📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুওয়াহহিদী সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী বনু মারীন

📄 মুওয়াহহিদী সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী বনু মারীন


বনু মারীন বিখ্যাত আমালিগ (বার্বার) গোত্র যিনাতা গোত্রের একটি শাখা। মাগরেবের ইতিহাসে বিভিন্ন বাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী আরও অনেক গোত্র যেমন উরিয়ালা, মাদাঈয়ূনা, মাগারাওয়া, আবদুল ওয়াদ, রিদারা ইত্যাদি গোত্রও যিনাতা গোত্রের শাখা। প্রথম দিকে বনু মারীন ছিল একটি যাযাবর সম্প্রদায়। ৬০১ হিজরীতে বনু আবদিল ওয়াদ ও বনু সগিলসের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে তারা নিজেদের আবাসভূমি ছেড়ে মাগরেবের গহীন পাহাড়ী অঞ্চলে চলে যায় এবং মাগরেব ও সাহারা মরুভূমির মধ্যবর্তী বৃক্ষ-তরু-লতাহীন এক নির্জন ও দুর্গম এলাকায় অবতরণ করে। ৬১০ হিজরীতে তারা সেখানেই স্থায়ী আবাস স্থাপন করে। সে বছরই ইকাব যুদ্ধের পর মুওয়াহ্হিদীনী শাসক মুহাম্মাদ আননাসীর ইন্তেকাল করেন এবং তার পুত্র আলমুস্তানসির তার স্থলাভিষিক্ত হন।

আলমুস্তানসির ছিলেন একেবারেই কিশোর বয়সী একজন শাসক। রাজনীতি ও প্রশাসননীতি সম্পর্কে তার মোটেও অভিজ্ঞতা ছিল না। তাই তিনি রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বভার তার চাচা ও মুওয়াহ্হিদীনী সাম্রাজ্যের বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিজে আমোদ-প্রমোদে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তখন দায়িত্বপ্রাপ্তরা সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্রপরিচালনার পরিবর্তে দুঃশাসন কায়েম করে এবং প্রশাসনিক দায়িত্বপালনে অবহেলা করে নিরাপত্তাহীনতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। ইকাব যুদ্ধের কারণে মুওয়াহ্হিদীনী সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তিও বহুলাংশে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তাদের অধিকাংশ দক্ষ সেনাপতি ও যোদ্ধা ইকাব যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। আর এর পরপরই এ অঞ্চলে এক বিরাট মহামারী ছড়িয়ে পড়ায় মারা গিয়েছিল অনেক মানুষ।

বনু মারীন এ সময় নির্জন মরুভূমিতে বসবাস করত। গ্রীষ্ম ও বসন্তকালে তারা গবাদি পশু চরাবার জন্য মাগরেবের গ্রাম ও উপশহরগুলোতে পশু চরাতে আসত এবং মরুভূমিতে জীবন নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী শস্যদানা ও খাবার সংগ্রহ করত। গ্রীষ্ম শেষে যখন শীতকাল শুরু হত, তখন তারা বিভিন্ন গ্রাম ও শহরতলি থেকে সকলে তৌরাকাসিফ নামক একটি শহরে সমবেত হত এবং সেখান থেকে সবাই একসঙ্গে নিজেদের আবাসভূমি গহীন মরুভূমির উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাত।

অতঃপর ৬১০ হিজরীতে তারা পশু চরানো এবং শস্যদানা ও খাবার সংগ্রহের উদ্দেশ্যে মাগরেবের বিভিন্ন গ্রাম ও শহরতলিতে উপস্থিত হল। এবার তারা এসে দেখতে পেল, এসব এলাকার অবস্থা আগের মতো নেই। সবকিছু কেমন যেন পাল্টে গেছে। মুওয়াহ্হিদীনী প্রশাসনের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক; রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে চরম উদাসীন হয়ে তারা ব্যস্ত আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসে। ইকাব যুদ্ধে বীর যোদ্ধা ও নওজোয়ানদের হারানোর পর জনগণও কেমন যেন নীরব-নিষ্প্রভ। যুদ্ধ বিভীষিকার পরেই যোগ হয়েছে মাগরেব ও আন্দালুস-ভূমি উজাড় করা এক মহামারী।

পাশাপাশি তারা লক্ষ করল, এ দেশের মাটি চাষাবাদের উপযোগী ও অত্যন্ত উর্বর, পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ আছে, আছে বসবাসের উপযুক্ত বিস্তৃত স্থান, চাষাবাদের বিস্তৃত ক্ষেত্র; পশু চরানোর প্রচুর বন থাকায় সবুজ ঘাসে ভরপুর চারণভূমিও অনেক, আছে সবুজ-শ্যামল সমতল ভূমি ও টিলাভূমি। সার্বিক পরিস্থিতি তাদের মরুভূমি ছেড়ে এখানে আবাস স্থাপন করতে উদ্বুদ্ধ করল। তারা মরুভূমিতে অবস্থানরত তাদের গোত্রীয় সকলকে যাবতীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করল এবং এও জানাল যে, তারা এখানেই আবাস স্থাপন করতে চায়। গোত্রের বাকিদেরকেও তারা এখানে চলে আসতে উদ্বুদ্ধ করল। বনু মারীনের অবশিষ্ট জনগোষ্ঠী সংবাদ পাওয়ামাত্র দ্রুত রুক্ষ মরুভূমি ছেড়ে এই সবুজ ভূখণ্ডে চলে এল এবং পুরো মাগরেব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল।

যেহেতু বনু মারীন ছিল যাযাবর সম্প্রদায়, স্বাভাবিকভাবেই কারও কাছে নতি স্বীকার করা বা কারও অধীনে থাকা তাদের স্বভাবে ছিল না। তাই নতুন আবাসস্থলে ধীরে ধীরে তারা কর্তৃত্ব বিস্তার করতে লাগল এবং যাযাবরদের রীতি অনুযায়ী তাদের চারণপথের শহরগুলোতে মাঝে মধ্যেই অতর্কিতে হামলা চালাতে লাগল। তাদের এ ধরনের আক্রমণের প্রকোপ যখন অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেল এবং মুওয়াহ্হিদীনী প্রশাসনের কাছে জনসাধারাণের অভিযোগ আসা বেড়ে গেল, তখন খলীফা আলমুস্তানসির মুওয়াহ্হিদীনী তাদের মূলোৎপাটন করার মনস্থ করলেন।

৬১০ হিজরীতে তিনি তৎকালীন প্রধান সেনাপতি আবূ মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ বিন মাই-ই’র নেতৃত্বে বনু মারীনকে দমন করার জন্য একটি বাহিনী প্রেরণ করলেন। উভয় বাহিনী মুখোমুখি হল। একটানা কয়েকদিনের প্রচণ্ড যুদ্ধের পর মুওয়াহ্হিদীনী বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হল। বিজয়ী বনু মারীন মুওয়াহ্হিদীনী রাষ্ট্রের প্রচুর সম্পদ ও অস্ত্র-শস্ত্র হস্তগত করল। ফলে তাদের শক্তি ও প্রভাব বহু গুণে বৃদ্ধি পেল এবং পুরো মাগরেব অঞ্চলে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ছড়িয়ে পড়ল।

৬১৪ হিজরী পর্যন্ত একটানা কয়েক বছর বনু মারীন ও মুওয়াহ্হিদীনী সরকারের মধ্যে সংঘাত ও যুদ্ধ অব্যাহত রইল। ৬১৩ হিজরীতে মুওয়াহ্হিদীনী শাসক রাশীদ বনু মারীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য একটি বাহিনী প্রেরণ করলেন এবং মুওয়াহ্হিদীনী বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হল ও বনু মারীন প্রচুর ধন-সম্পদ ও অস্ত্র-শস্ত্রের অধিকারী হল। এর এক বছর পরেই খলীফা রাশীদ মারা গেলেন এবং তার স্থলাভিষিক্ত হলেন তার ভাই আবুল হাসান সাঈদ। সেবিলবাসী সেবিল পতনের পূর্বে তার কাছে সাহায্য কামনা করেছিল। আবুল হাসান সাঈদ বনু মারীনকে দমন করার সংকল্প করলেন এবং এ উদ্দেশ্যে কঠোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলেন। ৬১৪ হিজরীতে তিনি বনু মারীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য একটি বিশাল বাহিনী প্রেরণ করলেন। উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘটিত প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে এবার বনু মারীন পরাজিত হল এবং তাদের তৎকালীন আমীর আবূ মু’আরিক মুহাম্মাদ বিন আবদূল হক নিহত হলেন।

আবু মু’আরিকের মৃত্যুর পর বনু মারীনের নেতৃত্বের গ্রহণ করলেন তার ভাই আবূ বকর বিন আবদূল হক। তিনি ‘আবু ইয়াহ্ইয়া’ উপাধি ধারণ করলেন। তার আমলে বনু মারীনের প্রতাপ ও শক্তি প্রচুর বৃদ্ধি পেল। ৬৪৩ হিজরীতে বনু মারীন মিকনাসা শহর দখল করে নিল। এরপর তারা ফেয নগরীকে লক্ষ্যস্থির করল এবং কঠিন অবরোধের পর ৬৪৬ হিজরীতে ফেয নগরীও দখল করে নিল। ৬৫৫ হিজরীতে তারা সিজিলমাসা (Sijilmasa) ও দারুআ (Draa) নগরী জয় করল। এবং এক বছর পর আবু ইয়াহ্ইয়াও মৃত্যুবরণ করলেন এবং তার স্থলাভিষিক্ত হলেন তার অপর এক ভাই আবু ইউসুফ ইয়াকুব বিন আবদূল হক আলমারীনী। তিনি ‘আলমনসুর’ উপাধি ধারণ করলেন এবং ফেয নগরীকে বনু মারীন রাষ্ট্রের রাজধানী নির্ধারণ করলেন।

৬৬৭ হিজরীতে বনু মারীন এবং মাগরেবের শাসক ও বনু আবদিল ওয়াদের সর্দার আমীর ইয়াহ্ইয়ামারাসিন বিন যিয়াদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হল। আবু ইউসুফ ইয়াকুব আলমনসুর যুদ্ধে জয়লাভ করলেন এবং ইয়াহ্ইয়ামারাসিন পরাজিত অবস্থায় তিলিমসানে চলে গেল। ৬৬৮ হিজরীতে আন্দালুসের খ্রিস্টান বাহিনী মাগরেবের সমুদ্র উপকূলীয় শহর সিল্যায় হামলা চালাল এবং সেখানকার বহু অধিবাসীকে হত্যা ও বন্দী করল। সংবাদ পেয়ে আলমনসুর আলমারীনী দ্রুত সসৈন্যে সেখানে গেলেন এবং কয়েক সপ্তাহ দখলদার খ্রিস্টান বাহিনীকে অবরোধ করে রাখার পর তাদেরকে শহর ত্যাগে বাধ্য করলেন।

৬৬৯ হিজরীতে সংঘটিত হল বনু মারীন ও মুওয়াহ্হিদীনী চূড়ান্ত যুদ্ধ। বছরের শেষ দিকে মুওয়াহ্হিদীনী খলীফা ওয়াসিক বিল্লাহ বনু মারীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য নিজেই বাহিনী নিয়ে রওয়ানা হলেন। বনু মারীনের রাজধানী ফেয এবং মুওয়াহ্হিদীনী রাষ্ট্রের রাজধানী মার্রাকুশের মধ্যবর্তী গাফ্ফ উপত্যকায় উভয় বাহিনী মুখোমুখি হল। যুদ্ধের পর বনু মারীন নিরঙ্কুশ জয় অর্জন করল। মুওয়াহ্হিদীনী বাহিনীর অসংখ্য সৈন্য নিহত হল; স্বয়ং মুওয়াহ্হিদীনী খলীফা ওয়াসিক বিল্লাহও নিহত হলেন। বনু মারীন বাহিনী তাদের অস্ত্র-শস্ত্র ও অন্যান্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদ করায়ত্ত করল। এরপর তারা রওয়ানা হল মার্রাকুশের উদ্দেশ্যে। ৬৬৯ হিজরী ১০ মুহাররম ইয়াকুব আলমনসুর তার বাহিনী নিয়ে মার্রাকুশে প্রবেশ করলেন এবং মার্রাকুশের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে ‘আমীরুল মুসলিমীন’ উপাধি ধারণ করলেন। শেষ হল দীর্ঘ প্রায় দেড় শতাব্দীর মুওয়াহ্হিদীনী সাম্রাজ্যের অধ্যায়, আর শুরু হল নবগঠিত এক সাম্রাজ্যের নতুন এক অধ্যায়, যার নাম ‘বনু মারীন সাম্রাজ্য’। পরবর্তী সময়ে বনু মারীন সুবিশাল মাগরেবের সকল অঞ্চলকেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছিল।

টিকাঃ
৯৫. ইবনে আবি যারা, আযযাহ্হারা, পৃ: ১৪ ও ইবনে খালদূন, তারিখে ইবনে খালদূন, ৭/১১৯।
৯৬. ইবনে আবি যারা, আযযাহ্হারা, পৃ: ২৪-২৭, ইবনে খালদূন, তারিখে ইবনে খালদূন, ৭/১১৯ ও আন্দালুসী, জাইসজাইকারা, ৪/১।
৯৭. ইবনে আবি যারা’, আযযাহ্হারা, পৃ: ২৭ ও ইবনে খালদূন, তারিখে ইবনে খালদূন, ৭/১১৯।
৯৮. ইবনে খালদূন, তারিখে ইবনে খালদূন, ৭/১১৯।
৯৯. ইবনে আবী যারা’, আযযাহ্হারা মুনতাক, মুওয়াহ্হিদীনী অধ্যায়, ১ : ৩৮৩-৩৪৮।
১০০. ইবনে আবি যারা’, আযযাহ্হারা, পৃ : ৬৬-৬৬ ও ইবনে খালদূন, তারিখে ইবনে খালদূন, ৭/১২১-১২১।
১০১. ‘ইবনে আবি যারা’, আযযাহ্হারা, পৃ: ৭৭-৭৮, ১০১।
১০২. ইবনে খালদূন, তারিখে ইবনে খালদূন, ৭/১১৯-১২৬।
১০৩. ইবনে আবি যারা’, আযযাহ্হারা, পৃ: ৮৩-৮৬ ও আন্দালুসী, জাইসজাইকারা, ৫/২২-২২।
১০৪. লেবুন : ‘ইবনে আবি যারা’, আযযাহ্হারা, পৃ: ১১৩-১১৮ ও ইবনে খালদূন, তারিখে ইবনে খালদূন, ৭/১২৫-১২৯।
১০৫. লেবুন : ‘ইবনে আবি যারা’, আযযাহ্হারা, পৃ: ১১২।

ফন্ট সাইজ
15px
17px