📄 পঞ্চম ফার্ডিনান্ড ও বিভেদ-সংঘাতের সদ্ব্যবহার
গ্রানাদার মুসলমানদের যখন এই পরিস্থিতি, খৃস্টান নরপতি পঞ্চম ফার্দিনান্দ এর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করলেন এবং আত্মঘাতী হানাহানিতে আক্রান্ত গ্রানাদার দুর্বল স্থানে হামলা শুরু করলেন। বেশ কয়েকটি এলাকায় মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে ক্যাস্টোলা বাহিনীর যুদ্ধ হল। কিছু যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করল, কিন্তু অনেক যুদ্ধে পরাজিত হল। এসব পরাজয়ের পেছনে শত্রুপক্ষের শক্তি যতটা না ভূমিকা রেখেছিল, তার চেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিল শাসক আবুল হাসানের বিলাসী জীবন ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে উদাসীনতার কারণে সৃষ্ট নিজেদের সামরিক দুর্বলতা। সাধারণ জনগণ আত্মরক্ষা ও প্রতিরক্ষার জন্য আপন আপন সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছিল।
এরপর একের পর এক বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনায় দ্রুত পরিস্থিতির পট পরিবর্তন ঘটল। গ্রানাদায় সংঘটিত এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেন এবং তার পিতা আবুল হাসান পালিয়ে মালাগায় তার ভাই যাগলের কাছে চলে গেলেন। মালাগায় যাগল খৃস্টানদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন এবং মহান আল্লাহর অনুগ্রহে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে খৃস্টান বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করার পর তাদের পিছু হটতে বাধ্য করেছিলেন। এসব যুদ্ধে খৃস্টান বাহিনী তাদের প্রচুর যুদ্ধাস্ত্র ও রসদ-সামগ্রীই হারায়নি; বরং কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতিসহ প্রচুরসংখ্যক সৈন্যও হারিয়েছিল।
এদিকে শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে আবু আবদুল্লাহও খৃস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-তৎপরতা শুরু করলেন। তিনি খৃস্টান বাহিনীকে পরাজিত করে তাদের পশ্চাদধাবন করে খৃস্টান-ভূখণ্ডে প্রবেশ করলেন। প্রচুর গনিমাতসহ প্রত্যাবর্তনের পথে খৃস্টান বাহিনী তার ফেরার পথ বন্ধ করে দিল। লুসিনা বা ইলইয়াসানার নিকটবর্তী স্থানে উভয় বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হল এবং যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী পরাজিত হল। মুসলিম আমির আবু আবদুল্লাহ খৃস্টান বাহিনীর হাতে বন্দী হলেন।
আবু আবদুল্লাহ বন্দী হওয়ার পর তার পিতা আবুল হাসান পুনরায় গ্রানাদায় ফিরে এলেন এবং নতুন করে শাসনভার গ্রহণ করলেন। তবে বার্ধক্য ও অসুস্থতা তাকে কাবু করে ফেলেছিল। মৃগীরোগ-জাতীয় এক ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। এরপর তার শরীরও নুয়ে গেল। এভাবেই আল্লাহ তাকে বিভিন্ন বিপদ দিয়ে শাস্তি দিলেন। বাধ্য হয়ে তিনি তার ভাই মুহাম্মাদ বিন সা'দ যাগলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন। এরপর তাকে চলৎশক্তিহীন অবস্থায় আলমুনাক্কার শহরে নিয়ে যাওয়া হল। কিছুদিন অবস্থান করার পর তিনি সেখানেই ইন্তেকাল করলেন।
আবুল হাসান পুনরায় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তার পুত্র আবু আবদুল্লাহকে মুক্ত করার চেষ্টাও করেছিলেন। তবে এর পেছনে সন্তানের প্রতি মায়া-মমতার কোন ভূমিকা ছিল না; বরং পুত্রকে নিজের আয়ত্তে রাখতে এবং তার দিক থেকে বিপদ দূর করার উদ্দেশ্যে তিনি এ কাজ করেছিলেন। তিনি প্রচুর পরিমাণ মুক্তিপণ প্রদান ও গ্রানাডায় বন্দী বেশ কয়েকজন খৃস্টান সেনাপতিকে ফেরত প্রদানের বিনিময়ে আবু আবদুল্লাহকে মুক্তি দেয়ার জন্য পঞ্চম ফার্দিনান্দের নিকট প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু পঞ্চম ফার্দিনান্দ তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাকে বন্দী করে রাখাটাই শ্রেয় মনে করেন।
এদিকে রানী আয়েশাও তার পুত্রকে উদ্ধার করার জন্য তার সমর্থকদের মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালালেন। তিনি খৃস্টান রাজা মেনে নেবেন এমন কিছু প্রস্তাবসহ ওলিদ ইবনে মুআশা-এর নেতৃত্বে মুক্তি-প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করার জন্য একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করলেন। অবশেষে অতি গোপনে বেশ কিছু শর্ত সাপেক্ষে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি হল। শর্তাবলির মধ্যে ছিল— আবু আবদুল্লাহ ফার্দিনান্দ ও তার স্ত্রী ইসাবেলার আনুগত্যের স্বীকৃতি দেবেন, প্রতিবছর তাদেরকে কর বাবদ বার হাজার স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করবেন, এখনই গ্রানাদায় বন্দী খৃস্টানদের মধ্য হতে ক্যাস্টোলা-শাসকের বাছাই করা চার শ' বন্দীকে মুক্তি দেবেন, এরপর আগামী পাঁচ বছর প্রতিবছর সত্তরজন করে বন্দীকে মুক্তি দেবেন এবং এসব প্রতিশ্রুতি রক্ষার নিশ্চয়তা হিসেবে আবু আবদুল্লাহর বড় পুত্র ও বেশ কয়েকজন আমীরকে জিম্মি হিসেবে রাখবেন। বিপরীতে ক্যাস্টোলা-পক্ষ প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, তারা আবু আবদুল্লাহকে তৎক্ষণাৎ মুক্তি দেবেন, আবু আবদুল্লাহকে রাষ্ট্রীয় কাজে ইসলামী শরীয়তের বিরোধী কোন কিছু করতে বাধ্য করবেন না, গ্রানাদার অভ্যন্তরে বিদ্রোহ দমনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনায় তারা আবু আবদুল্লাহকে সহায়তা করবেন এবং সেসব নগরী বিজিত হলে মূল গ্রানাদার মতো ক্যাসটোলা সরকারের বশে থাকবে। আবু আবদুল্লাহর মুক্তির তারিখ হতে পরবর্তী দু' বছর এ চুক্তিটি কার্যকর থাকবে।
টিকাঃ
৩৬৫. লেখক অজ্ঞাত, যুদ্ধাংশুল আবর, পৃ: ৫৩-৫৮, মাফরী, নাফহুত জীব, ৪/৫২২-৫২৫, ইনান, আন্দালুসের ইতিহাস ছিল আষাড়ুল, ৭/৫৩৫-৫৩৮ ও নাহরুন নীদী মদী, আন্তাজীবুল সিরাবী লীল আন্দালুস, পৃ : ১৫ (আল্লামা আবুল জাবিয়াছুল ইনানিয়া ফিল আন্দালুস-বহে প্রকাশিত, সম্পাদক: সালমা আদাখারা আলহেজায়ী)।
৩৬৬. লেখক অজ্ঞাত, যুদ্ধাংশুল আবর, পৃ: ৬২-৬৬, মাফরী, নাফহুত জীব, ৪/৫২৫ ও ইনান, আন্দালুসের ইতিহাস ছিল আষাঢ়ূল, ৭/২০১।
৩৬৭. ইনান, আন্দালুসের ইতিহাস ছিল আষাঢ়ুল, ৭/204-205।
📄 স্পেন-নৃপতি এবং অবশিষ্ট গ্রাস কেড়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা
গ্রানাডা-পরিস্থিতিতে এমন এক প্রেক্ষাপটে আছেন আবু আবদুল্লাহ, তার হাতে আছে গ্রানাদার নেতৃত্ব এবং আছেন স্পেন-নৃপতি পঞ্চম ফার্দিনান্দ, যার অধিকারে আছে মালাগা ও মারিয়া। নিজের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশ্যে ৮৯৫ হিজরীতে (১৪৯০ খৃষ্টাব্দে) স্পেন-নৃপতি মালাগা থেকে ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় শহর আলমারিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। মালাগা থেকে আলমারিয়ার পথে সব গ্রাম ও দুর্গ তিনি দখল করে নিলেন। আলমারিয়াবাসীও তার কাছে আত্মসমর্পণ করল। মুসলমানগণ আপন আপন নগরী রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ প্রতিরোধ গড়ে তুলল। কিন্তু সাধ্য ও যুদ্ধাস্ত্রের অপ্রতুলতা তাদেরকে প্রতিরোধ করতে দিল না এবং পরাজয় বরণ ব্যতীত তাদের কপালে আর কিছুই জুটল না। এরপর পঞ্চম ফার্দিনান্দ সেখান থেকে যাগলের নিয়ন্ত্রণাধীন ওয়াদিয়ে আশ-এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। যাগল দেখলেন, তিনি খৃস্টান বাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ হয়েছেন এবং আপন রাষ্ট্রকে রক্ষা করার সামর্থ্য তার নেই। তিনি যেসব মুসলিম শাসকের কাছে সাহায্য চাওয়া সম্ভব, সবার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। কিন্তু কে শুনবে তার আর্তনাদ! খৃস্টান বাহিনী ওয়াদিয়ে আশ-ও দখল করে নিল।
এর ফলে গ্রানাদা নগরী ও সংলগ্ন গ্রামসমূহ সবদিক থেকে খৃস্টান বাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল। পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ সবদিক থেকে খৃস্টান বাহিনী গ্রানাদা ঘিরে ফেলল। গ্রানাদাবাসীর অবস্থা তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই পূর্বাভাসের বাস্তব রূপ— শীঘ্রই এমন এক সময় আসবে, যখন বিভিন্ন জাতিবর্গ তোমাদের বিরুদ্ধে ডাকাডাকি করবে, যেমন একে অন্যকে ডেকে আনে দস্তরখানে। নবীজী এ কথা বলার পর উপস্থিত জনৈক সাহাবী প্রশ্ন করলেন, তখন কি সংখ্যাস্বল্পতার দরুন আমরা এ রূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হব? নবীজী উত্তর দিলেন, না; বরং সেদিন তোমরা সংখ্যায় থাকবে অনেক। কিন্তু তোমরা হবে বন্যায় ভেসে আসা খড়কুটোর মতো। আল্লাহ তা'আলা অতি অবশ্যই তোমাদের শত্রুদের বক্ষ থেকে তোমাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি তুলে নেবেন এবং আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের অন্তরে 'ওয়াহেন' (দুর্বলতা) ঢেলে দেবেন। এরপর জনৈক সাহাবী প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! 'ওয়াহেন' (দ্বারা) কী (উদ্দেশ্য)? নবীজী উত্তর দিলেন, দুনিয়াপ্রীতি ও মৃত্যু-ভীতি।
খৃস্টান রাজশক্তি তৎকালীন অসংগঠিত ও দুর্বল রাষ্ট্র গ্রানাদার চারপাশে সমবেত হল। (ক্যাসটোলা ও আরাগোনের মিলিত রাষ্ট্র) স্পেনের নৃপতি ফার্দিনান্দ গ্রানাদার গুরুত্বপূর্ণ দুইটি বুরুজ বা টাওয়ার দখল করে নিলেন। একটি হল গ্রানাদার সম্মুখভাগে জুব্বাহর টাওয়ার, আরেকটি হামাদান গ্রামের টাওয়ার। উভয় টাওয়ারই বেশ বড় ও সুরক্ষিত ছিল। পঞ্চম ফার্দিনান্দ তাঁর ছাউনির নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও মজবুত করলেন এবং গ্রানাদাবাসীর ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য প্রয়োজনীয় যুদ্ধাস্ত্র মজুদকরণের পাশাপাশি নিজ সৈন্যদের সেখানে এনে জড়ো করলেন। গ্রানাদা নগরী ছিল তাঁর ছাউনি থেকে একেবারে সন্নিকটে। তাই এখান থেকে গ্রানাদাবাসীর ওপর চাপ বৃদ্ধি করা সহজ ছিল।
টিকাঃ
৩৬৮. লেখক অজ্ঞাত, যুদ্ধাংশুল আবর, পৃ: ৯৮, মাফরী, নাফহুত জীব, ৪/৫২২ ও ইনান, আন্দালুসের ইতিহাস ছিল আষাঢ়ুল, ৭/২২৫-২২৬।
৩৬৯. সূনাতে আবূ দাউদ, হাদীস নং ৪২৬৭।
৩৭০. দাতাভুলুল ইনান ছিল আষাঢ়ুল, ৭/২২৭-২২৮।
📄 ক্যাথলিক শাসকদ্বয়ের দাবির উত্তরে আবু আবদুল্লাহ
কোন কোন ঐতিহাসিক নথিপত্রের ভাষ্য অনুসারে ৮৯৬ হিজরীর শুরুতে (১৪৯১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাস) উভয় রাষ্ট্রের শাসকদের মাঝে নতুন আরেকটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হল। স্বয়ং সুলতান আবু আবদুল্লাহ কর্তৃক জারীকৃত ৮৯৬ হিজরীর মুহাররম মাসের (১৪৯১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের) একটি সরকারী ফরমানে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ফরমানটি আলজিরিয়াস নগরীর সেনাপতি ও বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দকে প্রেরণ করা হয়েছিল। আবু আবদুল্লাহ ফরমানে বিশেষভাবে দু’ বছরের জন্য নতুন করে স্বাক্ষরিত চুক্তিকে ‘সৌভাগ্যপূর্ণ সন্ধিচুক্তি’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং এ চুক্তিতে তাদেরকেও অন্তর্ভুক্ত হতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। যদিও এ চুক্তির বিস্তারিত ভাষ্য আমাদের জানা নেই; কিন্তু ক্যাস্টেলো-ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনামতে আবু আবদুল্লাহ চুক্তিতে এই অঙ্গীকার করেছিলেন যে, বাসতা, আলমারিয়া ও ওয়াদিয়ে আশি-এর আত্মসমর্পণের পর তিনি নিজেই গ্রানাদা রাষ্ট্রকে ক্যাথলিক শাসকদের হাতে সমর্পণ করবেন। যাই হোক, ১৪৯১ খ্রিস্টাব্দের শুরুতে (৮৯৬ হিজরীর সফর মাসে) ক্যাথলিক রাজা-রানী সুলতান আবু আবদুল্লাহর কাছে প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে গ্রানাদা সমর্পণের অঙ্গীকার স্মরণ করিয়ে দিলেন। অবশ্য তারা এবার পুরো গ্রানাদার নিয়ন্ত্রণ দাবি করলেন না; দাবি করলেন কেবল গ্রানাদা-সুলতানদের রাজধানী ও প্রশাসনিক কেন্দ্র আলহামরা নগরীর নিয়ন্ত্রণ।
আবু আবদুল্লাহর পূর্ব-ভূমিকা ও অবস্থানই মূলত ক্যাথলিক শাসকদেরকে এরূপ নতি স্বীকারের দাবি জানাতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। কিন্তু বাস্তবে ঘটল সম্পূর্ণ উল্টো। ৮৯৬ হিজরীর ২৯ সফর (১৪৯১ খ্রিস্টাব্দের ২২ জানুয়ারি) সুলতান আবু আবদুল্লাহ তার সেনাপতি আবু কাসেম আলমুগলীকে একটি বার্তাসহ ক্যাথলিক শাসকদের কাছে প্রেরণ করলেন। যদিও প্রশ্নের ভাষা ছিল সংযত ও মার্জিত এবং শেষ হয়েছিল আনুগত্য প্রকাশের শব্দের মাধ্যমে; কিন্তু বার্তার সারমর্ম ছিল এই দাবির প্রত্যাখ্যান। কিন্তু এরপরও ক্যাথলিক শাসকদ্বয় বারবার আলহামরার নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানাতে লাগলেন।
বাধ্য হয়ে আবু আবদুল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মনস্থ করলেন। কিন্তু রাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাকে সময় নিয়ে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলার অনুরোধ করলেন। এরপর সুলতান আবু আবদুল্লাহ খৃষ্টান শাসকদ্বয়কে এ দাবি পরিত্যাগ করার জন্য রাজী করাতে তাঁর উজির ইউসুফ ইবন কুনানী ও তার সঙ্গে গ্রানাদার একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ীকে সেভিলের খৃষ্টান শাসকদের কাছে প্রেরণ করলেন। উক্ত ব্যবসায়ীর নাম ছিল ইবরাহীম আলকাশরী। খৃষ্টানদের সঙ্গে তার ভালো যোগাযোগ ও সম্পর্ক ছিল। কিন্তু তারাও ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল। ফলে নতুন করে মুসলিম-খৃষ্টান যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠল।
এখানে আমরা আবু আবদুল্লাহর এই নতুন অবস্থানের সামান্য পর্যালোচনা করব। বিগত কয়েক বছর ধরে মুসলিম আন্দালুসে চলমান দুর্যোগ-দুর্বিপাক সুলতান আবু আবদুল্লাহকে অন্য মানুষে পরিণত করেছিল। এই দুর্বল সুলতান উৎকণ্ঠার সাথে পরিস্থিতির পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন। তিনি এর মাঝে সুস্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন অশুভবাহী তকদীর ও পরিণতি। যদিও চাচা যাগাল ময়দান থেকে সরে যাওয়ায় তিনি তার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছিলেন; কিন্তু এর কারণে একই সঙ্গে তিনি প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে নির্ভর করা যায়, এমন সবচেয়ে বড় শক্তিকেও হারিয়েছিলেন। আন্দালুসের অন্য সব ঘাঁটি ক্যাস্টেলো রাজ্যের দখলভুক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং সেগুলোর জন্য নতুন খৃষ্টান প্রশাসকও নিযুক্ত করা হয়েছিল। সেসব নগরীতে এখনও রয়ে যাওয়া মুসলিম নাগরিকদের হয় খৃষ্টান শাসকদের আনুগত্য স্বীকার করতে হচ্ছিল কিংবা হিজরতের জন্য প্রস্তুত হতে হচ্ছিল। সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে খৃষ্টানদের প্রতাপ; বহু মুসলমান আপন ভিটে-মাটির লোভে, ব্যর্থ আত্মরক্ষায় কিংবা অনিশ্চয়তা ও বিভাজন থেকে বাঁচতে মুরতাদ হয়ে গেছে। অনেকেই অবশ্য নিজেদের দ্বীন ও প্রাণ রক্ষার্থে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নিয়েছে অন্য কোনো মাগবিরী ভূমিতে।
আবার এসব মুসলিম নাগরিকদের একটি বিরাট অংশ আন্দালুসের একমাত্র মুসলিম দুর্গ গ্রানাদায় ছুটে এসেছে। ফলে গ্রানাদার আদিবাসিন্দা ও নবাগত মানুষের এক জটলা সৃষ্টি হয়েছে। মূল গ্রানাদার নগরপ্রাচীরের ভেতরে ও এর পার্শ্ববর্তী শহরগুলিতে মুসলিম জনগণের সংখ্যা চার লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। হতাশা ও ঘৃণার এক সুতীব্র তরঙ্গ এই লক্ষ মানুষকে নিমজ্জিত করে রেখেছিল। কোন অপরাধ করা ছাড়াই তারা হারিয়েছেন নিজেদের ভূমি, সন্তান, ধন-সম্পদ; হয়েছেন নিয়তি-নিপীড়িত। আর তাই এই ঘৃণিত শত্রুর কাছে গ্রানাদা রাষ্ট্র তুলে দেওয়ার চিন্তা স্বাভাবিকভাবেই গণপ্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। সুলতান আবু আবদুল্লাহ এই গণ-চেতনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এ কারণেই ক্যাস্টেলোর শাসকদের প্রেরিত প্রতিনিধিদল যখন তার কাছে আলহামরা তুলে দেওয়ার দাবি জানাল, তার হৃদয় এই ধৃষ্টতা ও প্রতারণা মেনে নিতে বিদ্রোহ করল।
হয়তো এই প্রথমবারের মতো তিনি উপলব্ধি করলেন যে, তিনি এই প্রতারক শাসকদের সঙ্গে মিত্রতা করে এবং আপন জনগণ ও মুসলিম ভাইদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করে কী মারাত্মক ভুল করেছেন। আর তাই পঞ্চম ফার্দিনান্দ যখন তাকে এই প্রতারণার ফাঁদে আবারও ফেলতে চাইলেন, তিনি রাষ্ট্রের সকল সেনাপতি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ চাইলেন। তারা সকলে একবাক্যে ক্যাথলিক শাসকদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল এবং নিজেদের মাতৃভূমি ও দ্বীন রক্ষার্থে আমৃত্যু লড়ে যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করল। তখন আবু আবদুল্লাহ ক্যাস্টেলো-নৃপতিকে জানিয়ে দিলেন যে, তিনি এ বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি এবং গ্রানাদার জনগণ আত্মসমর্পণ ও সমঝোতা স্থাপনের দাবি প্রত্যাখ্যান করে লড়াই ও প্রতিরোধের সংকল্প ব্যক্ত করেছে। সুলতান আবু আবদুল্লাহ এইভাবে ক্যাস্টেলো-শাসকদেরকে উত্তর দিয়েছিলেন এবং জনসাধারণের দৃঢ় সংকল্পের কারণেই সমঝোতা ও নতি স্বীকারের পরিবর্তে সংগ্রাম ও প্রতিরোধের পথে নেমে গিয়েছিলেন।
টিকাঃ
৮০৫. ইবন, দারাউসুল ইসলাম ফিল আন্দালুস, ৭/২১২-২০৬।