📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 আবু আবদুল্লাহ ইবনুল হাকীম ও ভয়াবহ কিছু পদক্ষেপ

📄 আবু আবদুল্লাহ ইবনুল হাকীম ও ভয়াবহ কিছু পদক্ষেপ


৭৩১ হিজরীতে (১৩০২ খৃষ্টাব্দে) গ্রানাডা-শাসক ইবনুল আহমার আলফকীহ ইন্তেকাল করলেন। তার স্থলাভিষিক্ত হলেন তৃতীয় মুহাম্মাদ, যার উপাধি ছিল আল-মাখলু’ বা অপসারিত শাসক। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল মনোভাপন্ন একজন শাসক। তার শাসনকালে প্রকৃতপক্ষে গ্রানাডার রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল তদীয় উযীর আবু আবদুল্লাহ ইবনুল হাকীমের হাতে। 'হাকীম' পরিচয় ধারণকারী এই উযীর সাহেবও কিন্তু মোটেই হাকীম (প্রজ্ঞাবান) ছিলেন না। তিনি মাগরেবের সুলতানের পরিবর্তে মিত্রতা স্থাপন করেছিলেন ক্যাস্টেলোর শাসকের সঙ্গে।

উভয় আবু আবদুল্লাহ কেবল মাগরেবী সুলতানদের সঙ্গে মিত্রতা ত্যাগ করেই শান্ত হলেন না; বরং বনু আহমারের পূর্ববর্তী শাসকবৃন্দের কীর্তিকে অতিক্রম করে আরও অগ্রসর হলেন এবং এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন, যা ভাবলেও পরিণতি-আশঙ্কায় ললাট ঘর্মাক্ত হয়ে ওঠে। তিনি সিউটাবাসীকে সুলতান ইউসুফ আলমারিনীর আনুগত্য ত্যাগ করে ইবনুল আহমারের আনুগত্য মেনে নেয়ার জন্য এবং সে কাজে হস্তক্ষেপ করতে তার ভাই মালার প্রশাসককে প্ররোচিত করলেন। এরপর নিজেই সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে যুদ্ধ করতে রওয়ানা হলেন। পাঠক মনে প্রশ্ন- কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে? গ্রানাডার সার্বভৌমত্বের জন্য সার্বক্ষণিক হুমকি খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে, নাকি অন্য কারও বিরুদ্ধে?

উত্তর বড় বেদনাদায়ক। তিনি তার বাহিনী নিয়ে বনু মারীনের সাম্রাজ্যে হামলা চালালেন এবং জাবালে তারীক প্রণালীতে নিজের ক্ষমতা সুদৃঢ় করতে সিউটা নগরী দখল করে নিলেন। এরপর সিউটাবাসীরা নিরাপত্তা ঘোষণা করে সিউটার অপসারিত প্রশাসককে গ্রানাডায় পাঠিয়ে দিল।

বনু মারীনের শাসনব্যবস্থাকে আরও নড়বড়ে করার লক্ষ্যে এরপর এক মাগরেবী ব্যক্তিই অগ্রসর হল। আন্দালুসে বসবাসরত বনু মারীন গোত্রেরই উসমান বিন আবিল আ'লা নামক জনৈক ব্যক্তি সিউটা থেকে মাগরেব দখল করতে রওয়ানা হল। মাগরেবের তৎকালীন অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও তাকে সহায়তা করল। এই প্রেক্ষাপটে সুলতান ইউসুফ আলমারিনী নিহত হলেন এবং তার মৃত্যুর পর ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে তার দু’ পুত্র আবু সালিম ও আবু সাবিত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লেন। শেষ পর্যন্ত আবু সাবিতই জয়ী হলেন এবং তিনিই সিংহাসনে আসীন হলেন। এর অল্প কিছুদিন পরেই আবু সাবিতের মৃত্যু হল এবং তার স্থলাভিষিক্ত হলেন তার ভাই আবুর রবী’ সুলাইমান। বিদ্রোহী উসমান বিন আবিল আ'লাকে তিনিই পরাজিত করলেন। পরাজিত উসমান বিন আবিল আ'লা নিফল মনোরথে আন্দালুসে চলে গেলেন।

নিসন্দেহে এ ঘটনাপ্রবাহ ছিল দৃষ্টান্তহীন চরম অদূরদর্শিতার ফলাফল। নিসন্দেহে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ বলুন কিংবা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ, কোন দিক থেকেই এ ধরনের নির্লিপ্ততাকে মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু যা হওয়ার নয়, তা-ই হল। এদিকে গ্রানাডা-শাসক ও গ্রানাডার উযীরের এই নির্লিপ্ততার অনিবার্য পরিণতিতেই গ্রানাডায় আলমাখলু’-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংঘটিত হল এবং তার অপসারণের পর তার স্থলাভিষিক্ত হলেন তার ভাই আবুল জুয়ুস নাসর। খৃষ্টানশক্তি এ পরিস্থিতির সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাল এবং জাবালে তারীক হামলা চালাল। ৭৩১ হিজরীতে (১৩০৯ খৃষ্টাব্দে) খৃষ্টান বাহিনীর হাতে জাবালে তারীকের পতন ঘটল এবং মুসলিম আন্দালুস তার একমাত্র মুসলিম প্রতিবেশী ও ওপারের মাগরেব থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। এখন কেবল গ্রানাডার অবধারিত ও সুনিশ্চিত পরিণতির প্রহর গুনার পালা।

টিকাঃ
৮৯. ইবনে বদ্রুন, আদ্বাহীরাহ, ১/৪৪৪-৪৪৫, আলমাফাতুল বাদারিয়া, পৃ : ৪৬ ও ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/২২৯।
৯০. ইবনুল খতীব, আলইহাত্ব, ১/৩৪৫, আলমাফাতুল বাদারিয়া, পৃ : ৫১ ও ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/২২৯।
৯১. ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/২২৯।
৯২. প্রাগুক্ত, ৭/২২৯-২২৬।
৯৩. প্রাগুক্ত, ৭/২৩৬-২৩৮।
৯৪. ইবনুল খতীব, আলইহাত্ব, ১/৩৪১, আলমাফাতুল বাদারিয়া, পৃ : ৬২ ও ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/২৪০।

ফন্ট সাইজ
15px
17px