📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 পঞ্চম পরিচ্ছেদ : খৃস্টান রাষ্ট্রসমূহের ঐক্য

📄 পঞ্চম পরিচ্ছেদ : খৃস্টান রাষ্ট্রসমূহের ঐক্য


ইসলামী রাষ্ট্র গ্রানাডার ইতিহাসের এই জটিল ও কঠিন সময়কালের আলোচনা করার পূর্বে আমরা যে গুরুত্বপূর্ণ কার্যকারণে আন্দালুসে মুসলমানদের এই দ্রুত পতন ও ধ্বংসের কারণ হয়েছিল, তা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা দরকার মনে করছি। আর সে কার্যকারণটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান ও সংঘাতরত আন্দালুসের দুই পরাক্রান্ত খৃস্টান রাষ্ট্র ক্যাসটোলা ও আরাগোনাঁর ঐক্য ও একীভূত হওয়া।

উভয় রাষ্ট্র একই ধর্মবিশ্বাস ও একই জাতীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন পর্যন্ত একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘাত, যুদ্ধ ও অপরকে নিঃশেষ করার চেষ্টায় রত ছিল। অধিকাংশ লক্ষ্য ও স্বার্থের বিরোধ সত্ত্বেও উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে মিল ছিল। উভয়ের সবচে' বড় লক্ষ্য ছিল যে কোন মূল্যে আইবেরিয়ান উপদ্বীপে ইসলামের অস্তিত্বকে নির্মূল করা। কারণ, উভয় রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদের মনে এ ভয় ছিল যে, পূর্বের ন্যায় ইসলাম হয়তো আরও একবার আইবেরিয়ান উপদ্বীপে আধিপত্য গ্রহণ করবে, যার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে তাদের শাসনক্ষমতার সমাপ্তি।

১৪৬৮ খৃস্টাব্দে (৮৭৪ হিজরীতে) যখন ক্যাস্টোলা-শাসক চতুর্থ হেনরী মৃত্যুবরণ করেন, মূলত তখন থেকেই উভয় রাষ্ট্রের ঐক্যের প্রাথমিক লক্ষণসমূহ প্রতিভাত হতে থাকে। চতুর্থ হেনরীর মৃত্যু হলে ক্যাস্টোলা সিংহাসনে ঘিরে জটিল এক সমস্যার উদ্ভব হয়। হেনরী কোন পুত্র সন্তান রেখে যাননি। উত্তরাধিকারী হিসেবে রেখে গিয়েছিলেন একমাত্র কিশোরী কন্যা জওয়ান্নাকে (Joanna)। অবশ্য জওয়ান্নার পিতৃত্বের বিষয়টিও যথেষ্ট ধোঁয়াশাপূর্ণ। জওয়ান্নার বংশীয় পরিচয় সম্পর্কিত করা হত হেনরীর একান্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডিউক ব্যাল্ট্রান ডি লা কুয়েভা (Beltrán de la Cueva)-এর দিকে। এ কারণেই জওয়ানা পরিচিত ছিল 'জওয়ানা লা ব্যাল্ট্রানিজা' (Joanna la Beltraneja) নামে।

ক্যাস্টোলা রাষ্ট্রের সম্ভ্রান্ত ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকে জওয়ান্নার পক্ষে সমর্থন জানান। কিন্তু মৃত হেনরীর বোন রাজকুমারী ইসাবেলা ছিলেন এর বিরুদ্ধে। ক্যাস্টোলার জনগণের আবেগ-অনুভূতিও তার পক্ষে ছিল। অধিকন্তু সম্ভ্রান্ত ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ ছিল তার পক্ষে। এমনকি তার ভাই সদ্য মৃত হেনরীও মৃত্যুর পূর্বে সিংহাসনে ইসাবেলার অধিকারের বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন। ক্যাস্টোলার কার্টিজ (বিধানসভা)-ও ইতঃপূর্বে ১৪৬৮ খৃস্টাব্দে তার ভাই আলফোনসোর মৃত্যুর পরপরই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে ইসাবেলার অধিকারের পক্ষে সমর্থন দিয়েছিল। সুতরাং হেনরীর মৃত্যুর পর জওয়ান্নার পরিবর্তে হিসেবে ক্যাস্টোলার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়ে রাজকন্যা ইসাবেলার অগ্রাধিকার নিয়ে কোন সংশয় ছিল না।

ইসাবেলা তার ভাইয়ের মৃত্যুর কয়েক বছর পূর্বে আরাগোনাঁর নৃপতি দ্বিতীয় জন-এর পুত্র এবং আপন চাচাতো ভাই যুবরাজ ফার্দিনান্দ-এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এই বিবাহের পেছনেও আছে এক ইতিহাস। সংক্ষেপে এর বিবরণ হল, যেহেতু ইসাবেলার ক্যাস্টোলার সিংহাসন লাভের সমূহ সম্ভাবনা ছিল, তাই সাবালিকা হওয়ার পর থেকেই তার প্রতি অনেকের দৃষ্টি ছিল। আরাগোনাঁর তৎকালীন শাসক দ্বিতীয় জন পূর্ব থেকেই তার পুত্র ফার্দিনান্দ-এর জন্য ইসাবেলার পাণি গ্রহণের আগ্রহী ছিলেন। কেননা, একে তো উভয় রাজপরিবারের মধ্যে পূর্বে থেকেই আত্মীয়তার দৃঢ় ও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল, অপরদিকে স্বাভাবিকভাবেই এর মাধ্যমে উভয় রাষ্ট্রের ঐক্য ও একতার প্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল। এ কারণে ফার্দিনান্দ ছিলেন ক্যাস্টোলা-রাজকন্যা ইসাবেলার প্রথম সারির পাণিপ্রার্থীদের একজন। কিন্তু ইসাবেলার ভাই হেনরী ফার্দিনান্দ-এর সঙ্গে তার বোনের বিয়েতে রাজী ছিলেন না।

ভবিষ্যতে ক্যাস্টোলার সিংহাসন দখল-প্রত্যাশী আরও অনেকেই এক্ষেত্রে ফার্দিনান্দ-এর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন পর্তুগালের রাজা আলফোনসো। নৃপতি হেনরীও তার বোনকে পর্তুগালের এই রাজার সঙ্গে বিয়ে দিতে ইচ্ছুক ছিলেন। তবে ইসাবেলা গভীর চিন্তা-ভাবনা করার পর তার চাচা দ্বিতীয় জন যেসব কারণে এ বিয়েতে আগ্রহী ছিলেন, সেসব কারণেই আপন চাচাতো ভাই আরাগোনাঁর ফার্দিনান্দকেই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। তাছাড়া পিতামহের দিক থেকে উভয়ের এক রাজপরিবারভুক্ত হওয়ার দিকটিও ইসাবেলাকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

নৃপতি হেনরী যেহেতু এ বিয়েতে রাজী ছিলেন না, তাই ইসাবেলা অত্যন্ত গোপনে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে বিয়ের শর্তাবলি নির্ধারণ করেন। শর্তাবলির মধ্যে ছিল, ফার্দিনান্দ ক্যাস্টোলার আইন-কানুন ও রীতি-নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন, নিজের বসবাসের স্থান হিসেবে ক্যাস্টোলাকেই নির্বাচন করবেন, ইসাবেলার অনুমতি ছাড়া ক্যাস্টোলা ছাড়বেন না এবং রাষ্ট্রীয় যে কোন বিষয়ে ইসাবেলার অনুমতি ছাড়া কোন সিদ্ধান্ত নেবেন না। বিশেষভাবে ফার্দিনান্দ-এর কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয় যে, তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড যুদ্ধ অব্যাহত রাখবেন।

১৪৬৯ খৃস্টাব্দের অক্টোবর মাসে (৮৭৪ হিজরীতে) ইসাবেলার তৎকালীন আবাসনস্থল ওয়ালিদ শহরে অল্প কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবের উপস্থিতিতে বিশেষ এক অনুষ্ঠানে ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এর কয়েকদিন পর ইসাবেলা তার ভাই হেনরীকে পত্রের মাধ্যমে বিয়ের বিষয়টি অবগত করেন এবং স্বামী হিসেবে ফার্দিনান্দকে বেছে নেওয়ার কারণ বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন।

১৪৭৪ খৃস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে হেনরীর মৃত্যুর পরপরই ইসাবেলার তৎকালীন আবাসনস্থল শুকুরিষাতে ইসাবেলাকে ক্যাস্টোলা ও লিওন সাম্রাজ্যের রানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আরও কিছু নগরী তার আনুগত্যের ঘোষণা দেয়। কিন্তু পরিস্থিতি একেবারে নিষ্কণ্টক ছিল না। ক্যাস্টোলা রাষ্ট্রের অনেক নীতি-নির্ধারক সম্রাট কন্যা জওয়ান্নার পক্ষাবলম্বন করে। এদিকে ইসাবেলার স্বামী যুবরাজ ফার্দিনান্দও ক্যাস্টোলার রাজপরিবারের একমাত্র পুরুষ উত্তরাধিকারী হিসেবে ক্যাস্টোলার সিংহাসন কেড়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। কিন্তু ইসাবেলা শক্ত হাতে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। স্বামীর সঙ্গে তিনি যৌথ রাজতন্ত্রের চর্চায় সম্মত হন। অর্থাৎ ইসাবেলাই হবেন ক্যাসটোলার রাষ্ট্রের মূল মালিক, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদিতে তার মতামতই হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত; তবে ফরমান জারী হবে উভয়ের নামে এবং রাষ্ট্রীয় মুদ্রাতে উভয়ের নাম উৎকীর্ণ থাকবে।

টলেডোর আর্চ বিশপের নেতৃত্বে এ সময় ইসাবেলার প্রতিপক্ষীগণ পর্তুগালের শাসক পঞ্চম আলফোনসোর সঙ্গে সমঝোতা করে এবং জওয়ান্নাকে ক্যাসটোলার সম্রাজ্ঞী পদে বসানোর জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। উল্লেখ্য, জওয়ান্না ছিল পঞ্চম আলফোনসোর ভাগ্নি। ১৪৭৫ খৃষ্টাব্দের মে মাসে পর্তুগাল-নৃপতি আলফোনসো ক্যাসটোলা ভূমিতে হামলা চালান এবং ক্যাসটোলার পাহাড়ী এলাকা সামুরা নগরী পর্যন্ত পৌঁছে যান। ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলা দ্রুত তাদের বাহিনী নিয়ে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। সামুরার পার্শ্ববর্তী টোরো-র নিকটবর্তী এলাকায় উভয় পক্ষ মুখোমুখি হয়। যুদ্ধের প্রথমদিকে ক্যাসটোলা বাহিনী প্রবল চাপের মুখোমুখি হয়ে পরাজয়ের উপক্রম হলেও পর্তুগাল-নৃপতি এর সদ্ব্যবহার করতে ব্যর্থ হন। দীর্ঘ কয়েক মাস উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ চলে এবং শেষে ক্যাসটোলা বাহিনীর বিজয়ের মাধ্যমে শেষ হয়।

পর্তুগিজ বাহিনীর পরাজয়ের ফলে ক্যাসটোলার সিংহাসন নিয়ে সংঘাত ও দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে। এরপর ১৪৭৯ খৃষ্টাব্দে আরাগোনোর নৃপতি দ্বিতীয় জন মৃত্যুবরণ করেন। সিংহাসনে তার স্থলাভিষিক্ত হন তার পুত্র ফার্দিনান্দ। এর ফলে যুগ যুগ ধরে চলে আসা দীর্ঘ সংঘাত ও হানাহানির পর দুই খৃষ্টান রাষ্ট্র একীভূত ও এক সিংহাসনের শাসনভুক্ত হয়।

ক্যাথলিক ফার্দিনান্দ নামে পরিচিত পঞ্চম ফার্দিনান্দ যদিও রাজনীতি, প্রশাসন পরিচালনা-নীতি ও সামরিক নীতিতে অসামান্য যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন; কিন্তু পাশাপাশি তিনি ছিলেন এমন একজন শাসনকর্তা, যার নীতি নৈতিকতা ছিল না। প্রজাবৎসল নয় বরং বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা ছিল তার স্বভাব-রীতি। নিজের আকাঙ্ক্ষা ও স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য তিনি যে কোন পন্থা অবলম্বনে প্রস্তুত ছিলেন, চাই তা চারিত্রিক নীতিমালা, পৌরুষ ও বিশ্বস্ততার পূর্ণ বিরোধীই হোক না কেন; যেমনটি তার অতীত জীবনতিহাসের বিভিন্ন ঘটনায় প্রকাশ পেয়েছে এবং সামনেও আন্দালুসের পরাজিত জাতির সঙ্গে তার কৃত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রকাশ পাবে।

তার স্ত্রী রানী ইসাবেলা ছিলেন অত্যন্ত চৌকস মেধা ও দৃঢ় সংকল্পের অধিকারিনী। আপন কোমলতা ও কমনীয়তা, শৌর্য ও সাহসিকতা এবং বিচক্ষণতার মাধ্যমে তিনি ক্যাসটোলার জনগণের আবেগ ও মুগ্ধতার জগতে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু প্রচন্ড গোঁড়া ও অন্ধ মনোভাব তার মধ্যে কাজ করত। পাশাপাশি তিনি সর্বদা এক চরম সাম্প্রদায়িক অনুভবের অধিকারী পাদ্রীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকতেন এবং তাদের নির্দেশনা ও প্ররোচনায় কাজ করতেন। আন্দালুসে ইসলাম ধ্বংস করার পরিকল্পনা এই খৃষ্টান রানীর (যিনি ক্যাথলিক রানী পরিচয়েও খ্যাত ছিলেন) অন্তরে প্রচন্ড নিকৃষ্ট ও বীভৎস সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করেছিল এবং তাকে স্প্যানিশ তদন্ত কমিশন (বা ভুলবশত The Tribunal of the Inquisition বা জেরা আদালত নামে পরিচিতি লাভ করেছে)-এর পৃষ্ঠপোষকায় প্ররোচিত করেছিল। স্বৈরাচারী শাসনের নামে এই কমিশন যত অপরাধ করত, তিনি তার সবকিছুকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দিতেন।

দুই গোঁড়া ক্যাথলিক রাষ্ট্র যখন এক পতাকাতলে সমবেত হওয়ার মাধ্যমে শক্তিশালী ও স্থিতিশীল হল, মুসলিম রাষ্ট্র গ্রানাদা তখন প্রবেশ করে গৃহযুদ্ধের এক নতুন পরিক্রমায়। তৎকালীন গ্রানাদা-শাসক আবুল হাসান আলী বিন সা’দ ইবনু আহমাদ রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কাজকর্ম বাদ দিয়ে আমোদ-প্রমোদে ডুবে ছিলেন এবং ইসলাম ও ইসলামী ভূখণ্ডের এই চরম দুর্যোগ ও বিভেদকালীন সময়ে ভোগ-বিলাসের পেছনে অর্থ ও মেধা ব্যয় করছিলেন। আর তাই উভয় ক্যাথলিক রাষ্ট্র এক ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পর কালবিলম্ব না করে গ্রানাদা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। শুরু হয় মুসলিম আন্দালুস ও গ্রানাদা মুসলমানদের জীবনের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়।

টিকাঃ
৭০. হুমায়ুন, আন্দালুস ইসলাম কিশ্ব আমাদুস, ৭/১৩০-১৩২।

ফন্ট সাইজ
15px
17px