📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 দীর্ঘকাল গ্রানাডার সার্বভৌমত্ব টিকে থাকার কার্যকারণসমূহ এবং গ্রানাডার তৎকালীন পরিস্থিতির বিবরণ

📄 দীর্ঘকাল গ্রানাডার সার্বভৌমত্ব টিকে থাকার কার্যকারণসমূহ এবং গ্রানাডার তৎকালীন পরিস্থিতির বিবরণ


মাগরেব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর দীর্ঘ প্রায় দুই শ' বছর অর্থাৎ ৭০৯ হিজরী থেকে ৮৯৭ হিজরী (১৩০৯-১৪৯২ খৃষ্টাব্দ) পর্যন্ত গ্রানাডার পরিস্থিতি এমনই ছিল এক সুদীর্ঘ অবস্থায় উপনীত হলেও গ্রানাডার চূড়ান্ত পতন বিলম্বিত হয়েছিল। এই সুদীর্ঘ সময় গ্রানাডার নিরাপদ থাকার অন্তর্নিহিত রহস্য ও মূল কারণ হল উত্তরের দুই খৃষ্টান রাষ্ট্র ক্যাস্টেলো ও অ্যারাগোনার মধ্যকার প্রচণ্ড বিরোধ ও দীর্ঘ সংঘাত। আন্দালুসের ইসলামী খেলাফতের ভগ্নাবশেষের ওপর প্রতিষ্ঠিত এই দুই প্রতাপশালী রাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতই মূলত গ্রানাডার সুনিশ্চিত পতনকে বিলম্বিত করেছিল।

এই দীর্ঘ সময়কালে আন্দালুস উপদ্বীপের একমাত্র মুসলিম রাষ্ট্র গ্রানাডা শক্তি ও দুর্বলতা, পরাজয় ও অটলতা, নিরাপত্তা ও উৎকণ্ঠা এবং শান্তি ও অস্থিরতার মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও দীর্ঘ প্রায় আড়াই শ' বছর স্থায়িত্ব লাভকারী গ্রানাডা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে উৎপাদন-ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত ভরপুর। সম্পদ ও স্বচ্ছলতার প্রাচুর্যে ভরা দেশটি যেন কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। সাধ্য ও সামর্থ্যের স্বল্পতা, পরিস্থিতির কঠোরতা এবং শত্রুর বিশালতা ও ভয়াবহতা সত্ত্বেও গ্রানাডা এ সময় বিজয় ও প্রভাব বিস্তারের উল্লেখযোগ্য কিছু নমুনাও প্রত্যক্ষ করেছিল।

এই সংকটপূর্ণ কাল এবং পরিস্থিতির ভয়াবহতার মাঝেও গ্রানাডা আপন সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী সভ্যতার অগ্রযাত্রায় সামিল হয়েছিল এবং উল্লেখযোগ্য কর্ম ও কীর্তির এমন কিছু বিচিত্র নমুনা উপহার দিতে সক্ষম হয়েছিল, যা মুসলিম উম্মাহর মাঝে সুস্থ ইসলামী চেতনা ও মর্ম-অনুভূতির পরিমাণ অনুসারে এবং সুদৃঢ় বিশ্বাসের শক্তি অনুসারে মুসলিম উম্মাহর অপূর্ব প্রাণশক্তির এবং কর্মদক্ষতারই প্রমাণ বহন করে। মুসলিম জাতি কেবল গ্রানাডার ইতিহাসেই নয়; বরং সর্বযুগে সকল পরিবেশে নিজেদের পক্ষভুক্তদের কর্তৃক যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার চেয়ে বহুগণ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিজেদের অবহেলা, শিথিলতা এবং ইসলামের কাঙ্ক্ষিত অনুপম মানসিক স্তর থেকে নিম্নগামিতার কারণে। এই আচরণই তাদের পতন ত্বরান্বিত করেছে, ইসলামের অস্তিত্বকে গ্রাস করেছে, ইসলামী সভ্যতাকে নিষ্পেষিত করেছে এবং পরিণত করেছে এমন এক ধূলিকণায়, বাতিলের ঝড়ো হাওয়ায় যা উড়ে গেছে নিমিষেই।

এ সময়কালে গ্রানাডার মুসলমানদের প্রথম কীর্তি ছিল এই সঙ্গীন পরিবেশে অবশিষ্ট মুসলিম আন্দালুসকে রক্ষা করার জন্য সামর্থ্যের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা গ্রহণ এবং একটি মজবুত লক্ষ্যের পথে অগ্রসর হওয়া। কিছু বিষয় তো পূর্ব থেকেই বিদ্যমান ছিল, চলমান সময়ের মহান ব্যক্তিগণ তা ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন আর কিছু আবিষ্কার গ্রানাডা রাষ্ট্রের আমলেই, যার পেছনে অবদান ছিল গ্রানাডার যোদ্ধা প্রশিক্ষকদের, যারা বিভিন্ন বিজয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বীরত্বের নমুনাও রেখে গেছেন।

কখনো সঙ্কীর্ণ, কখনো-বা বিস্তৃত পরিসরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সামাজিক নির্মাণ ও বিনির্মাণে সংরক্ষণ সম্ভব হয়েছে। আর এ বিষয়টি কয়েক প্রজন্ম ধরে এই কঠিন খণ্ডযুদ্ধপূর্ণ পরিবেশে গ্রানাডাবাসীকে অবিচল থাকতে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি তারা যেসব অসাধারণ কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন, তা জীবনের বিস্তৃত নানা ক্ষেত্রে সুবিন্যস্ত ভূমিকা রেখেছে। অবশ্য স্বীকার করতেই হবে, মাঝে মধ্যেই এই উপচে পড়া ধারায় অধোগমনও ঘটেছে।

একাডেমিক জ্ঞানচর্চার বহুমুখী অঙ্গনে গ্রানাডা রাষ্ট্র উপহার দিয়েছে কালজয়ী নানা রচনাকর্ম, বিশাল বিশাল অভিনব গবেষণা। পাশাপাশি গ্রানাডার আলিমসমাজ পূর্বতন আলিমগণের রেখে যাওয়া ইলমী মিরাসের রক্ষণাবেক্ষণ এবং তা থেকে উপকার অর্জনের কাজও করেছেন সফলতার সঙ্গে।

এ সময়কালে কর্ম ও কীর্তিতে উজ্জ্বল ব্যক্তিদের নামের দীর্ঘ তালিকার কিছু আমরা পেতে পারি ইবনুল খতীবের 'আল-ইহাতা' ও মাক্কারীর 'নাফহুত তীব' গ্রন্থে। পাশাপাশি গ্রানাডার বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিভিন্ন মাদরাসা ও বহুমুখী জ্ঞানচর্চার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আবিষ্কৃত হয়েছিল নিত্য-নতুন সব সামরিক অস্ত্র। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল এক ধরনের কামান, যা দিয়ে বিশেষ ধরনের গোলাকে অনেক দূরে নিক্ষেপ করা যেত। এছাড়াও আবিষ্কৃত হয়েছিল বারুদকে বিস্ফোরক শক্তিতে রূপান্তরিত করার পদ্ধতি। এসব আবিষ্কার গ্রানাডা থেকেই ইউরোপে আমদানি হত। মাদ্রিদের সামরিক জাদুঘরে এখনও সেসব বন্দুক সংরক্ষিত আছে, যেগুলো গ্রানাডার তৎকালীন মুসলমানগণ আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করত।

গ্রানাডায় শিল্পখাতেও বিভিন্নমুখী উন্নতি সাধিত হয়েছিল। গ্রানাডায় ছিল জাহাজ-নির্মাণ কারখানা, বস্ত্র-বুনন কারখানা, কাগজ ও স্বর্ণের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তৈরির কারখানা। রঙ, চামড়া পরিশোধক, অলঙ্কার-শিল্পসহ জটিল ও নিপুণ বিভিন্ন শিল্পেও গ্রানাডা পৃথিবীকে উপহার দিয়েছে নানা আবিষ্কার। চাষাবাদ, সেচ পদ্ধতি, সেচ যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রেও গ্রানাডার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।

নির্মাণ ও স্থাপত্যের ক্ষেত্রেও গ্রানাডার ছিল উল্লেখযোগ্য পদযাত্রা। মসজিদ, রাজপ্রাসাদ, ঘর-বাড়ি, সেতু ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেণীর স্থাপনা নির্মাণে গ্রানাডার অনন্য অবদান রয়েছে। বিশেষত নিয়ন্ত্রণ ও অনুপম কারিগরি দক্ষতার ধারক কারুকার্যে সমৃদ্ধ আলহামরা প্রাসাদের কথা না বললেই নয়, যা আজও পৃথিবীর বুকে অক্ষত আছে। এ ছাড়া এ সময়কালে দুর্গ, নগর-প্রাচীর ও পর্যবেক্ষণ টাওয়ারসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা নির্মিত হয়েছিল।

গ্রানাডা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি কীর্তি হল, এ সময় সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতিতে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছিল। সড়ক ও রাস্তা-ঘাট, বিস্তৃত প্রাঙ্গণ ও উদ্যান-বাগান, সামাজিক ও জনহিতকর বিভিন্ন স্থাপনা ইত্যাদির বিচারে গ্রানাডা ছিল তৎকালীন বিশ্বের সুন্দরতম শহরগুলোর একটি। গ্রানাডায় তখন প্রায় দশ লক্ষ মানুষ বসবাস করত। ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গ্রানাডা রপ্তানি করত বিভিন্ন শিল্পসামগ্রী।

মানসিক ও নৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রেও সেকালে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর ওপর গ্রানাডার প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছিল। গ্রানাডায় নিয়মিত আয়োজন করা হত অশ্বচালনা ও অশ্ববিদ্যাসংক্রান্ত নানাবিধ কলা-কৌশল ও কসরতের মনোজ্ঞ প্রদর্শনী। এতে অশ্বচালনার নিপুণতা, ক্ষিপ্রতা ও বিভিন্ন রীতি প্রদর্শন করা হত, যা থেকে ইউরোপ অনেক কিছুই অর্জন করেছে।

টিকাঃ
৯৫. আবদুর রহমান আলজাজী, আলবাত্বুল আলমাখদূশ, পৃ : ৩৯৪-৩৯২।
৯৬. প্রাগুক্ত, মাদহাফৃত জীর, ৪/৫০৭-৫০৯ ও আবহারুল রিয়াজ, ১/৫০-৫৫।
৯৭. গ্রানাডা রাজ্য ও মুসলিম গ্রানাডা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় তাদের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন : ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/৬৩৮-৬৬৭ ও মাজকারী, মাদহাফৃত জীর, ১/৪৫২-৪৫৪।
৭৭. দেখুন : ইনান, দাওলাতুল ইসলাম ফিল আন্দালুস, ৫/২১১।
৭৮. ইবনুল খতীব, রিহলাতু ইবনি বতুতা, ৪/২১৬।

ফন্ট সাইজ
15px
17px