📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 গ্রানাডার পতন, কিছু কারণ, কিছু কার্যকারণ

📄 গ্রানাডার পতন, কিছু কারণ, কিছু কার্যকারণ


আন্দালুসের ইতিহাসে দুর্বলতা প্রতিটি যুগে জাতিসমূহের অধঃপতন, পতন ও ধ্বংস হওয়ার কারণস্বরূপ অনেকটা সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল। সেসব কারণেরই আরও প্রকট আকারে গ্রানাডার ইতিহাসে প্রকাশ পেয়েছিল। আর তাই গ্রানাডার পতনও হয়েছে চূড়ান্ত ও সর্বগ্রাসী। এসব কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল:

প্রথম কারণ: বিলাসিতায় ডুবে থাকা, পরকালীন চিন্তা-চেতনার পরিবর্তে পার্থিব চিন্তায় আচ্ছন্ন হওয়া, দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ভোগ-লালসায় মগ্ন হওয়া এবং অন্যায়ের সামনে নতি স্বীকার ও শিথিলতা ছিল এই মর্মান্তিক পতনের প্রথম কারণ। অধঃপতন ও পতনের আমলগুলোতে সবসময়ই দেখা গেছে সমাজে সম্পদের আধিক্য, মানুষের আমোদ-প্রমোদে নিমগ্নতা, উম্মত্ত যুবক শ্রেণির বড়ো রকমের পরাজিত মনোভাব এবং লক্ষ্যে অবিচলতার পরিবর্তে বড়ো রকমের নিম্নগামিতা। আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, “আমি কত জনপদ পিষ্ট করেছি, যারা ছিল জালেম! তাদের পর আমি অন্যান্য জাতি সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তারা যখন আমার শাস্তির পূর্বাভাস পেত, তখন তারা দ্রুত সেখান থেকে পালাতে লাগল। (তাদেরকে বলা হয়েছিল) পালিয়ো না। বরং ফিরে এসো তোমাদের সেই ধন-বাণিজ্য ও ভোগ-বিলাসের উপকরণের দিকে, যার মধ্যে তোমরা ছিলে। হয়তো তোমাদেরকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে।” [সুরা আম্বিয়া : ১১-১৩]
আয়াতের আলোকেই আমরা গ্রানাদাবাসীকে বলতে পারি, হে গ্রানাদাবাসী! কোথায় যাবে তোমরা? কোথায় ধাবিত হবে? ফিরে এসো আলহামরা প্রাসাদে; ফিরে এসো তোমাদের বাসগৃহে এবং...। এ দেশ সমর্পণ করো খ্রিস্টানদের হাতে আর আস্বাদন করো লাঞ্ছনার তিক্ত স্বাদ; যেহেতু তোমরা সম্মান ও মর্যাদার কাজ করোনি!

দ্বিতীয় কারণ: বীরত্বপূর্ণ লড়াই ও বিজয়াভিযান পরিত্যাগ। অবশ্য যারা ভোগ-বিলাসিতা এবং ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যে ডুবে যায়, সংগ্রামশীল জীবন তাদের পরিহার্য বৈশিষ্ট্য। আন্দালুসের ইতিহাস যিনিই অধ্যয়ন করবেন, অবাক বিস্ময়ে নিজেকে প্রশ্ন করবেন, কোথায় সেই জাতি, যারা প্রতিবছর নিয়ম করে এক-দু'বার বিজয়াভিযানে বের হত?! কোথায় ইউসুফ বিন তাশফিন ও আবু বকর বিন ওমর লামতূনী?! কোথায় হাজিব আলমানসুর?! এবং কোথায় আবদুর রহমান আননাসিরের মতো ব্যক্তিগণ?! আমরা যখন গ্রানাডার শাসকদের ইতিহাস অধ্যয়ন করি, কিংবা ইতিহাসের সেসব চরিত্রদের অবলোকন করি, যারা সমররীতি ও মেজাজের অধিকারী ছিলেন; যখন প্রত্যক্ষ করি যে, সংগ্রামশীল জীবন পরিত্যাগ করার কারণে তারা লাঞ্ছিত হয়েছেন, অপদস্থ হয়েছেন, তখন নিঃসন্দেহে তা আমাদেরকে এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও উপদেশ প্রদান করে।

তৃতীয় কারণ: উপরিউক্ত দুটি কারণের হাত ধরেই এসেছে তৃতীয় কারণটি। আর তা হল সীমাহীন গোনাহ ও অন্যায়-অপরাধে লিপ্ত হওয়া। অথচ চিরন্তন সত্য হল মুসলিম বাহিনী কখনোই অস্ত্র-জনবল এবং জাগতিক শক্তির সাহায্যে জয়লাভ করে না; তারা মূলতই ইলাহী বিজয় লাভ করে তাকওয়ার বলে। আর তাই মুসলমানগণ যখন রব-প্রদত্ত দীন হতে দূরে সরে যায়, রাসূল-প্রদত্ত পথ ও পদ্ধতি পরিত্যাগ করে, তখন তাদের ওপর নেমে আসে আসমানী ফয়সালা; ধ্বংস, লাঞ্ছনা ও হীনতার জীবন।

এগুলোই ছিল আন্দালুসের পতনের মূল ও মৌলিক কারণ। এ ছাড়াও আরও কিছু কার্যকারণ হল:
১. পারস্পরিক বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতা।
২. খ্রিস্টান, ইহুদি ও মুশরিকদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন।
৩. অযোগ্য ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব অর্পণ।
৪. দীন সম্পর্কে অজ্ঞতা।

অজ্ঞতা ও মুর্খতার প্রভাব দেখুন। মুহাম্মাদ ইবনুল আহমার একজন মুসলিম শাসক হয়ে সেভিল দখলে খ্রিস্টান বাহিনীকে সহায়তা করলেন আর তার জনগণও নিজেদেরকে সঠিক পথের অনুসারী ও মহান এক দায়িত্বপালনকারী মনে করে তার অনুসরণ করল! দ্বীন সম্পর্কে এর চেয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ের অজ্ঞতা আর কী হতে পারে?!

টিকাঃ
১২২. ইমাম আহমাদ, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৩৮১৮, তাবারানী, আলমু'জামুল কাবীর, ৩/৪৪৬, ও বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, হাদীস নং ৭০১৭।

ফন্ট সাইজ
15px
17px