📄 আমাদের যাপিত কালের শ্রেণিবিন্যাস
অনেক মুসলমানের মনেই এই আত্মজিজ্ঞাসা জাগে যে, উত্থান-পতন কিংবা প্রতিষ্ঠা ও বিলুপ্তির বিগত দিনের পর্যায়ক্রম অনুযায়ী যাপিত কালের মুসলিম নাগরিক হিসেবে আমরা এখন কোন্ স্তরে অবস্থান করছি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে যে প্রকৃত বাস্তবতা আমাদের সামনে সুস্পষ্টরূপে ধরা দেয় তা হল, ইসলামী উম্মাহ এখন অধঃপতন ও পতনের এক দীর্ঘতর সময় অতিক্রম করছে। মুসলিম জাতির মাঝে এখন বিরাজ করছে প্রচণ্ড দুর্বলতা ও বিভেদ-বিচ্ছিন্নতা। আর বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে উসমানী খেলাফতের পতনের মাধ্যমে সরাসরি যে পতন দৃশ্যমান হয়েছিল, তা ছিল ইসলামী ইতিহাসের চলমান স্বাভাবিক ধারারই একটি এবং মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের শাশ্বত ও চিরন্তন রীতিরই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এভাবে সবশেষে পতনের সঙ্গে এমন দুটি বিষয় যুক্ত হয়েছে, যা ইতিপূর্বে কোন ইসলামী রাষ্ট্রের বেলায় হয়নি এবং ইসলামী ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের পতনের কোনটির ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটেনি। বিষয়দুটি হল—
১. খেলাফতের বিলুপ্তি। ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো মুসলমানগণ এমন কোন রাষ্ট্র-বঞ্চিত হয়েছে, যা তাদের একতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখবে। মুসলিম উম্মাহর সুদীর্ঘ ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় অনেক চড়াই-উতরাই এসেছে, এসেছে আত্মবিস্মৃত পরিস্থিতি, পতন ঘটেছে বিভিন্ন ইসলামী সাম্রাজ্যের; কিন্তু হিজরী প্রথম শতাব্দীর উমায়্য সাম্রাজ্যকাল থেকে শুরু করে হিজরী চতুর্দশ শতাব্দীর উসমানী খেলাফতের পতনকাল পর্যন্ত কোনোকালেই মুসলিম উম্মাহর মানসপট থেকে খেলাফতের রূপ ও স্বরূপ পুরোপুরি অদৃশ্য হয়নি। এ দীর্ঘ চৌদ্দ শ' বছর ধরে ইসলাম ছিল ধর্ম ও রাষ্ট্রের সমান্তরাল রীতি।
২. ইসলামী শরীয়াব্যবস্থার বিলুপ্তি। পূর্বের কোন পতনকালেই যেমন খেলাফতের বিলোপ সাধন হয়নি; তেমনই কোন কালের কোন ইসলামী রাষ্ট্রই ইসলামী শরীয়ামুক্ত ছিল না। ইসলামী রাষ্ট্রসমূহের পতনের যে কোন যুগে মুসলিম জাতি যতই অবক্ষয় ও অধঃপতনের শিকার হোক না কেন, শরীয়াব্যবস্থা কখনোই পুরোপুরি বাতিল বা অদৃশ্য হয়নি। হ্যাঁ, কখনো কখনো ইসলামী শরীয়তের বিশেষ কোন শাখার প্রায়োগিক অংশে সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে কিংবা স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু শরীয়তকে এক পাশে সরিয়ে রেখে আপন দৃষ্টিভঙ্গির নিরিখে অধিকতর নমনীয় ও উপযোগী মানব রচিত জীবনব্যবস্থার বাস্তবায়ন করার প্রয়োজনে কখনোই এভাবে ব্যাপকহারে উৎসাহিত হয়নি।
এ দু'টি কার্যकारण বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংস্কার ও পুনর্গঠনের কার্যক্রমকে বহুলাংশে জটিল ও কঠিন করে তুলেছে। কিন্তু পূর্বেও যেমন ছিল, এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও সংস্কার ও পুনর্গঠন মোটেও অসম্ভব নয়। কেননা, ইসলামের জাগরণ ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে অসম্ভব মনে করা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সেই শাশ্বত সুন্নাহর পুরোপুরি সাংঘর্ষিক, যার সারমর্ম হল—কেয়ামত পর্যন্ত ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার রাজপথ উন্মুক্ত থাকবে।
অধিকন্তু বর্তমানে নতুন করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অনেক অনেক পূর্বাভাস চারিদিকে দৃশ্যমান হচ্ছে। ১৩৪২ হিজরীতে (১৯২৪ খৃষ্টাব্দে) উসমানী খেলাফতের পতনের পর ইসলামী বিশ্বের সর্বত্র না হলেও অধিকাংশ ভূখণ্ডে এক বিরাট নিম্নগামিতা ও অধঃপতন সংঘটিত হয়েছে। উসমানী খেলাফতের পতনের পর এক শতাব্দী ধরে প্রায় সকল মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর মডেল ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তির ওপর। সত্তর দশকের গোড়া পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন ছিল। কিন্তু সত্তর দশকের মধ্যভাগ হতে আমাদের বর্তমান কাল পর্যন্ত ইসলামী উম্মাহর প্রতিটি প্রান্তে নতুন করে এক চেতনা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
মসজিদগুলোর দিকে একনজর তাকিয়ে দেখুন ক্রমবর্তমান মুসল্লির সংখ্যা, বিশেষ করে যুবক শ্রেণির ব্যাপক উপস্থিতি; ইসলামী বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে রাস্তা-ঘাটে হিজাব পরিহিতা পর্দানাশীন নারীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা, আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইসলামিক সেন্টারের ব্যাপক বিস্তার; তিন শ' বছরেরও অধিক সময় ধরে খ্রিস্টান ও কমিউনিস্টি শাসনের পর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে ইসলামের নব জোয়ার—এক পলকে দেখা এক নবপ্রতিষ্ঠার পূর্বাভাসই দিচ্ছে।
টিকাঃ
৪৮৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৭৫২, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০৪।