📄 ভূমিকা
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি, তাঁর সাহায্য চাই। আমরা তাঁর মাগফেরাত (ক্ষমা) ও হেদায়াত (পথনির্দেশনা) কামনা করি। আমরা আমাদের নফসের অনিষ্ট ও খারাপ আমলের কুফল থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয় এবং হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। আল্লাহ বলেন:
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা প্রকৃত ভীতি সহকারে আল্লাহকে ভয় করো। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১০২)
“হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ইবাদত করো, যিনি তোমাদিগকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত ২১)
“হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন, আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত নারী ও পুরুষ। আর আল্লাহকে ভয় করো যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে কোন কিছু চেয়ে থাকো। এবং আত্মীয় পরিজনদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন আছেন।” (সুরা আন-নিসা, আয়াত ১)
“হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের আমল সংশোধন করবেন এবং গুনাহসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে।” (সুরা আল-আহযাব, আয়াত ৭০-৭১)
সবচাইতে নির্ভুল ও সঠিক কিতাব হলো আল্লাহর কিতাব। আর সর্বোত্তম আদর্শ হলো হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর আদর্শ। সবচাইতে খারাপ হলো বিদআত (দ্বীনে নতুন কিছু উদ্ভাবন), আর প্রত্যেক বিদআতই হলো পথভ্রষ্টতা。
প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোনেরা, আপনাদের জেনে রাখা প্রয়োজন যে, গুনাহ করার সাথে সাথে ক্ষমা চাওয়া ও আল্লাহর কাছে তাওবা করা ফরজ। তাওবা আল্লাহর রাস্তায় চলা মানুষের অনুসরণীয় পথ, মুমিনের রসদ। এটা দুনিয়া ও আখিরাতে সাফল্যের বড় পুঁজি। আন্তরিক তাওবার মাধ্যমেই কেবল আখিরাতে নাজাত ও পুরষ্কার মিলবে। তাওবাই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। তাওবা পাপরাশী মুছে দেয়, ভুল ত্রুটি ঢেকে রাখে, মানুষের হৃদয় ও মনকে সঠিক পথ দেখায়। এ কারণে সলফে সালেহীনরা নিয়মিত ভাল আমল করা সত্ত্বেও অল্প ঘুমাতেন, ভোরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন। তারা জানতেন যে তাদের আমলের আরও উন্নতি করার সুযোগ আছে। এজন্যই তাদের একজন বলেছিলেন, “আমাদের তাওবা আরো তাওবা দাবী করে।” আরেকজন বলেছিলেন, “অভিনন্দন তাকে যে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একটি সঠিক পদক্ষেপ নিতে পেরেছে।”
এই ছিল তাদের জীবন। পরবর্তী যুগের লোকেরা কামনা বাসনার পিছনে ছুটলো। তারা ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়ার মোহে ডুবে গেলো, তাদের কাছে আখেরাত হয়ে গেলো মূল্যহীন। তারা দিনে রাতে গুনাহ করতে লাগলো, কিন্তু উপলব্ধি করলো না যে আল্লাহ মহা প্রতাপশালী ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। যে ব্যক্তি পরম ক্ষমতাবান ও দয়াময়ের কাছে তাওবা করে না তার জন্য তো ব্যর্থতা ও বিফলতাই অনিবার্য হয়ে পড়ে।
সুতরাং হে আল্লাহর বান্দারা, আসুন আমরা গর্ব, অহংকার, হিংসা, ঘৃণা ও আত্মপ্রসাদ ইত্যাদি থেকে মুক্ত হয়ে খোলা ও পরিষ্কার মন নিয়ে আল্লাহর দিকে বারবার ফিরে আসি, যাতে করে আমরা দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জন করতে পারি।
এই বইতে আমি তাওবা, তার গুণাগুণ, শর্ত ও প্রাসংগিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। যদি আমি সঠিক বলি, তবে তা আল্লাহর রহমত। আর ভুল-ভ্রান্তির দায়ভার একান্তই আমার আর শয়তানের। প্রত্যেক অভিশপ্ত শয়তানের কাছ থেকে আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই। হে আল্লাহ, আমার এই প্রচেষ্টাকে শুধুমাত্র আপনার সন্তুষ্টির জন্য কবুল করুন। এর রচয়িতাকে আপনি ক্ষমা করুন। আপনিই সর্বশক্তিমান।
আবু মারইয়াম মাজদি ফাতহি আল সাইদ
📄 তাওবা এর আক্ষরিক অর্থ
আল-কামুস (বিখ্যাত আরবি অভিধান) অনুযায়ী, তাওবা শব্দের মানে গুনাহ থেকে ফিরে আসা। এই শব্দ ব্যবহার করা হয় যখন বান্দাহ গুনাহ করার পর তার রবের দিকে ফিরে আসে।
আল হালিমি (রঃ) বলেন, এর (তাওবা) ধরণ হলো এমন, যেন বান্দাহ আল্লাহর কাছ থেকে (গুনাহ করার মাধ্যমে) পালিয়ে গিয়েছিল এবং আবার তার প্রভুর কাছে ফিরে এসেছে। (আল মিনহাজ ফী শুয়াবুল ঈমান : ৩/২১)
📄 তাওবার প্রয়োজনীয়তা ও তার গুণাগুণ
আপনাদের জানা প্রয়োজন, অতীত ও বর্তমানের সমস্ত আলেমগণ সর্বসম্মতিক্রমে এই বিষয়ে একমত যে, ছোট বড় সমস্ত গুনাহ থেকে সাথে সাথে তাওবা করা ওয়াজিব। আল্লাহর নাযিলকৃত বাণীতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়:
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর সামনে তাওবা করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” (সুরা আন-নুর আয়াত ৩১)
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ তাআলার কাছে তাওবা করো, আন্তরিক তাওবা।” (সুরা আত-তাহরিম, আয়াত ৮)
"আর তোমরা নিজেদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। অতঃপর তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ করো। তাহলে তিনি তোমাদেরকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দান করবেন।” (সুরা হুদ, আয়াত ৩)
“তিনি তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন, গুনাহসমূহ মার্জনা করেন এবং তোমাদের কৃত বিষয় সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ অবগত আছেন।” (সুরা আশ-শুরা, আয়াত ২৫)
“অতঃপর যে স্বীয় অত্যাচারের পর তাওবা করে এবং সংশোধিত হয়, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।” (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত ৩৯)
“তারা কেন আল্লাহর কাছে তাওবা করে না, ক্ষমা প্রার্থনা করে না? আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, দয়ালু।” (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত ৭৪)
“কিন্তু যারা তাওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎ কর্ম করে, আল্লাহ তাদের গুনাহকে ভালো আমল দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সুরা আল-ফুরকান, আয়াত ৭০)
আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই বিষয়ে অসংখ্য হাদীস বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপ:
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন যে, “আল্লাহর শপথ! আমি প্রতিদিন সত্তরবারের বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই ও তাওবা করি।” (সহীহ বুখারী)
আম্মার ইবনে ইয়াসার থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন যে, “হে মানুষেরা! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো এবং ক্ষমা চাও। কেননা আমি প্রতিদিন একশত বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।” (সহীহ মুসলিম)
আবু মুসা আল-আশয়ারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন যে, “আল্লাহ রাতের বেলা তাঁর রহমতের হাত প্রসারিত করেন যাতে দিনের গুনাহগার বান্দাদের ক্ষমা করতে পারেন। আবার তিনি দিনের বেলা তাঁর রহমতের হাত প্রসারিত করেন যাতে রাতের গুনাহগার বান্দাদের ক্ষমা করতে পারেন। এইভাবে তিনি ক্ষমা করতে থাকবেন যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হয় (কেয়ামতের সময় ঘনিয়ে আসে)।” (সহীহ মুসলিম)।
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন যে, “সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবার আগ পর্যন্ত যে ব্যক্তিই তাওবা করবে, আল্লাহ তাকেই ক্ষমা করবেন।” (সহীহ মুসলিম)
ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন যে, “আদম সন্তানের যদি পাহাড় পরিমাণ সোনাও থাকে তবুও সে আরো চায়। এমন কি কবরে পৌঁছার আগ পর্যন্ত তার পেট সন্তুষ্ট হয় না। কিন্তু আল্লাহ তাকেই ক্ষমা করেন যে তাওবা করে।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন যে, “আল্লাহর কোন বান্দাহ যখন তাঁর দিকে ফিরে আসে এবং তাওবা করে, আল্লাহ তখন সেই মুসাফিরের চাইতেও বেশী খুশী হন, যে তার উট হারিয়ে ফেলেছে। উটের উপর ছিল তার খাদ্য-পানীয়-সম্বল। তখন সেই মুসাফির সব আশা হারিয়ে হতাশ হয়ে একটি গাছের ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম থেকে জেগে সে দেখে, তার উট তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আনন্দের আতিশয্যে সে তখন বলে উঠে, হে আল্লাহ আপনি আমার গোলাম, আমি আপনার মালিক (এই লোকটি যে পরিমাণ খুশি হয়, বান্দাহ তাওবা করলে আল্লাহ তার চাইতেও বেশি খুশি হন)।” (সহীহ বুখারী ও সহীh মুসলিম)
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন যে, “মৃত্যুশয্যায় উপনীত হবার আগ পর্যন্ত আল্লাহ তাঁর বান্দার তাওবা কবুল করেন”।
তাওবা সম্পর্কে সলফে সালেহীনদের বক্তব্য:
এক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রাঃ) কে এমন একটি পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো, যা সে করতে চেয়েছিল (কিন্তু করেনি)। তিনি লোকটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আবার যখন ফিরলেন তখন তার চোখে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। তিনি বললেন, “বেহেশতের আটটি দরজা আছে যার প্রতিটি খোলা হয় এবং বন্ধ করা হয় শুধুমাত্র তাওবার দরজা ছাড়া। একজন ফেরেশতা এই দরজা পাহারা দিচ্ছেন যাতে তা বন্ধ না হয়। সুতরাং তাওবা কর, হতাশ হয়ো না।”
তালাক ইবনে হাবীব (রঃ) বলেন, “একজন বান্দাহ কখনোই আল্লাহর হক (অধিকার) পরিপূর্ণ ভাবে আদায় করতে পারে না। তাই তোমরা সকাল সন্ধ্যা আল্লাহর কাছে তাওবা কর।”
সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যিব (রঃ) আল-কোরআনের আয়াত “যদি তোমরা সৎ হও, তবে তিনি তাওবাকারীদের জন্য ক্ষমাশীল।” (সুরা আল-ইসরা, আয়াত ২৫) উল্লেখ করতেন এমন ব্যক্তি সম্পর্কে যে পাপ করে এরপর তাওবা করে এরপর আবার পাপ করে এবং আবারো তাওবা করে।
মুজাহিদ (রঃ) বলেন, “যে ব্যাক্তি সকাল-সন্ধ্যা/দিনে রাতে আল্লাহর কাছে তাওবা করে না সে যালেমদের (অন্যায়কারীদের) অন্তর্ভুক্ত।”
লোকমান (আলাইহিস সালাম) তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন, “বৎস! তাওবা করতে দেরি করো না। কারণ মৃত্যু যে কোন মুহুর্তেই এসে যেতে পারে।"
আব্দুল্লাহ ইবনে হাবীব (রঃ) বলেন, “প্রতিবার গোনাহের সময় আল্লাহর যে ক্রোধ, তুমি কখনোই তা সহ্য করতে পারবে না। তাই সকাল সন্ধ্যা তাওবা কর।”
ফুযাইল ইবনে আয়ায (রঃ) জিহাদে যাওয়ার আগে মুজাহিদীনদের বলতেন, “তাওবার উপরে অটল থাকো। এটি তোমাকে এমন জিনিস থেকে রক্ষা করবে যা থেকে তোমার তলোয়ার তোমাকে রক্ষা করতে পারবেনা।”
হাসান (রঃ) বলতেন “হে আদম সন্তানেরা, গড়িমসি করো না। আজই তোমাদের দিন, আগামীকাল নয়। আমি এমন সব মানুষের সাথে মিশেছি যারা অর্থ সম্পদের চাইতে নিজেদের জীবন নিয়ে বেশী চিন্তিত ছিলেন।”
এই ছিল তাওবা সম্পর্কে আমাদের পূর্বসুরীদের অনুভূতি। তাঁরা বুঝতে পারতেন যে যদি কোন ব্যক্তি পুঁজি বিনিয়োগ করে লাভ ছাড়া তার পুরোটাই খুইয়ে বসে, তবে শোক করা ছাড়া তার উপায় থাকবে না। তদ্রুপ আমাদের এই জীবন মুল্যবান নিঃশ্বাসের যোগফল। এটি আমাদের বিনিয়োগকৃত পুঁজির মতো যা লাভ হিসেবে জান্নাত এনে দিবে। কিভাবে তাওবা ছাড়া কোন মানুষ এই বিনিয়োগের অপচয় করতে পারে?
একজন মানুষের যৌবন ও বার্ধক্য, সমৃদ্ধি ও দারিদ্র্য, সর্বাবস্থায় তাওবা করা জরুরী। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বলেন, “তাওবার ষ্টেশন হলো একজন মুসাফিরের প্রথম ষ্টেশন, মাঝের ষ্টেশন ও শেষের স্টেশন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাওবা তাকে ছেড়ে যায় না। যদি সে অন্য কোন ষ্টেশনে যায় তবে এই (তাওবার) ষ্টেশনও তার সাথে সাথে যায়। তাওবা বান্দার শুরু ও শেষ।” আল্লাহ বলেন, “মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (সুরা আন-নুর, আয়াত ৩১)
এই আয়াতটি একটি মাদানী সুরার অংশ, যা অবতীর্ণ হয় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও মুমিনগণ ঈমান, হিজরত ও সবরের কঠিন পরীক্ষা দেয়ার পর। এত কিছুর পরেও আল্লাহ তাদের সফলতার জন্য তাওবাকে শর্ত বানিয়েছেন।
📄 আন্তরিক তাওবা ও তার পূর্বশর্ত
আল্লাহ বলেন, “মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ তাআলার কাছে তাওবা করো, আন্তরিক তাওবা।” (সুরা আত-তাহরিম, আয়াত ৮)
ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন, “এর মানে হলো এমন সৎ ও দৃঢ় তাওবা যা আগের পাপরাশিকে মুছে দেয় এবং তাওবাকারীর মনে এমন অনুভুতির জন্ম দেয় যা ভবিষ্যতে তাকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে।” (তাফসীর ইবনে কাসীর: ৪/৩৯১)
আলেমদের মতে আন্তরিক তাওবা হলো:
নিজেকে তাৎক্ষণিকভাবে গুনাহ থেকে বিরত রাখা, ভবিষ্যতে আর গুণাহের পুনরাবৃত্তি না করার অংগীকার করা এবং অতীতে কৃত গুণাহের জন্য আন্তরিক অনুশোচনা করা। আর যদি কারো অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়ে থাকে, তবে তার প্রাপ্য (অর্থ, সম্পদ) মিটিয়ে দেয়া।
নিম্নে আন্তরিক তাওবা সম্পর্কে বিখ্যাত কয়েকজন সলফে সলেহীনদের উদ্ধৃতি দেয়া হলো:
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রাঃ) বলেন, “আন্তরিক তাওবা হলো গুণাহের দিকে আর না ফেরা, যেমন করে দুধ গাভীর ওলানে আর ফিরে যায় না।”
সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ) বলেন, “তাওবা কবুল হবার শর্ত তিনটি: তাওবা কবুল না হবার আশংকা, কবুল হবার আশা এবং (আল্লাহর) আনুগত্যের আকাঙ্ক্ষা।”
হাসান (রঃ) বলেন, “আন্তরিক তাওবা হলো পাপকে ঘৃণা করতে ভালবাসা এবং যখনই তা মনে পড়ে সাথে সাথে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।”
সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন, “আন্তরিক তাওবা হলো এমন যার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে সদুপদেশ দেয়।”
কালবী (রঃ) বলেন, “আন্তরিক তাওবা হলো মন থেকে আনুশোচনা করা, জিহ্বার মাধ্যমে ক্ষমা চাওয়া, পাপ ধ্বংস করা এবং আর কখনো নিশ্চিতভাবে গুণাহের দিকে ফিরে না যাওয়া।”
কুরযি (রঃ) বলেন, “তাওবার উপাদান চারটি। জিহ্বার মাধ্যমে ক্ষমা চাওয়া, শরীর থেকে পাপ মুছে ফেলা, পুনরায় গুনাহ না করার সংকল্প করা এবং অসৎ সঙ্গ পরিত্যাগ করা।”
ফুজাইল (রঃ) বলেন, “এটি হলো নিজের গুনাহকে এমন ভাবে চোখের সামনে রাখা, যেমন করে কোন ব্যক্তি তাকে সারাদিন দেখতে পায়।” (অর্থাৎ সব সময় নিজের গুণাহের জন্য লজ্জিত থাকা)
আন-নববী (রঃ) বলেন, “প্রতিটি পাপ থেকে তাওবা করা ফরজ। যদি এটি মানুষের অধিকার সম্পর্কিত না হয় তবে এর শর্ত তিনটি - পুরোপুরিভাবে গুনাহ পরিত্যাগ করা, আক্ষেপ ও আনুশোচনা বোধ করা এবং পুনরায় গুনাহ না করার সংকল্প করা। এই তিনটির কোন একটি উপাদান না থাকলে তাওবা কবুল হবে না।” (রিয়াদুস সালিহীন: ১৭)
যদি এটি কোন মানুষের অধিকার সম্পর্কিত হয় তবে অতিরিক্ত চতুর্থ আরেকটি শর্ত আছে, অন্য মানুষের প্রাপ্য ফিরিয়ে দেয়া (যদি তা অর্থ সম্পর্কিত হয়) অথবা ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে তার অধিকার ভঙ্গের দায় থেকে নিজেকে মুক্ত করা।
সুতরাং হে আল্লাহর বান্দারা, আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন প্রত্যেকেরই জীবনটাকে ভালভাবে কাজে লাগানো উচিত, শেষ বিচারের দিনকে স্মরণ করা উচিত। “যারা শিক্ষা গ্রহন করতে চায় ও শুকরিয়া আদায় করতে চায়, তাদের জন্য আমি দিন ও রাতকে সৃষ্টি করেছি পরিবর্তনশীলরুপে।” (সুরা আল-ফুরকান, আয়াত ৬২)
হাসান (রঃ) এই আয়াত সম্পর্কে বলেন, “যে রাতে নিজেকে সংশোধন করতে ব্যর্থ হলো, তার জন্য দিন আসে। আর যে দিনে নিজেকে সংশোধন করতে ব্যর্থ হলো, তার জন্য রাত আসে।” তিনি আরো বলেন, “একেকটি দিন মানুষকে ডাকে এবং বলে, 'হে মানুষেরা! আমি একটি নতুন দিন। আজকের দিনে যা করা হবে আমি তার স্বাক্ষী।”
ঈসা (আলাইহিস সালাম) বলেন, “দিন ও রাত হলো সম্পদের গুদাম, সিন্দুক। খেয়াল রেখো তুমি তাতে কি রাখছো। রাত ও দিনকে সঠিকভাবে কাজে লাগাও।”
এই হলো আন্তরিক তাওবা সম্পর্কে আলেমদের বক্তব্য। গভীরভাবে ভাবুন, দেখুন তা কতটা কঠিন। সেটি অর্জন করার চেষ্টা করুন।
তাওবা
নীচে কিছু মানুষের ঘটনা উল্লেখ করা হলো যারা আন্তরিকভাবে তাওবা করেছেন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জন করেছেন:
আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন যে, “তোমাদের পূর্বযুগে একজন মানুষ ছিল যে নিরানব্বইটি খুন করলো এবং তাওবা করতে চাইলো। তাই সে ঐ এলাকার সবচেয়ে বড় আলেমের কাছে গেলো। তাকে জিজ্ঞেস করলো তাওবা করার কোন সুযোগ আছে কিনা। সেই আলেম জবাব দিলেন, না নেই। লোকটি তখন সেই আলেমকেও হত্যা করে একশত পূর্ণ করলো। এরপর লোকটি আরেকজন আলেমের কাছে গেলে তিনি তাকে বললেন এই এলাকা ছেড়ে অন্য আরেকটি এলাকায় যেতে যেখানে মানুষ আল্লাহর ইবাদত করছে। সে তখন যাত্রা শুরু করলো। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছার আগে মাঝপথে তার মৃত্যু হয়। তখন রহমত আর গজবের ফেরেশতারা তাকে নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেন। রহমতের ফেরেশতারা বললেন, সে তাওবা করেছে এবং ঐ শহরের দিকে যাত্রা করেছে। গজবের ফেরেশতারা বললেন, সে তার সারা জীবনে কোন ভাল কাজ করেনি। তখন মানুষের চেহারায় একজন ফেরেশতা এলেন এবং তাদের বললেন দুই জায়গার দুরত্ব মাপতে। তারা মাপলেন। দেখা গেলো সে তার বাড়ির চাইতে তার নতুন গন্তব্যের দিকে অধিকতর নিকটবর্তী। তখন রহমতের ফেরশতারা তার রুহ নিয়ে গেলেন।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
একই হাদীসের আরেকটি বর্ণনায় আছে, আল্লাহ তার গন্তব্যের নিকটবর্তী জমিনকে আদেশ দিলেন কাছে আসার জন্য আর অন্য অংশকে বললেন দূরে সরে যাওয়ার জন্য। এরপর তারা মেপে দেখলেন, সে ছিল তার (নতুন) গন্তব্যের দিকে এক হাত বেশী এগিয়ে। তাকে মাফ করে দেয়া হলো।
ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, একবার জুহাইনা গোত্রের এক মহিলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কাছে এলো। সে ছিল ব্যভিচারের কারণে গর্ভবতী। সে বললো, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি এমন একটি পাপ করেছি যার জন্য আমার উপর ইসলামী শরিয়তের হদ (শাস্তি) প্রযোজ্য। সুতরাং আপনি আমাকে শাস্তি দিন।” রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার অভিভাবককে বললেন তার যত্ন নিতে এবং বাচ্চা প্রসব করার পর তাকে নিয়ে আসতে। তার অভিভাবক তাই করলেন। তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেই মহিলার কাপড় শক্ত করে বাঁধলেন এবং তার উপর হদ্ কায়েম করলেন। এরপর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেই মহিলার জানাজা পড়লেন।
হজরত ওমর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি একজন ব্যভিচারী মহিলার জানাজা পড়ছেন?”
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “তার তাওবা এত খাঁটি ছিল যে তা যদি মদিনার সত্তরজন মানুষের মাঝে ভাগ করে দেয়া হতো, তবুও তা যথেষ্ট হতো। সে নিজেকে আল্লাহর জন্য সপে দিয়েছিল। তুমি কি তার চাইতে উত্তম আর কাউকে পাবে?”
বুরাইদা ইবনে খুসাইব (রঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, মাইজ ইবনে মালিক (রাঃ) রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কাছে এলেন এবং বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি নিজের উপর যুলুম করেছি। আমি ব্যভিচার করেছি। আমাকে (শাস্তি দিয়ে) পবিত্র করুন।” রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে প্রত্যাখ্যান করলে তিনি পর পর তিন দিন এলেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি গর্ত খুড়ে তাঁকে সেখানে দাঁড়াতে বললেন। তিনি দাঁড়ালে তাঁকে পাথর মেরে হত্যা করা হলো। লোকেরা তাঁর সম্পর্কে দুই ধরণের মতামত দিতে লাগলো। একদলের মতে, তিনি ধ্বংস হয়ে গেছেন আর তার গুনাহ তাঁর ভাল কাজগুলোকে নষ্ট করে দিয়েছে। অন্য দলের মতে তাঁর চাইতে খাঁটি তাওবা আর কারো হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “তাঁর তাওবা এতোটাই খাঁটি ছিল যে তা যদি গোটা জাতির মাঝে ভাগ করে দেয়া হত তবুও তা তাদের জন্য যথেষ্ট হতো।”
সুতরাং, হে আল্লাহর বান্দারা! আপনারা দেখতেই পারছেন কিভাবে খাঁটি তাওবা বিশাল পুরষ্কার নিয়ে আসে। তাই সকাল সন্ধ্যা আমাদের আল্লাহর রহমত লাভের দিকে মনোযোগী হওয়া উচিৎ।
শেষের দুটি ঘটনা সম্পর্কে ইমাম ইবনে রজব (রঃ) বলেন, “একজন তাওবাকারী বান্দাহ বারংবার আত্মগ্লাণিতে ভোগে, কারণ সে নিজের গুণাহের মর্ম বুঝতে পারে। দেখুন এই মানুষগুলো কি রকম অনুশোচনায় ভুগেছিলেন যে নিজেদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে মৃত্যুকে কবুল করে নিয়েছিলেন।”
হ্যাঁ, তাঁরা জানতেন যে, শাস্তি গুনাহকে মুছে দেয়। তাই তারা পরকালের শাস্তির জন্য অপেক্ষা না করে দুনিয়াতেই নিজেদের শুদ্ধ করে নিয়েছিলেন।
ইবনুল কাইয়্যিম (রঃ) বলেন, “যদি তোমরা তাওবাকারী বান্দাহ দেখতে চাইতে তবে দেখতে পেতে আল্লাহর বাণী 'তোমরা আল্লাহ তাআলার কাছে তাওবা করো, আন্তরিক তাওবা' শুনে শেষ রাতে তার চোখ আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে চেয়ে ক্লান্ত। তোমরা আরো দেখতে পেতে তার খাওয়া-দাওয়া খুবই সামান্য, সে শোকে ভারাক্রান্ত। তার শরীর ক্রমাগত রোজা রাখার কারণে দুর্বল, পা দুটি নামাজে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত। সে হতো শারীরিক ও আধ্যাত্মিকভাবে নিঃশেষিত।”