📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 তদন্ত কমিশন, নির্যাতনের এক লোমহর্ষক অধ্যায়

📄 তদন্ত কমিশন, নির্যাতনের এক লোমহর্ষক অধ্যায়


খ্রিস্টান স্পেন তার মুসলিম নাগরিকদের বড় কঠিন ও লোমহর্ষক পন্থায় খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করার নীতি অবলম্বন করেছিল। আর পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়েছিল গির্জা-কর্তৃক প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। গ্রানাডা দখলের সময় মুসলমানের সঙ্গে কৃত চুক্তি খ্রিস্টান জাতির এই কুপ্রবৃত্তি মনোভাবের সামনে সামান্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে এ চুক্তি প্রহসনের চুক্তি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। স্প্যানিশরা যখন খ্রিস্টানদের বিকৃত ধর্ম ও ধর্মবিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করে, তখন স্প্যানিশ খ্রিস্টানরা তাদের বিদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করে। এরপর শুরু হয় এসব মুসলমানদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা।

খ্রিস্টান স্পেন মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের জন্য চালু করে এক নতুন পদ্ধতি। তারা এ উদ্দেশ্যে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে, যা ইতিহাসে 'তদন্ত কমিশন' নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এ সংগঠনের কাজ ছিল যেসব মুসলমানকে খুঁজে বের করা, যারা নিজেদেরকে খ্রিস্টান বলে দাবি করলেও গোপনে ইসলামী ধর্মবিশ্বাস লালন করে। যদি তারা এ ধরনের কাউকে পেত, যেমন কারও বাড়িতে কোরআন শরীফ পেত বা কাউকে নামাজ পড়তে দেখত কিংবা কেউ যদি মদপান না করত, তাহলে তাকে কঠিন শাস্তি প্রদান করত। বন্দীদশায় আটকে রেখে তাকে যেসব নির্যাতন করা হত, যা কোন সুস্থ মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না। কাউকে পানি দ্বারা পেট এমনভাবে পরিপূর্ণ করত, যেন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করে। কারও শরীরে উত্তপ্ত লোহা শলাকা বিদ্ধ করা হত, শরীরের হাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হত, কারও পা ভাঙিয়ে দেওয়া হত, প্রচণ্ড আঘাত করে কারও চোয়াল ভেঙে ফেলা হত।

নির্যাতনের জন্য তাদের কাছে লোহার বড় পেরেক-যুক্ত এক ধরনের যন্ত্র ছিল। সারারাত ব্যক্তিকে বাক্সের মধ্যে ঢুকিয়ে আটকে দেওয়া হত; ফলে লোহার পেরেকগুলো ধীরে ধীরে তার শরীরে ঢুকে যেত। কাউকে হাত-পা বেঁধে হাউজের মধ্যে ফেলে দেওয়া হত। তদন্ত কমিশন অনেককে জীবন্ত প্রোথিত করত। অনেককে কাঁটাযুক্ত লোহার চাবুক দ্বারা প্রহার করত। বিশেষ ধরনের যন্ত্র দ্বারা কারও কারও জিহ্বা কেটে ফেলা হত। ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়নের বাহিনী যখন পরবর্তী সময়ে স্পেন বিজয় করেছিল, তখন তারা নির্যাতনের এক ভয়াবহ ও মারাত্মক যন্ত্রপাতি প্রত্যক্ষ করেছে এবং নিজেদের লেখায় এগুলোর বিবরণ উল্লেখ করেছে। তারা লিখেছে, এসব যন্ত্রপাতি এত মারাত্মক ছিল যে, এগুলো দ্বারা কোন মানুষকে শাস্তি দেওয়া হত এ কথা কল্পনা করলেই স্পেনীয়ান বাহিনীর অনেক সৈন্য অসুস্থ হয়ে পড়তো। অথচ আন্দালুস মুসলিম জনগোষ্ঠী বাস্তবে এসব যন্ত্রপাতির নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

ইতিহাস-গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ আছে, তদন্ত কমিশন কর্তৃক অভিযুক্ত মুসলিম নারীদের জন্য সেখানে বিশেষ ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা ছিল। অভিযুক্ত নারীকে বিবস্ত্র করা হত। এরপর তাকে বিরান ও পরিত্যক্ত কোন গোরস্তানে নিয়ে যাওয়া হত এবং কোন কবরের ওপর বসানো হত। তারপর অভিযুক্ত মহিলাটির মাথা দু’ ইঁটের মাঝে রেখে এমন শক্ত করে বাঁধা হত, যেন নড়াচড়া করার সামান্য শক্তিও না থাকে। তদন্ত কমিশনের লোকেরা তাকে লোহার শিকল দ্বারা কবরের সঙ্গে বেঁধে ফেলত এবং তার মাথার চুল এমনভাবে ছড়িয়ে দিত, যেন পুরো শরীর ঢেকে যায়। মহিলাটিকে এভাবেই ফেলে রাখা হত, যতক্ষণ না সে ভয়ে ও ক্ষুধায় পাগল হয়ে যায় কিংবা মৃত্যুবরণ করে।

স্প্যানিশ খ্রিস্টানরা তাদের ধর্ম গ্রহণ করার জন্য মুসলমানদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল। ফলে পুরো আন্দালুস উপদ্বীপ খ্রিস্টান হয়ে গিয়েছিল এবং অন্তরে ও লোকচক্ষুর অন্তরালে ব্যতীত কালিমায়ে তাইয়েবা উচ্চারণ করার মতো কেউ বাকি ছিল না। যে মিনারগুলো হতে আযানের সুমহান-সুমধুর ধ্বনি উচ্চারিত হত, সেখানে গির্জার ঘণ্টা স্থাপন করা হয়। যে মসজিদগুলো কালের এক দীর্ঘ পরিক্রমায় আল্লাহর জিকর ও কোরআন তেলাওয়াতের গুঞ্জরণে মুখরিত ছিল, সেখানে প্রতিমা ও ক্রুশ স্থাপন করা হয়।

স্প্যানিশ তদন্ত কমিশন ছিল নির্যাতন-নিপীড়ন ও জুলুম-অত্যাচারের এক সাকার দৃষ্টান্ত। তারা মুসলমানদের পেছনে লেগে থাকত এবং এমন কুৎসিত ও বিকৃত সব পন্থায় তাদেরকে শাস্তি দিত যে, শুনলেও অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। ঈদের দিন কেউ ভালো পোশাক পরিধান করলে তাকে মুসলিম বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত। এমনকি তারা কাউকে মুসলিম বলে সন্দেহ করলে তাকে বিবস্ত্র করে ফেলত। যদি তাকে বা তার পরিবারের কাউকে খতনাযুক্ত পেত, তাহলে তার ও তার পরিবারের অবধারিত পরিণতি হত মৃত্যুদণ্ড। 'দিওয়ানে তাহকীক' (তদন্ত কমিশনের অফিশিয়াল নাম)-এর গঠনতন্ত্রে মৃত ও অনুপস্থিত ব্যক্তিদের বিচার করার ব্যবস্থাও ছিল। জীবিত ব্যক্তিদের ন্যায় মৃত ব্যক্তিদের ওপরও আইন জারী হত এবং বিভিন্ন শাস্তিও ঘোষিত হত। তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হত, তাদের কুশপুত্তলিকা তৈরি করে শাস্তি হিসেবে তা পোড়ানো হত, কবর খুঁড়ে তাদের দেহাবশেষ বের করে তা ভস্ম করা হত।

ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়ান ১৮০৮ খৃষ্টাব্দে এক রাজকীয় ফরমান জারী করে স্পেনে তদন্ত কমিশনের সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও বাতিল ঘোষণা করেন। স্পেনে কেন্দ্র অভিযানে কর্মরত সামরিক কর্মকর্তা কর্নেল লেমোটেকি সেই সময়ের কিছু লোমহর্ষক বিবরণ দিয়েছেন। ফরাসি বাহিনী যখন তদন্ত কমিশনের আশ্রমে অভিযান চালায়, সেখানে তারা ভূগর্ভস্থ নির্যাতন সেল আবিষ্কার করে। সেখানে মানুষের শরীরের আকৃতির সমান ছোট ছোট কক্ষে বন্দীদেরকে আমৃত্যু আটকে রাখা হত। কঙ্কালগুলো তখনও শিকল পরিহিত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। হাড় গুঁড়ো করার যন্ত্র, মাথার ওপর অবিরাম পানির ফোঁটা ফেলার যন্ত্র, এবং ধারালো ছুরিযুক্ত কফিন আকৃতির বাক্সের মতো বীভৎস সব যন্ত্রপাতির মাধ্যমে তারা মানুষকে নির্যাতন করত।

টিকাঃ
৩২৯. আলী সালাবী, দালাদুল মুজাফ্ফারীন, পৃ : ২০৯।
৩৩০. পাতকু আাবু শাদী, শাহরাতু দারনাজা, পৃ : ৮৮ ও ইবনান, দালাদুল ইসলাম ফিল আন্দালুস, ৭/৩১৮।
৪০২. সাদকী আবু যহীরা, শারয়াহ গাযাওয়াত, পৃ: ১০৯-১১০।
৪০৩. আদী যুহরিয়া, মুহাম্মাদুন তাহবীশুন, পৃ: ৯০।
৪০৪. ফাওয়ার্ব, মুহাম্মাদুল আহন, পৃ: ১০০-১০১।
৪০৫. সাদা ক্বারী, আদা লুস মুহাম্মাদিয়াতুন, পৃ: ২১১।
৪০৬. লেবুন। ইসম, আদা লুস ইসলামি আল আদা লুস, ৫/৩০৮।
০০৭. দামী মুরারি, মাসফাকুত তাফরীশ, পৃ: ১৩২-১৩৯।

ফন্ট সাইজ
15px
17px