” (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১১)
মুজাহিদ (রঃ) বলেন, “যারা সকাল সন্ধ্যা তাওবা করে না তারাই যালেম।”
আমাদের সলফে সালেহীনদের চরিত্র এমন ছিল যে তারা আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার উপর নির্ভর করতেন, যদিও তারা নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদত করতেন। তারা নিজেদের কাজের উপর নির্ভর করতেন না।
একজন ইবাদতকারী এত বেশী ইবাদত করতেন যে তার বুকের পাঁজর দেখা যেত। একজন তাকে বললো, “আল্লাহর দয়া অসীম।” তিনি উত্তর দিলেন, “ঠিক বলেছেন, যদি তাঁর দয়া অসীম না হতো তবে আমাদেরকে আমাদের ইবাদতের জন্য ধ্বংস করে দিতেন, গুণাহের কথা তো বাদই দিলাম।”
হুজাইফা ইবনে কাতাদা (রঃ) বলেন, “যদি কেউ আমাকে কসম করে বলে, আল্লাহর শপথ! আপনার আমল তো কিয়ামত দিবসে অবিশ্বাসীদের মতো।” আমি তাকে বলতাম তার শপথ সঠিক, তাকে এর জন্য কাফফারা দিতে হবে না।
সলফে সালেহীনরা তাদের আমল সম্পর্কে কখনই উচ্চাশা পোষণ করতেন না, তারা যতই আল্লাহর ইবাদত করুন না কেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সারারাত জেগে নামাজ পড়তেন, অনেক সময় তাঁর পা গুলো ফুলে যেতো। যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো আল্লাহ তাঁর পূর্বাপর সব গুনাহ মাফ করে দেয়ার পরও কেন তিনি এইরূপ করেন, তিনি বলতেন, "আমি কি শুকরিয়া আদায়কারী বান্দাহ হবো না?”
আব্দুর রাহমান ইবনে হামরাজ আল হারাজ (রঃ) বলেন, “তোমার নিজের ভেতরের সব খারাপ দিকগুলো খুঁজে দেখ। প্রত্যেককে তার নিজের স্বরূপে পুনরুজ্জিবীত করা হবে। যার ভিতরে সব ধরণের পাপ আছে তাকে সব ধরণের লোকের সাথে রাখা হবে।” তারপর তিনি নিজের সমালোচনা করে বলেন, “একজন ঘোষক আগামী দিন ঘোষনা করবে 'অমুক অমুক গুনাহগার লোকেরা, দাঁড়াও!' সুতরাং হে আরাজ তুমিও দাঁড়াবে তাদের সাথে। তখন আরেকটি ঘোষনা দেয়া হবে 'অমুক অমুক গুনাহগার লোকেরা, দাঁড়াও!' সুতরাং আবার হে আরাজ তুমি তাদের সাথে দাঁড়াবে। আমি দেখতে পাচ্ছি এভাবে তুমি সব দলের সাথেই দাঁড়াবে।”

📘 আন্তরিক তাওবা > 📄 তাওবার কিছু নিয়ম

📄 তাওবার কিছু নিয়ম


তাওবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম আছে। আমরা অত্যন্ত প্রাসংগিক কিছু নিয়ম উল্লেখ করবো ইনশাআল্লাহ।
ইবনুল কাইয়্যিম (রঃ) বলেন,
১। তাওবা করতে গড়িমসি না করা।
গুনাহ করার সাথে সাথে তাওবা করা ফরজ। যদি কেউ তাওবা করতে দেরি করে তবে সে তার জন্য দায়ী হবে। যদি সে পরে তাওবা করে, তবে তাওবা করতে দেরি করার জন্য আলাদা করে তাওবা করতে হবে।
২। একটি গুনাহ থেকে তাওবা করা, অন্যটি থেকে নয় – এমন যেন না হয়।
একটি গুনাহ থেকে তাওবা সঠিক ও খাঁটি হবে না, যদি দেখা যায় একই রকম আরেকটি গুণাহে সে লিপ্ত। কিন্তু যদি, যে গুনাহ থেকে তাওবা করা হচ্ছে, অন্য গুনাহটি একই রকমের না হয় তাহলে তার তাওবা সঠিক ও খাঁটি বলে ধরা হবে।
উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ মদ থেকে তাওবা না করে সুদ খাওয়া থেকে তাওবা করে, তাহলে তার সুদ সংক্রান্ত তাওবা সঠিক ধরা হবে। কিন্তু কেউ যদি হাশিশ (এক ধরনের মাদক) গ্রহণ থেকে তাওবা করে কিন্তু মদ পান চালিয়ে যায়, তাহলে তার এই তাওবা সঠিক হবে না। যেমন কোন ব্যক্তি এক মহিলার সাথে ব্যভিচার থেকে তাওবা করলো, অন্য মহিলার সাথে ব্যভিচার থেকে করলো না। তাহলে বাস্তবে এটি কোন তাওবাই হলো না।
৩। তাওবাকৃত গুণাহের দিকে ফিরে না যাওয়া।
কেউ কেউ বলেন তাওবা কবুলের পূর্বশর্ত হলো যেই গুনাহ থেকে তাওবা করা হচ্ছে তা আর না করা। কিন্তু বেশীরভাগ আলেমরা বলেন যদি কোন বান্দাহ নিজেকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে, অনুশোচনা করে, সেই গুণাহের পুনরাবৃত্তি না করার সংকল্প করে তাহলে তাওবা বৈধ এবং ইনশাআল্লাহ তা কবুল করা হবে। আবার গুণাহের দিকে ফিরে আসলেও তার আগের তাওবা অবৈধ হবে না, যদিও তাকে পুনরায় তাওবা করতে হবে।
শাইখ রুস্তাকি (রঃ) বলেন,
৪। "আমি তাওবা করিনি কারণ আমি জানতাম আমি আবার গুণাহের দিকে ফিরে যাব” এমন ধারণা হলো শয়তানের প্ররোচণা। কেউ জানে না তার মৃত্যু কখন হবে। তাওবার আগেও কেউ মারা যেতে পারে। বান্দার কাজ হলো তাওবা করা। আল্লাহ তাঁর অসীম রহমতে তাকে হয়তো গুনাহ ত্যাগ করার দৃঢ়তা দান করবেন। যদি কেউ আবার গুনাহ করেও বসে, তবুও অন্তত সে প্রচেষ্টা চালিয়েছিল এবং তাওবার মাধ্যমে পূর্বের গুনাহ থেকে নিজের অপবিত্রতা মুছে ফেলেছিল। তাওবাকারী সব সময় কোন না কোন উপকারিতা পায়। যদি আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করেন, তাহলে বোঝা যাবে তিনি তাকে খুবই পছন্দ করেন।
“নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারী এবং অপবিত্রতা থেকে যারা বেঁচে থাকে তাদের খুবই পছন্দ করেন।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত ২২২)
আমাদের জন্য উত্তম দৃষ্টান্ত হলো আদি পিতা আদম (আঃ), যিনি জান্নাতে একটিমাত্র ভুল করার পরেও নিয়মিত বেশী বেশী তাওবা করেছেন। আমরা অসংখ্য ভুল ভ্রান্তি করি, গুনাহ করি। আমাদের উচিৎ নিয়মিত তাওবা করে যাওয়া এবং আল্লাহর উপর আস্থা না হারানো।
৫। তাওবার পর করণীয়।
তাওবার পর একজন মানুষের আরো বেশী বিনয়ী ও আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকা উচিত। তার আত্মবিশ্বাসী হওয়া উচিৎ নয়। আল্লাহ তার তাওবা কবুল করে দিয়েছেন এমন ধারণাও মনে পোষণ করা উচিৎ নয়। এটি আরেক ধরণের অহংকার, যা নিজেই একটি গুনাহ। ইবনে হাওয়ারী (রঃ) বলেন, একজন বান্দাহ কোন গুণাহের জন্য তাওবা এবং সে গুণাহের জন্য এত বেশী অনুশোচনা করে যে, সে তার এই অনুশোচনার ও মর্মপীড়ার ফলে জান্নাতে প্রবেশ করে। তখন শয়তান আফসোস করতে থাকে কেন সে লোকটিকে শুরুতে কুমন্ত্রনা দিয়েছিল।
৬। যখন অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয় তখন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে জানানোও তাওবার অন্তর্ভুক্ত।
হানাফি, শাফেয়ী ও মালেকি মাযহাবের মতানুসারে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতির ব্যাপারে জানানো প্রয়োজন। তাঁরা রাসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই হাদিসটি উল্লেখ করেন “যে ব্যক্তি তার কোন ভাইয়ের সম্পদ বা সম্মানের ক্ষতি করে, তার অবশ্যই তার কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিৎ সেই দিনটি চলে আসার আগে যেদিন বিনিময়ের একমাত্র মাধ্যম হবে নেক আমল ও বদ আমল।”
সাধারণত গুনাহ দুইটি হকের সমষ্টি – একটি হলো আল্লাহর হক, অন্যটি বান্দার হক। আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। আর বান্দার হকের ক্ষেত্রে তাওবার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বান্দার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। এই জন্য খুনের ক্ষেত্রে তাওবা পূর্ণতা পাবে না যতক্ষণ না নিহত ব্যক্তির উত্তরাধীকারদেরকে ক্ষমা অথবা প্রতিশোধ, এই দুয়ের কোন একটি বেছে নেয়ার সুযোগ দেয়া হবে।
ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে জানানো বাধ্যতামুলক নয়। একজন মানুষ এটি ছাড়াও তাওবা করতে পারে। কারণ গুণাহের প্রদর্শনী করে কোন লাভ নেই। এতে কেবল ক্ষতি আর বিশৃঙ্খলাই বাড়বে যা ইসলামে হারাম। তবে যদি কেউ কারো সম্মানহানি করে বা গীবত করে, তাহলে অন্য কোন সময় তার প্রশংসা করতে হবে।”
৭। তাওবাকারী কি তার পূর্বেকার পর্যায়ের ঈমান ফিরে পায়?
কেউ কেউ বলেন, সে গুণাহের আগেকার ঈমানের অবস্থায় ফিরে যায় না। তাকে তার আগের ঈমান ফিরে পেতে হলে তার পরিবেশ তৈরি করতে হয়।
অন্যান্যরা বলেন সে পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে, কারণ তাওবার দ্বারা তার গুনাহ এমন ভাবে মাফ হয়ে যায় যেন সে আদৌ কোন গুনাহ করেনি।
ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) বলেন, “বিষয়টি আপেক্ষিক। কেউ হয়তো তার আগের মানে ফিরে যেতে পারে, কেউ হয়তো তার চাইতে উন্নত মানে পৌঁছে যায়।” এর ব্যাখ্যায় একটি গল্প বলা যেতে পারে।
এক মুসাফির শান্তিপূর্ণভাবে এবং সঠিক গতীতে পথ চলছে। সে কিছুক্ষণ দৌড়ায়, কিছুক্ষণ হাঁটে, কিছুক্ষণ পথ চলে আবার কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়। পথিমধ্যে সে একটি মরুদ্যান দেখতে পেল যেখানে একজন পথিকের মন মতো পরিষ্কার পানি, পর্যাপ্ত ছায়া ও বিশ্রামের ভাল ব্যবস্থা আছে। তখন সেই পথিক গিয়ে উঠলো সেখানে। হটাৎ একদল ডাকাত এসে তাকে আক্রমণ করে বন্দি করলো। সে তার জীবনহানির আশংকা করতে লাগলো এবং আফসোস করতে লাগলো ঠিকমত গন্তব্যে পৌঁছতে না পারায়। এরপর যখন সে ঘুমিয়ে ছিল তখন তার বাবা তাকে উদ্ধার করলেন এবং বললেন, তোমার সফর চালিয়ে যাও। এইসব শত্রুদের থেকে সাবধান থাকো। এরা তোমাকে হামলা করার জন্য ওত পেতে আছে। যদি তুমি সাবধান থাকো, তবে তুমি তাদের শিকার হবে না। আর যদি অসাবধান হও, তবে তুমি এর ফল ভোগ করবে।
যদি সে মুসাফির বুদ্ধিমান হয়, তবে সে সতর্কতা অবলম্বন করবে এবং আগের চাইতে আরো ভালভাবে সফর করবে। শেষ পর্যন্ত সে তার গন্তব্যে আগের চাইতে আরো ঝামেলামুক্তভাবে ও দ্রুত পৌঁছাবে। কিন্তু যদি সে সাবধান না হয়, শত্রুদের সাথে তার মোকাবেলার কথা ভুলে যায়, তাহলে পরিণতিতে তার প্রাপ্য ফল ভোগ করবে।
৮। তাওবার প্রকারভেদ।
ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) বলেন, “তাওবা দুই প্রকার। ফরজ ও মুস্তাহাব। ফরজ তাওবা করা হয় যখন কোন ফরজ ছুটে যায় বা হারাম কাজ করা হয়। আর মুস্তাহাব তাওবা করা হয় যখন কোন মুস্তাহাব আমল ছেড়ে দেয়া হয় বা মাকরুহ কাজ করা হয়। যে যথাযথ ভাবে প্রথম তাওবা করে সে মাঝারি মানের পরহেযগার। আর যে উভয় ধরণের তাওবা করে সে আল্লাহর নিকটবর্তী ও অগ্রগামীদের অন্তর্ভুক্ত। আর যারা কোন ধরণের তাওবাই করে না তারা হলো যালেম।

📘 আন্তরিক তাওবা > 📄 তাওবার সাহায্যকারী উপাদান

📄 তাওবার সাহায্যকারী উপাদান


১। বান্দাকে আল্লাহর শক্তিমত্তা ও ক্ষমতা বুঝতে হবে। তিনি ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দিতে পারেন। এই অনুভূতি বান্দাকে সাথে সাথে তাওবা করতে সাহায্য করবে। এজন্য সলফে সালেহীনদের একজন বলেছিলেন, “কেমন গুনাহ করেছ সেটি না দেখে বরং দেখো কার বিরুদ্ধে তুমি গুনাহ করেছ।” আল্লাহ বলেন,
“তোমাদের কি হলো যে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব আশা করছো না, অথচ তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন।” (সুরা নুহ, আয়াত ১৩-১৪)
২। বান্দার উচিৎ মৃত্যু ও মৃত্যুর যন্ত্রণার কথা স্মরণ করা। তার কল্পনা করা উচিৎ কতটা নিসঙ্গ আর একাকী হবে তার কবর! আল্লাহ বলেন,
“প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর তোমরা কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণভাবে বদলা প্রাপ্ত হবে।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮৫)
“কেউ জানেনা আগামীকাল সে কি উপার্জন করবে। কেউ এটাও জানেনা কোথায় তার মরণ হবে।” (সুরা লোকমান, আয়াত ৩৪)
মুজাহিদ (রঃ) বলেন, “যখন আদম সন্তানকে কবরে রাখা হবে তখন কবর তাকে বলবে, 'হে আদম সন্তান, লানত তোমার উপর! কোন জিনিস তোমাকে আমার সম্পর্কে ভুলিয়ে রেখেছিল? তুমি কি জানতে না আমি হলাম পোকা মাকড় ভর্তি, নিসঙ্গ আর অন্ধকার ঘর। আমি তোমার জন্য এসব জিনিসই তৈরি করে রেখেছি। তুমি আমার জন্য কি প্রস্তুতি নিয়ে এসেছো?”
ইবনে ওমর (রাঃ) বলেন, “সকালে তুমি আরেকটি সন্ধ্যা আর সন্ধ্যায় তুমি আরেকটি সকাল পাবে এমন আশা করো না। অসুস্থতার আগে সুস্থতাকে, মৃত্যুর আগে জীবনকে গুরুত্ব দাও।”
৩। বান্দার জেনে রাখা উচিৎ যে পরকালের উদ্দেশ্যে করা কাজের মাধ্যমেই উভয় জগতের সাফল্য পাওয়া যেতে পারে। এই পৃথিবী অল্প কিছু মুহুর্ত মাত্র, যা নিঃশেষ হয়ে যাবে।
“হে মানুষ, তোমাদের রবের সাথে সাক্ষাতের আগ পর্যন্ত তাঁর সন্তুষ্টির জন্য কঠিন পরিশ্রম করো।” (সুরা আল-ইনশিকাক, আয়াত ৬)
“তাদের কাছে পার্থিব জীবনের উপমা বর্ণনা করুন। তা হলো পানির ন্যায়, যা আমি আকাশ থেকে নাযিল করি। অতঃপর এর সংমিশ্রণে সবুজ শ্যামল ভুমিজ লতাপাতা নির্গত হয়। অতঃপর তা এমন শুষ্ক চূর্ণ বিচুর্ণ হয় যে বাতাসে উড়ে যায়। আল্লাহ এসব কিছুর উপর শক্তিমান।” (সুরা আল-কাহফ, আয়াত ৪৫)
“হে মানুষ, নিশ্চয়ই আল্লাহর ওয়াদা সত্য, সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাকে প্রতারণায় না ফেলে। সেই প্রবঞ্চক (শয়তান) যেন কিছুতেই আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদেরকে ধোঁকা দিতে না পারে।” (সুরা আল-ফাতির, আয়াত ৫)
রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “আল্লাহর কাছে যদি এই দুনিয়ার মূল্য একটা মাছির পাখার সমানও হতো তবে তিনি কোন কাফেরকে এক ফোঁটা পানিও দিতেন না।” (সুনান তিরমিজি)
তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেছেন, “পরকালের তুলনায় দুনিয়া হলো এক ফোঁটা পানির মত যা সাগরে আঙ্গুল ডুবালে তোমার একটি আঙ্গুলের সাথে উঠে আসে।” (সহীহ বুখারি ও সহীহ মুসলিম)
ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, “বিচারের দিন এই পৃথিবীকে একজন দাঁতহীন, কুশ্রী, বুড়ো মহিলার চেহারায় উপস্থাপন করা হবে। সে মানুষের সামনে উপস্থিত হলে মানুষ জিজ্ঞেস করবে, কে এই মহিলা? তারা আল্লাহর কাছে এই মহিলার সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকার প্রার্থনা করবে। তখন তাদের বলা হবে, এই হলো সেই দুনিয়া যার জন্য তোমরা ঝগড়াঝাটি করতে, সম্পর্ক ভেঙে দিতে। এই হলো সেই দুনিয়া যার জন্য তোমরা একে অপরকে হিংসা করতে, ঈর্ষা করতে। একে অপরের সাথে প্রতারণা করতে।
সেই মহিলাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করলে সে বলবে, হে আমার প্রভু! আমার অনুসারীরা কোথায়? কোথায় আমার লোকজন? আল্লাহ তখন তার অনুসারী ও লোকজনকে তার সাথে ছুড়ে ফেলার আদেশ দিবেন।”
৪। বান্দার জেনে রাখা উচিৎ, দুনিয়াতে হয়তো কোন শাস্তি তাড়াতাড়ি দেয়া হতে পারে। তার জীবনের সব কিংবা কোন একটি সমস্যা হলো তার গুণাহের ফল।
“আল্লাহ তাদের প্রতি অবিচার করেননি। বরং তারাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছে।” (সুরা আন-নাহল, আয়াত ৩৩)
ফুজাইল (রঃ) বলেন, “আমি যদি আল্লাহকে অমান্য করি, তার ফলাফল আমার গাধা আর চাকরের উপর পড়তে দেখি (অর্থাৎ তারাও সেদিন আমাকে মান্য করে না)।”
ইবনে সিরীন (রঃ) বলেন, “বিশ বছর আগে আমি একজন মানুষকে ছোট করেছিলাম তাকে 'হে দরিদ্র লোক' বলে, এজন্য আল্লাহ তারপর থেকে আমার উপর দারিদ্র্য দিয়েছেন।”
ফুজাইল (রঃ) বলেন, “একজন মানুষের জামাতে নামাজ ছুটে যায় অতীতে কোন পাপ করার কারণে।”
কাব উল আহবার (রঃ) বলেন, “দোযখের মানুষেরা চরম আফসোস বোধ থেকে নিজেদের হাত কাঁধ পর্যন্ত খেয়ে ফেলবে, অথচ টেরও পাবে না (আফসোস বোধ এতটাই তীব্র হবে)।”
ইয়াজিদ আর রুকাসি (রঃ) বলেন, “আমি নিজেকে দোযখের আগুনে দেখতে পাই একদিকে আমাকে লোহার হাতুড়ি দিয়ে মারা হচ্ছে অন্যদিকে আমি কাঁটা খাচ্ছি আর পুঁজ পান করছি। আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, তুমি কি চাও? আমি উত্তর দেই, আমি যদি নেক আমল করার জন্য পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারতাম আর এই শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে পারতাম। তার পর আমি কল্পনা করি আমি বেহেস্তের বাগানে হেটে বেড়াচ্ছি, সেখানে রেশমী কাপড় পরে কুমারী হুরদের সাথে মিলছি। আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, তুমি কি চাও? আমি উত্তর দেই, আমি চাই পৃথিবীতে ফিরে যেতে, যাতে আমি আরো অনেক বেশী নেক আমল করতে পারি আর বিনিময়ে এখানে আরো অধিক পরিমানে নেয়ামত পেতে পারি।
এরপর আমি নিজেকে বলি, হায়! তুমি কল্পরাজ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছো। সুতরাং নিজের লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করো।”
হে আল্লাহর বান্দারা, আমরা ঘোরের মধ্যে বাস করছি। আসুন আমরা তাওবা করি, অনুশোচনা করি আর আল্লাহর দিকে ফিরে যাই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00