📄 ইবনুল আহমার আলফকীহের পুনঃবিশ্বাসঘাতকতা এবং তরীফ দ্বীপের পতন
এর একবছর পর ৬৮৬ হিজরীতে সুলতান ইয়াকুব আলমানসুরী আলমারীনী ইন্তেকাল করলে বনু মারীন সাম্রাজ্যে তার স্থলাভিষিক্ত হলেন তার পুত্র ইউসুফ বিন আলমানসুর। তৎক্ষণাৎ ইবনুল আহমার আলফক্বীয় তার কাছে আগমন করেন এবং মিত্রতা ও আনুগত্যের আবেদন জানালেন। ইউসুফ বিন আলমানসুর যখন মাগরেবী বাহিনী নিয়ে আন্দালুসে গমন করেছিলেন এবং খুনটান মোরাবিহীনকে পরাজিত করেছিলেন, তখন উভয়ের মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল এবং ইউসুফ বিন আলমানসুর জাবীরাতুল খায়রা ও তারীক দ্বীপ বাদে মাগরেবী সাম্রাজ্যের অধীন আন্দালুসের সকল সীমান্তশহর ইবনুল আহমারকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ।
এ সময় মাগরেবের সুলতানের নিজের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গোলযোগ দমনে ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে ক্যাস্টেলো-শাসক স্যান্তাফো বনু মারীনের সঙ্গে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করলেন এবং মুসলিম ভূখণ্ডে হামলা চালালেন। সংবাদ পেয়ে সুলতান সাগর পাড়ি দিয়ে আন্দালুসে উপস্থিত হলেন এবং খৃষ্টান রাজ্যে হামলা চালিয়ে তাদের একপর্যায়ে পর্যদুস্ত করলেন।
এবার স্যান্তাফো ব্যবহার করলেন খৃষ্টানদের চিরাচরিত ঢাল। তিনি ইবনুল আহমারকে বার্তা পাঠিয়ে ভয় দেখালেন যে, মারীনী সুলতান তার রাষ্ট্র দখল করে নেবেন। তিনি ইবনুল আহমারকে মিত্রতার প্রস্তাব দিলেন এবং জানালেন যে, তারা উভয় মিলে বনু মারীনকে ভবিষ্যতে আন্দালুসে আগমনে বাধা দেবেন। এর ফলে ইবনুল আহমারের গ্রানাডা রাষ্ট্রও বনু মারীনদের দখলদারিত্বের আশঙ্কা থেকে মুক্ত থাকবে। আর এ পরিকল্পনার অন্যতম অংশ ছিল, তারীক দ্বীপ থেকে বনু মারীনের সামরিক ঘাঁটি উচ্ছেদ করা এবং তারীক দ্বীপ দখল করে নেওয়া।
স্যান্তাফোর প্ররোচনায় আবারও মুহাম্মদ আলফকীহের অন্তরে নানা ধরনের কুমন্ত্রণা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তিনি খৃষ্টান শাসকের পাতা মরণ ফাঁদে আটকে গেলেন। বেচারা একবিন্দুও ভাবলেন না যে, এর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে তিনি আত্মহননের পথেই বেছে নিচ্ছেন। তিনি স্যান্তাফোর প্রস্তাবে সম্মতি জানালেন এবং শর্ত দিলেন যে, দখল করার পর তারীক দ্বীপের মালিকানা তার হাতে থাকবে। বিনিময়ে তিনি ক্যাস্টেলো-শাসককে তার অধিকারে থাকা ছয়টি দুর্গের নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করবেন। চুক্তি অনুযায়ী স্যান্তাফো তারীক দ্বীপ অবরোধ করবেন এবং ইবনুল আহমাদ রসদ, খাবার ইত্যাদি প্রদান করে খৃষ্টান বাহিনীকে সহায়তা করবেন। দীর্ঘ অবরোধের পর দ্বীপবাসীর শক্তি নিঃশেষ হয়ে এলো। তারা বাধ্য হয়ে কিছু শর্তসাপেক্ষে ক্যাস্টেলো বাহিনীর কাছে নতি স্বীকার করল।
আগের বার ব্যর্থ হলেও এবার খৃষ্টান বাহিনী তারীক দ্বীপে এসে ব্যর্থ হল না। তারা তারীক দ্বীপ দখল করে নিল। কিন্তু দখল করার পর তারা আর সেখানে থেকে ফিরে গেল না এবং ইবনুল আহমাদকেও এর নিয়ন্ত্রণ বুঝিয়ে দিল না। ইবনুল আহমাদ দুই কুলই হারালেন এবং তার এই অমার্জনীয় অপরাধ ও চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তারীক দ্বীপের পতন ঘটল।
ভৌগোলিক দিক থেকে তারীক দ্বীপে অবস্থান ছিল মুসলিম আন্দালুসের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাবালে তারীক প্রণালী পর্যন্ত এর সীমানা প্রসারিত। সুতরাং তারীক দ্বীপের পতনের অর্থ হল আন্দালুসের সঙ্গে মাগরেবের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং মাগরেব থেকে মুসলিম আন্দালুসে সামরিক সাহায্য আগমনের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া।
টিকাঃ
৭০৩. ইবনুল বন্দ্বুল, রু’উল হাল্লাল, পৃ: ৮৯-৯০ ও ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/২৩০।
৭০৪. ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/২০১।
৮৭. ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/২১৯ ও আলনাসিরী, আলইস্তিকসা, ৩/৭১।
৮৮. ইবনুল খতীব, আলইহাত্ব, ১/৪৫৬, আলমাফাতুল বাদারিয়া, পৃ : ৪২ ও ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/২২৯।
📄 আবু আবদুল্লাহ ইবনুল হাকীম ও ভয়াবহ কিছু পদক্ষেপ
৭৩১ হিজরীতে (১৩০২ খৃষ্টাব্দে) গ্রানাডা-শাসক ইবনুল আহমার আলফকীহ ইন্তেকাল করলেন। তার স্থলাভিষিক্ত হলেন তৃতীয় মুহাম্মাদ, যার উপাধি ছিল আল-মাখলু’ বা অপসারিত শাসক। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল মনোভাপন্ন একজন শাসক। তার শাসনকালে প্রকৃতপক্ষে গ্রানাডার রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল তদীয় উযীর আবু আবদুল্লাহ ইবনুল হাকীমের হাতে। 'হাকীম' পরিচয় ধারণকারী এই উযীর সাহেবও কিন্তু মোটেই হাকীম (প্রজ্ঞাবান) ছিলেন না। তিনি মাগরেবের সুলতানের পরিবর্তে মিত্রতা স্থাপন করেছিলেন ক্যাস্টেলোর শাসকের সঙ্গে।
উভয় আবু আবদুল্লাহ কেবল মাগরেবী সুলতানদের সঙ্গে মিত্রতা ত্যাগ করেই শান্ত হলেন না; বরং বনু আহমারের পূর্ববর্তী শাসকবৃন্দের কীর্তিকে অতিক্রম করে আরও অগ্রসর হলেন এবং এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন, যা ভাবলেও পরিণতি-আশঙ্কায় ললাট ঘর্মাক্ত হয়ে ওঠে। তিনি সিউটাবাসীকে সুলতান ইউসুফ আলমারিনীর আনুগত্য ত্যাগ করে ইবনুল আহমারের আনুগত্য মেনে নেয়ার জন্য এবং সে কাজে হস্তক্ষেপ করতে তার ভাই মালার প্রশাসককে প্ররোচিত করলেন। এরপর নিজেই সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে যুদ্ধ করতে রওয়ানা হলেন। পাঠক মনে প্রশ্ন- কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে? গ্রানাডার সার্বভৌমত্বের জন্য সার্বক্ষণিক হুমকি খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে, নাকি অন্য কারও বিরুদ্ধে?
উত্তর বড় বেদনাদায়ক। তিনি তার বাহিনী নিয়ে বনু মারীনের সাম্রাজ্যে হামলা চালালেন এবং জাবালে তারীক প্রণালীতে নিজের ক্ষমতা সুদৃঢ় করতে সিউটা নগরী দখল করে নিলেন। এরপর সিউটাবাসীরা নিরাপত্তা ঘোষণা করে সিউটার অপসারিত প্রশাসককে গ্রানাডায় পাঠিয়ে দিল।
বনু মারীনের শাসনব্যবস্থাকে আরও নড়বড়ে করার লক্ষ্যে এরপর এক মাগরেবী ব্যক্তিই অগ্রসর হল। আন্দালুসে বসবাসরত বনু মারীন গোত্রেরই উসমান বিন আবিল আ'লা নামক জনৈক ব্যক্তি সিউটা থেকে মাগরেব দখল করতে রওয়ানা হল। মাগরেবের তৎকালীন অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও তাকে সহায়তা করল। এই প্রেক্ষাপটে সুলতান ইউসুফ আলমারিনী নিহত হলেন এবং তার মৃত্যুর পর ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে তার দু’ পুত্র আবু সালিম ও আবু সাবিত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লেন। শেষ পর্যন্ত আবু সাবিতই জয়ী হলেন এবং তিনিই সিংহাসনে আসীন হলেন। এর অল্প কিছুদিন পরেই আবু সাবিতের মৃত্যু হল এবং তার স্থলাভিষিক্ত হলেন তার ভাই আবুর রবী’ সুলাইমান। বিদ্রোহী উসমান বিন আবিল আ'লাকে তিনিই পরাজিত করলেন। পরাজিত উসমান বিন আবিল আ'লা নিফল মনোরথে আন্দালুসে চলে গেলেন।
নিসন্দেহে এ ঘটনাপ্রবাহ ছিল দৃষ্টান্তহীন চরম অদূরদর্শিতার ফলাফল। নিসন্দেহে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ বলুন কিংবা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ, কোন দিক থেকেই এ ধরনের নির্লিপ্ততাকে মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু যা হওয়ার নয়, তা-ই হল। এদিকে গ্রানাডা-শাসক ও গ্রানাডার উযীরের এই নির্লিপ্ততার অনিবার্য পরিণতিতেই গ্রানাডায় আলমাখলু’-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংঘটিত হল এবং তার অপসারণের পর তার স্থলাভিষিক্ত হলেন তার ভাই আবুল জুয়ুস নাসর। খৃষ্টানশক্তি এ পরিস্থিতির সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাল এবং জাবালে তারীক হামলা চালাল। ৭৩১ হিজরীতে (১৩০৯ খৃষ্টাব্দে) খৃষ্টান বাহিনীর হাতে জাবালে তারীকের পতন ঘটল এবং মুসলিম আন্দালুস তার একমাত্র মুসলিম প্রতিবেশী ও ওপারের মাগরেব থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। এখন কেবল গ্রানাডার অবধারিত ও সুনিশ্চিত পরিণতির প্রহর গুনার পালা।
টিকাঃ
৮৯. ইবনে বদ্রুন, আদ্বাহীরাহ, ১/৪৪৪-৪৪৫, আলমাফাতুল বাদারিয়া, পৃ : ৪৬ ও ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/২২৯।
৯০. ইবনুল খতীব, আলইহাত্ব, ১/৩৪৫, আলমাফাতুল বাদারিয়া, পৃ : ৫১ ও ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/২২৯।
৯১. ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/২২৯।
৯২. প্রাগুক্ত, ৭/২২৯-২২৬।
৯৩. প্রাগুক্ত, ৭/২৩৬-২৩৮।
৯৪. ইবনুল খতীব, আলইহাত্ব, ১/৩৪১, আলমাফাতুল বাদারিয়া, পৃ : ৬২ ও ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/২৪০।