📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 ইয়াকুব আলমানসুর আলমারীনী : এক সংগ্রামী পুরুষ

📄 ইয়াকুব আলমানসুর আলমারীনী : এক সংগ্রামী পুরুষ


ইয়াকুব আলমানসুর আলমারিনী-এর পরিচয় প্রদান করতে গিয়ে তার সমসাময়িক ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, তিনি ছিলেন অধিক রোযা ও অধিক কিয়ামুল লাইলের আমলকারী। সর্বদা যিকিরের হালতে থাকতেন, আখেরাতের চিন্তায় নিমগ্ন থাকতেন। দিনের অধিকাংশ সময় যিকির করতেন আর রাতের অধিকাংশ সময় নামাযে দণ্ডায়মান থাকতেন। সৎ লোকের সম্মান করতেন, দরিদ্রদের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিপূর্ণ ও আন্তরিক আচরণ করতেন। আহলে দ্বীনের সামনে বিনয়ী থাকতেন, রক্তপাত যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতেন। উদার ও বদান্য ছিলেন, যুদ্ধে সর্বদা বিজয়ী হয়েছেন এবং সৌভাগ্য চিরদিন তাঁর সহায় ছিল। তার বহন করা নেতৃত্বের পতাকা কোনদিন অবনমিত হয়নি; তার পরিচালিত বাহিনী কোনদিন ভাঙ্গনের শিকার হয়নি। যে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, তাকে পরাভূত করেছেন। যে বাহিনীর মোকাবেলা করেছেন, তাকেই পরাজিত ও বিনাশ করেছেন। যে নগরী ও দেশকে লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেছেন, তা-ই জয় করেছেন।

ইয়াকুব আলমানসুর আলমারিনী রহ.-এর এসব মহান বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি তো ইসলামের ইতিহাসের সকল বিজয়ী সেনানায়কের গুণাবলি। আজকের মুসলমানদের কর্তব্য, এসব গুণ ও বৈশিষ্ট্যের সামনে কিছুক্ষণের জন্য থেমে চিন্তা-ভাবনা করা, নিজেদের অন্তরের অন্তরালে এসব গুণের প্রতিচ্ছবি অঙ্কন করা; সর্বোপরি নিজেদের জীবনের চলার পথে আলো পাবার লক্ষ্যে এসব গুণের এক প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করা।

টিকাঃ
৯৩১. ইবন আবি যারা', আযযাহাফিয়াফুন সানিয়া, পৃ : ৮৮-৯৬।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 আন্দালুস ও বহিঃরাষ্ট্রের সহায়তার অর্জিত বিজয় একটি পর্যালোচনা

📄 আন্দালুস ও বহিঃরাষ্ট্রের সহায়তার অর্জিত বিজয় একটি পর্যালোচনা


ইয়াকুব আলমানসুর আলমারিনী-এর অসাধারণ সব বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ ও প্রায়োগিক নমুনা হল, যখন প্রথম মুহাম্মাদ ইবনুল আহমার তাঁর কাছে সহায়তার আবেদন করেছিলেন, তখন কালবিলম্ব না করে তিনি সে আবেদনে সাড়া দিয়েছিলেন এবং সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে সাগর পাড়ি দিয়ে আন্দালুসে পা রেখেছিলেন। এরপর গ্রানাডায় খৃস্টান বাহিনীর আক্রমণ মোকাবেলা করে ইসলামী চেতনারবোধের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিলেন।

বহিরাষ্টের সাহায্যে বিজয় অর্জন করা আন্দালুসবাসীর অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। বিগত দীর্ঘকাল ধরে এটি আন্দালুসে একটি স্বীকৃত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। দুই শ' বছরের অধিক সময় ধরে আন্দালুসবাসী বহিরাষ্টের সাহায্য নিয়েই খৃস্টান-পূজারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধে জয়লাভ করেছে। কখনো মুরাবিতী বাহিনীর সাহায্য নিয়ে, কখনো মুওয়াহ্হিদীবাহিনীর সহায়তায়, আবার কখনো বনূ মারীনের সহযোগিতায়, এভাবেই বহিরাষ্টের সহায়তা নির্ভর হয়ে পড়েছিল। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, মাগরেব ও পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোর কাছে সাহায্য গ্রহণ ব্যতীত আন্দালুসে মুসলমানদের ভিত্তি যেন দাঁড়াতে পারত না। আর এটা একটি অতি স্বাভাবিক ও কুদরতি বিষয় যে, অন্যের কাঁধে ভর করে যার অস্তিত্ব নির্ভরশীল, তার অবস্থান কখনোই শক্তিশালী ও স্থায়ী হয় না এবং এ পথে অর্জিত বিজয় কখনো পূর্ণাঙ্গ হয় না। যাদের সম্পদের পাহাড় খরচ হয় কেবল জাঁকজমকপূর্ণ রাজপ্রাসাদ নির্মাণের পেছনে, চির শত্রু খৃস্টান বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত অবস্থায় যাদের চিন্তা ও পরিকল্পনা এবং অর্থ ও কর্মসাধনা ব্যয় হয় গ্রানাডায় আলহামরা রাজপ্রাসাদের মতো আন্দালুসের অন্যতম জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ নির্মাণে, আর তাদের মাতৃভূমি ও সেই বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদের নিরাপত্তাব্যবস্থায় সাগর পাড়ি দিয়ে দূর দেশের বাহিনীকে এগিয়ে আসতে হয়, আর যাহাই হোক এ ধরনের রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রজীবন সঠিক পথে চলতে পারে না।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 প্রথম মুহাম্মাদের মৃত্যু এবং মুহাম্মাদ আলফকীহের ক্ষমতাগ্রহণ

📄 প্রথম মুহাম্মাদের মৃত্যু এবং মুহাম্মাদ আলফকীহের ক্ষমতাগ্রহণ


৬৭১ হিজরীতে (১২৭৩ খৃস্টাব্দে) প্রায় আশি বছর বয়সে গ্রানাডা শাসক প্রথম মুহাম্মাদ মৃত্যুবরণ করেন এবং তার পুত্র তার স্থলাভিষিক্ত হন। পিতা-পুত্রের উভয়ের নামই ছিল মুহাম্মাদ; বরং বনূ আহমারের অধিকাংশ শাসকই তাদের পুত্রের নাম মুহাম্মাদ রেখেছিলেন। নতুন শাসকের পুরো নাম মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ ইবনুল আহমার। পিতার শাসনামলে যেহেতু তিনি এলমে দ্বীন অন্বেষণে সচেষ্ট ছিলেন, তাই জনগণ তাকে 'ফকীহ' উপাধি প্রদান করে এবং তিনি পরিচিত ছিলেন 'মুহাম্মাদ আলফাক্বীহ' নামে।

শাসনভার লাভ করার পর মুহাম্মাদ আলফাক্বীহ তার রাষ্ট্রের সার্বিক অবস্থার ওপর নজর বোলালেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, উত্তরের খৃস্টানশক্তির মোকাবেলায় আন্দালুসের মুসলিম শক্তি কিছুতেই অটল-অবিচল থাকতে পারবে না। এদিকে তার পিতা প্রথম মুহাম্মাদের মৃত্যুর পর থেকে দশম আলফানসো তার রাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি দেখলেন যে, গ্রানাডা রাষ্ট্রের প্রশাসন ও সামরিক শক্তি এবার ভেঙে পড়েছে। তাই তিনি কালবিলম্ব না করে নতুন করে গ্রানাডা রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে হামলা চালাতে শুরু করেছেন। সবদিক বিবেচনা করে মুহাম্মাদ আলফাক্বীহ একটি পথই খুঁজে পেলেন; হ্যাঁ, বহিরাষ্টের সাহায্য কামনা। অধিকন্তু তার পিতাও মৃত্যুর পূর্বে তাকে মাগরেবের আমীরুল মুসলিহীন ইয়াকুব আলমানসুর আলমারিনী-এর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ওসিয়তও করেছিলেন।

বনূ মারীন সরকার সাহায্যে আহ্বানে সাড়া দিল। ৬৭৪ হিজরীর সফর মাসে আলমানসুর আলমারিনী প্রথমবার আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আন্দালুসে পা রাখলেন। নিজের আন্দালুস-অভিযানের প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য এর একবছর পূর্বে তিনি তার পুত্রের নেতৃত্বে পাঁচ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী জিব্রাল্টার প্রণালীতে প্রেরণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ইয়াকুব আলমানসুরের সমগ্র আন্দালুস-অভিযানের জন্য এই জিব্রাল্টার ছিল আন্দালুস-ভূমিতে তার অস্থায়ী ঘাঁটি।

টিকাঃ
৯৯৫. দেখন : ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/১৮৬।
৯৯৬. ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/১৮৬।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 ডনোনিয়ার যুদ্ধ ও নিরঙ্কুশ বিজয়

📄 ডনোনিয়ার যুদ্ধ ও নিরঙ্কুশ বিজয়


এমন প্রেক্ষাপটে গ্রানাডা থেকে অদূরে কর্ডোভার কাছাকাছি এলাকায় মুসলিম বাহিনী ক্যাসটেলা বাহিনীর মুখোমুখি হল। ক্যাসটেলা বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল ক্যাসটেলার বিখ্যাত যোদ্ধা ও সেনাপতি ডন লোরিয়ো ডি লারা। তার নামেই এ যুদ্ধের নামকরণ করা হয় এবং এ যুদ্ধটি 'ডনোনিয়ার যুদ্ধ' নামে খ্যাতি লাভ করে।

৬৭৪ হিজরীতে (১২৭৬ খৃস্টাব্দে) সংঘটিত হল ডনোনিয়ার যুদ্ধ। মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে বনূ মারীন রাষ্ট্রের প্রধান আমীরুল মুসলিমীন ইয়াকুব আলমানসুর আলমারিনী। তিনি নিজে জনসাধারণের মাঝে ইমানী চেতনা উদ্বুদ্ধ করলেন। যুদ্ধের প্রাক্কালে তিনি মুসলিম বাহিনীর উদ্দেশ্যে উপদেশ ভাষণে বললেন, শোন! জান্নাত তোমাদের জন্য আপন দ্বারসমূহ উন্মুক্ত করে দিয়েছে আর হুর ও গেলমানদের সুসজ্জিত করে রেখেছে। সুতরাং তোমাদের মন জান্নাতের দিকে ধাবিত হোক এবং জান্নাতের সওদা করতে গিয়ে আপন প্রাণ-সম্পদ ব্যয় কর। শোন, জান্নাত তো তরবারীর ছায়াতলে। এরপর তিনি মুসলিম বাহিনীকে উদ্বুদ্ধ করতে তেলাওয়াত করলেন কোরআনের চির শাশ্বত ঘোষণা:

বস্তুত আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও তাদের সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন, তাদের জন্য জান্নাত আছে—এর বিনিময়ে। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে। ফলে তারা হত্যা করে এবং নিজেরা নিহত হয়। এটা এক সত্য প্রতিশ্রুতি, যা আল্লাহ তাওরাত ও ইনজিলেও নিয়েছেন এবং কোরআনেও। আল্লাহ অপেক্ষা প্রতিজ্ঞা রক্ষাকারী আর কে আছে? সুতরাং তোমরা আল্লাহর সঙ্গে যে সওদা করেছ, সেই সওদার জন্য আনন্দিত হও এবং এটাই মহা সাফল্য। [সূরা তাওবা : ১১১]

এরপর তিনি বললেন, সুতরাং এই প্রভূত লাভের ব্যবসাকে সুবর্ণ সুযোগ মনে কর এবং এর এবং সৎকর্মের মাধ্যমে জান্নাতের দিকে অগ্রসর হও। তোমাদের মধ্যে যারা শাহাদাত বরণ করবে, তারা তো লাভ করবে শাশ্বত জীবনের গৌরব; আর যারা জীবিত থাকবে, তারা আপন পরিবারের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে নিরাপদ অবস্থায় পার্থিব গণীমত ও পরকালের অফুরান সাওয়াবের সম্পদ নিয়ে প্রশংসিত অবস্থায়।

হে মুমিনগণ! সবর অবলম্বন কর, মোকাবিলার সময় অবিচলতা প্রদর্শন কর এবং সীমান্ত রক্ষায় স্থির থাক। আর আল্লাহকে ভয় করে চল, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। [সূরা আলে-ইমরান : ২০০]

আন্দালুসী ও অন্যান্য সিপাহসালার, সংযুক্ত ইমানী চেতনায় উজ্জীবিত ও জান্নাতের সওদায় পূর্ণ প্রস্তুত আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া মাগরেবের সৈনিকদল—দশ হাজারেরও কমসংখ্যক বীর যোদ্ধার এই বাহিনীর মাধ্যমেই তারা ক্যাসটেলা রাজ্যের বিশাল বাহিনীকে পরাভূত করল এবং অর্জন করল এক মহান ও গৌরবময় বিজয়। যুদ্ধে খৃস্টান বাহিনীর ছয় হাজার সৈন্য নিহত হল, বন্দী হল সাত-আট হাজার। বাহিনীর প্রধান ডন লোরিয়ো নিজেও এ যুদ্ধে নিহত হল। মুসলিম বাহিনী প্রচুর গণীমত লাভ করল। ৬৭৪ হিজরীতে সংঘটিত এ যুদ্ধের মতো এমন নিরঙ্কুশ বিজয় আন্দালুসে ইতিপূর্বে খুব কম যুদ্ধেই অর্জিত হয়েছিল।

বিজয়ের পর আলমানসুর জাবীরাতুল খায়রায় ফিরে এলেন এবং কয়েকদিন সেখানে অবস্থান করে গণীমতের সম্পদ বণ্টন করলেন। এ সময় তিনি আটলান্টিকের ওপারের মুসলিম জনগণের কাছে মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের সংবাদ পাঠালেন এবং গ্রানাডা-শাসক ইবনুল আহমারের কাছেও সংবাদবাহক পাঠিয়ে বিজয়-সংবাদ পৌঁছে দিলেন। এরপর তিনি তার বাহিনী নিয়ে সেভিলের নগর-সীমান্তে পৌঁছালেন। মুসলিম বাহিনী দুর্গবেষ্টিত সেভিল নগরী অবরোধ করলো। প্রতিরোধ করতে গিয়ে সেভিলের খৃষ্টান বাহিনীর বহু সৈন্য হতাহত বা বন্দী হল। এরপর তিনি সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নিয়ে শারিসে পৌঁছালেন এবং শারিস নগরীও অবরোধ করলেন। এরপর সেখান থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করে জাবীরাতুল খায়রায় ফিরে এলেন।

এ যুদ্ধের তিন বছর পর ৬৭৭ হিজরীতে (১২৭৯ খৃষ্টাব্দে) সেভিলের খৃষ্টান গোষ্ঠী আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সংবাদ পেয়ে ইয়াকুব আলমানসুর আলমারিণী আবারও তার বাহিনী নিয়ে সেভিলে পৌঁছালেন এবং আবারও সেভিল অবরোধ করলেন। দীর্ঘ সময়ের অবরোধের পর সেভিলের খৃষ্টান কর্তৃপক্ষ জিবিয়া প্রদানের শর্তে ইয়াকুব আলমানসুরের সঙ্গে সন্ধি করল। এরপর তিনি কর্ডোভা অভিমুখী হলেন এবং কর্ডোভা অবরোধ করলেন। কর্ডোভাও জিবিয়া প্রদানের শর্তে নতি স্বীকার করল।

তৎকালীন আন্দালুসের খৃষ্টান গোষ্ঠী যে কোন মূল্যে তাদের নগরীগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে উদ্যোগী ছিল। তারা এসব নগরীর প্রাচীর ও দূর্গগুলোর কারণে নিশ্চিত নিরাপত্তা লাভ করেছিল। বরং বলা ভালো, এগুলো সেসব নগরপ্রাচীর ও দূর্গ, যা ইতঃপূর্বে মুসলমানরাই নিজেদের নগরীর নিরাপত্তার জন্য নির্মাণ করেছিল। কিন্তু দশম আলফনসো সেসব মুসলিম শাসকগণের মতো ভীরু, কাপুরুষ ও দূর্বল ছিলেন না, যারা এসব নগরীর পতনের সময় মুসলমানদের শাসনকর্তা ছিল এবং বীরত্ব প্রদর্শনের পরিবর্তে ভীরুতা ও কাপুরুষতার পরিচয় দিয়ে এসব নগরীর কর্তৃত্ব খৃষ্টানশক্তির হাতে তুলে দিয়েছিল। এমনকি তারা এসব নগরী দখলের ক্ষেত্রে খৃষ্টান বাহিনীকে সহায়তাও করেছিল।

মাররেবে ফিরে আসার পূর্বে ইউসুফ বিন তাশফীন বিতন্ড মুসলিম আন্দালুসের শাসকবর্গকে একত্র করে ঐকবদ্ধ থাকার এবং হানাহানি ও সংঘাত পরিহার করার নির্দেশ দিলেন, যেন তাদের নির্লজ্জতার কারণে এই মহান বিজয়ের সুফল বিনষ্ট না হয়। এরপর এই দুর্দমনীয় মুসলিম বীর ফিরে গেলেন নিজ দেশে। এ সময় তার বয়স ছিল ঊনআশি বছর! তিনি চাইলেই পারতেন নির্জন মরুভূমি ও উত্তাল সাগর পাড়ি দেওয়ার কষ্ট সহ্য না করতে। চাইলেই পারতেন যুদ্ধক্ষেত্রের দুর্যোগ-দুর্বিপাক ও রক্তপাত থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করতে। তিনি পারতেন অজানা ভূমির অচেনা পরিবেশে নিজে না গিয়ে মাগরেবে অবস্থান করতে এবং তার কোন সেনাপতিকে আন্দালুসে প্রেরণ করতে। কিন্তু তিনি এই বয়সেও সব কঠিন বাধাকে জয় করেছেন এবং ঘোড়ার পিঠে চড়ে রণাঙ্গনে ছুটে বেড়িয়েছেন। তার চেতনা ও প্রেরণা ছিল কবির ভাষায়,

কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য তুমি যখন ঝুঁকি নেবে, তাহলে সুদূর আকাশের তারকারাজি ছোঁয়ার পূর্বে থামবে না। কেননা, তুচ্ছ লক্ষ্য অর্জনে ভোগ করা মৃত্যুর স্বাদ তো গুরুত্বপূর্ণ কোন মিশন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে লাভ করা মৃত্যু-স্বাদের তুলনায় ভিন্ন কিছু নয়।

যাত্রাকার যুদ্ধের জ্ঞানী-গুণী, প্রতিভাশালী আলিমসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকেই শহীদ হয়েছিলেন। যেমন, নবীজীকে স্বপ্নে দেখা ইবনে রুমাইলা, মাররাকিশের কাজী আবু মারওয়ান আবদুল মালিক মাহমুদীয়ী প্রমুখ। আল্লাহু তাআ’লা তাদের সকলকে রহমতের বারিধারায় সিক্ত করুন।

টিকাঃ
৯৯১. 'ইবনে আবি যারা', আযযাহাফিয়াতুস সানিয়া, পৃ : ১৪৪-১৪৬ ও ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/১৯১-১৯২।
৯৯২. 'ইবনে আবি যারা', আযযাহাফিয়াতুস সানিয়া, পৃ : ১৪৮।
৯৯৩. 'ইবনে আবি যারা', আযযাহাফিয়াতুস সানিয়া, পৃ : ১৪৪-১৪৬।
৯৯৪. 'ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/১৯০।
৬৯৬. ইবনে আবি যারা’, আযযাহিয়াতুল মাদিন্না, পৃ: ১২৫ ও ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/১৩০।
৬৯৭. ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/১৩০-১৩৭।

ফন্ট সাইজ
15px
17px