📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 প্রথম মুহাম্মাদের মৃত্যু এবং মুহাম্মাদ আলফকীহের ক্ষমতাগ্রহণ

📄 প্রথম মুহাম্মাদের মৃত্যু এবং মুহাম্মাদ আলফকীহের ক্ষমতাগ্রহণ


৬৭১ হিজরীতে (১২৭৩ খৃস্টাব্দে) প্রায় আশি বছর বয়সে গ্রানাডা শাসক প্রথম মুহাম্মাদ মৃত্যুবরণ করেন এবং তার পুত্র তার স্থলাভিষিক্ত হন। পিতা-পুত্রের উভয়ের নামই ছিল মুহাম্মাদ; বরং বনূ আহমারের অধিকাংশ শাসকই তাদের পুত্রের নাম মুহাম্মাদ রেখেছিলেন। নতুন শাসকের পুরো নাম মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ ইবনুল আহমার। পিতার শাসনামলে যেহেতু তিনি এলমে দ্বীন অন্বেষণে সচেষ্ট ছিলেন, তাই জনগণ তাকে 'ফকীহ' উপাধি প্রদান করে এবং তিনি পরিচিত ছিলেন 'মুহাম্মাদ আলফাক্বীহ' নামে।

শাসনভার লাভ করার পর মুহাম্মাদ আলফাক্বীহ তার রাষ্ট্রের সার্বিক অবস্থার ওপর নজর বোলালেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, উত্তরের খৃস্টানশক্তির মোকাবেলায় আন্দালুসের মুসলিম শক্তি কিছুতেই অটল-অবিচল থাকতে পারবে না। এদিকে তার পিতা প্রথম মুহাম্মাদের মৃত্যুর পর থেকে দশম আলফানসো তার রাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি দেখলেন যে, গ্রানাডা রাষ্ট্রের প্রশাসন ও সামরিক শক্তি এবার ভেঙে পড়েছে। তাই তিনি কালবিলম্ব না করে নতুন করে গ্রানাডা রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে হামলা চালাতে শুরু করেছেন। সবদিক বিবেচনা করে মুহাম্মাদ আলফাক্বীহ একটি পথই খুঁজে পেলেন; হ্যাঁ, বহিরাষ্টের সাহায্য কামনা। অধিকন্তু তার পিতাও মৃত্যুর পূর্বে তাকে মাগরেবের আমীরুল মুসলিহীন ইয়াকুব আলমানসুর আলমারিনী-এর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ওসিয়তও করেছিলেন।

বনূ মারীন সরকার সাহায্যে আহ্বানে সাড়া দিল। ৬৭৪ হিজরীর সফর মাসে আলমানসুর আলমারিনী প্রথমবার আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আন্দালুসে পা রাখলেন। নিজের আন্দালুস-অভিযানের প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য এর একবছর পূর্বে তিনি তার পুত্রের নেতৃত্বে পাঁচ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী জিব্রাল্টার প্রণালীতে প্রেরণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ইয়াকুব আলমানসুরের সমগ্র আন্দালুস-অভিযানের জন্য এই জিব্রাল্টার ছিল আন্দালুস-ভূমিতে তার অস্থায়ী ঘাঁটি।

টিকাঃ
৯৯৫. দেখন : ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/১৮৬।
৯৯৬. ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/১৮৬।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 ডনোনিয়ার যুদ্ধ ও নিরঙ্কুশ বিজয়

📄 ডনোনিয়ার যুদ্ধ ও নিরঙ্কুশ বিজয়


এমন প্রেক্ষাপটে গ্রানাডা থেকে অদূরে কর্ডোভার কাছাকাছি এলাকায় মুসলিম বাহিনী ক্যাসটেলা বাহিনীর মুখোমুখি হল। ক্যাসটেলা বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল ক্যাসটেলার বিখ্যাত যোদ্ধা ও সেনাপতি ডন লোরিয়ো ডি লারা। তার নামেই এ যুদ্ধের নামকরণ করা হয় এবং এ যুদ্ধটি 'ডনোনিয়ার যুদ্ধ' নামে খ্যাতি লাভ করে।

৬৭৪ হিজরীতে (১২৭৬ খৃস্টাব্দে) সংঘটিত হল ডনোনিয়ার যুদ্ধ। মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে বনূ মারীন রাষ্ট্রের প্রধান আমীরুল মুসলিমীন ইয়াকুব আলমানসুর আলমারিনী। তিনি নিজে জনসাধারণের মাঝে ইমানী চেতনা উদ্বুদ্ধ করলেন। যুদ্ধের প্রাক্কালে তিনি মুসলিম বাহিনীর উদ্দেশ্যে উপদেশ ভাষণে বললেন, শোন! জান্নাত তোমাদের জন্য আপন দ্বারসমূহ উন্মুক্ত করে দিয়েছে আর হুর ও গেলমানদের সুসজ্জিত করে রেখেছে। সুতরাং তোমাদের মন জান্নাতের দিকে ধাবিত হোক এবং জান্নাতের সওদা করতে গিয়ে আপন প্রাণ-সম্পদ ব্যয় কর। শোন, জান্নাত তো তরবারীর ছায়াতলে। এরপর তিনি মুসলিম বাহিনীকে উদ্বুদ্ধ করতে তেলাওয়াত করলেন কোরআনের চির শাশ্বত ঘোষণা:

বস্তুত আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও তাদের সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন, তাদের জন্য জান্নাত আছে—এর বিনিময়ে। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে। ফলে তারা হত্যা করে এবং নিজেরা নিহত হয়। এটা এক সত্য প্রতিশ্রুতি, যা আল্লাহ তাওরাত ও ইনজিলেও নিয়েছেন এবং কোরআনেও। আল্লাহ অপেক্ষা প্রতিজ্ঞা রক্ষাকারী আর কে আছে? সুতরাং তোমরা আল্লাহর সঙ্গে যে সওদা করেছ, সেই সওদার জন্য আনন্দিত হও এবং এটাই মহা সাফল্য। [সূরা তাওবা : ১১১]

এরপর তিনি বললেন, সুতরাং এই প্রভূত লাভের ব্যবসাকে সুবর্ণ সুযোগ মনে কর এবং এর এবং সৎকর্মের মাধ্যমে জান্নাতের দিকে অগ্রসর হও। তোমাদের মধ্যে যারা শাহাদাত বরণ করবে, তারা তো লাভ করবে শাশ্বত জীবনের গৌরব; আর যারা জীবিত থাকবে, তারা আপন পরিবারের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে নিরাপদ অবস্থায় পার্থিব গণীমত ও পরকালের অফুরান সাওয়াবের সম্পদ নিয়ে প্রশংসিত অবস্থায়।

হে মুমিনগণ! সবর অবলম্বন কর, মোকাবিলার সময় অবিচলতা প্রদর্শন কর এবং সীমান্ত রক্ষায় স্থির থাক। আর আল্লাহকে ভয় করে চল, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। [সূরা আলে-ইমরান : ২০০]

আন্দালুসী ও অন্যান্য সিপাহসালার, সংযুক্ত ইমানী চেতনায় উজ্জীবিত ও জান্নাতের সওদায় পূর্ণ প্রস্তুত আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া মাগরেবের সৈনিকদল—দশ হাজারেরও কমসংখ্যক বীর যোদ্ধার এই বাহিনীর মাধ্যমেই তারা ক্যাসটেলা রাজ্যের বিশাল বাহিনীকে পরাভূত করল এবং অর্জন করল এক মহান ও গৌরবময় বিজয়। যুদ্ধে খৃস্টান বাহিনীর ছয় হাজার সৈন্য নিহত হল, বন্দী হল সাত-আট হাজার। বাহিনীর প্রধান ডন লোরিয়ো নিজেও এ যুদ্ধে নিহত হল। মুসলিম বাহিনী প্রচুর গণীমত লাভ করল। ৬৭৪ হিজরীতে সংঘটিত এ যুদ্ধের মতো এমন নিরঙ্কুশ বিজয় আন্দালুসে ইতিপূর্বে খুব কম যুদ্ধেই অর্জিত হয়েছিল।

বিজয়ের পর আলমানসুর জাবীরাতুল খায়রায় ফিরে এলেন এবং কয়েকদিন সেখানে অবস্থান করে গণীমতের সম্পদ বণ্টন করলেন। এ সময় তিনি আটলান্টিকের ওপারের মুসলিম জনগণের কাছে মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের সংবাদ পাঠালেন এবং গ্রানাডা-শাসক ইবনুল আহমারের কাছেও সংবাদবাহক পাঠিয়ে বিজয়-সংবাদ পৌঁছে দিলেন। এরপর তিনি তার বাহিনী নিয়ে সেভিলের নগর-সীমান্তে পৌঁছালেন। মুসলিম বাহিনী দুর্গবেষ্টিত সেভিল নগরী অবরোধ করলো। প্রতিরোধ করতে গিয়ে সেভিলের খৃষ্টান বাহিনীর বহু সৈন্য হতাহত বা বন্দী হল। এরপর তিনি সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নিয়ে শারিসে পৌঁছালেন এবং শারিস নগরীও অবরোধ করলেন। এরপর সেখান থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করে জাবীরাতুল খায়রায় ফিরে এলেন।

এ যুদ্ধের তিন বছর পর ৬৭৭ হিজরীতে (১২৭৯ খৃষ্টাব্দে) সেভিলের খৃষ্টান গোষ্ঠী আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সংবাদ পেয়ে ইয়াকুব আলমানসুর আলমারিণী আবারও তার বাহিনী নিয়ে সেভিলে পৌঁছালেন এবং আবারও সেভিল অবরোধ করলেন। দীর্ঘ সময়ের অবরোধের পর সেভিলের খৃষ্টান কর্তৃপক্ষ জিবিয়া প্রদানের শর্তে ইয়াকুব আলমানসুরের সঙ্গে সন্ধি করল। এরপর তিনি কর্ডোভা অভিমুখী হলেন এবং কর্ডোভা অবরোধ করলেন। কর্ডোভাও জিবিয়া প্রদানের শর্তে নতি স্বীকার করল।

তৎকালীন আন্দালুসের খৃষ্টান গোষ্ঠী যে কোন মূল্যে তাদের নগরীগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে উদ্যোগী ছিল। তারা এসব নগরীর প্রাচীর ও দূর্গগুলোর কারণে নিশ্চিত নিরাপত্তা লাভ করেছিল। বরং বলা ভালো, এগুলো সেসব নগরপ্রাচীর ও দূর্গ, যা ইতঃপূর্বে মুসলমানরাই নিজেদের নগরীর নিরাপত্তার জন্য নির্মাণ করেছিল। কিন্তু দশম আলফনসো সেসব মুসলিম শাসকগণের মতো ভীরু, কাপুরুষ ও দূর্বল ছিলেন না, যারা এসব নগরীর পতনের সময় মুসলমানদের শাসনকর্তা ছিল এবং বীরত্ব প্রদর্শনের পরিবর্তে ভীরুতা ও কাপুরুষতার পরিচয় দিয়ে এসব নগরীর কর্তৃত্ব খৃষ্টানশক্তির হাতে তুলে দিয়েছিল। এমনকি তারা এসব নগরী দখলের ক্ষেত্রে খৃষ্টান বাহিনীকে সহায়তাও করেছিল।

মাররেবে ফিরে আসার পূর্বে ইউসুফ বিন তাশফীন বিতন্ড মুসলিম আন্দালুসের শাসকবর্গকে একত্র করে ঐকবদ্ধ থাকার এবং হানাহানি ও সংঘাত পরিহার করার নির্দেশ দিলেন, যেন তাদের নির্লজ্জতার কারণে এই মহান বিজয়ের সুফল বিনষ্ট না হয়। এরপর এই দুর্দমনীয় মুসলিম বীর ফিরে গেলেন নিজ দেশে। এ সময় তার বয়স ছিল ঊনআশি বছর! তিনি চাইলেই পারতেন নির্জন মরুভূমি ও উত্তাল সাগর পাড়ি দেওয়ার কষ্ট সহ্য না করতে। চাইলেই পারতেন যুদ্ধক্ষেত্রের দুর্যোগ-দুর্বিপাক ও রক্তপাত থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করতে। তিনি পারতেন অজানা ভূমির অচেনা পরিবেশে নিজে না গিয়ে মাগরেবে অবস্থান করতে এবং তার কোন সেনাপতিকে আন্দালুসে প্রেরণ করতে। কিন্তু তিনি এই বয়সেও সব কঠিন বাধাকে জয় করেছেন এবং ঘোড়ার পিঠে চড়ে রণাঙ্গনে ছুটে বেড়িয়েছেন। তার চেতনা ও প্রেরণা ছিল কবির ভাষায়,

কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য তুমি যখন ঝুঁকি নেবে, তাহলে সুদূর আকাশের তারকারাজি ছোঁয়ার পূর্বে থামবে না। কেননা, তুচ্ছ লক্ষ্য অর্জনে ভোগ করা মৃত্যুর স্বাদ তো গুরুত্বপূর্ণ কোন মিশন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে লাভ করা মৃত্যু-স্বাদের তুলনায় ভিন্ন কিছু নয়।

যাত্রাকার যুদ্ধের জ্ঞানী-গুণী, প্রতিভাশালী আলিমসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকেই শহীদ হয়েছিলেন। যেমন, নবীজীকে স্বপ্নে দেখা ইবনে রুমাইলা, মাররাকিশের কাজী আবু মারওয়ান আবদুল মালিক মাহমুদীয়ী প্রমুখ। আল্লাহু তাআ’লা তাদের সকলকে রহমতের বারিধারায় সিক্ত করুন।

টিকাঃ
৯৯১. 'ইবনে আবি যারা', আযযাহাফিয়াতুস সানিয়া, পৃ : ১৪৪-১৪৬ ও ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/১৯১-১৯২।
৯৯২. 'ইবনে আবি যারা', আযযাহাফিয়াতুস সানিয়া, পৃ : ১৪৮।
৯৯৩. 'ইবনে আবি যারা', আযযাহাফিয়াতুস সানিয়া, পৃ : ১৪৪-১৪৬।
৯৯৪. 'ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/১৯০।
৬৯৬. ইবনে আবি যারা’, আযযাহিয়াতুল মাদিন্না, পৃ: ১২৫ ও ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/১৩০।
৬৯৭. ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/১৩০-১৩৭।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুহাম্মাদ ইবনুল আহমার আলফকীহ ও চরম বিশ্বাসঘাতকতা

📄 মুহাম্মাদ ইবনুল আহমার আলফকীহ ও চরম বিশ্বাসঘাতকতা


সুলতান ইয়াকুব আলমানসুর যখন জাবীরীয়াতুল খায়রায় অবস্থান করছিলেন, এ সময় সংবাদ এল, মালাগার প্রশাসক ইন্তেকাল করেছেন। উক্ত প্রশাসক ছিলেন তৎকালে মালাগার শাসনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী বনু আশিফকুল্লা গোষ্ঠীর। প্রয়াত প্রশাসকের স্থলাভিষিক্ত হলেন তার পুত্র। কিন্তু তিনি গ্রানাডা-শাসক মুহাম্মাদ আলফকীহ্-এর উস্কানি থেকে নিষ্কৃতি পেতে মালাগার শাসনভার নিজে গ্রহণ না করে সুলতান ইয়াকুব আলমানসুরের কাছে সোপর্দ করতে চাচ্ছিলেন। উল্লেখ্য, মুহাম্মাদ আলফক্বীহ্ ছিলেন তার মামা। এমনকি অতিষ্ঠ হয়ে তিনি আলমানসুরকে এ কথাও বললেন যে, আপনি যদি মালাগার দায়িত্ব গ্রহণ না করেন, তাহলে আমি তা খৃষ্টানদের হাতে তুলে দেব; তবুও ইবনুল আহমারকে এ অঞ্চলের মালিক হতে দেব না। বাধ্য হয়ে পরিস্থিতির দাবি হিসেবে ইয়াকুব আলমানসুর বনু আশিফকুল্লার দাবি মেনে নিলেন এবং দ্রুত মালাগা পৌঁছে মালাগার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলেন।

নিঃসন্দেহে এটি ছিল ইয়াকুব আলমানসুরের জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি সিদ্ধান্ত। কেননা, তিনি সর্বদা মুহাম্মাদ আলফক্বীহকে আত্মীয়তা ও সদ্গুণে রাখতে আগ্রহী ছিলেন। তিনি জানতেন যে, তার সঙ্গে মুহাম্মাদ আলফক্বীহ্ এর ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি অনেকটা ইউসুফ বিন তাশফীনের সঙ্গে মু’তামিদ বিন আব্বাদের সম্পর্কের মতো। এ শ্রেণির সুবিধাবাদী ও নীতিহীন শাসকেরা মুসলিম ভূখন্ডকে খৃষ্টানশক্তির হাতে তুলে দিতে রাজী হবে; কিন্তু ইউসুফ বিন তাশফীন বা ইয়াকুব আলমানসুরের মতো আন্দালুসের পরম বন্ধুদেরকে আন্দালুসে অবতরণ করতে দিতে রাজী হবে না। হায়! কী নিষ্ঠুর নীতি-বিসর্জন!

এ কথা সত্য যে, ইয়াকুব আলমানসুর কিছুতেই তার অভিযান-তৎপরতাকে বিফল হতে দিতে চাননি। নিশ্চিতভাবে তিনি আন্দালুস-ভূমিতে বনু মারীনের অবস্থান শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, যেন এর মাধ্যমে এ অঞ্চলে খৃষ্টান বাহিনীর আক্রমণ ও সব ধরনের প্রচেষ্টার প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় এবং একই সঙ্গে ইবনুল আহমারের মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকা খৃষ্টানদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন বা খৃষ্টানদের হাতে ইসলামী ভূখন্ডের বিভিন্ন অংশের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার চিন্তাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।

আগে থেকেই আন্দালুসের দক্ষিণ উপকূলের তারীক্ব দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ সুলতান ইয়াকুবের হাতে ছিল এবং সেখানে বনু মারীনের সেনাবাহিনী ছিল। প্রথমবার যখন ইবনুল আহমার তার কাছে সাহায্যের আবেদন করেছিলেন, তখনই তিনি শর্ত দিয়েছিলেন যে, তারীক্ব দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ বনু মারীনকে দিতে হবে, যেন খৃষ্টানদেরকে বিরুদ্ধে প্রয়োজন পড়লে নিকটবর্তী আন্দালুস-ভূমির অভ্যন্তরেও সাহায্যকারী বাহিনী পাওয়া যায় এবং যে কোন সময় মাগরেব থেকে মুসলিম বাহিনীর আন্দালুস-ভূমিতে অবতরণ নিষ্কন্টক হয়।

যা আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা-ই ঘটল। মুহাম্মাদ আলফক্বীহ্ মু’তামিদ বিন আব্বাদের চরিত্রকেই যেন পুনরুজ্জীবিত করলেন। তিনি আশঙ্কা করলেন, আবারও ইউসুফ বিন তাশফীনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে, এবং তিনি হারাতে যাচ্ছেন তার অতি সাধের শাসনক্ষমতা। ইউসুফ বিন তাশফীন যেমন প্রথমে বিভক্ত আন্দালুসের শাসকবর্গকে সহায়তা করেছিলেন, এরপর নিজেই আন্দালুসের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন এবং আন্দালুসকে মুরাব্বিতী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, তেমন ভাবেই হয়তো গ্রানাডাও চলে যাচ্ছে বনু মারীনের সাম্রাজ্যের অধীনে। এসব ভেবে মুহাম্মাদ আলফক্বীহ্ সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি যে কোন মূল্যে বাধার দেওয়াল হয়ে দাঁড়াবেন, যাতে আন্দালুস কিছুতেই বনু মারীনের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হতে না পারে।

কী ভয়াবহ চিন্তা! ফক্বীহ্ উপাধিধারী ফিকরু-শূণ্য এক শাসকের কেমন নীচ মানসিকতাপূর্ণ চিন্তাধারা! অতীতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কী করবেন তিনি? তার মনে যে তপ্ত আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রতিরোধ করতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন তিনি? বাস্তবতা চিন্তা করে মুহাম্মাদ আলফক্বীহ্ উপলব্ধি করলেন যে, ইয়াকুব আলমানসুর আলমারিণীর সঙ্গে লড়াই করার মতো সামর্থ্য তার নেই। তাহলে কী করবেন তিনি?

হীন ও স্বজাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস আবারও মঞ্চস্থ হল। ইতঃপূর্ব্বে মু’তামিদ বিন আব্বাদ যেমন ন্যায়নিষ্ঠ ইউসুফ বিন তাশফীনকে পরাভূত করতে ষষ্ঠ আলফনসোকে সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন, এবার মুহাম্মাদ ইবনুল আহমার আলফক্বীহ্-ও ইসলাম ও মুসলমানদের সঙ্গে একই রকম প্রতারণা করলেন এবং তারীক্ব দ্বীপ থেকে তার যুগের আন্দালুসের রক্ষক ও অকৃত্রিম বন্ধু ইয়াকুব আলমারীনীকে বিতাড়িত করতে ক্যাস্টেলো-শাসক দশম আলফোসোর সাহায্য প্রার্থনা করলেন।

টিকাঃ
৭০১. ইবনুল খতীব, আললমহাতুল বাদরিয়্যা, পৃ: ৪২ ও ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/১৩৭।
৭০২. ইবনুল খতীব, আলইহাতা ২/৬৪৬, আস্সাসুল আলিয়্য, তৃতীয় খন্ড, পৃ: ১২৮ এবং আলনাফাযি, আলইফতিছাল, ৬/৪৮।
৭০৩. দেখূন: ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/১৩০।
৬৯৬. দেখুন : ইবনুস খলদূন, আল ইবরু, জা’মিউল আযম, পৃ. ২৮৬ ও ইবনু খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/২০০।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 ইবনুল আহমার আলফকীহের পুনঃবিশ্বাসঘাতকতা এবং তরীফ দ্বীপের পতন

📄 ইবনুল আহমার আলফকীহের পুনঃবিশ্বাসঘাতকতা এবং তরীফ দ্বীপের পতন


এর একবছর পর ৬৮৬ হিজরীতে সুলতান ইয়াকুব আলমানসুরী আলমারীনী ইন্তেকাল করলে বনু মারীন সাম্রাজ্যে তার স্থলাভিষিক্ত হলেন তার পুত্র ইউসুফ বিন আলমানসুর। তৎক্ষণাৎ ইবনুল আহমার আলফক্বীয় তার কাছে আগমন করেন এবং মিত্রতা ও আনুগত্যের আবেদন জানালেন। ইউসুফ বিন আলমানসুর যখন মাগরেবী বাহিনী নিয়ে আন্দালুসে গমন করেছিলেন এবং খুনটান মোরাবিহীনকে পরাজিত করেছিলেন, তখন উভয়ের মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল এবং ইউসুফ বিন আলমানসুর জাবীরাতুল খায়রা ও তারীক দ্বীপ বাদে মাগরেবী সাম্রাজ্যের অধীন আন্দালুসের সকল সীমান্তশহর ইবনুল আহমারকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ।

এ সময় মাগরেবের সুলতানের নিজের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গোলযোগ দমনে ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে ক্যাস্টেলো-শাসক স্যান্তাফো বনু মারীনের সঙ্গে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করলেন এবং মুসলিম ভূখণ্ডে হামলা চালালেন। সংবাদ পেয়ে সুলতান সাগর পাড়ি দিয়ে আন্দালুসে উপস্থিত হলেন এবং খৃষ্টান রাজ্যে হামলা চালিয়ে তাদের একপর্যায়ে পর্যদুস্ত করলেন।

এবার স্যান্তাফো ব্যবহার করলেন খৃষ্টানদের চিরাচরিত ঢাল। তিনি ইবনুল আহমারকে বার্তা পাঠিয়ে ভয় দেখালেন যে, মারীনী সুলতান তার রাষ্ট্র দখল করে নেবেন। তিনি ইবনুল আহমারকে মিত্রতার প্রস্তাব দিলেন এবং জানালেন যে, তারা উভয় মিলে বনু মারীনকে ভবিষ্যতে আন্দালুসে আগমনে বাধা দেবেন। এর ফলে ইবনুল আহমারের গ্রানাডা রাষ্ট্রও বনু মারীনদের দখলদারিত্বের আশঙ্কা থেকে মুক্ত থাকবে। আর এ পরিকল্পনার অন্যতম অংশ ছিল, তারীক দ্বীপ থেকে বনু মারীনের সামরিক ঘাঁটি উচ্ছেদ করা এবং তারীক দ্বীপ দখল করে নেওয়া।

স্যান্তাফোর প্ররোচনায় আবারও মুহাম্মদ আলফকীহের অন্তরে নানা ধরনের কুমন্ত্রণা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তিনি খৃষ্টান শাসকের পাতা মরণ ফাঁদে আটকে গেলেন। বেচারা একবিন্দুও ভাবলেন না যে, এর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে তিনি আত্মহননের পথেই বেছে নিচ্ছেন। তিনি স্যান্তাফোর প্রস্তাবে সম্মতি জানালেন এবং শর্ত দিলেন যে, দখল করার পর তারীক দ্বীপের মালিকানা তার হাতে থাকবে। বিনিময়ে তিনি ক্যাস্টেলো-শাসককে তার অধিকারে থাকা ছয়টি দুর্গের নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করবেন। চুক্তি অনুযায়ী স্যান্তাফো তারীক দ্বীপ অবরোধ করবেন এবং ইবনুল আহমাদ রসদ, খাবার ইত্যাদি প্রদান করে খৃষ্টান বাহিনীকে সহায়তা করবেন। দীর্ঘ অবরোধের পর দ্বীপবাসীর শক্তি নিঃশেষ হয়ে এলো। তারা বাধ্য হয়ে কিছু শর্তসাপেক্ষে ক্যাস্টেলো বাহিনীর কাছে নতি স্বীকার করল।

আগের বার ব্যর্থ হলেও এবার খৃষ্টান বাহিনী তারীক দ্বীপে এসে ব্যর্থ হল না। তারা তারীক দ্বীপ দখল করে নিল। কিন্তু দখল করার পর তারা আর সেখানে থেকে ফিরে গেল না এবং ইবনুল আহমাদকেও এর নিয়ন্ত্রণ বুঝিয়ে দিল না। ইবনুল আহমাদ দুই কুলই হারালেন এবং তার এই অমার্জনীয় অপরাধ ও চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তারীক দ্বীপের পতন ঘটল।

ভৌগোলিক দিক থেকে তারীক দ্বীপে অবস্থান ছিল মুসলিম আন্দালুসের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাবালে তারীক প্রণালী পর্যন্ত এর সীমানা প্রসারিত। সুতরাং তারীক দ্বীপের পতনের অর্থ হল আন্দালুসের সঙ্গে মাগরেবের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং মাগরেব থেকে মুসলিম আন্দালুসে সামরিক সাহায্য আগমনের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া।

টিকাঃ
৭০৩. ইবনুল বন্দ্বুল, রু’উল হাল্লাল, পৃ: ৮৯-৯০ ও ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/২৩০।
৭০৪. ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/২০১।
৮৭. ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/২১৯ ও আলনাসিরী, আলইস্তিকসা, ৩/৭১।
৮৮. ইবনুল খতীব, আলইহাত্ব, ১/৪৫৬, আলমাফাতুল বাদারিয়া, পৃ : ৪২ ও ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৭/২২৯।

ফন্ট সাইজ
15px
17px