📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 শরীফ ইদরীসী রহ.

📄 শরীফ ইদরীসী রহ.


তার পুরো নাম মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ বিন ইদরীস ইদরীসী হাসান আততালিবী। জন্ম ৪৯৩ হিজরীতে। তিনি ছিলেন বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিশারদ। সিউটায় জন্মগ্রহণ করলেও শিক্ষা-দীক্ষা ও বেড়ে ওঠা কর্ডোভায়। ন্যায়নিষ্ঠভাবে শরীফ ইদরীসীকে মুসলিম ভূগোলবিদগণের স্তম্ভ বলে গণ্য করা হয়। তিনি আমাদের জন্য রেখে গেছেন এক সুবিশাল ভূগোলকোষ, তার কালজয়ী গ্রন্থ— ‘নুযহাতুল মুশতাক্ব ফী ইখতিরাক্বিল আফাক্ব’ (نزهة المشتاق في اختراق الآفاق)।

তিনি আন্দালুস উপদ্বীপ চষে বেড়িয়েছেন এবং প্রচুর সফর করেছেন। তিনি ফ্রান্স ও দক্ষিণ ইংল্যান্ডের উপকূলীয় অঞ্চলেও পৌঁছেছিলেন। এরপর তিনি আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে মরক্কোয় গেছেন এবং মরক্কোর উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলে সফর করেন। কিছুদিন তিনি মাররাকিশে বসবাস করেন, কিছুদিন বসবাস করেন কন্সটানটিনোপলে। এরপর তিনি প্রাচ্যে সফর করেন এবং এশিয়া মাইনর অঞ্চলে যান। বিস্তৃত ও সুগভীর ভৌগোলিক জ্ঞান বিন্যাসই তার এসব ভ্রমণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল এবং তার অমর রচনা ‘নুযহাতুল মুশতাক্ব’ সংকলনে প্রাথমিক ভূমিকাস্বরূপ কাজ করেছিল।

সিসিলিয়া দ্বীপে এসে শরীফ ইদরীসীর ভ্রমণ শেষ হয়। সেখানে সিসিলিয়া দ্বীপের তৎকালীন শাসক দ্বিতীয় রজার নিজ প্রাসাদে তাকে স্বাগত জানান এবং প্রচুর উপঢৌকন প্রদানের পাশাপাশি তাকে মানচিত্র তৈরির দায়িত্বভার অর্পণ করেন। সিসিলিয়ায় অবস্থানকালে ইদরীসি বিশ্বের এমন একটি মানচিত্র অঙ্কনের পরিকল্পনা করেছিলেন, যা নিকট অতীতেও সবচেয়ে' সূক্ষ্ম ও শ্রেষ্ঠ মানচিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

এরপর তিনি ভূগোল বিষয়ে একটি ব্যাপক ও বিস্তৃত গ্রন্থ রচনা করেন এবং তাতে তৎকালীন আবিষ্কৃত বিশ্বের নানা তথ্য উপস্থাপন করেন। গ্রন্থটিতে তৎকালীন বিশ্বের ভূখণ্ড ও রাষ্ট্রসমূহের পরিস্থিতি ও চিত্র, সাগর-পাহাড়, তৎকালীন বিস্ময়কর নিদর্শনাদির বিবরণসহ প্রতিটি এলাকার অধিবাসীদের অবস্থা, ধর্ম, পোশাক, ভাষা ইত্যাদির বিবরণও প্রদান করা হয়েছে। পনের বছর সময় ব্যয় করে তিনি গ্রন্থটি রচনা করেন এবং ৫৪৯ হিজরীতে (১১৫৪ খৃষ্টাব্দে) এর সংকলন সমাপ্ত করেন। এই কালজয়ী গ্রন্থ সম্পর্কে আল্লামা যিরিকলী মন্তব্য করেছেন, তার এ গ্রন্থটি ইউরোপ ও ইটালিয়ান অঞ্চলসমূহের বিবরণ সম্পর্কে আরবীতে লেখা সবচেয়ে' বিশুদ্ধ গ্রন্থ। প্রতীচ্য সম্পর্কে যেসব আরব আলিম কলম ধরেছিলেন, তারা সকলেই তার এই গ্রন্থ থেকে তথ্য গ্রহণ করেছেন।

ইদরীসীর বিখ্যাত রচনাসমূহ হল:
* নুযহাতুল মুশতাক্ব ফী ইখতিরাক্বিল আফাক্ব।
* আল-জামি' লি-সিফাতি আশতাতিন নাবাত।
* রাওজুল উনস ওয়া নুযহাতুন নাফস।
* উনসুল মুহাজ ওয়া রাওজুল ফরাজ।
এ ছাড়াও তিনি রূপার গোলকের ওপর পৃথিবীর মানচিত্র অঙ্কন করেছিলেন। শরীফ আল-ইদরীসী ৫৬০ হিজরীতে (১১৬৬ খৃষ্টাব্দে) মৃত্যুবরণ করেন।

টিকাঃ
০০৭. পূর্ব আলজেরিয়ার একটি নগরী।
৫০৫. ইদরীসী, আলআ’লাম, ৭/২৪।
৫০৬. ইদরীসীর ‘আল-জামি' লি-সিফাতি আশতাতিন নাবাত’ গ্রন্থটিতে ৫৯০টি ভেষজ উদ্ভিদের আলোচনা করা হয়েছে। বিখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী ইবনুল বাইতার তার এ গ্রন্থের উপরই নির্ভর করেছেন। ইদরীসী যদি ভূগোলশাস্ত্রে তার সুবিশাল কর্মের জন্য খ্যাতি লাভ না করতেন, নিশ্চিত করেই তার নাম পৃথিবীখ্যাত শ্রেষ্ঠতম উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের তালিকায় লিপিবদ্ধ হত।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 লিসানুদ্দীন ইবনুল খতীব রহ.

📄 লিসানুদ্দীন ইবনুল খতীব রহ.


তার পুরো নাম মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ বিন সাঈদ আল-লিসানি। তিনি ছিলেন একাধারে উজির, ঐতিহাসিক ও প্রাজ্ঞ সাহিত্যিক। তার পূর্বপুরুষগণ 'বনূ উযীর’ বা মন্ত্রীপরিবার নামে পরিচিত ছিল। জন্ম ৭১৩ হিজরীতে (১৩১৩ খৃষ্টাব্দে)। জন্ম ও বেড়ে ওঠা গ্রানাডাতে। গ্রানাডার সুলতান আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন ইসমাঈল এবং পরবর্তীতে তার পুত্র আল-গণী বিল্লাহ মুহাম্মদ তাকে উজির নিয়োগ করেন এবং তাকে উচ্চতর মর্যাদা প্রদান করেন। কিন্তু বিরুদ্ধপক্ষের কুচক্রী ও পরনিন্দায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি মাগরেরবের তৎকালীন মারীনী সুলতান আবদুল আযীয বিন আলী মারীনীর কাছে বার্তা পাঠিয়ে তার রাষ্ট্রে চলে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

এরপর তিনি গোপনে আন্দালুস ত্যাগ করে তিলিমসানে চলে যান। সুলতান আবদুল আযীয তাকে পূর্ণ মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে স্বাগত জানান এবং ইবনুল খতীবের সন্তান ও পরিবারকে নিয়ে আসতে একটি প্রতিনিধিদল গ্রানাডায় পাঠান। এরপর ইবনুল খতীব ফেয এলাকায় বসবাস করতে থাকেন।

ঐতিহাসিক মাক্কারী তার সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি ছিলেন বিখ্যাত উযীর লিসানুদ্দীন, যার সুনাম ও সুখ্যাতি প্রাচ্যে-প্রতীচ্যে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। গদ্য হোক বা পদ্য; চিকিৎসাবিজ্ঞান কিংবা জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্তৃত অন্যান্য শাখা, সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন আদর্শ ও দৃষ্টান্ত। তার রচনাবলিই এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। তিনি ছিলেন আলিমকুলের পতাকাবাহী।

সুলতান আব্দুল আযীযের মৃত্যুর পর তার পুত্র সাঈদ বিল্লাহ তার স্থলাভিষিক্ত হন। কিন্তু তিনি পদচ্যুত হন এবং মাগরেরবের শাসনভার গ্রহণ করেন সুলতান আল-মুসতানসির। সুলতান আল-মুসতানসিরের শাসনামলে গ্রানাদার শাসক আল-গণী বিল্লাহ শর্ত দেন যে, ইবনুল খতীবকে তার হাতে তুলে দিতে হবে। শর্ত মতে ইবনুল খতীবকে গ্রেফতার করে ফেয নগরীতে বিচার করা হয়। সেখানে তাকে ধর্মত্যাগ ও জিন্দিক মতবাদ গ্রহণের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। সভায় উপস্থিত ফকীহগণের কেউ কেউ তাকে হত্যার ফতোয়া প্রদান করেন। এরপর তাকে পুনরায় জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কিছু দুষ্কৃতিকারী তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে। এভাবে ৭৭৬ হিজরীতে (১৩৭৪ খৃষ্টাব্দে) নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করেন লিসানুদ্দীন ইবনুল খতীব রহ.।

তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হল:
* আল-ইহাতা ফী আখবারি গারনাতা।
* আমালুল আ'লাম ফী মান বুইআ ইবনুল ইখতিজাম ফী মুলুকিল ইসলাম।
* আল-লামহাতুল বাদরিয়্যা ফী আদ-দাওলাতিন নাসরিয়্যা।
* রাকমুল হুলাল ফী নাযমিদ দুয়াল।
* মুকাদ্দিমা তুস-সায়িল আনিল মারাজিল হা-ইল।
* রাওজাতুত তা'রীফ বিল হুব্বিশ শারীফ।
* আমালু মান তাব্বা লিমান আহাব্বা।

টিকাঃ
৫০৯. লিসানুদ্দীন ইবনুল খতীব-এর বিস্তারিত জীবনবৃত্তান্ত জানতে দেখুন 'আল’হাতা ফী আখবারি গারনাতা’ গ্রন্থের ভূমিকা।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 ইবনে বতুতা রহ.

📄 ইবনে বতুতা রহ.


তার পুরো নাম শামসুদ্দীন আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মদ বিন ইবরাহীম আল-লাওয়াতী আত-তানজী। তিনি ৭০৩ হিজরীতে (১৩০৪ খৃষ্টাব্দে) তানজাহ জন্মগ্রহণ করেন। বংশগত দিক থেকে তিনি ছিলেন বিখ্যাত বার্বার গোত্র লিওয়াতা বংশোদ্ভূত। ইবনে বতুতা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আরব পরিব্রাজক হিসেবে গণ্য করা হয়। দীর্ঘ আটাশ বছর তিনি তৎকালীন আবিষ্কৃত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তার এই দীর্ঘ ভ্রমণের সূচনা হয় মাতৃভূমি ত্যাগের মাধ্যমে। তিনি মিশর, আরব উপদ্বীপ, শাম, পারস্য, বাহরাইন, ওমান, পূর্ব আফ্রিকা, এশিয়া মাইনর, ক্রিমিয়া, এবং ভলগা নদীর অববাহিকা সফর করেন।

এরপর তিনি পৌঁছলেন ভারতবর্ষে। সেখানে আট বছর অবস্থান করার পর মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও চীন সফর করেন। ১৩৪৬ খৃষ্টাব্দে তিনি তানজাহ ফিরে আসেন। এরপর তিনি আরও দু'বার সংক্ষিপ্ত পরিভ্রমণে বের হয়েছিলেন। প্রথমবার ১৩৫০ খৃষ্টাব্দে আন্দালুসের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং দ্বিতীয়বার ১৩৫২ খৃষ্টাব্দে সুদান ও মধ্য আফ্রিকায়। ১৩৫৯ খৃষ্টাব্দে তিনি ফেয নগরীতে প্রত্যাবর্তন করেন। সেখানে তিনি তার বিশ্ববিখ্যাত ভ্রমণবৃত্তান্ত 'তুহফাতুন নুযযার ওয়া গারাইেবুল আমছার ওয়া আজাইেবুল আসফার' (যা ইবনে বতুতার সফরনামা নামে পরিচিত) -এর শ্রুতলিপি কাজ সমাপ্ত করেন।

ইবনে বতুতা তার সুদীর্ঘ পরিব্রাজক-জীবনে প্রায় এক লক্ষ বিশ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিলেন। সেই যুগের যাতায়াত-ব্যবস্থা বিবেচনা করলে এটি ছিল এক বিস্ময়কর সংকল্প ও মানসিক দৃঢ়তার পরিচয়। ইবনে বতুতার সফরনামার স্বাতন্ত্র্য হল, তিনি যা কিছু দেখেছেন, শুনেছেন এবং উপলব্ধি করেছেন তার সবটাই নিখুঁত ও সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন। ইবনে বতুতা ৭৭৯ হিজরীতে (১৩৭৭ খৃষ্টাব্দে) মাররাকিশে ইন্তেকাল করেন।

টিকাঃ
৮৮৫. আরব সপ্ত-পরিব্রাজক হলেন, আলমাসুদী, ইদ্রীসী, ইবনে জুবায়ের, আলহাজ্বী, ইয়াকুত, আলবিরুনী ও ইবনে বতুতা।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 ইবনুল বান্না মাররাকিশী রহ.

📄 ইবনুল বান্না মাররাকিশী রহ.


তিনি হলেন শায়খ মুহাম্মদ আবুল আব্বাস আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বিন উসমান ইবনুল বান্না আল-আযদী মাররাকুশি। তার পিতা রাজমিস্ত্রী ছিলেন বিধায় তিনি ইবনুল বান্না নামে পরিচিতি লাভ করেন। জন্ম ৬৭৩ হিজরীতে (১২৭৬ খৃষ্টাব্দে) মাররাকিশে।

তার রচিত বিখ্যাত কয়েকটি গ্রন্থ হল:
* হাশিয়া আলাল কাশশাফ।
* মুনতাখাবুস সুলুক ফী ইলমুল উসুল।
* কুল্লিয়াতু ফিল মানতিক ওয়া শারহুহা।
* আল-ফাসলাকু ফিল হিসাব।
* আল-লাওয়াজিমুল আকলিয়্যা ফী মাদারিকিল উলুম।
* তালখীসু আমালিল হিসাব।

'তালখীসু আমালিল হিসাব' গ্রন্থটিকে হিজরী দশম শতাব্দীর সূচনাকাল পর্যন্ত ইউরোপে গণিতশাস্ত্রের মৌলিক উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হত। জর্জ সার্টন তার 'A History of Science' গ্রন্থে লিখেছেন যে, এই গ্রন্থটিতে গণিতশাস্ত্র ও বীজগণিতের অত্যন্ত উপকারী তথ্য রয়েছে কারণ ইবনুল বান্না এতে অত্যন্ত দুর্বোধ্য বিষয়গুলোকে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ডেভিড ইউগ্যান স্মিথ তাঁর 'History of Mathematics' গ্রন্থে লিখেছেন যে, এই গ্রন্থে বীজগণিতের বর্গ ও ঘন (squares and cubes) এবং সমীকরণ (Equation) সমাধানের নিয়ম রয়েছে। ইবনে খালদুন রহ. এই গ্রন্থটি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যে, এটি অত্যন্ত সুস্থ ও সুপ্রতিষ্ঠিত দলিলসমৃদ্ধ।

ইবনুল বান্না ৬৭ বছর বয়সে ৭২১ হিজরীতে (১৩২১ খৃষ্টাব্দে) মাররাকিশে ইন্তেকাল করেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px