📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুহাম্মাদ ইবনুল আহমার আলফকীহ ও চরম বিশ্বাসঘাতকতা

📄 মুহাম্মাদ ইবনুল আহমার আলফকীহ ও চরম বিশ্বাসঘাতকতা


সুলতান ইয়াকুব আলমানসুর যখন জাবীরীয়াতুল খায়রায় অবস্থান করছিলেন, এ সময় সংবাদ এল, মালাগার প্রশাসক ইন্তেকাল করেছেন। উক্ত প্রশাসক ছিলেন তৎকালে মালাগার শাসনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী বনু আশিফকুল্লা গোষ্ঠীর। প্রয়াত প্রশাসকের স্থলাভিষিক্ত হলেন তার পুত্র। কিন্তু তিনি গ্রানাডা-শাসক মুহাম্মাদ আলফকীহ্-এর উস্কানি থেকে নিষ্কৃতি পেতে মালাগার শাসনভার নিজে গ্রহণ না করে সুলতান ইয়াকুব আলমানসুরের কাছে সোপর্দ করতে চাচ্ছিলেন। উল্লেখ্য, মুহাম্মাদ আলফক্বীহ্ ছিলেন তার মামা। এমনকি অতিষ্ঠ হয়ে তিনি আলমানসুরকে এ কথাও বললেন যে, আপনি যদি মালাগার দায়িত্ব গ্রহণ না করেন, তাহলে আমি তা খৃষ্টানদের হাতে তুলে দেব; তবুও ইবনুল আহমারকে এ অঞ্চলের মালিক হতে দেব না। বাধ্য হয়ে পরিস্থিতির দাবি হিসেবে ইয়াকুব আলমানসুর বনু আশিফকুল্লার দাবি মেনে নিলেন এবং দ্রুত মালাগা পৌঁছে মালাগার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলেন।

নিঃসন্দেহে এটি ছিল ইয়াকুব আলমানসুরের জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি সিদ্ধান্ত। কেননা, তিনি সর্বদা মুহাম্মাদ আলফক্বীহকে আত্মীয়তা ও সদ্গুণে রাখতে আগ্রহী ছিলেন। তিনি জানতেন যে, তার সঙ্গে মুহাম্মাদ আলফক্বীহ্ এর ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি অনেকটা ইউসুফ বিন তাশফীনের সঙ্গে মু’তামিদ বিন আব্বাদের সম্পর্কের মতো। এ শ্রেণির সুবিধাবাদী ও নীতিহীন শাসকেরা মুসলিম ভূখন্ডকে খৃষ্টানশক্তির হাতে তুলে দিতে রাজী হবে; কিন্তু ইউসুফ বিন তাশফীন বা ইয়াকুব আলমানসুরের মতো আন্দালুসের পরম বন্ধুদেরকে আন্দালুসে অবতরণ করতে দিতে রাজী হবে না। হায়! কী নিষ্ঠুর নীতি-বিসর্জন!

এ কথা সত্য যে, ইয়াকুব আলমানসুর কিছুতেই তার অভিযান-তৎপরতাকে বিফল হতে দিতে চাননি। নিশ্চিতভাবে তিনি আন্দালুস-ভূমিতে বনু মারীনের অবস্থান শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, যেন এর মাধ্যমে এ অঞ্চলে খৃষ্টান বাহিনীর আক্রমণ ও সব ধরনের প্রচেষ্টার প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় এবং একই সঙ্গে ইবনুল আহমারের মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকা খৃষ্টানদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন বা খৃষ্টানদের হাতে ইসলামী ভূখন্ডের বিভিন্ন অংশের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার চিন্তাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।

আগে থেকেই আন্দালুসের দক্ষিণ উপকূলের তারীক্ব দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ সুলতান ইয়াকুবের হাতে ছিল এবং সেখানে বনু মারীনের সেনাবাহিনী ছিল। প্রথমবার যখন ইবনুল আহমার তার কাছে সাহায্যের আবেদন করেছিলেন, তখনই তিনি শর্ত দিয়েছিলেন যে, তারীক্ব দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ বনু মারীনকে দিতে হবে, যেন খৃষ্টানদেরকে বিরুদ্ধে প্রয়োজন পড়লে নিকটবর্তী আন্দালুস-ভূমির অভ্যন্তরেও সাহায্যকারী বাহিনী পাওয়া যায় এবং যে কোন সময় মাগরেব থেকে মুসলিম বাহিনীর আন্দালুস-ভূমিতে অবতরণ নিষ্কন্টক হয়।

যা আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা-ই ঘটল। মুহাম্মাদ আলফক্বীহ্ মু’তামিদ বিন আব্বাদের চরিত্রকেই যেন পুনরুজ্জীবিত করলেন। তিনি আশঙ্কা করলেন, আবারও ইউসুফ বিন তাশফীনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে, এবং তিনি হারাতে যাচ্ছেন তার অতি সাধের শাসনক্ষমতা। ইউসুফ বিন তাশফীন যেমন প্রথমে বিভক্ত আন্দালুসের শাসকবর্গকে সহায়তা করেছিলেন, এরপর নিজেই আন্দালুসের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন এবং আন্দালুসকে মুরাব্বিতী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, তেমন ভাবেই হয়তো গ্রানাডাও চলে যাচ্ছে বনু মারীনের সাম্রাজ্যের অধীনে। এসব ভেবে মুহাম্মাদ আলফক্বীহ্ সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি যে কোন মূল্যে বাধার দেওয়াল হয়ে দাঁড়াবেন, যাতে আন্দালুস কিছুতেই বনু মারীনের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হতে না পারে।

কী ভয়াবহ চিন্তা! ফক্বীহ্ উপাধিধারী ফিকরু-শূণ্য এক শাসকের কেমন নীচ মানসিকতাপূর্ণ চিন্তাধারা! অতীতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কী করবেন তিনি? তার মনে যে তপ্ত আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রতিরোধ করতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন তিনি? বাস্তবতা চিন্তা করে মুহাম্মাদ আলফক্বীহ্ উপলব্ধি করলেন যে, ইয়াকুব আলমানসুর আলমারিণীর সঙ্গে লড়াই করার মতো সামর্থ্য তার নেই। তাহলে কী করবেন তিনি?

হীন ও স্বজাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস আবারও মঞ্চস্থ হল। ইতঃপূর্ব্বে মু’তামিদ বিন আব্বাদ যেমন ন্যায়নিষ্ঠ ইউসুফ বিন তাশফীনকে পরাভূত করতে ষষ্ঠ আলফনসোকে সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন, এবার মুহাম্মাদ ইবনুল আহমার আলফক্বীহ্-ও ইসলাম ও মুসলমানদের সঙ্গে একই রকম প্রতারণা করলেন এবং তারীক্ব দ্বীপ থেকে তার যুগের আন্দালুসের রক্ষক ও অকৃত্রিম বন্ধু ইয়াকুব আলমারীনীকে বিতাড়িত করতে ক্যাস্টেলো-শাসক দশম আলফোসোর সাহায্য প্রার্থনা করলেন।

টিকাঃ
৭০১. ইবনুল খতীব, আললমহাতুল বাদরিয়্যা, পৃ: ৪২ ও ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/১৩৭।
৭০২. ইবনুল খতীব, আলইহাতা ২/৬৪৬, আস্সাসুল আলিয়্য, তৃতীয় খন্ড, পৃ: ১২৮ এবং আলনাফাযি, আলইফতিছাল, ৬/৪৮।
৭০৩. দেখূন: ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/১৩০।
৬৯৬. দেখুন : ইবনুস খলদূন, আল ইবরু, জা’মিউল আযম, পৃ. ২৮৬ ও ইবনু খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/২০০।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 ইবনুল আহমার আলফকীহের পুনঃবিশ্বাসঘাতকতা এবং তরীফ দ্বীপের পতন

📄 ইবনুল আহমার আলফকীহের পুনঃবিশ্বাসঘাতকতা এবং তরীফ দ্বীপের পতন


এর একবছর পর ৬৮৬ হিজরীতে সুলতান ইয়াকুব আলমানসুরী আলমারীনী ইন্তেকাল করলে বনু মারীন সাম্রাজ্যে তার স্থলাভিষিক্ত হলেন তার পুত্র ইউসুফ বিন আলমানসুর। তৎক্ষণাৎ ইবনুল আহমার আলফক্বীয় তার কাছে আগমন করেন এবং মিত্রতা ও আনুগত্যের আবেদন জানালেন। ইউসুফ বিন আলমানসুর যখন মাগরেবী বাহিনী নিয়ে আন্দালুসে গমন করেছিলেন এবং খুনটান মোরাবিহীনকে পরাজিত করেছিলেন, তখন উভয়ের মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল এবং ইউসুফ বিন আলমানসুর জাবীরাতুল খায়রা ও তারীক দ্বীপ বাদে মাগরেবী সাম্রাজ্যের অধীন আন্দালুসের সকল সীমান্তশহর ইবনুল আহমারকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ।

এ সময় মাগরেবের সুলতানের নিজের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গোলযোগ দমনে ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে ক্যাস্টেলো-শাসক স্যান্তাফো বনু মারীনের সঙ্গে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করলেন এবং মুসলিম ভূখণ্ডে হামলা চালালেন। সংবাদ পেয়ে সুলতান সাগর পাড়ি দিয়ে আন্দালুসে উপস্থিত হলেন এবং খৃষ্টান রাজ্যে হামলা চালিয়ে তাদের একপর্যায়ে পর্যদুস্ত করলেন।

এবার স্যান্তাফো ব্যবহার করলেন খৃষ্টানদের চিরাচরিত ঢাল। তিনি ইবনুল আহমারকে বার্তা পাঠিয়ে ভয় দেখালেন যে, মারীনী সুলতান তার রাষ্ট্র দখল করে নেবেন। তিনি ইবনুল আহমারকে মিত্রতার প্রস্তাব দিলেন এবং জানালেন যে, তারা উভয় মিলে বনু মারীনকে ভবিষ্যতে আন্দালুসে আগমনে বাধা দেবেন। এর ফলে ইবনুল আহমারের গ্রানাডা রাষ্ট্রও বনু মারীনদের দখলদারিত্বের আশঙ্কা থেকে মুক্ত থাকবে। আর এ পরিকল্পনার অন্যতম অংশ ছিল, তারীক দ্বীপ থেকে বনু মারীনের সামরিক ঘাঁটি উচ্ছেদ করা এবং তারীক দ্বীপ দখল করে নেওয়া।

স্যান্তাফোর প্ররোচনায় আবারও মুহাম্মদ আলফকীহের অন্তরে নানা ধরনের কুমন্ত্রণা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তিনি খৃষ্টান শাসকের পাতা মরণ ফাঁদে আটকে গেলেন। বেচারা একবিন্দুও ভাবলেন না যে, এর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে তিনি আত্মহননের পথেই বেছে নিচ্ছেন। তিনি স্যান্তাফোর প্রস্তাবে সম্মতি জানালেন এবং শর্ত দিলেন যে, দখল করার পর তারীক দ্বীপের মালিকানা তার হাতে থাকবে। বিনিময়ে তিনি ক্যাস্টেলো-শাসককে তার অধিকারে থাকা ছয়টি দুর্গের নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করবেন। চুক্তি অনুযায়ী স্যান্তাফো তারীক দ্বীপ অবরোধ করবেন এবং ইবনুল আহমাদ রসদ, খাবার ইত্যাদি প্রদান করে খৃষ্টান বাহিনীকে সহায়তা করবেন। দীর্ঘ অবরোধের পর দ্বীপবাসীর শক্তি নিঃশেষ হয়ে এলো। তারা বাধ্য হয়ে কিছু শর্তসাপেক্ষে ক্যাস্টেলো বাহিনীর কাছে নতি স্বীকার করল।

আগের বার ব্যর্থ হলেও এবার খৃষ্টান বাহিনী তারীক দ্বীপে এসে ব্যর্থ হল না। তারা তারীক দ্বীপ দখল করে নিল। কিন্তু দখল করার পর তারা আর সেখানে থেকে ফিরে গেল না এবং ইবনুল আহমাদকেও এর নিয়ন্ত্রণ বুঝিয়ে দিল না। ইবনুল আহমাদ দুই কুলই হারালেন এবং তার এই অমার্জনীয় অপরাধ ও চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তারীক দ্বীপের পতন ঘটল।

ভৌগোলিক দিক থেকে তারীক দ্বীপে অবস্থান ছিল মুসলিম আন্দালুসের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাবালে তারীক প্রণালী পর্যন্ত এর সীমানা প্রসারিত। সুতরাং তারীক দ্বীপের পতনের অর্থ হল আন্দালুসের সঙ্গে মাগরেবের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং মাগরেব থেকে মুসলিম আন্দালুসে সামরিক সাহায্য আগমনের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া।

টিকাঃ
৭০৩. ইবনুল বন্দ্বুল, রু’উল হাল্লাল, পৃ: ৮৯-৯০ ও ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/২৩০।
৭০৪. ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/২০১।
৮৭. ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/২১৯ ও আলনাসিরী, আলইস্তিকসা, ৩/৭১।
৮৮. ইবনুল খতীব, আলইহাত্ব, ১/৪৫৬, আলমাফাতুল বাদারিয়া, পৃ : ৪২ ও ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/২২৯।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 আবু আবদুল্লাহ ইবনুল হাকীম ও ভয়াবহ কিছু পদক্ষেপ

📄 আবু আবদুল্লাহ ইবনুল হাকীম ও ভয়াবহ কিছু পদক্ষেপ


৭৩১ হিজরীতে (১৩০২ খৃষ্টাব্দে) গ্রানাডা-শাসক ইবনুল আহমার আলফকীহ ইন্তেকাল করলেন। তার স্থলাভিষিক্ত হলেন তৃতীয় মুহাম্মাদ, যার উপাধি ছিল আল-মাখলু’ বা অপসারিত শাসক। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল মনোভাপন্ন একজন শাসক। তার শাসনকালে প্রকৃতপক্ষে গ্রানাডার রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল তদীয় উযীর আবু আবদুল্লাহ ইবনুল হাকীমের হাতে। 'হাকীম' পরিচয় ধারণকারী এই উযীর সাহেবও কিন্তু মোটেই হাকীম (প্রজ্ঞাবান) ছিলেন না। তিনি মাগরেবের সুলতানের পরিবর্তে মিত্রতা স্থাপন করেছিলেন ক্যাস্টেলোর শাসকের সঙ্গে।

উভয় আবু আবদুল্লাহ কেবল মাগরেবী সুলতানদের সঙ্গে মিত্রতা ত্যাগ করেই শান্ত হলেন না; বরং বনু আহমারের পূর্ববর্তী শাসকবৃন্দের কীর্তিকে অতিক্রম করে আরও অগ্রসর হলেন এবং এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন, যা ভাবলেও পরিণতি-আশঙ্কায় ললাট ঘর্মাক্ত হয়ে ওঠে। তিনি সিউটাবাসীকে সুলতান ইউসুফ আলমারিনীর আনুগত্য ত্যাগ করে ইবনুল আহমারের আনুগত্য মেনে নেয়ার জন্য এবং সে কাজে হস্তক্ষেপ করতে তার ভাই মালার প্রশাসককে প্ররোচিত করলেন। এরপর নিজেই সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে যুদ্ধ করতে রওয়ানা হলেন। পাঠক মনে প্রশ্ন- কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে? গ্রানাডার সার্বভৌমত্বের জন্য সার্বক্ষণিক হুমকি খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে, নাকি অন্য কারও বিরুদ্ধে?

উত্তর বড় বেদনাদায়ক। তিনি তার বাহিনী নিয়ে বনু মারীনের সাম্রাজ্যে হামলা চালালেন এবং জাবালে তারীক প্রণালীতে নিজের ক্ষমতা সুদৃঢ় করতে সিউটা নগরী দখল করে নিলেন। এরপর সিউটাবাসীরা নিরাপত্তা ঘোষণা করে সিউটার অপসারিত প্রশাসককে গ্রানাডায় পাঠিয়ে দিল।

বনু মারীনের শাসনব্যবস্থাকে আরও নড়বড়ে করার লক্ষ্যে এরপর এক মাগরেবী ব্যক্তিই অগ্রসর হল। আন্দালুসে বসবাসরত বনু মারীন গোত্রেরই উসমান বিন আবিল আ'লা নামক জনৈক ব্যক্তি সিউটা থেকে মাগরেব দখল করতে রওয়ানা হল। মাগরেবের তৎকালীন অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও তাকে সহায়তা করল। এই প্রেক্ষাপটে সুলতান ইউসুফ আলমারিনী নিহত হলেন এবং তার মৃত্যুর পর ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে তার দু’ পুত্র আবু সালিম ও আবু সাবিত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লেন। শেষ পর্যন্ত আবু সাবিতই জয়ী হলেন এবং তিনিই সিংহাসনে আসীন হলেন। এর অল্প কিছুদিন পরেই আবু সাবিতের মৃত্যু হল এবং তার স্থলাভিষিক্ত হলেন তার ভাই আবুর রবী’ সুলাইমান। বিদ্রোহী উসমান বিন আবিল আ'লাকে তিনিই পরাজিত করলেন। পরাজিত উসমান বিন আবিল আ'লা নিফল মনোরথে আন্দালুসে চলে গেলেন।

নিসন্দেহে এ ঘটনাপ্রবাহ ছিল দৃষ্টান্তহীন চরম অদূরদর্শিতার ফলাফল। নিসন্দেহে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ বলুন কিংবা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ, কোন দিক থেকেই এ ধরনের নির্লিপ্ততাকে মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু যা হওয়ার নয়, তা-ই হল। এদিকে গ্রানাডা-শাসক ও গ্রানাডার উযীরের এই নির্লিপ্ততার অনিবার্য পরিণতিতেই গ্রানাডায় আলমাখলু’-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংঘটিত হল এবং তার অপসারণের পর তার স্থলাভিষিক্ত হলেন তার ভাই আবুল জুয়ুস নাসর। খৃষ্টানশক্তি এ পরিস্থিতির সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাল এবং জাবালে তারীক হামলা চালাল। ৭৩১ হিজরীতে (১৩০৯ খৃষ্টাব্দে) খৃষ্টান বাহিনীর হাতে জাবালে তারীকের পতন ঘটল এবং মুসলিম আন্দালুস তার একমাত্র মুসলিম প্রতিবেশী ও ওপারের মাগরেব থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। এখন কেবল গ্রানাডার অবধারিত ও সুনিশ্চিত পরিণতির প্রহর গুনার পালা।

টিকাঃ
৮৯. ইবনে বদ্রুন, আদ্বাহীরাহ, ১/৪৪৪-৪৪৫, আলমাফাতুল বাদারিয়া, পৃ : ৪৬ ও ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/২২৯।
৯০. ইবনুল খতীব, আলইহাত্ব, ১/৩৪৫, আলমাফাতুল বাদারিয়া, পৃ : ৫১ ও ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/২২৯।
৯১. ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/২২৯।
৯২. প্রাগুক্ত, ৭/২২৯-২২৬।
৯৩. প্রাগুক্ত, ৭/২৩৬-২৩৮।
৯৪. ইবনুল খতীব, আলইহাত্ব, ১/৩৪১, আলমাফাতুল বাদারিয়া, পৃ : ৬২ ও ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/২৪০।

ফন্ট সাইজ
15px
17px