📄 ইবনে জুবাইর রহ.
তার পুরো নাম আল্লামা আবুল হুসাইন মুহাম্মাদ বিন আহমাদ বিন জুবাইর আলকিনানী আন্দালুসী। সাহিত্যিক ও পরিভ্রাজক হিসেবে তাঁর খ্যাতি রয়েছে। ৫৪০ হিজরীতে (১১৪৫ খৃস্টাব্দে) তিনি ভ্যালেন্সিয়াতে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে ইলমুল কিরাআতের শিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর সাহিত্যে মনোযোগী হন এবং সাহিত্য, কাব্যরচনা ও গদ্যলেখার জগতে যোগ্যতার উচ্চতম শিখরে আরোহণ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা হলো—ভ্রমণবৃত্তান্ত 'রিসালাতু ইবনি জুবাইর', কাব্যসংকলন 'নাযমুল জুমান' ইত্যাদি।
তাঁর অনন্য গদ্যকুশলতার একটি নমুনা ‘নাফহুত তীব’ গ্রন্থে আল্লামা মাক্কারী রহ. তুলে ধরেছেন। ইবনে জুবাইর তাঁর দামেশক-ভ্রমণের সময় দামেশক সম্পর্কে বলেছিলেন—'দামেশক। প্রাচ্যের ভূস্বর্গ। প্রদীপ্ত সৌন্দর্যের উদয়াচল। মুসলিম বিশ্বের যেসব নগরী আমি ভ্রমণ করেছি, দামেশক তার শেষ প্রান্ত। সেসব শহরের রূপে-গুণে আমি বিমুগ্ধ হয়েছি, দামেশক সবার শ্রেষ্ঠ। দামেশক সজ্জিত হয়েছে পল্লবিত বাগিচার রেশমী আচ্ছাদনে; বিকশিত হয়েছে সুরভিত কুসুমের বিচিত্র দেহাবরণে। আল্লাহ পাকের আদেশে মাসীহ্ ও তাঁর মাতা আশ্রয় নিয়েছিলেন দামেশকের উচ্চভূমিতে; যেখানে ছিল অবারিত শান্তি, নিবিড় তরু-ছায়া ও স্বচ্ছ ঝরনা-ধারা।'
তিনি আরও বলেন—'আল্লাহর শপথ! যদি পৃথিবীতে কিছু থাকে ‘স্বর্গ’ বলে, নিঃসন্দেহে তা দামেশক-ভূমি; আর যদি থাকে ঊর্ধ্বজগতে, তবে তা দামেশকেরই সমান্তরাল।' জীবনীকার ও ইতিহাসলেখকগণ অকুণ্ঠচিত্তে ইবনে জুবাইরের প্রশংসা করেছেন। লিসানুদ্দীন ইবনুল খতীব রহ. তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি ফিকহ ও ইলমুল হাদীসে আন্দালুসের প্রাজ্ঞ আলিমগণের একজন। পরবর্তী সময়ে তিনি সাহিত্যচর্চা পরিহার করে যিকিরে মশগুল হন। ইবনে জুবাইর ৬১৪ হিজরীর (১২১৭ খৃষ্টাব্দে) আলেকজান্দ্রিয়ায় ইন্তেকাল করেন।
টিকাঃ
৯৯৯. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ২২/৪৬-৪৭।
১০০. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ২/৮৫২।
১. দামেশকের শহর ও আশেপাশে পট্টবস্ত্রের পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে অবস্থিত বিশাল সবুজ অঞ্চলের নাম 'গুতআ'।
২. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ২/৩৫৩-৩৫৭।
৩. প্রাগুক্ত, ২/৪৫৭।
৪. ইবনুল খতীব, আলইহাতা, ১/২৩৯।
📄 ইবনুল কুরতুবী রহ.
তাঁর পুরো নাম আবদুল্লাহ ইবনুল হাসান বিন আহমাদ বিন ইয়াহ্ইয়া বিন আবদুল্লাহ আল আনসারী আলমালাকী। তাঁর উপনাম আবু মুহাম্মাদ। তবে তিনি ‘ইবনুল কুরতুবী’ নামে সমধিক পরিচিত। ৫৬৬ হিজরীর নভেম্বরে মালাগাতে তাঁর জন্ম।
ঐতিহাসিকগণের বর্ণনামতে তিনি ছিলেন প্রগাঢ় ইলমের অধিকারী, ইলমুল কিরাআত, ইলমুল হাদীস ও অন্যান্য শাস্ত্রের শায়খ, বর্ণনার ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত, সুন্দর আচরণের অধিকারী, আসমাউর রিজাল ও ইতিহাস-শাস্ত্রে প্রাজ্ঞ। তিনি ছিলেন প্রিয়ভাষী, সচেতন, প্রদীপ্ত মেধাশক্তি ও মহৎ চরিত্রের অধিকারী, সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে সম্মানের পাত্র, ধার্মিক ও প্রাজ্ঞ সাহিত্যিক।
তাঁর প্রিয় শিষ্য জাফর বিন জাফর বলেছেন, ফারা পাহাড়ের ওপর অবস্থিত তাঁর অতি ছোট কুটিরে আমি একরাত তাঁর সঙ্গে অতিবাহিত করেছিলাম অধ্যয়নের জন্য। তিনি এক আশ্চর্য স্বপ্নের কথা আমাকে শুনিয়েছিলেন। তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, কিয়ামতের ময়দানে বিচার শেষে তাঁকে আল্লাহর পক্ষ থেকে মুক্তির পরোয়ানা প্রদান করা হচ্ছে। তিনি ইলমুল আরুজ (কাব্যশাস্ত্র) সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু রচনা উম্মাহকে উপহার দিয়েছেন। এছাড়াও তিনি কুরআনের কিরাআত সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর প্রসিদ্ধ একটি গ্রন্থ হলো—‘আলমুফহিম লি শুহুরির রুনদী’। ইবনুল কুরতুবী ৬১১ হিজরীর ৭ রবিউল আউয়াল মৃত্যুবরণ করেন।
টিকাঃ
৫. প্রাগুক্ত, ৩/৫৫৮।
৬. প্রাগুক্ত, ৩/৪৫৫।
৭. মালাগা নগরীর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত একটি পাহাড়ের নাম।
৮. ইবনুল খতীব, আলইহাতা, ৩/৪০৫-৪০৭।
৯. ইবনুল খতীব, আলইহাতা, ৩/৪০৬।