📄 মুসলিম উম্মাহ মৃত্যুঞ্জয়ী এক জাতি
পূর্বে আমরা আলোচনা করেছি যে, পৃথিবীতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের শাশ্বত বিধানের দাবি হল মুসলিম উম্মাহ কখনোই নিঃশেষ ও বিলুপ্ত হবে না; বরং সর্বদাই প্রতিষ্ঠা ও উত্থানের নিরন্তর সংগ্রাম নিয়ে থাকবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠার পর যেমন পতন এসেছে ও আসছে, প্রতিটি পতনের পরও অবশ্যই আসবে নবপ্রতিষ্ঠার পালা। কাফির-গোষ্ঠীর শক্তি ও ক্ষমতা কতটা বৃদ্ধি পেল, মুসলিম জাতি কতটা দুর্বল হয়ে পড়ল, এসব বিবেচনা এখানে একেবারেই গৌণ। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তো সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন: “যারা কুফর অবলম্বন করবে, দেশে দেশে তাদের (সাফল্যপূর্ণ) বিচরণ যেন তোমাকে কিছুতেই ধোঁকায় না ফেলে। (এটা) সামান্য ভোগ (যা তারা লুটছে), অতঃপর তাদের ঠিকানা জাহান্নাম, আর তা নিকৃষ্টতম বিছানা।” [সুরা আল-ইমরান : ১৯০-১৯৭]
📄 এ লড়াই হক-বাতিলের লড়াই
মুসলমানদের সঙ্গে অন্যদের যুদ্ধ কোন ব্যক্তি-লড়াই বা রাষ্ট্রীয় লড়াইকে প্রতিবিম্বিত করে না; বরং এ লড়াই হচ্ছে বিশ্বাসের লড়াই, হক ও বাতিলের লড়াই, ন্যায়-অন্যায়ের চিরন্তন যুদ্ধ। এ যুদ্ধকে সরল করে বললে—আল্লাহর বন্ধু ও শয়তানের দোসরদের লড়াই। লড়াইয়ের প্রকৃত রূপ যখন এই, তাহলে এর ফলাফল কী হতে পারে? শক্তির যতই তারতম্য থাকুক, এ যুদ্ধে জয়লাভ করবেই আল্লাহর ও তাঁর বন্ধুদের দল, না ইবলিস ও তার তাঁবেদারী দল? আল্লাহর দলের সৈনিকদের শক্তি ও সামর্থ্য কতটা দুর্বল অথবা শয়তানী বাহিনীর কাছে শক্তি ও লড়াইয়ের উপকরণের কতটা আধিক্য, তা এখানে মূল বিবেচ্য নয়; জয়-পরাজয়ের মূল নিয়ামক হল উভয় দলের পরিচিতি।
ইতিহাস ও ইসলামের অতীত যুদ্ধগুলোর পরিবেশ-প্রতিবেশ ও ফলাফল বিবেচনায় রাখলে আমাদের এ দাবির স্বপক্ষে অত্যন্ত উৎকৃষ্ট উদাহরণ ও প্রমাণ পাওয়া যাবে। বলুন, অতীতের যতগুলো যুদ্ধে মুসলিম জাতি জয়লাভ করেছে, পূর্বানুমান ও সামরিক শক্তি-বিবেচনায় কি সেসব যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় প্রত্যাশিত ও স্বাভাবিক ছিল? উদাহরণস্বরূপ কাদিসিয়ার যুদ্ধের কথাই ধরুন। তৎকালীন প্রবল পরাক্রান্ত পারসিক বাহিনীর দুই লক্ষ প্রশিক্ষিত সৈন্যের বিরুদ্ধে মাত্র বত্রিশ হাজার সদস্যের মুসলিম বাহিনীর পরিণতি স্বাভাবিক বিবেচনায় কী হতে পারত?! অতীত বিবেচনা, সামরিক অনুমান, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি—কোন বিবেচনাতেই কি কাদিসিয়ার ইসলামী বিজয়কে সম্ভাব্য বলে স্বীকৃতি দেওয়া যায়? তাও আবার কোথায়? সুদূর পারস্যের মাটিতে, পারসিক বাহিনীর ঘরের মাঝে!
কিংবা দেখুন ইয়ারমুকের যুদ্ধের কথা। একদিকে তৎকালীন আরেক পরাক্রান্ত রোম বাহিনী, অপরদিকে মাত্র ঊনত্রিশ হাজার মুসলমান। সামরিক শক্তির বিচারে কি মুসলিম বাহিনীর বিজয়কে সম্ভাব্য বলা যায়? কিংবা দেখুন একবার নয়, দু’বার নয়; একটানা আশির দিনব্যাপী শুষতার (Shushtar) রণাঙ্গনে পঞ্চাশ হাজার পারসিক সৈনিকের বিরুদ্ধে ত্রিশ হাজার মুসলিম সৈন্যের পর্যুদস্ত করার সেই অনন্য উপাখ্যান? তাও আবার পারস্যের ভূমিতে?! আন্দালুসের ইতিহাসই-বা বাদ দেবেন কেন? ওয়াদিয়ে বারবাটের যুদ্ধে এক লক্ষ গোথ সৈন্যের বিরুদ্ধে তারিক বিন যিয়াদের মাত্র বারো হাজার মুসলমানের জয়লাভকে আপনি কোন বিবেচনায় স্বাভাবিক বলবেন?!
কাদিসিয়া, ইয়ারমুক, শুষতার বা ওয়াদিয়ে বারবাট; বরং ইসলামী ইতিহাসের প্রতিটি বিজয় কেবল বর্তমান সামরিক অনুমান নয় বরং অতীত বিবেচনায়ও যদি অসম্ভব নাও হয়, সুকঠিন যে ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই ধারাবাহিক বিজয়-ঘটনা ইতিহাসের এমন এক রহস্যালোকের অধ্যায়, কেবল একটি উত্তর ব্যতিরেকে যার কোন সমাধান আমাদের কাছে নেই। আর তা এই যে, আমরা মুসলমানগণ মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি ও জানি, কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন স্বয়ং আল্লাহ্ তা'আলা!
“এবং (হে নবী!) তুমি যখন (তাদের ওপর মাটি) নিক্ষেপ করেছিলে, তখন তা তুমি নিক্ষেপ করোনি; বরং আল্লাহ্ই নিক্ষেপ করেছিলেন।” [সূরা আনফাল: ১৭]
“আল্লাহ্ চাইলে নিজেই তাদের হঠিয়ে দিতে পারতেন; কিন্তু (তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিলেন এ জন্য যে,) তিনি তোমাদের কতককে কতকের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান।” [সূরা মুহাম্মাদ: ০৪]
সুতরাং আল্লাহ্ তা'আলা কাফিরদের বিরুদ্ধে মুমিনদের যুদ্ধে মুমিনদের পরীক্ষা করেন। আল্লাহ্র পক্ষ ত্যাগকারী কাফির-মুনাফিকদের বিরুদ্ধে, ইহুদি-খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে কিংবা পৃথিবীর অন্য যে কোন জাতি, যারা আল্লাহ্র একত্ববাদকে অস্বীকার করে এবং মুসলমানদের ভূখণ্ডে আগ্রাসন চালায়, তাদের সবার বিরুদ্ধে যুদ্ধে মহা পরাক্রমশালী সত্তা আল্লাহ্ তা'আলাই আমাদের সাহায্যকারী। এটা তো আমাদের প্রতি দয়াময় আল্লাহ্র পরম দয়া, করুণা ও অনুগ্রহ যে, তিনি আমাদেরকে তাঁর সৈনিক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আমাদের ভূমিকা তো হল—কাফিরদের সম্মুখে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিচালনা—ব্যাস, এতটুকু বিনিময়ে আমরা লাভ করি 'আযরে আযীম' ও মহা পুরস্কার। মুসলমানদের মন-মানসিকতা জুড়ে এ বিষয়টাই বদ্ধমূল থাকা উচিত এবং সর্বশেষ যে পতনের কথা আমরা আলোচনা করেছি, তার পরবর্তী উত্থানের বিনির্মাণ প্রচেষ্টায় ভূমিকা রাখতে সচেষ্ট হওয়া উচিত।